আখলাক ও শামায়েল
রাসূলুল্লাহ (সা) কেমন ছিলেন
রাসূলুল্লাহ (সা)-র চরিত্র ও ব্যবহার, মহান গুণাবলী ও আচার-অভ্যাস সম্পর্কে উম্মুল-মু’মিনীন হযরত খাদীজা (রা)-এর সন্তান এবং হযরত হাসান ও হুসায়ন (রা)-এর মামা হিন্দ (রা) ইবন আবী হালা খুবই ব্যাপক ও বাগ্মিতাপূর্ণ ভাষায় বর্ণনা দান করেছেন। তিনি বলেন:
“রাসূলুল্লাহ (সা) সব সময় আখেরাতের চিন্তায় ও পারলৌকিক বিষয় নিয়ে চিন্তামগ্ন থাকতেন। এক্ষেত্রে তাঁর একটি ধারাবাহিকতা ছিল। এ চিন্তা তাঁকে সব সময় অস্থির করে রাখত। অধিকাংশ সময় তিনি দীর্ঘ নীরবতা পালন করতেন, বিনা প্রয়োজনে কথা বলতেন না। কথা বলতে শুরু করলে কথাগুলো বেশ ভালভাবে উচ্চারণ করতেন এবং সেভাবেই শেষ করতেন। তাঁর আলোচনা ও বর্ণনা খুব পরিষ্কার, স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থতামুক্ত হত। কথা অনাবশ্যকভাবে দীর্ঘ যেমন হত না, তেমনি তা খুব সংক্ষিপ্তও হত না (বরং পরিমিত হত)। তিনি নরম মেজাজের ও নম্রভাষী ছিলেন, কর্কশ ও রূঢ়ভাষী ছিলেন না। তিনি কাউকে যেমন ঘৃণা কিংবা অবজ্ঞা করতেন না, তেমনি কেউ তাঁকে অবজ্ঞা বা ঘৃণা করুক তাও পছন্দ করতেন না অর্থাৎ তিনি দুর্বল প্রকৃতির লোক ছিলেন না যে সব কিছুই মেনে নেবেন, বরং প্রভাবমণ্ডিত মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। নে’মতের বিরাট কদর করতেন এবং খুব বেশি মনে করতেন, চাই পরিমাণে যতই স্বল্প হোক না কেন, এমন কি তা চোখে না পড়ার মত বিষয়ও যদি হয় এবং এর ত্রুটি বা খুঁৎ ধরতেন না। খানাপিনার বস্তুর দোষ ধরতেন না যেমন, তেমনি প্রশংসাও করতেন না। পার্থিব ও পার্থিব বিষয় সম্পর্কিত কোন বিষয়ের ওপর ক্রোধান্বিত হতেন না। কিন্তু আল্লাহর কোন হক নষ্ট হতে দেখলে সে সময় তাঁর জালাল তথা তেজস্বিতার সামনে কোন কিছুই তিষ্ঠাতে
পারত না যতক্ষণ না তিনি তার বদলা নিতেন। তিনি নিজের ব্যাপারে কখনও ক্রুদ্ধ হননি এবং কারো থেকে কখনও প্রতিশোধও গ্রহণ করেননি। ইশারা করতে হলে গোটা হাত কাজে লাগাতেন। কোন বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করতে হলে একে উল্টে দিতেন। কথা বলার সময় ডান হাতের তালুকে বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির সঙ্গে মেলাতেন। রাগের কিংবা অপসন্দনীয় কথা হলে শ্রোতার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করতেন না। খুশী হলে চোখ নামিয়ে ফেলতেন। তাঁর হাসি বেশির ভাগ সময় মুচকি হত যার ফলে বৃষ্টিস্নাত মেঘের আড়াল থেকে সূর্য উঁকি দেবার মত তাঁর মুক্তার মত উজ্জ্বল শুভ্র দাঁতগুলো দেখা যেত।”
হযরত আলী (রা) ছিলেন তাঁর খানদানেরই লোক। তিনি লেখাপড়ার ও জানাশোনার ব্যাপক সুযোগ পেয়েছিলেন এবং যাঁর দৃষ্টি মানুষের মনস্তত্ত্ব ও চরিত্রের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলোর গভীরে প্রবেশ করেছিল। তিনি ছিলেন তাঁর একান্ত নিকটজন ও কাছের মানুষ। এরই সাথে মানুষের গুণাবলীর প্রকাশে ও দৃশ্য বর্ণনায় যিনি ছিলেন সবচেয়ে পারঙ্গম। তাঁর “মহান চরিত্র” (خُلُقٍ عَظِيمٍ) সম্পর্কে তিনি বলেন:
“তিনি প্রকৃতিগতভাবেই খারাপ কথা বলা, নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনা থেকে দূরে অবস্থান করতেন এবং অনিচ্ছাকৃতভাবেও এমন কোন বিষয় তাঁর থেকে প্রকাশ পেত না। বাজারে তিনি কখনো উচ্চ স্বরে কথা বলেন নি। মন্দের বদলা কখনো মন্দের দ্বারা নিতেন না, বরং ক্ষমা করতেন। তিনি কখনো কারো ওপর হাত তোলেননি একমাত্র জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ ছাড়া। কখনো কোন খাদেম কিংবা মহিলার ওপর হাত ওঠাননি। কোন প্রকার জুলুম কিংবা প্রতিশোধ নিতে কেউ কখনো দেখেনি যতক্ষণ না কেউ আল্লাহর নির্ধারিত হুদূদ বা সীমারেখা অতিক্রম করত এবং তাঁর সম্মান ও মর্যাদার ওপর আঁচ পড়ত। তবে হ্যাঁ, আল্লাহ তা’আলার কোন হুকুম নষ্ট করা হলে এবং তাঁর মর্যাদার ওপর আঘাত এলে তিনি এর জন্য সবচেয়ে ক্রোধান্বিত হতেন। দুটি জিনিস সামনে এলে সহজতরটিকে নির্বাচিত করতেন। যখন নিজের ঘরে তাশরীফ নিতেন তখন সাধারণ মানুষের মতই দৃষ্টিগোচর হতেন। নিজেই কাপড় পরিষ্কার করতেন, বকরীর দুধ দোহন করতেন এবং নিজের সকল প্রয়োজন নিজেই আঞ্জাম দিতেন।
“নিজের যবান হেফাজত করতেন। কেবল তখনই মুখ খুলতেন যখন এর প্রয়োজন দেখা দিত। লোকের মন জয় করতেন, তাদের মনকে ঘৃণাসিক্ত করতেন না। কোন সম্প্রদায় কিংবা জাতিগোষ্ঠীর সম্মানিত লোকের আগমন ঘটলে তিনি
তাঁর সঙ্গে সম্মান ও মর্যাদামণ্ডিত আচরণ করতেন এবং তাঁকে ভাল ও উচ্চ পদে নিযুক্ত করতেন। লোকের সম্পর্কে সতর্ক ও মাপা মন্তব্য করতেন আপন হৃদয়তা ও আখলাক দ্বারা মাহরূম না করেই। আপন সঙ্গী-সাথীদের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখতেন। লোকদের থেকে বিভিন্ন লোকজন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন।
“ভাল কথার ভাল দিক সম্পর্কে বর্ণনা করতেন এবং একে শক্তি জোগান। মন্দ কথার অনিষ্টকর দিক বলে দিতেন এবং একে দুর্বল করে দিতেন। তাঁর ব্যাপারগুলো হত ভারসাম্যময় ও একই রূপ। এক্ষেত্রে কোনরূপ পরিবর্তন হত না। কোন কিছুর প্রতি আলসতা কিংবা অবহেলা প্রদর্শন করতেন না এই ভয়ে যে, না জানি অন্যরাও এই আলসতার শিকার হয়ে পড়ে এবং বিতৃষ্ণ হয়ে পড়ে। প্রতিটি অবস্থা ও প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্যই তাঁর নিকট সেই অবস্থা মাফিক প্রয়োজনীয় সামান ছিল। সত্যের ব্যাপারে কোনরূপ কার্পণ্যের প্রশ্রয় দিতেন না, আবার সীমা অতিক্রমও করতেন না। যেসব লোক তাঁর কাছাকাছি থাকতেন তাঁরা হতেন সবচেয়ে ভাল ও নির্বাচিত লোক। তাঁর দৃষ্টিতে সর্বোত্তম লোক তিনি ছিলেন যিনি সকলের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী এবং যার ব্যবহার ভাল। তাঁর নিকট সবচেয়ে বেশি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী ছিলেন তিনি যিনি মানুষের শোকে-দুঃখে সান্ত্বনা দানকারী, সহানুভূতিশীল এবং যিনি অপরের সাহায্য-সহযোগিতায় সকলের আগে থাকেন। আল্লাহর যিক্র করতে করতে দাঁড়াতেন এবং আল্লাহর যিক্র করতে করতে বসতেন। কোথাও তাশরীফ নিলে যেখানে মজলিস সমাপ্ত হত সেখানেই তাশরীফ রাখতেন এবং এজন্য আদেশও করতেন। মজলিসে উপস্থিত লোকদের ও সাথীদের সবার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিতেন এবং সকলের দিকে লক্ষ্য রাখতেন। উপস্থিত সকলেই মনে করতেন যে, হযরত (সা)-এর চোখে তাঁর চেয়ে বেশি আপন বুঝি আর কেউ নন। যদি কেউ কোন বিশেষ প্রয়োজন বা উদ্দেশ্যে রাসূল (রা)-কে বসাতেন কিংবা কোন প্রয়োজনে কথা বলতেন তবে তিনি পরিপূর্ণ ধৈর্য ও প্রশান্তির সঙ্গে তাঁর সকল কথা শুনতেন যতক্ষণ না সে তার কথা শেষ করে নিজে থেকেই বিদায় নিত। যদি কেউ তাঁর কাছে কিছু চাইত, সাহায্য কামনা করত, তবে তার প্রয়োজন পূরণ না করে তাকে ফিরিয়ে দিতেন না। কিছু দিতে না পারলে কমপক্ষে তাকে মিষ্টি ও কোমল ভাষায় জবাব দিতেন। তাঁর উত্তম ব্যবহার সবার জন্যই উন্মুক্ত ছিল এবং তিনি তাদের জন্য পিতার ভূমিকা পালন করতেন। সকল শ্রেণীর ও সকল স্তরের লোক সত্যের মাপকাঠিতে তাঁর দৃষ্টিতে সমান ছিল। তাঁর মজলিস ইল্ম ও মা‘রিফাত, লজ্জা-শরম, ধৈর্য ও আমানতদারীর মজলিস ছিল। এ
মজলিসে কেউ উচ্চ কণ্ঠে কথা বলত না। কারও দোষ-ত্রুটির চর্চা কিংবা চরিত্র হননও করা হত না এ মজলিসে। কারও সম্মান ও মর্যাদার ওপর আঘাত হানা হত না কিংবা কারো চারিত্রিক দুর্বলতাকে ঢোল পিটিয়ে প্রচারও করা হত না। সকলেই ছিল সমান। কারো ওপর কারো মর্যাদা থাকলে তা একমাত্র তাকওয়ার ভিত্তিতেই ছিল। ছোটরা বড়দের সম্মান করত আর বড়রা ছোটদের করতেন স্নেহ ও মেয়া। অভাবী ও দুঃস্থ লোকদেরকে নিজের ওপর প্রাধান্য দিতেন, মুসাফির ও নবাগতকে হেফাজত করতেন এবং তাদের প্রতি খেয়াল রাখতেন।”
হযরত আলী (রা) আরও বলেন :
“তিনি সব সময় হাসিখুশী ও প্রফুল্ল থাকতেন। তিনি ছিলেন কোমল চরিত্রের ও নরম দিলের মানুষ। তিনি কঠোর প্রকৃতির লোক ছিলেন না। রূঢ় ও কঠোর ভাষায় কথা বলায় অভ্যস্ত ছিলেন না তিনি। মানুষের ওপর খুব সত্বর সদয় হয়ে যেতেন, খুব তাড়াতাড়ি মানুষকে ক্ষমা করে দিতেন। কারও সঙ্গে ঝগড়া করতেন না, বরং পরিপূর্ণ ভাব- গম্ভীর, শান্ত ও ধীরস্থির মেয়াজের ছিলেন তিনি। চেঁচিয়ে কথা বলতেন না। সাধারণত ফালতু কথা বলতেন না আর নিম্নমানের কথাও বলতেন না। কারও ওপর দোষ চাপাতেন না। সংকীর্ণ চিত্ত ও কৃপণ ছিলেন না। যে কথা তাঁর পছন্দ হত না তা তিনি উপেক্ষা করতেন, তা ধর্তব্যের মধ্যে আনতেন না। স্পষ্টভাবে সে সম্পর্কে হতাশা প্রকাশ করতেন না এবং এর জওয়াবও দিতেন না। তিনটি জিনিসের স্পর্শ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বাঁচিয়ে চলতেন : (১) ঝগড়া (২) অহংকার ও (৩) অনর্থক কথা ও কাজ। লোকদেরকে তিনটি জিনিসের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন : (১) কারো ওপর দোষ চাপাতেন না, (২) কারো দুর্বল ও গোপনীয় বিষয়ের অনুসন্ধান করে বেড়াতেন না এবং (৩) কেবল সেই কথাই বলতেন যে কথাতে ছওয়াবের আশা করা যেত। যখন কথা বলতেন মজলিসে উপস্থিত লোকেরা সম্মানার্থে এমনভাবে মস্তক অবনত করে ফেলতেন যে, মনে হত বুঝিবা সকলের মাথার ওপর পাখি বসে আছে, না জানি, নড়াচড়াতে তা উড়ে যায়। যখন তিনি চুপ করতেন তখন তারা কথা বলত। তাঁর সামনে তারা কখনো ঝগড়ায় লিপ্ত হত না। যদি তাঁর মজলিসে কেউ কথা বলত তখন আর সব লোক চুপ করে কথকের কথা শুনত যতক্ষণ না সে তার কথা শেষ করত। রাসূল (সা)-এর সামনে প্রত্যেক লোকের কথা বলার অধিকার ঠিক ততটুকুই থাকত যতটুকু থাকত তার পূর্ববর্তী লোকের যাতে সে পূর্ণ তৃপ্তি সহকারে তার কথা বলার সুযোগ পায় এবং ঠিক তেমনি সম্মান ও প্রশান্তির সঙ্গে তা শোনা হত। যে কথায় সকলে হাসত, তিনিও তাতে হাসতেন। যে কথায় লোকে বিস্ময় প্রকাশ করত, তিনিও তাতে বিস্ময় প্রকাশ করতেন। মুসাফির ও পরদেশীয়র বেআদবী সইতেন ও
সর্বপ্রকার যাতনা ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সঙ্গে শুনতেন। সাহাবায়ে কিরাম (রা) এ ধরনের লোকদের মনোযোগ নিজেদের দিকে টেনে নিতেন যাতে রাসূল (সা)-এর ওপর তা বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়। তিনি বলতেন : তোমরা অভাবী ও প্রয়োজন মুখাপেক্ষী লোক পেলে তাদের সাহায্য করবে। তিনি সেইসব লোকের প্রশংসা ও স্তুতি কবুল করতেন যারা সীমার ভিতর অবস্থান করত। কারো কথা বলার সময় কথা বলতেন না, তার কথা মাঝপথে থামিয়েও দিতেন না। তবে হ্যাঁ, সীমা অতিক্রম করলে তাকে নিষেধ করতেন এবং মজলিস থেকে উঠে গিয়ে তার কথা থামিয়ে দিতেন।
“তিনি সবচেয়ে উদার মন ও প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী, স্পষ্টভাষী, কোমল প্রকৃতি বিশিষ্ট এবং সামাজিক পারস্পরিক লেনদেনের ব্যাপারে বদান্য ছিলেন। যে তাঁকে প্রথম দেখত সেই ভীত ও কম্পিত হয়ে পড়ত। কিন্তু তাঁর সাহচর্যে থাকলে এবং জানাশোনা হলে মুগ্ধ, আকৃষ্ট ও অভিভূত হত এবং যেই তাঁকে দেখত সেই বলত যে, তাঁর মত আর কাউকে এর আগে যেমন দেখিনি, তেমনি দেখিনি তাঁর পর অন্য কাউকে। আমাদের নবী করীম (সা)-এর ওপর আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহরাশি বর্ষিত হোক।”
আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবীকে সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতার পোশাকে মণ্ডিত ও সজ্জিত করেছিলেন এবং তাঁকে ভালবাসা, আকর্ষণ, ভীতিকর প্রভাব ও ব্যক্তিত্বের এক অপূর্ব প্রতিমূর্তি বানিয়ে ছিলেন। হিন্দ ইবন আবী হালা (রা) বলেন :
“তিনি প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা ও শান-শওকতের অধিকারী ছিলেন এবং অন্যের দৃষ্টিতেও খুবই মর্যাদাবান ছিলেন। তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল পূর্ণিমা রাত্রির চাঁদের মতই জ্বলজ্বল করত।”
হযরত বারাআ ইবন ‘আযিব (রা) বলেন :
“আল্লাহ্র রাসূল (সা) মধ্যম আকৃতির ছিলেন; না বেশি লম্বা, না বেশি বেটে। আমি একবার তাঁকে লাল কোর্তা পরিহিত অবস্থায় দেখেছিলাম। এর থেকে ভাল কোন জিনিস আমি কখনো দেখিনি।” হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, “তিনি মধ্যম আকৃতির ছিলেন, এর থেকে কিছুটা লম্বা। তিনি ছিলেন গৌরবর্ণের, ঘনকৃষ্ণ শ্মশ্রু, মুখমণ্ডল অত্যন্ত মানানসই ও সুন্দর, দীর্ঘ চোখের পলক ও চওড়া কাঁধের অধিকারী।” শেষে তিনি বলেন, “তাঁর মত আর কাউকে এর আগেও যেমন দেখিনি, তেমনি দেখিনি পরেও।”
হযরত আনাস (রা) বলেন : আমি রেশম ও রেশমী কিংখাবও তাঁর হাতের মত নরম পাইনি এবং তাঁর (শরীরের) খোশবু থেকে অধিকতর খোশবুও আমি আর শুকি নাই।
আল্লাহ্র সঙ্গে সম্পর্ক
আল্লাহ তা’আলা তাঁকে রিসালাত দ্বারা ধন্য করেছিলেন, তাঁকে আপন মাহবুব বানিয়েছিলেন এবং উত্তম মনোনয়নে মনোনীত করেছিলেন, তাঁর অগ্র-পশ্চাতের সকল গোনাহ মাফ করে দিয়েছিলেন। এতদসত্ত্বেও তিনি ইবাদত-বন্দেগীতে সবচেয়ে বেশি উদ্যমী ও প্রয়াসী ছিলেন, ছিলেন সর্বাধিক আগ্রহী। হযরত মুগীরা ইবন শু’বা (রা) বলেন :
“একবার রাসূলুল্লাহ (সা) নফল সালাতে এত দীর্ঘক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন যে, তাঁর কদম মুবারক ফুলে গিয়েছিল। আরয করা হল, “হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনার আগে-পিছের যাবতীয় গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়েছে (তারপরও ইবাদতে বেশি কষ্ট করেন কেন?)। একথা শুনে তিনি বলেন : আমি কি আল্লাহ্র শোকরগুযার বান্দা হব না?”
হযরত আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) একবার কুরআন পাকের একটি আয়াত তেলাওয়াত করতে করতে গোটা রাত কাটিয়ে দেন। হযরত আবু যর (রা) বর্ণনা করেন, একবার রাসূলুল্লাহ (সা) রাতের বেলায় সালাতের জন্য খাড়া হয়ে একটি আয়াত তেলাওয়াত করতে করতে ভোর হয়ে যায়। আয়াতটি ছিল নিম্নরূপঃ

“আর আপনি যদি তাদেরকে শাস্তি দেন তবে তারা তো আপনারই বান্দা; আর আপনি তাদেরকে ক্ষমা করলে আপনি তো অবশ্যই প্রবল পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ” (সূরা আল-মাইদা, ১১৮ আয়াত)।
হযরত আয়েশা (রা) এও বলেন, “তিনি এত বেশী সিয়াম (রোযা) পালন
করতেন যে, আমরা মনে করতাম যে, তিনি সম্ভবত সিয়াম আর খুলবেন না, সর্বদাই বুঝি রোযাদার থাকবেন। আবার যখন সওম খুলতেন তখন আমরা ভাবতাম সম্ভবত তিনি আর সিয়াম পালন করবেন না।”
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, “যদি কেউ তাঁকে কিয়ামু’ল-লায়ল (তাহাজ্জুদ সালাত)-এ মশগুল দেখতে চাইত তবে তা দেখতে পেত। আবার ঠিক তেমনি কেউ যদি তাঁকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে চাইত তাহলেও সে দেখতে পেত।”
‘আবদুল্লাহ ইবনু’শ-শিখখীর (রা) বর্ণনা করেন, “আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে হাযির হয়ে দেখতে পেলাম যে, তিনি সালাতে মগ্ন এবং কান্নার কারণে তাঁর বক্ষ মুবারক থেকে এমন আওয়াজ উথিত হচ্ছিল যেমন ডেকচি থেকে ফুটন্ত পানির শব্দ বের হয়।”
সালাত ভিন্ন আর কোন কিছুতে তিনি সান্ত্বনা পেতেন না এবং মনে হত যে, সালাত আদায়ের পরও তিনি সালাতের আকাঙ্ক্ষী ও অপেক্ষমাণ। তিনি বলতেন, جعل قرة عينى فى الصلوة “আমার চক্ষুর শীতলতা সালাতের ভেতর রাখা হয়েছে।”
সাহাবা-ই কিরাম (রা) বলেন, “যখন কোন সমস্যা-সংকট কিংবা পেরেশানীর কারণ দেখা দিত অমনি তিনি সালাতের দিকে মনোযোগী হতেন এবং সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন।”
আবু’দ-দারদা (রা) বলেন, “যখনই রাতের বেলা কখনো জোরে প্রবল বেগে বাতাস বইত তিনি মসজিদে আশ্রয় নিতে যতক্ষণ না বাতাস থেমে যেত। যদি মহাকাশে কোনরূপ পরিবর্তন দেখা যেত, যেমন সূর্যগ্রহণ কিংবা চন্দ্রগ্রহণ, তিনি সালাতে মনোনিবেশ করতেন এবং এর থেকে আল্লাহর আশ্রয় কামনা করতেন যতক্ষণ না গ্রহণ কেটে যেত এবং আকাশ পরিষ্কার হয়ে যেত।” তিনি সব সময় সালাত আদায়ে আগ্রহী থাকতেন এবং সালাত ব্যতিরেকে তৃপ্তি ও শান্তি পেতেন না। যতক্ষণ না তিনি সালাত আদায় করতেন তাঁর অস্থিরতা বিদ্যমান থাকত। কখনো বা তাঁর মুওয়াযযিন বিলাল (রা)-কে বলতেন, “বিলাল! সালাতের
ইহতিমাম কর এবং আমার শান্তি ও তৃপ্তির ব্যবস্থা কর।”
পার্থিব সম্পদ ও এর প্রতি নিস্পৃহতা
টাকা-পয়সা ও দুনিয়ার ধন-সম্পদ তিনি কোন্ দৃষ্টিতে দেখতেন তা কোন কথাশিল্পী কিংবা তুখোড় বাগ্মীও বর্ণনা করতে গেলে থেই হারিয়ে ফেলবে। আর তা এজন্য যে, তিনি তো দূরের কথা, তাঁর ঈমানী রব্বানী মাদরাসার একজন পেছনের সারির ছাত্র এবং আরব ও অনারব বিশ্বের একজন ছাত্রের তস্য ছাত্রও টাকা-পয়সা কিংবা বিত্ত-সম্পদকে এক কানাকড়ির বেশি মূল্য দিতেন না এবং তাঁদের বৈরাগ্যসুলভ জীবন, পার্থিব সম্পদের প্রতি নিস্পৃহ মানসিকতা, অপরের জন্য সম্পদ ব্যয়ের আগ্রহ, নিজের মোকাবিলায় অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দান, অল্পে তুষ্টি ও পরমুখাপেক্ষীহীনতার যেসব ঘটনা ইতিহাসের পাতায় রক্ষিত দেখতে পাওয়া যায় তাতে যে কোন মানুষের বুদ্ধিবিভ্রম ঘটা বিচিত্র নয়। যখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর একজন দাসানু দাসের তস্য দাসের এই অবস্থা তখন এ থেকেই পরিমাপ করা যায়, তাহলে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা), যিনি এদের সবার ইমাম ও পথপ্রদর্শক এবং যিনি প্রতিটি নেক ও কল্যাণ, মর্যাদা ও তাকওয়ায় তাঁদের মুরুব্বী ও শিক্ষক ছিলেন, তাঁর অবস্থা এ ব্যাপারে কি হতে পারে?
এজন্য আমরা এখানে এতদসম্পর্কিত মাত্র কয়েকটি বর্ণনা উদ্ধৃত করছি যা সাহাবা-ই কিরাম (রা)-এর মুখ থেকে আমাদের অবধি এসে পৌঁছেছে। কেননা সত্য ঘটনা থেকে বেশি প্রভাবশালী ও কার্যকর কোন কিছু নেই এবং এর চেয়ে অধিকতর বিশুদ্ধ, নির্ভুল ও বাঙময় প্রতিনিধিত্ব কোন কথামালা দ্বারা হতে পারে না।
তাঁর সবচেয়ে প্রভাবমণ্ডিত ও বিখ্যাত উক্তি যা তিনি হরফে হরফে মেনে চলতেন এবং যা ছিল তাঁর সমগ্র জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, তা হল:

“হে আল্লাহ! পারলৌকিক জীবনই তো আসল জীবন।”
তিনি বলতেন:

“দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক? দুনিয়ার সাথে আমার সম্পর্ক তো এতটুকুই যেমন কোন মুসাফির পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে কোন গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বসল, আরাম করল, তারপর ছায়া ছেড়ে গন্তব্যের দিকে রওয়ানা হল।”
হযরত ওমর (রা) একবার আঁ-হযরত (সা)-কে চাটাইয়ের ওপর শোয়া অবস্থায় দেখতে পান, দেখতে পান পার্শ্বদেশে চাটাইয়ের দাগ। এই দৃশ্যে হযরত ওমর (রা) কেঁদে ফেলেন। তাঁকে কাঁদতে দেখে হুজূর আকরাম (সা) জিজ্ঞেস করলেন: কি ব্যাপার? ওমর (রা) আরয করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর সৃষ্টি জগতের ভেতর সর্বাধিক নির্বাচিত আপনিই, অথচ তাবৎ সুখ-সম্ভোগের অধিকারী রোম ও পারস্য সম্রাটরা। এতচ্ছ্রবণে হুজূর আকরাম (সা)-এর চেহারা লাল হয়ে গেল। তিনি বললেন, “খাত্তাব পুত্র! এতে কি তোমার কোন সন্দেহ আছে?” এরপর তিনি বললেন, “এরা তো তারাই যাদেরকে দুনিয়ার জীবনের সমস্ত মজাই এখানে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
তিনি বিলাসী ও আরাম-আয়েসী জীবন কেবল নিজের জন্যই অপসন্দ করতেন তাই নয়, বরং আহলে বায়ত (নবী-পরিবার)-এর জন্যও এর পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি দু‘আ করতেন:

“হে আল্লাহ! মুহাম্মদ-এর পরিবারবর্গের যতটুকু প্রয়োজন কেবল ততটুকু রিযিকই দিও।” হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন: শপথ সেই সত্তার যাঁর হাতে আবূ হুরায়রার জীবন! আল্লাহর নবী ও তাঁর পরিবারবর্গ কখনো উপর্যুপরি তিন দিন গমের রুটি পেট ভরে খেতে পারেন নি আর এ অবস্থায় তাঁরা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে গেছেন।”
উম্মুল-মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, “আমরা মুহাম্মদ (সা)-এর পরিবারবর্গের এক চাঁদ উঠে আর এক চাঁদ এসে যেত, অথচ আমাদের ঘরে চুলা জ্বলত না; কেবল খেজুর ও পানির ওপর আমাদের জীবন চলত।”
তাঁর লৌহবর্ম জনৈক ইয়াহুদীর কাছে বন্ধক রাখা ছিল। তাঁর নিকট এমন কিছু ছিল না যদ্বারা তিনি তা ছাড়িয়ে আনতে পারেন। এমতাবস্থায় তিনি ইন্তিকাল করেন।
যখন তিনি জীবনের শেষ হজ্জ আদায় করেন সে সময় তাঁর সামনে ছিল মুসলমানদের জনসমুদ্র, সমগ্র আরব ভূখণ্ড ছিল তাঁর পদানত, অথচ তাঁর নিজের অবস্থা ছিল একজন দরিদ্রের ন্যায়; তাঁর গায়ে ছিল একটি চাদর মাত্র যার মূল্য চার দিরহামের বেশি ছিল না। সে সময় তিনি বলেছিলেনঃ হে আল্লাহ! একে তুমি এমন হজ্জ বানাও যার ভেতর রিয়া (লোক দেখানো) ও খ্যাতির কামনা যেন না থাকে।
হযরত আবূ যর (রা)-কে একবার তিনি বলেছিলেন, “আমি পছন্দ করি না যে, আমার কাছে ওহুদ পাহাড়সম স্বর্ণ থাকুক আর এমতাবস্থায় তিন দিন অতিবাহিত হোক এবং তার ভেতর থেকে একটি দীনারও আমার নিকট অবশিষ্ট থাকুক। তবে কোন দ্বীনী কাজে কিছু অবশিষ্ট থাকলে ভিন্ন কথা। অন্যথায় আল্লাহ্ বান্দাদের মধ্যে আমি সেগুলো এভাবে এবং এভাবে ডানে বামে ও পেছনে (যাকে পাব) বিলিয়ে দেব।”
হযরত জাবির ইবন ‘আবদুল্লাহ (রা) বর্ণনা করেন, “কখনো এমন হয়নি যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে কোন জিনিস চাওয়া হয়েছে আর তার জবাবে তিনি ‘না’ বলেছেন।” ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ (সা) বদান্যতা ও দানশীলতায় বেগবান বাতাসের চেয়েও অধিকতর দ্রুতগামী ছিলেন।”
হযরত আনাস (রা) বলেনঃ একবার এক লোক তাঁর (রাসূলের) নিকট কিছু চাইল। তিনি তাকে একপাল বকরী ও ভেড়া দিয়ে দিলেন যা দু’টো পাহাড়ের মাঝে ছিল। লোকটি ভেড়া-বকরীর পাল হাঁকিয়ে তার গোত্রের লোকদের নিকট ফিরে গেল এবং বলতে লাগলঃ লোক সকল! ইসলাম কবুল কর। মুহাম্মদ (সা) এভাবে বিলাচ্ছেন যে, দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনের যেন কোন ভয় নেই। একবার তাঁর খেদমতে নব্বই হাজার দিরহাম পেশ করা হল। দিরহামগুলো একটা চাটাইয়ে ঢালা হল। অতঃপর তিনি দাঁড়িয়ে তা বণ্টন করা শুরু করলেন। কোন প্রার্থীকেই তিনি ফেরান নি। এমন কি এক সময় তা সব শেষ হয়ে গেল।
আল্লাহ্র সৃষ্ট জীবের সঙ্গে
কিন্তু ইবাদতের প্রতি এই আগ্রহ, দুনিয়া ও পার্থিব জগতের উপকরণাদির সঙ্গে সম্পর্কহীনতা, পরিপূর্ণ যুহদ, আল্লাহ তা‘আলার দিকে পূর্ণ মনোনিবেশ এবং তাঁর
দরবারে কান্নাকাটি, দু‘আ ও মুনাজাতের ভেতর দিয়ে আত্মবিলোপ তাঁর সর্বোত্তম আখলাক, স্নেহ-ভালবাসা, অন্তর-রাজ্য জয়, স্নেহপূর্ণ আচরণ এবং প্রত্যেক মানুষকে তার বৈধ অধিকার প্রদানে ও তার সম্মান ও মর্যাদা মাফিক আচরণে কোনরূপ পার্থক্য সৃষ্টি করত না। আর এ দু’টো এমন বিষয় যে, দু’টোকে একত্র করা অন্য কোন লোকের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি বলতেন :

“আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে তবে খুব কম হাসতে আর বেশি কাঁদতে।”
লোকের ভেতর তিনিই সবচেয়ে উদার হৃদয়বিশিষ্ট, কোমল প্রকৃতির অধিকারী এবং খান্দানের দিক দিয়ে সর্বাধিক সম্মানিত ছিলেন। সাহাবায়ে কিরাম (রা) থেকে আলাদা হয়ে থাকতেন না, বরং তাঁদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাঁদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে হাসি-খুশীর সঙ্গে ও সহাস্য বদনে মিশতেন। তাঁদের বাচ্চাদের কোলে বসাতেন। স্বাধীন হোক বা ক্রীতদাস-দাসী, ফকীর-মিসকীন সকলের দাওয়াতই তিনি কবুল করতেন। পীড়িতের সেবা-শুশ্রূষা করতেন, তা সে শহরের শেষ প্রান্তেই থাকুক না কেন। মা‘যূর-এর ওযর কবুল করতেন। সাহাবা-ই কিরাম (রা)-এর মজলিসে তাঁকে কখনো হাত-পা ছড়িয়ে বসতে দেখা যায়নি যাতে অন্যের কোনরূপ কষ্ট হয়।
‘আবদুল্লাহ ইবনু’ল-হারিছ (রা) বর্ণনা করেন, “আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চেয়ে বেশী প্রফুল্ল ও হাসি-খুশী আর কাউকে দেখিনি।” জাবির ইবন সামুরা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-র মুবারক মজলিসে আমি শতবারের বেশি বসার সুযোগ পেয়েছি। আমি দেখেছি যে, তাঁর সাহাবা-ই কিরাম (রা) একে অন্যের থেকে কবিতা শুনছেন ও শোনাচ্ছেন এবং জাহিলী যুগের কোন কোন কথা ও ঘটনাসমূহের আলোচনাও করছেন আর তিনি চুপ করে আছেন অথবা কখনো কোন হাসির কথা হলে তিনিও তাঁদের সাথে মুচকি হাসছেন।
শুরায়দ (রা) বর্ণনা করেন, “রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে উমায়্যা ইবনু’স-সাল্ত -এর কবিতা শোনাবার জন্য বললেন। অনন্তর আমি রাসূল (সা)-কে তার কবিতা শোনালাম।”
তিনি অত্যন্ত কোমল অন্তঃকরণবিশিষ্ট, স্নেহ-ভালবাসা ও দয়া-মায়ার সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি ছিলেন। মানবীয় আবেগ ও সূক্ষ্মতর অনুভূতি তাঁর পবিত্র জীবন-চরিতে সর্বোত্তম ও সুন্দরতম আকৃতিতে জেঁকে ছিল। আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, “রাসূলুল্লাহ (সা) তদীয় কন্যা ফাতিমা (রা)-কে বলতেনঃ আমার সন্তানদ্বয় (হাসান ও হুসายน রা)-কে ডাক দাও। ডাক দিতেই তাঁরা দৌড়ে আসতেন। তখন তিনি তাঁদের দু’জনকে চুমু খেতেন এবং বুকে তুলে নিতেন।” “একবার তিনি তাঁর দৌহিত্র হাসান ইবন ‘আলী (রা)-কে ডাকলেন। তিনি দৌড়ে এলেন এবং তাঁর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এরপর তাঁর দাড়ি মুবারকের ভেতর আঙুল ঢোকাতে লাগলেন। এরপর তিনি তাঁর নিজের পবিত্র মুখ খুলে দিলেন এবং তিনি (হাসান) আপন মুখ তাঁর (রাসূল) বরকতময় মুখের ভেতর ফেলতে লাগলেন।”
হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, “যায়দ ইবন হারিছা (রা) [যিনি হুজূর (সা)-এর গোলাম ছিলেন] যখন মদীনায় আগমন করল তখন তিনি ঘরেই ছিলেন। সে সময় তাঁর শরীরের সর্বত্র কাপড় ঢাকা ছিল না, শরীর থেকে চাদর গড়িয়ে পড়ছিল। এমতাবস্থায় তিনি তাকে (যায়দকে) দেখে জড়িয়ে ধরলেন, কোলাকুলি করলেন ও চুমু খেলেন।”
উসামা ইবন যায়দ (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জনৈক কন্যা তাঁকে পয়গাম পাঠালেন, আমার বাচ্চা মরণাপন্ন। মেহেরবানী করে আসুন। তিনি তাঁকে সালাম পাঠালেন এবং বললেনঃ সবই আল্লাহ্র যা তিনি নিয়েছেন এবং যা তিনি দিয়েছেন তাও আল্লাহ্রই। প্রতিটি বস্তু তাঁর দরবারে নামাঙ্কিত ও নির্ধারিত। অতএব, ধৈর্য ধারণ কর এবং পুরস্কারের প্রত্যাশী হও, আশায় বুক বাঁধো। কন্যা কসম দিয়ে বলে পাঠালেন যেন তিনি অবশ্যই একবার আসেন। তিনি যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন এবং আমরাও তাঁর সঙ্গে উঠে দাঁড়ালাম। তিনি সেখানে গিয়ে বসলে কোলে করে বাচ্চা সেখানে আনা হল। তিনি তাকে কোলে তুলে নিলেন। ঐ সময় তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে। এতদ্দৃষ্টে তাঁর চোখ ফেটে অবিরল ধারায় অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল। হযরত সা‘দ (রা) আরয করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! একি (আপনিও কাঁদছেন)? তিনি বললেনঃ এ স্নেহ-মমতার বহিঃপ্রকাশ যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের ভেতর যাকে চান দান করে থাকেন। আর আল্লাহ তা‘আলা
তাঁর রহমদিল বান্দাদের ওপরই দয়া প্রদর্শন করে থাকেন।
বদরের যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে রাসুলুল্লাহ (সা)-র চাচা আব্বাস (রা)-ও (তখন তিনি মুসলমান হননি) ছিলেন। অন্য যুদ্ধবন্দীদের মত তাঁকেও কষে বেঁধে রাখা হয়েছিল। ফলে তিনি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন আর তাঁর কাতরা নির কারণে তিনি ঘুমাতে পারছিলেন না। জনৈক আনসার সাহাবী বিষয়টি বুঝতে পেরে হযরত আব্বাস (রা)-এর বাঁধন একটু ঢিলা করে দেন। আনসার সাহাবীর এই মমতা প্রদর্শন আল্লাহ্র রাসূল (সা)-কে উৎসাহিত করতে পারেনি যে, হযরত আব্বাস (রা) ও একজন সাধারণ যুদ্ধবন্দীর মধ্যে কোনরূপ ভিন্ন আচরণ করা হোক (ফলে রাসুলুল্লাহর ইচ্ছানুক্রমে অপরাপর বন্দীদের বাঁধনও অনুরূপ ঢিলা করে দেওয়া হয়)। আনসার সাহাবী যখন দেখতে পেলেন যে, হযরত আব্বাস-এর বাঁধন ঢিলা করে দেওয়াতে আল্লাহ্র রাসূল খুশী হয়েছেন তখন তিনি অভিপ্রায় প্রকাশ করেন যে, তাঁর পিতৃব্যকে বিনা মুক্তিপণে ছেড়ে দেওয়া হোক। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা) তাঁর এই পরামর্শ কবুল করেননি।
একবার জনৈক বেদুইন রাসুলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে এসে উপস্থিত হল এবং বলতে লাগল: আপনারা কি আপনাদের ছেলেমেয়েদের স্নেহ করেন, মায়া করেন, ভালবাসেন? আমরা তো তাদের মায়া করি না, ভালবাসি না। আল্লাহ্র রাসূল (সা) বললেন যদি আল্লাহ তা’আলা তোমার অন্তর থেকে দয়ামায়া উঠিয়ে নিয়ে থাকেন তাহলে আমি আর তোমার জন্য কি করতে পারি?
তিনি শিশুদের প্রতি খুবই সদয় ও স্নেহশীল ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ ও কোমল আচরণ করতেন। হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, একবার খেলাধুলায় মত্ত কতিপয় শিশুর পাশ দিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন। তিনি তাদেরকে সালাম দিলেন।
হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা) আমাদের সঙ্গে একবারে মিশে থাকতেন। আমার এক কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে তিনি বলতেন: ওহে উমায়র! তোমার নুগায়র (ক্ষুদ্রতর পক্ষী যা নিয়ে শিশুরা অধিকাংশ সময় খেলা করে থাকে)-এর কি হল?
মুসলমানের প্রতি তিনি অত্যন্ত স্নেহশীল ও সদয় ছিলেন। তিনি তাদের
অবস্থার খুব রেআয়েত করতেন। মানব স্বভাবে বিরক্তি ও ক্লান্তিবোধ করা এবং সাময়িকভাবে তাদের মাঝে ভীরুতা ও কাপুরুষতা সৃষ্টি হওয়া বিচিত্র নয়। এসবের দিকে তিনি বরাবর লক্ষ্য রাখতেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে যে ওয়াজ-নসীহত করতেন তা বিরতি দিয়ে করতেন এবং তা এ জন্য করতেন যাতে আমাদের মাঝে তা বিরক্তি বা একঘেয়েমীর সৃষ্টি না করে। সালাত বা নামাযের সঙ্গে এতটা প্রেম ও আকর্ষণ সত্ত্বেও যদি কোন বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পেতেন অমনি সালাত সংক্ষিপ্ত করে দিতেন। তিনি নিজে বলেছেন: আমি সালাতে দাঁড়াই এবং চাই দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে তা আদায় করি। তারপর কোন বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই। অতঃপর এই ধারণায় আমি সালাত সংক্ষিপ্ত করি যাতে তার মায়ের কোনরূপ উৎকণ্ঠা কিংবা মানসিক পীড়ার কারণ না হয়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) আরও বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি এসে রাসূল (সা)-এর খেদমতে আরয করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার মহল্লায় ফজরের নামাযে কেবল এজন্যই হাজির হই না যে, অমুক লোক খুবই দীর্ঘ সালাত আদায় করে থাকে। এরপর তিনি যে ওয়াজ করলেন এর থেকে ক্রোধান্বিত অবস্থায় আর কোন ওয়াজে তাঁকে আমি দেখিনি। তিনি বললেনঃ তোমাদের মধ্যে সেই সব লোক রয়েছে যারা (ইবাদত ও সালাতের প্রতি) মানুষকে বিতৃষ্ণ ও বিরক্ত করে তুলছে। তোমাদের মধ্যে যারা সালাতে ইমামতি করবে তাদের উচিত হবে তা সংক্ষিপ্ত করা। কেননা জামাতে উপস্থিত মুসল্লীদের মধ্যে দুর্বল লোক যেমন রয়েছে, তেমনি বৃদ্ধ ও দরকারত রয়েছে এমন লোকও রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে বলতে চাই যে, মহিলা যাত্রী দলে ছিল আনজাশা নামে জনৈক সুরেলা কণ্ঠের অধিকারিণী যার সুরেলা আবৃত্তিতে উট দ্রুতগতিতে ছুটত। মহিলাদের এতে কষ্ট হত। এই দেখে একদিন তিনি আনজাশাকে বললেন: “আনজাশা! একটু আস্তে। দ্রুতগতির কারণে দুর্বল ও কোমল দেহের লোকগুলোর যেন কষ্ট না হয়।”
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বক্ষ মুবারককে সর্বপ্রকার হিংসা-বিদ্বেষ ও অপরের ক্ষতি ও অমঙ্গল কামনা থেকে সর্বপ্রযত্নে মুক্ত রেখেছিলেন। তিনি বলতেনঃ তোমাদের
কেউ যেন আমার সামনে অপর কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ না করে। কেননা আমি চাই, তোমাদের সামনে আমি যেন এমনভাবে হাজির হতে পারি যে, তোমাদের প্রতি আমার দিল সাফ থাকে।
মুসলমানদের অনুকূলে তিনি ছিলেন স্নেহশীল পিতার মতোই আর সমস্ত মুসলমান ছিল যেন সকলেই তাঁর পরিবার-পরিজনের অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের সকলের জিম্মাদারী যেন তাঁরই কাঁধে ন্যস্ত। তিনি তাদের ওপর এতটা সদয় ও স্নেহশীল ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে এতটা ঘনিষ্ঠ ছিলেন যতটা হয়ে থাকে একজন মা তার কোলের সন্তানের প্রতি। মুসলমানদের নিকট ধন-সম্পদ ও তাদের জীবিকার ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা যে প্রাচুর্য দান করেছিলেন এর সঙ্গে তাঁর কোন সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু তাদের ঋণ ও তাদের পৃষ্ঠদেশের ওপর অর্পিত বোঝা হাল্কা করাকে তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, কেউ সম্পত্তি রেখে মারা গেলে তা আর উত্তরাধিকারী তথা ওয়ারিছদের আর কেউ ঋণ রেখে মারা গেলে তা পরিশোধের দায়িত্ব আমার। অন্য এক বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি বলতেনঃ এমন কোন মু’মিন নেই যার দুনিয়া ও আখিরাতে আমার চেয়ে বড় কোন অভিভাবক আছে। যদি চাও এই আয়াত পড়তে পারঃ

“নবী মু’মিনদের জন্য তাদের জীবনের চেয়েও বেশি বন্ধু ও সুহৃদ হয়ে থাকেন” (সূরা আল-আহযাব, ৬ আয়াত)।
এজন্য কোন মুসলমান ইন্তিকাল করলে এবং তার কোন পরিত্যক্ত সম্পদ থাকলে তা তার ওয়ারিছ ও নিকটাত্মীয়দের অধিকার হিসাবে গণ্য হবে, তা সে যেই হোক। কিন্তু যদি তার জিম্মায় কোন ঋণ থাকে, থাকে জমি- জায়গা তবে সে যেন আমার কাছে আসে। তার অভিভাবক ও জিম্মাদার আমি।
স্বভাব-প্রকৃতিতে ভারসাম্য
আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে যে উন্নত স্তরের আখলাক এবং যেই সর্বোচ্চ শ্রেণীর স্বভাবজাত ও প্রকৃতিগত ভারসাম্য দান করেছিলেন তা ছিল ভবিষ্যত শতাব্দীগুলোর এবং বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য পূর্ণতম বিকাশ। একে আমরা স্বভাবের ভারসাম্য, সুস্থ প্রকৃতি, অনুভূতির সূক্ষ্মতা ও তীক্ষ্ণতা, ভারসাম্য ও সামগ্রিকতা ও
কমবেশির বাড়াবাড়ি থেকে মুক্ত বলে ব্যাখ্যা করতে পারি। হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল (সা) দু’টো কাজের মধ্যে যখন কোন একটিকে অগ্রাধিকার প্রদান করতেন তখন সব সময় সহজতরটিকেই অগ্রাধিকার দিতেন। তবে এই শর্তে যে, এতে গুনাহর নাম-গন্ধও যেন না থাকে। যদি এতে গুনাহর সামান্যতম গন্ধও পাওয়া যেত তবে তিনি এর থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে অবস্থান করতেন।
তিনি বেশি লৌকিকতা, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি যুহ্দ ও নির্লিপ্ততা এবং নফসের বৈধ অধিকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া থেকে অনেক দূরে ছিলেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “দীন খুব সহজ; তবে কেউ যদি দীনের সঙ্গে শক্তি পরীক্ষায় অগ্রসর হয় দীন তার ওপর বিজয়ী হবে, প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করবে। এজন্য মধ্যম পন্থায় ভারসাম্যপূর্ণ পথে চল। নিকটবর্তী দিকগুলোর রেআয়াত কর ও সন্তুষ্ট থাক এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও অন্ধকার রাত্রির ইবাদত থেকে শক্তি অর্জন কর।”
তিনি এও বলতেন, “থাম, ততটুকুই কর যতটুকু করার শক্তি তোমার রয়েছে। আর তা এজন্য যে, আল্লাহর কসম! আল্লাহ তা’আলা তো ক্লান্ত হয়ে পড়বেন না, বরং তোমরাই ক্লান্ত হয়ে পড়বে।” ইবন আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, আল্লাহ তা’আলার নিকট কোন ধরনের দীন বা ধর্ম সর্বাধিক প্রিয় ও পছন্দনীয়? তিনি বললেন, الحنيفية السمحة “সহজ ও নিষ্ঠাপূর্ণ দীনে ইবরাহীমী।”
আবদুল্লাহ ইবন মাস‘উদ (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন, “বাড়াবাড়ি ও জোর-জবরদস্তির সঙ্গে কাজ আদায়কারী ও খুঁৎ অন্বেষণকারী ধ্বংস হয়েছে।”
তিনি যখন কোন কোন সময় কতক সাহাবীকে কোথাও কোন জায়গায় তা‘লীম প্রদান ও ওয়াজ-নসীহতের জন্য পাঠাতেন তখন তাঁদেরকে বলতেন, “সহজ পন্থা অনুসরণ করবে, সংকীর্ণ করে তুলবে না; সুসংবাদ শোনাবে, বিদ্বিষ্ট ও ঘৃণার্হ করে তুলবে না।” আবদুল্লাহ ইবন ‘আমর ইবনি’ল-‘আস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ
(সা) বলেন, “আল্লাহ তা’আলা তৎকর্তৃক প্রদত্ত নে‘মতের বাহ্যিক প্রকাশ তাঁর বান্দার ওপর দেখতে পছন্দ করেন।”
বাড়িতে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে
তিনি তাঁর বাড়িতে সাধারণ মানুষের মতোই থাকতেন। যেমন স্বয়ং হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেছেন, “তিনি তাঁর কাপড়-চোপড়ও পরিষ্কার করতেন, বকরীর দুধও নিজ হাতেই দোহন করতেন এবং নিজের কাজ নিজেই করতেন।” সম্মুখে অগ্রসর হয়ে বলেন, “নিজের কাপড়ে তালি লাগাতেন, জুতা সেলাই করতেন এবং এভাবে আরও কাজ করতেন।” হযরত আয়েশা (রা)-কে জিজ্ঞেস করা হল যে, তিনি তাঁর ঘরে কিভাবে থাকতেন? জওয়াবে তিনি বললেন, “তিনি ঘরে কাজে-কর্মের ভেতর থাকতেন। যখন সালাতের ওয়াক্ত হত, তখন সালাত আদায়ের জন্য বাইরে চলে যেতেন।”
এক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, “তিনি তাঁর নিজের জুতা মেরামত করে নিতেন, কাপড় সেলাই করতেন যেমন তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের বাড়ি-ঘরে করে থাকে।”
হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, “তিনি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কোমল এবং সবার চেয়ে বেশি মহানুভব ছিলেন আর হাসির সময় মুচকি হাসি হাসতেন।”
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, “আমি এমন কাউকে দেখিনি, যিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চেয়ে আপন পরিবার-পরিজনের প্রতি অধিক সদয় ও স্নেহশীল।” হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে তার পরিবার-পরিজনের নিকট সর্বোত্তম এবং আমি আমার পরিবার-পরিজনের ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।”
হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, “রাসূলুল্লাহ (সা) কখনো কোন খাদ্য-বস্তুর ভেতর দোষ খোঁজেন নি। যদি পছন্দ হয়েছে খেয়েছেন, পছন্দ না হলে তা খাননি।”
আপন আহলে বায়ত, পরিবার-পরিজন ও নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে তাঁর চিরদিনের অভ্যাস ছিল এই যে, যে যেই পরিমাণ তাঁর নিকটবর্তী হত -বিপদাপদ ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে তাকে সেই পরিমাণ সামনে রাখতেন এবং পুরস্কার-পারিতোষিক ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের সময় তাকে সেই পরিমাণ পেছনে রাখতেন। যখন ‘উৎবা ইবন রবী‘আ, শায়বা ইবন রবী‘আ ও ওলীদ ইবনে উৎবা (যারা ছিল আরবের নামী-দামী বীরপুরুষ ও রণনিপুণ সৈনিক) বদর প্রান্তরে কুরায়শদের পক্ষ থেকে মুসলমানদেরকে তাদের মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ প্রদান করল এবং তাদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী আহ্বান করল তখন তিনি আপন পিতৃব্য হামযা, পিতৃব্য-তনয় আলী ও নিকটাত্মীয় উবায়দা (রা)-কে ডেকে পাঠালেন এবং তাঁদের মোকাবিলায় প্রেরণ করলেন। অথচ তিনি মক্কার এসব বাহাদুর সৈনিকের মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে বেশ ভালই অবহিত ছিলেন। মুহাজিরদের মধ্যে এমন অনেক বীরপুরুষ ও সাহসী যোদ্ধা বর্তমান ছিলেন যাঁরা তাদের সঙ্গে সেয়ানে সেয়ানে অবতীর্ণ হতে পারতেন। বনু হাশিমের এই তিন জন ছিলেন তাঁরাই যাঁরা রক্ত সম্পর্কের দিক দিয়ে তাঁর সবচে’ নিকটজন ছিলেন, ছিলেন সবচে’ একান্ত প্রিয়জন। কিন্তু তাঁদেরকে এই বিপদ থেকে বাঁচাবার জন্য তিনি অন্যদেরকে বিপদের মুখে ঠেলে দেননি, তাঁদেরকেই মোকাবিলায় পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলার কুদরত দেখুন, এই তিনজনকেই তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলায় জয়যুক্ত করলেন ও বিজয় দান করলেন। হযরত হামযা ও হযরত আলী (রা) সাফল্যের সঙ্গে বিজয়ী বেশে এবং নিরাপদে ফিরে আসলেন আর ‘উবায়দা (রা)-কে আহত অবস্থায় ময়দান থেকে উঠিয়ে আনা হল।
তিনি যখন (বিদায় হজ্জের খুতবায়) সূদকে হারাম এবং জাহিলী যুগের রক্তের বদলাকে বিলোপ ঘোষণা করলেন তখনও তার সূচনা করলেন তাঁরই শ্রদ্ধেয় চাচা ‘আব্বাস ইবন আব্দুল-মুত্তালিব এবং আপন ভাতিজা রবী‘আ ইবনু’ল-হারিছ (রা) ইবন ‘আবদি’ল-মুত্তালিব-এর পুত্র থেকে। বিদায় হজ্জের প্রদত্ত এই খুতবায় তিনি বলেনঃ
“জাহিলী যুগের সূদ আজ থেকে রহিত ও বিলুপ্ত করা হল এবং প্রথম যে সূদ আজ আমি বিলুপ্ত করছি তা আমারই আপনজন আব্বাস ইবন আব্দুল-মুত্তালিবের সূদ। জাহিলী যুগের রক্তের প্রতিশোধও আজ বিলুপ্ত করা হল আর সে ক্ষেত্রে
প্রথম যে রক্তের প্রতিশোধ বিলুপ্ত করা হল তা আমাদের রবী‘আ ইবনু’ল-হারিছ-এর সন্তানের রক্ত।”
পক্ষান্তরে আরাম-আয়েশ ও পুরস্কার কিংবা পারিতোষিক প্রদানের ক্ষেত্রে তিনি সাধারণ রাজা-বাদশাহর কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের আচরণ ও অভ্যাসের বিপরীতে এই সমস্ত বুযুর্গকে সব সময় পেছনে রেখেছেন এবং এঁদের মোকাবিলায় অন্যদেরকে প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার দিয়েছেন। হযরত আলী কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু বর্ণনা করেন, গম ভাঙাতে যাতা ঘোরাতে ফাতিমা (রা)-এর খুব কষ্ট হত। সে সময় তিনি জানতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে বেশ কিছু দাসী এসেছে। তিনি পিতার খেদমতে হাজির হলেন এবং তাঁর (ফাতিমার) খেদমতের জন্য, কাজে-কর্মে তাঁকে কিছুটা সাহায্যের জন্য একজন দাসী প্রদানের আবেদন জানালেন। রাসূলুল্লাহ (সা) সে সময় ঘরে ছিলেন না। তিনি হযরত আয়েশা (রা)-এর খেদমতে এর উল্লেখ করলেন। হযরত আয়েশা (রা) এ কথা আল্লাহ্র রাসূলের কানে তুললেন। অনন্তর রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের ঘরে তাশরীফ আনলেন। সে সময় আমরা ঘুমাবার জন্য বিছানায় শুয়ে পড়েছিলাম। তাঁকে দেখেই আমরা দাঁড়াতে গেলাম। তিনি আমাদের উঠতে নিষেধ করলেন। তাঁর কদম মুবারকের শীতলতা আমরা বক্ষে অনুভব করলাম। অতঃপর তিনি এ প্রসঙ্গের অবতারণা করে বললেন, “আমি কি তোমাকে এর থেকে উত্তম কথা বলব না যার আবেদন তুমি করেছিলে? যখন তুমি ঘুমাতে যাও তখন ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদু লিল্লাহ ও ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়বে। আমার কাছে তোমরা যা চেয়েছিলে তার চেয়ে এটি ভাল।”
অপর এক বর্ণনায় এ ঘটনার সাথে এও বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁদেরকে বলেন, “আল্লাহ্র কসম! আহলে সুফ্ফার সদস্যদের ক্ষুধায় পেট যখন পিঠের সাথে লেগে গেছে তখন (তাঁদের একটা ব্যবস্থা না করে) তোমাদের জন্য আমি কিছুই দিতে পারি না। তাঁদের খরচ চালাবার মত এ মুহূর্তে আমার কাছে কিছুই নেই। এদের (দাস-দাসীগুলো)-কে বিক্রি করে যা পাওয়া যাবে তা ওদের জন্য ব্যয় করব।”
সূক্ষ্মতর অনুভূতি, আবেগের সমুন্নতি ও পবিত্রতা
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সীরাত তথা জীবন-চরিত নবুওয়ত ও দাওয়াত-ই হকের
মহান দায়িত্ব, মানবতার জন্য দরদ ও মর্মজ্বালা এবং সেই অব্যাহত চিন্তা-ভাবনা ও কর্তব্যানুভূতির সাথে সাথে, পর্বতের পক্ষেও যার ভার বহন করা সহজসাধ্য ছিল না, সূক্ষ্ম মানবীয় অনুভূতি, পবিত্র ও সমুন্নত আবেগ পূর্ণ মাত্রায় বিরাজ করছিল সেই অস্বাভাবিক ইচ্ছাশক্তি, অনড় মত ও বিশ্বাসের সঙ্গে যা আম্বিয়া আলাইহিমুস-সালাম-এর প্রতীক চিহ্ন ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য হয়ে থাকে এবং যাঁরা দাওয়াত ইলাল্লাহ ও আল্লাহর কলেমার সমুন্নতির পথে এবং তাঁর হুকুম-আহকাম পালন করার ক্ষেত্রে কোন কিছুকেই গ্রাহ্যের মধ্যে আনেন না এবং কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেন না। তিনি তাঁর বিশ্বস্ত সাথীদেরকে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত ভোলেন নি যাঁরা তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন এবং সত্যের পথে নিজেদের সবকিছু লুটিয়ে দিয়েছিলেন, যাঁরা ওহুদ যুদ্ধে শাহাদত লাভ করে চিরন্তন ও চিরস্থায়ী জীবন লাভ করেছিলেন। তাঁদের কথা তিনি বারবার আলোচনা করেছেন, তাঁদের জন্য দু’আ করেছেন এবং তাঁদের অন্তিম বিশ্রামস্থলে গমন করেছেন।
এই ভালবাসা ও আস্থা মানবীয় দেহ অতিক্রম করে সেইসব নি্প্রাণ পাথর, পাহাড়-পর্বত ও উপত্যকা অবধি সঞ্চারিত হয়েছিল যেখানে প্রেম ও বিশ্বস্ততা, কুরবানী ও আত্মোৎসর্গের এই অপূর্ব দৃশ্য বিশাল বিস্তৃত আসমান প্রত্যক্ষ করেছিল এবং যেই উপত্যকা ভূমি তাঁদের অবস্থানস্থলে পরিণত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিল। আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, একবার তিনি ওহুদকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, هذﺍ جبل يحبنا ونحبه “এই সেই পাহাড় যে আমাদেরকে ভালবাসে আর আমরাও যাকে ভালবাসি।” আবী হুমায়দ (রা) বর্ণনা করেন, “আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে তাবূক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসছিলাম। আমরা যখন মদীনার নিকটবর্তী হলাম তখন তিনি বলেন : هذﻩ طابة وهذﺍ جبل يحبنا ونحبه “এই মদীনা তায়্যিবা আর এই সেই পাহাড় যে আমাদেরকে ভালবাসে, আমরা যাকে ভালবাসি।”
উকবা (রা) বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা) একদিন ওহুদের শহীদদের কবর যিয়ারত করতে গেলেন এবং তাঁদের জন্য দু’আ ও মাগফিরাত কামনা করলেন।” জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) বলেন, আমি দেখলাম যে, আল্লাহর রাসূলের সামনে ওহুদের শহীদদের সম্পর্কে কথা উঠল। তখন তিনি বললেন : আল্লাহর কসম! আমার ইচ্ছা ছিল আমিও যদি ওহুদের শহীদদের সাথে পাহাড়ের কোলে থেকে যেতে পারতাম!
তিনি তাঁর প্রিয়তম চাচা ও দুধভাইয়ের শাহাদাতের বেদনায় ও শোকে (যিনি রাসূলের ভালবাসায়, টানে ও ইসলামের সাহায্য-সমর্থনে আপন জীবন বিলিয়ে দেন এবং তাঁর লাশ মুবারকের সঙ্গে যেই আচরণ করা হয়েছিল যা আর কারো সঙ্গে করা হয়নি) উলূল-আজম (সুদৃঢ় ধৈর্যের অধিকারী) পয়গম্বরদের ন্যায় ধৈর্যের সাথে বরদাশত করেছিলেন। কিন্তু তিনি যখন ওহুদ থেকে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলেন এবং বনী আবদি’ল-আশহাল-এর ঘরের সামনে অতিক্রম করছিলেন এমন সময় শহীদদের জন্য কান্নার আওয়াজ তাঁর কানে ভেসে এল। আর এটাই তাঁর সূক্ষ্ম মানবীয় অনুভূতিতে অনুরণন সৃষ্টি করল, তাঁর চোখকে করে তুলল অশ্রুসিক্ত। তিনি বললেন : لكن حمزة لا بواكى له “কিন্তু হামযার জন্য কোন ক্রন্দনকারী নেই।”
তথাপি এই ভদ্র ও উন্নত মানবীয় আবেগ-অনুভূতি, নবুওয়াত ও ইসলামের দাওয়াতের মহান যিম্মাদারী, ঐশী সীমারেখার রেআয়েত ও হেফায়তের ব্যাপারে কোনরূপ প্রভাব-প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করতে পারেনি। সীরাত তথা জীবন-চরিতকার ও ঐতিহাসিক বর্ণনা করেন যে, সা’দ ইবন মু’আয ও উসায়দ ইবন হুদায়র (রা) যখন বনী আবদি’ল-আশহালের জন্য হুকুম দিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ঘরে গিয়ে পিতৃব্য সায়্যিদুনা হামযা (রা)-র শাহাদাতে মাতম তথা শোক প্রকাশের জন্য বললেন। মহিলারা তাই করল। রাসূলুল্লাহ (সা) ঘরে ফিরে মহিলাদেরকে মসজিদে নববীর দরজায় রোরুদ্যমান দেখতে পেলেন। তিনি তাদেরকে বললেন, “আল্লাহ তোমাদের ওপর রহম করুন! তোমরা যে যার ঘরে ফিরে যাও। তোমাদের এখানে আগমনই শোক প্রকাশের সমান হয়ে গেছে।” এক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এসব কি হচ্ছে? তাঁকে বলা হল, আনসাররা তাঁদের মহিলাদেরকে কোন উদ্দেশ্যে এখানে পাঠিয়েছেন। তিনি আল্লাহর কাছে মাফ চাইলেন এবং ভালোভাবে ভদ্র ভাষায় সম্বোধন করে তাদের বললেন, “আমার উদ্দেশ্য তা ছিল না (যা তোমরা বুঝেছ ; মৃতের জন্য কান্নাকাটি করা আমি পছন্দ করি না)। এরপর তিনি তাদেরকে মাতম করতে নিষেধ করলেন।”
এ থেকেও নাজুক মুহূর্ত দেখা দিয়েছিল আল্লাহর সিংহ সায়্যিদুনা হযরত হামযা (রা)-র ঘাতক ওয়াহশীর ক্ষেত্রে। মুসলমানরা মক্কা জয় করলে ওয়াহশীর কাছে
গোটা পৃথিবী ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যায় এবং সকল পথই সে অবরুদ্ধ দেখতে পায়। তার জন্য কুদরতীভাবেই সমস্যার সৃষ্টি হয়। সে সিরিয়া, ইয়ামান কিংবা অন্য কোথাও গিয়ে লুকোবার ইচ্ছে করে। কিন্তু লোকে তাকে বলল, “আরে ভাল মানুষ! আল্লাহর রাসূল এমন কাউকেই হত্যা করেন না, যে তাঁর ধর্ম ইসলামে দাখিল হয় অর্থাৎ তিনি কোন মুসলমানকে হত্যা করেন না।” বিষয়টা এবার তার উপলব্ধিতে ধরা পড়ল আর ধরা পড়তেই কলেমা শাহাদাত পাঠ পূর্বক সে মুসলমান হয়ে গেল। মুসলমান হওয়ার পর সে যখন প্রথমবারের মত হুযূর (সা)-এর দরবারে উপস্থিত হল তখন তিনি তার ইসলাম গ্রহণকে কবুল করলেন এবং এমন কোন কথা বললেন না যদ্বারা তার মনে ভীতির সঞ্চার হতে পারে। এরপর তিনি তার থেকে হযরত হামযা (রা)-র শাহাদাতের বিবরণ শুনলেন অর্থাৎ হামযা (রা)-কে সে কিভাবে হত্যা করেছিল। বিবরণ পেশ করতে তাঁর ভেতর সূক্ষ্ম মানবীয় অনুভূতি ও অবস্থা অবশ্যই সৃষ্টি হয়ে থাকবে। কিন্তু এই বিশেষ অবস্থা তাঁর নববী মেযাজ ও দায়িত্বানুভূতির ওপর প্রাধান্য পায়নি যে, তিনি তাঁর ইসলাম গ্রহণ কবুল করবেন না কিংবা ক্রোধের বশে তাকে হত্যাই করবেন (না, এমনটি হয়নি, হতে পারেনি)। কেবল তাকে এতটুকু বলেছেন, “আল্লাহর বান্দা! তুমি আমার সামনে এস না। আমি চাই তুমি যেন আমার সামনে না পড়।” ওয়াহশী বলেন : এরপর থেকে আমি তাঁর সামনে যেতে চাইতাম না যাতে আমার ওপর তাঁর চোখ পড়ে যায় আর এভাবেই তাঁর নির্ধারিত ও প্রতিশ্রুত সময় এসে যায়।
বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে— আমার ওপর যখন তাঁর চোখ পড়ল তখন তিনি আমাকে বললেন, “তুমি কি ওয়াহশী!” আমি বললাম : হ্যাঁ (আমি ওয়াহশী)! তিনি বললেন, “তাহলে তুমিই কি হামযাকে শহীদ করেছিলে?” আমি বললাম, “আপনি যা জেনেছেন তা সত্য।” তিনি বললেন, “তুমি কি এতটুকু করতে পার যে, তুমি আর আমার সামনে আসবে না?”
এই প্রকৃতিগত ও মানবীয় অবস্থা ও অনুভূতি এবং উন্নত ও সূক্ষ্ম আবেগের ঝলক আমরা সেখানেও দেখতে পাই যখন তিনি মাটিতে মিশে যাওয়া একটি পুরনো কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং নিজেকে আর স্থির রাখতে না পেরে কেঁদে ফেললেন। এরপর তিনি বললেন: এ (আমার মা) আমেনার কবর। এ ছিল তখনকার কথা যখন তাঁর (মা আমেনার) ইন্তিকাল হয়েছে বহু দিন গত হয়।
বদান্যতা, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা
আল্লাহ্র রাসূল (সা) সর্বোত্তম আখলাক ও চরিত্র, দয়া, বদান্যতা ও বিনয়ের ক্ষেত্রে সমগ্র মানবতার ইমাম ও অগ্রনায়ক ছিলেন। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন : اِنَّكَ لَعَلٰى خُلُقٍ عَظِيْمٍ
“হে রাসূল! আপনি নিশ্চিতই মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।” অন্যদিকে আল্লাহ্র রাসূল স্বয়ং বলেছেন : ادبنى ربی فاحسن تادیبی
“আল্লাহ তা’আলা আমাকে প্রশিক্ষণ দান করেছেন এবং সর্বোত্তম প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।”
হযরত জাবির (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন :

“আল্লাহ তা’আলা আমাকে সর্বোত্তম আখলাক-চরিত্র ও উত্তম কার্যাবলীর পূর্ণতা দানের জন্য পাঠিয়েছেন।”
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আখলাক-চরিত্র কেমন ছিল? এ সম্পর্কে হযরত আয়েশা (রা)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন : كان خلقه القرآن
“আখলাক-চরিত্রে তিনি কুরআনু’ল-করীমের বাস্তব প্রতিচ্ছবি ছিলেন।” মুসলিম, আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত।
ক্ষমাশীলতা, ধৈর্য ও সহনশীলতা, প্রশস্ত হৃদয় ও সহিষ্ণুতার ক্ষেত্রে তাঁর যে অবস্থানগত মর্যাদা ছিল সেখান অবধি মেধার অধিকারীর মেধা এবং কবির কল্পনাও পৌঁছতে পারে না।
যদি এসব ঘটনা সেই নির্দিষ্ট পন্থায় বর্ণনা না করা হত যা সকল সন্দেহ ও সংশয়ের ঊর্ধ্বে তাহলে লোকের মেধা ও মনন আজ তা কবুল করত না। কিন্তু এই সব বর্ণনা এতখানি সঠিক, নির্ভুল ও অব্যাহত সনদ এবং একজন নির্ভরযোগ্য ন্যায়পরায়ণ রাবী থেকে আরেকজন নির্ভরযোগ্য ন্যায়পরায়ণ রাবী পর্যন্ত এইরূপ সংযত ও সতর্কতার সাথে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এ সবের ভেতর এমন অব্যাহত ও ধারাবাহিক সূত্র পাওয়া যায় যে, এর দরুন এসব বর্ণনা সেই নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেযের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।
এই সুযোগে এই প্রসঙ্গে কতকগুলো ঘটনা আমরা বর্ণনা করব। তাঁর দয়া ও বদান্যতা এবং চরম থেকে চরমতম দুশমনের সাথেও সৌজন্য প্রদর্শন ও
সহানুভূতিমূলক আচরণের একটি নমুনা ছিল সেই ঘটনাটি যখন মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি ইবন সলূলকে কবরে নামানো হয়। তিনি সেখানে গমন করেন এবং তাকে কবর থেকে বের করবার নির্দেশ দিলেন। এরপর তিনি তার লাশ হাঁটুর ওপর নিলেন, পবিত্র মুখের থুথু তার ওপর নিক্ষেপ করলেন এবং নিজের পরিধেয় জামা তাকে পরালেন।
আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, “আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে চলছিলাম। সে সময় তিনি নাজরানের চাদর পরেছিলেন যার প্রান্তদেশ ছিল মোটা। পথিমধ্যে এক বেদূঈনে সঙ্গে দেখা। সে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চাদর মুবারক ধরে জোরে টান দিল। আমি চোখ তুলে দেখতে পেলাম জোরে টান দেয়ার ফলে তাঁর গলায় দাগ পড়ে গেছে। এরপর সেই বেদূঈন বলল : ওহে মুহাম্মদ! আল্লাহ্র যে মাল আপনার কাছে রয়েছে তা আমাকে দেবার জন্য হুকুম দিন। তিনি তার দিকে ঘুরে দেখলেন ও হাসলেন, তারপর তাকে তার প্রার্থিত বস্তু দেওয়ার জন্য বললেন।”
যায়দ ইবন সু’না (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) রাসূল (সা)-এর কাছে এল এবং তাকে ধার পরিশোধের দাবি জানাল যা তিনি তার থেকে নিয়েছিলেন। এরপর সে কাপড় ধরে তাঁর কাঁধে জড়িয়ে সজোরে টানা-হেঁচড়া করল, কাপড়ের প্রান্ত মুঠিতে ধরে রাখল এবং রূঢ় ভাষায় কথা বলল। সে এরপর আরও বলল : তোমরা আবদুল মুত্তালিবের বংশের লোক। বড় টালবাহানা কর তোমরা। হযরত ওমর (রা) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি লোকটার অশিষ্ট ও রূঢ় আচরণ লক্ষ্য করে তাকে ধমক লাগালেন এবং কড়া ভাষায় কথা বললেন। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মুখে হাসি লেগেই ছিল। তিনি হযরত ওমর (রা)-কে বললেন : ওমর! আমি ও এই লোক তোমার কাছে অন্যরূপ ব্যবহার পাবার হকদার ছিলাম। দরকার তো ছিল, তুমি আমাকে সত্ত্বর কর্জ পরিশোধের পরামর্শ দিতে আর তাকে বলতে নরম ও মোলায়েম ভাষায় তাগাদা দিতে। এরপর তিনি বললেন, তার ঋণ পরিশোধের এখনও তিন দিন সময় আছে। যাই হোক, তিনি হযরত ওমর (রা)-কে এই ঋণ পরিশোধের জন্য নির্দেশ দিলেন এবং আরও বিশ সা’ বেশি দেবার জন্য
বললেন এজন্য যে, হযরত ওমর (রা) তাকে ভীত-শঙ্কিত করে দিয়েছিলেন। আর এ কথাই তার অর্থাৎ পাওনাদার লোকটির (যায়দ ইবন সু’নার) ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়।
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, “একবার মক্কা থেকে ৮০ জন সশস্ত্র লোক তান’ঈম পাহাড় বেয়ে অতর্কিতে নেমে আসে এবং প্রতারণাপূর্বক রাসূল (সা)-কে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়। তিনি সবাইকে বন্দী করেন, কিন্তু কাউকে প্রাণে না মেরে সবাইকে জীবিত রাখেন।”
জাবির (রা) বর্ণনা করেন, “আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে একবার নাজদের দিকে অভিযান পরিচালনা করি। পথিমধ্যে দ্বিপ্রহর হল এবং আমরা বিশ্রাম নেবার প্রয়োজন অনুভব করলাম। উক্ত এলাকায় প্রচুর ঝোপঝাড় ছিল। তিনি একটি বাবুল বৃক্ষের ছায়ায় আরাম করছিলেন। তলোয়ার বৃক্ষ শাখায় ঝোলানো ছিল। লোকেরা এদিক-সেদিক বিভিন্ন গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ্র রাসূল (সা) আমাদের ডাক দিলেন। আমরা হুযূর (সা)-এর খেদমতে গিয়ে দেখি এক বেদূঈন তাঁর সামনে বসা। তিনি বললেন : আমি শুয়েছিলাম। এই লোক এসে আমার তলোয়ার টেনে নামায়। আমি জেগে দেখতে পেলাম সে তলোয়ার হাতে আমার শিয়রে দাঁড়িয়ে। সে আমাকে বলল : এখন আমার হাত থেকে কে তোমাকে বাঁচাবে বল? আমি বললাম : আল্লাহ! এরপর সে তলোয়ার কোষবদ্ধ করল এবং বসে পড়ল। এই সেই লোক যে এখন তোমাদের সামনে উপবিষ্ট।” বর্ণনাকারী (হযরত জাবির) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) তাকে কোন শাস্তি দেননি।
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার অবস্থা ছিল এই যে, সমস্ত সাহাবায়ে কিরামের ধৈর্যও একত্রে তার সমকক্ষ হবে না, অথচ সাহাবায়ে কিরাম (রা) সকলেই ধৈর্যের প্রতিচ্ছবি ছিলেন। উল্লিখিত সকল ব্যাপারে সকলের জন্যই তাঁর ভূমিকা ছিল একজন স্নেহশীল ওস্তাদ এবং একজন রহমদিল ও মেহেরবান সংস্কারক মুরুব্বীর। এর একটি নমুনা আমরা হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর বর্ণনায় দেখতে পাই। তিনি বলেন, “একবার এক বেদূঈন মসজিদে পেশাব করে দিল। লোকেরা তা দেখতে পেয়ে তেড়ে ফুঁড়ে এল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে থামিয়ে
দিয়ে বললেন : তাকে তোমরা ছেড়ে দাও এবং যেখানে সে পেশাব করেছে সেখানে এক বালতি পানি ঢেলে দাও। মনে রেখ, তোমাদেরকে আসানী সৃষ্টিকারী হিসাবে পাঠানো হয়েছে, দুর্বিষহ বিড়ম্বনা সৃষ্টিকারী হিসাবে নয়।
মু’আবিয়া ইবনু’ল-হাকাম (রা) বর্ণনা করেন— আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে সালাত আদায় করছিলাম। এক ব্যক্তি হাঁচি দিল। আমি জবাবে “ইয়ারহামুকাল্লাহ” বললাম। লোকে আমাকে জবাব দিতে শুনে ক্রোধভরে আমার দিকে তাকাতে লাগল। আমি বললাম— তোমাদের মা তোমাদেরকে কাঁদাক! কী হয়েছে যে, তোমরা আমার দিকে এভাবে ক্রোধভরে তাকাচ্ছ? এতদশ্রবণে লোকেরা তাদের নিজেদের রানের ওপর থাপ্পড় মারতে লাগল। যখন আমি বুঝতে পারলাম যে, তারা আমাকে চুপ করাতে চাচ্ছে তখন আমি চুপ করলাম। এমনি সময় রাসূলুল্লাহ (সা) সালাত থেকে মুক্ত হলেন। আমার পিতামাতা তাঁর জন্য কুরবান হউন! আমি এর আগে তাঁর মত মুরুব্বী ও শিক্ষক দেখিনি এবং এরপরও দেখিনি। আল্লাহ্র কসম করে বলছি, তিনি আমাকে শাসাননি, আমাকে ভাল-মন্দ কিছু বলেননি। কেবল এতটুকু বলেছেন যে, সালাত আদায়রত অবস্থায় সাধারণত মানুষ যেভাবে কথা বলে সেভাবে কথা বলা সমীচীন নয়। সালাত কেবল তাসবীহ, তাকবীর ও কুরআন তেলাওয়াতের জন্য।
আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, “আল্লাহ্র রাসূল (রা) খুবই রহমদিল ছিলেন। তাঁর নিকট কোন অভাবী লোক এলে কিংবা কোন লোক প্রয়োজন নিয়ে আসলে তিনি অবশ্যই তাকে কিছু দেবার প্রতিশ্রুতি দিতেন। কিছু থাকলে (দেবার মত) তখনই দিয়ে তার প্রয়োজন মেটাতেন। একবার সালাত দাঁড়িয়ে গেছে। এমন সময় জনৈক বেদূঈন সামনে অগ্রসর হল এবং তাঁর কাপড় ধরে বলতে লাগল : আমার একটা মা’মূলী প্রয়োজন বাকী আছে। আমার ভয় হয়, না জানি আমি ভুলে যাই। তিনি তার সাথে গেলেন। সে তার কাজ শেষ করলে তিনি ফিরে এলেন এবং সালাত আদায় করলেন।”
তাঁর ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও সহ্যশক্তি, উদার হৃদয় ও অটুট ইচ্ছাশক্তি সম্পর্কে তাঁরই খাদেম হযরত আনাস (রা) প্রদত্ত সাক্ষ্য থেকে পাওয়া যাবে। সে সময় তিনি খুবই অল্পবয়স্ক ছিলেন। তিনি বলেন, “আমি দশ বছর ধরে আল্লাহ্র রাসূল (সা)-এর
খেদমত করেছি। তিনি কখনও ‘হু’ বলেন নি এবং কখনও এও বলেন নি যে, অমুক কাজ তুমি কেন করলে আর অমুক কাজ কেন করলে না?”
সু’আদ ইবন ওমর (রা) বলেন— আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে হাজির হলাম। আমার কাপড়ে জাফরান মিশ্রিত খোশবুর চিহ্ন ছিল। তিনি দেখে বললেন, ورس ، ورس “ফেলে দাও, ফেলে দাও।” তারপর তিনি ছড়ি দিয়ে আমার পেটের ওপর আঘাত করলেন। এতে আমি কষ্ট পাই। আমি বললাম, “হে আল্লাহ্র রাসূল! এখন আমার ওপর কিসাস (বদলা, বিনিময়) গ্রহণের অধিকার এসে বর্তেছে।” অমনি রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর পেটের ওপর থেকে চাদর সরিয়ে দিলেন এবং বললেন, “কিসাস নিয়ে নাও।”
তাঁর বিনয়
তাঁর ভেতর অত্যধিক মাত্রায় বিনয় ছিল। কোন কিছুতেই এবং কোন ক্ষেত্রেই তিনি বিশিষ্ট ও দেদীপ্যমান হওয়া পছন্দ করতেন না এবং এও ভাল মনে করতেন না যে, লোকে তাঁর সম্মানে দাঁড়িয়ে পড়ুক কিংবা তাঁর প্রশংসা ও স্তুতির ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি বা সীমালংঘন করুক যেমনটি অতীতের বহু উম্মত তাদের নবীদের বেলায় করেছে অথবা কেউ তাঁকে আল্লাহ্র বান্দা ও রাসূল হওয়া থেকেও তাঁর মর্যাদা ঊর্ধ্বে তুলে ধরুক তাও তিনি পছন্দ করতেন না। হযরত আনাস (রা) বলেন, “আমাদের নিকট রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চেয়ে বেশি প্রিয় আর কিছু ছিল না। আমরা তাঁকে দেখতাম এবং এই ধারণায় দাঁড়াতাম না যে, তিনি তা পছন্দ করেন না।”
তাঁকে বলা হয়েছে যে, ياخير البرية অর্থাৎ হে সৃষ্টির সর্বোত্তম মানুষ! তিনি বললেন, ذالك ابراهيم عليه السلام “এ মর্যাদা ইবরাহীম (আ)-এর জন্য সংরক্ষিত।”
হযরত ওমর (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, “আমার প্রশংসা এভাবে বাড়িয়ে কর না যেভাবে খৃষ্টানরা ঈসা ইবন মরিয়ম (আ)-এর সম্পর্কে করেছিল। আমি তো কেবল আল্লাহ্র একজন বান্দা। তোমরা আমাকে আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল বলবে।”
আবদুল্লাহ ইবন আবী আওফা (রা) বর্ণনা করেন, “আল্লাহ্র রাসূল (সা) কোনরূপ লোক-লজ্জা অনুভব করতেন না কোন গোলাম কিংবা বিধবার সঙ্গে পথ চলতে এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে।” হযরত আনাস (রা) বলেন, “মদীনার দাসী-বাঁদীরা কেউ এসে তাঁর হাত ধরত এবং যা কিছু বলার বলত, যত দূর পারত হাত ধরে টেনে নিয়ে যেত।”
‘আদী ইবন হাতেম আত-তাঈ (রা) যখন তাঁর খেদমতে হাজির হলেন তখন তিনি তাঁকে নিজের ঘরে ডেকে নিলেন। একজন দাসী হেলান দেবার জন্য একটি বালিশ এগিয়ে দিল। তিনি বালিশটা নিয়ে ‘আদী ও তাঁর মাঝে রেখে দিলেন এবং নিজে মাটির ওপর বসে পড়লেন। ‘আদী (রা) বলেন— এ থেকেই আমি বুঝতে পারলাম তিনি কোন বাদশাহ নন।
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, “আল্লাহ্র রাসূল (সা) পীড়িতের সেবা করতেন, জানাযায় শরীক হতেন, গাধার ওপরও আরোহণ করতেন এবং ক্রীতদাসের দাওয়াতও কবুল করতেন।”
জাবির (রা) বর্ণনা করেন, “আল্লাহ্র রাসূল (সা) [চলার সময়] দুর্বল লোকদের কথা ভেবে চলার গতি শ্লথ করে দিতেন এবং তাদের জন্য দু’আ করতেন।”
আনাস (রা) বর্ণনা করেন, “আল্লাহ্র রাসূল (সা) যবের রুটি এবং স্বাদ নষ্ট হতে যাচ্ছে এমন তরকারির দিকে দাওয়াত দেওয়া হলেও তিনি তা কবুল করতেন।”
তাঁর থেকেই আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্র রাসূল (সা) ইরশাদ করেন, “আমি একজন দাস, দাসের মতই খাই এবং দাসের মতই উপবেশন করি।”
‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আমর ইবনি’ল-‘আস (রা) বর্ণনা করেন, “আল্লাহ্র রাসূল (সা) আমার এখানে তশরীফ নিলেন। আমি ছাল ভর্তি চামড়ার একটি বালিশ তাঁর খেদমতে পেশ করলাম। তিনি মাটির ওপরই বসে পড়লেন এবং বালিশটি আমার ও তাঁর মাঝে রেখে দিলেন।”
“আল্লাহ্র রাসূল (সা) নিজের ঘর নিজেই পরিষ্কার করতেন, উট বাঁধতেন, পশুর ঘাসপাতাও দিতেন, খেদমতগারের সঙ্গে বসে একই আসনে খানা খেতেন, আটা মারতে তাকে সাহায্য করতেন এবং বাজার থেকে প্রয়োজনীয় সওদা নিজেই নিয়ে আসতেন।”
বীরত্ব, সাহসিকতা ও লজ্জা-শরুম
তাঁর চরিত্রে বীরত্ব, সাহসিকতা ও লজ্জা-শরুম (যাকে অধিকাংশ মানুষ পরস্পরের বিপরীত মনে করে) একই রূপ বর্তমান ছিল। তাঁর লজ্জাশীলতা সম্পর্কে হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, “তিনি পর্দানশীন কুমারী বালিকার চেয়েও অধিক লাজুক ছিলেন। কোন জিনিস তাঁর অপছন্দনীয় হলে তাঁর চেহারায় তার প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত হত। অতিরিক্ত লজ্জা-শরুমের কারণে কারো মুখের ওপর এমন কথা বলতে পারতেন না যা তার নিকট বিষাদের কারণ হবে। এটি অন্যকে সোপর্দ করতেন।” হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, একবার আল্লাহ্র রাসূল (সা)-এর মজলিসে জনৈক ব্যক্তির কাপড়ে হলুদ রঙের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছিল। যেহেতু তিনি কারো মুখের ওপর এমন কথা বলা পছন্দ করতেন না যা তার নিকট খারাপ লাগবে, এজন্য সে যখন উঠে পড়ল তখন তিনি লোকদেরকে বললেন যে, খুবই ভাল ছিল যদি তোমরা তাকে হলুদ রঙের কাপড় ব্যবহার করা ছেড়ে দেবার জন্য বলে দিতে।
হযরত আয়েশা (রা) বলেন, “যখন তিনি কারো সম্পর্কে খারাপ কিছু জানতে পেতেন তখন তিনি তার নাম ধরে এ কথা বলতেন না যে, সে এ কাজ কেন করল, বরং তিনি এভাবে বলতেন, লোকের কি হল যে, তারা এ রকম বলে কিংবা এ রকম করে। তিনি তার বিরোধিতা করতেন বটে, কিন্তু করনেওয়ালার নাম প্রকাশ করতেন না।”
তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা সম্পর্কে শেরে খোদা আলী মুর্তাযা (রা)-র সাক্ষ্যই যথেষ্ট হবে বলে আশা করি। তিনি বলেন, “যুদ্ধ যখন তীব্র আকার ধারণ করত এবং মনে হত যে, চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে খুঁজে বেড়াতাম যাতে তাঁর আশ্রয় আমরা গ্রহণ করতে পারি এবং দেখতে পেতাম তিনি শত্রু থেকে খুব বেশি দূরে নন অর্থাৎ সে সময়
অন্যদের তুলনায় তিনিই শত্রুর কাছাকাছি অবস্থান করতেন। বদর যুদ্ধে আমাদের এই অবস্থাই ছিল। আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আশ্রয় নিচ্ছিলাম আর তিনি আমাদের সকলের তুলনায় শত্রুর সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী ছিলেন।
হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেন, “আল্লাহ্র রাসূল (সা) সকলের চেয়ে বেশি সুন্দর ও দীপ্তিমান, সবচেয়ে বেশি দানশীল, সবচেয়ে বেশি বীর-বাহাদুর ছিলেন। এক রাতে মদীনার লোকেরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল এবং যেদিক থেকে আওয়াজ আসছিল লোকেরা সেদিকে ছুটে গেল। পথিমধ্যে সকলের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাক্ষাৎ। তিনি তখন ফিরে আসছিলেন। তিনি আওয়াজ পেতেই সকলের আগেই বেরিয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলে চলছিলেন : ভয় পাবার কারণ নেই, কোন ভয় নেই। তিনি সে সময় আবূ তালহা (রা)-এর অশ্বপৃষ্ঠে সমাসীন ছিলেন যার পিঠে জীনও ছিল না। তাঁর কাঁধে তখন তলোয়ার ঝুলছিল। তিনি ঘোড়ার প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন, আমি তাকে সমুদ্রের মত গতিশীল, প্রবহমান ও দ্রুত গতিসম্পন্ন পেয়েছি।”
ওহুদ ও হুনায়ন যুদ্ধে যখন বড় বড় বীর-বাহাদুর শত্রুপক্ষের আক্রমণের তীব্রতায় বিক্ষিপ্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়েছিল এবং রণক্ষেত্র ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল সে সময়ও তিনি তাঁর খচ্চরের ওপর তেমনি নিরুদ্বিগ্ন ও প্রশান্ত চিত্তে ও দৃঢ়তার সঙ্গে আপন অবস্থানে অটল ছিলেন। মনে হচ্ছিল যেন কিছুই হয়নি। তিনি তখন নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করে চলেছিলেন :

“আমি নবী মিথ্যা নই; আবদুল মুত্তালিবের বংশধর আমি (এও তেমনি মিথ্যা নয়)।”
স্নেহ-ভালবাসা ও সাধারণ দয়ামায়া
এই ধরনের বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে সাথেই তিনি অত্যন্ত রহমদিল ছিলেন। তাঁর চক্ষু খুব সহজেই অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠত।
দুর্বল মানুষ, এমন কি অবলা পশুর প্রতি সদয় ব্যবহারের জন্যও তিনি নির্দেশ দিতেন। শাদ্দাদ ইবন আওস (রা) বলেন, আল্লাহ্র রাসূল (সা) বলেছেন, “আল্লাহ তা’আলা প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে ভাল ব্যবহার ও কোমল আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। এজন্য হত্যা করতে চাইলেও ভালভাবে কর, যবাহ করলেও ভালভাবে
কর। তোমাদের কেউ পশু যবাহ করতে চাইলে সে যেন তার ছুরি ভালোভাবে শান দিয়ে নেয় এবং যবাহ্র পশুকে যেন আরাম দেয়।”
হযরত ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি একটি বকরী যবাহর জন্য মাটিতে শুইয়ে দিয়ে ছুরিতে শান দিতে লাগল। রাসূলুল্লাহ (সা) তা দেখে তাকে বললেন, “তুমি কি তাকে দু’বার মারতে চাও? তাকে শুইয়ে দেবার আগেই কেন তুমি ছুরিতে শান দিয়ে নিলে না?”
তিনি সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে জীব-জানোয়ারকে ঘাসপাতা দেবার জন্য নির্দেশ দিতেন এবং তাদেরকে পেরেশান করতে ও তাদের পিঠে সাধ্যাতীত বোঝা চাপাতে নিষেধ করেন। পশুর কষ্ট দূর করা এবং তাদেরকে আরাম-আয়েশ দেওয়াকে ছওয়াব ও পুরস্কারের কারণ এবং আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের মাধ্যম বলে বর্ণনা করেন। তিনি এর ফযীলতও বর্ণনা করেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, “এক ব্যক্তি কোথাও সফরে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তাঁর তীব্র পিপাসা লাগে। তিনি একটু দূরে একটি কুয়া পেলেন এবং এতে নেমে পড়লেন। পানি পানের পর তিনি ওপরে উঠে এসে দেখতে পেলেন যে, একটা কুকুর পিপাসার তীব্রতায় পানি না পেয়ে কাদা চাটছে। লোকটি মনে মনে ভাবলেন, পিপাসায় আমার যেই অবস্থা হয়েছিল এর অবস্থাও তাই। তিনি পুনরায় কুয়ায় অবতরণ করলেন, স্বীয় চামড়ার মোজায় পানি ভর্তি করলেন, অতঃপর পানি ভর্তি মোজাটি দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে ওপরে উঠে আসলেন এবং কুকুরটাকে পানি পান করালেন। আল্লাহ তা’আলা তাঁর এই আমলকে কবুল করলেন এবং তাঁর বিগত জীবনের সকল অপরাধ ক্ষমা করেন। লোকেরা আরয করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! পশু-পাখি ও জীব-জানোয়ারের ব্যাপারেও পুরস্কার রয়েছে? তিনি বললেন : সৃষ্টি জগতের এমন প্রতিটি বস্তুতে পুরস্কার রয়েছে যার প্রাণ রয়েছে, যা তরতাজা ও জীবন্ত।”
আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “জনৈক মহিলাকে কেবল এজন্যই শাস্তি দান করা হয়েছিল যে, সে তার বিড়ালটাকে খেতে দেয়নি, বিড়ালটাকে বেঁধে রাখার কারণে কোন কিছু শিকার করে খেতে পারেনি। ফলে বিড়ালটা মারা গিয়েছিল।”
সুহায়ল ইবন ‘আমর (অন্য বর্ণনায় সুহায়ল ইবনু’র-রবী ইবন ‘আমর) [রা]
বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ্র রাসূল (সা) একবার পথ চলতে একটি উটের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। উটটা অনাহারে থাকার দরুন শীর্ণকায় হয়ে গিয়েছিল এবং তার পেট পিঠের সাথে লেগে গিয়েছিল। এতদ্দৃষ্টে (উটের মালিককে ডেকে) তিনি বললেনঃ
“এইসব অবলা পশুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। এর পিঠে যখন আরোহণ করবে, তখন ভালোভাবে আরোহণ করবে। যখন যবাহপূর্বকে তার গোশত ভক্ষণ করবে তখনও যেন সে ভাল অবস্থায় থাকে।”
‘আবদুল্লাহ ইবন জা’ফর (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) জনৈক আনসারীর ঘেরাও পাঁচিলের ভেতর প্রবেশ করলেন। ভেতরে একটি উট ছিল। রাসূল (সা)-কে দেখতেই উটটা ডাকতে লাগল এবং তার চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল। আল্লাহ্র রাসূল (সা) তার কাছে গেলেন এবং তার কুঁজ ও পিঠের ওপর হাত বুলালেন। এতে উটটা শান্ত হয়ে গেল। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, উটটার মালিক কে? এমন সময় একজন আনসারী যুবকের আবির্ভাব ঘটল এবং উটটা তার বলে জানাল। তিনি তাকে বললেন, “আল্লাহ তা’আলা যে পশুর ব্যাপারে তোমাকে মালিক বানিয়েছেন তাঁকে কি তুমি ভয় পাও না? সে তোমার বিরুদ্ধে আমার কাছে অভিযোগ করছে যে, তুমি তাকে কষ্ট দাও এবং সব সময় তাকে কাজে লাগিয়ে রাখ।”
হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, আল্লাহ্র রাসূল (সা) বলেন, “যদি তোমরা সবুজ শ্যামল কোন জায়গায় যাও তখন সেখানে জোরে হাঁটবে। যদি রাত্রে কোথাও ছাউনি ফেলতে হয় তবে রাস্তার ওপর ফেলবে না এজন্য যে, সেখানে জীব-জানোয়ারের চলাফেরা ঘটে থাকে এবং পোকা-মাকড় আশ্রয় নেয়।”
ইবন মাসঊদ (রা) বর্ণনা করেন— আমরা আল্লাহ্র রাসূল (সা)-এর সঙ্গে একবার এক সফরে ছিলাম। তিনি একটি জরুরী প্রয়োজনে সেখান থেকে কিছুক্ষণের জন্য অন্যত্র গমন করেন। ইতোমধ্যে আমরা একটা ছোট্ট পাখি দেখতে পেলাম যার সাথে আরও দু’টো ছানা ছিল। আমরা ছানা দু’টো নিয়ে নিলাম। পাখিটা তা দেখে পাখা ঝাপটাতে লাগল। এমন সময় আল্লাহ্র রাসূল (সা) ফিরে এলেন এবং এ দৃশ্য দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন : ছানা দু’টো ছিনিয়ে এনে পাখিটাকে কে কষ্ট দিয়েছে? এরপর তিনি ছানা দু’টো যথাস্থানে ফিরিয়ে দেবার হুকুম দিলেন। সেখানে আমরা পিঁপড়ার একটা ঢিবি দেখতে পাই এবং তা
জ্বালিয়ে দেই। তিনি জিজ্ঞেস করলেন য়া এটা কে জ্বালিয়েছে? আমরা বললাম য়া আমরাই এ কাজ করেছি। তিনি বললেন য়া আগুনে পুড়িয়ে শাস্তি দেবার অধিকার কেবল আল্লাহ্ রাব্বু’ল-আলামীনের।
খাদেম, চাকর-বাকর ও শ্রমিকদের সাথে, যারা আর পাঁচজন মানুষের মতোই মানুষ, যাদের তাদের মনিব ও মালিকের ওপর অবদান রয়েছে, তিনি সদ্ব্যবহার করার যেই শিক্ষা দিয়েছেন তা এর অতিরিক্ত। হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা) বলেন আল্লাহ্ রাসূল (সা) বলেছেন, “তোমরা যা খাও তাদেরকেও তাই খেতে দাও, তোমরা যা পরিধান কর তাদেরকেও তাই পরিধান করাও আর আল্লাহ্ তা’আলার মাখলূককে শান্তিতে নিক্ষেপ কর না। যাদেরকে আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদের অধীনস্থ করেছেন, তারা তোমাদের ভাই, তোমাদের খাদেম ও তোমাদেরই সাহায্যকারী মদদগার। যার ভাই যার অধীনে তার উচিত হবে সে যা খাবে তাকেও তাই খাওয়াবে, যা নিজে পরবে তাকেও তাই পরতে দেবে। তাকে এমন কাজ করতে দেবে না যা তার শক্তির বাইরে। যদি তাকে এমন কাজ করতে দিতেই হয় তবে তুমি তার কাজে সহযোগী হবে, তাকে সাহায্য করবে।”
আবদুল্লাহ্ ইবন ওমর (রা) বলেন, এক বেদূঈন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খেদমতে এল এবং জিজ্ঞেস করল, “আমি আমার নওকরকে দিনে কতবার ক্ষমা করব?” তিনি বললেন, “সত্তর বার।” বর্ণনাকারী আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, “শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকাবার পূর্বেই তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক তাকে দিয়ে দাও।”
বিশ্বজয়ী, পরিপূর্ণ ও চিরন্তন নমুনা
হযরতুল্ ওস্তায মাওলানা সায়্যিদ সুলায়মান নদভীর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘খুতباتে মাদ্রাজ’-এর একটি অংশ উদ্ধৃত করার মাধ্যমে এই অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি টানতে চাই যেখানে সায়্যিদ সাহেব রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পরিপূর্ণ, বিশ্বজয়ী ও অবিনশ্বর জীবন-চিত্র, তাঁর ব্যাপকতা ও পরিপূর্ণতা, মানব জাতির সকল স্তর ও সকল শ্রেণীর, অধিকন্তু সব রকমের পরিবেশ, সকল যুগ, সকল পেশা, মোটকথা সর্বপ্রকার অবস্থা, জীবনের প্রতিটি স্তর ও পর্যায়ের জন্য তাঁর পরিপূর্ণ ও সামগ্রিক দিকনির্দেশনা
ও মহোত্তম আদর্শ অত্যন্ত প্রভাবমণ্ডিত ভাষায় অলঙ্কারপূর্ণ ভঙ্গীতে পেশ করেছেন। তিনি বলেন :
“সর্বশ্রেণীর মানুষের জন্য সর্বাবস্থায় আদর্শ স্থানীয় এবং মানুষের সর্বপ্রকার বিশুদ্ধ মানসিকতার সুষ্ঠু বিকাশ, পূর্ণাঙ্গ আচার-পদ্ধতি ও চরিত্রের সমন্বয় যাঁর জীবন-চরিতে ঘটেছে তিনি একমাত্র মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ছাড়া আর কেউ নন। আপনি যদি বিত্তশালী হয়ে থাকেন তবে মক্কার আদর্শ ব্যবসায়ী ও বাহরায়নের বিত্তবান মহাপুরুষের আদর্শ অনুসরণ করুন। দীনহীন দরিদ্র হয়ে থাকলে শি’বে আবূ তালিবের অসহায় বন্দী ও মদিনায় আশ্রয় গ্রহণকারী মেহমানের হালচাল শুনুন। আপনি সম্রাট হয়ে থাকলে আরব সম্রাটের ইতিহাস কাহিনী পাঠ করুন, শাসিত হয়ে থাকলে কুরায়শদের শাসিত শোষিত মুহাম্মাদ (সা!)-এর দিকে একটু দৃকপাত করুন। বিজয়ী হয়ে থাকলে বদর ও হুনায়ন বিজয়ী মহাবীর সেনাপতির দিকে লক্ষ্য করুন। পরাজিত হয়ে থাকলে ওহুদ যুদ্ধের শিক্ষা গ্রহণ করুন। আপনি যদি ওস্তাদ বা শিক্ষক হয়ে থাকেন, তবে সুফ্ফা শিক্ষাগারের আদর্শ শিক্ষকের আদর্শ সামনে রাখুন। ছাত্র বা শাগরিদ হয়ে থাকলে জিবরাইল রুহুল আমীনের সম্মুখে উপবিষ্ট আদর্শ ছাত্রকে অনুসরণ করুন। আপনি যদি ওয়ায়েজ, উপদেশদাতা বা বক্তা হন, তবে মদীনার মসজিদের মিম্বরে দণ্ডায়মান মহাপুরুষের আদর্শ বাণী শুনুন। নিঃসঙ্গ অসহায় অবস্থায় সত্যের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালনে যদি আপনি আগ্রহী হন, তবে মক্কার অসহায় মহাপুরুষের আদর্শ আপনার সম্মুখে রয়েছে। খোদায়ী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে দুশমনকে পরাভূত ও প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে থাকলে মক্কাবিজয়ী মহাপুরুষের আদর্শ অবলোকন করুন। বিষয় সম্পত্তি ও পার্থিব ব্যাপারসমূহকে গোছানোর ব্যাপারে খায়বর, বনি নযীর ও ফাদাকের ভূ-সম্পত্তিসমূহের মালিকের আদর্শ আপনার সম্মুখে রয়েছে। পিতৃহীন এতিমের জন্য রয়েছে আবদুল্লাহ ও আমেনার দুলালের আদর্শ, শিশু বালকের জন্য রয়েছে হালিমার গৃহে প্রতিপালিত বালক মুহাম্মাদের আদর্শ, যুবকের জন্য রয়েছে মক্কার রাখাল যুবকের আদর্শ। আপনি যদি ব্যবসা ব্যপদেশে সফরে থাকেন তবে বসরার বিদেশী বণিকের দৃষ্টান্ত আপনার সম্মুখে রয়েছে। আপনি যদি আদালতের বিচারপতি অথবা পঞ্চায়েতের সালিশ হন, তবে প্রভাত সূর্যের পূর্বে কা’বায় প্রবেশকারী বিচারকের প্রতি লক্ষ্য করুন হাজরে আসওয়াদকে কা’বার এক কোণে কেমন করে রেখে দিচ্ছেন। মদীনার খেজুর পাতায় ছাওয়া মসজিদে উপবিষ্ট বিচারপতিকে লক্ষ্য করুন আইনের বেলায় যার কাছে বাদশাহ-ভিখারী ও আমীর- গরীবের মধ্যে
পার্থক্যের কোন বালাই নেই। আপনি স্বামী হয়ে থাকলে খাদীজা ও আয়েশার পুণ্যাত্মা স্বামীর আদর্শ চরিত পাঠ করুন। আপনার সন্তান-সন্ততি থাকলে ফাতেমার জনক ও হাসান-হুসায়নের নানার আদর্শ আপনার সম্মুখে রয়েছে। মোটকথা, আপনি যে কেউ হন না কেন, সর্বাবস্থায়ই আপনার জীবনপথে চলার জন্য আদর্শ ও আলোর দিশা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপক জীবন-চরিতে নিহিত রয়েছে। এজন্য সর্বশ্রেণীর আদর্শ অনুসন্ধিৎসু ও নূরে ঈমানের তলবগারদের জন্য একমাত্র মোস্তফা-চরিতেই আলোর দিশা ও মুক্তির পথ নিহিত রয়েছে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ যার সম্মুখে রয়েছে, একাধারে নূহ, ইবরাহীম, আইয়ুব, ইউনূস ও মূসা-ঈসা মহাপুরুষবর্গের আদর্শ জীবন-চরিতসমূহ তার চোখের সামনে রয়েছে। অন্য সকল নবীর জীবন-চরিতসমূহ যেন একইধরনের দ্রব্যসামগ্রীর বিপণীমালা আর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচার-ব্যবহার ও জীবনচরিত দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ বিপণীকেন্দ্র, যেখানে সকল ধরনের ক্রেতা ও সব রকমের পণ্যসামগ্রীর ছড়াছড়ি রয়েছে।”