আমীর-উমারা ও শাসকবর্গের প্রতি ইসলামের দাওয়াত

আমীর-উমারা ও শাসকবর্গের প্রতি ইসলামের দাওয়াত
(৬ষ্ঠ হিজরীর শেষ ভাগ থেকে ৭ম হিজরীর ১ম ভাগ)

দাওয়াতের বিজ্ঞ পন্থা

হুদায়বিয়ার সন্ধির পর অবস্থা স্বাভাবিকভাবেই শান্তিপূর্ণ হয়ে যায়। ইসলামের দাওয়াত শ্বাস গ্রহণের সুযোগ পায় এবং উন্নতি ও প্রগতির পথে অগ্রসর হওয়ার নতুন রাস্তাসমূহ বিস্তৃত হতে থাকে। এই সুযোগে রাসূলুল্লাহ (সা) পৃথিবীর বিভিন্ন শাহানশাহ সম্রাট ও আরবের আমীর-উমারা বরাবর কতকগুলো চিঠি লেখেন এবং তাদেরকে বড় বিজ্ঞজনোচিত পন্থায় ইসলামের দাওয়াত দেন। এজন্য তিনি বেশ আয়োজন করেন এবং প্রত্যেক সম্রাটের জন্য এমন সব দূত নির্বাচিত করেন যাঁরা তাঁদের সম্মান ও মর্যাদা মুতাবিক কথাবার্তা বলতে পারেন এবং সেখানকার ভাষা, অধিকন্তু দেশের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল।

সাহাবায়ে কিরাম (রা) আরয করেন যে, এ সব দেশের শাসকবর্গ এমন কোন পত্র গ্রহণ করেন না যার উপর মোহরাঙ্কিত না করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের

জন্য একটি বিশেষ মোহর (সিল) তৈরি করেন যার বৃত্ত ছিল রৌপ্যের এবং মাঝখানে محمد رسول الله এভাবে অঙ্কিত ছিল।

এসব লিপি আমাদের বলে দেয় যে, এই ধর্ম কেবল আরবদের কিংবা আরব উপদ্বীপের নয়, বরং গোটা মানব সমাজের ছিল। অনন্তর আরবের বাইরের সভ্য ও প্রভাবশালী হুকুমত এর ভেতর তাদের পতন দেখতে পায় এবং সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা নিজেরা এই দাওয়াতকে কবুল করবে না অথবা নিদেনপক্ষে তাদের প্রজাদেরকে এই দাওয়াত বুঝবার ও সে সম্পর্কে ফয়সালা করবার সুযোগ দেবে না।

নবী করীম (সা)-এর পত্রাবলী

যে সব রাজা-বাদশাহ ও সম্রাটের নামে এসব পত্র প্রেরণ করা হয়েছিল তাঁদের মধ্যে রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস, পারস্য সম্রাট খসরু পারভেয, আবিসিনিয়া অধিপতি নাজাশী ও মিসরের বাদশাহ মুকাওকিসের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

হেরাক্লিয়াসের নামে প্রেরিত পত্র তিনি হযরত দাহিয়াতুল-কালবী মারফত পাঠান এবং তিনি বসরার শাসক ও সর্দারের মাধ্যমে এই পত্র সম্রাট হেরাক্লিয়াস অবধি পৌঁছে দেন। পত্র নিম্নরূপ:

“পরম দাতা ও দয়ালু আল্লাহর নামে। মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে যিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। এই পত্র রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াসের নামে প্রেরিত হচ্ছে। হেদায়াতের অনুসারীদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর আমি তোমাকে ইসলামের দিকে আহ্বান করছি। ইসলাম কবুল কর, শান্তি পাবে। আল্লাহ তোমাকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন। আর তুমি যদি না মান, এর থেকে মুখ ফিরিয়ে

নাও তাহলে তোমার প্রজাবর্গের গুনাহও তোমার কাঁধে চাপবে। হে কিতাবধারিগণ! এমন একটি কথার দিকে এস যা আমাদের ও তোমাদের মাঝে बराबर আর তা হল, আমরা আল্লাহ ব্যতিরেকে অপর কারোর ইবাদত করব না। আর আমাদের কেউ আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাদের কাউকে ‘রব’ তথা প্রভু-প্রতিপালক হিসাবে গ্রহণ করব না। আর যদি তোমরা এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে বল, সাক্ষী থাক যে, আমরা মুসলমান।”

খসরু পারভেযের নামে নিম্নোক্ত-পত্র প্রেরণ করেন :

“পরম দাতা ও দয়ালু আল্লাহর নামে। আল্লাহর রসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে পারস্য সম্রাট খসরুর উদ্দেশ্যে (পত্র প্রেরিত হচ্ছে)। তার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক যে হেদায়াতের অনুসারী, আল্লাহ ও তদীয় রাসূলে বিশ্বাসী এবং যে এই সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতিরেকে আর কোন মা’বূদ নেই এবং আমি সমগ্র মানব-মণ্ডলীর উদ্দেশ্যে রাসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি যাতে প্রত্যেক জীবিত মানুষকে আমি সতর্ক করতে পারি, করতে পারি ভীতি প্রদর্শন। ইসলাম কবুল কর, শান্তি পাবে। অন্যথায় অগ্নি উপাসক প্রজাবর্গের সকল পাপ তোমার কাঁধে চাপবে।”

নাজাশীর নামে প্রেরিত পত্র নিম্নরূপ :

“পরমদাতা ও দয়ালু আল্লাহর নামে। মুহাম্মাদ-এর পক্ষ থেকে, যিনি আল্লাহর রাসূল, আবিসিনিয়া অধিপতি নাজাশীর প্রতি (এই পত্র প্রেরিত হচ্ছে)। হেদায়াত অনুসারীদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর আমি তোমার নিকট সেই আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করছি যিনি ব্যতিরেকে আর কোন ইলাহ নেই। যিনি সম্রাট, পবিত্র, শান্তিপ্রদাতা, মু’মিন ও রক্ষক এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, ঈসা ইবন মরিয়ম আলাইহিস-সালাম আল্লাহর রূহ ও তাঁর বাক্য যা তিনি পবিত্র আত্মা ও সতী-সাধ্বী মরিয়মের মধ্যে ফুঁকে ছিলেন। অনন্তর তাঁর রূহ ও তাঁর ফুৎকারে ঈসা(আ) তাঁর গর্ভে স্থিতি লাভ করেন, হযরত আদম (আ)-কে যেমন তিনি তাঁর কুদরতী হাতে বানিয়েছিলেন। আমি তোমাকে দাওয়াত দিচ্ছি এক আল্লাহর বিশ্বাস স্থাপনের যাঁর কোন শরীক নেই, তাঁর প্রভুত্বের আনুগত্যের। আর তুমি আমার আনুগত্য কর এবং ওয়াহী হিসাবে আমার ওপর যা নাযিল হয়েছে তার অনুসরণ কর। তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন কর। নিশ্চিতই আমি আল্লাহর রাসূল। আর আমি তোমাকে ও তোমার সেনাবাহিনীকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাচ্ছি। আমি আমার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি এবং আমার নসীহত পূর্ণ করেছি। অতএব আমার নসীহত কবুল কর। যারা হেদায়াতের অনুসারী তাদের প্রতি সালাম।”

কিবতী অধিপতি ও বাদশাহ মুকাওকিসের নামে প্রেরিত পত্র ছিল নিম্নরূপ :

“পরম দাতা ও দয়ালু আল্লাহর নামে। আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (সা)-এর পক্ষ থেকে কিবতী অধিপতি মুকাওকিসের নামে। হেদায়াত অনুসারীদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর আমি তোমাকে ইসলামের দাওয়াত জানাচ্ছি। ইসলাম কবুল কর, শান্তি পাবে। আল্লাহ তোমাকে দ্বিগুণ পুরস্কারে ভূষিত করবেন। আর যদি তুমি না মান তাহলে তোমার দেশবাসীর গুনাহও তোমার ওপর বর্তাবে।

ওহে আহলে কিতাব! একটি বিষয়ের দিকে আস যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোন শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না। তারপর তারা যদি স্বীকার না করে তাহলে বলে দাও যে, সাক্ষী থাক! আমরা তো অনুগত মুসলিম” (সূরা আল ইমরান, ৬৪ আয়াত)।

কিন্তু খসরু পারভেযের পত্রে এই আয়াত লিপিবদ্ধ ছিল না। কেননা এইসব পত্রে সেই সব গ্রন্থধারী (আহলে কিতাব)-কে সম্বোধন করা হয়েছে যারা ঈসা মসীহ (যীশু খৃষ্ট)-র ঈশ্বরত্বের সমর্থক এবং যারা আল্লাহ ব্যতিরেকে ধর্মীয় পণ্ডিত ও সাধু-সন্তদেরকে এবং মসীহ (আ)-কে নিজেদের ‘রব’ তথা প্রভু বানিয়ে নিয়েছিল। হেরাক্লিয়াস বায়যান্টিয়াম সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন আর মুকাওকিস ছিলেন মিসরের বাদশাহ। উভয়েই তৎকালীন খৃষ্টান বিশ্বের নেতা ও [হযরত মসীহ (আ) সম্পর্কে মামূলী কিসিমের মতভেদ ছাড়া] স্বীকৃত ধর্মীয় রাহনুমাও ছিলেন।

খসরু পারভেয ও তার জাতি সূর্য পূজারী ও অগ্নিপূজক ছিল এবং দুই খোদা (মঙ্গল ও কল্যাণের খোদা ‘য়াযদান’ এবং অমঙ্গল ও অকল্যাণের খোদা হিসেবে ‘আহরিমান’)কে মান্য করত। তারা নবুওয়াত ও রিসালাতের সঠিক মর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল। সেজন্য পারস্য সম্রাটের প্রেরিত পত্রে এই কথা লেখা হয়েছিল : واني رسول الله الى الناس كافة لينذر من كان حيا “আমি সমগ্র মানবমণ্ডলীর জন্য আল্লাহর এমন এক রাসূল যেন সচেতনভাবে তিনি জীবিত লোকদেরকে সতর্ক করতে পারেন।”

এসব সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন কারা?

আমরা এই পয়গম্বরসুলভ পদক্ষেপের গুরুত্ব ও উপযোগিতা (যা এই সব পত্রে ব্যক্ত হয়েছে) ততক্ষণ পর্যন্ত পরিমাপ করতে মানব না যতক্ষণ না উল্লিখিত রাজন্য চতুষ্টয় (হেরাক্লিয়াস, খসরু পারভেয, নাজাশী ও মুকাওকিস)-এর সমসাময়িক ইতিহাস, অবস্থান ও মর্যাদা, তাঁদের সাম্রাজ্যের পরিধি ও বিস্তৃতি এবং তাঁদের শান-শওকত সম্পর্কে আমরা অবহিত হব। যদি কেউ খৃষ্টীয় ৭ম শতাব্দীর রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত না হন এবং তিনি যদি ঐসব দেশ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য না জেনে থাকেন তাহলে তিনি মনে করতে পারেন যে, এসব পত্র

কতকগুলো স্থানীয় শাসক ও দেশীয় রাজার নামে লেখা হয়েছিল যা সর্বকালে ও সর্বত্র পাওয়া যায়।

এর বিপরীতে যিনি সেই যুগের রাজনৈতিক চিত্রে ঐসব রাজা-বাদশাহর গুরুত্ব সম্পর্কে জ্ঞাত, তাঁদের ইতিহাস, জীবন-চরিত ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত, তাঁদের শক্তি, ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তিকে বেশ ভাল করেই উপলব্ধি করেন, তিনিই অনুভব করবেন যে, এই বিরাট পদক্ষেপ গ্রহণ ও সাহসিকতা প্রদর্শন কেবল সেই নবীই করতে পারেন যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে এই কাজের জন্য আদিষ্ট, যাঁর ওপর এই দাওয়াত ও পয়গামের পরিপূর্ণ যিম্মাদারী অর্পিত, যাঁর ওপর দুর্বলতা ও ভীতির সামান্যতম ছায়াও পড়েনি এবং আসমান ও যমীনের প্রকৃত শাহানশাহ রাজাধিরাজের যাঁর ওপর এমন তাজাল্লি হবে যে, রাজমুকুট ও শাহী তখতের মালিক তাঁর দৃষ্টিতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কিংবা নিষ্প্রাণ কাষ্ঠপুত্তলি মনে হয়, যাঁকে বাদশাহদের পোশাকে সজ্জিত করে হুকুমতের সিংহাসনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেইজন্য এখানে সমসাময়িক ইতিহাস ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিকদের সাক্ষ্যের সাহায্যে তাঁদের পরিচিত পেশ করা হচ্ছে।

রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস ১ম (৬১০-৬৪১খৃ.)

বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যাধিপতি রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস ১ম এক সুবিশাল ও বিস্তৃত সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন যিনি পারস্য সম্রাটের সঙ্গে মিলে সে যুগের সমগ্র সভ্য জগৎকে নিজেদের মধ্যে আপোসে ভাগ-বণ্টন করে নিয়েছিলেন এবং যাঁর মুদ্রা অর্ধ-দুনিয়াব্যাপী চলছিল। তিনটি মহাদেশ ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকায় তাঁর সমৃদ্ধ, শক্তিশালী, প্রাচুর্যপূর্ণ, উন্নত, সভ্য ও নব্য উপনিবেশ (Dominions) ছিল। এই সাম্রাজ্য মহান রোম সাম্রাজ্যের স্থলাভিষিক্ত ছিল যার অধীনে প্রায় সমগ্র প্রাচীন সভ্য দুনিয়াই ছিল।

এই সম্রাট এক গ্রীক পরিবারে সদস্য ছিলেন। তিনি কাপুডেশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং (কুর্তাজেনা) কার্থেজ-এ লালিত-পালিত হন। তিনি আফ্রিকার একজন শাসকের পুত্র ছিলেন। তাঁর ভেতর এমন কিছু ছিল না যদ্বারা তাঁর অস্বাভাবিক মেধা, অত্যুৎসাহ ও নেতৃত্বসুলভ যোগ্যতার পরিচয় মিলত। ফোকাস যখন বলপূর্বক বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের অধিপতি সম্রাট মরিকাস মরিস (পারস্য সম্রাট খসরু

পারভেয যাঁর দ্বারা অনুগৃহীত হয়েছিলেন)-কে হত্যা করেন তখন ইরানী রা বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের উপর সৈন্য পরিচালনার বাহানা পেয়ে যায় এবং বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের বারটা বাজিয়ে ছাড়ে। এই বিশাল বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের শেষ নিঃশ্বাস চলছিল। ফলে হেরাক্লিয়াসকে কার্থেজ থেকে ডেকে পাঠানো হয়। তিনি ফোকাসকে হত্যা করেন এবং ৬১০ খৃষ্টাব্দে সাম্রাজ্যের সকল ক্ষমতা স্বহস্তে গ্রহণ করেন। সে সময় গোটা দেশ জীবন-মৃত্যুর মাঝে দোল খাচ্ছিল এবং শুষ্ক ও খরা, সংক্রামক ব্যাধি, দারিদ্র ও সম্পদহানির ফলে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। হেরাক্লিয়াস তাঁর হুকুমতের প্রথম বছর পরিপূর্ণ শান্তি ও স্বস্তিপ্রিয় মানুষের ন্যায় কাটিয়ে দেন এবং কোন বড় ধরনের কাজ আনজাম দেননি। কিন্তু ৬১২ খৃষ্টাব্দে তাঁর ভেতর অকস্মাৎ এক বিপ্লব সৃষ্টি হল (এটি ছিল সেই বছর যেই বছর কুরআন মজীদ কয়েক বছরের ভেতর রোমকদের বিজয়ের ভবিষ্যৎদ্বাণী করেছিল) এবং তিনি দেখতে না দেখতেই একজন আরাম ও বিলাসপ্রিয় সম্রাট থেকে একজন আবেগোদ্দীপ্ত ও মর্যাদাবান নেতা ও জেনারেলে পরিণত হন। এই ধারণা তাঁর সমগ্র সত্তার ওপর পুরোপুরিভাবে চেপে বসে। তাঁর ভেতর জাতীয় মর্যাদাবোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। অনন্তর তিনি ইরানের হৃৎপিণ্ডের প্রতি গতি ফেরালেন, আপন হৃতভূমি ও সম্মান পুনরুদ্ধার করলেন, ইরানের বিখ্যাত শহরগুলো দখল করলেন, ইরানের হৃৎপিণ্ডে অবতরণ পূর্বক সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে তাঁর ঝাণ্ডা প্রোথিত করলেন এবং মহান ও প্রাচীন ইরানী শাহানশাহীর সম্মান ও মর্যাদাকে ধূলোয় মিশিয়ে দিলেন এবং তাদেরকে আঘাতে আঘাতে এমনভাবে ক্ষতবিক্ষত করেন যে, মনে হচ্ছিল পারস্য সাম্রাজ্য অন্তিম দশায় উপনীত হয়েছে এবং সাসানী বংশের সিংহাসনের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গেছে। বিজয়ী সম্রাট অতঃপর ফিরে এসে ৬২৫ খৃষ্টাব্দে বিজয়ীবেশে কনস্টান্টিনোপলে প্রবেশ করেন এবং ৬২৯ খৃষ্টাব্দে পবিত্র ক্রুশকাষ্ঠ (ইরানীরা যা উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল) সেখানে পুনর্বার স্থাপন করা এবং আপন মানত পুরা করবার জন্য বায়তুল-মাকদিসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। লোকে সম্মান ও ভক্তি প্রকাশের উদ্দেশ্যের তাঁর রাস্তায় ফরাশ ও গালিচা বিছিয়ে দিত, পুষ্প বর্ষণ করত এবং আতর ছিটিয়ে দিত। ক্রুশ কাষ্ঠ পুনর্বার স্থাপনের আনন্দে সেখান এক বিরাট উৎসবের

আয়োজন করা হয় এবং বিজয়ে আনন্দোৎসব পালিত হয়। এ সময় হেরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পত্র মুবারক পান যেই পত্রে তাঁকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু এর পরপরই হেরাক্লিয়াস অলসতা, গাফিলতি, আরাম-আয়েশ ও বিলাস প্রিয়তার সেই অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করেন যেই অবস্থায় তিনি পূর্বে ছিলেন, এমন কি ইসলামের জানবায মুজাহিদবৃন্দ এই সাম্রাজ্যের পতনের ফয়সালা শুনিয়ে দিলেন এবং এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে তার অবসানও ঘটল। সম্রাটের বিশাল সাম্রাজ্য কেবল ইউরোপ ও এশিয়া মাইনরে সীমাবদ্ধ হয়ে গেল। যাই হোক, তাঁকে তাঁর যুগের মহান সম্রাটদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হত। সাম্রাজ্যের পরিধি ও বিস্তৃতি, সমর শক্তি, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও উন্নতির ক্ষেত্রে যদি কেউ তাঁর সমকক্ষ ও সমমর্যাদার থেকে থাকেন তবে তিনি ছিলেন ইরানী শাহানশাহ খসরু ২য়। ৬৪১ খৃ. কনস্টান্টিনোপলে তিনি ইনতিকাল করেন এবং সেখানেই সমাহিত হন।

খসরু পারভেয ২য় (৫৯০-৬২৮ খৃ.)

ইনি হরমুযের ৪র্থ পুত্র এবং খসরু ১ম, যিনি ন্যায়বিচারক বাদশাহ নওশেরওয়া নামে খ্যাত, -এর পৌত্র ছিলেন। আরবের লোকেরা তাঁকে কিসরা পারভেয নামে স্মরণ করে থাকে। তাঁর পিতার হত্যার পর ৫৯০ খৃ. তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন। বাহরাম চূবীন তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। খসরু পরাজিত হন, সাসানী রাষ্ট্র পরিত্যাগ পূর্বক বায়যান্টাইন অধিপতি মরিস (Maurice) -এর আশ্রয় প্রার্থনা করেন এবং আপন রাজ্য পুনরুদ্ধারে তাঁর সাহায্য চান। মরিস বিশাল সেনাবাহিনী সহকারে তাঁকে সাহায্য করেন। বিরাট রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাহরাম পরাজিত হন এবং খসরু তাঁর পিতা-পিতামহের সিংহাসনে পুনর্বার অধিষ্ঠিত হন। ৬১২ খৃ. খসরু বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের ওপর তাঁর আত্মিক (معنوی) পিতা ও অনুগ্রহদাতা অভিভাবক মরিসের হত্যার বদলা তার ঘাতক ও রোম সাম্রাজ্যের সিংহাসন ছিনতাইকারী ফোকাস থেকে গ্রহণের স্থির সংকল্প গ্রহণ করেন। অবশেষে ফোকাসের হত্যাও তাকে অধিকতর আগ্রাভিযানের থেকে বিরত রাখতে পারেনি।

তিনি কনস্টান্টিনোপল অবধি অগ্রসর হন এবং তাঁর পুরাতন প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্যের বারটা বাজিয়ে ছাড়েন যার নজীর পূর্বে মেলে না। ৬১৫ খৃ. পর্যন্ত তাঁর বিজয় ও সৌভাগ্য তারকা পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়। এমন কি হেরাক্লিয়াস ইরানীদেরকে তাঁর দেশ থেকে উৎখাত করেন এবং সাসানী সাম্রাজ্যের হূৎপিণ্ডের ওপর হামলা করেন। খসরু পারভেযকে তার দেশকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে একটি সুরক্ষিত ও দূরদরাজ এলাকায় আশ্রয় নিতে হয়। কিন্তু সত্ত্বরই ৬২৮ খৃষ্টাব্দে একটি বিদ্রোহের ফলে তার সকল কর্মের পরিসমাপ্তি ঘটে।

ইরানের ঐতিহাসিকগণ একমত যে, খসরু ২য় ইরানের সবচেয়ে মহান ও শান-শওকতের অধিকারী সম্রাট ছিলেন। তাঁর আমলে সাসানী সাম্রাজ্য উন্নতি ও সমৃদ্ধি, জীবনের প্রাচুর্য, বিলাস-সামগ্রী ও সৌন্দর্য-উপকরণের সর্বোচ্চ সীমায় গিয়ে পৌঁছেছিল। ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম রাজ্যগুলো অবধি তাঁর মুদ্রা চালু ছিল। তাঁর নামের সঙ্গে এইসব শানদার ভূমিকা যোগ করা হত:

“ঈশ্বরসমূহের মধ্যে অবিনশ্বর মানব, মানুষের মধ্যে অদ্বিতীয় খোদা, তাঁর নামের বিজয়গাঁথা, সূর্যের সঙ্গে উদয়কারী, রাত্রির চক্ষু উন্মীলনকারী।” তাঁর যুগে দেশ যতটা উন্নতি করেছিল এবং তিনি যতটা শান-শওকত লাভ করেছিলেন সে সম্পর্কে বিখ্যাত ঐতিহাসিক তাবারীর বক্তব্য নিম্নরূপ:

“এই বাদশাহ ছিলেন সবচেয়ে বেশি কঠোর স্বভাবের, সবচেয়ে বেশি সিদ্ধান্ত প্রদানের শক্তিসম্পন্ন ও দূরদৃষ্টির অধিকারী, বীরত্বে ও শৌর্যবীর্যে, বিজয় ও সাফল্যপূর্ণ কৃতিত্বে, সম্পদের প্রাচুর্যে, ভাগ্যের আনুকূল্যে এবং যুগ-উত্তীর্ণ হবার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ যতটা তাঁর অধিকারে ছিল আর কোন বাদশাহর তা ছিল না। ফলে তাঁর উপাধি পড়ে গিয়েছিল পারভেয আরবীতে যার অর্থ মুজাফফার অর্থাৎ বিজয়ী ও সৌভাগ্যশালী। সভ্যতা ও সংস্কৃতির নতুনত্ব আনয়ন এবং সমালোচনার ক্ষেত্রে তাঁর কোন জুড়ি ছিল না। খাদ্য-দ্রব্য ও পানীয় সামগ্রীর শাখায় তিনি নিত্য-নতুন আবিষ্কার করেছিলেন”।

আতর ও সুগন্ধি দ্রব্যাদি উদ্ভাবনে তাঁর স্থান ছিল সর্বোচ্চে। তাঁর আমলে আড়ম্বরপূর্ণ রকমারী খানা, উন্নত ধরনের পানীয় এবং সর্বোত্তম আতর ও সুগন্ধির

প্রতি লোকের এক ধরনের বিশেষ রুচি সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। গান-বাজনা ও সঙ্গীত তাঁর আমলে উন্নতির এতটা চরম শিখরে উপনীত হয়েছিল যে, লোকের এসব জিনিসের প্রতি এক অস্বাভাবিক রকমের আকর্ষণ সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। সম্পদ জমা করা, গহনা-সামগ্রী ও সুন্দর দ্রব্য একত্র করার প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আগ্রহ ও বড় শখ। যখন তাঁর রাজকোষের মালামাল (৬০৭-৬০৮ খৃ.) পুরাতন ভবন থেকে তিসিফোন (মাদায়েন)-এর নতুন ভবনে স্থানান্তরিত করা হয় তখন তার পরিমাণ ছিল ৪৬৮ মিলিয়ন (অর্থাৎ ছেচল্লিশ কোটি আশি লাখ) মিছকাল স্বর্ণ যা সাইত্রিশ কোটি ৫০ লাখ রৌপ্য (طلاى) ফ্রাঙ্কের সমমানের। সিংহাসনে আরোহণের ত্রয়োদশ বর্ষে তাঁর রাজকোষে ৮৮০ মিলিয়ন (অর্থাৎ ৮৮ কোটি) মিছকাল স্বর্ণ মজুদ ছিল। তিনি ৩৭ বছর রাজত্ব করার পর তৎপুত্র শায়রোয়া সিংহাসনে আরোহণ করেন।

মুকাওকিস (হি. ৬ষ্ঠ, খৃ. ১২শ)

তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার গভর্নর এবং মিসরে বায়যান্টাইন সম্রাটের ভাইসরয় ছিলেন। আরব ঐতিহাসিকদের অধিকাংশ তাঁকে মুকাওকিস নামে স্মরণ করেন। তাঁর আসলে নাম ও ডাকনামের মধ্যে প্রচুর মতভেদ রয়েছে। ঐতিহাসিক আবু সালেহ হিজরী ৬ষ্ঠ/খৃ. ১২শ শতকে, যিনি তাঁর ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছিলেন, জুরায়জ ইবন মীনা আল-মুকাওকিস নামে তাঁর উল্লেখ করেছেন। ইবন খালদুন লিখেছেন যে, তিনি কিবতী (কপ্ট) ছিলেন। ঐতিহাসিক মাকরীযী তাঁকে “আল-মুকাওকিস আর-রূমী” লিখেছেন। ইরানীরা যখন মিসরের ওপর হামলা করে তখন বায়যান্টাইনের নিযুক্ত গভর্নর পালিয়ে যান। তাঁর নাম ছিল John the Almoner। তিনি আলেকজান্দ্রিয়া থেকে পালিয়ে সাইপ্রাস পৌঁছান এবং সেখানেই মারা যান। এরপর হেরাক্লিয়াস তদন্তলে অপর একজন ভাইসরয় নিযুক্ত করেন যাঁর নাম ছিল জর্জ। সম্ভবত ইনিই তিনি যাঁকে আরবরা জুরায়জ বলে। সম্রাট তাঁকে রাষ্ট্রীয় গির্জার প্রধানও নিযুক্ত করেন। কতক ঐতিহাসিক লেখেন যে, তার যুক্তি হয় ৬২১ খৃ.। আলফ্রেড বাটলার লেখেন :

আরবদের ধারণা ছিল যে, যেই গভর্নর বায়যান্টাইন সরকারের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর বিজয় লাভের পর মিসরের গভর্নর নিযুক্ত হন তাঁর উপাধি ছিল মুকাওকিস। তিনি একই সঙ্গে দেশের গভর্নর, গির্জার প্রধান ও ধর্মীয় নেতাও

হতেন। অনন্তর তিনি জর্জের জন্য (যিনি সেখানে ভাইসরয় ছিলেন) এই উপাধি ঠিক করেন। তাঁরা এব্যাপারে অগ্রাধিকার দেন যে, মুকাওকিস তাঁর আসল নাম নয়, বরং উপাধি যা প্রাচীন কিবতী বা কপ্ট ভাষার শব্দ। এটাও সম্ভব যে, মিসরের ওপর ইরানীদের বিজয়, প্রাধান্য ও ক্ষমতা লাভের সময় কোন কিবতী লাট পাদরী গির্জার নেতৃত্ব ও ক্ষমতার বাগডোর স্বহস্তে গ্রহণ করে থাকবেন। তথাপি সন্ধিচুক্তি তথা সুলেহনামা ৬২৮ খৃ. লিখিত হয়। এজন্যই এটা সম্ভব যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর লিপি মুবারক মুকাওকিসের নামে এই বিরতি ও অবকাশ কালেই পৌঁছে যখন মিসরের গভর্নর প্রায় স্বাধীনই ছিলেন।

আর এটাই কারণ যে, রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর নামের সঙ্গে عظيم القبط তথা কিবতীদের মহান নেতা শব্দ প্রয়োগে সম্বোধন করেন।

মিসর বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের সবচেয়ে উর্বর রাজ্য ছিল এবং উৎপাদন ও জনসংখ্যা উভয় ক্ষেত্রেই এগিয়ে ছিল। রোমের রাজধানীতে খাদ্যদ্রব্যের সরবরাহ এখান থেকেই হত। মিসর বিজয়ী হযরত ‘আমর ইবনুল-আস(রা), যিনি হুযূর (সা)-এর পত্র প্রেরণের চৌদ্দ বছর পর সেখানে বিজয়ী বেশে প্রবেশ করেছিলেন, আমীরুল-মু’মিনীন হযরত ওমর ইবনু’ল-খাত্তাব (রা)-এর নামে স্বীয় প্রেরিত পত্রে নিম্নোক্ত ভাষায় মিসরের প্রশংসা করেছিলেন :

মিসরের যমীন অত্যন্ত সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা। এর দৈর্ঘ্য এক মাসের দূরত্ব এবং প্রস্থে দশ দিনের পরিমাণ। এর বসতি ও জনসংখ্যার আধিক্যের পরিমাপ এর থেকে করা যেতে পারে যে, হযরত আমর ইবনুল-আস (রা) যখন ২০ হিজরীতে মুতাবিক ৬৪০ খৃ. মিসর বিজয়ের পর জরিপ করেন যে, জিযয়া কর কারা দিতে পারে তখন দেখা গেল এ সংখ্যা ষাট লাখের বেশি। রোমকদের সংখ্যা এদের ভেতর ছিল এক লাখ। হযরত আমর ইবনুল-আস (রা) পত্রে এও লিখেছিলেন :

“আমি এমন এক শহর জয় করেছি যার প্রশংসায় আমি এতটুকু লিখছি যে, আমি সেখানে চার হাজার সমুন্নত ও সুদৃঢ় জায়গা দেখতে পেয়েছি যেখানে চার

হাজার হাম্মাম (গোসলখানা) ছিল, ইয়াহুদীদের সংখ্যা ছিল চল্লিশ হাজার আর বাদশাহর জন্য ছিল চার শত বিনোদন কেন্দ্র।”

নাজাশী (৫২৫-৫৫৭খৃ.)

এই দেশটি প্রাচীনকাল থেকেই হাবশা (Abyssinia), বর্তমানে ইথিওপিয়া (Ethiopia) নামে পরিচিত। এটি পূর্ব আফ্রিকার অংশ এবং লোহিত সাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। যে যুগের কথা আমরা আলোচনা করছি তখন এর সীমা কি ছিল তা নির্ধারণ করা আজ খুব সহজ নয়।

এখানকার হুকুমতও পৃথিবীর প্রাচীনতম হুকুমতগুলোর অন্যতম। ইয়াহূদী উৎস থেকে জানা যায় যে, সাবার রাণী আবিসিনিয়াতেই থাকতেন এবং হযরত সুলায়মান (আ)-এর বংশধর আজও এর শাসন ক্ষমতায় সমাসীন। হায়কাল-ই সুলায়মানী ধ্বংসের পর এখানেই ইয়াহূদীরা বসতি স্থাপন করতে শুরু করে। খৃ. চতুর্থ শতক খৃষ্ট ধর্ম সেখানে বিস্তার লাভ করতে থাকে। ইয়ামানের বাদশাহ যখন তার দেশে খৃষ্টানদের ওপর জুলুম করতে শুরু করে তখন রোম সম্রাট ১ম জাস্টিনিয়ান আবিসিনিয়ার বাদশাহর নিকট খৃষ্টানদের সাহায্য করার এবং তাদের ওপরকৃত জুলুমের অবসানের দাবি জানান। অনন্তর ৫২৫ খৃ. তিনি ইয়ামান দখল করেন এবং ইয়ামানের ওপর আবিসিনিয়ার নিয়ন্ত্রণ ৫০ বছর অবধি বহাল থাকে। ঐ সময় আবিসিনিয়ার পক্ষ থেকে ইয়ামানের বাদশাহ আবরাহা বায়তুল্লাহ্‌র ওপর আক্রমণ চালায় এবং হাতীর ঘটনা সংঘটিত হয়।

আবিসিনিয়ার রাজধানী ছিল Axum। এটি ছিল একটি স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত হুকুমত যা কোন ভিনদেশী হুকুমতের অধীন ছিল না এবং কাউকে খাজনা কিংবা ট্যাক্স দিত না। বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল কেবল ধর্মীয় আর সে ধর্মীয় সম্পর্ক খৃষ্ট ধর্মের। এর প্রমাণ পরিষ্কারভাবে এ থেকে মেলে যে, বায়যান্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান খৃ. তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি জুলিয়ান নামে এক ব্যক্তিকে আবিসিনিয়ার শাহী দরবারে দূত হিসাবে প্রেরণ করেন। De Lacy O’Leary তদীয় Arabia befor Mohammad নামক গ্রন্থে লেখেন :

“৫২ খৃ. থেকে শুরু করে ইসলামের আবির্ভাব অবধি আবিসিনিয়া পূর্ব লোহিত

সাগর আফ্রিকার সমগ্র ব্যবসা-বাণিজ্য অব্যাহতভাবে নিয়ন্ত্রণ করত, বরং সম্ভব সে ভারতবর্ষের ব্যবসা-বাণিজ্যও নিয়ন্ত্রণ করত।”

আবিসিনিয়ার বাদশাহকে সর্বদা নাজাশী (Nagusa, Nagashi) বলা হত। অবশ্য এই নাজাশী কে ছিলেন তা চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায় যাঁর নামে রাসূলুল্লাহ (সা) স্বীয় পত্র পাঠিয়েছিলেন এবং যাঁকে ইসলামের দাওয়াত জানিয়েছিলেন। এই সূত্রে আমাদের সামনে দু’জন এবং একে অপরের থেকে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আছেন। প্রথম জন হচ্ছেন যাঁর শাসনামলে মক্কার মুসলমানরা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন এবং যাঁদের মধ্যে জা’ফর (রা) ইবন আবী তালিবও ছিলেন। এটি নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষের ঘটনা। এটি একটি যুক্তিবিরুদ্ধ বিষয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সে সময় এই পত্র পাঠিয়েছিলেন। কেননা তখনকার অবস্থা এর একেবারেই অনুমতি দেয় না এবং এ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় অনুকূল মুহূর্তও তখন আসেনি। তিনি হিজরতের পূর্বে কোন রাজা-বাদশাহর নামে পত্র দিয়েছিলেন এবং ইসলাম কবুলের দাওয়াত দিয়েছিলেন এর কোন হাদিস আমরা পাই না। খুব বেশি যা পাওয়া যায় তা এই যে, তিনি এ সময় তাঁকে সেসব মুসলমানকে আশ্রয় দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন যাঁরা কুরায়শদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। ইবন হিশাম ও অপরাপর লেখক এই অধ্যায়ে যা কিছু লিখেছেন তা থেকে এতটা অনুমান অবশ্যই করা যায় যে, তাঁর অন্তরে ঈমান আসন গেড়েছিল এবং তিনি একথা স্বীকার করতেন যে, ঈসা আলাইহিস-সালাম ইব্‌ন মরিয়ম আল্লাহ্‌র বান্দা ও তাঁর রাসূল এবং তাঁর হুকুম যা তিনি মরিয়ম (আ)-এর ওপর নিক্ষেপ করেছিলেন।

এই নাজাশী সম্পর্কে যতটা জানা যায় যাঁকে রাসূলুল্লাহ (সা) ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত পত্র পাঠিয়েছিলেন, ঐতিহাসিক হাফিজ ইব্‌ন কাছীরের ধারণা মুতাবিক, তিনি সেই নাজাশী যিনি সেই মুসলিম নাজাশীর পর আবিসিনিয়ার শাসক হন, হযরত জা’ফর (রা) যাঁর দরবারে বক্তব্য পেশ করেছিলেন। ইব্‌ন কাছীর বলেন : এটি সেই সময় ঘটেছিল যখন তিনি মক্কা বিজয়ের পূর্বে পৃথিবীর বিভিন্ন শাসকের নামে পত্র লেখেন এবং তাঁদেরকে দীনে হকের দাওয়াত দেন। আমাদের মতে, অগ্রাধিকার পাবার যোগ্য অভিমত এই যে, ইনিই সেই নাজাশী যিনি ইসলাম কবুল করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) নিজেই মুসলমানদেরকে তাঁর মৃত্যু সংবাদ দিয়েছিলেন এবং তাঁর জন্য মাগফিরাত কামনায় দু’আ করেছিলেন। উবায়্য ওয়াকেদী ও অন্যান্য জীবন-চরিতকারের বরাতে লেখেন, “ইনিই সেই নাজাশী যাঁর

নিমিত্ত তিনি মাগফিরাতের দু’আ করেছিলেন।” এই ঘটনা তাবুক অভিযান থেকে প্রত্যাবর্তনকালে ৯মে হিজরীর রজব মাসে সংঘটিত হয়েছিল।

আর এভাবেই বিভিন্ন বর্ণনার সত্যতা সমর্থিত হয় এবং কার্যকারণ দ্বারাও এর সমর্থন মিলে। আল্লাহই ভাল জানেন।

প্রেরিত পত্রের সঙ্গে রাজা-বাদশাহদের আচরণ

হেরাক্লিয়াস, নাজাশী ও মুকাওকিস— এই তিনজন নবী করীম (সা)-এর পত্রের সঙ্গে ভক্তি ও সম্ভ্রমপূর্ণ আচরণ করেন। তাঁদের পক্ষ থেকে প্রদত্ত জবাব ছিল বিনয় মিশ্রিত ও শ্রদ্ধাবিজড়িত। নাজাশী ও মুকাওকিস রাসূল (সা)-এর দূতকে খুবই সম্মান করেন। মুকাওকিস তাঁকে উপঢৌকন পাঠিয়েছিলেন যার মধ্যে দু’জন বাদীও ছিল। এদের একজনের নাম ছিল মারিয়া (রা)। রাসুলুল্লাহ (সা)-র সাহেবযাদা হযরত ইবরাহীম (রা) তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন।

পারস্য সম্রাট খসরু পারভেয পত্র পেতেই তা ছিঁড়ে ফেলে এবং বলে : আমার গোলাম হয়ে আমাকে এভাবে লেখে! রাসুলুল্লাহ (সা)-এ সম্পর্কে অবহিত হয়ে বলেন : আল্লাহ তার রাজ্যকে টুকরো টুকরো করে দিন।

অতঃপর খসরু পারভেয ইয়ামানের শাসনকর্তা বাযানকে হুকুম দেন যেন পত্র প্রেরককে গ্রেফতার করে তার সমীপে হাজির করা হয়। তিনি বাবাওয়ায়হকে রাসুল (রা)-এর নিকট প্রেরণ করেন। বাবাওয়ায়হ গিয়ে জানায় যে, সম্রাট খসরু গভর্নর বাযানকে নির্দেশ দিয়েছেন কাউকে পাঠিয়ে আপনাকে সেখানে হাজির করতে। তিনি আমাকে এজন্যই পাঠিয়েছেন যাতে আপনি আমার সাথে সেখানে যান। রাসুলুল্লাহ (সা) তখন তাকে অবহিত করেন যে, আল্লাহ পাক খসরু পারভেযের ওপর তৎপুত্র শায়রুয়াকে চাপিয়ে দিয়েছেন যে তাকে হত্যা করেছে।

রাসূলুল্লাহ (সা) যেই খবর দিয়েছিলেন তা হরফে হরফে সত্য প্রমাণিত হয়। খসরুর সিংহাসনে তাঁরই পুত্র কুবায়, যার উপাধি ছিল শায়রূয়া, অধিষ্ঠিত হন। খসরু পারভেয তাঁরই ইঙ্গিতে ৬২৮ খৃষ্টাব্দে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে যায় এবং শাসক বংশের হাতে সাম্রাজ্য একটি খেলনায় পরিণত হয়। শায়রূয়া ছয় মাসের বেশি রাজত্ব করতে পারেন নি। চার বছরের ভেতর পরপর দশজন সম্রাট সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে গিয়েছিল। অবশেষে সবাই মিলে ইয়াযদাগির্দকে সিংহাসনে বসায় এবং তাঁরই শিরে রাজমুকুট অর্পিত হয়। ইনি ছিলেন সাসানী বংশের শেষ শাসক এবং তাঁকেই মুসলিম ফৌজের মুখোমুখি হতে হয়েছিল যেই ফৌজ অবশেষে সাসানী সাম্রাজ্যের ভাগ্যের ওপর সীলমোহর মেরে দেয় এবং যেই সাম্রাজ্যের বিজয় ডংকা সুদীর্ঘ চারশত ধরে দুনিয়ার বুকে বেজেছিল তা চিরতরে নির্বাপিত হয়। ৬৩৭ খৃষ্টাব্দে এই ঘটনা সংঘটিত হয়। আর এভাবেই এই ভবিষ্যদ্বাণী আট বছরের মধ্যে সত্যে পরিণত হয় এবং ভবিষ্যদ্বাণীর দ্বিতীয় অংশ اذا هلك كسرى فلا كسرى بعده অর্থাৎ “যখন পারস্য সম্রাটের পতন হবে তারপর আর কেউ সম্রাট হবে না” ফলে যায়।

আল্লাহ তা’আলা মুসলমানদেরকে পারস্যের উত্তরাধিকারী ও শাসক বানিয়ে দেন, পারস্যবাসীদেরকে ইসলামের হেদায়েত দান করেন, ইরানে ‘ইল্‌ম ও দীনের বড় বড় ইমাম ও ইসলামের অসাধারণ সব ব্যক্তিত্বের জন্ম হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর একথা সঠিক হিসাবে ধরা দেয় যে, لو كان العلم بالثريا لتناوله اناس من ابناء فارس অর্থাৎ ইল্‌ম যদি ছুরাইয়া নক্ষত্রেও থাকে তবুও কিছু ইরানবাসী তা অর্জন করেই ছাড়বে।

হেরাক্লিয়াস ও আবু সুফিয়ানের কথোপকথন

হেরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে সঠিক তথ্য লাভ ও যথার্থ সত্য সম্পর্কে অবহিত হওয়ার মানসে প্রয়াস পান এবং এমন কোন লোকের সন্ধান করেন যে তাঁর (রাসূল সা) সম্পর্কে নির্ভুল রিপোর্ট দিতে পারে। সৌভাগ্যক্রমে আবু সুফিয়ান সে সময় গাযায় উপস্থিত ছিলেন এবং বাণিজ্য ব্যপদেশে সেখানে এসেছিলেন।

তাঁকে শাহী দরবারে ডেকে পাঠানো হয়। সম্রাটের প্রশ্ন ছিল এমন একজন বুদ্ধিমান, জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ লোকের প্রশ্নের ন্যায় যিনি ধর্মের ইতিহাস, আম্বিয়া-ই কিরামের বৈশিষ্ট্য ও জীবন-চরিত, তাঁদের জাতিগোষ্ঠীর তাঁদের সঙ্গে ব্যবহার, আচার-আচরণ ও আল্লাহর সুন্নাহ সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবহিত। আবূ সুফিয়ানও প্রাচীন আরবদের ন্যায় এই লজ্জায় যে, লোকে তাকে যেন ভুল বক্তব্য ও তথ্য বিকৃতকারী না বলে— কৃত প্রশ্নের একেবারে ঠিকঠাক উত্তর দেন।

নিম্নে আলোচ্য কথোপকথন উদ্ধৃত করা হল :

হেরাক্লিয়াস : তাঁর বংশ কিরূপ?

আবূ সুফিয়ান : তাঁকে আমাদের মধ্যে উচ্চ বংশজাত মনে করা হয়।

হেরা. : তিনি যা বলেন তা কি তাঁর আগে কেউ কখনো বলেছিলেন?

আ. সু. : না (বলেননি)।

হেরা. : এই বংশের কোন বাদশাহ অতিক্রান্ত হয়েছেন?

আবূ. সু. : না (হননি)।

হেরা. : প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী লোকে তাঁর অনুসরণ করছে, না কি দুর্বল লোকেরা?

আবূ. সু. : দুর্বল লোকেরা।

হেরা. : তাঁর অনুসারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, না হ্রাস পাচ্ছে?

আ. সু. : বৃদ্ধি পাচ্ছে।

হেরা. : কেউ কি তাঁর ধর্মে একবার প্রবেশের পর অপসন্দ হওয়ার কারণে উক্ত ধর্ম পরিত্যাগ করেছে?

আ. সু. : না (পরিত্যাগ করেনি)।

হেরা. : এই দাবি করবার পূর্বে তোমরা কি কখনো তাঁকে মিথ্যা বলতে দেখেছ?

আ. সু : না (বলতে দেখিনি)।

হেরা. : কখনও কি প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে তোমরা দেখেছ?

আ. সু. : এখন পর্যন্ত তো করেননি। কিন্তু এখন একটি নতুন সন্ধিচুক্তি হয়েছে। দেখা যাক তিনি এর ওপর কায়েম থাকেন কি না।

হেরা. : তোমরা কি কখনো তাঁর সাথে যুদ্ধও করেছ?

আ. সু : হ্যাঁ (করেছি)।

হেরা. : যুদ্ধের ফলাফল কী দাঁড়িয়েছে?

আ. সু : যুদ্ধের পাশা আমাদের ও তাঁদের মধ্যে পাল্টাতে থাকে। কখনো আমরা, আবার কখনো তাঁরা বিজয়ী হন।

হেরা. : তিনি কিসের তা’লীম দিয়ে থাকেন?

আ. সু. : তিনি বলেন, এক আল্লাহ্ ইবাদত কর, তাঁর সঙ্গে অপর কাউকে শরীক করো না। সালাত আদায় কর, চরিত্রের হেফাজত কর, সত্য কথা বল, আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষা কর।

হেরাক্লিয়াস দোভাষীকে বললেন যে, তাঁকে বল, আমি তোমাকে তাঁর (রাসূল সা)-এর বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তুমি বলেছ যে, তিনি তোমাদের ভেতর শরীফ বংশের। পয়গম্বরগণ সব সময় উত্তম খান্দানেই জন্ম নিয়ে থাকেন। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি যে, উক্ত খান্দানে আর কেউ নবুওয়াত দাবি করেছিল কি না? তো তার জওয়াবে তুমি না বলেছ। যদি এর আগে আর কেউ এই দাবি করত তাহলে আমি বলতাম যে, তিনি পূর্বসূরীর নকল করছেন। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি যে, তাঁর খান্দানে কোন বাদশাহ অতিক্রান্ত হয়েছেন কি না। তুমি বলেছ, না। যদি কেউ বাদশাহ হতেন তাহলে আমি বলতাম, নবুওয়াত দাবির দ্বারা তিনি বাদশাহী হাসিল করতে চান, তিনি ক্ষমতা প্রত্যাশী। আমি জানতে চেয়েছি, তাঁর নবুওয়াত দাবির পূর্বে তোমরা কখনো তাঁকে মিথ্যা বলতে দেখেছ কি না। তুমি বলেছ, না। আমি জানি যে, এটা অসম্ভব। কেননা যিনি মানুষের সঙ্গে মিথ্যা বলেন না, তিনি আল্লাহ সম্পর্কে কি করে মিথ্যা বলতে পারেন? আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি যে, অভিজাত ও প্রভাবশালী লোকেরা তাকে অনুসরণ করছে, নাকি গরীব ও দুর্বল লোকেরা। তুমি বলেছ, দুর্বল লোকেরা। পয়গম্বরদের (প্রাথমিক কালে) অনুসরণ সব সময় গরীব ও দুর্বল লোকেরাই করে থাকে। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তাঁর অনুসারীদের সংখ্যা বাড়ছে, না কি কমছে? জওয়াবে জানিয়েছ যে, বাড়ছে। ঈমানের ব্যাপারে এমনটিই হয়ে থাকে। তা বৃদ্ধি পেয়ে থাকে, এমন কি তা পূর্ণতায় গিয়ে পৌঁছে। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তাদের কেউ কি একবার ধর্ম গ্রহণের পর নারাজ হয়ে পুনরায় পূর্ব ধর্মে ফিরে গেছে (অর্থাৎ মুরতাদ হয়েছে কি না)। তুমি বলেছ, না। ঈমানের অবস্থা এরকমই হয়ে থাকে। যখন একবার ঈমানের স্বাদ কেউ আস্বাদন করতে সক্ষম হয় তখন আর সে তা পরিত্যাগ করে না। আর ঈমান একবার কারও হৃদয়ে প্রবেশ করলে তা আর বেরিয়ে আসে না। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তিনি চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন কিনা। তুমি বলেছ, না। পয়গম্বরগণ চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। আমি আরও

জানতে চেয়েছি, তিনি কি শিখিয়ে থাকেন। তুমি বলেছ যে, তিনি তোমাদেরকে আল্লাহর ইবাদত করতে, তাঁর সঙ্গে কোন কিছুর শরীক না করতে, মূর্তিপূজা না করতে বলে থাকেন। নামায আদায় করতে, সত্য কথা বলতে ও সতীত্ব সম্ভ্রম রক্ষার তা’লীম দিয়ে থাকেন। যদি তোমার কথা সত্য হয়ে থাকে তাহলে অতি সত্বর যেখানে এই মুহূর্তে আমি আছি তা তাঁর অধীনে চলে যাবে। আমার অবশ্যই এ ধারণা ছিল যে, একজন পয়গম্বর আসছেন। কিন্তু আমার জানা ছিল না যে, তিনি আরবে পয়দা হবেন। আমি যদি সেখানে যেতে পারতাম তাহলে অবশ্যই আমি তাঁর সাক্ষাতে যেতাম। আর আমি যদি তাঁর খেদমত থাকতাম তাহলে আমি তাঁর পা ধুয়ে দিতাম।

এরপর হেরাক্লিয়াস সাম্রাজ্যের প্রধান প্রধান সভাসদ ও অমাত্যের একটি সভা রাজপ্রাসাদে আহ্বান করলেন এবং দরজা বন্ধ করে দিলেন। এরপর তিনি উপস্থিত সকলকে সম্বোধন করে বললেন : হে রোমের অধিবাসীবৃন্দ! তোমরা কি কল্যাণ ও মঙ্গল চাও? তোমরা কি চাও তোমাদের দেশের অস্তিত্ব অটুট ও অক্ষুণ্ণ থাকুক? যদি চাও তাহলে এই নবীর ওপর ঈমান আন। উপস্থিত সকলেই দ্রুতবেগে দরজার দিকে দৌড়াল। গিয়ে দেখতে পেল দরজা বন্ধ। অতঃপর হেরাক্লিয়াস তাদের অসন্তোষ ও উগ্র মূর্তি দর্শনে তাদের ঈমান গ্রহণের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেলেন এবং বললেন যে, এখনই আমি যে কথা বলছিলাম তা এ জন্য বলেছিলাম, তোমরা তোমাদের ধর্মের ওপর কতটা মজবুত। আমি পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম। আমি তা দেখতে পেলাম। এতদশ্রবণে উপস্থিত সকলে সন্তুষ্ট চিত্তে বাদশাহকে আভূমি নত হয়ে কুর্নিশ করল।

মোটকথা, হেরাক্লিয়াস সৌভাগ্য ও মুক্তির এই সুবর্ণ সুযোগ হেলায় হারিয়ে দিলেন এবং সেই চিরন্তন ও চিরস্থায়ী সম্পদের ওপর তিনি নশ্বর সাম্রাজ্যকে অগ্রাধিকার দিলেন যার পরিণতি হল এই যে, ফারূকী খিলাফত আমলে তাঁকে এই সাম্রাজ্যও খোয়াতে হয়। ২

উরায়সী কে ছিলেন?

‘উরায়সিয়্যীন বা যুরায়সিয়্যীন’ শব্দের বর্ণনায় মতভেদ সত্ত্বেও কেবল সেই পত্রেই শব্দটি উল্লেখিত হয়েছে যে পত্র হেরাক্লিয়াসের নামে লেখা হয়েছিল। এছাড়া তিনি যত পত্র বিভিন্ন রাজা-বাদশাহর নিকট পাঠিয়েছিলেন কোন পত্রেই আমরা শব্দটি পাই না। হাদীস ও অভিধানশাস্ত্রের আলিমগণ এই শব্দের প্রকৃত মর্ম সম্পর্কে

বেশ খানিকটা মতভেদ করেছেন। বিখ্যাত মত এই যে, ‘উরায়সিয়্যীন’ উরায়সীর বহুবচন আর শব্দটি খেদমতগার, শাগরিদ, পেশাজীবী ও কৃষিজীবীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।

ইবন মনযূরও ‘লিসানুল-আরব’ গ্রন্থে একে কৃষিজীবীদের সম অর্থের বলে অভিহিত করেছেন এবং একে অভিধানশাস্ত্রের ইমাম ছা‘লাব থেকে উদ্ধৃত করেছেন। ইবনুল-আরাবীর উক্তির বরাত দিয়েও এর মূল উৎসের এই অর্থই লিখেছেন এবং আবূ উবায়দার উক্তি নকল করেছেন, “আমার মতে উরায়স ‘সর্দার’ও বড়দেরকে বলা হয় যাঁদের হুকুম তামিল করা হয় আর যখন তাঁরা আনুগত্য চান তখন তাঁদের আনুগত্য করা হয়।

এই মুহূর্তে একজন লেখাপড়া জানা মানুষ, যাঁর দৃষ্টি সেইসব দেশের বৈশিষ্ট্য ও অবস্থার ওপর রয়েছে, এই প্রশ্ন করতে পারেন যে, যদি উরায়সিয়্যীন-এর অর্থ কৃষিজীবীই হবে তাহলে পারস্য সম্রাট খসরু পারভেয এর বেশি হকদার ছিলেন যে, তাকে তাদের সম্পর্কে, তার যিম্মাদারী সম্পর্কে অবহিত ও সতর্ক করা হত এবং এই শব্দটি সেই পত্রে আসত যা খসরু পারভেযের নামে পাঠানো হয়েছিল। এ জন্য যে, কৃষকশ্রেনীর সংখ্যা বায়যান্টীয় সাম্রাজ্যের তুলনায় সাসানী সাম্রাজ্যে খুব বেশি বিস্তৃত ও উল্লেখযোগ্য ছিল এবং ইরানের জাতীয় আমদানী রাজস্ব ও অর্থনৈতিক উপায়-উপকরণের বেশির ভাগ নির্ভরশীলতা কৃষির ওপর ছিল। আযহারী এদিকেই ইঙ্গিত করেছেন এবং ইবন মানযূর তাঁর বরাতে উদ্ধৃত করেন :

“ইরাকের সাওয়াদ এলাকার লোক, যারা পারস্য সম্রাটের ধর্মানুসারী ছিল, কৃষিজীবী ছিল। রোমকরা সাজ-সরঞ্জাম তৈরি ও শিল্পকর্মে নিয়োজিত ছিল। আর এজন্য তারা অগ্নি উপাসকদেরকে ‘উরায়সিয়্যীন’ বলত। উরায়স-এর দিকে সম্বন্ধ করত যার অর্থ ‘কৃষক’। আরবরাও ইরানীদেরকে ‘ফালাহীন’ (কৃষক) উপাধিতে স্মরণ করত।

উল্লিখিত কারণে আমাদের নিকট অগ্রাধিকারযোগ্য অভিমত এই যে, উরায়সিয়্যীন অর্থ আরিয়ূস মিসরীর অনুসারী (Arius, 280-336), যিনি এমন একটি স্থায়ী খৃষ্টান উপদলের প্রতিষ্ঠাতা যিনি খৃষ্টান আকীদা-বিশ্বাস ও সংস্কার শাখায় এক বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। এই উপদল বায়যান্টাইন সাম্রাজ্য ও খৃষ্টান গির্জাকে দীর্ঘকালব্যাপী পেরেশান করে রেখেছিল। আরিয়ূস সেই ব্যক্তি যিনি

তাওহীদ তথা একাত্ববাদের ধ্বনি বুলন্দ আওয়াজে তুলে ধরেন এবং খালিক ও মাখলুক তথা স্রষ্টা ও সৃষ্টি (খৃষ্টানদের ভাষায়) “পিতা-পুত্রে”র মাঝে পার্থক্য করার দাওয়াত দেন। তিনি এই বিষয়ের ওপর আলোচনা-সমালোচনার দ্বার উন্মুক্ত করেছেন এবং খৃষ্টান সমাজে বহু শতাব্দী যাবত এটাই আলোচ্য বিষয় ছিল। তাঁর ধ্যান-ধারণার সংক্ষিপ্তসার এই : “এক আল্লাহর এই শান নয় যে, তিনি যমীনে প্রকাশিত হবেন। এজন্য তিনি হযরত ঈসা মসীহ (আ)-কে শক্তি ও আল্লাহর কালাম দ্বারা ভরপুর করে দেন। আল্লাহর মৌলিক গুণাবলীর ভেতর ওয়াহদানিয়াত (এককত্ব) ও আবাদিয়াত (চিরন্তনত্ব) রয়েছে এবং তিনি তাঁর সত্তা থেকে সরাসরি কাউকে পয়দা করেননি। ‘পুত্র স্বয়ং খোদা’ নয়, বরং আল্লাহর হুকুমের কৌশলের একটি প্রকাশ আর তাঁর উলূহিয়্যাত আপেক্ষিক (اضافى) – তা সর্বাত্মক নয়।

James Mackinon তদীয় গ্রন্থ “From Christ to Constantine, London. 1936-এ লিখেন :

“আরিয়ূসের সুস্পষ্ট বক্তব্য ছিল এই যে, কেবল আল্লাহর সত্তাই আদি, চিরন্তন ও চিরস্থায়ী। তাঁর কোন শরীক নেই। তিনিই যিনি অনস্তিত্ব থেকে পুত্রকে অস্তিত্ব দান করেছেন। সেজন্য পুত্র আদি নয়। আল্লাহ হামেশা বাপ বা পিতা নন। অনন্তর এক যমানা এমন গেছে যে, পুত্রের অস্তিত্বই ছিল না। পুত্র তার একটি স্থায়ী হাকীকত রাখেন যেখানে আল্লাহ তার শরীক নন। তিনি (পুত্র) পরিবর্তন ও বিপ্লবের দ্বারা প্রভাবিত হন আর তিনি বিশুদ্ধ ও সঠিক অর্থে আল্লাহ হিসাবে অভিহিত হওয়ার যোগ্য নন। হ্যাঁ, তাঁকে বড়জোর ‘কামেল’ হিসাবে অভিহিত করা যেতে পারে, কিন্তু তিনি মোটের ওপর একজন কামেল মখলুক তথা পরিপূর্ণ সৃষ্টি।”

অপর দিকে আলেকজান্দ্রিয়ার গির্জা খৃষ্টীয় চতুর্থ শতকে হযরত ঈসা মসীহ (আ)-র ঈশ্বরত্বের সমর্থক ছিল। এই গির্জার মতে খালেক ও মাখলুক তথা স্রষ্টা ও সৃষ্টি এবং পিতা ও পুত্রের মাঝে কোন পার্থক্য ছিল না।

তাঁকে (আরিয়ূসকে) মিসরীয় গির্জার পাদ্রী প্রধান আলেকজান্ডার ৩২১ খৃষ্টাব্দে আলেকজান্দ্রিয়ার গির্জা থেকে উৎখাত ও বেদখল করে দিয়েছিল। আরিয়ূস শহর ছেড়ে চলে যান, কিন্তু তাঁর বেদখলী দ্বারা এই ঝগড়া শেষ হয়নি। সম্রাট কনস্টানটাইন এই দ্বন্দ্ব নিরসনের চেষ্টা চালান। কিন্তু এতে তিনি সাফল্য লাভ করেননি। ৩২৫ খৃষ্টাব্দে তিনি Nicea-তে একটি সম্মেলন আহ্বান করেন। সম্মেলনে দুই হাজার তিরিশ জন পাদ্রী যোগদান করেন। সম্রাটের ঝোঁক ছিল মসীহ

(আ)-এর ওপর ঈশ্বরত্ব আরোপের দিকে। এজন্য তিনি আরিয়ূসের বিপক্ষে ফায়সালা দেন। এতদসত্ত্বেও প্রতিনিধিবর্গের অধিকাংশই আরিয়ূসের সমর্থক ছিলেন এবং কেবল তিন শত আঠারো জন পাদ্রীই বাদশাহ্ সাথে ছিল। তথাপি সম্রাট আরিয়ূসকে ইলিরিয়ায় (Illyria) নির্বাসন দেন এবং তাঁর সকল লিখিত বই-পুস্তক জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া যার কাছেই তাঁর লেখা কোন কিছু পাওয়া যেত তাকেই কঠিন শাস্তি দেওয়া হত। কিন্তু এত কিছু করার পরও আরিয়ূসের গুরুত্ব এবং মানুষের মনে তাঁর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা নিঃশেষ করা যায়নি।

শেষাবধি কনস্টানটাইনকেই তাঁর ভূমিকা নমনীয় করতে হয়। তিনি তাঁর ধর্মবিশ্বাসের ওপর থেকে আরোপিত বাধা-নিষেধ উঠিয়ে নেন। তাঁর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী আলেকজান্ডারের মৃত্যু এবং তদীয় স্থলাভিষিক্ত Athaniasius-এর নির্বাসনের পর আরিয়ূস পুনরায় আলেকজান্দ্রিয়া প্রত্যাবর্তন করেন। সম্ভাবনা ছিল যে, কনস্টানটাইন তাঁকে মিসরীয় গির্জার প্রধান নিযুক্ত করবেন এবং তাঁর ধর্মমত কবুল করবেন। কিন্তু মৃত্যু তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি।

ড্রেপার তাঁর Conflict between Religeon and Science নামক পুস্তকে লিখেছেন যে, তেরটি খৃষ্টান অধিবেশন খৃ. ৪র্থ শতকে আরিয়ূসের বিরুদ্ধে ফায়সালা দিয়েছিল। পঞ্চদশ খৃষ্টান অধিবেশন এর সমর্থন যুগিয়েছিল। ১৭শ অধিবেশন যেই মত প্রকাশ করেছিল তা এই অভিমতের খুবই কাছাকাছি ছিল। এভাবেই ৪৫তম খৃষ্টান অধিবেশন এই সমস্যার ওপর গভীর চিন্তা-ভাবনা ও ফায়সালা করার জন্যই অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

ঘটনা এই যে, খৃষ্টান জগতে চতুর্থ শতাব্দীর পূর্বে ত্রিত্ববাদী বিশ্বাসের সাধারণ প্রচলনের কথা জানা যায় না। New Catholic Encyclopaedia-য় বলা হয়েছে :

“ত্রিত্ববাদী বিশ্বাসের নব গঠন ও এর গোপন রহস্যের ওপর থেকে অবগুণ্ঠন কেবল ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধেই উঠতে পেরেছে। সাধারণ তৌহিদী আকীদার ওপর যদি কেউ কোন আলোচনা করে তবে তার অর্থ এই যে, তা খৃষ্টান ইতিহাসের সূচনা থেকে ৪র্থ শতাব্দীর শেষ চতুর্থাংশ পর্যন্ত স্থানান্তরিত হয়ে যায়। আর তা এই যে, একজন উপাস্যের তিন রকম প্রকাশ রয়েছে। খৃষ্টান জগতে এই মতবাদ সেই নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক মধ্যবর্তী অবকাশে বিস্তার লাভ

করেছিল।

এই আকীদা-বিশ্বাস ও দাওয়াত যীশু খৃষ্টের খোদািয়তের প্রকাশ্যে দাওয়াতের সঙ্গে সর্বদা সাংঘর্ষিক থাকে। কখনো এর পাল্লা ভারী হত, কখনও বা ওর পাল্লা। বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলগুলোতে খৃষ্টানদের বিরাট বড় সংখ্যা আরিয়ূসের বিশ্বাস পোষণ করত। এমন কি থিওসোডিযাস (Theosodius the great) এ বিষয়ে একটি সম্মেলন কনস্টান্টিনোপলে আহ্বান করেন যিনি যীশু খৃষ্টের, ঈশ্বর ও ঈশ্বরপুত্র হবার এই বিশ্বাসকে যথারীতি অনুমোদন দেন এবং এর ঘোষণা প্রদানের পর আরিয়ূসের ধর্মবিশ্বাসের দাওয়াত শেষ হয়ে যায় এবং এই আন্দোলন দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যায়। এতদসত্ত্বেও খৃষ্টানদের একটি দল এরপরও এই বিশ্বাসের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রাখে। আর এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী লোকগুলো “উরায়সিয়্যা ফের্কা” বা “উরায়সিয়্যীন” নামে মশহুর হয়।

এজন্য অগ্রাধিকারযোগ্য ও অনুমানসিদ্ধ কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর এই কথার فإن توليت فان عليك اثم الاريسيين “যদি তুমি অস্বীকার কর তবে উরায়সিয়্যীনদের পাপও তোমার ওপর বর্তাবে” অর্থ এই এজন্য যে, তৎকালীন খৃষ্টান জগতে, যাঁর নেতৃত্ব ছিল মহান বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের হাতে এবং যার প্রধান ছিলেন হেরাক্লিয়াস, এই উপদলই ছিল তুলনামূলকভাবে তাওহীদ তথা একত্ববাদের ধারক-বাহক এবং এর ওপর তখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, প্রথম যুগের কতক জলীলুল-কদর মুসলিম আলেমও এই ধারণাই ব্যক্ত করেছেন। ইমাম তাহাবী (র) (মৃ. ৩১২হি.) তদীয় “মুশকিলুল-আছার” নামক গ্রন্থে লিখেছেন :

“কোন কোন তত্ত্বজ্ঞ আলেম বর্ণনা করেছেন যে, হেরাক্লিয়াসের দলে একটি উপদল ছিল যাদেরকে উরায়সিয়্যা বলা হত। এরা আল্লাহর ওয়াহদানিয়াত ও হযরত মসীহ (আ)-এর ‘আবাদিয়াত অর্থাৎ ঈসা মসীহ আল্লাহর পুত্র নন, বান্দা-এই মতের সমর্থক ছিলেন। খৃষ্টানরা মসীহ (আ)-র রবূবিয়াত তথা ঈশ্বর-পুত্র হওয়া সম্পর্কে যা কিছু বলত এই উপদল তা স্বীকার করত না। এরা মসীহ (আ)-র দীনের ওপর কায়েম ছিল এবং ইনজীলে যা কিছু ছিল তার ওপর আমল করত। খৃষ্টানরা এ ব্যাপারে আরও অগ্রসর হয়ে যা কিছু বলত তারা তা বিশ্বাস করত না। যদি একথা সত্যি হয় তাহলে এই উপদলকে “উরায়সিয়্যূন” পেশসহযোগে এবং “আরীসিয়্যীন” বা “ইরিসিয্যীন” যবর ও যের সহযোগে উভয় রকম পাঠই জায়েয। উলামায়ে হাদীসের এটাই ধারণা। ”

এরই কাছাকাছি মত ব্যক্ত করেছেন মুসলিম শরীফের ভাষ্যকার ইমাম নববী (র) (মৃ. ৬৭৬ হি.)। তিনি বলেন :

“দ্বিতীয় মত এই যে, এরা সেই সব ইয়াহুদী ও খৃষ্টান যারা আবদুল্লাহ ইবন উরায়স -এর অনুসারী ছিল যার দিকে সম্পর্কিত করে তার মতবাদকে “আরূসী” মতবাদ বলা হয়। ”

আরব নেতৃত্ববৃন্দের নামে পত্র

আরব নেতৃত্ববৃন্দের মধ্যে তিনি মুনযির ইবন আবী (বাহরায়ন -এর শাসক), জীফার ইবনুল-জুলান্দা, ‘আবদ ইবন আল-জুলান্দা আযদি (আম্মানের আমীর-উমারা’), হাওযাহ ইবন আলী (যামামার শাসক ) ও হারিছ ইবন শাম্মার আল-গাসসানীর নামে পত্র প্রেরণ করেন। মুনযির ইবন সাবী, এছাড়া জুলান্দার দুই পুত্র জীফার ও ‘আবদ ইসলাম কবুল করেন। যামামার শাসক হাওযাহ ইবন ‘আলী রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট দরখাস্ত পেশ করে যে, তাকে ক্ষমতায় শরীক করা হোক। তিনি আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর সত্বর তার মৃত্যু হয়।

বনী লেহয়ান ও যী-কার্দ যুদ্ধ

হুদায়বিয়ার সন্ধি (৬ হি.) ও খায়বার যুদ্ধের মাঝে বনী লেহয়ান ও যী-কারাদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা) স্বয়ং তাশরীফ নেন এবং ইব্‌ন মাকতূম (রা)-কে মদীনার গভর্নর নিযুক্ত করেন। প্রথম যুদ্ধের কারণ ছিল রাজী’র ঘটনায় খুবায়ব ইব্‌ন ‘আদী ও তাঁর সাথীদের শহীদী খুনের বদলা গ্রহণ। আর দ্বিতীয় যুদ্ধের কারণ ছিল রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জঙ্গলে বিচরণরত উটনী পালের ওপর কাফির মুশরিকদের হামলা, বনী গিফারের এক ব্যক্তিকে খুন এবং তার স্ত্রীকে অপহরণ।