ওফাত

ওফাত
(রবীউল-আওয়াল ১১ হিজরী)

দাওয়াত ও তাবলীগ এবং শারী‘আর বাস্তবায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে : পরম প্রিয়ের সঙ্গে মিলনের প্রস্তুতি

দীন ইসলাম পূর্ণতা প্রাপ্ত হলে নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হল :

“আজ আমি তোমাদের জন্য দীনের পূর্ণতা দান করলাম, তোমাদের ওপর আমি আমার নে‘মত পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসাবে ইসলামকে আমি মনোনীত করলাম” (সূরা মাইদাহ, ৩ আয়াত)।

রাসূলুল্লাহ (সা) হেদায়াতের পয়গাম মানুষকে পৌঁছে দিলেন। আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে তাঁর ওপর অর্পিত আমানত এতটুকু কমবেশি না করে যথাযথভাবে পৌঁছে দিয়েছেন, সত্যের পথে কুরবানী ও আত্মত্যাগের হক আদায় করেছেন এবং এমন এক উম্মত তৈরি করলেন যে উম্মত নবীর দায়িত্বে সমাসীন না হয়েও নবুওয়াতের জিম্মাদারী আদায় করতে পারে। তিনি তাদেরকে এই দাওয়াতের পতাকাবাহী এবং এই দীনকে যাবতীয় বিকৃতির হাত থেকে রক্ষার জিম্মাদার বানালেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

“তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত; মানব সমাজের জন্যই তোমাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে। তোমরা মানুষকে সৎকর্মের আদেশ দেবে এবং অসৎ কর্ম থেকে নিষেধ করবে আর আল্লাহ্‌র ওপর ঈমান আনবে।” (সূরা আল-ইমরান, ১১০ আয়াত)।

এরই সাথে সাথে আল্লাহ তা’আলা কুরআন মজিদের, যা এই ধর্মের বুনিয়াদ এবং ঈমান ও ইয়াকীনের মূল উৎস, হেফাজত তথা রক্ষণাবেক্ষণ ও স্থায়িত্বের জিম্মাদারীও গ্রহণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে :

“নিশ্চয় এই উপদেশ (কুরআন মজীদ) আমিই অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর রক্ষক” (সূরা হিজর, ৯ আয়াত)।

অপরদিকে তিনি এই ধর্মের দিকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাবর্তন এবং বড় বড় দল ও গোত্রের ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে আপন নবীর চক্ষু শীতল করেন এবং গোটা পৃথিবীতে এর বিস্তার ও প্রচার-প্রসারের চিহ্ন প্রকাশিত হতে থাকে এবং পরিষ্কার দৃষ্টিগোচর হতে থাকে যে, দেখতে দেখতে এই ধর্ম (ইসলাম) দুনিয়ার অপরাপর সকল ধর্মের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করবে এবং বিজয়ী হবে। সূরা নাসরে আল্লাহ তা’আলা এরই প্রতি ইশারা করেছেন :

“যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসল এবং তুমি দেখলে লোক দলে দলে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করছে। অতএব, তুমি তোমার প্রভু প্রতিপালকের প্রশংসাগীতি সহকারে তাসবীহ পাঠ কর এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। তিনি বড়ই তওবা কবুলকারী” (সূরা নাসর, ১-৩ আয়াত)।

কুরআন মজীদের পুনরাবৃত্তি (দওর) ও বর্ধিত ই’তিকাফ

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিয়মিত অভ্যাস ছিল, প্রতি রমযানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করতেন। কিন্তু যে বছর তিনি ইনতিকাল করেন সেই বছর এই ই’তিকাফের মেয়াদ বাড়িয়ে দেন এবং ২০ দিন ই’তিকাফ করেন।

হযরত জিবরীল (আ) রমযানের প্রতি রাত্রে এসে হযরত রাসূল আকরাম (সা)-এর সঙ্গে মিলিত হতেন এবং তিনি তাঁর (ফেরেশতা জিবরীল)-এর সাথে কুরআন মজীদের তিলাওয়াতের পুনরাবৃত্তি করতেন। কিন্তু এ বছর তিনি বলেন : এবার তিনি একবারের জায়গায় দু’বার আসেন। এ থেকে আমার ধারণা হয় যে, আমার সময় ঘনিয়ে এসেছে।

এ সময় আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবীকে তাঁর প্রভু প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মিলনের অনুমতি দান করেন যাঁর চেয়ে বেশি তাঁর মোলাকাতের আগ্রহ আর কারো হতে পারে না। আল্লাহ তা’আলাও এই সাক্ষাতের জন্য আগ্রহী ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা) নিজেও অত্যধিক পরিমাণে আগ্রহী ও অভিলাষী ছিলেন এই সাক্ষাতের জন্য।

আল্লাহ তা’আলা সাহাবা-ই কিরাম (রা)-কেও তাঁর ইনতিকালের খবর শোনান এবং এই বিরাট আঘাত সহিবার জন্য পূর্বাহ্নেই প্রস্তুত করেছিলেন যা না শুনে তাঁদের কোন গত্যন্তর ছিল না, অথচ রাসূলপ্রেমিক হিসাবে সাহাবা-ই কিরাম (রা) অপেক্ষা সমগ্র যমীনে আর কেই-বা বেশি ছিলেন। এর পূর্বে ওহুদ যুদ্ধে একবার তাঁর শাহাদাতের আকস্মিক খবর তাঁরা পেয়েছিলেন। পরে তাঁরা জেনেছিলেন যে,

এটা ছিল শয়তানের একটি চক্রান্ত এবং তারই ছড়ানো একটি গুজব। আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবীকে হায়াত-ই তায়্যিবা ও তাঁর সোহবত থেকে উম্মতকে উপকৃত হওয়ার আরেকটি সুযোগ দান করেছেন যদিও এ ঘটনা একদিন না একদিন ঘটবেই। অনন্তর আল্লাহ ইরশাদ করেন :

“আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল বৈ ত নন, তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল গত হয়েছেন; তা তিনি যদি মারাই গিয়ে থাকেন কিংবা তিনি যদি শাহাদাতই লাভ করে থাকেন তবে কি তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে? আর কেউ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে চাইলে সে এর দ্বারা আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ কৃতজ্ঞ বান্দাদেরকে সত্বর পুরস্কৃত করবেন” (সূরা আলে-ইমরান, ১৪৪ আয়াত)।

প্রথম যুগের এই সব মুসলমান, যাঁদেরকে রাসূল (সা) सर्वोत्तम প্রশিক্ষণ দান করেছিলেন, তাঁদের দিলকে আল্লাহ তা’আলার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন এবং দুনিয়ার প্রত্যন্ত কোণে কোণে ও দূর-দূরান্তে অবস্থিত পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিকট ইসলামের পয়গাম পৌঁছাবার এক বিরাট ও পবিত্র কাজে নিয়োজিত করেছিলেন, এ বিষয়ে পূর্ণ বিশ্বাসী ছিলেন যে, তিনি (রাসূল সা) একদিন না একদিন এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে তাদেরকে রেখে যাবেনই এবং তিনি তাঁর এই দীর্ঘ অবিশ্রান্ত মেহনত ও অবিচল কুরবানীর सर्वोत्तम ফল ও পুরস্কার লাভের জন্য আপন প্রভু প্রতিপালকের সান্নিধ্যে উপস্থিত হবেনই। যখন اِذَا جَاءَ نَصْرُ اللهِ وَالْفَتْحُ এই আয়াত নাযিল হয় তখনই সাহাবা-ই কিরাম (রা) বুঝে নিয়েছিলেন যে, এই আয়াত রাসূল (সা)-এর তিরোধানের পূর্বাভাস ঘোষণা করছে। কেননা নবুওয়াতের মিশন পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়েছে এবং আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এসে গেছে।

যে সময় এই আয়াত নাযিল হয় الْيَوْمَ اَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণতা দান করলাম” তখনও বহু জলীলুল-কদর

সাহাবা অনুভব করেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-র ইনতিকালের সময় নিকটবর্তী।

পরম প্রভুর সাক্ষাতের জন্য অধীর আগ্রহ এবং দুনিয়ার প্রতি বিদায় সম্ভাষণ

বিদায় হজ্জ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে এমন সব কথাবার্তা প্রকাশ পেত যদ্বারা ইঙ্গিত পাওয়া যেত যে, তাঁর ইনতিকালের সময় নিকটবর্তী এবং তিনি এই সফরের জন্য প্রস্তুত ও পরম প্রিয়্যের মিলন কামনায় উন্মুখ। তিনি ওহুদ যুদ্ধের শহীদদের জন্য আট বছর পর এভাবে দু’আ করেন যেন তিনি সত্ত্বরই স্বীয় সাহাবা-ই কিরাম (রা) থেকে পৃথক হতে যাচ্ছেন যেমন কোন জীবিত ব্যক্তি মৃত মানুষকে শেষ বিদায় জ্ঞাপন করে থাকে।

এরপর তিনি মিম্বরের দিকে গমন করেন এবং সেখানে উপবেশনপূর্বক সমবেত সাহাবা-ই কিরাম (রা)-কে লক্ষ করে বলেন : আমি তোমাদের আগে যাচ্ছি এবং তোমাদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিচ্ছি। এরপর তোমাদের সঙ্গে আমার হাওয-ই কাওছারে সাক্ষাৎ হবে। আমি আমাকে সেখানে দণ্ডায়মান অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি। আমাকে তামাম যমীনের ধনভান্ডারের চাবি প্রদান করা হয়েছিল। আমি এ বিষয়ে আদৌ ভীত নই যে, তোমরা আমার পর শির্ক-এ লিপ্ত হবে। কিন্তু আমার ভয় হয় যে, না জানি তোমরা পরস্পরে দুনিয়া লাভের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হও এবং যেভাবে পূর্বকার জাতিসমূহ ধ্বংস হয়েছে তেমনি তোমরাও ধ্বংসপ্রাপ্ত হও।

রোগের সূচনা

সফর মাসের শেষ দিকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়। এর প্রাথমিক আলামত এভাবে প্রকাশ পায় যে, তিনি রাত্রির মাঝামাঝি জান্নাতুল-বাক্বীতে গমন করেন এবং কবরবাসীদের জন্য আল্লাহর দরবারে মাগফিরাত কামনা করেন। এরপর তিনি ঘরে ফিরে আসেন। ভোর হল এবং সেদিন থেকেই রোগের আলামত শুরু হয়।

উম্মুল-মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) জান্নাতুল-বাকী থেকে ফিরে আমাকে শিরঃপীড়ায় আক্রান্ত দেখতে পেলেন। আমি তখন (ব্যথায় কাতরাচ্ছিলাম আর) বলছিলাম, আমার মাথায় কী যন্ত্রণা! তিনি বললেন : না, আমার মাথায় কত যন্ত্রণা। আয়েশা! আমার মাথায় কত যন্ত্রণা। আয়েশা! আমার মাথায় কত কষ্ট। এরপর রোগ যন্ত্রণা বৃদ্ধি পেতে লাগল। সে সময় তিনি মেয়মূনা (রা)-র ঘরে ছিলেন। তিনি এ ঘরেই তাঁর সমস্ত স্ত্রীদেরকে ডেকে পাঠালেন এবং তাঁদের কাছে রোগতাড়িত অবস্থায় আয়েশা (রা)-র ঘরে থাকার অনুমতি চাইলেন। তাঁরা সকলেই সন্তুষ্ট চিত্তে অনুমতি দিলেন। তিনি পরিবারস্থ দু’জন যাদের একজন ছিলেন হযরত ফযল ইবন আব্বাস (রা) ও অপরজন হযরত আলী (রা)-এর সাহায্যে সেখান থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন। রাসূল (সা)-এর মাথায় তখন পট্টি বাঁধা ছিল। তিনি পা হেঁচড়ে চলছিলেন এবং এ অবস্থায় হযরত আয়েশা (রা)-এর ঘরে গমন করেন।

হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, যেই রোগে তিনি ইনতিকাল করেন সেই রোগে আক্রান্ত থাকা অবস্থায় এ কথা বলতেন : আয়েশা! সেই খাবারের কষ্ট এখন অনুভব করছি যা আমি খায়বারে খেয়েছিলাম। সেই বিষক্রিয়া এখন আমার শিয়া (আবহুর) কেটে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে।

শেষ অভিযান

রাসূল (সা) জীবনের শেষ দিকে উসামা ইবন যায়দ (রা)-কে একটি সৈন্যদলের আমীর নিযুক্ত করত সিরিয়ায় প্রেরণ করেন এবং তাকে নির্দেশ দেন যে, তার ঘোড়া বলাকা ও দারুম অবধি অবশ্যই যাবে। এটি ফিলিস্তীনের অন্তর্গত।

এই সৈন্যদলে তিনি মুহাজির ও আনসারদের মধ্যকার প্রবীণ ও নির্বাচিত সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত করেন যাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ছিলেন হযরত ওমর (রা)। রাসূল (সা) ভীষণ রোগাক্রান্ত অবস্থায়ও তাঁদের সেখানে পৌঁছবার নির্দেশ দেন। এ সময় উসামার বাহিনী জুরুফ নামক স্থানে তাঁবু ফেলেছিল।

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ইনতিকালের পর হযরত আবু বকর (রা) হূযূর (সা)-এর এই অন্তিম বাসনা পূরণের নিমিত্ত উসামা (রা) বাহিনীর অগ্রাভিযান মুলতবি না করে বরং তা বর্ণে বর্ণে প্রতিপালন করেছিলেন।

উসামা বাহিনীর ব্যাপারে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও এহতিমাম

রাসূলুল্লাহ (সা) অনুভব করলেন যে, লোকে উসামা বাহিনীর ব্যাপারে কেমন যেন নিস্পৃহ। কেননা এর আগে কেউ কেউ এ ধরনের কথা বলেছিলেন যে, একজন নব্য তরুণকে জলীলুল-কদর সাহাবা এবং মুহাজির ও আনসারদের আমীর নিযুক্ত করা হয়েছে। এ কথা শুনে তিনি শিরঃপীড়ার কঠিন যন্ত্রণা ও তজ্জজনিত মাথায় পট্টি বাঁধা অবস্থাতেও বাইরে তশরীফ নেন এবং মিম্বরে উপবেশন করেন। অতঃপর প্রথমে তিনি আল্লাহর উপযোগী হাম্দ ও ছানা পেশ করলেন। এরপর তিনি বললেন : লোক সকল! উসামার বাহিনী পাঠিয়ে দাও। আজ যদি তোমরা তার নেতৃত্বের ব্যাপারে কানাঘুষা কর তবে মনে রেখ, তোমরা তার পিতার নেতৃত্বের ব্যাপারেও আপত্তি উত্থাপন করেছিলে। নিশ্চিতই সে নেতৃত্বের উপযুক্ত এবং সে তার অধিকার রাখে যেমন তার পিতা এর অধিকার রাখত। এতটা বলে তিনি মিম্বর থেকে নিচে নেমে আসলেন এবং লোকেরা দ্রুততার সঙ্গে এর প্রস্তুতিতে লেগে গেল।

এদিকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পীড়ার তীব্রতা পূর্বের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পায়। অপরদিকে উসামা (রা) বাহিনীসহ রওয়ানা হয়ে যান এবং মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে ‘জুরুফ’ নামক স্থানে ছাউনি ফেলেন যাতে অবশিষ্ট লোক যারা আসতে চায় তারা সকলেই এখানে সমবেত হতে পারে। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা) ভীষণ পীড়িত ছিলেন। আর উসামা (রা) ও তাঁর সাথীবৃন্দ সেখানে ছাউনি ফেলে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পরবর্তী অবস্থা কোথায় গিয়ে পৌঁছায় তা দেখার জন্য গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন।

এই পীড়িত অবস্থায় তিনি মুসলমানদের অন্তিম উপদেশ দান করতে গিয়ে বলেন, তারা যেন এই বাহিনী ঠিক সেভাবে পাঠায় যেভাবে তিনি পাঠাতেন এবং জাযীরাতুল-আরবে তারা যেন দ্বিতীয় কোন ধর্মের অবকাশ না রাখে। তিনি এও

বলেন, কাফির মুশরিকদের এখান থেকে বের করে দেবে।

মুসলমানদের জন্য দু’আ এবং ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য ব্যগ্রতা ও গর্ব থেকে দূরে থাকার জন্য সতর্কবাণী

পীড়িত অবস্থায় কিছু সাহাবা-ই-কিরাম (রা) হযরত আয়েশা (রা)-এর ঘরে একত্র হন। তিনি অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান এবং তাঁদের জন্য হেদায়াত, নুসরাত ও আল্লাহর তাওফীক কামনায় দু’আ করেন। অতঃপর তিনি বলেন : আমি তোমাদেরকে আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে ওসিয়ত করছি এবং আমার পরে আল্লাহ তা’আলাকেই তোমাদের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করছি। আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য প্রকাশ্য ভীতি প্রদর্শনকারী ও সতর্ককারী। দেখো, আল্লাহর জনপদ এবং তাঁর বান্দাদের মধ্যে অহমিকা ও প্রাধান্য লাভের প্রতিযোগিতায় মেতো না। এজন্য যে, আল্লাহ তা’আলা আমার ও তোমাদের ব্যাপারে আগেই বলে দিয়েছেন :

“এটি পারলৌকিক আবাস, আমি তাদের জন্য নির্মাণ করেছি যারা যমীনের বুকে প্রাধান্য লাভের আকাঙ্ক্ষী নয় এবং যারা গোলযোগ ও হাঙ্গামা সৃষ্টি করতেও ইচ্ছুক নয়; আর আল্লাহভীরুদের (মুত্তাকীদের) জন্যই যাবতীয় পরিণাম” (সূরা কাসাস, ৮৩ আয়াত)।

অতঃপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াত তেলাওয়াত করেন :

“অহঙ্কারীদের ঠিকানা জাহান্নাম নয় কি?” (সূরা যুমার, ৬০ আয়াত)।

দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্কহীনতা এবং অব্যয়িত অর্থের প্রতি বিতৃষ্ণা

হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) বর্ণনা করেন, “তিনি (রাসূল সা) পীড়িত অবস্থায় একবার জিজ্ঞেস করলেন : আয়েশা! সেই সোনার মোহরগুলো কি করেছ? আমি পাঁচ অথবা সাত কিংবা নয়-এর মত আশরাফী নিয়ে এলাম। তিনি সেগুলো হাতে নিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন, “আমি এগুলো

সহকারে আল্লাহকে কিভাবে মুখ দেখাব? যাও, এগুলো আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দাও।”

সালাতের এহতিমাম এবং হযরত আবূ বকর (রা)-এর ইমামতি

রাসূলুল্লাহ (সা)-র পীড়ার প্রকোপ ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে লাগল এবং তবিয়তও ভারী হয়ে উঠতে লাগল। এমতাবস্থায় তিনি জানতে চাইলেন যে, লোকেরা সালাত আদায় করেছে কি না? আমরা জবাবে বললাম : না, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সকলেই আপনার অপেক্ষা করছে। তিনি বললেন : আমার জন্য পানির পাত্রে পানি রেখে দাও। নির্দেশ পালিত হল। তিনি গোসল করলেন। এরপর তিনি উঠবার জন্য কোশেশ করলেন। কিন্তু ইতোমধ্যেই তিনি বেহাশ হয়ে পড়লেন। হুশ ফিরে পেতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন : সবাই কি সালাত আদায় করেছে? সকলেই জানাল : না, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! সকলেই আপনার অপেক্ষায় রয়েছে। সে সময় সকলেই মসজিদে নববীতে চুপচাপ বসে এশার সালাতের অপেক্ষায় ছিলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত আবূ বকর (রা)-কে বলে পাঠালেন সালাতের ইমামতি করতে। হযরত আবূ বকর (রা) খুবই নরম দিলের মানুষ ছিলেন। তিনি বললেন : ওমর! তুমিই সালাতে ইমামতি কর। হযরত ওমর (রা) বললেন : এ বিষয়ে আমার তুলনায় আপনিই অধিক উপযুক্ত ও বেশি হকদার। অনন্তর পীড়ার দিনগুলোতে হযরত আবূ বকর (রা)-ই ইমামতি করতে থাকেন।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) কিছুটা সুস্থবোধ করতে থাকেন এবং শরীরও অনেকটা হালকা মনে হতে থাকে। তিনি হযরত আব্বাস (রা) ও হযরত আলী (রা)-র কাঁধে ভর দিয়ে জোহরের সালাতের নিমিত্ত বাইরে তশরীফ নিলেন। হযরত আবূ বকর (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-কে দেখতেই পিছিয়ে আসতে চাইলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে ইঙ্গিতে পিছিয়ে আসতে নিষেধ করলেন এবং হযরত আব্বাস ও আলী (রা)-কে বললেন : তাঁকে আবূ বকরের পাশে বসিয়ে দিতে। হযরত আবূ বকর (রা) দাঁড়িয়ে সালাতের ইমামতি করতে থাকেন এবং আল্লাহর রাসূল (সা) পাশে বসে সালাত আদায় করেন।

উম্মুল-ফযল বিনতুল-হারিছ (রা) বর্ণনা করেন : আমি হূযূর (সা)-কে

মাগরিবের সালাতে সূরা ওয়াল-মুরসালাত পাঠ করতে শুনেছি। এরপর আর কোন সালাতে তাঁর ইমামতি করা সুযোগ হয়ে ওঠেনি। এমতাবস্থাতেই আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় হাবীবকে তাঁর সান্নিধ্যে ডেকে নেন।

বিদায়ী খুতবা

রাসূলুল্লাহ (সা) পীড়িত থাকার দিনগুলোতে মিম্বরে বসে উম্মতের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু কথা বলেছিলেন আর সে সময় তাঁর মাথায় ছিল পট্টি বাঁধা। এ সময় একবার তিনি এও বলেছিলেন :

“আল্লাহর বান্দাদের মধ্য থেকে এক বান্দাকে আল্লাহ তা’আলা দুনিয়া এবং আল্লাহর কাছে যা কিছু আছে এতদুভয়ের মধ্যে কোন একটিকে বাছাই করে নেবার এখতিয়ার দিলেন। আল্লাহর বান্দাহ তখন আল্লাহর কাছে যা আছে তাই বেছে নিলেন।”

উপস্থিত লোকদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর এ কথার মর্ম বুঝে ফেললেন এবং তিনি উপলব্ধি করলেন যে, এর দ্বারা তিনি নিজেকেই বুঝিয়েছেন। আর এটা বুঝতে পেরে তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন : না, আমাদের জীবন ও সন্তান-সন্ততি সব কিছুই আপনার জন্য কুরবান।

তিনি বললেন : আবু বকর! থাম, তাড়াহুড়া কর না। নিঃসন্দেহে এমন কেউ নেই যে তার জীবন ও সম্পদ দিয়ে আমাকে এতটা উপকৃত করেছে যতটা করেছে আবু বকর (রা)। আর আমি যদি মানুষের মধ্যে কাউকে আমার বন্ধু বানাতাম তাহলে আবূ বকরকেই আমার বন্ধু বানাতাম। কিন্তু ইসলামের সম্পর্ক ও ইসলামের প্রতি ভালবাসাই সর্বোত্তম।

তিনি এও বলেন : (আমার মন চায়) আমার সামনের মসজিদের সকল জানালা বন্ধ করে দেই, কেবল আবূ বকরের জানালা খোলা থাকুক।

আনসারদের সঙ্গে উত্তম আচরণের উপদেশ

হযরত আবু বকর ও হযরত আব্বাস (রা) একবার আনসারদের এক মাহফিলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁরা দেখতে পেলেন যে, সকলে কাঁদছে। তাঁরা উভয়ে তাঁদেরকে তাঁদের কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তাঁরা বললেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-র সাহচর্য ও তাঁর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোর কথা স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠছে। রাসূলুল্লাহ (সা) এ সম্পর্কে জানতে পেরে বাইরে বেরিয়ে এলেন। এ সময় তিনি তাঁর পবিত্র মস্তক চাদরের প্রান্তদেশ দিয়ে জড়িয়ে রেখেছিলেন। তিনি মিম্বরে উপবেশন করলেন। এরপর আর কখনও তাঁর মিম্বরে উপবেশনের সুযোগ হয়নি। অতঃপর তিনি আল্লাহ তা’আলার হাম্দ ও ছানা পেশ করলেন যা তাঁর মর্যাদা ও শানের উপযুক্ত। এরপর তিনি বললেন :

“আমি তোমাদেরকে আনসারদের সঙ্গে উত্তম আচরণের উপদেশ দিচ্ছি। তারা দেহ ও আত্মার মত এবং তারা আমার আস্থাভাজন ও আমার গোপন রহস্যের ধারক। তাদের ওপর যে দায়িত্ব ছিল তারা তা সম্পূর্ণরূপে পালন করেছে। অন্যদের ওপর তাদের যে অধিকার তা এখনও অবশিষ্ট রয়ে গেছে। এজন্য তোমরা তাদের ভাল ও নেককার লোকদের পরামর্শ কবুল করবে এবং তাদের মধ্যে কেউ অন্যায় করলে তাকে মাফ করবে।”

জামাতে কাতারবন্দী অবস্থায় মুসলমানদের প্রতি তাঁর শেষ দৃষ্টি নিক্ষেপ

হযরত আবূ বকর (রা) যথারীতি ইমামতি করতে থাকেন। সোমবার ফজরের সালাত আদায়ের নিমিত্ত সাহাবা-ই কিরাম (রা) কাতার বেঁধে দাঁড়িয়েছেন। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সা) হুজরা মুবারকের পর্দা তুললেন এবং কিছুক্ষণ ধরে এই দৃশ্য দেখলেন যে, মুসলমানরা তাঁদের প্রভু প্রতিপালকের সামনে কিভাবে হাযির! তাঁর দাওয়াত ও জিহাদ, তাঁর সারা জীবনের চেষ্টা-সাধনা কি রঙ নিয়ে এসেছে এবং এই উম্মত কিভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে, যাঁরা সালাতের সঙ্গে এতটা ঘনিষ্ঠ ও নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত এবং যাঁরা তাঁদের নবীর উপস্থিতিতে ও অনুপস্থিতিতে, বর্তমানে ও অবর্তমানে উভয় হালতে একইরূপ উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আনন্দাতিশয্য সহকারে দরবারে ইলাহী সমীপে বিনীতভাবে উপস্থিত। এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ও তাঁর

জীবনব্যাপী সাধনার সাফল্য দৃষ্টে, যা তাঁর পূর্বে আর কোন নবী কিংবা দাঈর ভাগ্যে জোটেনি, তাঁর চোখ জুড়াল এবং তিনি নিশ্চিত হলেন যে, এই দীন এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সঙ্গে এই উম্মতের সম্পর্ক চিরন্তন ও স্থায়ী যা তাঁর ইনতিকালের পরেও শেষ হবে না। আল্লাহই ভাল জানেন যে, সে সময় তিনি কতটা খুশী হয়ে থাকবেন। এই দৃশ্য দেখে তাঁর চেহারা খুশীতে ঝলমলিয়ে ওঠে। সাহাবা-ই কিরাম (রা) বলেন :

“রাসূলুল্লাহ (সা) আয়েশা (রা)-র কামরার পর্দা তুললেন এবং দাঁড়িয়ে আমাদের দেখতে থাকলেন। মনে হচ্ছিল যে, তাঁর চেহারা মুবারক যেন খোলা পৃষ্ঠার ন্যায়। এরপর তিনি মুচকি হাসলেন। আমাদের ধারণা হল : না জানি, আমরাও খুশির দরুন পরীক্ষায় নিপতিত হই এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। আমাদের এও ধারণা হল যে, সম্ভবতঃ তিনি বাইরে তশরীফ আনবেন। তিনি ইঙ্গিতে জানিয়ে দিলেন, সালাত শেষ কর। এরপর তিনি পর্দা ফেলে দিলেন এবং সেদিনই ইনতিকাল করলেন।”

কবর পূজা এবং একে মসজিদ ও ইবাদতগাহে পরিণত করা সম্পর্কে নিন্দা জ্ঞাপন

রাসূলুল্লাহ (সা)-র শেষ বাক্য ছিল :

“আল্লাহ্ তা’আলা ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের ধ্বংস করুন। তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়ে ছেড়েছে। আরব ভূখণ্ডে একই সঙ্গে যেন দুটো ধর্ম একত্রে সহাবস্থান না করে (অর্থাৎ আরব ভূমি কেবল ইসলামের জন্যই নির্দিষ্ট থাকবে)!”

হযরত আয়েশা (রা) ও হযরত ইবন আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, যখন ইনতিকালের মুহূর্ত ঘনিয়ে এল তখন একটি কালো পাড়যুক্ত চাদর তাঁর ওপর ছিল। এটি কখনো বা তিনি চেহারা মুবারকের ওপর ফেলছিলেন। বেশি কষ্ট হলে ফেলে দিচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি বলেন : ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক! তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদে (প্রার্থনাস্থলে) পরিণত করে ছেড়েছে। তিনি মুসলমানদেরকে এ থেকে সতর্ক করছিলেন।

অন্তিম উপদেশ

ইনতিকালের কাছাকাছি সময় তাঁর বেশির ভাগ ওসিয়ত ছিল এই : الصلاة وما ملكت ايمانكم “দেখো, সালাতের প্রতি খেয়াল রাখবে এবং অধীনস্থ লোকদের (দাস-দাসী ও চাকর-বাকরদের) প্রতি খেয়াল রাখবে।” একথা তিনি বার বার বলতে লাগলেন, এমন কি কথাগুলো মুখে উচ্চারণ করাও রাসূল (সা)-এর জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। জানা যায় যে, বুকের ভেতর থেকে কথাগুলো বারবার আওড়াবার চেষ্টা করছেন।

হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু বর্ণনা করেন যে, তিনি এ সময় সালাত ও যাকাত আদায় এবং অধীনস্থ লোকজন ও দাসদাসীদের সঙ্গে উত্তম আচার-আচরণ ও সদ্ব্যবহারের উপদেশ দেন।

হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) বর্ণনা করেন, “আমি সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর দম করছিলাম। এমন সময় তিনি আসমানের দিকে চোখ তুলে চাইলেন এবং বললেন : الرفيق الاعلى، الرفيق الاعلى ‘সর্বোত্তম বন্ধুর সান্নিধ্যে; সর্বোত্তম বন্ধুর নিকট’।”

ঠিক এমনি মুহূর্তে আব্দুর রহমান ইবন আবী বকর (রা) ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন তার হাতে পীলু বৃক্ষের একটি তরতাজা ডাল ছিল। তিনি ডালটার দিকে একনজর তাকালেন। আমি ধারণা করলাম, সম্ভবত তিনি এর প্রয়োজন বোধ করছেন। অনন্তর তার হাত থেকে ডালটা নিলাম এবং পাতাগুলো ঝেড়ে ফেলে মেসওয়াক বানিয়ে রাসূল (সা)-কে পেশ করলাম। তিনি এটি নিয়ে খুব ভাল করে মেসওয়াক করলেন যেমনটি তিনি সাধারণত করে থাকেন। এরপর তিনি মেসওয়াকটি আমাকে ফিরিয়ে দিতে চাইলেন, কিন্তু তা হাত থেকে পড়ে যায়।

তিনি আরও বলেন : তাঁর (রাসূল আকরাম)-র নিকট পানির একটি পাত্র ছিল। তিনি এতে হাত ডুবাচ্ছিলেন আর ভেজা হাত দিয়ে বারবার আপন চেহারা মুবারক মুছছিলেন আর বলছিলেন :

“আল্লাহ ব্যতিরেকে কোন ইলাহ নেই, মৃত্যু যন্ত্রণা অবধারিত সত্য।” এরপর তিনি বাম আঙুল ওপরের দিকে তুললেন এবং বলতে লাগলেন : في الرفيق

فِى الرَّفِيْقِ الْاَعْلٰى ، اَلْاَعْلٰى “সর্বোত্তম বন্ধুর নিকট”। আর এভাবে বলতে থাকা অবস্থাতেই তাঁর রূহ মুবারক প্রিয়তম বন্ধুর সান্নিধ্যে পৌঁছে যায় এবং তাঁর হাত পানির ভেতর একদিকে ঢলে পড়ে।

হযরত আয়েশা (রা) বলেন, “ইনতিকালের সময় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মস্তক মুবারক আমার উরুর ওপর ন্যস্ত ছিল। কিছুক্ষণের জন্য তিনি বেহুশ হয়ে যান। হুশ ফিরে পেতেই তিনি ঘরের ছাদের দিকে চোখ তুলে চাইলেন এবং বললেন : اَللّٰهُمَّ الرَّفِيْقَ الْاَعْلٰى ‘হে আল্লাহ! সর্বোত্তম বন্ধু আমার’। আর এটিই ছিল ইনতিকালের মুহূর্তে তাঁর মুখে উচ্চারিত সর্বশেষ বাক্য।”

কি অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা) দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন

রাসূলুল্লাহ (সা) যখন ইহজগত থেকে বিদায় নেন তখন গোটা জাযীরাতুল-আরব তাঁর করতলগত। তৎকালীন দুনিয়ার তামাম শাসক, রাজা-মহারাজা ও আমীর-উমারা তাঁর ভয়ে কম্পিত। সকলের অন্তর মানসে তাঁরই প্রভাব প্রতিষ্ঠিত। সাহাবায়ে কিরাম (রা) তাঁর জন্য নিজেদের জীবন, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি সব কিছু উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত। এত সব সত্ত্বেও তিনি যখন এই নশ্বর জগত থেকে বিদায় নেন তখন তিনি তাঁর কাছে এক দীনার কিংবা এক দিরহাম, দাস-দাসী, এমন কি কোন কিছুই পেছনে রেখে যাননি। তাঁর কেবল সাদা রঙের একটি খচ্চর ছিল, অস্ত্রশস্ত্র ছিল (জিহাদের ময়দানে আত্মরক্ষার জন্য) আর ছিল এক টুকরো যমীন যা তিনি সাদাকা করে দিয়েছিলেন।

তাঁর ওফাতের সময় তাঁর জেরা (লৌহবর্ম)-টি এক ইয়াহুদীর কাছে তিরিশ সা’ যবের বিনিময়ে বন্ধক ছিল। তাঁর নিকট তখন এমন কিছু ছিল না যা দিয়ে তিনি লৌহবর্মটি ছাড়িয়ে আনতে পারেন। আর এভাবেই তিনি এই নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

পীড়িত অবস্থায় তিনি চল্লিশজন ক্রীতদাস মুক্ত করেন। তাঁর নিকট ছয়/সাত দীনার ছিল। হযরত আয়েশা (রা)-এর প্রতি সেগুলোও বিলিয়ে দেয়ার আদেশ দেয়া হল।

উম্মুল-মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন : এমন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ইনতিকাল হয় যখন আমার ঘরে এমন কিছু ছিল না যা জীবিত কোন প্রাণী খেতে পারে। অবশ্য সামান্য কিছু যব ছিল যা আমার আলমারীর ওপর রাখা

ছিল। আমি এ থেকে কিছু খেয়েছি। অনেক দিন তা চলেছিল। তারপর একদিন তা মাপলাম। ব্যাস! এরপর তাও শেষ হয়ে যায়।

তিনি ১১শ হিজরীর ১২ রবীউল আওয়াল সোমবার দিন দুপুরের পর ইনতিকাল করেন। এ সময় তাঁর বয়স ছিল তেষট্টি বছর। আর এই দিনটি ছিল সবচেয়ে অন্ধকার ও ভয়াবহতম দিন, সবচেয়ে বিষাদময় পরীক্ষার দিন আর গোটা মানবতার জন্য দিনটি ছিল বিরাট এক দুর্ঘটনা, যেভাবে তাঁর জন্ম তথা আবির্ভাবের দিনটি ছিল মানবতার ইতিহাসের সবচেয়ে আলোকোজ্জ্বল ও বরকতময় দিন। হযরত আনাস ও হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা) বর্ণনা করেন : যেই দিন রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় তশরীফ এনেছিলেন সেদিন মদীনায় প্রতিটি বস্তু তাঁর আগমনে ধন্য, পুত-পবিত্র ও আলোকপ্রভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। যেদিন তিনি ইনতিকাল করেন সেদিন সবকিছুই যেন আঁধারে ঢাকা পড়ল। উম্মু আয়মানও কাঁদছিলেন। লোকে তাঁর কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করায় তিনি উত্তরে জানান : আমি জানতাম আল্লাহর রাসূল (সা) একদিন এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেবেন। আমি কাঁদছি এজন্য যে, ওয়াহীর ধারাবাহিকতা এই সাথে আমাদের থেকে চিরতরে ছিন্ন হয়ে গেল।

সাহাবায়ে কিরাম (রা) যেভাবে তাঁর মৃত্যু সংবাদ শোনেন

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ইনতিকালের সংবাদ সাহাবায়ে কিরাম (রা)-এর ওপর বিজলিবৎ পতিত হয়। আর এর কারণ ছিল আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে তাঁদের প্রেম-ভালবাসা ও হৃদয়তাপূর্ণ সম্পর্ক যার তুলনা মেলে না। সাহাবায়ে কিরাম (রা) তাঁর স্নেহ ছায়ায় থাকতে এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন যেভাবে সন্তান তার পিতামাতার স্নেহাঞ্চলের নিচে অবস্থান করে, বরং তার চেয়েও বেশি। এদিক দিয়ে তাঁদের ওপর তাঁর প্রভাবের কথা যতই বলা যাক তা প্রকৃত অবস্থা থেকে কমই বলা হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন :

“তোমাদের কাছে তোমাদেরই মধ্য থেকে একজন পয়গম্বর এসেছেন, যা তোমাদের জন্য কষ্টকর তা তার নিকট দুর্বহ মনে হয় আর তিনি তোমাদের অতীব মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী, মু’মিনদের প্রতি স্নেহশীল, সদয়” (সূরা তাওবা, ১২৮ আয়াত)।

সাহাবায়ে কিরামের প্রত্যেকেই মনে করতেন, তিনি আল্লাহর রসূল (সা)-এর স্নেহ-সদয় দৃষ্টিতে সর্বাধিক প্রিয়পাত্র ও স্নেহভাজন। কোন কোন সাহাবী তো বিশ্বাসই করতে পারেন নি যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ইনতিকাল করেছেন। এদের মধ্যে প্রথমেই হযরত ওমর (রা)-এর নাম নেওয়া যেতে পারে। যাঁরই আল্লাহর রাসূলের মৃত্যু সংবাদ তাঁকে দিতে চেয়েছেন তিনি তাঁরই ওপর কুপিত হয়েছেন। তিনি সরাসরি মসজিদে নববীতে আসেন এবং সকলের সামনে একটি ভাষণ দেন। তাতে তিনি বলেন :

“মুনাফিকদের পরিপূর্ণরূপে যতক্ষণ না আল্লাহ তা’আলা নির্মূল করছেন ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর রাসূলের ইনতিকাল হবে না।”

হযরত আবূ বকর (রা)-এর সাহসী পদক্ষেপ

এমতাবস্থায় হযরত আবূ বকর (রা) {যাঁকে আল্লাহ তা’আলা নবুওয়াতের খিলাফত ও প্রতিনিধিত্ব এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের হিম্মত ও প্রজ্ঞা দিয়ে তৈরি করেছিলেন}-এর মত সর্বোত্তম দৃঢ়তা, মনোবল ও পাহাড়সম হিম্মতের অধিকারী একজন ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন ছিল যিনি শত আঘাতেও টলবেন না। আবূ বকর (রা) ও এ সময় মদীনায় অদূরে সানাহ নামক পল্লীতে অবস্থান করছিলেন। সংবাদ পেতেই তিনি দ্রুত আগমন করলেন (বুখারী ৬৪০) এবং মসজিদে নববীর দরজা মুখে মুহূর্তের জন্য থামলেন। এ সময় হযরত ওমর (রা) {বেহূশ প্রায়} লোকজনের সামনে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। তিনি কোন দিকে আদৌ দৃকপাত না করেই সরাসরি হযরত আয়েশা (রা)-এর ঘরে রাসূলুল্লাহ (সা) সমীপে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তাঁর শরীর মুবারক এক খণ্ড চাদর দ্বারা তখন আবৃত ছিল। তিনি চাদর সরিয়ে ঝুঁকে পড়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চেহারা মুবারকে চুমু খেলেন এবং বললেন : আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোন। মৃত্যুর স্বাদ যা আল্লাহ তা’আলা আপনার জন্য নির্ধারিত রেখেছিলেন আপনি তা চেখেছেন। এরপর আর কখনো সে স্বাদ আপনাকে চাখতে হবে না, আর কখনো আপনাকে মৃত্যু যাতনা সাইতে হবে না। এরপর তিনি চাদর দিয়ে পূর্বের মতই চেহারা মুবারক ঢেকে দিলেন। অতঃপর তিনি মসজিদে নববীতে এলেন। হযরত ওমর (রা) তখনও কথা বলে চলছিলেন। তিনি ওমর (রা)-কে লক্ষ করে বললেন, ওমর! থাম। কিন্তু বিষাদের আবেগে তাঁর কথা তিনি শোনেননি। হযরত আবু বকর (রা) যখন দেখতে পেলেন তিনি থামছেন না, তখন তিনি সমবেত জনতার দিকে অগ্রসর হলেন এবং নিজের কথা শুরু

করলেন। তাঁকে কথা বলতে দেখে সকলই হযরত ওমর (রা)-কে ছেড়ে তাঁর দিকে ছুটে এলেন। হযরত আবূ বকর (রা) সর্বপ্রথম আল্লাহর হাম্দ ও ছানা পাঠ করলেন। এরপর বললেন :

“লোক সকল! যদি কেউ মুহাম্মাদ (সা)-এর আনুগত্য ও গোলামী করে থাক তবে সে জেনে রাখুক, নিশ্চিতই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। আর যিনি আল্লাহর ইবাদত করেন তিনি (নিশ্চিত থাকুন ও) জানুন, আল্লাহ তা’আলা চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই।” এরপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াত তেলাওয়াত করলেন :

“মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল বৈ নন। তাঁর পূর্বেও অনেক রাসূল গত হয়েছে। যদি তিনি মারা যান কিংবা শাহাদাত বরণ করেন তাহলে কি তোমরা পেছনের দিকে ফিরে যাবে? যারা পেছনের দিকে ফিরবে (ধর্মত্যাগী হবে) তারা আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ্ কৃতজ্ঞ বান্দাদেরকে পুরস্কৃত করবেন” (সূরা আল-ইমরান, ১৪৪ আয়াত)।

যাঁরা এ সময় এই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন তাঁরা এই দৃশ্য দেখছিলেন। তাঁরা বলেন : আল্লাহর কসম! হযরত আবূ বকর যখন এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন তখন মনে হচ্ছিল এক্ষুণি বুঝি এই আয়াত নাযিল হল আর আবূ বকর তাদের অন্তরের কথাই ব্যক্ত করলেন।

হযরত ওমর (রা) বলেন : আবূ বকর (রা)-কে যখন এই আয়াত পাঠ করতে শুনলাম তখন আমি বিস্ময়াভিভূত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলাম। আমার পায়ে তখন আদৌ যেন কোন শক্তি ছিল না! সে সময়ই কেবল আমি জানতে পারলাম হূযূর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের ইনতিকাল হয়ে গেছে।

হযরত আবূ বকর (রা) খলীফা নির্বাচিত

এরপর সকীফায়ে বনী সায়েদায় হযরত আবূ বকর (রা)-এর হাতে সকলে খেলাফতের বায়আত গ্রহণ করেন। এ ব্যাপারে দ্রুততার কারণ হল, শয়তান যেন মুসলমানদের মনে বিভেদের বীজ বপন করতে এবং তাঁদের ভেতর অনৈক্য ও

পরস্পরের প্রতি সন্দেহ সৃষ্টির সুযোগ না পায় এবং প্রবৃত্তিজাত কামনা-বাসনা যেন মাথা তুলতে না পারে। আর হূযূর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর আখেরী সফরে যেন এভাবে রওয়ানা হতে পারেন যে, মুসলমানরা একই সূত্রে সম্পর্কিত, তাঁরা পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ ও একই রঙে রঞ্জিত, তাঁদের একজন আমীর আছেন যিনি তাঁদের সকল বিষয় দেখাশোনা করছেন, এমন কি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দাফন-কাফন আমীরুল-মুমিনীন ও খলীফাতুল-মুসলিমীনের হাতেই সম্পন্ন হোক।

মুসলমানরা তাঁদের রাসূল (রা)-কে যেভাবে বিদায় দিল

এরপর লোকেরা শান্ত হল। বিস্ময় ও বিষাদের মেঘ কেটে গেল এবং তাঁরা নবী প্রদত্ত তাঁদের কর্ম ও দায়িত্ব সম্পাদনে তৎপর হল।

আহলে বায়ত রাসূলুল্লাহ (সা)-এর লাশ গোসল দেওয়ান ও কাফন পরিধান করান। এরপর তাঁর লাশ মুবারক জানাযার উদ্দেশ্যে ঘরেই রেখে দেওয়া হয়। এ সময় হযরত আবূ বকর (রা) বলেন : আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি, যে নবী যেখানে ইনতিকাল করেছেন তাঁকে সেখানেই দাফন করা হয়েছে। অনন্তর যে বিছানায় তিনি ইনতিকাল করেন তা উঠিয়ে দেওয়া হয় এবং বিছানাস্থলে কবর খনন করা হয়। হযরত আবূ তালহা আনসারী (রা) কবর খনন করেন।

এরপর লোকে দলে দলে আসতে শুরু করল। একদল আগমন করত, জানাযা আদায় করে চলে যেত, তারপর অপর দলের আগমন ঘটত, জানাযা আদায় করত। প্রথমে পুরুষেরা জানাযা আদায় করেন। এরপর মহিলাদের অনুমতি দেওয়া হয়। মহিলাদের পর শিশুদের অনুমতি দেওয়া হয়। তারাও জানাযা আদায় করে। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জানাযায় কাউকে ইমাম নিযুক্ত করা হয়নি।

এই ঘটনা মঙ্গলবার দিনের। এটি ছিল মদীনায় মুসলমানদের জন্য একটি শোকাবহ ও বিষাদময় দিন। হযরত বিলাল (রা) ফজরের আযান দিতে গিয়ে হূযূর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের স্মৃতি মানস পটে ভেসে ওঠায় কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যায়। এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম (রা), যাঁরা পূর্ব থেকেই শোকাভিভূত ছিলেন, শোক ও দুঃখের আরও গভীর সমুদ্রে নিমজ্জিত হন। তাঁরা তো এই আযান এমতাবস্থায় শুনতেন যখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁদের মধ্যে বর্তমান ছিলেন। কিন্তু আজকের অবস্থা তা থেকে কত ভিন্ন! উম্মুল-মু’মিনীন

হযরত উম্মু সালামা (রা) বলেন, দিনটি ছিল আমাদের জন্য কী নিদারুণ কষ্টের! আমাদের যখন সেদিনের কষ্টের কথা মনে হয় তখন সব কষ্টই তার তুলনায় নেহায়েত তুচ্ছ ও সহজ মনে হয়।

স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) নিজের সম্পর্কে বলেছিলেন

“লোক সকল! তোমাদের মধ্যে কেউ যখন কারো মৃত্যুতে আঘাত পায় তখন আমার মৃত্যুতে আঘাতপ্রাপ্ত লোকদের থেকে সান্ত্বনা পেতে চেষ্টা করবে। কেননা আমার মৃত্যুতে প্রাপ্ত শোকাবহ আঘাতের চেয়ে আমার উম্মতের ওপর কোন বড় আঘাত আসবে না।”

সাহাবা-ই কিরাম (রা) যখন দাফন শেষে ফিরে আসেন তখন সাহাবী হযরত আনাস (রা)-কে লক্ষ করে রাসূল কন্যা হযরত ফাতিমা (রা) বলে ওঠেন :

“আনাস! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের দেহ মুবারক মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে তোমরা কিভাবে পারলে? তোমাদের মন কিভাবে তা মেনে নিল?”