নবী যুগে ইয়াছরিব (মদীনা) : এক নজরে
মক্কা ও মদীনার সামাজিক পার্থক্য
ইযাছরিব শহরের সঠিক পরিমাপ করবার জন্য, যে শহরকে আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূল (সা)-এর দারুল হিজরত, ইসলামের বিশ্বব্যাপী দাওয়াতের কেন্দ্র এবং ইসলামের আবির্ভাবের পর প্রতিষ্ঠিত পয়লা ইসলামী সমাজের দোলনা বানান, আমাদেরকে তার সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা, প্রাচীন গোত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক, সেখানকার ইয়াহূদীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক গুরুত্ব এবং এই উর্বর শহরের জীবনের মান বুঝতে হবে যেখানে কয়েকটি ধর্ম, সংস্কৃতি ও সমাজ পাশাপাশি ছিল, যেখানে মক্কা মুকাররামায় এক রঙ, এক পদ্ধতি ও একই ধর্ম ছিল। এই প্রসঙ্গে এখানে পাঠকদের সামনে কিছুটা বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা হচ্ছে যার সাহায্যে নবী করীম (সা)-এর আবির্ভাবকালীন ইয়াছরিব শহরের ধরন, প্রকৃতি ও অবস্থা সম্পর্কে কতকটা পরিমাপ করা যাবে।
ইয়াহূদী
বর্তমানে এই ঐতিহাসিক সত্য অগ্রাধিকার লাভ করেছে যে, ইয়াহূদীদের অধিকাংশই আরব উপদ্বীপে সাধারণভাব, বিশেষভাবে ইয়াছরিব শহরে খ্রীষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে আগমন করে। প্রখ্যাত ইয়াহূদী পণ্ডিত ড. ইসরাঈল ওয়েলফিনসন লেখেনঃ
“৭০ খ্রীষ্টাব্দে ইয়াহূদী ও রোমকদের যুদ্ধের পরিণতিতে যখন ফিলিস্তীন ও বায়তুল মাকদিস ধ্বংস হয়ে যায় এবং ইয়াহূদীরা দুনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে তখন ইয়াহূদীদের বহু দল আরব দেশগুলোর দিকে মুখ ফেরায়। একই বক্তব্য ইয়াহূদী ঐতিহাসিক জোসেফাসেরও যিনি নিজেও এই যুদ্ধে শরীক ছিলেন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইয়াহূদী ইউনিটগুলোর নেতৃত্বও করেছিলেন। আরবী উৎসসমূহেও এর সমর্থন পাওয়া যায়।”
মদীনায় ইয়াহূদীদের তিনটি গোত্র বসবাস করত (যাদের বয়স্ক পুরুষদের সংখ্যা দু’হাজারের কিছুটা উপরে) : কায়নুকা, নাদীর ও কুরায়যা। অনুমিত হয় যে, কায়নুকা গোত্রের লড়াকু পুরুষের সংখ্যা ছিল সাতশ’। নাদীর গোত্রের লোক সংখ্যাও ছিল অনুরূপ। পক্ষান্তরে কুরায়যা গোত্রের প্রাপ্তবয়স্ক লোকের সংখ্যা ছিল সাতশ’ ও নয়শ’র মাঝামাঝি।
এই তিনটি গোত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল তিক্ত এবং এদের পরস্পরের মধ্যে কখনও যুদ্ধও বেঁধে যেত। ডঃ ওয়েলফিনসন বলেন :
“বনী কায়নুকা ও অবশিষ্ট ইয়াহুদীদের মধ্যে শত্রুতা চলে আসছিল। এর কারণ বনী কায়নুকা বনী খাযরাজের সঙ্গে বু‘আছ যুদ্ধে শরীক ছিল। আর বনী নাদীর ও বনী কুরায়জা অত্যন্ত নির্মমভাবে বনী কায়নুকার রক্তপাত ঘটিয়েছিল এবং তাদের মেরুদণ্ড অত্যন্ত কঠিন হাতে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, অথচ তারা বন্দী সমস্ত ইয়াহুদীদের মুক্তিপণ (ফিদ্য়া)-ও আদায় করে দিয়েছিল। অনন্তর ‘বু‘আছ’ যুদ্ধের পর থেকে ইয়াহুদী গোত্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ঝগড়া চলে আসছিল। কায়নুকা গোত্র ও আনসারদের মধ্যে যুদ্ধ হলে আনসারদের মোকাবিলায় কোন ইয়াহুদীই তাদের সহযোগিতা দেয়নি।”
কুরআন মজীদও ইয়াহুদীদের পারস্পরিক শত্রুতার প্রতি ইঙ্গিত করেছে :

“যখন তোমাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা পরস্পরের রক্তপাত করবে না এবং আপনজনকে স্বদেশ থেকে বহিষ্কৃত করবে না, অতঃপর তোমরা এটা স্বীকার করেছিলে, আর এ বিষয়ে তোমরাই সাক্ষী। তোমরাই তারা যারা অতঃপর একে অন্যকে হত্যা করেছ এবং তোমাদের একদলকে স্বদেশ থেকে বহিষ্কৃত করেছ, তোমরা নিজেরা তাদের বিরুদ্ধে অন্যায় ও সীমালংঘন দ্বারা পরস্পরের পৃষ্ঠপোষকতা করেছ এবং তারা যখন বন্দীরূপে তোমাদের নিকট উপস্থিত হয় তখন তোমরা মুক্তিপণ দাও, অথচ তাদের বহিষ্কারই তোমাদের জন্য অবৈধ ছিল” (সূরা বাকারা : ৮৪-৮৫ আয়াত)।
ইয়াহূদীরা মদীনার বিভিন্ন বস্তি ও মহল্লায় থাকত যা তাদেরই জন্য নির্দিষ্ট ছিল। বনু কায়নুকাকে যখন বনী নাদীর ও বনু কুরায়জা মদীনার পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয় তখন তারা শহরের ভেতর একটি বিশেষ মহল্লায় বসবাস করতে থাকে। বনু নাদীর মদীনা থেকে দু’তিন মাইল দূরে বুতহান উপত্যকার চড়াইয়ে থাকত যা ছিল খেজুর ও ক্ষেত-খামারে পূর্ণ। বনু কুরায়জা মদীনার দক্ষিণে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত মাহযূর এলাকায় বসবাস করত।
মদীনায় ইয়াহূদীদের নির্দিষ্ট বস্তি ছিল যেখানে নির্মিত হয়েছিল দুর্গ ও সুদৃঢ় ইমারতাদি। সেগুলোতে তারা স্থায়ীভাবে থাকত। তাদের ইয়াহূদী হুকুমত স্থাপনের মওকা মেলেনি, বরং তারা গোত্রীয় সর্দারদের সমর্থন-সহায়তায় ও হেফাজতে নিশ্চিন্তে বসবাস করত এবং এই সমর্থন-সহায়তার বিনিময় হিসাবে তারা বার্ষিক রাজস্ব প্রদান করত দরুন তারা বেদূঈনদের আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকত। এই বিপদের প্রেক্ষিতে ইয়াহূদীরা অঙ্গীকার বা চুক্তিবদ্ধ হতে বাধ্য ছিল। অনন্তর প্রত্যেক ইয়াহূদী আরব সর্দার ও আরব রইসের কাউকে না কাউকে নিজেদের মিত্র বানিয়ে রাখত।
ধর্মীয় বিষয়াদি
ইয়াহূদীরা নিজেদেরকে একটি চিরন্তন ধর্মের ও আসমানী শরীয়ত তথা ঐশী বিধানের ধারক-বাহক মনে করত। অনন্তর তারা তাদের মাদ্রাসাগুলোতে (যেগুলোকে মিদরাস বলত) তাদের ধর্মীয় ও পার্থিব বিষয়াদি, শরঈ হুকুম-আহকাম, ইতিহাস ও তাদের নবী-রসূলদের জীবনী পাঠ করত এবং পাঠদান করত। এভাবেই তারা নির্দিষ্ট ইবাদতগাহগুলোতে তাদের ইবাদত ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করত। তারা সেইসব জায়গায় তাদের সমস্ত ধর্মীয় ও পার্থিব বিষয়াদির ক্ষেত্রে পরামর্শ ও মত বিনিময়ের জন্য একত্র হত। ইয়াহূদীরা তাদের নির্দিষ্ট ধর্মীয় আইন-কানুন্যের ওপর আমল করত যেগুলোর ভেতর থেকে কিছু কিছু তারা নিজেদের কিতাবগুলো থেকে গ্রহণ করেছিল আর কিছু তাদের গণক ও আলিমগণ নিজেদের পক্ষ থেকে উদ্ভাবন করে নিয়েছিল। ঠিক তেমনি তাদের ঈদ উৎসব তারা পৃথকভাবে উদযাপন করত। বিশেষ কিছু দিনে, যেমন ‘আশূরার দিনে তারা রোযা রাখত।
ইয়াহূদীদের ধর্মীয়, নৈতিক ও চারিত্রিক অবস্থা
মনে হয় মদীনার ইয়াহূদীদের তাদের আসল দীন ও কিতাবের শিক্ষামালার
সঙ্গে সম্পর্ক খুবই দুর্বল হয়ে গিয়েছিল এবং কালের পরিক্রমায় তারাও তাদের প্রতিবেশী আরবদের মতই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাওহীদের কিছু প্রভাব, খানাপিনা ও হালাল-হারামের বাছ-বিচার তখনও অবশিষ্ট থেকে গিয়েছিল। কিন্তু যখন ইসলাম নির্ভেজাল তাওহীদের অকাট্য আকীদা-বিশ্বাস সাথে নিয়ে এল যা কুরআনে বিধৃত, তখন তাদের এই ছিটেফোঁটা বৈশিষ্ট্যটুকুও লোপ পেল। তারা নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক অধঃপতনের শেষমার্গে গিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল। নিজেদের প্রয়োজন পূরণের ও উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য নিকৃষ্টতম কাজ, যাদুটোনা প্রভৃতি, বিরোধী ও প্রতিপক্ষের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য খাদ্যে বিষ মেশানো, বিদ্রূপ, বাণ নিক্ষেপ, দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ সৃষ্টি, ধোঁকা নিক্ষেপক অর্থপূর্ণ কথা বলে আহত নিজের অন্তরকে প্রবোধ দান করা তাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছিল যা ঐসব হীন মানসিকতা ও পরাজিত সমাজের পরিচয়জ্ঞাপক চিহ্ন ছিল যারা পুরুষোচিত গুণাবলী ও নৈতিক সাহস থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে। যাদুবিদ্যা ও গণনাশাস্ত্রে ইয়াহূদীদের পারদর্শিতা ইতিহাস স্বীকৃত। তাদের আলিম ও মনীষীরা এ কথা গর্বভরে বলেও থাকে। কুরআন মজীদেরও নিম্নোক্ত আয়াতে এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে :

“তারা (ইয়াহূদীরা) এর (যাদুববিদ্যার) আনুগত্য করেছে যাদ্ধারা শয়তান সুলায়মানের সাম্রাজ্যে ও শাসনামলে কাজ নিত” (সূরা বাকারা : ১০২ আয়াত)।
ইয়াহূদীদের এই পেশা রসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। প্রখ্যাত ইয়াহূদী প্রাচ্যবিদ মারগোলিউথ (Margoliouth), যার ইসলাম ও রসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে বিদ্বিষ্ট মনোভাব সর্বজনবিদিত, বলেন, “মদীনার ইয়াহূদীরা যাদুবিদ্যায় বড় অভিজ্ঞ ছিল। তারা প্রকাশ্য যুদ্ধ ও পুরুষোচিত বীর্যের মোকাবিলায় যাদুর কসরত প্রদর্শনকে অগ্রাধিকার প্রদান করত।”
খয়বর যুদ্ধের প্রসঙ্গে বকরীর গোশতে বিষ মেশানোর ঘটনা আসবে যা নবী করীম (সা)-কে পেশ করা হয়েছিল। তিনি তা থেকে রক্ষা পান। কিন্তু বশীর ইবন বারা ইবন মা’রূর এই খাবার গ্রহণ করায় ইন্তিকাল করেন।
পরিচিত বাক্যকে একটি বিশেষ ভঙ্গিতে ব্যবহার এবং এর থেকে কদর্য অর্থ গ্রহণের উল্লেখ কুরআন শরীফে এভাবে এসেছে :

“হে মু’মিনগণ! তোমরা (নবীকে) رَاعِنَا বল না, বরং বল انْظُرْنَا (আমাদের প্রতি লক্ষ্য করুন) ; আর জেনে রেখ, কাফিরদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি রয়েছে” (সূরা বাকারা : ১০৪ আয়াত)।
আবূ নঈম তদীয় দালায়েল গ্রন্থে ইবনে ‘আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন : ইয়াহূদীরা খুবই আস্তে রসূলুল্লাহ (সা)-কে رَاعِنَا বলত যা ছিল তাদের ভাষায় একটি খারাপ গালি। তারা এ কথা বলে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করত। এই প্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক উক্ত আয়াত নাযিল করেন এবং এর দ্বার রুদ্ধ ও মুসলমানদের পরানুকরণ থেকে বাঁচাবার উদ্দেশ্যে এ জাতীয় শব্দের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। ইয়াহূদীদের এখানে এই বাক্যের অর্থ হল اسمع لاسمعت শোন! আল্লাহ যেন তোমাকে শোনার নসীব না করেন। এও বলা হয়েছে যে, (না‘ঊযুবিল্লাহ–আমরা আল্লাহর আশ্রয় চাই) তারা অর্থাৎ ইয়াহূদীরা রসূল (সা)-কে ن ر ع দ্বারা সম্বোধন করেছে যা راعونا থেকে নির্গত আর এ অর্থ হল মূর্খতা ও বোকামি। আলিফ দীর্ঘ আওয়াজের জন্য।
ইমাম বুখারী ‘আয়েশা (রা) থেকে ওরওয়া (র) -র বর্ণনা উদ্ধৃত করেন যে, তিনি বলেন যে, ইয়াহূদীরা মহানবী (সা)-কে সালাম করার সময় السام عليك অর্থাৎ ‘তোমার ওপর মৃত্যু বা দুর্ভাগ্য আপতিত হোক’ বলত।
হাদীসে এসেছে لكل داء دواء الا السام ‘সব রোগের ওষুধ আছে মরণ ব্যাধি ছাড়া’। এ সম্পর্কেই এই আয়াত নাযিল হয় :

“আর লোকে যখন তোমার কাছে আসে তোমাকে তখন এমন ভাষায় সালাম দেয় যে ভাষায় আল্লাহ তোমাকে সালাম দেননি”।
এভাবেই তারা এমন সব নৈতিক অবনতি ও চারিত্রিক অধঃপতনের শিকার হয়েছিল যা কোন সভ্য, ভদ্র ও শরঈ শিক্ষামালার ওপর প্রতিষ্ঠিত সমাজের নিকট আশা করা যায় না। এই প্রবণতা সম্পর্কে জানা যায় সেই আরব মহিলার ঘটনা থেকেও যেই মহিলা বনী কায়নুকার বাজারে একজন কারিগরের নিকট কোন কাজে গিয়েছিল। ইয়াহূদী তখন তার মুখের নেকাব খুলে ফেলার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে। কিন্তু মহিলা অস্বীকার করায় কারিগর তার নেকাব পেছনে (কিছুুর সাথে) বেঁধে দেয়। মহিলাটি উঠে দাঁড়াতেই তার নেকাব খসে পড়ে এবং তিনি বেআব্রু হয়ে যান। এই দৃশ্য ইয়াহূদীরা হেসে ফেলে। ফলে অপমানিতা মহিলাটি জোরে
চিৎকার করে ওঠেন। চিৎকার শুনে জনৈক মুসলিম ছুটে আসেন এবং তলোয়ারের এক আঘাতেই দুর্বৃত্ত কারিগরকে খতম করেন। অতঃপর ইয়াহূদীরা সকলে উক্ত মুসলমানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাঁকে শহীদ করে দেয়।
দৃশ্যত মনে হয় যে, এই জাতীয় ঘটনা এটাই প্রথম ছিল না, কিন্তু আরব বাজারগুলোতে এরূপ ঘটা ছিল কঠিন।
অর্থনীতি
অপরাপুর জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের অধিকাংশ আর্থিক বিষয়াদি বন্ধক ও সুদী ভিত্তিতে চলত এবং মদীনার মত কৃষি এলাকার কারণে তাদের সামনে সুবর্ণ সুযোগও ছিল। কেননা কৃষকদের কৃষিকর্মের প্রেক্ষিতে বেশির ভাগ সময় ধারকর্জের প্রয়োজন দেখা দিত।
বন্ধক ব্যবস্থা কেবল সম্পদ ও গহনাগাটির মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং নিরুপায় অবস্থায় মহিলা ও শিশুও বন্ধক রাখা হত। অনন্তর কা‘ব ইবনে আশরাফ-এর হত্যা প্রসঙ্গে ইমাম বুখারী নিম্নোক্ত বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন :

“মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা) কা‘বকে বললেন : আমরা চাই যে, তুমি এক ওয়াসাক কিংবা দুই ওয়াসাক খাদ্যশস্য আমাদেরকে কর্জ হিসাবে দাও। সে বলল : দিতে পারি, তবে এই শর্তে যে, তুমি আমার কাছে কিছু বন্ধক রাখবে। মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা) বললেন : তুমি কি বন্ধক নিতে চাও? কা‘ব বললঃ তুমি তোমার মহিলাদেরকে আমার কাছে বন্ধক রাখ। তিনি বললেন : আমরা আমাদের মহিলাদেরকে তোমার কাছে কি করে বন্ধক রাখি যেখানে তুমি সমগ্র আরবদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, সুশ্রী ও কান্তিময় পুরুষ। সে বলল : তাহলে তোমাদের ছেলেদের বন্ধক হিসাবে রাখ। এতে তিনি বললেন : আমরা আমাদের ছেলেদেরকে তোমার কাছে কি করে বন্ধক রাখি! ভবিষ্যতে তাদেরকে কেউ ভর্ৎসনা করবে এবং খোঁটা দেবে যে, তাদেরকে এক বা দুই ওয়াসাকের বিনিময়ে বন্ধক রাখা হয়েছিল। আর এটা আমাদের জন্য হবে চরম লজ্জা ও গ্লানির বিষয়। অবশ্য আমরা তোমার কাছে অস্ত্রশস্ত্র বন্ধক হিসাবে রাখতে পারি।”
এ ধরনের বন্ধকের অনিবার্য পরিণাম এই যে, এতে বন্ধকদাতা ও বন্ধক গ্রহীতার মাঝে ঘৃণা ও শত্রুতা সৃষ্টি হয়, বিশেষত সেই সময় যখন আরবের লোকেরা তাদের মহিলাদের ব্যাপারে ছিল অত্যন্ত আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী এবং এ ব্যাপারে তাদের খ্যাতিও রয়েছে। মদীনার অর্থনীতির ওপর ইয়াহূদীদের এই আধিপত্যের ফলে তাদের সামাজিক চাপ খুবই বেড়ে যায় এবং তারা বাজারগুলোতে খেয়াল-খুশির রাজত্ব চালাতে থাকে। নিজের স্বার্থসিদ্ধি ও মুনাফা শিকারী মানসিকতার অনুকূলে তারা কৃত্রিম অভাব ও দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে চোরাকারবারী ও মজুদদারীকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে থাকে। এজন্য মদীনার অধিকাংশ লোক তাদের এই পরিকল্পিত ধান্দাবাজি ও সীমাতিরিক্ত সুদখোরী ও মুনাফাখোরী মানসিকতার এমন সব লজ্জাকর কার্যকলাপের কারণে তাদের ঘৃণা করতে শুরু করেছিল যা থেকে একজন আরব দূরে অবস্থান করে।
তাদের স্বভাবগত রাজনীতি, লোভ-লালসা ও ক্রমান্বয়ে জুড়ে বসার প্রেক্ষিতে De Lacy of Leary তদীয় Arabia before Muhammad নামক গ্রন্থে লিখেছেন:
আসল বেদূঈন বাসিন্দা এবং নতুন বসতি স্থাপনকারী ইয়াহূদীদের সম্পর্ক ঈসায়ী ৭ম শতাব্দীতে খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কেননা ঐসব ইয়াহূদী তাদের কৃষি এলাকা বেদূঈনদের চারণক্ষেত্র অবধি বিস্তৃত করে নিয়েছিল।
আউস ও খাযরাজ (মদীনার আরব বাসিন্দা) এবং ইয়াহূদীদের সম্পর্ক ছিল ব্যক্তিগত স্বার্থ ও লাভের ওপর ভিত্তিশীল। ইয়াহূদীরা এই দুই গোত্রকে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত করাতে সম্ভাব্য লাভের আশায় প্রচুর টাকা-পয়সা খরচ করত। আউস ও খাযরাজের কয়েকটি যুদ্ধে তারা এ ধরনের খরচ করেছিল। এর ফলে এ দু’টো গোত্রই ধ্বংস হবার উপক্রম হয়েছিল। তাদের সামনে কেবল একটাই লক্ষ্য থাকত যাতে মদীনার ওপর তাদের আর্থিক আধিপত্য বজায় থাকে। আগত নবীর প্রসঙ্গে ইয়াহূদীদের কথাবার্তাও আউস ও খাযরাজকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করেছিল।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অবস্থা
আরব ভূখণ্ডে বসবাসরত ইয়াহূদীদের ভাষা স্বাভাবিকভাবে আরবীই ছিল, কিন্তু তা নির্ভেজাল ছিল না। এতে স্বল্প পরিমাণে হিব্রু ভাষার মিশ্রণ ঘটে গিয়েছিল। কেননা তারা হিব্রুর ব্যবহার একেবারেই পরিত্যাগ করেনি। তারা তাদের
ইবাদত-বন্দগী ও শিক্ষামূলক বিষয়ে এর ব্যবহার করত।
ইয়াহূদীদের ধর্মীয় ও দাওয়াতী দিক সম্পর্কে ড. ইসরাঈল ওয়েলফিনসন বলেন; এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ইয়াহূদীদের নিকট আরবে তাদের ধর্মীয় ক্ষমতা বিস্তৃত করবার উপায়-উপকরণ ছিল। যদি তারা চাইত তবে লব্ধ ও অর্জিত ক্ষমতা দ্বারা আরও অনেক বেশি প্রভাব-প্রতিপত্তি লাভ করতে পারত। কিন্তু ইয়াহূদীদের ইতিহাস সম্পর্কে যারা জ্ঞাত তারা জানেন যে, ইয়াহূদীরা অপরাপর জাতিগোষ্ঠীকে কখনো তাদের ধর্ম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করেনি এবং কতকগুলো কারণে ধর্মের প্রচার ইয়াহূদীদের জন্য নিষিদ্ধ থেকেছে।
ইয়াহূদীরা (নিজেদের জাতীয় মেযাজ মাফিক) তাদের সমাজকে নবতর অবস্থা ও পরিবর্তন-পরিবর্ধন মুতাবিক ঢেলে সাজানো, নতুন চ্যালেঞ্জ অনুধাবন করা ও প্রাপ্ত সুযোগ কাজে লাগানো এবং ইসলাম গ্রহণ পূর্বক নিজেদের সংস্কৃতি, মেধা, প্রতিভা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার উপযুক্ত স্থান লাভে ব্যর্থ হয়। এই দুঃখজনক পরিণতি এমন প্রতিটি সমাজকেই বরণ করে নিতে হয়েছে যারা নিজেদের অতীত, নাম-ধাম ও বংশের অহমিকায় মত্ত, যারা কল্পনার জগতে বসবাস করে এবং শূন্যগর্ভ নেতৃত্বের আশ্রয় নেয়।
ইয়াহূদীরা নিজেদেরকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে এবং এক পয়গামবাহক, আহলে কিতাব ও পূর্ববর্তী আম্বিয়াই কিরাম-এর উম্মত ও বংশধর হওয়ার দিক দিয়ে নিজেদের যোগ্যতা ও অগ্রবর্তিতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়। আরবের নিম্ন পর্যায়ের মূর্তিপূজা ও নীচু স্তরের জাহিলিয়াত দৃষ্টেও তাদের মধ্যে কোন প্রকার অস্থিরতা জন্ম নেয় নি এবং তারা (নিদেনপক্ষে) সেই তৌহিদী আকীদা-বিশ্বাসের দাওয়াতও দেয় নি যে ‘আকীদা-বিশ্বাসের তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে (নিজেদের নৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতন ও জাতীয় দুর্বলতা সত্ত্বেও) ধারক-বাহক হিসাবে দাবি করে আসছিল। এর বুনিয়াদী কারণ ছিল এই যে, তারা নিজেদের ধর্মের দিকে কোন ইসরাঈলী বহির্ভূত লোককে দাওয়াত দেয়ার সমর্থকই ছিল না। ইয়াহূদী ধর্মকে তারা পারিবারিক ও বংশগত ধর্ম ও সম্মান মনে করবার বিশ্বাস ছিল তাদের চিরন্তন বৈশিষ্ট্যজ্ঞাপক চিহ্ন (যেমন ইসরাঈল ওয়েলফিনসন এবং প্রাক্তন আমেরিকান ইয়াহূদী ও বর্তমানের মুসলিম মনীষা মরিয়ম জমিলা বলেন)। এরই সাথে তাদের আরামপ্রিয়তা ও সীমাতিরিক্ত বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতাও তাদের জন্য ছিল এক প্রতিবন্ধক।
কিন্তু এটি এক নিশ্চিত বিষয় যে, আউস, খাযরাজ ও অন্যান্য আরব গোত্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষাকারী বহু লোক ইয়াহূদী ধর্মকে নিজেদের মর্জিমাফিক কিংবা
আত্মীয়তা সূত্রে অথবা ইয়াহূদী পরিবেশে প্রতিপালিত হওয়ার কারণে গ্রহণ করে নিয়েছিল। আরবের ইয়াহূদীদের মধ্যে সবগুলোই পাওয়া যেত। এটাও জানা যে, বিশিষ্ট ইয়াহূদী বণিক ও বিখ্যাত কবি কা‘ব ইবনু’ল-আশরাফ (যে নাদীর গোত্রীয় হিসেবে পরিচিত ও বিখ্যাত ছিল) ত্বাঈ গোত্রের একজন সদস্য ছিল। তার পিতা নাদীর গোত্রে বিয়ে করেছিল। অনন্তর কা‘ব একজন উৎসাহী ইয়াহূদী হিসেবে আবির্ভূত হয়। ইবনে হিশাম বলেন :
“তার পৈতৃক সম্পর্ক ছিল ত্বাঈ গোত্রের সঙ্গে, এরপর বনী নাবহান গোত্রের সঙ্গে। তার মা ছিল নাদীর গোত্রের মেয়ে।”
আরবদের মধ্যে একটি প্রথা এই ছিল যে, যাদের ছেলে হয়ে মারা যেত, বাঁচত না, তারা মানত করত যদি ছেলে বেঁচে যায় তবে তাকে ইয়াহূদীদের হাতে তুলে দেবে, তারা তাকে নিজেদের মধ্যে শামিল করে নেবে। অতএব, বহু আরব এভাবেই ইয়াহূদী হয়ে গিয়েছিল। সুনানে আবূ দাঊদ-এ নিম্নোক্ত বর্ণনা পাওয়া যায় :

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যেই মহিলার বাচ্চা বাঁচত না সে মানত করত যে, যদি এই বাচ্চা বেঁচে যায় তবে তাকে ইয়াহূদী বানাবে। অতএব, নাদীর গোত্র যখন মদীনা থেকে নির্বাসিত হল তখন তাদের নিকট আনসারদের ছেলে-সন্তানও ছিল। এজন্য তারা বলতে থাকে যে, আমরা আমাদের ছেলেদের ছেড়ে যাব না। এই উপলক্ষে এই আয়াত নাযিল হয়ঃ
لاَ إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ “ধর্মে কোন জোর-জুলুম নেই। সত্য মিথ্যা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।”
আউস ও খাযরাজ
আউস ও খাযরাজ (মদীনার আরব বাসিন্দা)-এর বংশধারা ইয়ামানের আযদ গোত্রের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হয় যেখান থেকে ইয়াছরিবের দিকে হিজরতের স্রোত বিভিন্ন বিরতিতে বইতে থাকে। এর কয়েকটি কারণ ছিল। এর মধ্যে ইয়ামানের অনিশ্চিত অবস্থা, আবিসিনিয়ার আক্রমণ, মা’রিব বাঁধের ধ্বংসের পর কৃষি মাটিতে
সেচ উপযোগী পানির অভাব প্রভৃতি রয়েছে। এভাবেই আউস ও খাযরাজ মদীনায় ইয়াহূদীদের পর আগমন করে। আউসের শাখা গোত্রসমূহ মদীনার দক্ষিণ ও পূর্বদিকে বসতি স্থাপন করে যা আাওয়ালী এলাকা বলা হয়। খাযরাজের শাখা-গোত্রসমূহ মধ্য ও উত্তর এলাকায় বসতি স্থাপন করে। এটি মদীনার নিম্ন বা ঢালু ভাগ। এরপর পশ্চিমে হাররাতু’ল-ওয়াবরা অবধি আর কিছু নেই।
খাযরাজ ছিল চারটি গোত্রের সমষ্টি : (১) মালিক (২) ‘আদী (৩) মাযিন ও (৪) দীনার। এর সবগুলোই নাজ্জার গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল যাকে تیم اللات বলা হত। বনু নাজ্জারের গোত্রসমূহ মদীনার সেই মধ্য ভাগে বসতি স্থাপন করে যেখানে এখন মসজিদে নববী (সা) অবস্থিত। আউস মদীনার উর্বর কৃষি এলাকায় বসতি স্থাপন করে এবং ইয়াহূদীদের গুরুত্বপূর্ণ গোত্র ও দলসমূহ প্রতিবেশীতে পরিণত হয়। খাযরাজ যেখানে অবস্থান নেয় তা খুব শস্য-শ্যামল এলাকা ছিল না। তাদের বনী কায়নুকা নামক একটি বড় ইয়াহূদী গোত্র প্রতিবেশী ছিল।
এখন আউস ও খাযরাজের প্রকৃত জনসংখ্যা অবগত হওয়া খুবই কষ্টকর। কিন্তু অবস্থা ও ঘটনাসমূহের ওপর দৃষ্টিক্ষেপণকারী তাদের সামরিক শক্তির পরিমাপ সেই সমস্ত যুদ্ধ থেকে করতে পারবে যেসব যুদ্ধে তারা হিজরতের পর অংশ গ্রহণ করেছিল। অনন্তর মক্কা বিজয়ের পর তাদের যুদ্ধ-উপযোগী জনসংখ্যা ছিল চার হাজার।
মদীনায় হিজরতের সময় আরবদেরই প্রাধান্য ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইয়াহূদীরা তাদের এসব প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত ছিল না। তাদের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ছিল অনৈক্য ও কাদা ছোড়াছুড়ি। কিছু গোত্র আউসের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিল আর কিছু খাযরাজের সঙ্গে। যুদ্ধের সময় তারা তাদের স্বধর্মীদের মোকাবিলায় আরবদের তুলনায় কঠোর স্বভাবের প্রমাণিত হয়েছিল। কায়নুকা, বনু নাদীর ও বনু কুরায়জার পারস্পরিক শত্রুরতার ফলেই বনী কায়নুকা নিজেদের কৃষি কর্ম ও ক্ষেতখামার পরিত্যাগপূর্বক শিল্পকর্মকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।
এভাবেই আউস ও খাযরাজের মধ্যে বহু যুদ্ধ সংঘটিত হয় যার মধ্যে প্রথম যুদ্ধ ছিল সুমায়র যুদ্ধ আর শেষ যুদ্ধ ছিল বু’আছ যুদ্ধ। এ যুদ্ধ হিজরতের পাঁচ বছর পূর্বে সংঘটিত হয়েছিল। ইয়াহূদীরা আউস ও খাযরাজকে পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত করাতে চক্রান্ত করত এবং অনৈক্য ও হানাহানির আগুন জ্বেলে দিত যাতে আরব তাদের সম্পর্কে উদাসীন থাকে। আরবরাও এ কথা অনুভব করত। এ জন্য তারা ইয়াহূদীদেরকে ثعالب তথা খেঁকশিয়াল বা ধূর্ত উপাধিতে স্মরণ করত।
এই প্রসঙ্গে ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় যে ঘটনার উল্লেখ করেছেন তা থেকে এ বিষয়ের ওপর বেশ আলোকপাত ঘটে। ঘটনার বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, একবার শা’ছ ইবন কায়স নামক এক বয়োবৃদ্ধ ইয়াহূদী এক স্থানে আউস ও খাযরাজকে ইসলাম কবুলের পর এক মজলিসে বসে স্নেহ-ভালবাসার আলাপ করতে দেখতে পায়। এ দৃশ্য সে খুব কষ্ট পায়। অবশেষে সইতে না পেরে সে এক ইয়াহূদী যুবককে, আনসারদের সঙ্গে যার সম্পর্ক ছিল, ডেকে ইঙ্গিতে জানিয়ে দিল সে যেন তাদের মজলিসে যোগ দেয় এবং কোন এক উপলক্ষে বু’আছ যুদ্ধসহ ইতোপূর্বকার যুদ্ধগুলোর প্রসঙ্গ টেনে ওঠায় এবং যুদ্ধকালে পঠিত কবিতা আবৃত্তি করে যাতে উভয় গোত্রের পুরোনো ক্ষত, যা শুকিয়ে গিয়েছিল, পুনরায় দগদগে হয়ে ওঠে এবং জাহিলী যুগের অন্ধ গোত্রপ্রীতি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। ফলে বিরাজিত সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি ভেঙে খানখান হয়ে যায়।
এ চক্রান্ত ব্যর্থ হয়নি। উভয় গোত্রের মধ্যে, যারা এককালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও শত্রুতার মানসিকতা নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, মুহূর্তের মধ্যে রক্তে জাহিলিয়াতের আগুন ধরে যায়। খাপ থেকে তলোয়ার টেনে বের করার উপক্রম হতেই রসূলুল্লাহ (সা) মুহাজিরদের সমভিব্যাহারে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন এবং স্বীয় অমূল্য উপদেশ দ্বারা তাদের ঈমানের স্ফুলিঙ্গ দাউ দাউ করে জ্বালিয়ে তোলেন এবং তাদের দীনী জযবা তথা ধর্মীয় প্রেরণা জাগিয়ে দেন। তারা তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, তাঁরা এক গভীর চক্রান্তের শিকার হয়ে গিয়েছিল। তাঁদের চোখ দিয়ে অনুশোচনা ও অনুতাপের অশ্রু বিগলিত ধারায় ঝরতে থাকে। আউস ও খাযরাজ পরস্পরকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে। মনে হচ্ছিল তাঁদের মধ্যে যেন কিছুই হয়নি।
প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক অবস্থা
নবী করীম (সা)-এর হিজরতের কালে ইয়াছরিব বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত ছিল যেখানে ইয়াহূদী ও আরব গোত্রগুলো বসবাস করত এবং প্রতিটি গোত্র কোন না কোন গোত্রের অংশে ছিল। এসব এলাকা ছিল দুই প্রকারঃ এক প্রকার কৃষি জমি, ঘরবাড়ি ও এসবে বসবাসকারী আর দ্বিতীয় প্রকার ছিল আতাম (آطام) বা আতেম (গড় বা দুর্গবেষ্টিত মহল্লা)। ইয়াহূদীদের এ সব গড়ের (آطام) সংখ্যা ছিল ৫৯টি। ড. ওয়েলফিনসন এসব ‘আতাম’-এর (গড়ের) উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেনঃ
“ইয়াছরিবে ‘আতাম’ (গড়)-এর বিরাট গুরুত্ব ছিল যেখানে শত্রুর আক্রমণ মুহূর্তে গোত্রের লোকেরা আশ্রয় নিত, বিশেষত মহিলা, শিশু, পঙ্গু ও অসহায় লোকেরা সে সময় এতে মাথা গুঁজার ঠাঁই পেত। যখন মহল্লার পুরুষেরা লড়বার জন্য চলে যেত, এসব গড় গুদাম হিসেবেও ব্যবহৃত হত এবং এতে খাদ্যশস্য ও ফলমূল জমা করে রাখা হত। কেননা এগুলো খোলা জায়গায় রাখলে শত্রু কর্তৃক লুণ্ঠিত ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকত। এ ছাড়া এতে মালামাল ও অস্ত্রশস্ত্র রাখা হত। নিয়ম ছিল যে, দ্রব্য-সামগ্রী ও রসদ-সম্ভার পরিপূর্ণ কাফেলা গড়ের কাছাকাছিই অবতরণ করবে। আর এসব গড়ের দরজা মুখে বাজারও বসত। ধারণা করা হয় যে, এসব গড়ে ইবাদতখানা ও ইয়াহূদীদের ধর্মীয় শিক্ষায়তনও থাকত, যেসব উত্তম ও প্রচুর সামান সেখানে থাকত তা থেকে এটাই বোঝা যায়। সেখানে ধর্মীয় কিতাবাদিও থাকত। সেখানে আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শের নিমিত্ত ইয়াহূদী নেতৃবৃন্দ সমবেত হত। কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারকে পাকাপোক্ত করতে কিংবা প্রতিজ্ঞা বা চুক্তি সম্পাদনের সময় তারা পবিত্র গ্রন্থের কসম খেত।”
লেখক ‘আতাম’ (آطام) -এর বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আরও বলেন :
“হিব্রু ভাষায় এর অর্থ বন্ধ ও রুদ্ধ করে দেওয়া। প্রাচীরের সঙ্গে যখন এই শব্দ ব্যবহৃত হবে তখন এর অর্থ হবে সেই খিড়কি যা বাইরে থেকে বন্ধ, কিন্তু ভিতর থেকে খোলা যায়। এর ব্যবহার পাঁচিল কিংবা প্রবল নিরাপত্তামূলক প্রাচীরের ক্ষেত্রেও হয়ে থাকে। এভাবে আমরা ধরে নিতে পারি যে, ইয়াহূদীরা ‘আতাম’কে ছোট্ট দুর্গ অর্থে ব্যবহার করত। এতে বাইরে থেকে ভেতরে আলো প্রবেশের জন্য ছিদ্র থাকত যা বাইরে থেকে বন্ধ এবং ভেতর থেকে খোলা যেত।”
ইয়াছরিব ছিল এইসব মহল্লা ও কেল্লাবন্দির নাম যা প্রকৃতপক্ষে কাছাকাছি বস্তিগুলোর একটি সমষ্টি ছিল যা পরবর্তীতে শহরে পরিণত হয়েছিল। কুরআন করীমও এদিকেই ইঙ্গিত প্রদান করেছে :

“আল্লাহ বস্তিবাসীদের থেকে তাঁর রাসূলকে যা কিছু প্রদান করেছেন” (সূরা হাশর : ৭ আয়াত)।
অন্যত্র বলা হয়েছে :

“ওরা তোমাদের সাথে একাট্টা হয়ে লড়াই করে না, কিন্তু লড়াই করে কেল্লাবন্দ বস্তিতে কিংবা প্রাচীরের পেছন থেকে” (সূরা হাশর, ১৪ আয়াত)।
মদীনা তায়্যিবায় হাররাতের বিরাট গুরুত্ব ছিল। হাররা-ই লাভা বলা হয় সেই পোড়া-কালো পাথরের এলাকাকে যা আগ্নেয়গিরির গলিত লাভা একে অপরের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে এবং যা একেবারেই অসংলগ্ন, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ও আড়আড়ি তেরছাভাবে মাইলের পর মাইল জুড়ে বিস্তৃত। এর ওপর খালি পায়ে হাঁটা যেমন মুশকিল, তেমনি এর ওপর দিয়ে উট ও ঘোড়ার পক্ষেও চলা দুষ্কর। মদীনার দুটো হাররাহ বিখ্যাত। একটি পশ্চিম দিকে যাকে ‘হার্রাতু’ল-ওয়াবরা’ (حرة الوبرة) বলা হয়। অপরটি পূর্বদিকে যা ‘হাররাহ ওয়াকিম’ নামে মশহুর। আল্লামা মাজদুদ্দীন ফীরোযাাবাদী তদীয় গ্রন্থ المغانم المطابة في معالم طابة-য় কতিপয় হার্হার কথা উল্লেখ করেছেন যেগুলো মদীনার আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এই দু’টি হাররাহ (হাররাতুল-ওয়াবরা ও হার্াহ ওয়াকিম) মদীনাকে একটি দুর্গবেষ্টিত শহর বানিয়ে দিয়েছে যার ওপর কেবল উত্তর দিক থেকে সেনাভিযান হতে পারত (এবং এটাই সেই দিক যেদিকটিতে আহযাব যুদ্ধে খন্দক বা পরিখা খনন করে নিরাপদ ও সুরক্ষিত করা হয়েছিল)। দক্ষিণ দিকে ঘন খেজুর বাগান, বাগ-বাগিচা ও ঘন বসতির দরুন মিলিত ঘরবাড়িগুলো একটি অপরটির সঙ্গে এমনভাবে ঘেরাও যে, এদিক থেকেও বহিরাক্রমণ কঠিন। হিজরতের জন্য মদীনাকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে মদীনার এই সুদৃঢ় প্রাকৃতিক রক্ষা ব্যূহ ও সামরিক বৈশিষ্ট্যেরও ভূমিকা ছিল।
হাররাহ ওয়াকিম ছিল মদীনার পূর্বদিকে। এটি ছিল হাররাতুল-ওয়াবরা থেকে বেশি জনবসতিপূর্ণ। নবী করীম (সা) যখন ইয়াছরিবে হিজরত করেন তখন
হাররাহ ওয়াকিমে ইয়াহূদীদের গুরুত্বপূর্ণ গোত্রসমূহ, যেমন বন্-নাদীর, বন্ কুরায়জা প্রভৃতি বসবাস করত। তাদের সাথে আওস গোত্রের গুরুত্বপূর্ণশাখাসমূহ বন্ আব্দিল আশহাল, বন্ জাফর, বন্ হারিছা, বন্ মু’আবিয়া সেখানেই অবস্থান করত। ওয়াকিম বনী আল-আশহালেরই এলাকায় ছিল যার নামে হাররাহ ওয়াকিম নামাঙ্কিত ছিল।
ধর্মীয় অবস্থা ও সামাজিক অবস্থান
মদীনার আরব জনসাধারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কুরায়শদের আনুগত্য মেনে চলত আর মক্কাবাসী কুরায়শদেরকে কা’বার মুতাওয়াল্লী, ধর্মীয় নেতা এবং আকীদা ও আমলের বেলায় অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় উদাহরণ মনে করত। তারা আরব ভূখণ্ডে বিস্তৃত মূর্তিগুলোরই পূজা করত যেগুলোকে কুরায়শ ও হেজাযের লোকেরা পূজা করত। কতক গোত্রের কিছু এলাকাভিত্তিক মূর্তির সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। এভাবে ‘মানাত’ নামক মূর্তি মদীনার লোকদের সবচেয়ে প্রিয় ও পুরাতন মূর্তি ছিল এবং আওস ও খাযরাজ গোত্র একে সব চাইতে পবিত্র মনে করত। একে আল্লাহর শরীক জ্ঞান করত। এই মূর্তিটি কুদায়দ পাহাড়ের সম্মুখবর্তী সমুদ্রোপকূলের দিকে মক্কা ও মদীনার মাঝখানে ‘মুশাল্লাল’ নামক স্থানে অবস্থিত ছিল। ‘লাত’ তায়েফবাসীদের প্রিয় মূর্তি ছিল। উযযা ছিল মক্কার জাতীয় মূর্তি। এজন্য এসব শহরের লোকদের তাদের স্ব স্ব মূর্তির সঙ্গে আবেগ উদ্দীপক সম্পর্ক থাকত। মদীনার লোকদের ভেতর কেউ কাঠের কিংবা অন্য কোন জিনিসের মূর্তি নিজেদের ঘরে রাখলে তাকে ‘মানাত’ নামেই ডাকত, যেমন বনী সালমার একজন সর্দার ‘আম্র ইব্নু’ল-জামূহ ইসলাম গ্রহণের পূর্বে বানিয়ে রেখেছিল।
ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (র) উরওয়ার বরাতে হযরত আইশা (রা) থেকে إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, আনসারগণ ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ‘মানাত’ নামের ওপর তালবিয়াঃ (দ্র.) পড়ত এবং মুশাল্লাল-এর কাছে তার পূজা করত। তার নামে হজ্জ শুরুকারী সাফা ও মারওয়ার সাঈ (দ্র.) সহীহ-শুদ্ধ মনে করত না। লোকে যখন এ বিষয়ে জানতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা জাহিলী যুগে সাফা-মারওয়ার তাওয়াফকে দোষের ভাবতাম। তখন আল্লাহ তা’আলা এই আয়াত
নাযিল করেন : ان الصفا والمروة অর্থঃ সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।
আমরা মদীনার আর কোন মূর্তি সম্পর্কে জানি না যে, তা লাত, মানাত কিংবা উয্যা ও হোবলের মত বিখ্যাত হয়েছে এবং লোকে তার পূজা-অর্চনা করত ও তার জন্য মদীনার বাইরে থেকে আগমন করত। মনে হয় মক্কার মত মদীনায় মূর্তির আধিক্য ছিল না এজন্য যে, মক্কার প্রতিটি ঘরেই একটি বিশেষ মূর্তি থাকত। মক্কায় লোকে মূর্তি ফেরি করে বিক্রি করত। মোটকথা, মক্কা মূর্তিপূজার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় মর্যাদার দাবিদার ছিল। সে ছিল নেতৃত্বের আসনে সমাসীন আর মদীনা ছিল এর ছায়াস্বরূপ।
মদীনার লোকেরা বছরের দু’দিন খেলাধুলা ও আনন্দ-উৎসবের পর্ব হিসাবে পালন করত। নবী করীম (সা) যখন মদীনায় তশরীফ নেন তখন মদীনার লোকদের তিনি বললেন : قد ابدلكم الله تعالى بهما خيراً منهما يوم الفطر والاضحى, আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে এই দু’দিনের থেকে উত্তম দিন দান করেছেন : ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। কোন কোন হাদীস ব্যাখ্যাতা জাহিলী যুগের উক্ত দু’দিন সম্পর্কে বলেছেন যে, সে দু’দিনের একদিন হল নওরোজ বা নববর্ষ এবং ২য় দিন মিহিরজান দিবস। সম্ভবত তারা এ দুই উৎসব ইরানের লোকদের থেকে নিয়েছিল।
আওস ও খাযরাজ গোত্রের বংশীয় আভিজাত্যের স্বীকৃতি কুরায়শরাও দিত। তারা ছিল আরব আরিবার সঙ্গে সম্পর্কিত বন্ কাহতানের অন্যতম শাখা। কুরায়শ তাদের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রেও সম্পর্কিত ছিল। অনন্তর কুরায়শ সর্দার হাশিম ইবন আবদ মানাফ বনী আন-নাজ্জারে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর বিয়ে হয়েছিল সালামা বিনতে আমর ইবন যায়দ-এর সঙ্গে যিনি বনী আদী ইবন আন-নাজ্জারের কন্যা আর বনী আদী ছিল খাযরাজ গোত্রেরই একটি শাখা। এতদসত্ত্বেও কুরায়শরা নিজেদেরকে মদীনার আরব গোত্রগুলোর তুলনায় নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠতর ভাবত। বদর যুদ্ধের দিন উতবা ইবন রবীআ, শায়বা ইবন রবীআ ওয়ালীদ ইবন উতবা যখন মুসলমানদেরকে তাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য আহ্বান করল তখন সে ডাকে সাড়া দিতে আনসারদের কিছু যুবক বের হল। তখন তারা জিজ্ঞেস করল, তোমরা কারা? তারা জবাবে বলল, আমরা আনসার। এতে তারা বলল, আমরা তোমাদেরকে চাই না। এরপর তাদের একজন চিৎকার দিয়ে ডেকে বলল,
মুহাম্মাদ! আমাদের মোকাবিলায় আমাদের সমগোত্রীয় ও সমকক্ষ কাউকে পাঠাও। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, উবায়দা ইবনুল হারিছ! তুমি অগ্রসর হও। হামযা! তুমি অগ্রসর হও। আলী! তুমি দাঁড়াও। এসব মুসলমান তাদের সম্মুখীন হলে এবং নিজেদের নাম বললে কুরায়শরা বলল : হ্যাঁ, এসব শরীফ লোক, আমাদের সমকক্ষ।
এর কারণ কি? এর কারণ এই যে, কুরায়শরা কৃষিকাজকে (যাতে মদীনার লোকেরা নিজেদের এলাকাগত অবস্থার কারণে অভ্যস্ত ছিল) কিছুটা অবজ্ঞার চোখে দেখত। এর প্রকাশ আবু জেহেলের সেই কথা থেকেও পাওয়া যায় যাকে আফরার দুই আনসারী বালক হত্যা করেছিল। মৃত্যুর সময় সে হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা)-কে বলেছিল : لوغير اكار قتلنى হায়! যদি এক কৃষক ছাড়া অন্য কেউ আমাকে হত্যা করত।
অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা
মদীনা তার ভূমির ধরন ও প্রকৃতির দিক দিয়ে একটি কৃষি এলাকা ছিল। এজন্য এর বাসিন্দাদেরকে কৃষি ও বাগবাগিচার ওপরই নির্ভর করতে হত। তাদের গুরুত্বপূর্ণ উৎপন্নজাত ফসলের মধ্যে ছিল খেজুর ও আঙ্গুর। কেননা তাদের সেখানে অনেক বাগান ছিল যেগুলোর অনেকগুলোই ছিল বেড়া ঘেরা আর অনেকগুলো ছিল বেড়াবিহীন। ক্ষেতের ফসল ও খেজুর গাছ দুই কাণ্ডওয়ালা ও এক কাণ্ডওয়ালা হত।
শস্যক্ষেতে বিভিন্ন প্রকার খাদ্যশস্য ও শাক-সবজী উৎপন্ন হত। দুর্ভিক্ষ ও শুষ্ক বছরে লোকের বেশি ভাগ খাদ্যের প্রয়োজন খেজুর পূরণ করত এবং প্রয়োজন মুহূর্তে মুদ্রা তথা টাকা-পয়সার ন্যায় এসবের দ্বারা কেনাবেচার ক্ষেত্রে সাহায্য নেওয়া হত। এভাবে খেজুর বাগান মদীণাবাসীদের জীবনে বিরাট কল্যাণ ও
বরকতের পুঁজি ছিল। এর দ্বারা তাদের যেমন খাদ্যের অভাব ঘুচত, তেমনি শিল্পসামগ্রী, নির্মাণ, জ্বালানি ও পশু পালের খাবার হিসাবেও তা কাজে লাগত।
মদীনার খেজুর ছিল বহু রকমের যার সবগুলো নাম মনে রাখাও মুশকিল। মদীনার লোকদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফলে খেজুর উৎপাদনের বৃদ্ধি ও উন্নত মানের করার বহু পন্থা জানা ছিল যেগুলোর ভিতর নারী-পুরুষের পার্থক্য এবং সেগুলো কলমের ব্যবহারও ছিল যাকে ‘তাবীর’ বা ‘কলম’ শব্দ দ্বারা ব্যাখ্যা করত।
বাগান কিংবা কৃষিকাজ করার অর্থ এই নয় যে, মদীনায় কোন প্রকার বাণিজ্যিক তৎপরতা ছিল না। অবশ্যই এ কথা ঠিক যে, মদীনার বাণিজ্যিক তৎপরতা মক্কার মত উষ্ণ ও জোরদার ছিল না। কেননা পানিবিহীন ঊষর-ধূসর শুষ্ক মরু বিয়ابان মক্কা উপত্যকার লোকদের নির্ভরতা স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসা-বাণিজ্য ও শীত-গ্রীষ্মের বাণিজ্যিক সফরের ওপর ছিল।
মদীনার কিছু কিছু শিল্প ইয়াহূদীদের সঙ্গেই সম্পর্কিত ও নির্দিষ্ট ছিল যেগুলো তারা সম্ভবত ইয়ামান থেকে নিয়ে এসেছিল। বনী কায়নুকা’র লোকেরা সাধারণভাবে স্বর্ণকার ও অস্ত্র নির্মাতার পেশা অবলম্বন করেছিল আর ইয়াহূদীরা ছিল মদীনার সবচেয়ে ধনিক ও বিত্তবান সম্প্রদায়। তাদের বাড়িঘর সব সময় ধন-সম্পদ ও স্বর্ণ-রৌপ্য দ্বারা ভর্তি থাকত।
মদীনার যমিন আগ্নেয়গিরির গলিত লাভা এলাকায় (হাররাত) বিদ্যমান থাকায় খুব উর্বর প্রমাণিত হয় যার উপত্যকাগুলোতে বন্যার পানিও খুব প্রবাহিত হত এবং জমির সাথে সাথে ক্ষেত-খামার ও বাগ-বাগিচাগুলোকে প্লাবিত ও শস্যা-শ্যামল করে তুলত। এগুলোর ভিতর সবচেয়ে বিখ্যাত উপত্যকা ছিল আকীক উপত্যকা। আবার আকীক উপত্যকা ছিল মদীনার খেলাধুলার জায়গা। এতে প্রচুর পানি থাকত আর এখানে বাগানে কুয়া খননের সাধারণ প্রচলন ছিল।
বাগানের চারপাশে প্রাচীর ঘেরা থাকত। এ ধরনের প্রাচীর ঘেরা বাগানকে মদীনার লোকেরা ‘হায়িত’ (حائط) বলত। ঠিক তেমনি মদীনার অনেক কুয়ার পানি প্রাচুর্য ও মিষ্টতার জন্য মশহুর ছিল। এসব কুয়ার সঙ্গে ছোট ছোট খাল বা নালার ব্যবস্থা ছিল যে সবের মারফত মদীনাবাসী তাদের বাগানগুলোতে পানি সরবরাহ করত।
খাদ্যশস্যের মধ্যে প্রথম স্থান ছিল যবের এবং এর পরের স্থান ছিল গমের। শাক-সবজী ও তরি-তরকারির খুবই প্রাচুর্য ছিল। কৃষি কাজ ছিল কয়েক ধরনের : মুযাবানা, মুহাকালা, মুখাবারা, মু’আওয়ামা । ঐগুলোর মধ্যে কোন কোন কৃষি ব্যবস্থাকে ইসলাম বহাল রাখে আর কোন কোনটিকে নিষিদ্ধ করে, আবার কোন কোনটির সংস্কার সাধন করে।
মক্কা ও মদীনায় যেসব মুদ্রার প্রচলন ছিল তা ছিল একই ধরনের। আমরা মক্কা অধ্যায়ে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। মক্কাবাসীদের তুলনায় মদীনার লোকদেরকে মাপ-জোখের বেশি মুখোমুখি হতে হত। কেননা সেখানকার বাসিন্দাদের পুঁজিই ছিল খাদ্যশস্য ও ফলমূল। মদীনায় ব্যবহৃত পরিমাপক বস্তু ছিল এই : মুদ্দ, সা, ফারাক, ইরক ও ওয়াসাক আর ওজনের নিমিত্ত ছিল দিরহাম, শিকাক, দানিক, কীরাত, নাওয়াত, রতল, কিনতার ও আওকিয়া।
ভূমির উর্বরতা সত্ত্বেও খাদ্যের দিক দিয়ে মদীনা স্বনির্ভর ছিল না। এজন্য সেখানকার বাসিন্দারা বাইরে থেকেও খাদ্যশস্য আমদানি করত। তারা ময়দা, আটা, ঘি ও মধু সিরিয়া থেকে আমদানি করত। তিরমিযী শরীফে হযরত কাতাদা ইবন নু’মান (রা) বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায় যে, মদীনার লোকের প্রধান খাদ্য ছিল খেজুর ও যব। আর কেউ যখন সচ্ছল হত তখন কোন সওদাগর (ضاغط) ১
সিরিয়া থেকে ময়দা নিয়ে আসত তখন তারা নিজেদের জন্য এসব ময়দা ক্রয় করত। কিন্তু পরিবার-পরিজন খেজুর ও যবই খেত। এই কাহিনী মদীনার খাদ্যব্যবস্থা ও জীবনমানের পার্থক্যের ওপর যথেষ্ট আলোকপাত করে যা হিজরতের পর হঠাৎ করে সামনে এসে দেখা দেয়নি।
ইয়াহূদীরা, যাদের স্বভাব-প্রকৃতি ও ইতিহাস সর্বত্রই একইরূপ, মদীনায়ও তারা আরবদের তুলনায় অধিকতর বিত্তবান ও সম্পদশালী ছিল। আরবরা তাদের বেদুঈন প্রকৃতি ও জাতীয় মেজাজের কারণে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বেশি ভাবতে অভ্যস্ত ছিল না যে, এর জন্য ধন-সম্পদ সঞ্চয় করার চিন্তা করবে। সেই সঙ্গে তারা ছিল অত্যন্ত মেহমান নওয়ায তথা অতিথিবৎসল ও দানশীল। এজন্য তারা প্রায়শই ইয়াহূদীদের নিকট হাত পাততে ও ধারকর্জ করতে বাধ্য হত আর এসব ধারকর্জ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুদী ও বন্ধকী ধরনের হত।
মদীনার লোকদের নিকট উট, গাভী ও বকরীও ছিল। জমিতে পানি সেচ দেবার জন্য তারা উট ব্যবহার করত। আর এ ধরনের উটকে الابل النواضح বলা হত। তাদের চারণক্ষেত্রও ছিল। এসব চারণক্ষেত্রের ভিতর সর্বাধিক মশহুর চারণক্ষেত্র ছিল غابة ও زغاية। এখান থেকে লোকে জ্বালানি সংগ্রহ করত এবং পশুপালও চরাত। ঘোড়া তারা যুদ্ধে ব্যবহার করত যদিও তা মক্কার তুলনায় কম পাওয়া যেত। বন্ সুলায়ম ঘোড়ার জন্য খ্যাত ছিল। তারা ঘোড়া বাইরে থেকে আমদানি করত।
মদীনায় কয়েকটি বাজারও ছিল। এ সব বাজারের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বনী কায়নুকার বাজার। এই বাজার ছিল স্বর্ণ-রৌপ্যের গহনা, শিল্পজাত দ্রব্যাদি ও বস্ত্রবাজার হিসাবে বিশেষ খ্যাত। সেই সময় মদীনায় সূতী ও রেশমী কাপড়, রঙীন গালিচা ও নকশাকৃত পর্দা সাধারণভাবে পাওয়া যেত। আতর বিক্রেতারা বিভিন্ন রকমের আতর ও মেশক বিক্রি করত। তেমনি আম্বর ও পারা ব্যবসায়ীও
পাওয়া যেত। ক্রয়-বিক্রয়ের বহুবিধ পন্থার মধ্যে ইসলাম কোন কোনটি বহাল রাখে এবং কতকগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। যেমন নাজাশ ও ইহতিকার (গুদামজাতপূর্বক সংকট সৃষ্টি করত অধিক মূল্যে বিক্রয়), تلقى الركبان (পশুর স্তনে দুধ জমা করত খরিদ্দারকে অধিক দুধের কথা বলে প্রতারণাপূর্বক বিক্রয়),
بيع الحاضر البادى ، بيع النسية (بيع المصراة) بيع المزابنه، بيع المجازفة، مخاضرة – আওস ও খাযরাজ গোত্রের কিছু লোক (ইয়াহূদীদের দেখাদেখি) নিজেরা সুদী কারবার শুরু করেছিল। কিন্তু ইয়াহূদীদের তুলনায় এদের সংখ্যা ছিল খুবই কম।
মদীনার সাংস্কৃতিক জীবনে সেখানকার বাসিন্দাদের মেজাজ ও রুচির কারণে বেশ উন্নতি পরিলক্ষিত হয়ে চলছিল। ফলে সেখানে দ্বিতল গৃহ নির্মাণ শুরু হয়েছিল।
কিছু কিছু ঘরের সঙ্গে পাইন বৃক্ষের বাগানও ছিল। তারা মিষ্টি পানি পানে অভ্যস্ত ছিল। আর এই মিষ্টি সুপেয় পানি তাদেরকে অনেক সময় দূর থেকে আনতে হত। উপবেশনের জন্য চেয়ারও ব্যবহৃত হত। সীসা ও পাথরের পেয়ালা ও আবখুর ব্যবহৃত হত এবং নানা ধরনের চেরাগও ব্যবহৃত হত। ঘর ও ক্ষেত-খামারের কাজে ছোট ঝুড়ি (ঝুড়ি) ও থলি ব্যবহার করা হত। বিত্তবান ও ধনাঢ্য লোক, বিশেষত ইয়াহূদীদের বাড়িতে বেশ আসবাবপত্র পাওয়া যেত। নানা প্রকার গহনাপাতি ব্যবহৃত হত, যেমন কংকন, বায়ুবন্দ, পায়ের মল, খাড়ু, কানবালা, আংটি বা অঙ্গুরী, স্বর্ণ বা যামানী দানার হার প্রভৃতি।
মহিলাদের মধ্যে কাপড় বুনন ও সুতা কাটার ব্যাপক প্রচলন ছিল এবং সেলাই, রঞ্জন করা, পাথর কাটা প্রভৃতি শিল্পের সঙ্গে হিজরতের পূর্ব থেকেই মদীনার লোকেরা পরিচিত ছিল।
ইয়াছরিবের জটিল ও উন্নত সমাজ
এভাবে এ কথা খুব সহজেই বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ও মুহাজিরগণ মক্কা থেকে ইয়াছরিব নামক কোন গ্রাম পানে সফর করেননি, বরং তাঁরা এক শহর
থেকে আরেক শহরের দিকে স্থান ত্যাগ করেছিলেন এবং স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। যদিও দ্বিতীয় শহরটি প্রথম শহরের তুলনায় জীবনের বহু প্রকাশ ও বিকাশের ক্ষেত্রে ভিন্নতর ছিল এবং তুলনামূলকভাবে মক্কা থেকে কিছুটা ক্ষুদ্রতর ছিল। কিন্তু সেখানকার অর্থাৎ ইয়াছরিবের জীবন জটিলতার দিক দিয়ে মক্কার তুলনায় অগ্রসর ছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সামনে আগত সমস্যা ছিল বিভিন্ন ধরনের। কেননা সেখানে কয়েকটি ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতি বর্তমান ছিল যে সবের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং মদীনাকে এক আকীদা-বিশ্বাস ও একই ধর্মের রঙে রঞ্জিত করার কাজ আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত রাসূল (সা)-ই করতে পারতেন যাঁকে আল্লাহ পাক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, মানবতার বিক্ষিপ্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে একত্র করা এবং পরস্পর বিবাদমান শক্তিকে হেদায়াত ও মানবতার পুনর্গঠনের কাজে একে অন্যের مددগ্যারে (মদদগারে) পরিণত করবার অস্বাভাবিক যোগ্যতা দান করেছিলেন এব যাঁকে এক চিত্তাকর্ষক ব্যক্তিত্ব দান করেছিলেন। আল্লাহ তা’আলা কত যথার্থই না বলেছেন :

“যিনি তোমাকে তাঁর সাহায্য ও মু’মিনদের দ্বারা সাহায্য করেছেন, তিনি ওদের হৃদয়ের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন। পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদ ব্যয় করলেও তুমি তাদের হৃদয়ে প্রীতি স্থাপন করতে পারতে না; কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে প্রীতি স্থাপন করেছেন। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (সূরা আনফাল : ৬৩ আয়াত)।