নবুওয়াত লাভের পর
মানবতার সুবহে সাদিক
রাসূলুল্লাহ (সা)-র বয়সের যখন চল্লিশ পূর্তি হল বিশ্ব তখন অনলকুণ্ডের একেবারে প্রান্তসীমায়, বরং এ কথা বলাই অধিকতর সঙ্গত হবে যে, দোরগোড়ায় উপনীত। গোটা মানবগোষ্ঠী দ্রুততার সঙ্গে আত্মহত্যার পথে অগ্রসর হয়েছিল। এটা ছিল সেই নাযুক মুহূর্ত যখন মানবতার ভাগ্যাকাশে ঘটল সুবহে সাদিকের উদয়। শোষিত, বঞ্চিত ও দুর্ভাগা বিশ্বের ভাগ্য আবার জেগে উঠল এবং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আবির্ভাবের মুবারক মুহূর্ত নিকটবর্তী হল। আল্লাহ্র নিয়মও তাই, যখন অন্ধকার ঘনীভূত হয়, মানুষের হৃদয়-মন শক্ত ও মৃতপ্রায় হয়ে যায় তখন তাঁর রহমতের স্নিগ্ধ বসন্ত বাতাস বইতে শুরু করে এবং মানবতার শীতল মৌসুমী বাগে আবার বসন্তের আগমন ঘটে।
দুনিয়াতে তখন মূঢ়তা ও জাহিলিয়াতের রাজত্ব চলছিল। কল্পনার ফানুস ওড়ানো এবং শিরক ও মূর্তি পূজার মহামারী চলছিল সর্বত্র ব্যাপকভাবে। এতদ্দৃষ্টে তাঁর অস্থিরতা সৃষ্টিজগতের ও আসমান-যমীনের স্রষ্টার পথ-নির্দেশনা তথা হেদায়াত ও তাঁর বিধানাবলীর অপেক্ষার চূড়ান্ত সীমায় গিয়ে উপনীত হয়েছিল। মনে হচ্ছিল কোন অদৃশ্য শক্তি ও গায়বী আওয়াজ তাঁকে পরিচালনা করছে, পথ প্রদর্শন করছে এবং সেই বিরাট পদের জন্য তাঁকে প্রস্তুত করছে।
সে সময় একাকিত্ব ও নির্জনতাপ্রিয়তা তাঁর নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। তিনি সকলের থেকে আলাদা হয়ে নিঃসঙ্গ অবস্থানে বিরাট তৃপ্তি পেতেন, শান্তি পেতেন। তিনি মক্কা থেকে বহু দূরে চলে যেতেন, এমন কি শহরের ঘরবাড়িগুলো তাঁর দৃষ্টিসীমা থেকে হারিয়ে যেত। তিনি মক্কার বিভিন্ন ঘাঁটি ও এখানকার উপত্যকাসমূহ যখন অতিক্রম করতেন তখন গাছপালা ও প্রস্তরমালা থেকে আওয়াজ ভেসে আসত, “আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ! হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনার প্রতি সালাম। তিনি ডানে বামে ঘুরে তাকাতেন, কিন্তু গাছপালা ও প্রস্তর খণ্ড ছাড়া আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হত না।”
হেরা গুহায়
বেশির ভাগ সময় তিনি হেরা গুহায় অবস্থান করতেন এবং উপর্যুপরি কয়েক
রাত সেখানেই অতিবাহিত করতেন। এর ইনতেজামও তিনি আগে থেকেই করে নিতেন। এখানে তিনি ইবরাহীম (আ)-এর তরীকায ও সুস্থ প্রকৃতির পথনির্দেশনায় আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন।
নবুওয়াত লাভ
এভাবেই একদা তিনি হেরা গুহায় তাশরীফ আনেন এমন সময় তাঁকে নবুওয়াতের পদমর্যাদা দিয়ে সরফরায করার পবিত্র মুহূর্ত এসে যায়। জন্মের ৪১তম বছরে ১৭ রমযান তারিখের ঘটনা (মুতাবিক ৬ আগস্ট, ৬১০ খৃ.) জাগ্রত ও চেতন্যাবস্থায় সংঘটিত হয়। তাঁর সামনে হেরা গুহায় ফেরেশতা আগমন করেন এবং বলেন : পড়ুন। তিনি উত্তর দিলেন : আমি পড়তে জানি না। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, এরপর ফেরেশতা আমাকে বুকের সঙ্গে জাপটে ধরে এমন জোরে চাপ দিলেন যে, আমি কষ্ট অনুভব করলাম। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন : পড়ুন। আমি বললাম : আমি পড়তে জানি না। এরপর তিনি পুনরায় আমাকে ধরলেন এবং এমন জোরে বুকের সঙ্গে চেপে ধরলেন যে, আমি তাঁর চাপ তীব্রভাবে অনুভব করলাম। অতঃপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন: পড়ুন। আমি বললাম, আমি পড়তে জানি না। তিনি পুনরায় আমাকে ধরে পূর্বের মতোই চাপ দিলেন এবং ছেড়ে দিলেন। বললেন : পড়ুন। আমি পড়লাম :

“পাঠ কর তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক থেকে। পাঠ কর, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না” (সূরা আলাক : ১-৫ আয়াত)।
এটা ছিল নবুওয়াতের প্রথম দিন, পহেলা ওয়াহী ও কুরআনের অংশ।
হযরত খাদীজা (রা)-র ঘরে
রাসূলুল্লাহ (সা) এই আকস্মিক ঘটনায় খুবই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। কেননা এর আগে আর কখনো এমন ধরনের ঘটনা তাঁর সঙ্গে ঘটেনি। আর এ ধরনের কথাও তিনি আর কখনো শোনেন নি। নবুওয়াত ও আম্বিয়া আলাইহিমু’স-সালামের যুগ দীর্ঘকাল হয় গত হয়ে গেছে। অতএব, তিনি বিপদাশঙ্কা করতে লাগলেন এবং নিজের ঘরে ফিরে গেলেন। ভয়ের প্রাবল্যে তাঁর কাঁধ কাঁপছিল। তিনি ঘরে পৌঁছেই হযরত খাদীজা (রা)-কে বললেন : আমাকে ঢেকে দাও, আমাকে ঢেকে দাও, আমাকে ঢেকে দাও। আমার বিপদের আশঙ্কা হচ্ছে।
হযরত খাদীজা (রা) তাঁকে ভয় পাওয়ার ও ভীত হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তিনি তখন সকল ঘটনা বিবৃত করলেন। তিনি একজন বুদ্ধিমতী ও সজাগ সচেতন মহিলা ছিলেন। নবুওয়াত, আম্বিয়া-ই কিরাম ও ফেরেশতাদের সম্পর্কে তিনি অনেক কিছুই শুনে রেখেছিলেন। তিনি তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবন নওফলের নিকট (যিনি খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, আসমানী সহীফাসমূহ অধ্যয়ন করেছিলেন এবং তাওরাত ও ইঞ্জীলের ধারক-বাহকদের সঙ্গে তাঁর উঠাবসা ছিল) কখনো কখনো গমন করতেন এবং মক্কার লোকদের অন্যায় ও অসমীচীন কথাবার্তা ও অভ্যাস পছন্দ করতেন না। আর সেসব কোন সুস্থ ও বিবেকবান মানুষই পছন্দ করবে না।
তিনি তাঁর স্ত্রী ও দিবারাত্রির সঙ্গিনী হিসাবে তাঁর গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছু সম্পর্কে অবহিত হওয়ার কারণে, অধিকন্তু বিশেষ আস্থা ও সম্পর্কের দরুন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উন্নত ও মহান চরিত্র সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত ছিলেন। তাঁর গুণাবলী ও স্বভাব-প্রকৃতি দৃষ্টে হযরত খাদীজা (রা)-র পূর্ণ বিশ্বাস জন্মেছিল যে, আল্লাহ তা’আলার সাহায্য-সমর্থন ও তৌফিক প্রতি মুহূর্তে তাঁর অনুষঙ্গী। তিনি আল্লাহ তা’আলার মনোনীত মকবুল বান্দা এবং তাঁর সীরাত তথা জীবন-চরিতও পছন্দনীয় সীরাত। যেই ব্যক্তি এরূপ আখলাক-চরিত্র, এ রকম জীবন-চরিত ও এমন উন্নত ও পবিত্র স্বভাব-প্রকৃতির অধিকারী হবেন তাঁর ওপর কোন শয়তান,
জিন্ন কিংবা দুষ্ট আত্মার প্রভাব পড়তে পারে না কখনো। এটি আল্লাহ তা’আলার হেকমত, রহমত ও স্নেহ-মমতা থেকে দূরে এবং তাঁর প্রচলিত সুন্নাতের পরিপন্থী। তিনি সুদৃঢ় বিশ্বাস, গভীর আস্থার সঙ্গে ও পূর্ণ শক্তিতে বললেন :
“কখনো নয়। আল্লাহর কসম! আল্লাহ তা’আলা কখনো আপনাকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করবেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অপরের বোঝা বহনপূর্বক তার বোঝা হালকা করেন, অভাবী লোকের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকেন, মেহমানের খাতির-যত্ন ও মেহমানদারী করেন এবং সত্য পথে চলতে গিয়ে তাকলীফ ও বিপদ-মুসীবতে সাহায্য করেন।”
ওয়ারাকা ইবন নওফলের মজলিসে
হযরত খাদীজা (রা) এ কথাগুলো তাঁর সুস্থ প্রকৃতি ও বিশুদ্ধ ফিতরত, অধিকন্তু আপন জীবনের অভিজ্ঞতা ও লোকের সম্পর্কে জানা-শোনার ভিত্তিতে বলেছিলেন। কিন্তু এই ব্যাপারটি ছিল বড় ধরনের এবং এতে এমন কোন লোকের পরামর্শ গ্রহণের প্রয়োজন ছিল যিনি বিভিন্ন ধর্ম ও সে সবের ইতিহাস, নবুওয়াত ও তার মেযাজ, অধিকন্তু কিতাবীদের সম্পর্কে বেশ ভালোভাবে অবহিত, যার নিকট আম্বিয়ায়ে কিরামের ঘটনাবলী ও তাঁদের জ্ঞানের কিছুটা ছিটেফোঁটা হলেও বর্তমান।
তিনি ভাবলেন যে, তাঁর জ্ঞানী ও মনীযী চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবন নওফলের সাহায্য নেয়া দরকার। অনন্তর তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে সাথে নিয়ে তাঁর কাছে গেলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ওয়ারাকাকে সমগ্র ঘটনা বিবৃত করলেন। ওয়ারাকা শুনতেই বলেন : কসম সেই পবিত্র সত্তার যাঁর হাতে আমার জীবন! আপনি এই উম্মতের নবী! আপনার নিকট সেই নামূসে আকবর এসেছিলেন যিনি হযরত মূসা (আ)-র নিকট এসেছিলেন। একদিন আসবে যখন আপনার জাতি ও সম্প্রদায় আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে এবং কষ্ট দেবে, আপনাকে বের করে দেবে, আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করবে। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন এ কথা শুনলেন যে, আপনার জাতি ও সম্প্রদায় আপনাকে বের করে দেবে তখন কিছুটা আশ্চর্য হলেন। কেননা তিনি জানতেন যে, কুরায়শ সমাজ তাঁর অবস্থান ও মর্যাদা সম্পর্কে অবহিত এবং তিনি এও জানতেন যে, তাঁকে সাদিক (সত্যবাদী) ও আমীন (বিশ্বস্ত, আমানতদার) বলতে তাদের মুখে ফেনা উঠে যায়। তিনি বিস্ময়ের সুরে জিজ্ঞেস করলেন, “তারা আমাকে বের করে দেবে!” ওয়ারাকা জওয়াব দিলেন, “হ্যাঁ, আপনি যেই পয়গাম
নিয়ে এসেছেন সেই পয়গাম যখনই অন্য কেউ নিয়ে এসেছেন তখন লোকে তাঁর শত্রুতা সাধনে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে এবং তাঁর সঙ্গে যুদ্ধে নেমেছে। বরাবরই তাই হয়ে এসেছে। আমি যদি সেদিন থাকি আর আমার হায়াতে যদি কুলায় তাহলে সর্বশক্তি দিয়ে আমি আপনাকে সাহায্য করব।”
এরপর অনেক দিন যাবত ওয়াহীর সিলসিলা বন্ধ থাকে। পুনরায় এর ধারা শুরু হয় এবং কুরআন মজীদ নাযিল হতে থাকে।
হযরত খাদীজা (রা)-র ইসলাম গ্রহণ ও তাঁর অবদান
সর্বপ্রথম হযরত খাদীজা (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। দাম্পত্য সূত্রে সম্পর্কিত হবার কারণে তাঁর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমত ও সান্নিধ্য এবং সাহায্য ও সহায়তা প্রদানের বেশ ভাল সুযোগ ছিল। তিনি প্রতিটি মওকায় তাঁর পেছনে দাঁড়ান এবং সহায়তা করেন। লোকে তাঁকে যে কষ্ট দিত তিনি তা হালকা করবার সর্বদাই চেষ্টা পেতেন এবং তাঁকে সাহস যোগাতেন।
হযরত ‘আলী ও যায়দ ইবন হারিছা (রা)-র ইসলাম গ্রহণ
এরপর হযরত ‘আলী ইবন আবী তালিব ইসলাম গ্রহণ করেন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল দশ বছর। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কোলে লালিত-পালিত হয়েছিলেন। পেরেশানী ও দুর্ভিক্ষের আমলে চাচা আবূ তালিবের নিকট থেকে তিনি হযরত ‘আলীকে চেয়ে নিয়েছিলেন এবং আপন পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিলেন। এরপর যায়দ ইবনে হারিছা (যিনি ছিলেন তাঁর গোলাম ও পালক পুত্র) ইসলাম গ্রহণ করেন।
এঁদের ইসলাম গ্রহণ ছিল মূলত এমন সব লোকের সাক্ষ্য যাঁরা ছিলেন তাঁর সর্বাধিক নিকটবর্তী এবং যাঁরা তাঁর সত্যবাদিতা, নিষ্ঠা ও উত্তম চরিত্র সম্পর্কে সর্বাধিক ওয়াকিফহাল এবং পরিবারের লোকদের মত গোপন ও প্রকাশ্য খুঁটিনাটি সকল বিষয় অবহিত ছিলেন।
হযরত আবূ বকর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ এবং ইসলাম প্রচারে তাঁর অংশ
হযরত আবূ বকর ইবন আবী কুহাফার ইসলাম গ্রহণও আদৌ কম গুরুত্বপূর্ণ
ছিল না এজন্য যে, তাঁর প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টি, উন্নত মনোভাব, চারিত্রিক ভারসাম্য ও মধ্যম পন্থার কারণে কুরায়শদের মাঝে একটি বিশেষ মর্যাদার আসনে সমাসীন ছিলেন তিনি। তিনি ইসলামের ঘোষণা দেন এবং তা প্রকাশও করেন। তিনি বিরাট জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব এবং সহজ সরল প্রকৃতির অধিকারী ছিলেন। কুরায়শদের বংশধারা ও তাঁর ইতিহাস সম্পর্কে তিনি ছিলেন অবহিত। একজন উন্নত মানের নৈতিক চরিত্রসম্পন্ন ও সফল ব্যবসায়ী ছিলেন তিনি। অনন্তর তিনি তাঁর আস্থাভাজন ও চেনাজানা লোকদেরকে এবং আশেপাশে অবস্থানকারী ঘনিষ্ঠ লোকদের মাঝে ইসলামের প্রচার শুরু করেন। বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বপ্রথম মুসলমান।
কুরায়শ অভিজাতদের ইসলাম গ্রহণ
হযরত আবূ বকর (রা)-এর দাওয়াত ও তাবলীগে কুরায়শদের বহু নামকরা সর্দার ইসলাম গ্রহণ করেন। এঁদের মধ্যে উছমান ইবন আফফান, যুবায়র ইবনুল-আওয়াম, ‘আবদুর রহমান ইবন ‘আওফ, সা‘দ ইবন আবী ওয়াক্কাস, তালহা ইবন ‘উবায়দুল্লাহ (রা) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। হযরত আবূ বকর (রা) এঁদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে নিয়ে আসেন। তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন।
এঁদের পরই কুরায়শদের আরও অনেক লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। এঁরা সকলেই প্রভূত সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। এঁদের কয়েকজনের নাম আবূ উবায়দা ইবনুল-জাররাহ, আরকাম ইবন আবিল-আরকাম, ‘উছমান ইবন মাজঊন, উবায়দুল্লাহ ইবনুল-হারিছ ইবন আবদিল-মুত্তালিব, সাঈদ ইবন যায়দ, খাব্বাব ইবনুল-আরাত, ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস‘ঊদ, ‘আম্মার ইবন ইয়াসির, সুহায়ব (রা) প্রমুখ (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম ‘আজমা’ঈন)।
এরপর বিপুল সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। গোটা জামা‘আত ও দলকে দল ইসলাম কবুল করত আর এদের মধ্যে পুরুষ যেমন থাকত, তেমনি থাকত নারীরাও, এমন কি একদিন ইসলামের আওয়াজ মক্কার আকাশে-বাতাসে পথে-প্রান্তরে উত্থিত হতে থাকে এবং সর্বত্র এর ব্যাপক আলোচনা ও চর্চা শুরু হয়।
সাফা পর্বতে সত্যের প্রথম ঘোষণা
প্রথম দিকে রাসূলুল্লাহ (সা) দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ গোপনে করতে থাকেন। আর এভাবেই কেটে যায় তিনটি বছর। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে খোলামেলা ও প্রকাশ্যে দাওয়াত প্রদানের নির্দেশ ঘোষিত হয়। ইরশাদ হয়ঃ

“অতএব তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছ তা প্রকাশ্যে প্রচার কর এবং মুশরিকদের উপেক্ষা কর” (সূরা হিজর, ৯৪ আয়াত)।

“তোমার নিকট-আত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দাও আর যারা তোমার অনুসরণ করে সেই সমস্ত মু’মিনের প্রতি বিনয়ী হও” (সূরা শু‘আরা : ২২৪-১৫)।

“এবং বল, আমিতো কেবল এক প্রকাশ্য সতর্ককারী।”
এই নির্দেশ প্রাপ্তির পর রাসূলুল্লাহ (সা) সাফা পর্বতের শীর্ষদেশে আরোহণ করলেন এবং সজোরে ডাক দিলেন : يا صباحاه এই ডাক ছিল আরবদের নিকট অতি পরিচিত। যখন কোন দুশমন কিংবা শত্রুদলের আক্রমণের তাৎক্ষণিক বিপদাশঙ্কা দেখা দিত তখন এই শব্দে ডাক দেওয়া হত। অতএব, এই ডাক শুনতেই কুরায়শদের সকল গোত্র দৌড়ে এসে সাফা পাহাড়ের পাদদেশে সমবেত হল। যারা কোন কারণে আসতে পারল না তারাও তাদের পক্ষ থেকে কাউকে না কাউকে পাঠিয়ে দিল। সে সময় তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন :
“ওহে বনী আবদুল মুত্তালিব! হে ফিহির বংশধর! ওহে বনী কা‘ব! যদি আমি তোমাদেরকে বলি যে, এই পাহাড়ের অপর পাশে একদল শত্রু সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে এবং তোমাদের ওপর হামলার অপেক্ষা করছে তবে কি তোমরা তা বিশ্বাস করবে?”
আরবরা ছিল অত্যন্ত বাস্তববাদী ও কাজের লোক। তারা একটা লোকের ভিতর সত্যবাদিতা, আমানতদারী, বিশ্বস্ততা ও কল্যাণকামিতা বারবার প্রত্যক্ষ করেছে। যখন তারা দেখতে পেল যে, সেই ব্যক্তি (তাঁর সম্পর্কে তখন পর্যন্ত সেটাই ছিল তাদের অভিমত) পর্বতশীর্ষে দাঁড়িয়ে আছে আর পাহাড়ের অপর পাশও সে
দেখতে পাচ্ছে আর তারা দেখছে কেবল তাদের সামনের জিনিস, তখন তাদের মেধা, বুদ্ধিমত্তা, ন্যায়পরায়ণতা এবং উল্লিখিত বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী সংবাদদাতার সংবাদ ও তথ্য পথ দেখাল। তারা সমস্বরে বলল, “হ্যাঁ, আমরা তা বিশ্বাস করব।”
দাওয়াত ও তরবিয়তের সুবিজ্ঞ ধারা
এই প্রকৃতিসম্মত ও প্রাথমিক পর্যায় যখন অতিক্রম করল এবং শ্রোতাদের আস্থা ও বিশ্বাস সম্পর্কে জানতে পারলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : فَإِنِّي نَذِيرٌ لَّكُم بَيْنَ يَدَيْ عَذَابٍ شَدِيدٍ তাহলে জেনে রেখ যে, আমি তোমাদেরকে এক কঠিন শাস্তি সম্পর্কে ভয় দেখাতে এবং সতর্ক ও সাবধান করতে এসেছি যে শাস্তি তোমাদের একবারে সামনে।
এটি ছিল প্রকৃতপক্ষে নবুওয়াত পদের সঠিক সংজ্ঞা ও পরিচয় জ্ঞাপন। অদৃশ্য সত্য ও আল্লাহ্ প্রদত্ত জ্ঞানের ভেতর নবুওয়াতের যে বিশেষত্ব ও অনন্যতা রয়েছে তার বিরাট হেকমত ও সালংকার প্রতিনিধিত্ব যার নজীর আমরা ধর্মসমূহের ও নবুওয়াতের ইতিহাসে পাই না। ঘটনা এই যে, এর থেকে সংক্ষিপ্ত ও সহজ রাস্তা এবং এর চেয়ে বেশি বোধগম্য ও সুস্পষ্ট বর্ণনা আর কিছু হতে পারত না।
একথা শুনতেই সমবেত জনতার ওপর এক ধরনের নীরবতা ছেয়ে গেল। কিন্তু আবূ লাহাব বলে উঠল, গোটা দিনই তোমার জন্য দুঃসংবাদ বয়ে আনুক। কেবল একথা বলার জন্যই কি তুমি আমাদেরকে এখানে ডেকেছিলে?
বর্ণিত পন্থায় রাসূলুল্লাহ (সা) একটি তুলনাহীন পয়গম্বরসুলভ কৌশল ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তাদেরকে এই সত্য ও বাস্তবতা সম্পর্কে সতর্ক করলেন যে, সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু স্বয়ং তাদের ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছে এবং তাদের ঘরেই বসে রয়েছে। আসলে তাকে পরিহার করা এবং তার ক্ষতির হাত থেকে বাঁচা দরকার। কোন পাহাড়-পর্বতের গুহা ও গহ্বর কিংবা কোন পাঁচিলের আড়ালে উপবেশনকারী এবং মোক্ষম মুহূর্তে অতর্কিতে হামলাকারী দুশমনের জানমালের ধ্বংস ও ক্ষতি যা তারা করতে পারে তা এই ধ্বংসাত্মক ও রক্তপিয়াসী দুশমনের মোকাবিলায় কতটুকু মূল্য বহন করে যা তার নিজের ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছে? এই বিশাল সৃষ্টিজগতের স্রষ্টা ও শাসনকর্তা এবং আপন মেহেরবান অনুগ্রহপ্রদাতার সত্তা
ও গুণাবলী, তাঁর হক ও দায়িত্ব-কর্তব্যাদি এবং তাঁর সর্বোত্তম নামসমূহ (আসমাউল হুসনা) থেকে গাফিলতি, প্রকাশ্য শির্ক ও প্রতিমা পূজা, অন্ধভাবে বেপরোয়া হয়ে নফস ও প্রবৃত্তিজাত কামনা-বাসনার গোলামী,াজে ও অদ্ভুত কষ্ট-কল্পনার আনুগত্য, আল্লাহ্ নির্ধারিত সীমারেখা লঙ্ঘন, নিষিদ্ধ ও অবৈধ বস্তু, জুলুম-নিপীড়ন, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকরণ ও অন্যায়-অবিচারের ভেতর আপাদমস্তক নিমজ্জিত থাকা অতর্কিত আক্রমণের আশায় ওঁৎ পেতে বসে থাকা শত্রুদলের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর, কষ্টদায়ক ও বিপজ্জনক যার আশঙ্কায় চোখের ঘুমও পালিয়ে যায় এবং যার এতটুকু সংবাদ মিলতেই সে পাগলের মতই ঘরবাড়ি ছেড়ে দৌড়ে বেরিয়ে যায়।
শত্রুতা আরম্ভ এবং আবু তালিবের প্রতিরোধ ও অপত্য স্নেহ
রাসূলুল্লাহ (সা) যখন প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়া শুরু করলেন এবং নির্ভয়ে ও निःশঙ্ক চিত্তে ইসলামের ঘোষণা দিতে লাগলেন তখন পর্যন্ত তাঁর জাতি এ বিষয়ে বেশি গ্রাহ্য করেনি এবং তেমন ভয়ের কারণও তারা অনুভব করেনি। তারা এই দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করা কিংবা এর জওয়াব দেবার প্রয়োজন মনে করেনি। কিন্তু তিনি যখন তাদের উপাস্য দেবদেবীর নিন্দা করতে শুরু করলেন অমনি তারা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল এবং ঐক্যবদ্ধভাবে তাঁর বিরোধিতায় কোমর বেঁধে নেমে পড়ল।
রাসূলুল্লাহ (সা)-র চাচা আবূ তালিব তাঁকে রক্ষা করতে ঢাল হিসাবে বুক পেতে দিলেন এবং তাঁর সঙ্গে সদয় ও স্নেহপূর্ণ আচরণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) অতঃপর কায়মনে দাওয়াত, তাবলীগে ও সত্যের প্রকাশ্যে ঘোষণায় মগ্ন হয়ে পড়লেন এবং কোনরূপ বাধা-বিঘ্নের প্রতিই আর ভ্রূক্ষেপ করলেন না। অপরদিকে আবূ তালিব তাঁর জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং সর্বপ্রযত্নে তাঁকে রক্ষা করতে লাগলেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) ও আবূ তালিবের কথোপকথন
এখন কুরায়শদের ভেতর চতুর্দিকে ও সর্বক্ষণ রাসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও গুঞ্জন শুরু হল। তারা একে অপরকে তাঁর বিরোধিতায় ও শত্রুতা সাধনে উৎসাহিত করতে লাগল এবং এর জন্য ক্ষেত্র তৈরি করতে লাগল। অনন্তর একদিন তারা দলবদ্ধ হয়ে আবূ তালিবের নিকট গেল এবং তাকে বলল:
“আবূ তালিব! আপনি একজন প্রবীণ ও বয়োবৃদ্ধ মানুষ। আমাদের দৃষ্টিতে
আপনার একটা বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। আমরা এর আগেও আপনার খেদমতে আরয করেছিলাম যে, আপনি আপনার ভাতিজাকে নিষেধ করুন। কিন্তু এ ব্যাপারে আপনি কিছুই করেননি। খোদার কসম করে বলছি- এ যাবত যে ধৈর্যের পরিচয় আমরা দিয়েছি এর চেয়ে বেশি ধৈর্য ধারণ আমরা আর করব না। এখন আমরা আমাদের উপাস্য দেবদেবীগুলোর দোষারোপ করার চেষ্টা আর বেশি দিন বরদাশত করতে পারছি না। হয় আপনি তাঁকে এই প্রয়াস থেকে বিরত রাখুন, অন্যথায় আমরা তাঁর ও আপনার সঙ্গে বোঝাপড়া করব যতক্ষণ না আমাদের কোন এক পক্ষ খতম হয়ে যায়।”
আবূ তালিবের পক্ষে আপন জাতিগোষ্ঠীর বিচ্ছিন্নতা ও শত্রুতা মেনে নেওয়া যেমন কষ্টকর ছিল, তেমনি রাসূলুল্লাহ (সা)-র প্রতি সাহায্য-সমর্থনের প্রসারিত হাত গুটিয়ে নিতেও তিনি রাজি ছিলেন না, সম্মত ছিলেন না তাঁকে শত্রু হস্তে সমর্পণ করতে। তিনি ভাতিজাকে ডেকে আনলেন এবং বললেন, ভাতিজা আমার! তোমার জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা আমার কাছে এসেছিল এবং এ ধরনের কথা বলেছে। এখন আমার দিকেও একটু খেয়াল দাও আর নিজের জানেরও মোয়া কর। আমার ওপর এত বোঝা চাপিয়ে দিও না যা আমি বহন করতে পারব না।
‘যদি ডান হাতে সূর্য ও বাম হাতে চাঁদও দেওয়া হয়’
রাসূলুল্লাহ (সা) এতদশ্রবণে ধারণা করলেন যে, সম্ভবত চাচা আবূ তালিবও এবার তাঁর ব্যাপারে দ্বিধান্বিত ও সংশয়গ্রস্ত। এরপর তিনি আর তাঁর বেশি সাহায্য-সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারবেন না। তিনি বললেন :
“চাচাজান! আল্লাহর কসম, যদি তারা আমার ডান হাতে সূর্য ও বাম হাতে চাঁদও তুলে দেয় আর তারা যদি চায় যে, আমি এই কাজ ছেড়ে দেই তবুও আমি যতক্ষণ এ থেকে বিরত হব না যতক্ষণ না আল্লাহ আমাকে বিজয়ী করেন অথবা এ পথে আমি ধ্বংস হয়ে যাই।”
এ কথা বলতেই রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চোখ মুবারক অশ্রুসিক্ত হয়ে যায়। তিনি কেঁদে ফেলেন। এরপর তিনি উঠে দাঁড়ান এবং গমনোদ্যত হতেই আবূ তালিব তাঁকে ডাকেন এবং বলেন : ভাতিজা! আমার কাছে এস। তিনি কাছে যেতেই বললেন : যাও! তোমার মনে যা চায় বল এবং যেভাবে চাও প্রচার চালিয়ে যাও। আল্লাহর কসম! আমি কখনোই তোমাকে শত্রুর হাতে তুলে দেব না।
কুরায়শগণ কর্তৃক মুসলিম নিপীড়ন
রাসূলুল্লাহ (সা) লোকদেরকে আল্লাহর দিকে পূর্ণ শক্তিতে দাওয়াত দেওয়া শুরু করলেন। কুরায়শরা যখন তাঁর চাচা আবূ তালিবের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেল তখন তাদের সমস্ত রাগ-ক্রোধ গিয়ে পড়ল তাদের গোত্রের সেই সব লোকের ওপর যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং যাঁদেরকে সাহায্য-সমর্থন করবার মত কেউ ছিল না।
প্রতিটি গোত্রই তাদের গোত্রের সেই সব লোকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল যাঁরা ইসলাম কবুল করেছেন। এই সব লোককে বন্দীত্ববরণ, মারপিট, ক্ষুধা-পিপাসা এবং মক্কার ভীষণ গরম ও চোখ ঝলসানো রৌদ্রের তীব্র দাহের কষ্ট সইতে হয়।
হযরত বিলাল হাবশী (রা)-কে ইসলাম কবুলের কারণে তাঁর মনিব উমাইয়্যা ঠিক দুপুরের তপ্ত রৌদ্রে বাইরে নিয়ে আসত, এরপর চিৎ করে শুইয়ে দিয়ে তাঁর বুকের ওপর ভারী পাথর চাপিয়ে দিত। তারপর বলত : আল্লাহর কসম! তোমাকে এই অবস্থায় রাখা হবে যতক্ষণ না তোমার প্রাণ বায়ু বেরিয়ে যায় অথবা তুমি মুহাম্মাদের ধর্ম অস্বীকার কর এবং লাত ও উযযার পূজা পুনরায় শুরু কর। কিন্তু তিনি এই কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুহূর্তেও আল্লাহর ওয়াহদানিয়াতের ঘোষণা প্রদান থেকে বিরত হতেন না এবং বলতেন, “আহাদ! আহাদ”-তিনি এক, একজন।
এ রকম অবস্থায় একবার হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) তাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হযরত বিলাল (রা)-কে এমতাবস্থায় দেখতে পেয়ে তাঁর মনিব উমাইয়্যাকে তদপেক্ষা অধিকতর মজবুত, মোটাসোটা ও কৃষ্ণকায় একজন গোলামের বিনিময়ে তাঁকে (বিলালকে) মুক্ত করে দেন।
বনী মাখযূম আম্মার ইবন ইয়াসির, তাঁর পিতা ও মাতাকে ইসলাম কবুলের অপরাধে বাইরে নিয়ে আসত এবং তাঁদেরকে মক্কার ভীষণ গরম ও তপ্ত রৌদ্রে ফেলে বিভিন্ন রকমের কষ্ট দিত। যদি কখনও রাসূলুল্লাহ (সা) সেদিক দিয়ে যেতেন এবং তাঁদেরকে এ অবস্থায় দেখতে পেতেন তখন বলতেন, “ওহে ইয়াসির পরিবার! একটু সবুর কর। তোমাদের মনযিল তো জান্নাতে”। তাঁর মা হযরত সুমাইয়্যা (রা)-কে মুশরিকরা সেই সময় শহীদও করে দেয়। কেননা তিনি ইসলাম ছাড়া আর সব কিছুকেই অস্বীকার করেছিলেন।
মুস‘আব ইবন ‘উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার উত্তম বসন-ভূষণের অধিকারী একজন যুবক। আরাম-আয়েশ ও বিলাস-বসনের ভেতর তিনি লালিত-পালিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন পিতামাতার অতি আদরের দুলাল। তাঁর মাও ছিলেন একজন ধনবতী মহিলা। মা তাঁকে সর্বদা ভাল ভাল ও দামী কাপড়-চোপড় পরিধান করাতেন। সুগন্ধি দ্রব্যের ব্যবহারে মক্কায় তাঁর কোন জুড়ি ছিল না। খুবই দামী হাদরামী জুতা ব্যবহার করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর কথা বলতে গিয়ে বলতেন যে, মক্কায় মুস‘আব ইবন ‘উমাইর-এর চেয়ে সুন্দর আকৃতি-প্রকৃতি, উত্তম বসন-ভূষণ ও সর্বাধিক বিলাসবয়নে লালিত-পালিত আর কাউকে আমি দেখিনি। মুস‘আব ইবন উমাইর (রা) যখন জানতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) “দারুল আরকাম”-এ ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন তখন তিনিও সেখানে গিয়ে পৌঁছেন এবং ইসলাম কবুল করেন এবং তাঁর নবুওয়াতের সত্যতার সপক্ষে সাক্ষ্য দেন। সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি তাঁর মা ও স্বজাতির ভয়ে এত্য প্রকাশ হতে বিরত থাকেন এবং গোপনে গোপনে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে থাকেন। ‘উছমান ইবন তালহা একবার তাঁকে সালাত আদায়রত অবস্থায় দেখে ফেলেন এবং এ কথা তাঁর মা ও গোত্রের লোকদেরকে জানিয়ে দেন। তারা তাঁকে ধরে নিয়ে যায় এবং বন্দী করে রাখে। আবিসিনিয়ার ১ম হিজরত পর্যন্ত তিনি বন্দী অবস্থায় থাকেন। অতঃপর তিনি সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে আবিসিনিয়াগামী ১ম কাফেলার সঙ্গে হিজরত করেন। এরপর তিনি মুসলমানদের সঙ্গে এমন শান-শওকতের সঙ্গে প্রত্যাবর্তন করেন যে, তাঁর অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল এবং কোমলতা ও প্রাচুর্যের স্থলে অসচ্ছলতা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। তাঁর মা তাঁর এই পরিবর্তনদৃষ্টে তাঁকে অভিশাপ দেওয়া ও ভর্ৎসনা করা থেকে বিরত থাকে।
কিছু সংখ্যক মুসলমান মুশরিকদের আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। এরা ছিল মুশরিক কুরায়শদের প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী সর্দারবৃন্দ। তারা আশ্রিত মুসলমানদের পূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করত। ‘উছমান ইবন মাজ‘উন (রা) ওয়ালীদ ইবন মুগীরের আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। এতে তাঁর মর্যাদাবোধে আঘাত লাগে। তিনি এ অবস্থা মেনে নিতে অসমর্থ হন এবং তার সাহায্য-সমর্থন ও যিম্মাদারী তাকে প্রত্যর্পণ করেন। তিনি বলেন, আমার ইচ্ছা ও অভিলাষ যে, আমি গায়রুল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করব না। এ নিয়ে তাঁর ও অন্য এক মুশরিকের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এতে উক্ত মুশরিক ক্রুদ্ধ হয় এবং তাঁর চোখে এমন জোরে ঘুষি মারে যে, তাঁর দৃষ্টিশক্তি
হারাবার উপক্রম হয়। ওয়ালীদ ইবন মুগীরা কাছে থেকে এই দৃশ্য দেখছিল। সে বলল, আল্লাহর কসম! ভাতিজা আমার, তোমার চোখ এই ব্যথা-বেদনা থেকে মুক্ত ছিল, নিরাপদ ছিল। তুমি এক মজবুত আশ্রয়ে ছিলে (খামাকা তুমি এক বিপদ ডেকে এনেছ)। হযরত ‘উছমান ইবন মাজ‘ঊন (রা) জওয়াব দেন, আল্লাহর কসম! আমার ভাল চোখটিও আকাঙ্ক্ষা করছে তার সাথেও একই ঘটনা ঘটুক। ওহে আবদু’স-শামস! আমি তো তাঁর প্রতিবেশে ও আশ্রয়ে রয়েছি যিনি তোমার চেয়ে বেশি সম্মান ও ক্ষমতার অধিকারী।
হযরত ‘উছমান ইবন ‘আফফান (রা) যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর চাচা হাকাম ইবন আবিল-‘আস ইবন উমায়্যা তাঁকে খুব শক্ত করে বাঁধে, এরপর বলে : তুমি কি তোমার বাপ-দাদার ধর্ম ছেড়ে একটা নতুন ধর্ম গ্রহণ করেছ? আল্লাহর কসম! তোমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত বাঁধনমুক্ত করব না যতক্ষণ না তুমি তোমার এই ধর্ম পরিত্যাগ করবে। হযরত ‘উছমান (রা) বলেন : আল্লাহর কসম! আমি কোনদিন ও কখনও এই ধর্ম পরিত্যাগ করব না। হাকাম যখন ধর্মের ওপর তাঁর এই দৃঢ়তা ও অটুট বিশ্বাস দেখতে পেল তখন সে তাঁকে ছেড়ে দিল।
খাব্বাব ইবনুল-আরাত (রা) বলেন, একদিন কুরায়শ গোত্রের লোকেরা আমাকে ধরে নিয়ে গেল। তারা আগুন জ্বালাল এবং আমাকে টেনে-হিঁচড়ে সেখানে নিয়ে ফেলল। এরপর একজন এসে আমার বুকের ওপর তার পা এভাবে তুলে চেপে ধরল যে, আমার পিঠ মাটির সঙ্গে লেগে গেল। এরপর তিনি পিঠ আলগা করে দেখালেন, দেখতে পেলাম গোটা পিঠটাতেই ধবল কুষ্ঠের মত দাগ পড়ে গেছে।
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে কুরায়শদের শত্রুতার নানা পদ্ধতি
ইসলামের জন্য উৎসর্গীকৃতপ্রাণ এইসব টগবগে যুবা ও তরুণদেরকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে আনার কুরায়শদের সকল প্রয়াস যখন ব্যর্থ হল এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ভেতরেও কোনরূপ নমনীয়তা সৃষ্টি করতে পারল না তখন বিষয়টি ইসলামের শত্রুদের নিকট খুবই অসহনীয় হয়ে উঠল। তারা কিছু অবাচীন ও মাস্তান কিসিমের লোককে তাঁর পেছনে লেলিয়ে দিল। এরা তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে চেষ্টা পেল এবং নানা রকমের কষ্ট ও যন্ত্রণা দিতে শুরু করল। তাঁর প্রতি যাদুকর,
কবি, গণক, মাথা খারাপ ইত্যাদি নানা ধরনের অপবাদ চাপাল। তাঁকে কষ্ট দেবার নিত্য-নতুন কৌশল আবিষ্কার করতে লাগল এবং সব রকমের অস্ত্রই তাঁর ওপর প্রয়োগ করল।
একদিন মক্কার কুরায়শ নেতৃত্ববর্গ হিজ্র-এ সমবেত ছিল। এমন সময় আকস্মিকভাবেই রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেখানে এসে উপস্থিত হলেন এবং তাওয়াফরত অবস্থায় তাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে লক্ষ্য করে কিছু কটূক্তি করল, বিদ্রূপ করল। তিনবার যখন তিনি তাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করলেন তিনবারই তারা তাঁকে নিয়ে হাসি-মস্করা ও ঠাট্টা-বিদ্রূপ করল। শেষে তিনি থামলেন এবং বললেন : কুরায়শ-এর লোকেরা! তোমরা কি শুনতে পাচ্ছ? কসম সেই সত্তার যাঁর কব্জায় আমার জীবন! আমি তোমাদের জন্য ধ্বংস বয়ে এনেছি। তাঁর এই কথায় সবাই এভাবে নিশ্চুপ হয়ে যায় যে, মনে হচ্ছিল কারও ধড়েই বুঝি প্রাণ নেই। এরপর তিনি তাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক ও আত্মীয় সম্পর্কের কথা বলা শুরু করলেন।
দ্বিতীয় দিনেও একই ঘটনা ঘটল। গতকালের লোকেরাই সেখানে ছিল। এমন সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেখানে তশরীফ নিলেন। তারা সকলে এক সঙ্গে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তাঁকে ঘিরে ধরল। এদের একজন তাঁর চাদর ধরে এমন জোরে হেঁচকা টান দিল যে, তা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর গলায় পেঁচিয়ে তাঁর শ্বাস বন্ধ করবার উপক্রম হয়। এ দৃশ্য দেখতেই হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও লোকটির মাঝে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলেন, أَتَقْتُلُونَ رَجُلًا أَن يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ “তোমরা একজন লোককে ‘আমার রব আল্লাহ্’ বলার অপরাধে জানে-প্রাণে মেরে ফেলতে চাও?” এতে তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ছেড়ে দিল বটে, কিন্তু আবূ বকর (রা)-এর দিকে ঘুরে দাঁড়াল এবং তাঁকে প্রহার করতে লাগল।
অবশেষে তারা হযরত আবূ বকর (রা)-এর দাড়ি ধরে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে যায় এবং তিনি এই অবস্থায় বাড়ি গিয়ে পৌঁছান যখন তাঁর মুখ-মাথা ফুলে গিয়েছিল।
একদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বের হলেন। সারা দিনটিই তাঁকে কঠিন কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়। এমন একজনকেও পাওয়া যায়নি যে তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে নি কিংবা কোন রকমের কষ্ট দেয়নি। যখন তিনি ঘরে ফিরলেন কষ্টের তীব্রতায়
চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। এ সময় সূরা মুদ্দাচ্ছিরের প্রথম দিককার কয়েকটি আয়াত নাযিল হয় এবং তাঁকে ياايها المدثر ‘হে বস্ত্রাচ্ছাদিত ব্যক্তি’ বলে সম্বোধন করা হয়।
হযরত আবূ বকর (রা)-এর সঙ্গে কুরায়শ কাফিরদের ব্যবহার
একদিন হযরত আবূ বকর (রা) একটি জনসমাবেশে তাবলীগে দীনের তথা ইসলাম প্রচারের নিয়তে দাঁড়ালেন এবং আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের দাওয়াত দেওয়া শুরু করলেন। কুরায়শরা রাগে ও ক্রোধে বেদিশা হয়ে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং প্রচণ্ড প্রহারে তাঁকে ধরাশায়ী করে ফেলল। উতবা ইবন রবী‘আ এক জোড়া পুরোনো ছেঁড়া জুতো দিয়ে তাঁর চেহারায় এমনভাবে মারতে লাগল যে, সেই আঘাতে চেহারা ফুলে এমন হয়েছিল যে, তাঁকে আর চিনবার উপায় ছিল না।
বনু তামীম হযরত আবূ বকর (রা)-কে মৃতপ্রায় অবস্থায় সেখান থেকে তুলে নিয়ে যায়। তাঁর মৃত্যুর ব্যাপারে কারও মনে কোন সন্দেহ ছিল না। দুপুরের পর তিনি হুশ ফিরে পান। হুশ ফিরে পাবার পর প্রথম শব্দ যা তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়েছিল তা ছিল এই, “আমাকে আগে বল রাসূলুল্লাহ (সা) কেমন আছেন। তিনি ভাল আছেন তো?” এতে তারা হযরত আবূ বকর (রা)-কে ভাল-মন্দ অনেক কিছুই বলেছিল, দেখ, নিজে মরতে বসেছে সেদিকে খেয়াল নেই, অথচ যাঁর জন্য মরতে বসেছে তাঁর দিকে টান ষোলআনা এখনও বর্তমান। সেই মুহূর্তে উম্মু জামীল যিনি ইসলাম কবুল করেছিলেন, তাঁর নিকটবর্তী হন। তিনি তাঁর নিকট রাসূলুল্লাহ (সা)-র কুশলবার্তা জিজ্ঞেস করেন। তিনি তখন বলেন, আপনার আম্মা কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি শুনে ফেলবেন। এতে হযরত আবূ বকর (রা) বললেন, তাঁর সামনে বললে কোন ক্ষতি নেই।
উম্মু জামীল বললেন, তিনি বহাল তবিয়তেই ও সহীহ-সালামতেই আছেন। তিনি বললেন, “আমি আল্লাহর দরবারে মানত মেনেছি যে, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বরকতময় খেদমতে হাজির হতে পারছি ততক্ষণ পর্যন্ত আমি কোন কিছু খাব না, পানও করব না।” কিন্তু তাঁরা দু’জন থেমে গেলেন। এরপর লোকজনের আনাগোনা বন্ধ হল এবং চতুর্দিক যখন নীরব হল তখন তাঁরা উভয়ে হযরত আবূ বকর (রা)-কে ধরে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে নিয়ে আসেন। তাঁর এই অবস্থাদৃষ্টে রাসূলুল্লাহ (সা) খুবই ব্যথিত হন। তিনি হযরত আবূ বকর
(রা)-এর মায়ের জন্য দু‘আ করেন এবং তাঁকে ইসলাম গ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করলে তিনি তন্মুহূর্তেই মুসলমান হয়ে যান।
রাসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে কু-ধারণা সৃষ্টি করতে কুরায়শদের অপপ্রয়াস
কুরায়শরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ব্যাপারে খুবই পেরেশান ছিল। তাদের উপলব্ধিতে আসছিল না যে, তাঁর সম্পর্কে এমন কি বলা যায় দরুন লোকে তাঁর সম্পর্কে খারাপ ধারণা করে এবং তাঁর নিকট যাওয়া থেকে বিরত থাকে। তারা মনেপ্রাণে চাইত যে, যে সমস্ত কাফেলা দূর ও কাছাকাছি এলাকা থেকে আসত, তাঁর পয়গাম শুনত তাদেরকে কোনক্রমে দূরে সরিয়ে দেওয়া ও কাছে ঘেঁষতে না দেওয়া। তারা সকলে মিলে ওয়ালীদ ইবন মুগীরার নিকট গেল (যে তাদের বয়োবৃদ্ধ ছিল আর হজ্ব মরশুমও ছিল সমাগত প্রায়) এবং তার পরামর্শ চাইল। সে বলল, হে কুরায়শ সম্প্রদায়! হজ্ব মরশুম সমাগত প্রায়। এই মরশুমে আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে হজ্ব প্রতিনিধি দল আসবে। তাদের সকলের কানে এ কথা পৌঁছে গেছে। এজন্য এই লোকটি সম্পর্কে এমন কোন সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর যাতে তোমরা পরস্পর মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন না হও। তোমরা সবাই একই কথা বল। অনেকক্ষণ ধরে তারা এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করল এবং বিভিন্ন রকমের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হল। কিন্তু ওয়ালীদ কোন কথাতেই তৃপ্ত হল না। সে সবগুলো প্রস্তাবকেই অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত ঠাওরাল। এবার কুরায়শরা এ ব্যাপারে তার নিজের মতামত কি তা জানতে চাইলে। সে উত্তর দিল যে, আমার ধারণায় সবচে’ মনে ধরার মত কথা হবে এই যে, তোমরা সবাই মিলে তাকে যাদুকর বল। বল যে, মুহাম্মাদ যাদু দেখাতে এসেছে। সে তাঁর যাদু দ্বারা বাপ-বেটা, ভাই-ভাই, স্বামী-স্ত্রী ও পরিবারের লোকদের ভেতর বিভেদ সৃষ্টি করে দেয়।
এই বার্তা নিয়ে তারা সেখান থেকে ফিরল। হজ্ব মরশুম আসতেই এবং কাফেলার আগমন শুরু হতেই এরা সকলে মক্কার বিভিন্ন আগমন-নির্গমন পথে ও সাধারণ সড়ক পথের ওপর গিয়ে বসে পড়ল। সেখান দিয়ে যারাই পথ অতিক্রম করত তারা তাকে রাসূলুল্লাহ (সা)-র নিকট যেতে বাধা দিত এবং পূর্ব স্থিরীকৃত কথার পুনরাবৃত্তি করত।
রাসূলুল্লাহ (সা)-কে কষ্ট প্রদানের ক্ষেত্রে নিষ্ঠুর ও নির্দয় আচরণ
কুরায়শরা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে কষ্ট প্রদানের ক্ষেত্রে নির্দয়তা ও নিষ্ঠুরতার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করল। বিভিন্ন পন্থায় তারা তাঁকে কঠিন থেকে কঠিনতর কষ্ট
দিল। এ ক্ষেত্রে তারা না আত্মীয়তার তোয়াক্কা করল, আর না পরওয়া করল মানবতার।
একবার নবী করীম (সা) মসজিদুল-হারামে সিজদারত ছিলেন। তাঁর কাছাকাছি কুরায়শরা বসেছিল। তাদের ভেতর থেকে উকবা ইবন আবী মু‘ঈত উঠে গিয়ে কোন এক জায়গা থেকে একটা উটের নাড়ীভুঁড়ি এনে তাঁর পিঠের ওপর চাপিয়ে দিল। নাড়ীভুঁড়ির ভারে তিনি সিজদা থেকে মাথা তুলতে পারছিলেন না। এমন সময় খবর পেয়ে কন্যা হযরত ফাতিমা (রা) সেখানে ছুটে এলেন এবং সে সব সরিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে ভারমুক্ত করলেন এবং উক্ত পাষণ্ডকে বদদু‘আ দিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা)ও ঐ সব পাষণ্ডের জন্য বদ দু‘আ করলেন।
হযরত হামযা (রা)-র ইসলাম গ্রহণ
একদিন আবূ জেহেল সাফা পর্বতের পাদদেশে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পাশ দিয়ে কোথাও যাচ্ছিল। সে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে একা দেখতে পেয়ে বেশ গালমন্দ দিল এবং নিপীড়ন করল। তিনি এর কোন উত্তর দিলেন না দেখে সে চলে গেল। অল্পক্ষণ পরই হযরত হামযা তীর-ধনুকসজ্জিত অবস্থায় শিকার থেকে প্রত্যাবর্তন করলেন। তিনি কুরায়শদের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর ও উদ্যমী যুবক হিসেবে বিবেচিত হতেন। তাঁকে আবদুল্লাহ ইবন জাদ‘আনের বাঁদী এই ঘটনা বিবৃত করে। তিনি রাগে-ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে সেই মুহূর্তেই মসজিদুল-হারামে প্রবেশ করলেন। দেখতে পেলেন, আবূ জেহেল তার লোকজনের মাঝে বসে আছে। তিনি তার কাছে গেলেন এবং একেবারে মাথার ওপর দাঁড়িয়ে ধনুক দিয়ে তার মাথায় আঘাত করলেন এবং ভীষণ রকম আহত করলেন। তিনি তাকে বললেন : তোমার এত বড় সাহস যে, তুমি তাঁকে গাল-মন্দ কর ও কটূবাক্য বল। অথচ আমি তাঁরই দীনের ওপর আছি এবং তিনি যা বলে তা আমিও বলি। আবূ জেহেল চুপ করে থাকল। আর হযরত হামযা (রা) ইসলাম কবুল করলেন। তাঁর বীরত্ব, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও মর্যাদার কারণে কুরায়শরা ভীষণ এক চপেটাঘাত পেল।
উতবা ও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পারস্পরিক কথা
কুরায়শরা যখন দেখতে পেল যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সমর্থক সহযোগী ও ঈমানদারদের সংখ্যা প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে তখন উতবা ইবন রবী‘আ এই প্রস্তাব পেশ করল যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-র সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সমঝোতার কোন একটা পন্থা খুঁজে বের করা যাক। সে কুরায়শদের
নিকট অনুমতি চাইল যে, সে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কিছু প্রস্তাব তাঁর সামনে রাখতে চায়। সম্ভবত সে এই প্রস্তাব গ্রহণপূর্বক স্বীয় দাওয়াত ও তাবলীঘ থেকে বিরত থাকবে। কুরায়শরা তাকে অনুমতি দিল এবং তাকে এ ব্যাপারে তাদের প্রতিনিধি নিযুক্ত করল।
উতবা রাসূলুল্লাহ (সা)-র নিকট গেল এবং তাঁর সামনে গিয়ে বসল। তারপর বলল, ভাতিজা! তুমি আমাদের ভেতর যে মর্যাদা ও অবস্থানের অধিকারী তা তুমি জান। তুমি এক ঝগড়া ও গণ্ডগোলের বিষয় তোমার জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে এনে ছড়িয়ে দিয়েছ। তুমি তাদের ঐক্য ও সংহতিকে বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছ। তাদেরকে বেওকুফ ও নাদান ঠাওরেছ। তাদের উপাস্য দেবদেবীগুলোকে ও তাদের ধর্মের ওপর দোষ চাপিয়েছ। তাদের পূর্বপুরুষ ও পিতৃ-পিতামহদের তরীকাকে অস্বীকার করেছ। এখন আমি কয়েকটি কথা তোমার সামনে রাখছি। সম্ভবত এগুলোর মধ্যে কোন একটি তোমার নিকট গ্রহণযোগ্য হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন: আবূল-ওয়ালীদ! তোমার যা বলার অসংকোচে বল। আমি শুনছি।
সে বলল, ভাতিজা আমার! যে তরীকা ও যেই দীন তুমি নিয়ে এসেছ এর পেছনে যদি তোমার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হয়ে থাকে ধন-সম্পদ অর্জন তাহলে আমরা সেই ধন-সম্পদ তোমার জন্য এতটাই জমা করব যে, তুমি হবে আমাদের ভেতর সবচে’ ধনবান। যদি সম্মান ও খ্যাতি অর্জন করতে চাও তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের নেতা হিসাবে মেনে নেব এবং তোমার মর্জির বাইরে কোন ফয়সালা আমরা করব না। যদি বাদশাহী চাও, চাও রাজক্ষমতা তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের বাদশাহ বানাব। আর যদি কোন প্রেতাত্মা ও জিন ইত্যাদির আছরজনিত কারণে এসব হয়ে থাকে আর এর প্রতিরোধক যদি তোমার কাছে না থাকে তাহলে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে পারি এবং এজন্য যত টাকা দরকার আমরা দেদার খরচ করতে পারি যাতে তুমি তার হাত থেকে পরিপূর্ণ সুস্থতা লাভ করতে পার।
উতবার যখন সব কিছু বলা হল তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন: যা কিছু বলার ছিল তা কি বলেছ? সে বলল: হ্যাঁ। তিনি বললেন: তাহলে এবার আমার কথা শোন।
এরপর তিনি সূরা ফুসসিলাত-এর কিছু আয়াত সিজদার আয়াত অবধি তেলাওয়াত করলেন। উতবার কর্ণকুহরে কালামে পাকের আয়াত পৌঁছতেই সে নীরবে তা শুনতে লাগল। তার দুই হাত ছিল পেছনের দিকে ঠেস দেয়া আর তার
কান দু’টো ছিল ঐশী বাণী শ্রবণে একান্তভাবে মগ্ন। রাসূলুল্লাহ (সা) সিজদার আয়াত অবধি পৌঁছতেই সিজদা করলেন। এরপর বললেন : আবূল-ওয়ালীদ! তোমার যা কিছু শোনার ছিল শুনেছ। এখন যা মনে করার কর।
উটবা যখন তার সাথীদের নিকট ফিরে গেল তখন লোকেরা তার চেহারাদৃষ্টে বলতে লাগল, আমরা কসম খেয়ে বলছি যে, আবূল-ওয়ালীদ যেই চেহারা নিয়ে গিয়েছিল এই চেহারা তার থেকে ভিন্ন। সে বসতেই লোকেরা তাকে জেঁকে ধরে জিজ্ঞেস করল : আবূল-ওয়ালীদ! খবর কি? কি সংবাদ নিয়ে এসেছ? উটবা বলল, “খবর এই যে, আমি তাঁর মুখে এমন এক কালাম শুনেছি যা এর আগে আর কখনো শুনিনি। আল্লাহর কসম করে বলছি, হে কুরায়শগণ! এ কালাম কাব্য নয়, যাদু নয়, গণনাবিদ্যা নয় আর না জ্যোতির্বিদ্যা। আমার কথা শোন এবং ঐ লোকটাকে তাঁর অবস্থার ওপর ছেড়ে দাও।” একথা বলতেই তারা উটবাকে গালমন্দ দেওয়া শুরু করল। তারা আরও বলল, মুহাম্মাদের যাদু, আল্লাহর কসম, দেখছি তোমাকেও গ্রাস করেছে।
উটবা বলল: আমার অভিমত আমি তোমাদেরকে বললাম। এখন তোমাদের যেমন অভিরুচি, যা খুশী করতে পার।
আবিসিনিয়া অভিমুখে মুসলমানদের হিজরত
রাসূলুল্লাহ (সা) যখন দেখতে পেলেন যে, তাঁর সাহাবাগণ তথা সঙ্গী-সাথীদেরকে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হচ্ছে এবং তিনি তাঁদের হেফাজত ও প্রতিরোধ করতে পারছেন না তখন তিনি তাঁদেরকে বললেন : যদি তোমরা চাও তবে আবিসিনিয়ার দিকে বেরিয়ে গেলে ভাল হবে। সেখানকার যিনি বাদশাহ তাঁর জন্য কেউ কারুর ওপর জুলুম করে না। দেশটা খুব ভাল। যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ তোমাদের জন্য মুক্তির ও প্রশস্ততার অন্য কোন ব্যবস্থা করছেন এটাই তোমাদের জন্য ভাল হবে।
এই সময় মুসলমানদের একটি দল আবিসিনিয়ার দিকে হিজরত করল। ইসলামে এটাই ছিল প্রথম হিজরত। এই দলে ছিল দশজন মুসলিম। দলের আমীর নিযুক্ত হয়েছিলেন হযরত ‘উছমান ইবন মাজ‘ঊন (রা)। এরপর জা‘ফর ইবন আবী তালিব (রা) হিজরত করেন। এরপর একে একে অনেক মুসলমানই সেখানে গিয়ে পৌঁছান। এঁদের ভেতর কেউ ছিলেন একাকী এবং কেউ কেউ পরিবার-পরিজনসহ হিজরত করেছিলেন। এসব লোক যাঁরা আবিসিনিয়া পানে হিজরত করেছিলেন তাঁদের মোট সংখ্যা ৮৩ জন ছিল বলে কথিত।
আবিসিনিয়া অভিমুখে হিজরতের পেছনে কুরায়শদের অত্যাচার-নিপীড়নের হাত থেকে মুক্তি পাওয়াই একমাত্র লক্ষ্য ছিল না, বরং বিদেশ-বিভুঁইয়ে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া, সেই সঙ্গে নবী করীম (সা)-এর দুশ্চিন্তার লাঘবও এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।
মুহাজিরদের তালিকা পর্যালোচনা করলে এর পরিধির বিশালতা ও বৈচিত্র্যের পরিমাপ করা যায় এবং জানা যায় যে, এই তালিকায় সমাজের সর্বশ্রেণীর ও সর্বস্তরের প্রতিনিধিত্ব ছিল। এ দলে আমীর যেমন দেখা যায়, তেমনি দেখা যায় ফকীরকেও। বৃদ্ধ যেমন দৃষ্টিগোচর হয়, তেমনি দৃষ্টিগোচর হয় যুবকও। পুরুষ যেমন, তেমনি নারীও এ তালিকায় স্থান পেয়েছে। আর এঁদের অধিকাংশেরই সম্পর্ক ছিল মক্কার বনেদী ও প্রাচীন খানদানগুলোর সঙ্গে যাদ্ধারাইসলামের দাওয়াতের বিরাট প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া এবং এর শক্তি ও বিশালতা সম্পর্কে জানা যায়।
কুরায়শদের পশ্চাদ্ধাবন
কুরায়শরা যখন দেখতে পেল যে, মুসলমানরা সেখানে পৌঁছে গেছে এবং আরাম ও প্রশান্তির সঙ্গে রয়েছে তখন তারা আবদুল্লাহ ইবন আবী রবী‘আ ও ‘আমর ইবনুল-‘আস ইবন ওয়াইলকে সেখানে পাঠায় এবং তাদের সঙ্গে সম্রাট নাজাশী, যুদ্ধবাজ সর্দার ও সিপাহসালারদের জন্য এমন বহু উপহার-উপঢৌকনও পাঠায় যেগুলো কে মক্কার বিশেষ সওगात মনে করা হত। এরা দু’জন সম্রাট নাজাশীর দরবারে গিয়ে উপস্থিত হয় এবং সম্রাটের সিপাহসালার ও সর্দারদেরকে নানা রকমের উপহার পেশ করে তাদের অনুকূলে টেনে নেয়। সম্রাটের দরবারে এ দু’জন কুরায়শ প্রতিনিধি এভাবে তাদের আলোচনার সূত্রপাত করে :
“মহানubhav সম্রাটের রাজ্যে আমাদের দেশের কিছু বেওকুফ যুবা ও তরুণ এসে আশ্রয় নিয়েছে। এরা তাদের ধর্ম পরিত্যাগ করেছে, অথচ তারা আপনার ধর্মও কবুল করেনি, বরং এরা এক নতুন ধর্ম আবিষ্কার করেছে, যে ধর্ম না আমরা চিনি আর না আপনারা চেনেন। আমাদেরকে আপনার নিকট তাদের সম্প্রদায়ের কিছু নেতৃস্থানীয় ও দায়িত্বশীল লোক (যারা তাদেরই বাপ-চাচা ও নিকটাত্মীয়) পাঠিয়েছেন যাতে আপনি তাদের ছেলে-সন্তানদেরকে ফেরত পাঠিয়ে দেন। কেননা এদের ব্যাপারে তারাই বেশি ভাল জানে এবং তারাই এদের আপনজন।”
সম্রাটের চারপাশে যেসব সর্দার ছিল তারা সকলেই একবাক্যে বলে উঠল, “মহানubhav সম্রাট! এরা দু’জন ঠিকই বলছেন। আপনি তাদেরকে ওদের
দু’জনের হাতে তুলে দিন।” নাজাশী তাদের এ্ববিধ কথায় খুবই ক্রোধান্বিত হন এবং তাদের কথা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। যারা তাঁর মহানুভবতার ছায়াতলে আশ্রয় নিতে এসেছে তাদেরকে এভাবে বন্ধুহীন ও স্বজনহীন অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া তিনি পছন্দ করেননি। তিনি এ ব্যাপারে শপথও করেন এবং মুসলমানদের ডেকে পাঠিয়ে খৃষ্টান পাদ্রীদেরকে একত্র করেন এবং মুসলমানদের দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “তোমাদের সেই ধর্ম কি যার জন্য তোমরা তোমাদের দেশ ও জাতি পরিত্যাগ করেছ এবং পরিত্যাগের পর তোমরা না আমার ধর্ম গ্রহণ করেছ, আর না অন্য কোন পরিচিত ধর্ম কবুল করেছ?”
জা‘ফর ইবন আবী তালিব (রা)-এর ভাষণ : জাহিলিয়াতের পর্দা উন্মোচন ও ইসলামের পরিচিতি পেশ
তখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পিতৃব্য পুত্র জা‘ফর ইবন আবী তালিব (রা) দাঁড়ান এবং নিম্নোক্ত বক্তব্য পেশ করেন :
“হে রাজন! আমরা ছিলাম এক জাহিল কওম। আমরা মূর্তিপূজা করতাম। মৃত জীব ভক্ষণ করতাম। সর্বপ্রকার নির্লজ্জতা, অশ্লীলতা ও পাপে আমরা ছিলাম লিপ্ত। আমাদের মধ্যে যারা সবল ও শক্তিশালী তারা দুর্বল ও কমযোর লোকদের ছিঁড়ে খেতাম। আমরা এ রকম অবস্থায় ছিলাম। এমন সময় আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরই মধ্যে থেকে একজনকে রাসূল হিসেবে পাঠালেন যাঁর খানদান বংশমর্যাদায় ও কৌলিন্যে শ্রেষ্ঠ, যাঁর সত্যবাদিতা, আমানতদারী, সৎচরিত্র ও পবিত্রতা সম্পর্কে আমরা আগে থেকেই জানতাম। তিনি আমাদেরকে দাওয়াত দিলেন এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনতে এবং কেবল তাঁরই ইবাদত-বন্দেগী করতে। তিনি আহ্বান জানালেন আমরা ও আমাদের বাপ-দাদা যেসব মূর্তি ও পাথরের পূজা করতেন সেগুলোকে একেবারে ছেড়ে দিতে এবং সে সবের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করতে। তিনি আমাদেরকে সত্য কথা বলতে, আমানত আদায় করতে, আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখতে, প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করতে, নাজাযেয ও হারাম কথাবার্তা ও না-হক খুন-খারাবী ত্যাগ করে চলতে নির্দেশ দেন। নির্লজ্জ ও অশ্লীল কাজ, মিথ্যা, ধোঁকা ও প্রতারণা, ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ, সতী-সাধ্বী ও পবিত্রা রমণীদের চরিত্রে অপবাদ আরোপ করতে তিনি নিষেধ করেন। তিনি আমাদেরকে নির্দেশ দেন যেন আমরা কেবল এক আল্লাহর ইবাদত করি এবং তাঁর সাথে অপর কাউকে শরীক না করি। তিনি আমাদেরকে সালাত, সওম ও যাকাতের নির্দেশ দেন (এ সময় তিনি ইসলামের অন্যান্য আরকানের
বর্ণনাও দেন)। আমরা তাঁকে সত্য বলে মেনেছি, তাঁর ওপর ঈমান এনেছি এবং যেসব তরীকা ও শিক্ষামালা তিনি আল্লাহর নিকট থেকে নিয়ে এসেছেন আমরা তার আনুগত্য করি, করি অনুসরণ। আমরা কেবল এক আল্লাহর ইবাদত করি, তাঁর সঙ্গে অপর কাউকে শরীক করি না। তিনি যা হারাম করেছেন আমরা তা হারাম জেনেছি এবং তিনি যা হালাল করেছেন তা হালাল হিসেবে মেনে নিয়েছি। এতে আমাদের জাতিগোষ্ঠী আমাদের শত্রুতা সাধনে কোমর বেঁধে নেমে পড়ে। তারা আমাদেরকে নানা রকমের কষ্ট দেয় এবং আমাদেরকে তাঁর প্রচারিত দীন থেকে বিচ্যুত করবার জন্য বিভিন্ন রূপ পরীক্ষার মাঝে নিক্ষেপ করে। তারা আরও চেষ্টা চালায় যেন আমরা আল্লাহর ইবাদত পরিত্যাগ করি, পুনরায় মূর্তি পূজা শুরু করি এবং যেই সব গোনাহ ও পাপ কাজকে প্রথমে বৈধ মনে করতাম পুনরায় তা বৈধ ও হালাল মনে করি।
“যখন তারা আমাদের সঙ্গে জোর-জবরদস্তি করা শুরু করল, আমাদের ওপর জুলুম করল, আমাদের বেঁচে থাকাকে অসম্ভব করে তুলল, আমাদের ধর্মের পথে পর্বতসম বাধা হয়ে দাঁড়াল তখন আমরা আশ্রয় গ্রহণ মানসে আপনার রাজ্যে আসি এবং এজন্য আপনাকেই আমরা নির্বাচিত করি। আপনার প্রতিবেশ ও আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষী হই। হে রাজন! আমরা এখানে এই আশায় এসেছি যে, এখানে আমাদের ওপর কোন জুলুম হবে না।”
নাজাশী এই গোটা বক্তৃতা পূর্ণ নীরবতা ও গাম্ভীর্যের সঙ্গে শুনলেন এবং বললেন তোমাদের নবী আল্লাহর কাছ থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন তার কিছু কি তোমাদের কাছে আছে? হযরত জা‘ফর (রা) উত্তর দিলেন : হ্যাঁ! আছে। নাজাশী বললেন : আমাকে তা পাঠ করে শোনাও।
হযরত জা‘ফর (রা) সূরা মারয়ামের প্রথম দিকের আয়াতগুলো তেলাওয়াত করলেন। তেলাওয়াত শুনে নাজাশী কেঁদে ফেললেন এবং চোখের পানিতে তাঁর দাড়ি পর্যন্ত ভিজে যায়। সম্রাটের দরবারের পাদ্রীরা পর্যন্ত কাঁদতে থাকেন। এমন কি তাঁদের ধর্মীয় পুস্তক অবধি চোখের পানিতে ভিজে যায়।
হযরত জা‘ফর (রা)-এর হেকমত ও অলংকারময় বক্তব্য
আবিসিনিয়া অধিপতি নাজাশীর সামনে হযরত জা‘ফর ইবন আবী তালিব (রা)-এর বক্তৃতা ও ইসলামের দাওয়াত তার হেকমত, স্থান-কালের রে‘আয়েত ও মানুষের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে অবগতির চিত্তাকর্ষক নমুনা। এ থেকে শাব্দিক অলংকারিতা অপেক্ষাও বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক অলংকারিতা প্রকাশ পায় যাকে ঐশী
পথ-নির্দেশনা (রব্বানী হেদায়াত) ও গায়েবী মদদ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। উপরন্তু এই বক্তৃতা থেকে হযরত জা‘ফর (রা)-এর শান্ত প্রকৃতি ও দূরদর্শিতাও পরিচয় পাওয়া যায় যে ক্ষেত্রে বনু হাশিম কুরায়শদের ওপর এবং কুরায়শ গোত্র সমগ্র আরবের ওপর অগ্রগামী ছিল। হযরত জা‘ফর (রা) তাঁর বক্তৃতাকে আরব জাহিলিয়াতের অবস্থা পেশ করা এবং একথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-কে আল্লাহ তা‘আলা রাসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন, মানুষকে তিনি আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছেন এবং দীনে হক-এর দাওয়াত ও সর্বোত্তম চরিত্রের তা‘লীম দিয়েছেন। যে সব লোক তাঁর ওপর ঈমান এনেছে তাদের জীবনে বিরাট বিপ্লব সাধিত হয়েছে। এটা অবস্থার এমন বিশ্লেষণ ও চিত্রাংকন যা একটি আত্মজীবনীর মর্যাদা রাখে এবং যার বর্ণনাকারীর সত্যতার ক্ষেত্রে সন্দেহ বা সংশয়ের আদৌ অবকাশ নেই। বিজ্ঞসুলভ দাওয়াত ও বর্ণনা প্রকৃত সত্যের এমন একটি পন্থা বা পদ্ধতি যা উপস্থাপনকারীর জন্য না বিপদ সৃষ্টিকারী আর না সংশয় সৃষ্টিকারী, না বিরোধিতাকারী ও আপত্তি উত্থাপনকারীকে আহত করে এবং না শ্রোতাকে বিরোধিতা করার জন্য উৎসাহিত করার সুযোগ দেয়। এটি এমন একটি ব্যাপার যা ঘটনা ও একটি সমাজের সত্যিকার কাহিনী যার মধ্যে একজন নবীর দাওয়াত ও তা‘লীম গ্রহণকারীকে মানবতার নিম্নতম অবস্থা থেকে উঠিয়ে উচ্চতম সোপানে পৌঁছে দিয়েছে। এখন যার ইচ্ছা সে এটাকে পরীক্ষা করে দেখুক এবং এই বৈপ্লবিক অবস্থা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করুক।
কুরায়শ প্রতিনিধি দলের ব্যর্থতা
নাজাশী (বক্তৃতা শ্রবণান্তে) বললেন, নিঃসন্দেহে এটি এবং যা কিছু হযরত ‘ঈসা (আ) নিয়ে এসেছিলেন একই আলোক-রশ্মি থেকে উৎসারিত। অতঃপর তিনি কুরায়শ দূতদ্বয়ের দিকে মনোনিবেশ করলেন এবং বললেন : তোমরা এখান থেকে চলে যাও। আল্লাহর কসম! আমি কখনো এদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দেব না।
এবার ‘আম্র ইবনুল-‘আস তার তুণীরের শেষ তীরটি নিক্ষেপ করল। তীরটি ছিল বিষমাখা। সে বলল : মহান সম্রাট! এরা হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে এমন সব কথা বলে যা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করাও মুশকিল।
মুসলমানদের লক্ষ করে সম্রাট নাজাশী জিজ্ঞেস করলেন : তোমরা হযরত মসীহ (আ) সম্পর্কে কী বলে থাক?
হযরত জা‘ফর ইবন আবী তালিব (রা) উত্তরে জানালেন : আমরা তাঁর সম্পর্কে
সেই সব কথাই বলি যা আমাদের নবী (সা) আমাদেরকে শিখিয়েছেন। আর তা হল, তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল এবং তিনি তাঁর রূহ ও তাঁর বাক্য (কালেমা) যা তিনি কুমারী ও পবিত্রা মারয়ামের ওপর নিক্ষেপ করেছিলেন। এতদশ্রবণে তিনি তাঁর হাত দিয়ে মাটি থেকে একটি খড় তুলে বললেন : আল্লাহর কসম! যা কিছু তোমরা বললে হযরত ঈসা (আ) এর থেকে এই খড়ের তুল্যও বেশি নন।
এরপর সম্রাট মুসলমানদের অবস্থান সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে মঞ্জুর করেন এবং তাদেরকে নিরাপত্তা ও অভয় দান করেন। কুরায়শ দূতদ্বয় অত্যন্ত লজ্জিত ও অপমানিত হয়ে সেখান থেকে বহিষ্কৃত হল আর মুসলমানরা অত্যন্ত উত্তম আবাস ও ভাল পরিবেশে সম্মানজনক স্থান লাভ করল।
মুসলমানদের কৃতজ্ঞতাবোধের প্রেরণা
সেই যুগেই নাজাশীর জনৈক দুশমন তাঁর রাজ্যে হামলা চালায়। মুহাজির মুসলমানদের সম্পর্কে সম্রাট নাজাশীর প্রশংসনীয় ভূমিকা এবং তাঁর সদয় ব্যবহারের উত্তরে মুসলমানগণ সম্রাটকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করেন যা ছিল ইসলামের নৈতিক শিক্ষামালা মাফিক ও মুসলমানদের চরিত্র উপযোগী।
আবিসিনিয়ায় দীনের দাওয়াত ও ইসলামের পরিচিতি পেশ
আবিসিনিয়া অভিমুখে মুসলমানদের হিজরত নবুওয়াতের ৫ম বর্ষে অনুষ্ঠিত হয়। হযরত জা‘ফর ইবন আবী তালিব (রা) তাঁর সঙ্গী-সাথীদেরকে নিয়ে হিজরী ৭ম বর্ষ পর্যন্ত এখানে থাকেন এবং খায়বার যুদ্ধের সময় তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা)-র খেদমতে উপস্থিত হন। এভাবে তাঁরা পনের বছর আবিসিনিয়ায় থাকেন। এ এক দীর্ঘ সময় যা থেকে হযরত জা‘ফর ইবন আবী তালিব (রা) ইসলামের দাওয়াতের ধারাবাহিকতায় অবশ্যই ফায়দা লাভ করে থাকবেন। যেহেতু দেশটি অপরাপর খৃষ্টান দেশের মোকাবিলায় উদারতা, সহিষ্ণুতা ও নিপীড়িত মজলুমদেরকে আশ্রয় দানের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল এবং শাসক তাঁর ন্যায়বিচার ও মানবতাবোধের জন্য পরিচিত ছিলেন, কিন্তু ঐ যুগ ঘটনার বিস্তৃত ও লিখিত বিবরণ ধরে রাখার যুগ ছিল না বিধায় এর সপক্ষে প্রমাণ হিসেবে যদিও আমাদের নিকট ঐতিহাসিক ও পুঁথিগত দলীল-দস্তাবেজ নেই, কিন্তু অনুমান করা চলে যে, তাঁর এই দীর্ঘ প্রবাস জীবনের অবস্থান থেকে (যার পেছনে অন্য কোন পার্থিব ফায়দা লাভ
লক্ষ্য ছিল না) দীনের দাওয়াত ও ইসলামের পরিচিতি পেশের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে থাকবেন।
হযরত ওমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা ওমর ইবনুল-খাত্তাব (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের সাহায্য-সমর্থনের অদৃশ্য উপকরণ সরবরাহ করেন। ওমর কুরায়শ গোত্রের একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন ভীতিকর ও প্রভাবমণ্ডিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী বীর পুরুষ। রাসূলুল্লাহ (সা)-র একান্ত অভিলাষ ছিল তিনি মুসলমান হন। এজন্য তিনি দু‘আও করতেন।
তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা এই যে, তাঁর বোন খাত্তাব কন্যা ফাতেমা (রা) ইসলাম কবুল করেছিলেন এবং তারপর তাঁর স্বামী সাঈদ ইবন যায়দ (রা)-ও ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁদের দু’জনের কেউই হযরত ওমরের ভীতিকর ব্যক্তিত্বের কারণে, অধিকন্তু ইসলাম ও মুসলমানদের সঙ্গে তাঁর কঠোর আচরণের দরুন তখন পর্যন্ত তাঁদের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেননি। খাব্বাব ইবনুল-আরাত (রা) ফাতেমাকে কুরআন শরীফ পড়াতেন।
হযরত ওমর (তখনও তিনি মুসলমান হননি) একবার তলোয়ার ঝুলিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাহাবায়ে কিরামের সন্ধানে বের হলেন। তিনি জানতে পেরেছিলেন যে, এই সময় তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ সাফা পাহাড়ের নিকটবর্তী কোন বাড়িতে সমবেত হয়েছেন। পথিমধ্যে তিনি নঈম ইবন ‘আবদুল্লাহর দেখা পান যিনি তাঁরই গোত্র বনী ‘আদীর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : ওমর! কোথায় যাচ্ছ? তিনি বললেন : (আল্লাহ্র পানাহ চাই) মুহাম্মাদ (সা)-এর ফয়সালা করতে চলেছি যিনি ধর্মচ্যুত হয়ে গেছেন, কুরায়শদের পারস্পরিক ঐক্য ও সংহতিকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দিয়েছেন, তাদেরকে জাহেল ও বেওকুফ প্রতিপন্ন করেছেন, তাদের ধর্মে দোষারোপ করছেন, তাদের উপাস্য দেবদেবীগুলোকে গালি দিয়েছেন। আজ তাঁর কিস্সাই খতম করতে চাই।
নঈম বললেন : ওমর! জানি না তুমি কোন্ ধোঁকায় পড়েছ। আগে নিজের ঘরের খোঁজ নাও। প্রথমে নিজের ঘর ঠিক কর।
ওমর বললেন : আমার ঘরের খবর! কেন, আমার ঘরে কি হয়েছে?
তিনি উত্তর দিলেন : তোমার ভগ্নিপতি, চাচাতো ভাই সাঈদ ইবন যায়দ ও তোমার বোন ফাতেমা দু’জনেই মুসলমান হয়েছে এবং মুহাম্মাদের ধর্ম কবুল
করেছে, তার খবর রাখ? আগে তাদের খোঁজ নাও (তারপর অন্যের খবর নিতে যেও)।
ওমর তখন বোন ও ভগ্নিপতির বাড়ীর পথ ধরলেন। সে সময় তাঁদের নিকট হযরত খাব্বাব ইবনুল-আরাত (রা) বসা ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল কুরআানুল-করীমের সূরা তা-হা-র লিখিত একটি অংশ। তিনি তাঁদের উভয়কে এটি পড়াচ্ছিলেন। ওমরের পায়ের আওয়াজ পেতেই হযরত খাব্বাব (রা) ঘরের ভিতরের একটি কামরায় গিয়ে লুকিয়ে পড়লেন। হযরত ফাতেমা জলদী লিখিত সূরার অংশটুকু উরুর নিচে লুকিয়ে ফেললেন। কিন্তু ওমর খাব্বাব ইবনুল-আরাত (রা)-এর তেলাওয়াতের শব্দ আগেই শুনে ফেলেছিলেন। তিনি ভেতরে প্রবেশ করতেই জিজ্ঞেস করলেন: বাড়ীতে ঢুকতেই কি সব যেন শুনতে পেলাম! ঘরে তোমরা কি করছিলে? তাঁরা উভয়ে বললেন: তুমি কিছু শুনতে পেয়েছ বুঝি? ওমর বললেন: হ্যাঁ, শুনেছি আর এও শুনেছি যে, তোমরা দু’জনেই মুহাম্মাদের ধর্ম কবুল করেছ। এই বলে তিনি ভগ্নিপতি হযরত সাঈদ ইবন যায়দ (রা)-এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং তাঁকে মারতে শুরু করলেন। হযরত ফাতেমা (রা) স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেও ভাইয়ের হাতে প্রহৃত ও আহত হলেন।
এবার তাঁরা উভয়ে স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করলেন এবং বললেন: ওমর! তুমি যা শুনেছ ও যা জেনেছ তা সত্য। হ্যাঁ, আমরা মুসলমান হয়েছি এবং আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের ওপর ঈমান এনেছি। এখন তোমার যা করার করতে পার।
বোনের রক্তাক্ত শরীরের দিকে তাকাতেই ওমরের উত্তেজনায় ভাটা পড়ল এবং আপন কৃতকর্মের দরুন লজ্জিত হলেন। তিনি থামলেন, তারপর বললেন: কিছুক্ষণ আগে তোমরা যা পড়ছিলে তা আমাকে দাও, আমি দেখতে চাই মুহাম্মাদ তোমাদেরকে কি শেখান। ওমর লেখাপড়া জানতেন। তাঁর মুখে একথা শুনতেই বোন ফাতেমা বললেন: ওমর! আমাদের ভয় হচ্ছে তুমি এর সঙ্গে কোন বেয়াদবী না করে বস। তিনি বললেন: তোমরা ভয় পেয়ো না, নিশ্চিন্তে থাকতে পার। তিনি কসম খেয়ে তাঁদের আশঙ্কা দূর করলেন এবং তাঁদেরকে আশ্বস্ত করলেন। তাঁর এ ধরনের কথাবার্তায় বোন ফাতেমা আশান্বিত হলেন যে, সম্ভবত ওমর ইসলাম কবুল করবেন। তিনি নম্র ভাষায় বললেন: ভাইজান! শির্ক-এ লিপ্ত থাকার দরুন আপনি নাপাক ও অপবিত্র। এই সহীফা কেবল পাক-পবিত্র মানুষই স্পর্শ করতে পারে।
ওমর উঠলেন, গিয়ে গোসল করলেন। তখন বোন ফাতেমা কুরআনের অংশটুকু ভাইয়ের হাতে তুলে দিলেন। সূরা তা-হা পড়া শুরু করে কিছু দূর অগ্রসর হতেই ওমর বলে ওঠেন : কী পবিত্র ও সম্মানিত কালাম!
হযরত খাব্বাব (রা) একথা শুনতেই গোপন কামরা থেকে বেরিয়ে এলেন এবং ওমরকে লক্ষ্য করে বললেন : ওমর! আল্লাহর কসম, আমার আশা ছিল যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীর দাওয়াত দ্বারা আপনাকে অবশ্যই ধন্য ও অনুগৃহীত করবেন। কেননা গতকালই আমি হূযূর আকরাম (সা)কে এই দু‘আ করতে শুনেছি, হে আল্লাহ! আবূল-হাকাম ইবন হিশাম (আবূ জাহল) কিংবা ওমর ইবনুল-খাত্তাবের মাধ্যমে ইসলামকে সাহায্য কর। হে ওমর! এখন তো তোমার কিছুটা আল্লাহর ভয় ও লজ্জা-শরমের খেয়াল করা উচিত।
তখন ওমর বললেন : খাব্বাব! আমাকে মুহাম্মাদ (সা)-এর কাছে নিয়ে চল। আমি ইসলাম কবুল করতে চাই। হযরত খাব্বাব (রা) বললেন : তিনি এখন সাফা পাহাড়ের কাছাকাছি একটি ঘরে আছেন। তাঁর সঙ্গে আরও অনেক সাথী আছেন। হযরত ওমর (রা) তলোয়ার কোষবদ্ধ করলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-র সঙ্গে সাক্ষাৎ এর উদ্দেশ্যে সাফা অভিমুখে ধাবিত হলেন। তিনি ঘরে গিয়ে টোকা দিলেন। দরজায় টোকা পড়তেই একজন সাহাবী দাঁড়ালেন এবং দরজা পথে উঁকি দিয়ে দেখে নিশ্চিত হতে চাইলেন। দেখতে পেলেন, ওমর তলোয়ারসহ দ্বারদেশে দণ্ডায়মান। তিনি ঘাবড়ে গেলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-র কাছে গিয়ে বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! খাত্তাব পুত্র ওমর তলোয়ার হাতে দরজায় দাঁড়িয়ে। বীর কেশরী হযরত হামযা (রা) বললেন : তাকে আসতে দাও। যদি সে নেক নিয়তে এসে থাকে হবে তো ভাল, অন্যথায় আমরা তার তলোয়ার দিয়েই তাকে খতম করব। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : তাকে অনুমতি দাও। অনন্তর সাহাবী গিয়ে হযরত ওমরকে ভেতরে আসবার অনুমতি দিলেন।
হযরত ওমর আসতেই রাসূলুল্লাহ (সা) সামনে অগ্রসর হয়ে তাঁর পরিধেয় কাপড় সজোরে টেনে ধরে বললেন : খাত্তাব পুত্র! কোন্ অভিপ্রায়ে তুমি এখানে এসেছ? আল্লাহর কসম! আমি দেখতে পাচ্ছি মৃত্যুর আগে কোন্ কঠিন বিপদ ও মুসীবতের সম্মুখীন তোমাকে হতে হবে।
হযরত ওমর বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার নিকট আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান আনার এবং আল্লাহ তা‘আলা যে হেদায়াতে ও তা‘লীম তাঁর মাধ্যমে পাঠিয়েছেন তা কবুল করার জন্য হাজির হয়েছি।
হযরত ওমর বলেন, একথা শোনা মাত্রই রাসুলুল্লাহ (সা) তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করলেন। তাকবীর ধ্বনি উচ্চারিত হতেই সেই ঘরে যত সাহাবা-ই কিরাম উপস্থিত ছিলেন সকলেই বুঝলেন যে, ওমর মুসলমান হয়ে গেছেন।
হযরত ওমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের ফলে মুসলমানদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মানবোধ সৃষ্টি হয়। হযরত হামযা (রা) পূর্বেই ইসলাম কবুল করেছিলেন। তিনি জানতেন যে, কুরায়শ কাফিরদের ওপর এর কতটা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে এবং মক্কার জীবনে এর কী প্রভাব অনুভূত হবে। আর তাদের এই ধারণা কোন খোশ-কল্পনার ওপর ভিত্তি করে ছিল না। কেননা মুশরিকদের নিকট আর কোন লোকের ইসলাম গ্রহণ এতটা কষ্টকর ও অসহনীয় ছিল না এবং আর কোন ঘটনাকে এতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি যতটা দেওয়া হয়েছিল হযরত ওমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনাকে।
হযরত ওমর (রা) তাঁর মুসলমান হওয়ার কথা প্রকাশ্যে ও খোলাখুলি ঘোষণা দেন। কুরায়শদের ভেতর এ খবর তাৎক্ষণিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। হযরত ওমর (রা)- ও এজন্য প্রয়োজনে লড়াই করে মরবার জন্যও প্রস্তুত হয়ে যান এবং তিনি প্রতিপক্ষের সঙ্গে মোকাবিলার পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। শেষাবধি বিরোধী ও শত্রুপক্ষ ব্যর্থ মনোরথ ও হিম্মতহারা হয়ে থেমে যায়।
কুরায়শদের পক্ষ থেকে বনী হাশিমকে বয়কট ও অবরোধ
আরব গোত্রগুলোর মাঝে ইসলাম দ্রুতবেগে বিস্তার লাভ করতে থাকে। এতে কুরায়শরা খুবই চিন্তিত হয়। তারা একটি পরামর্শ সভার আয়োজন করে। সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, এমন একটি লিখিত অঙ্গীকার বা চুক্তি নামা সম্পাদিত হোক যার মাধ্যমে বনী হাশিম ও বনী আবদুল-মুত্তালিবকে এ বিষয়ে বাধ্য করা হবে যে, তাদের সঙ্গে কোন প্রকার বিয়ে-শাদী হবে না, কোন রকমের ক্রয়-বিক্রয়ও করা যাবে না। সভার পর এই সব দফাওয়ারী সিদ্ধান্তসমূহ লিখে অতঃপর এ সব অঙ্গীকারের ওপর সকলের দস্তখত গ্রহণপূর্বক সর্বসম্মতিক্রমে তা কা‘বা শরীফের ভেতর টাঙ্গিয়ে দেওয়া হয়।
শা‘ব-এ আবী তালিব বা আবু তালিব গিরি উপত্যকায়
কুরায়শরা এই চুক্তিনামা সম্পাদন করতেই বনু হাশিম ও বনী আবদুল মুত্তালিব তাদের সর্দার আবু তালিবের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হল। তারা আবু তালিব গিরি উপত্যকায় গিয়ে উঠল এবং সেখানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল। এ ঘটনা নবুওয়াতের ৭ম বর্ষের। বনু হাশিমের আবু লাহাব ইবন অবদি’ল-মুত্তালিব এতে শরীক ছিল
না। সে ছিল কুরায়শদের সমর্থক। বনু হাশিম অনেক কাল এতে বন্দী জীবন যাপন করে। অবশেষে অবরোধ দীর্ঘায়িত হতে থাকে এবং এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে, অবরুদ্ধ লোকজনকে বাবুল বৃক্ষের পাতা খেয়ে জীবন ধারণ করতে হয়। শিশুরা ক্ষুধায় অস্থির হয়ে চিৎকার দিয়ে কাঁদত। এমন কি তাদের কান্নার আওয়াজ বহু দূর থেকেও শোনা যেত। কুরায়শরা ব্যবসায়ীদেরকেও তাদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করত। ফলে ঐসব ব্যবসায়ী খাদ্য ও নিত্য-ব্যবহার্য দ্রব্যাদির মূল্য এতটা বাড়িয়ে দিত যাতে বনু হাশিমের পক্ষে সংগ্রহ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এভাবে কেটে যায় তিন তিনটি বছর। এ সময় গোপন পন্থায় কিছু কিছু নিত্য-প্রয়োজনীয় সামগ্রী তাদের নিকট পৌঁছে যেত। কুরায়শদের যেসব লোক তাদের সঙ্গে লেনদেন ও আত্মীয়তা সম্পর্কে সম্পর্কিত ছিল তারা কিছুটা পর্দান্তরালে তাদের সাহায্য করত। রাসূলুল্লাহ (সা) এমতাবস্থাও তাঁর গোত্রের মাঝে দাওয়াত ও তাবলীঘের এই অপরিহার্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতেন দিনে-রাতে, গোপনে ও প্রকাশ্যে সম্ভাব্য সকল পন্থায়। আর বনু হাশিম পুরস্কার প্রাপ্তির আশায় সর্বপ্রকার দুঃখ-কষ্ট সহ্য করত।
চুক্তিনামা ভঙ্গ ও বয়কটের অবসান
ইতিমধ্যে কুরায়শদের কিছু বিবেকবান ও উন্নত মনোবলসম্পন্ন লোকের মন-মানসে, যাদের ভেতর হিশাম ইবন ‘আমর ইবন রবী‘আ ছিলেন অগ্রগামী, এই অত্যাচার-নিপীড়নমূলক চুক্তির বিরুদ্ধে অসন্তোষ সৃষ্টি হয় এবং একে তারা মানবতাবিরোধী কাজ বলে অভিহিত করে। হিশাম ছিলেন উত্তম আচার-আচরণ-বিশিষ্ট ও আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষাকারী লোক এবং গোত্রের সকলেই তাঁকে সম্মান ও শ্রদ্ধার চোখে দেখত। তিনি কুরায়শদের সেই সব লোকের সঙ্গে, যাদের ভেতর কোমল আচরণ, উন্নত মনোবল ও ঔদার্য বিদ্যমান ছিল, যোগাযোগ করেন এবং তাদের শরাফত ও মানবতাবোধকে জাগিয়ে দেন এবং তাদেরকে এই নিপীড়নসর্বস্ব অঙ্গীকার অবসানে উৎসাহিত করেন। পাঁচ ব্যক্তিকে পাওয়া যায় যারা এই চুক্তি মানতে অস্বীকার করতে একমত হল। পরদিন কুরায়শদের অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে যুহায়র ইবন আবী উমায়্যা, যাঁর মা ছিলেন আবদুল মুত্তালিব কন্যা ‘আতেকা, এসে হাজির হন এবং বলতে থাকেন :
“ওহে মক্কাবাসী! এ তোমাদের কেমন বিচার যে, আমরা সকলে মজাসে খাব, পান করব আর আমাদেরই আত্মীয় বনু হাশিম এক দানা খাবার ও এক বিন্দু পানির জন্য হাপিত্যেশ করবে এবং তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে, তাদের সঙ্গে কেনাবেচাও
করা চলবে না, বন্ধ থাকবে। আল্লাহর কসম! আমি ততক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিন্তে বসব না যতক্ষণ না এ জুলুমসর্বস্ব চুক্তিনামা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করতে পারছি।”
এ সময় আবূ জাহল হস্তক্ষেপ করতে চাইল। কিন্তু তার চাল কার্যকর হল না। মুত‘ইম ইবন ‘আদী এই চুক্তিনামা ছিঁড়ে ফেলার উদ্দেশ্যে কা‘বার দিকে অগ্রসর হতেই দেখতে পেলেন চুক্তিনামাটির অধিকাংশই কীটদষ্ট, কেবল باسمك اللَّهُمَّ শব্দটি অক্ষত ও পাঠযোগ্য রয়েছে [রাসূলুল্লাহ (সা) তদীয় চাচা আবূ তালিবকে এ বিষয়ে পূর্বাহ্নেই অবহিত করেছিলেন]।
যাই হোক, চুক্তিনামাটি ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং সেই সাথে এর লিখিত বক্তব্যের আর কোন গুরুত্ব রইল না।
আবূ তালিব ও হযরত খাদীজা (রা)-র ওফাত
নবুওয়াতের দশম বর্ষে একই সালে আবূ তালিব ও হযরত খাদীজা (রা) উভয়ের ইনতিকাল হয়। রাসূলুল্লাহ (সা)-র সঙ্গে এ দু’জনের উত্তম সাহচর্য ও আচরণ, বিশ্বস্ততা ও সাহায্য-সমর্থনের যে সম্পর্ক ছিল তা দিবালোকের ন্যায় দেদীপ্যমান। অবশ্য আবূ তালিব ইসলাম কবুল করেননি। এই শোকাবহ ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ (সা)-কে উপর্যুপরি কয়েকটি বিপদের সম্মুখীন হতে হয়।
কুরআন মজীদের বিপ্লবাত্মক চিকিৎসা এবং সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির ওপর এর প্রভাব
তুফায়েল ইবন ‘আমর আদ-দাওসী ছিলেন আরবের একজন নেতৃত্বস্থানীয় ও সম্মানিত ব্যক্তি এবং একজন বিশিষ্ট কবি। তিনি একবার মক্কায় আগমন করলে কুরায়শরা অভ্যাস মাফিক তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সা)-র খেদমতে উপস্থিত হতে বাধা দিতে চাইল এবং তাঁকে তাঁর নিকটবর্তী হওয়া ও তাঁর বাক্য শ্রবণ সম্পর্কে ভীত ও শঙ্কিত করল। বলল, আমাদের ভয় হয় যে, না জানি এর ফলে আমাদের এখানে যা ঘটেছে তোমার ও তোমার জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গেও সেই একই ব্যাপার ঘটে। অতএব তাঁর সঙ্গে তোমার কথা না বলা ও তাঁর কথা না শোনাই ভাল।
তুফায়েল বলেন, “আল্লাহ্র কসম! তারা এমনভাবে আমার পেছনে লাগল যে, আমি সিদ্ধান্তই নিয়ে ফেললাম, আমি তাঁর কথা শুনবও না, আর তাঁর সঙ্গে কথাও বলব না, বরং আরও একটু অগ্রসর হয়ে আমি এতদূর করলাম যে, আমি কানে তুলা ভর্তি করলাম এবং (তাওয়াফের নিয়তে) হারাম শরীফের দিকে গেলাম।
হঠাৎ আমি চোখ তুলে দেখতে পেলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কা‘বার নিকট নামায পড়ছেন। আমি তাঁর নিকট গিয়ে দাঁড়ালাম এবং আল্লাহ্ তাঁর কালাম-ই পাকের কিছুটা আমাকে জবরদস্তিমূলক শুনিয়েই ছাড়লেন। তিনি বলেন, আমি খুব ভাল কথা শুনলাম। আমি মনে মনেই বললাম : আমার মা আমাকে কাঁদাক। আল্লাহ্-র কসম! আমি কথাশিল্পী আর আমি কথা চিনিও। কথার ভাল-মন্দ আমার কাছে গোপন থাকতে পারে না। কাজেই এ কালাম শোনার পথে কোন জিনিস প্রতিবন্ধক হতে পারে? যদি তা আসলেই ভাল কথা হয় তাহলে আমি তা কবুল করব আর খারাপ হলে ছেড়ে দেব।।”
এরপর তুফায়েল রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে তাঁর ঘরে গিয়ে দেখা করলেন এবং এই ঘটনা আনুপূর্বিক বর্ণনা করলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলেন এবং তাঁর সামনে কুরআন মজীদ তেলাওয়াত করলেন। অনন্তর তিনি মুসলমান হয়ে গেলেন এবং ইসলামের দা‘ঈ ও মুবাল্লিগ হিসেবে আপন কওম ও পরিবার-পরিজনের মাঝে ফিরে গেলেন। তিনি তাঁর পরিবারের লোকদের সঙ্গে থাকতে অস্বীকার করলেন এবং বলে দিলেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা মুসলমান হচ্ছে তিনি তাদের সঙ্গে কোন সম্পর্কই রাখবেন না। একথায় তারা সকলেই ইসলামে দাখিল হয়। তিনি তাঁর গোত্র দাওসকেও ইসলামের দাওয়াত দেন এবং তাঁর মাধ্যমে উক্ত গোত্রে ইসলামের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটে।
হযরত আবূ বকর (রা) শুরুতে নিজের ঘরেই নামায পড়তেন। কিন্তু তাঁর মন এতে সন্তুষ্ট হল না। তিনি ঘরের আঙিনায় নামাযের একটি জায়গা বানিয়ে নেন এবং সেখানে নামায আদায় ও কুরআন মজীদ তেলাওয়াত করতে থাকেন। যখন তিনি তেলাওয়াত করতেন তখন কাফির মুশরিকদের মহিলা ও শিশুরা তাঁর ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ত এবং তাঁকে দেখতে ও তাঁর কুরআন মজীদ তেলাওয়াত শুনতে থাকত আর বিস্ময় বোধ করত। হযরত আবূ বকর (রা) ছিলেন খুবই কোমল অন্তঃকরণবিশিষ্ট। তেলাওয়াতের মুহূর্তে তাঁর চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় অশ্রু ঝরত। এ দৃশ্য কাফির সর্দারদেরকে ভীত ও শঙ্কিত করে তোলে। তারা ইবনু’দ -দাগিনাকে, যে তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিল, ডেকে পাঠায়। যখন সে তাদের সামনে গেল তখন তারা তাকে বলল, তুমি আবূ বকরকে আশ্রয় দিয়েছিলে। আমরা এই শর্তে তা মেনে নিয়েছিলাম যে, সে তার ঘরের ভেতরে থেকে আল্লাহ্-র ইবাদত করবে। কিন্তু এক্ষণে সে তার নামায ও কেরাত পাঠ সব কিছুই প্রকাশ্যে করতে
শুরু করেছে। আমাদের ভয় হয়, সে আমাদের ছেলেমেয়ে ও মহিলাদেরকে প্রভাবিত ও যাদুগ্রস্ত না করে ফেলে।
এখন সে যদি তার ঘরের ভিতর আল্লাহর ইবাদত করতে রাজী থাকে তাহলে ঠিক আছে। যদি তা করতে অস্বীকার করে তাহলে তাকে বল যে, সে তার আশ্রয় ও হেফাজত ফিরিয়ে নিক। আমরা চাই না যে, তুমি তোমার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ কর। আর আমরা এও চাই না যে, আবূ বকরকে প্রকাশ্যে ইবাদত ও তেলাওয়াতের অনুমতি দেওয়া হোক।
ইবনু’দ-দাগিনা যখন হযরত আবূ বকর (রা)-কে কুরায়শ নেতৃত্বের এই দাবি সম্পর্কে অবহিত করলেন তখন জবাবে তিনি বললেন : আমি তোমাদের আশ্রয় ও যামানত ফিরিয়ে দিচ্ছি। আমি আল্লাহর যামানত ও হেফাজতেই রাজী আছি।
তায়েফ সফর ও কঠিন সংকটের মুখোমুখি
আবূ তালিবের ইনতিকালের পর রাসূলুল্লাহ (সা) কুরায়শদের পক্ষ থেকে এমন বহুবিধ কষ্ট ও জুলুম-নির্যাতনের সম্মুখীন হন যা আবূ তালিবের জীবদ্দশায় কুরায়শদের সাহসে কুলায়নি। একবার তাঁর মস্তকের ওপর মাটিও নিক্ষেপ করা হয়। তাঁকে কষ্ট ও যন্ত্রণা প্রদানের ধারা যখন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে লাগল এবং কাফির ও মুশরিকদের ইসলামের প্রতি অবজ্ঞা, অপমান ও অসম্মান প্রদর্শনের ফিরিস্তি যখন বৃদ্ধি পেতে থাকল তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তায়েফ গমনের ইচ্ছা করলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল তিনি তায়েফের ছাকীফ গোত্রকে ইসলামের দাওয়াত দেবেন এবং এ ব্যাপারে তিনি তাদের সাহায্য চাইবেন। তায়েফবাসীদের নিকট তিনি ভাল কিছু আশা করেছিলেন আর এতে বিস্ময়েরও কিছু ছিল না। তাঁর এই প্রত্যাশার পেছনে কারণ ছিল আর তা এই যে, দুগ্ধ পানকালীন তিনি বনী সা‘দ কবিলায় অতিবাহিত করেছিলেন। এই কবিলার বসতি ছিল তায়েফেরই নিকটবর্তী।
তায়েফের গুরুত্ব
তায়েফ শহর নিজস্ব গুরুত্ব, আবাদীর বিস্তৃতি, স্বাচ্ছন্দ্য ও প্রাচুর্যের দিক দিয়ে মক্কার পর ছিল দ্বিতীয় শহর। কুরআন মজীদে কুরায়শদের জবানী তে একথার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে :

“আর এরা বলে, এই কুরআন কেন অবতীর্ণ হল না দুই জনপদের (মক্কা ও তায়েফ-এর) কোন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির ওপর?” (যুখরুফ : ৩১ আয়াত)।
এই শহর বিখ্যাত প্রতিমা “লাত”-এর পূজা-অর্চনারও কেন্দ্র ছিল যেখানে লোকে নিয়মিত তীর্থ দর্শনের জন্য আগমন করত। আর এ ব্যাপারে তায়েফ ছিল মক্কার সমকক্ষ এবং একই আসনে সমাসীন। মক্কা ছিল কুরায়শদের সর্ববৃহৎ প্রতিমা “হুবল”-এর পূজা-অর্চনার কেন্দ্র। আমীর-উমারা ও প্রাচুর্যের অধিকারী লোকেরা গ্রীষ্মকাল এখানেই অতিবাহিত করত। মুসলিম আমলে এবং এরপরও তার এই গুরুত্ব অক্ষুণ্ন ছিল। উমাইয়্যা কবি ওমর ইবন রবী’আ বলেন :

“বিলাসপ্রিয় ও প্রাচুর্যের অধিকারী লোকেরা শীতকাল মক্কায় কাটায় আর গ্রীষ্মকাল অতিবাহিত করে তায়েফে।”
তায়েফের লোকেরা স্থাবর সম্পত্তি ও জায়গা-যমীনের মালিক ছিল। তাদের ছিল বড় বড় বাগ-বাগিচা ও ক্ষেত-খামার। এই সম্পদ ও সুখ-সাচ্ছন্দ্য তাদের ভেতর অহংকার ও অহমিকা সৃষ্টি করে দিয়েছিল আর তারা ছিল কুরআন কারীমের এই আয়াতের প্রয়োগস্থল

“যখনই আমি কোন জনপদে সতর্ককারী প্রেরণ করেছি ওর বিত্তশালী অধিবাসীরা বলেছে, তোমরা যা-সহ প্রেরিত হয়েছ আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি। ওরা আরও বলত, আমরা ধনে-জনে সমৃদ্ধিশালী; সুতরাং আমাদেরকে কিছুতেই শাস্তি দেওয়া হবে না” (সূরা সাবা : ৩৪-৩৫)।
তায়েফবাসীদের আচরণ ও মহানবী (সা)-এর দু’আ
রাসূলুল্লাহ (সা) যখন তায়েফ গমন করেন তখন তিনি সর্বপ্রথম ছাকীফ নেতৃত্বন্দ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য যান এবং তাদের কাছে ‘দীনে হক’-এর দাওয়াত দেন। কিন্তু তিনি এর খুবই খারাপ ও কড়া জবাব পান।
তারা তাঁকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করল এবং শহরের উচ্ছৃঙ্খল ও বখাটে যুবক ও ক্রীতদাসদেরকে তাঁর পেছনে লেলিয়ে দিল। এরা তাঁকে গালি দেয়, হৈ চৈ করে এবং তাঁর প্রতি পাথর নিক্ষেপ করে। এরূপ কষ্টকর ও অসহায় অবস্থায় তিনি আশ্রয় নেবার উদ্দেশ্যে একটি আঙুর বাগানে তশরীফ নেন। তায়েফে তাঁকে যতটা কষ্ট ও যন্ত্রণা দেওয়া হয়েছিল মক্কায় প্রদত্ত কষ্টের তুলনায় তা ছিল অনেক বেশি। তারা রসূলুল্লাহ (সা)-র গমন পথের দু’পাশে লোক দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। তিনি চলার জন্য পা তুলতেই দু’দিক থেকে পাথর নিক্ষিপ্ত হত। শেষ পর্যন্ত তাঁর পদদ্বয় রক্তাক্ত ও ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। সে সময় তাঁর মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ও অন্তর নিংড়ানো দু’আ বেরিয়ে আসে এবং তিনি আল্লাহ তা’আলার নিকট নিজের দুর্বলতা, নিঃসম্বলতা ও মানুষের চোখে নিকৃষ্টতার ফরিয়াদ জানান এবং আল্লাহর সাহায্য-সহায়তার জন্য নিম্নোক্ত ভাষায় প্রার্থনা জানান। তিনি বলেন :

“আল্লাহ্! তোমার কাছেই আমি ফরিয়াদ জানাই আমার দুর্বলতার, আমার কৌশলহীনতার এবং মানুষের কাছে আমার নিকৃষ্টতার। তুমিই রহমকারীদের মধ্যে সর্বাধিক রহম করনেওয়ালা। অসহায় ও দুর্বলদের প্রভু তো তুমিই আর আমার প্রতিপালক রবও তুমিই। তুমি কার হতে সোপর্দ করছ আমাকে? অনাত্মীয় রুক্ষ চেহারাওয়ালাদের কাছে অথবা এমন দুশমনদের কাছে ঠেলে দিচ্ছ আমাকে যারা আমার কাজে-কর্মে আমার ওপর কাবু পেয়ে যেতে পারে তার কাছে? তুমি যদি আমার ওপর অসন্তুষ্ট না হয়ে থাক তবে এরও কোন পরওয়া করি না আমি। তবে তোমার পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ও ‘আফিয়াতই আমার জন্য অধিক বিস্তৃত। ইয়া আল্লাহ্! আমি তোমার সত্তার নূর তথা আলোক-রশ্মির আশ্রয় প্রার্থনা করছি যারদ্বারা সমগ্র আঁধার আলোময় হয়ে যায় এবং দীন ও দুনিয়ার সকল কাজ সহীহ-শুদ্ধ হয়ে যায়। তোমার ক্রোধ আমার ওপর আপতিত হোক অথবা তোমার অসন্তুষ্টিই আমার
ওপর আপতিত হোক, সর্বাবস্থায় তোমার রেযামন্দী ও সন্তুষ্টিই আমার কাম্য। নেক কাজ করার কিংবা অন্যায় ও পাপ থেকে বেঁচে থাকার শক্তি আমি তোমার কাছ থেকেই পেয়ে থাকি।”
এ সময় আল্লাহ্ তা’আলা পাহাড়সমূহের ফেরেশতাকে তাঁর নিকট পাঠান এবং তিনি তাঁর নিকট তায়েফ যে দু’টো পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত সে দু’টোকে একত্রে মিলিয়ে দিয়ে তায়েফবাসীদেরকে পিষে মেরে ফেলার অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু তিনি অনুমতি দিতে অস্বীকার করেন এবং বলেন, আমি আশা করি, তাদের বংশধরদের মধ্যে এমন লোক জন্ম নেবে যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে অপর কাউকে শরীক করবে না।
যখন উতবা ইবন রবী’আ ও শায়বা ইবন রবী’আর মন রাসুলুল্লাহ (সা)-র এই অবস্থা দৃষ্টে কিছুটা কোমল হল এবং তাদের মানবতার শিরায় কিছুটা কাঁপন সৃষ্টি হল তখন তারা উভয়ে আদ্দাস নামক তাদের এক খৃস্টান ক্রীতদাসকে ডেকে পাঠাল। তারা তাকে বলল লও, এই সব আঙুরের খোশা। একটি তশতরীতে করে ঐ লোকটির কাছে নিয়ে যাও এবং তাকে খেতে বল। আদ্দাস নির্দেশ মাফিক হুকুম তামিল করল এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে আলাপ-আলোচনান্তে ও তাঁর মহানুভব চরিত্রদৃষ্টে মুসলমান হয়ে গেল।
রাসূলুল্লাহ (সা) তায়েফ থেকে মক্কায় ফিরে এলেন। তাঁর সম্প্রদায় তখনও তাঁর বিরোধিতায়, শত্রুতায়, ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও যন্ত্রণা প্রদানে ছিল তেমনি জোর তৎপর।
মি‘রাজের ঘটনা
এই ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ (সা)-র মি’রাজ ঘটে। তাঁকে রাতারাতি গায়েবী শক্তিযোগে মসজিদে হারামে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে মসজিদে আকসায় পৌঁছানো হয়। এরপর এর পার্শ্ববর্তী এলাকা, সপ্ত আসমান ভ্রমণ, আল্লাহর নিদর্শনাবলীর পর্যবেক্ষণ এবং আম্বিয়া আলাইহিমু’স-সালামের সঙ্গে সাক্ষাতের সেই সব ঘটনা সংঘটিত হয় যে সম্পর্কে আল্লাহ পাকের ইরশাদ :

“তার চোখ না অন্যদিকে ঝুঁকেছে আর না সীমা অতিক্রম করেছে। সে তার প্রতিপালকের কুদরতের কত বিরাট বিরাট নিদর্শনই না প্রত্যক্ষ করেছে” (সূরা
আন-নাজম, ১৭-১৮ আয়াত।
এ ছিল আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে তাঁর সম্মানে যিয়াফত ও অভ্যর্থনা জ্ঞাপন যা তাঁর চিত্তবিনোদন এবং তায়েফে প্রাপ্ত সেইসব আঘাতের উপশম ও সেই সমস্ত লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, অপমান-অপদস্থ ও অবিশ্বস্ততার ব্যথা অবসানের জন্যই যার কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে তিনি সেখানে অতিবাহিত করেছিলেন।
সকাল হতেই তিনি সকলকে এই ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করলেন। এতে কুরায়শরা খুবই বিস্ময় প্রকাশ করে, একে অবাস্তব ও অসম্ভব ব্যাপার হিসেবে অভিহিত করে, তাঁকে মিথ্যাবাদী ঠাওরায় এবং বিদ্রূপ করে। হযরত আবূ বকর (রা) মি’রাজের ঘটনার কথা শুনতেই বলে ওঠেন—যদি তিনি এ ধরনের কথা বলে থাকেন তবে তিনি সত্যি কথাই বলেছেন। তোমরা এতে বিস্মিত হচ্ছ কেন? আল্লাহ্ কসম! তিনি যখন আমাদেরকে এই খবর বলেন যে, তাঁর নিকট দিবারাত্রের যে কোন ভাগে আসমান থেকে যমীন অবধি ওযাহী এসে থাকে তখন আমি তাঁর সত্যতার সাক্ষ্য দিয়ে থাকি। এটা তো তার চাইতেও কঠিন ও অসম্ভব ব্যাপার নয় যে বিষয় নিয়ে তোমরা বিস্ময় প্রকাশ করছ।
মি’রাজের উচ্চ ও সূক্ষ্ম মর্ম
মি’রাজের ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না যা দ্বারা রসূলুল্লাহ (সা)-কে আল্লাহ তা’আলার বড় বড় নিদর্শন প্রত্যক্ষ করানো হয় এবং আসমান ও যমীনের রাজত্ব পর্দাহীন ও আবরণমুক্ত অবস্থায় তাঁর সামনে ধরা দেয়। নবুওয়াতের এই অদৃশ্য ও আসমানী সফরে ছাড়াও বহু উচ্চ ও সূক্ষ্ম মর্ম লুকায়িত ও প্রচ্ছন্ন রয়েছে এবং এর ভেতর বহু সুদূরপ্রসারী ইশারা-ইঙ্গিত করা হয়েছে। সূরা ইসরা ও সূরা নাজ্ম যা মি’রাজের সিলসিলায় নাযিল হয়, এটা ঘোষণা দেয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) উভয় কিবলা অর্থাৎ মসজিদুল-হারাম ও মসজিদুল-আকসার নবী, উভয় দিক অর্থাৎ পূর্ব ও পশ্চিমের ইমাম, তাঁর পূর্ববর্তী সমস্ত আম্বিয়া-ই কিরাম-এর ওয়ারিছ এবং পরবর্তীতে আগত সমগ্র মানব জাতির রাহবার ও রাহনুমা (পথপ্রদর্শক)। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও তাঁর মি’রাজ সফরে মক্কা বায়তুল-মাকদিসের ও মসজিদুল-হারাম মসজিদে আকসার কাছাকাছি হয়ে গেছে। তাঁর ইমামতিতে তামাম আম্বিয়া-ই
কিরাম (আ) সালাত আদায় করেন এটি ছিল তাঁর পয়গাম ও দাওয়াতের ব্যাপকতা ও অসাধারণত্ব, তাঁর নেতৃত্বের চিরন্তনতা এবং প্রতিটি মানবশ্রেনীর জন্য তাঁর শিক্ষামালার সামগ্রিকতা ও যোগ্যতার প্রমাণ।
এই ঘটনা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ব্যক্তিত্বের সঠিক ও নির্ভেজাল স্বীকৃতি, এর নির্ভুল নির্দেশনা, তাঁর ইমামত ও নেতৃত্বের বর্ণনা, এই উম্মাহর (যাদের মাঝে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন) আসল মকাম ও প্রকৃত অবস্থানগত মর্যাদা নির্ধারণ, এই পয়গাম ও দাওয়াতের ও নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের পর্দা উন্মোচন করে যা এই উম্মতকে এই বিশাল বিস্তৃত দুনিয়া ও বিশ্ব সমাজে আনজাম দিতে হবে।
মি’রাজের ঘটনা প্রকৃতপক্ষে একটি সীমিত, স্থানীয় ও সাময়িক প্রকৃতির এবং নবুওয়াতের চিরন্তন ও বিশ্বজয়ী ব্যক্তিত্বের মাঝে একটি বিভক্তি রেখা ও বৈশিষ্ট্যমূলক মাইলফলক হিসাবে মর্যাদা রাখে। রাসূলুল্লাহ (সা) যদি কোন জাতীয় অথবা স্থানীয় লিডার, কোন একটি দেশ বা রাষ্ট্রের পথপ্রদর্শক নেতা, বিশেষ কোন বংশ বা গোত্রের ত্রাতা তথা মুক্তিদাতা এবং কোন নতুন শান-শওকত ও আজমতের প্রতিষ্ঠাতা হতেন তাহলে তাঁর এই আসমানী মি’রাজের প্রয়োজন ছিল না, এজন্য আসমান-যমীনের বিস্তৃত রাজত্বের ভ্রমণ ও পর্যবেক্ষণেরও দরকার ছিল না। এরও প্রয়োজন ছিল না যে, তাঁর মাধ্যমে আসমান ও যমীনের এই নতুন সম্পর্ক কায়েম হবে। সে সময় এই ভূখণ্ড, এই পরিবেশ, এই সমাজ তাঁর জন্য যথেষ্ট বিবেচিত হত। এটা বাদ দিয়ে তাঁর আর কোন ভূখণ্ডের দিকে মনোযোগ দেবার প্রয়োজন ছিল না, প্রয়োজন ছিল না সমুন্নত ও সমুচ্চ আসমান ও সিদরাতুল -মুনতাহা অবধি পৌঁছার অথবা মসজিদে আকসায় তশরীফ নেবার যা তাঁর নিজের শহর থেকে বহু দূর এবং শক্তিশালী রোম সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল।
মি’রাজের ঘটনা এই ঘোষণা দেয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সেই সব জাতীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে কোনই সম্পর্কে রাখেন না যাদের যোগ্যতা ও চেষ্টা-সাধনার বৃত্ত তাদের দেশ অথবা তাদের জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায় পর্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং যাদের থেকে কেবল তাদেরই বংশ-গোত্র ও তাদেরই জাতিগোষ্ঠী উপকৃত হয়, যাদের সঙ্গে তারা ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত এবং এই পরিবেশ অবধিই তাদের প্রভাব অবশিষ্ট থাকে যেই পরিবেশের মাঝে তাদের জন্ম। তিনি যেই দল ও জামা’আতের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন তা ছিল আল্লাহর প্রেরিত নবী ও রাসূলদের জামাআত যাঁরা আসমানের পয়গাম যমীনবাসীদেরকে, স্রষ্টার পয়গাম সৃষ্টিকে পৌঁছে দিয়ে থাকেন এবং তাঁদের দ্বারা গোটা মানব সমাজ (কাল, ইতিহাস,
রঙ ও বংশ, দেশ ও জাতি নির্বিশেষে) ধন্য ও গৌরবান্বিত হয়ে থাকে এবং তাদের ভাগ্য গড়ে।
সালাত ফরয হল
এ সময় আল্লাহ তা’আলা তাঁর উম্মতের ওপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেন এবং আল্লাহ্ বরাবর তিনি ওয়াক্ত সংখ্যা হ্রাস করবার জন্য আবদার জানাতে থাকেন। শেষাবধি আল্লাহ রাহমানুর -রাহীম এই সালাতকে দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্তে সীমিত করে দেন এবং এও ঘোষণা করে দেওয়া হয় যে, যে ঈমান ও এহতিসাবের সঙ্গে এই সালাতসমূহ আদায় করবে তাকে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের বিনিময় ও ছওয়াব প্রদান করা হবে ।
আরব গোত্রগুলোর প্রতি ইসলামের দাওয়াত
এখন থেকে রসূলুল্লাহ (সা) হজ্জের মৌসুমে আরবের বিভিন্ন গোত্রের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করতে আরম্ভ করলেন এবং তাদের নিকট ইসলামের প্রতি সাহায্য-সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবার জন্য আবেদন জানালেন। তিনি তাদেরকে সম্বোধন করে বলেন, ” হে অমুক গোত্র ! আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহ্ রসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি যিনি তোমাদেরকে আল্লাহ্ ইবাদতের হুকুম দেন এবং এও হুকুম দেন যে, তোমরা তাঁর সঙ্গে আর কাউকে শরীক করবে না। আর যেই সব সত্তাকে তোমরা তাঁর সমকক্ষ বানিয়ে নিয়েছ এবং যাদেরকে তোমরা পূজা-অর্চনা কর সে সবের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ কর। তোমরা তাঁর ওপর ঈমান আন এবং এর সত্যতা স্বীকার কর আর আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত হেফাজত কর যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ প্রদত্ত জিনিসগুলো যেগুলো দিয়ে আল্লাহ তা’আলা আমাকে পাঠিয়েছেন সেগুলো ভাল করে খোলাখুলিভাবে আমি বর্ণনা করি।”
তিনি কথা শেষ করতেই (তাঁকে অনুসরণরত ) আবূ লাহাব দাঁড়িয়ে পড়ত এবং বলত, হে অমুক গোত্র! সে তোমাদেরকে দাওয়াত দিচ্ছে যে, তোমরা লাত ও উযযার বন্দেগী ও বিশ্বস্ততার শিকল নিজেদের গলা থেকে ছুঁড়ে ফেল এবং নিজেদের সাহায্যকারী জিনদের সঙ্গেও সম্পর্কচ্ছেদ করে সেই বিদ’আত ও গোমরাহী এখতিয়ার কর যা সে নিয়ে এসেছে। অতএব, তোমরা তাঁর কথা মানবে না, তাঁর কথা শুনবে না।
ইসলামের রাস্তা
এই রাস্তা যা রসূলুল্লাহ (সা) ও ইসলামের দিকে যেত কাঁটা ভরা ও সর্বপ্রকার বিপদাপদ ও শংকাপূর্ণ ছিল, যে রাস্তায় নিজের জীবনের ওপর বিপদের ঝুঁকি গ্রহণ ব্যতিরেকে চলা ও মনযিলে মকসূদ পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব ছিল না।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস (রা) হযরত আবূ যর গিফারী (রা)-র মক্কা পর্যন্ত পৌঁছা, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পবিত্র খেদমতে হাজির হওয়া ও ইসলাম কবুলের যেই ঘটনা বর্ণনা করেছেন, এর দ্বারা তার ওপর আলোকপাত ঘটে। তিনি বলেন
“যখন আবূ যর (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আবির্ভাব সম্পর্কে জানতে পারলেন তখন তিনি তাঁর ভাইকে বললেন, তুমি সেই উপত্যকায় যাও এবং সেই লোকটি সম্পর্কে জানতে চেষ্টা কর যিনি দাবি করছেন যে, তাঁর কাছে আসমান থেকে ওযাহী আসে। তাঁর কথাবার্তা শুনবে, এরপর আমাকে এসে বলবে। তার ভাই রওয়ানা হল এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করল। এরপর ফিরে গিয়ে সে আবূ যর (রা)-কে বলল, আমি তাঁকে দেখেছি। তিনি পছন্দনীয় চরিত্রের লোক এবং সর্বোত্তম চরিত্র ও ব্যবহারের শিক্ষা দিয়ে থাকেন। আর আমি তাঁর মুখ থেকে এমন সব কথা শুনতে পেয়েছি যাকে কবিতা বলা যায় না। আবূ যর (রা) বললেন, আমি যা জানতে চাচ্ছিলাম এর দ্বারা তা মিলল না। এরপর তিনি নিজেই সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন এবং পানির মশক নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি মক্কায় গিয়ে উপস্থিত হলেন এবং হারাম শরীফে পৌঁছে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সন্ধান নিতে শুরু করলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে চিনতেন না, অথচ কাউকে জিজ্ঞেস করাও সমীচীন মনে করেন নি। এই খোঁজেই রাত হল। সে সময় হযরত আলী কাররামাল্লাহু তাঁকে দেখতে পান এবং দেখা মাত্রই তিনি বুঝতে পারেন যে, লোকটি কোন নবাগত মুসাফির। তিনি তাঁর পিছু নিলেন। কিন্তু কেউ কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। যখন ভোর হল তখন তিনি (আবূ যর) তাঁর মশক ও খাদ্য-খাবার নিয়ে পুনরায় সেই মসজিদে গেলেন। এ দিনটিও এভাবেই কেটে গেল আর রাসূলুল্লাহ (সা)-ও তাঁকে দেখেন। আর এ অবস্থায় সন্ধ্যায় ঘনিয়ে এল। তিনি তাঁর শোবার জায়গায় চলে গেলেন। এই সময় হযরত ‘আলী (রা) তাঁর নিকট দিয়ে অতিক্রম করেন এবং তাঁকে লক্ষ করে বলেন যে, এখন পর্যন্ত কি এই মুসাফিরের মনযিলে মকসূদ জানার সময় হয়নি? তৃতীয় দিন হযরত আলী (রা) এভাবেই তাঁর কাছে গেলেন তাঁকে উঠালেন এবং বললেন তুমি কি আমাকে বলবে যে, কোন জিনিস তোমাকে এখান পর্যন্ত টেনে এনেছে? তিনি বললেন, তুমি যদি আমার সঙ্গে
ওয়াদা কর যে, তুমি আমাকে পথ দেখাবে তাহলে আমি তোমাকে বলতে পারি। হযরত আলী (রা) ওয়াদা করলে তিনি তাঁর সঙ্গে যাবার জন্য তৈরি হলেন। হযরত আলীর সঙ্গে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে উপস্থিত হলেন, তাঁর কথা শুনলেন এবং সেখানেই মুসলমান হয়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে বললেন, তুমি তোমার কওমের নিকট ফিরে যাও এবং এই দাওয়াত তথাকার লোকদেরকে পৌঁছে দাও যাতে আমার কথা ভালভাবে প্রকাশ পায়। হযরত আবূ যর (রা) বললেন, সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন! আমি তাদের নিকট গিয়ে চিৎকার করে এই দাওয়াত দেব। অতঃপর বের হয়ে মসজিদে হারামে এলেন এবং ঘোষণা দিলেনঃ اشهد ان لا اله الا الله وان محمداً رسول الله এই কথা শুনতেই লোকেরা তাঁকে ঘিরে ফেলে এবং এত প্রহার করে যে, তিনি বেহুঁশ হয়ে মাটিতে পড়ে যান। ইতোমধ্যে হযরত আব্বাস এসে উপস্থিত হলেন এবং তাঁকে ঝুঁকে পড়ে দেখলেন ও লোকদেরকে বললেন, তোমরা কি জান যে, লোকটি গিফার গোত্রের? তোমাদের ব্যবসায়ী বণিকদের যে রাস্তা সিরিয়ার দিকে গেছে তা এই গোত্রের পাশ দিয়েই গেছে। এরপর তিনি তাঁকে বাঁচিয়ে দেন। দ্বিতীয় দিনও তিনি এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করলেন। আর লোকেও উত্তেজিত হয়ে তাঁকে খুব মারপিট করে। হযরত আব্বাস এসে সেদিনও তাঁকে সাহায্য করেন।
আনসারদের ইসলাম কবুলের সূচনা
রাসূলুল্লাহ (সা) হজ্জ মৌসুমে ইসলামের প্রচার অভিযানে রওয়ানা হন। এমনি এক অভিযানে ‘আকাবা’ উপত্যকার কাছে আনসারদের খাযরাজ গোত্রের কিছু লোকের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি তাদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেন, তাদের সামনে ইসলাম পেশ করেন এবং কুরআন মজীদ তেলাওয়াত করে শোনান। এই সব লোক মদীনায় ইয়াহূদীদের প্রতিবেশে বসবাস করত এবং তাদের কাছ থেকে শুনত যে, খুব কাছাকাছি সময়ে একজন নবী আবির্ভূত হবেন। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল, আল্লাহর কসম! এঁকে সেই নবী বলেই মনে হচ্ছে যার সংবাদ ইয়াহূদীরা তোমাদেরকে বলত। দেখো, ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে কেউ যেন তোমাদের অগ্রগামী না হতে পারে। অনন্তর তারা তৎক্ষণি তাঁর সত্যতা মেনে নিল এবং তাঁর নিকট আরয করল, আমরা আমাদের কওমকে ছেড়ে এসেছি।
আমাদের সেই কওমের ভেতর যতটা অন্যায়, ফাসাদ ও বিভেদ এতটা আর কোন কওমে নেই। সম্ভবত আপনার মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে দেবেন। আমরা ওখানে গিয়ে তাদেরকে এ ব্যাপারে অবহিত করব এবং তাদেরকে দাওয়াত দেব। আপনিও তাদের সামনে সেই সব জিনিস পেশ করুন যা আমরা কবুল করেছি। যদি আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে আপনার পেছনে ঐক্যবদ্ধ করে দেন তাহলে আপনার চেয়ে বেশি সম্মানের অধিকারী আর কেউ হবে না।
তারা ঈমান আনার পর স্বদেশে ফিরল। মদীনায় পৌঁছে তারা তাদের অন্য ভাইদের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে আলোচনা করল এবং তাদেরকেও ইসলামের দাওয়াত দিল। এই দাওয়াতে তাদের কওম ও জাতিগোষ্ঠীর ভেতর ইসলামের ব্যাপক প্রচার ঘটে। আনসারদের এমন কোন ঘর ছিল না যেখানে তাঁর সম্পর্কে আলোচনা না হয়েছে।
আকাবার প্রথম বায়‘আত
পরের বছর। হজ্জ মৌসুমে আনসারদের বারজন লোক ‘আকাবা উপত্যকায় রাসূলুল্লাহ (সা)-র সঙ্গে মিলিত হল এবং তাঁর পবিত্র হাতের ওপর চুরি, ব্যভিচার, সন্তান হত্যা থেকে বিরত থাকা এবং ভাল কাজে অনুসরণ ও তৌহীদের ওপর বায়’আত নিল। যখন তারা ফিরে যেতে চাইল তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের সঙ্গে হযরত মুস’আব ইবন উমায়র(রা)-কে পাঠান এবং তাকে বলে দেন যে, তিনি যেন তাদেরকে কুরআন শেখান, ইসলামের তা’লীম দেন এবং তাদেরকে দ্বীনী তথা ধর্মীয় মসলা-মাসাইল সম্পর্কে অবহিত করেন। তাঁকে মদীনায় “মুকরী” বা কুরআন পাঠদানকারী বলা হত। তিনি আস’আদ ইবন যুরারাহ্-র এখানে মেহমান হয়েছিলেন এবং সেখানে ইমামতির দায়িত্বও তিনি পালন করতেন।
আনসারদের ইসলাম গ্রহণের আসল কারণ
আল্লাহ্ তা’আলার যা ইচ্ছা তাই করলেন অর্থাৎ এই রকম নাযুক মুহূর্তে তিনি তাঁর রসূল ও দ্বীনের সাহায্য-সমর্থনের জন্য আওস ও খাযরাজ ৪ গোত্রদ্বয়কে দাঁড় করিয়ে দিলেন। এরা উভয়েই ছিল ইয়াছরিবের দু’টি বড় গোত্র ও গুরুত্বপূর্ণ আরব কবিলা। আল্লাহ পাক তাঁদেরকে সুবর্ণ সুযোগ দান করলেন যে, তারা এই
নে’মতের, যার থেকে বড় আর কোন নে’মত নেই, কদর করুক এবং ইসলামের অভ্যর্থনা ও কবুলিয়তের ক্ষেত্রে তাদের সমসাময়িকদের ও হেজাযবাসীদেরকে অতিক্রম করুক এবং এই মুহূর্তে এই দীনকে নিজেদের বুকের ভেতর স্থান দিক, বরং এর জন্য যেন নিজেদের বুক পেতে দেয় যখন আরবের সকল গোত্র, বিশেষ করে কুরায়শরা এর থেকে একেবারেই মুখ ঘুরিয়ে বসেছিল। وَاللَّهُ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ “আর আল্লাহ যাকে চান সিরাতুল-মুস্তাকীম অভিমুখে পথ দেখিয়ে থাকেন।”
বিভিন্ন কার্যকারণ, যা ছিল মূলত আল্লাহ তা’আলার হেকমত ও অভিপ্রায়ের ওপর ভিত্তিশীল এবং যার উদ্দেশ্যই ছিল ইসলামের প্রচার-প্রসার ও প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য অনুকূল ক্ষেত্র প্রস্তুত করা, আওস ও খাযরাজকে এই মহাসৌভাগ্যের জন্য তৈরি করে দিয়েছিল। তাদের মধ্যে ও কুরায়শদের ভেতর কয়েকটি ক্ষেত্রে ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছিল। আওস ও খাযরাজের এই গোত্র মক্কার কুরায়শদের বিপরীতে নরম মেজাজ ও নরম দিলের অধিকারী ছিল আর চরমপন্থী, জোর-যবরদস্তি, অহংকার ও সত্য প্রত্যাখ্যানের মত নীচতা ও অনা সৃষ্টি থেকে ছিল মুক্ত ও পবিত্র। এই সবগুলোর সম্পর্ক সেই সব বংশীয় ও গোত্রীয় ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্যের দরুন ছিল যার দিকে রাসূলুল্লাহ (সা) ইয়ামানের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ইঙ্গিত করে বলেছিলেন :

“তোমাদের কাছে ইয়ামানের লোকেরা এসেছে যারা খুবই কোমল অন্তঃকরণ বিশিষ্ট নরম দিলের মানুষ।” এই উভয় গোত্র (আওস ও খাযরাজ) মূলত ইয়ামানের সঙ্গেই সম্পর্কিত ছিল। প্রাচীন যুগে তাঁদের বাপ-দাদা সেখান থেকে এখানে হিজরত করেছিলেন। আল্লাহ তা’আলা তাঁদের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন:

“মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা এই নগরীতে বসবাস করেছে এবং ঈমান এনেছে তারা মুহাজিরদেরকে ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না আর তারা তাদেরকে নিজেদের ওপর প্রাধান্য দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও” (সূরা হাশর, ৯ আয়াত)।
তাদের ইসলাম গ্রহণের পেছনে এও একটি কারণ ছিল যে, পারস্পরিক গৃহযুদ্ধ ও অব্যাহত লড়াই-ঝগড়া তাদেরকে ভেঙে চুরে চুরমার করে দিয়েছিল। বু’আছ যুদ্ধের পর বেশি দিন হয়নি, এর তিক্ত স্মৃতি তখনও তাদের মন-মানসে জাগ্রত ছিল। আর এখন তাদের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি, পারস্পরিক আপোস- সমঝোতা ও যুদ্ধের হাত থেকে বাঁচবার একটা আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। তাদের এই শব্দ সমষ্টি সেই অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থার ইঙ্গিত দেয়, “আমরা আমাদের কওমকে পেছনে রেখে এসেছি। কোন কওমের ভেতর এতটা অন্যায়-অনাসৃষ্টি, ফেতনা-ফাসাদ ও পারস্পরিক শত্রুতা নেই যতটা আছে তাদের ভেতর। সম্ভবত আল্লাহ আপনার মাধ্যমে তাদেরকে একত্র করবেন। যদি আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে দেন তাহলে আপনার থেকে বেশি সম্মানের অধিকারী আর কেউ হবে না।” হযরত আয়েশা (রা) বলেন : বু’আছ যুদ্ধ রাসূলুল্লাহ (সা)-র জন্য একটি গায়েবী মদদ এবং মদীনায় হিজরত ও নুসরাতের একটি উপক্রমণিকা ছিল।
দ্বিতীয় কারণ ছিল এই যে, কুরায়শ ও অবশিষ্ট সমগ্র আরবদের সম্পর্ক নবুওয়াত ও আম্বিয়া ‘আলায়হিমু’ সালামের সঙ্গে দীর্ঘকাল থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং কালের দীর্ঘ দূরত্বের কারণে তারা এর অর্থ ও মর্ম সম্পর্কে একেবারেই অপরিচিত হয়ে গিয়েছিল। তাদের মূর্খতা ও অজ্ঞতা চূড়ান্ত সীমায় গিয়ে পৌঁছেছিল। মূর্তিপূজার ক্ষেত্রে তারা বাড়াবাড়ির সকল সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তারা সেই সব ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠী (ইয়াহূদী ও খৃষ্টান) থেকেও বহু দূরে অবস্থান করছিল যারা আম্বিয়া-ই কিরামের সঙ্গে নিজেদেরকে সম্পর্কিত করত এবং আসমানী সহীফার (তা বিকৃতই হোক না কেন) ছিল ধারক ও বাহক। আল্লাহ তা’আলা নিম্নোক্ত আয়াতে সেই ঐতিহাসিক সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন :

“যাতে তুমি সতর্ক করতে পার এমন এক জাতিকে যাদের পিতৃপুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়নি যার ফলে ওরা গাফিল” (সূরা ইয়াসীন, ৬ আয়াত)।
এর বিপরীতে আওস ও খাযরাজ ইয়াহূদীদেরকে নবুওয়াত ও আম্বিয়া-ই কিরাম সম্পর্কে পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করতে এবং তাওরাত পাঠ করতে বরাবর দেখতে ও শুনতে পেত, বরং ইয়াহূদীরা অধিকাংশ সময় তাদেরকে বলত যে, শেষ যুগে একজন নবী আবির্ভূত হবেন। আমরা তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়ে তোমাদেরকে
এভাবে হত্যা করব যেভাবে ‘আদ ও ইরাম জাতিগোষ্ঠীকে হত্যা করা হয়েছে। এদের সম্পর্কেই আল্লাহ তা’আলা বলেন :

“তাদের নিকট যা আছে আল্লাহর নিকট থেকে তার সমর্থক কিতাব আসল যদিও পূর্বে কাফির মুশরিকদের বিরুদ্ধে বিজয় প্রার্থনা করত। তবুও তারা যা জ্ঞাত ছিল তা যখন তাদের নিকট আসল তখন তারা তা প্রত্যাখ্যান করল। সুতরাং কাফিরদের ওপর আল্লাহর লা’নত” (সূরা বাকারা, ৮৯ আয়াত)।
আওস, খাযরাজ ও মদীনার আদিম অধিবাসীরা, যারা আকীদা তথা বিশ্বাসগত দিক থেকে মুশরিক ও মূর্তিপূজক ছিল, ধর্মীয় যথার্থতা, পরিভাষা (যেমন নবুওয়াত ও রিসালত, ওয়াহী ও ইলহাম, হাশর-নশর ও আখিরাত) ও সুন্নাতে ইলাহী তথা ঐশী জীবনধারা সম্পর্কে এতটা অজ্ঞ ও অপরিচিত ছিল না যতটা ছিল মক্কার কুরায়শ ও তাদের প্রতিবেশী গোত্রগুলো যুগের অতিক্রমণের ফলে। এর কারণ এই যে, আওস ও খাযরাজ দীর্ঘকাল থেকে ইয়াহূদীদের সঙ্গে ওঠা-বসা ও বসবাসের কারণে ঐসব ধর্মীয় তথা দীনী যথার্থতা ও পরিভাষাসমূহ, আম্বিয়ায়ে কিরাম-এর নাম ও বিক্ষিপ্ত অবস্থা, বিভিন্ন যুগে আম্বিয়া ‘আলায়হিমুস্ সালামের আবির্ভাব এবং হেদায়াত তথা ঐশী পথনির্দেশনার আসমানী নিজাম সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হয়ে গিয়েছিল। তারা দিনরাত ইয়াহূদীদের সঙ্গে ওঠাবসা করত যারা ছিল আহলে কিতাব। তাদের সঙ্গে যুদ্ধ ও সমঝোতা, অঙ্গীকার ও পারস্পরিক চুক্তি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিরও সম্পর্ক ছিল। এজন্য যখন আওস ও খাযরাজের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষাকারী মদীনার সে সব বাসিন্দা রসূলুল্লাহ (সা)-এর দাওয়াত সম্পর্কে অবহিত হল এবং তারা হজ্জ পালন উপলক্ষে মক্কায় আগমন করল এবং মহানবী (সা) স্বয়ং তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন, এ সময় এমন মনে হল যে, অকস্মাৎ তাদের চোখ থেকে পর্দা উঠে গেল আর তারা যেন প্রথম থেকেই এর জন্য তৈরি ছিল।
ইয়াছরিবের বৈশিষ্ট্য এবং একে দারুল-হিজরত হিসাবে নির্বাচনের পেছনে প্রচ্ছন্ন রহস্য
মদীনাকে দারুল হিজরত ও ইসলামের দাওয়াতের কেন্দ্র হিসেবে নির্বাচনের পেছনে মদীনাবাসীদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন, অধিকন্তু সেই সব রহস্যের কারণে ছিল যেসব রহস্য আল্লাহ ভিন্ন আর কেউ জানে না। একটি হেকমত এও ছিল যে, মদীনার সামরিক ও ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর একটি সুদৃঢ় দুর্গ হিসেবে অবস্থানগত গুরুত্ব ছিল।
আরব উপদ্বীপের কাছাকাছি আর কোন শহর এ ব্যাপারে মদীনার সমকক্ষ ছিল না। হাররাতুল-ওয়াবরা পশ্চিম দিক দিয়ে মদীনাকে হেফাজত করত আর হার্রা ওয়াকিম পূর্বদিক থেকে একে ঘিরে রেখেছিল। মদীনার উত্তরাংশ ছিল একমাত্র পথ যা আক্রমণকারী যে কোন বাহিনীর জন্য ছিল উন্মুক্ত [এটাই সেই এলাকা যেখানে ৫ম হিজরীতে আহযাব যুদ্ধের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া-সাল্লাম খন্দক (পরিখা) খননের নির্দেশ দিয়েছিলেন]। মদীনার অপর দিক খেজুরের ঘন বাগান অথবা ক্ষেত দ্বারা বেষ্টিত ছিল। যদি কোন আক্রমণকারী ফৌজকে একে অতিক্রম করতে হত তবে তার রাস্তায় এমন সংকীর্ণ পথ ও অলিগলি পড়ত যা পূর্ণ কাতারবন্দী ও ফৌজী শৃঙ্খলার সাথে পার হওয়া সহজসাধ্য ছিল না এবং মা’মুলী ফৌজী চৌকীও এই অভিযানের বাধা সৃষ্টি করার জন্য ছিল যথেষ্ট।
ইবন ইসহাক বলেনঃ মদীনার একদিকের অংশ বা রাস্তা ছিল উন্মুক্ত, বাকি সকল দিক বসতি ও খেজুর বাগানের কারণে পরস্পরের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। কোন দুশমন এর ভেতর দিয়ে অগ্রসর হতে পারত না।
রাসূলুল্লাহ (সা)ও মদীনাকে নির্বাচিত করতে গিয়ে সম্ভবত আল্লাহর সেই হেকমত ও মুসলিহাত (উপযোগিতা)-এর দিকে হিজরতের পূর্বেই ইঙ্গিত প্রদান করেছিলেন এবং এও বলেছিলেন, আমাকে তোমাদের দারুল-হিজরত দেখানো হয়েছে। এটি খেজুরের বাগিচাপূর্ণ এলাকা ও لابتين তথা পোড়া ও ইতস্তত
বিক্ষিপ্ত কংকরপূর্ণ দু’টি এলাকার মাঝখানে অবস্থিত। এরপর যাদের হিজরত করার ছিল তারা মদীনায় হিজরত করেছে।
মদীনার এই দু’টি গোত্র, যারা আওস ও খাযরাজ নামে বিখ্যাত ছিল- জাতীয় মর্যাদাবোধ, আত্মসম্মান, অশ্বারোহণ ও পুরুষোচিত শৌর্য-বীর্যের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট ছিল। তারা কারো সামনে কখনো মাথা নত করেনি। কোন বড় গোত্র কিংবা হুকুমতকে তারা কখনো ট্যাক্স ও জরিমানা দেয়নি। এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য আওস সর্দার হযরত সা’দ ইবন মু’আয (রা)-এর সেই বক্তব্যের মাঝে পাওয়া যাবে যা তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে খন্দক যুদ্ধের সময় বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমরা ও এরা শিরক ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিলাম। না আমরা আল্লাহর ইবাদত করতাম আর না আমরা তাঁকে চিনতাম। সে সময়ও তাদের (ইয়াহূদীদের) এই সাহস ছিল না যে, তারা মেহমানদারী কিংবা মূল্য প্রদান ব্যতিরেকে মদীনার একটি খেজুরও খাবে।”
ইবন খালদূন বলেন, “এই দু’টি গোত্র বা জ্ঞাতিগোষ্ঠীর ইয়াহূদীদের ওপর প্রাধান্য ছিল এবং সম্মান-সম্ভ্রম ও শান-শওকতের ক্ষেত্রে নাম করেছিল। তাদের নিকটবর্তী মুদার গোত্রের বসতি ছিল; তারাও ছিল তাদেরই মিল্লাতের অন্তর্গত।” বিখ্যাত আরব গ্রন্থকার ইবন ‘আব্দ রাব্বিহী তদীয় ইকদ্’ল ফরীদ গ্রন্থে লিখছেন :
আনসার গোত্র ছিল আযদ কবিলার শাখা। এদের আওস ও খাযরাজ বলা হয়। হারিছা ইবন ‘আমর ইবন আমরের দুই পুত্র থেকে এই বংশ-ধারা অব্যাহত থাকে। এসব লোক সমস্ত লোকের ভেতর অত্যন্ত আত্মসচেতন ও উন্নত মনোবল-সম্পন্ন ছিল এবং তারা কখনো কোন সম্রাট কিংবা হুকুমতকে রাজস্ব প্রদান করেনি।“
এ ছাড়া বনী ‘আদী ইবন নাজ্জার বনী হাশিমের ছিল মাতৃকূল। হাশিম তাদের বংশের এক মেয়ে সালমা বিনতে ‘আমরকে বিয়ে করেছিলেন। হাশিমের এক ছেলে ‘আবদুল-মুত্তালিবের এই ঘরে জন্ম হয়। হাশিম তাঁকে তাঁর মায়ের নিকট রেখে আসেন। যখন তিনি বড় হন এবং সাবালকত্বে উপনীত হওয়ার নিকটবর্তী হন তখন তাঁকে তাঁর চাচা মক্কায় নিয়ে আসেন। আরবের সমাজ জীবনে আত্মীয়-কুটুম্বের বিরাট গুরুত্ব ছিল এবং একে উপেক্ষা করা যেত না। হযরত আবূ আয়্যূব আনসারী (রা) ছিলেন এই বংশেরই একজন। মদীনায় পৌঁছে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর ঘরে অবস্থান করেছিলেন।
আওস ও খাযরাজ ছিল কাহতান বংশধর। মুহাজির ও যেসব লোক মক্কা ও এর চার পাশে তাদের আগেই ইসলাম কবুল করেছিল তারা ছিল আদনান বংশের। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন মদীনায় হিজরত করলেন এবং আনসাররা তাঁর সাহায্য ও সমর্থনে এগিয়ে এল তখন এর মাধ্যমে বনী আদনান ও কাহতান উভয়েই ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হল এবং দুই দেহ এক আত্মায় লীন হয়ে গেল। জাহিলিয়াত যুগে এদের মাঝে বিরাট দ্বন্দ্ব ও শত্রুতা ছিল। ইসলামের বরকতে শয়তান তাদের কাতারে প্রবেশের ও কুমন্ত্রণা দেবার রাস্তাই পায়নি। ফলে জাহিলী যুগের ন্যায়-অন্যায় সকল ক্ষেত্রেই গোত্রীয় পক্ষপাতিত্ব এবং ‘আদনান বংশের কিংবা কাহতান বংশের দাবির ব্যাপারে অযথা পক্ষপাতিত্ব, অহংকার ও অহমিকা প্রকাশের সুযোগটুকুও হারাতে বসে।
এই সমস্ত কার্যকারণ ও অগ্রাধিকারমূলক বৈশিষ্ট্যদৃষ্টে ইয়াছরিব রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাহাবা-ই কিরামের হিজরতের জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্থান ছিল। ইসলামের দাওয়াতের আবাসস্থল ও কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার এই শহর পূর্ণ হকদার ছিল। এমন কি সে এরও হকদার ছিল যে, ইসলাম পূর্ণ শক্তি ও সংহতি লাভ করুক, তার ভেতর সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার যোগ্যতা ও শক্তি পয়দা হোক এবং সে আরব উপদ্বীপকে জয় করতে পারুক এবং এরপর সেই সময়কার গোটা সভ্য জগতে আপন হেদায়াতের পতাকা ওড়াতে সক্ষম হোক।
মদীনায় ইসলামের বিস্তার
এখন আনসার (অর্থাৎ আওস ও খাযরাজ)-দের ঘরে ঘরে ইসলামের প্রচার শুরু হল। প্রথমে আওসের শাখা বনী আল-আশহালের সঙ্গে সম্পর্কিত ও তাদের কওমের সর্দার সা’দ ইবন মু’আয ও উসায়দ ইবন হুদায়র ইসলাম গ্রহণ করেন। তাদের ইসলাম গ্রহণের পেছনে বিরাট ভূমিকা ছিল প্রথম দিককার ইসলাম গ্রহণকারীদের ঈমানী হিকমত, স্নেহ-ভালবাসা ও মেহেরবাণীপূর্ণ আচরণ এবং মুস’আব ইবন ‘উমায়র (রা)-এর সর্বোত্তম পন্থায় দাওয়াত ও তাবলীগের। এরপর বনী ‘আব্দ আল-আশহালও ইসলাম কবুল করে। শেষ পর্যন্ত আনসারদের এমন কোন ঘর অবশিষ্ট ছিল না যার কোন না কোন পুরুষ ও মহিলা মুসলমান না হয়েছে।
আকাবার দ্বিতীয় বায়‘আত
পরবর্তী বছর মুস‘আব ইবন ‘উমায়র (রা) মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং আনসারদের কিছু মুসলমান মুশরিকদের একটি দলের সাথে, যারা হজ্জ আদায়ের
উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল- মক্কায় পৌঁছে এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে ‘আকাবার বায়‘আতের ওয়াদা করে। তারা হজ্জ সমাপ্তির পর রাত্রির এক-তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হতেই আকাবা উপত্যকার নিকটবর্তী একটি ঘাঁটিতে একত্র হয়। এদের সাকুল্যে সংখ্যা ছিল ৭৩ জন যাঁদের ভেতর দু’জন মহিলাও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) সেখানে তশরীফ নেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর চাচা আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবও ছিলেন। তখনও তিনি মুসলমান হননি।
রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন, তাঁদেরকে কুরআন মজীদ পাঠ করে শোনান, তাঁদেরকে আল্লাহর দিকে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানান এবং ইসলাম গ্রহণে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করেন। এরপর তিনি বলেন, আমি তোমাদেরকে একথার ওপর বায়‘আত নিচ্ছি যে, তোমরা আমাকে হেফাজতের ব্যাপারে ততটুকুই খেয়াল রাখবে ও যত্নবান হবে যতটুকু তোমরা আপন পরিবার-পরিজনদের ক্ষেত্রে করে থাক। এর ওপর তারা বায়‘আত করেন এবং হূযূর (সা)-এর থেকে এই অঙ্গীকার গ্রহণ করেন যে, তিনি তাঁদেরকে নির্বান্ধব ও সহায়হীন অবস্থায় পরিত্যাগ করবেন না এবং স্বীয় জাতিগোষ্ঠীর নিকটও ফিরে যাবেন না। তিনি ওয়াদা করেন এবং বলেন, আমি তোমাদেরই একজন এবং তোমরাও আমারই লোক। যার সঙ্গে তোমরা যুদ্ধ করবে, তার সঙ্গে আমিও যুদ্ধ করব। যার সঙ্গে তোমরা সন্ধি করবে, সমঝোতা করবে, আমিও তার সঙ্গে সমঝোতা ও সন্ধি করব। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁদের ভেতর থেকে বারজন যিম্মাদার ও সর্দার নির্বাচিত করেন : ন’জন খাযরাজ গোত্রের আর তিনজন আওস গোত্রের।
মদীনায় হিজরতের অনুমতি
আনসারদের এই গোত্র যখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাতে বায়‘আত করল এবং তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের সর্বপ্রযত্নে সাহায্য ও সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিল তখন থেকে বহু মুসলমান তাঁদের আশ্রয়ে চলে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) সেই সব মুসলমানদেরকে যাঁরা তাঁর সঙ্গে মক্কায় ছিলেন, মদীনার পানে হিজরতের ও আনসারদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, “আল্লাহ ‘আযযা ওয়া জাল্লা তোমাদের জন্য কিছু ভাই ও ঘরবাড়ির ব্যবস্থা করেছেন যেখানে তোমরা নিরাপদে থাকতে পার।” এ কথা শুনে লোকে দলে দলে হিজরত করতে লাগল। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় অবস্থানপূর্বক হিজরতের ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশের প্রতীক্ষায় থাকেন।
মক্কা থেকে মুসলমানদের হিজরত কোন তুচ্ছ ব্যাপার ছিল না যে, কুরায়শরা ঠান্ডা মস্তিষ্কে ও নির্বিকার চিত্তে তা মেনে নিয়েছে। তারা বসতির এই স্থানান্তর, তাদের চলাচল ও গতিবিধির পথে নানা প্রতিবন্ধকতা দাঁড় করায় এবং মুহাজিরদেরকে বিভিন্ন রকমের পরীক্ষা ও কষ্ট-তকলীফের মধ্যে নিক্ষেপ করতে শুরু করে। কিন্তু মুহাজিররাও তাঁদের এই রায় পালটাতে ও পশ্চাদপসরণ করতে তৈরি ছিলেন না। তাঁরা কোন মূল্যেই মক্কায় থাকা পছন্দ করতেন না। অনন্তর কাউকে নিজের বউ-বিবি ও বাচ্চা মক্কায় রেখে একাকী চলে যেতে হয়, যেমনটি আবূ সালামা (রা)-র ক্ষেত্রে ঘটেছিল। কেউ তাঁর সারা জীবনের কামাই ও পুঁজিপাট্টা থেকে হাত গুটিয়ে নেন, যেমনটি সুহায়ব (রা) করেছিলেন।
উম্মু সালামা (রা) স্বয়ং বর্ণনা করেন, যখন আবূ সালামা (রা) মদীনায় হিজরতের পাকাপোক্ত এরাদা করলেন, তখন সফরের জন্য নিজের উট তৈরি করলেন, আমাকে তার পিঠে চড়িয়ে দিলেন এবং আমার ছেলে সালামা ইবন আবী সালামাকে আমার কোলে দিলেন। এরপর উটের রশি হাতে নিলেন এবং রওয়ানা হলেন। যখন বনী আল-মুগীরার কিছু লোকের নজর তাঁর ওপর পড়ল তখন তারা তাঁর নিকট ছুটে এল এবং বলতে লাগল, তোমার পর্যন্ত তো ঠিক আছে, নিজের জান বাঁচিয়ে যাচ্ছ, কিন্তু তোমার স্ত্রীকে আমরা তোমার সাথে কিভাবে ছাড়তে পারি? তিনি বলেন, এই কথা বলে তারা উটের রশি তাঁর হাত থেকে ছিনিয়ে নিল এবং আমাকে সাথে করে নিয়ে গেল। এতদ্দৃষ্টে বন্ ‘আবদুল-আসাদ, যারা আবূ সালামার সমর্থক ছিল, ভীষণ উত্তেজিত ও ক্ষুব্ধ হল। তারা বলল, আল্লাহর কসম! তোমরা তাকে আমাদের ভাই থেকে কেড়ে রেখেছ। কিন্তু এখন আমরা আমাদের সন্তানকে তার কাছে কিছুতেই থাকতে দেব না। এরপর আমার বাচ্চাকে নিয়ে তাদের ভেতর টানাটানি শুরু হয়ে গেল। উভয়েই বাচ্চা টানাটানি করতে গিয়ে বাচ্চার হাতই উপড়ে ফেলার উপক্রম করে। শেষাবধি বনী আবদুল আসাদ তাকে ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয় এবং নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যায়। বন্ আল-মুগীরা আমাকে তাদের আয়ত্তে নিয়ে নেয়। আমার স্বামী মদীনা রওয়ানা হয়ে পড়েছিলেন। এভাবে আমার সন্তান, স্বামী ও আমি পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। আমি প্রতিদিন সকালে বাইরে বেরিয়ে আসতাম, আবতাহ নামক স্থানে বসে পড়তাম এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত কাঁদতে থাকতাম। আর এভাবেই কেটে যায় এক বছর। একদিন বনী আল-মুগীরার আমার অন্যতম পিতৃব্য পুত্র আমাকে এমতাবস্থায় দেখতে পেয়ে আমার প্রতি দয়াপরবেশ হয়। সে বনী আল-মুগীরাকে গিয়ে বলল : তোমরা এই অসহায় মহিলাটাকে কেন আটকে রেখেছ? কেন তোমরা তাকে ছেড়ে দিচ্ছ না? তোমরা তাকে তার স্বামী-পুত্র থেকে মাহরূম করেছ। এতে তারা বলতে লাগল :
যদি তোমার মন চায় তবে তুমি তোমার স্বামীর কাছে চলে যেতে পার। সে সময় বনী আবদ্’ল-আসাদ আমার সন্তানকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেয়। আমি আমার উট তৈরি করলাম, আমার বাচ্চা কোলে নিলাম এবং স্বামীর সন্ধানে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। এ সময় আমার সাথে আল্লাহর কোন বান্দা ছিল না। আমি যখন “তানঈম” পর্যন্ত পৌঁছলাম তখন সেখানে বনী আবদুদ্- দার এর উছমান ইবন তালহার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি আমাকে দেখেই বলে ওঠেন : আবূ উমাইয়ার মেয়ে! কোথায় চলেছ তুমি? আমি বললাম : মদীনায় আমার স্বামীর কাছে যাবার ইচ্ছা রয়েছে। তিনি আবার বললেন : তোমার সাথে আর কেউ (কোন পুরুষ) আছে? আমি জবাব দিলাম : আমার সাথে আল্লাহ আর এই বাচ্চা ছাড়া আর কেউ নেই। বললেন : আল্লাহর কসম! তোমার পক্ষে উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা সহজসাধ্য হবে না। এই বলে তিনি উটের রশি নিজের হাতে তুলে নিলেন এবং আমাকে নিয়ে সামনে রওয়ানা হলেন। আল্লাহর কসম! যাদেরকে আমি এ পর্যন্ত দেখেছি তাদের মধ্যে কাউকেই আমি তাঁর চেয়ে বেশি শরীফ ও দয়ার্দ্রচিত্ত দেখিনি। যখনই কোন মনযিল আসত ও থামবার দরকার হত তিনি উট বসিয়ে নিজে দূরে সরে যেতেন। আমি উটের পিঠ থেকে নেমে এলে তিনি উটের কাছে গিয়ে সামানপত্র নামাতেন। এরপর উটটা একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে নিজে কোন গাছের ছায়ায় শুয়ে পড়তেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে ও রওয়ানা হওয়ার সময় হলে তিনি উঠে পড়তেন, উট প্রস্তুত করতেন, সামানপত্র উটের পিঠে বোঝাই করতেন, এরপর সেখান থেকে কিছুটা দূরে সরে যেতেন এবং আমাকে উটের পিঠে বসতে বলতেন। আমি ভালোভাবে বসলে তিনি এসে উটের রশি ধরতেন এবং এভাবে পরবর্তী মনযিল পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছতেন। এভাবেই তিনি আমাকে মদীনায় পৌঁছে দেন। তিনি যখন বনী আমর ইবন আওফের গ্রাম “কুবা” দেখতে পেলেন তখন আমাকে বললেন : তোমার স্বামী এই গ্রামে আছেন (আবূ সালামা এখানেই অবস্থান করছিলেন)। এখন তুমি আল্লাহর নাম নিয়ে সেখানে চলে যাও। এই বলে তিনি আমাকে বিদায় দিলেন এবং মক্কায় রওয়ানা হলেন।
তিনি বলতেন, ইসলামে কোন পরিবারকেই সেই তকলীফ বইতে হয়নি যেই তকলীফ বয়েছে আবূ সালামা (রা)-র পরিবারবর্গ এবং আমি কাউকে উছমান ইবন তালহা (রা)-র চেয়ে বেশি শরীফ ও অদম্য মনোবলসম্পন্ন পাইনি।
সুহায়ব রূমী (রা) যখন হিজরত করতে মনস্থ করলেন তখন কুরায়শ
কাফিরগণ তাঁকে বলল, তুমি একজন অবজ্ঞাত ও দরিদ্র অসহায় হিসাবে আমাদের কাছে এসেছিলে। আমাদের এখানে থেকে তুমি এত বড় ধনী ও সম্পদশালী হয়েছ এবং এত বিরাট মর্যাদার অধিকারী হয়েছ। আর এখন চাচ্ছ যে, তুমি তোমার সমস্ত সাজ-সামান, আসবাব ও জানমাল নিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে যাবে। আল্লাহর কসম! এ হতে পারে না। সুহায়ব (রা) তাদেরকে বললেন, যদি আমি এ সব কিছুই তোমাদেরকে দিয়ে দেই তাহলে কি তোমরা আমাকে যেতে দেবে? তারা বলল, হ্যাঁ। সুহায়ব (রা) বললেন : তবে এই নাও, আমার যা কিছু তোমাদেরকে দিয়ে দিলাম।
রাসূলুল্লাহ (সা) যখন এই ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারলেন তখন তিনি বললেনঃ ربح صهيب – ربح صهيب সুহায়ব লাভবান হয়েছে, সুহায়ব লাভবান হয়েছে।
এ সময় আর যারা মদীনায় হিজরত করেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন হযরত ওমর, তালহা, হামযা, যায়দ ইবনে হারিছা, ‘আবদুর রহমান ইবনে আওফ, যুবায়র ইবনু’ল-আওয়াম, আবূ হুযায়ফা, ‘উছমান ইবন আফফান (রা) ছাড়াও আরও বহু সাহাবায়ে কিরাম। এরপর হিজরতের সিলসিলা শুরু হয়ে যায় এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে মক্কায় দু’জন লোক (হযরত আবূ বকর ও হযরত আলী) ছাড়া কেবল তাঁরাই ছিলেন যাঁরা কোন সঙ্গত ওযরের কারণে যেতে পারেনি অথবা যাঁরা কোন পরীক্ষা ও সংকটে পড়েছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বিরুদ্ধে কুরায়শদের ষড়যন্ত্র ও তার ব্যর্থতা
কুরায়শরা যখন দেখতে পেল যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মদীনায় এমত পরিমাণ মদদগার ও সহায় সৃষ্টি হয়ে গেছে যে, সেখানে আর তাদের ওপর কোন জোর-যবরদস্তি চলবে না, তখন তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-র মদীনায় হিজরত থেকে খুবই বিপদ ও ভয়ের আশঙ্কা করল। তারা ভাবল যে, যদি তিনি মদীনায় চলে যান তাহলে আর তাঁকে পায় কে? কোনভাবেই আর তাঁকে বাগে আনা যাবে না। অতএব যা করবার তা এখনই করতে হবে, নইলে আর কখনো নয়। এই ভেবে তারা সকলে দারুন-নদওয়ায় (যা আসলে কুসায়্যি ইবন কিলাবের ঘর ছিল এবং কুরায়শরা তাদের সকল গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো সম্পর্কে এখানেই সিদ্ধান্ত নিত ও নিষ্পত্তি করত) সমবেত হল এবং এই সমস্যা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করল। এ সময় কুরায়শদের বড় বড় সর্দার সবাই বর্তমান ছিল।
শেষে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, প্রতি গোত্র থেকে একজন সাহসী, উদ্যমী ও সদ্বংশজাত যুবক বাছাই করা হোক। তারা সকলে মিলে একযোগে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর হামলা করবে। তাতে এই হত্যার দায় সকল গোত্রের মধ্যে বণ্টন হয়ে যাবে। কারও একার ওপর এর দায়-দায়িত্ব বর্তাবে না। তাহলে বনী আবদে মানাফ সমগ্র কওমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ঝুঁকি নেবে না। এরপর লোকেরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং “সার্বিক পাপ” সংঘটনের এই সিদ্ধান্ত এভাবেই গৃহীত হয়।
আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূল (সা)-কে শত্রুদের এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক ও অবহিত করেন। তিনি হযরত আলী (রা)-কে তাঁর বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ার নির্দেশ দেন এবং এও বলেন, তাঁর জীবনের ওপর কোনরূপ বিপদাশঙ্কা নেই।
এদিকে ষড়যন্ত্রকারীরা সকলে সম্মিলিতভাবে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দরজায় সশস্ত্র অবস্থায় এসে দাঁড়ায়। তারা আক্রমণের জন্য ছিল সম্পূর্ণ প্রস্তুত। রাসূল (সা) বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং অল্প কিছু মাটি হাতে তুলে নিলেন। এ সময়ই আল্লাহ তা’আলা তাদের দৃষ্টিশক্তি হরণ করে নেন। অতঃপর তিনি তাদের মাথার ওপর মাটি ছিটাতে ছিটাতে এবং সূরা ইয়াসীনের আয়াত فَأَغْشَيْنَاهُمْ فَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ পর্যন্ত তেলাওয়াতরত অবস্থায় পরিষ্কার তাদের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন, কেউ জানতেও পারল না।
এরই মাঝে এক আগন্তুক এসে তাদেরকে বলল : তোমরা কিসের ও কার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছ? তারা বলল : মুহাম্মাদের অপেক্ষায় আছি। আগন্তুক বলল : ব্যর্থ অপদার্থের দল! সে তো চলে গেছে এবং যেখানে যাবার সেখানকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে। তারা সকলেই ঘরের ভিতর উঁকি মেরে দেখল যে, একজন লোক বিছানায় শুয়ে আছে। তাদের নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মাল যে, বিছানায় শায়িত ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা) না হয়েই যায় না! ভোর হলে দেখা গেল হযরত আলী (রা) বিছানা ছেড়ে উঠছেন। এ দৃশ্যে তারা খুবই লজ্জিত হল এবং সকলে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে গেল।
রাসূলুল্লাহ (সা)-র মদীনায় হিজরত
রাসূলুল্লাহ (সা) আবূ বকর (রা)-এর নিকট গেলেন এবং বললেন : আল্লাহ তা’আলা আমাকে এখান থেকে বের হওয়ার এবং হিজরত করার অনুমতি দিয়েছেন। হযরত আবূ বকর (রা) বললেন : الصحبة يا رسول الله ইয়া
রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার সঙ্গী ও সহচর হবার প্রত্যাশী। তিনি বললেন : الصحبة হ্যাঁ, তুমিই এ সফরে আমার সাথী হবে। হযরত আবূ বকর (রা) এতচ্ছ্রবণে আনন্দে কেঁদে ফেলেন। এরপর তিনি রাসূল (সা)-এর খেদমতে দুটো উট আরোহণের জন্য পেশ করেন যা তিনি এই সফরের উদ্দেশ্যে পূর্ব থেকেই প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনে উরায়কিতকে তিনি পথপ্রদর্শক হিসাবে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নিযুক্ত করেন।
আশ্চর্য বৈপরীত্য
কুরায়শরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে এত পরিমাণ শত্রুতা ও তাঁর বিরোধিতায় এতখানি ঐক্যবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বিশ্বস্ততা, সততা, উদারতা, আমানতদারী ও অদম্য মনের ওপর ছিল পূর্ণ আস্থাশীল। সমগ্র মক্কায় যদি কারো কোন জিনিস বিনষ্ট হবার কিংবা ছিনতাই হবার আশঙ্কা দেখা দিত তবে সে উক্ত বস্তু রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট গচ্ছিত রেখে দিত। এভাবে তাঁর নিকট বিভিন্ন ধরনের আমানত রক্ষিত ছিল। তিনি হযরত আলী (রা)-কে এসবের যিম্মাদার বানিয়ে যান যাতে তিনি মক্কায় থেকে এসব আমানত তার প্রকৃত মালিকদেরকে ফেরত দিতে পারেন। যতক্ষণ না তিনি তা পালন করতে পারবেন ততক্ষণ পর্যন্তই কেবল তিনি মক্কায় অবস্থান করবেন। আল্লাহ তা’আলা সত্যই ইরশাদ করেছেন :

“আমি জানি যে ওদের (কাফিরদের) কথা তোমাকে কষ্ট দেয়, আর তারা তো তোমাকে মিথ্যাবাদী বলে না, বরং জালিমরা আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করে থাকে” (সূরা আন’আম : ৩৩)।
হিজরত থেকে একটি শিক্ষা
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর এই হিজরত থেকে সর্বপ্রথম যে কথা প্রমাণিত হয় তা এই যে, দাওয়াত ও ধর্ম বিশ্বাসের খাতিরে যে কোন প্রিয় ও ভালবাসার, যে কোন পরিচিত ও কাঙ্ক্ষিত বস্তু এবং এমন প্রতিটি বস্তুকে যাকে ভালবাসা, যাকে অগ্রাধিকার প্রদান এবং যাকে যে কোন মূল্যে আঁকড়ে ধরার প্রেরণা মানুষের সুস্থ ও স্বাভাবিক প্রকৃতির অন্তর্গত, বেদরেগ কুরবানী করা যায়, কিন্তু প্রথমোল্লিখিত দুটি বস্তুকে কোন জিনিসের বিনিময়েই পরিত্যাগ করা যেতে পারে না।
মক্কা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জন্মস্থান এবং তাঁর ও সাহাবায়ে কিরাম (রা)-এর কেন্দ্র ও স্বদেশ হওয়া ছাড়াও হৃদয়ে চুম্বকের মতোই আকর্ষণীয় ছিল। আর তা এ জন্যও যে, এ শহরেই বায়তুল্লাহ তথা আল্লাহর ঘর অবস্থিত যার প্রতি ভালবাসা তাঁদের আত্মা ও রক্তের কণিকায় অনুপ্রবিষ্ট ছিল। কিন্তু এগুলোর কোনটিই রাসূল (সা) ও সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে দেশত্যাগ ও পরিবার-পরিজনকে বিদায় জানানো থেকে বিরত রাখতে পারেনি। কিন্তু যমীন এই আকীদা-বিশ্বাস ও দাওয়াতের জন্য একেবারেই সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল এবং মক্কাবাসীরা এ দু’টো বস্তু থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
মানবীয় সম্পর্ক ও ভালবাসা এবং ঈমানী শক্তি ও আগ্রহ-উদ্দীপনার এই মিলিত প্রেরণা রাসূল (সা)-এর এই বাক্য থেকে স্পষ্ট প্রতিভাত হয় যা তিনি হিজরত কালে মক্কাকে সম্বোধন করে বলেছিলেনঃ

“(প্রিয় মক্কা!) কত সুন্দর শহর তুমি আর আমার কত প্রিয় ও ভালবাসার তুমি! যদি আমার কওম আমাকে এখান থেকে বের করে না দিত তাহলে তোমাকে ছাড়া অন্য কোথাও আবাস গড়তাম না, বসবাস করতাম না।”
এটি ছিল আল্লাহ্ তা’আলার সেই নির্দেশ পালন :

“বান্দা আমার! যারা ঈমান এনেছ (তারা জেনে রাখ), আমার যমীন খুব প্রশস্ত; অতএব একমাত্র আমারই ইবাদত কর” (সূরা ‘আনকাবূত, ৫৬ আয়াত)।
ছওর গিরিগুহার দিকে
রাসূলুল্লাহ (সা) ও হযরত আবূ বকর (রা) মক্কা থেকে গোপনে চুপিসারে রওয়ানা হন। আবূ বকর (রা) তদীয় পুত্র ‘আবদুল্লাহকে বলে রেখেছিলেন যে, সে যেন খবর রাখে, লোকে তাদের সম্পর্কে কি ধরনের কানাকানি করছে। স্বীয় গোলাম ‘আমের ইবন ফুহায়রার প্রতি তাঁর নির্দেশ ছিল সে যেন সারা দিন তার বকরী চরায় এবং সন্ধ্যাবেলায় তাঁদেরকে দুধ পৌঁছে দেয়। আসমা বিনতে আবী বকর (রা) তাঁদের খাবার পৌঁছে দিতেন।
প্রেমের অপূর্ব ঝলক
প্রেম বা ভালবাসা মানব সৃষ্টি থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এমন একটি ইলহামী বা ঐশী প্রেরণা হিসাবে স্থায়ী ও চিরন্তন হয়ে আছে যা নাযুক থেকে নাযুকতর কথা বা বিষয়ের দিকে নিজেই স্বয়ং পথ-প্রদর্শন করে আর রাস্তা বুঝিয়ে দেয়। এই عشق والا ব্যাপারটা তার প্রেমাষ্পদ থেকে এক মুহূর্তের জন্যও গাফিল হয় না এবং কল্পনা থেকে ধারণাপ্রসূত বস্তুর বিপদাশঙ্কা অনুভব করে ফেলে। এই সফরে রাসূলুল্লাহ (সা)-র সঙ্গী হযরত আবূ বকর (রা)-এরও অবস্থা ছিল কতকটা এ ধরনেরই। অনন্তর বর্ণিত আছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (সা) গুহার দিকে রওয়ানা হলেন তখন হযরত আবূ বকর চলার সময় কখনও তাঁকে আগে রেখে পেছনে চলতেন, আবার কখনো বা পেছনে রেখে নিজে সামনে চলতেন। এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (সা) ব্যাপারটা বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করেন, আবূ বকর! কী ব্যাপার, কখনো তুমি আমার পেছনে পেছনে চল, আবার কখনো বা আগে? আবূ বকর (রা) উত্তরে বলেন : হে আল্লাহর রাসূল! যখন আমি দুশমনের পশ্চাদ্ধাবনের কথা মনে করি তখন আমি আপনার পেছনে চলি, অতঃপর সামনে থেকে যখন শত্রুর অতর্কিত আক্রমণের আশঙ্কা হয় তখন আমি আপনার সম্মুখে যাই।
উভয়ে যখন গুহা মুখ পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন তখন হযরত আবূ বকর (রা) বললেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি একটু থামুন। আমি গুহার ভেতর-বাইরে ভালোভাবে দেখে নেই আর ধুলি-ময়লা কিছু থাকলে ভেতরটা পরিষ্কার করে নেই। এরপর তিনি গুহার ভেতর প্রবেশ করেন এবং তা সাফ-সুথরা করে যেসব গর্ত ও ফাঁক-ফোকর ছিল সেগুলো বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এলেন। সে সময় তাঁর মনে পড়ল যে, ভেতরের একটি গর্ত এখনও বন্ধ করা বাকি যেটি তিনি ঠিকমত দেখতে পাননি। তিনি পুনরায় আরয করলেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আর একটু অপেক্ষা করুন, আমি সেটি আরেকবার দেখে নেই। তিনি পুনরায় গুহার ভেতর প্রবেশ করলেন। যখন তিনি পরিপূর্ণরূপে নিশ্চিত হলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সা)-কে ভেতরে প্রবেশের অনুরোধ জানালেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ভেতরে তশরীফ নেন।
আসমানী সাহায্য ও গায়েবী মদদ
উভয়ে যখন গুহায় প্রবেশ করলেন তখন আল্লাহ্ তা’আলা মাকড়সা পাঠালেন। সে গুহার মুখে যে গাছ ছিল তার মাঝে জাল বুনল এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-কে আড়াল করে দিল। এরই সাথে আল্লাহ তা’আলা দু’টো কবুতর পাঠিয়ে দিলেন যারা
বাক-বাকুম ডেকে অবশেষে গুহামুখে এসে বসে গেল।
আল্লাহ্রই হাতে আসমান ও যমীনের বাহিনী।

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নাযুক মুহূর্ত
এদিকে মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সা) -এর পশ্চাদ্ধাবন শুরু করল। এ ছিল মানবতার সুদীর্ঘ সফরের সবচেয়ে নাযুক ও চরম ক্রান্তিলগ্ন অথবা এ ছিল এমন এক দুর্ভাগ্য যার কোন শেষ ছিল না কিংবা এমন এক সৌভাগ্যের সূচনা যার কোন সীমা ছিল না। মানবতা অস্থিরভাবে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় এবং নিশ্চল ও निष्প্রাণ ভঙ্গিতে সেই সব গুপ্তচর ও পশ্চাদ্ধাবনকারীদেরকে বিস্ময় বিস্ফারিত নেত্রে দেখছিল যারা সেই মুহূর্তে গুহার মুখে দাঁড়িয়েছিল এবং এতটুকু বাকি ছিল যে, তাদের মধ্যে কেউ নিচের দিকে তাকাবে আর দেখে ফেলবে। কিন্তু আল্লাহর কুদরত তাদের ও তাদের পদক্ষেপের মাঝে বাঁধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে গেল এবং তারা প্রতারিত হল। তারা দেখল গুহার মুখে মাকড়সার জাল। ফলে তাদের ধারণায়ও আসেনি যে, ভেতরে কেউ থাকতে পারে।
এই ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন :

لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا চিন্তিত হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে
সেই মুহূর্তে হযরত আবূ বকর (রা)-এর দৃষ্টি ওপরে উঠতেই মুশরিকদের আগমনের আভাস পেলেন। তিনি বললেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! তারা আর এক কদম ও যদি অগ্রসর হয় তাহলে আমাদেরকে দেখে ফেলবে। রাসূল (সা) জবাব দিলেনঃ مَا ظَنُّكَ بِاثْنَيْنِ اللَّهُ ثَالِثُهُمَا “সেই দু’জনের সম্পর্কে তোমার কি ধারণা যাঁদের তৃতীয় জন আল্লাহ?” এ সূত্রেই আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াত নাযিল করেন :

“দু’জনের একজন যখন তারা দু’জনে গুহার ভেতর ছিলেন যখন তিনি তাঁর সাথীকে বলেছিলেন : ঘাবড়িও না, দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই ; আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন” (সূরা তাওবাহ : ৪০ আয়াত)।
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পশ্চাদ্ধাবনে সুরাকার যাত্রা
কুরায়শরা চতুর্দিকে ঘোষণা করে দিয়েছিল যে, যে কোন লোক রাসূলুল্লাহ (সা)-কে গ্রেপ্তার করে আনতে পারবে তাকে এক শত উটনী পুরস্কারস্বরূপ প্রদান করা হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) আবূ বকরসহ গুহায় তিন রাত্রি অতিবাহিত করার পর উভয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হলেন। আমের ইবন ফুহায়রা ও ‘আবদুল্লাহ ইবন উরায়কিত, যাঁদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা) পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পথপ্রদর্শক হিসাবে সাথে নিয়েছিলেন, সমুদ্র উপকূলের দিকে তাঁদেরকে নিয়ে চলেন।
সুরাকা ইবন মালিক ইবন জু’শামকে পুরস্কারের লোভ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পশ্চাদ্ধাবনে প্ররোচিত করে এবং শত উটনীর আগ্রহে অশ্বপৃষ্ঠে সওয়ার হয়ে তাঁর পদচিহ্ন অনুসরণে পশ্চাদ্ধাবন শুরু করে। কিন্তু হঠাৎ তার ঘোড়া হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। কিন্তু এরপরও সে হার মানতে রাজি নয়। রাসূল (সা)-এর পায়ের চিহ্ন ধরে সামনে অগ্রসর হতে থাকে। দ্বিতীয়বার তার ঘোড়া হোঁচট খেলে সে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যায়। অতঃপর পুনরায় সে অশ্বপৃষ্ঠে সওয়ার হয়ে পশ্চাদ্ধাবন শুরু করে, এমন কি সে যাত্রীদলকে সামনে অগ্রসরমাণ দেখতে পায়। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তার ঘোড়া কঠিনভাবে হোঁচট খায় এবং তার সামনের দু’টো পা মাটির মধ্যে ধসে যায় আর সুরাকা মাটিতে নিক্ষিপ্ত হয়। এরই সাথে সেখান থেকে ঘূর্ণি আকারে ধোঁয়া উঠতে থাকে।
এতদ্দৃষ্টে সুরাকা পরিষ্কার বুঝতে পারল যে, স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সহায় ও মদদগার এবং সর্বাবস্থায় তিনিই জয়যুক্ত হবেন। অতএব, সে জোরে ডাক দিল এবং বলল, আমি সুরাকা ইবন জু’শাম। আমাকে কথা বলার অনুমতি দিন। আমা দ্বারা আপনাদের কোন ক্ষতি হবে না। রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত আবূ বকর (রা)-কে বললেন, ওকে জিজ্ঞেস করুন সে আমাদের কাছে কি চায়? সুরাকা বলল, আপনি মেহেরবানী করে আমাকে কিছু লিখিত দিন যা আমার ও আপনার মাঝে নিদর্শন ও স্মৃতি হিসাবে রক্ষিত থাকবে। আমের ইবন ফুহায়রা হাড় কিংবা ঝিল্লির ওপর কিছু লিখে তাকে দেন।
একটি কল্পনাতীত ও বুদ্ধির অগম্য ভবিষ্যদ্বাণী
ঠিক এমনি এক অবস্থায় যখন রাসূলুল্লাহ (সা) নিজেই দেশ ত্যাগে মজবুর,
যখন তাঁর পক্ষে মক্কায় অবস্থান করা অসম্ভব, চারদিক থেকে শত্রু কর্তৃক পরিবেষ্টিত, সতর্ক ও শ্যেন দৃষ্টি তাঁকে অনুসরণ করছে, রাসূলুল্লাহ (সা)-র দৃষ্টি তখন দৃষ্টিসীমার বাইরে সেখানে গিয়ে উপস্থিত যেদিন তাঁরই গোলাম পারস্য সম্রাট কিসরার শাহী মুকুট ও রোম সম্রাট কাইজারের সিংহাসন তাদের পদযুগল দ্বারা মথিত করবে এবং ভূপৃষ্ঠের সঞ্চিত ধনভাণ্ডারের মালিক হবে। তিনি নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের মাঝেও সেই জ্বলজ্বলে আলোকিত ভবিষ্যদ্বাণী করেন এবং সুরাকাকে লক্ষ্য করে বলেন : সুরাকা! সে সময় তোমার অবস্থা কেমন হবে যখন পারস্য সম্রাটের কঙ্কন তুমি তোমার হাতে পরবে?
নিশ্চিতই আল্লাহ তাঁর নবীর সঙ্গে সাহায্য-সমর্থন, প্রকাশ্য ও অবধারিত বিজয় এবং তাঁর দীনের প্রাধান্য, উত্থান ও পরিপূর্ণ বিজয়ের ওয়াদা করেছিলেন।

“তিনিই তাঁর রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য-সুন্দর দীনসহ পাঠিয়েছেন যাতে সেই দীনকে (দুনিয়ার) সমস্ত দীনের ওপর বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, যদিও তা মুশরিকদের নিকট অপ্রীতি কর হয়” (সূরা তাওবা : ৩৩ আয়াত)।
স্বল্প দৃষ্টি ও বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা এই সত্যকে অস্বীকার করেছে, প্রত্যাখ্যান করেছে, কুরায়শরা একে অসম্ভব বিষয় ভেবেছে, কিন্তু নবুওয়াতের দৃষ্টি দূরবর্তী বিষয়কে কাছে দেখছিল।

“আল্লাহ অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন না।”
এটি হরফে হরফে সত্যে পরিণত হয়েছে। যখন হযরত ওমর (রা)- এর সামনে পারস্য সম্রাট কিসরার কঙ্কন, তাঁর কোমর বন্ধনী, মেখলা ও শাহী মুকুট এনে হাজির করা হয় তখন তিনি সুরাকাকে ডেকে পাঠান এবং তাকে এসব পরিধান করান। আর এভাবেই রাসূলুল্লাহ (সা)-র ভবিষ্যদ্বাণী হরফে হরফে পূর্ণতা পায়। সুরাকা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সামনে রাহা খরচ ও জরুরী সামানও পেশ করেছিল, কিন্তু তিনি তা কবুল করেননি। কেবল এতটুকু বলেছিলেন :
اخف عنا “আমাদের খবর গোপন রাখবে, কাউকে বলবে না।”
বরকতময় ব্যক্তি
রাসূলুল্লাহ (সা) ও হযরত আবূ বকর (রা) তাঁদের সফরকালে উম্মু মা’বাদ আল-খুযা’ঈয়ার পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন। তার ছিল একটি বকরী। দানাপানি ও ঘাসের স্বল্পতার দরুন বকরীর দুধ শুকিয়ে গিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) তার পালানের ওপর হাত বুলিয়ে দিলেন, আল্লাহর নাম নিলেন এবং দু’আ করলেন। ঠিক তন্মুহূর্তেই পালান দুধে পরিপূর্ণ হল। অতঃপর দুধ দোহন করা হলে তিনি উম্মু মা’বাদ ও নিজের সাথীদেরকে তা পান করতে দিলেন। সবাই পেট ভরে ও তৃপ্তি সহকারে দুধ পান করলেন। এরপর মহানবী (সা) নিজেও পান করলেন। অতঃপর পুনরায় দুধ দোহন করা হলে পাত্র ভর্তি হয়ে গেল। আবূ মা’বাদ ঘরে ফিরে পাত্র ভর্তি দুধ দেখে ব্যাপার কি জানতে চাইল। উম্মু মা’বাদ বলল ⦂ আল্লাহর কসম! একজন বরকতময় লোক আমাদের এখান দিয়ে গেছেন। তিনি এ ধরনের কথাও বলেছেন, এই বলে সে রাসূল (সা)-এর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে প্রশংসা করল। এ কথা শুনে আবূ মা’বাদ বলল ⦂ আল্লাহর কসম! মনে হচ্ছে, ইনি সেই লোক কুরায়শরা যাঁর সন্ধান করে ফিরছে।
রাহবার তাঁদের দু’জনকে সাথে করে সফর অব্যাহত রাখল। অতঃপর এক সময় তাঁরা মদীনার উপকণ্ঠে কুবা পল্লীতে পৌঁছলেন। এটি ছিল ১২ রবিউল আউয়াল সোমবারের ঘটনা। আর এই তারিখ থেকেই হিজরী তথা ইসলামী বর্ষপঞ্জী শুরু হয়।