আরবের অন্ধকারতম যুগ এবং একজন স্থায়ী নবী প্রেরণের আবশ্যকতা
এই সব যোগ্যতা ও উত্তম গুণাবলী সত্ত্বেও যদ্দ্বারা আল্লাহ পাক আরবদেরকে ধন্য করেছিলেন এবং যদ্দরুণ হযরত মুহাম্মাদ (সা)-এর প্রেরণ ও ইসলামের আবির্ভাবের নিমিত্ত তাদেরকে নির্বাচিত করেছিলেন, আরব উপদ্বীপে সচেতনতা ও অস্থিরতার কোন চিহ্ন দৃষ্টিগোচর হত না এবং হুনাফা ও সত্যের অন্বেষণের প্রেরণা ও আবেগ পোষণকারী মুষ্টিমেয় কতিপয় ব্যক্তিই অবশিষ্ট থেকে গিয়েছিল এবং যাদের অবস্থান বর্ষাঘন শীতল রাত্রির গভীর অন্ধকারে জোনাকি পোকার চেয়ে বেশি ছিল না। যারা না কোন পথহারা পথিককে পথ প্রদর্শন করতে পারত আর না পারত কাউকে উষ্ণতা ও উত্তাপ প্রদান করতে। এই যুগ যেযুগে রাসূলুল্লাহ (সা) আবির্ভূত হন আরব উপদ্বীপের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা অন্ধকারতম যুগ ছিল। এই ভূখণ্ডটি অন্ধকার ও অবনতির চূড়ান্ত ধাপে উপনীত হয়েছিল যখন সংস্কার ও সংশোধনের সকল আশা-ভরসা নিঃশেষ হয়ে যায়। এ ছিল সেই শক্ত কঠিন হৃদয় চূর্ণকারী ও সঙ্গীন পর্যায় যা কোন নবীর তাবলীগের রাস্তায় এসে থাকবে।
নবী করীম (সা)-এর একজন ইংরেজ জীবনীকার (Sir William Muir) যিনি ইসলামের মহানবী হুজূর আকরাম (সা)-সম্পর্কে মনগড়া কাহিনী রচনায় ও কলঙ্ক লেপনে কুখ্যাত, সে যুগের খুব সুন্দর চিত্র অঙ্কন করেছেন এবং পাশ্চাত্য লেখকদের সেই দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাখ্যান করেছেন যে, তাঁর আবির্ভাবের পূর্বে লাভা নির্গত হওয়ার সময় হয়ে গিয়েছিল। মুহাম্মাদ (সা) কেবল সঠিক মুহূর্তে ও যথার্থ স্থানে পৌঁছে আগুনের উত্তাপ বৃদ্ধি করেন। ফলে লাভা নির্গত হয়ে পড়ে। তিনি বলেন :
“মুহাম্মাদ-এর যৌবনের উষালগ্নে ‘আরব উপদ্বীপ একেবারেই পরিবর্তনের অযোগ্য অবস্থায় ছিল। সম্ভবত এর চেয়ে বেশী নৈরাশাজনক অবস্থা আর কোন যুগে ছিল না।”
একই লেখক অন্যত্র বলেন :
“খৃষ্ট ধর্মের বিস্তারের যৎকিঞ্চিৎ চেষ্টা আরব ভূ-পৃষ্ঠে সময় সময় মামুলী কাঁপন সৃষ্টি করেছিল বটে এবং তুলনামূলকভাবে কঠিনতর ইয়াহুদী প্রভাবসমূহ কখনো কখনো অভ্যন্তরীণ ভাগেও চোখে পড়ত। কিন্তু স্থানীয় মূর্তিপূজা ও ইসমাঈলীদের কল্পনাপূজার খরস্রোত সবদিক থেকে কা‘বা অভিমুখে দু’কূলপ্লাবী হয়ে আছড়ে পড়ছিল এবং এর সুস্পষ্ট প্রমাণ সরবরাহ করছিল যে, মক্কার মাযহাব ও উপাসনার তরীকা-পদ্ধতি আরবদের মস্তিষ্কের ওপর শক্তভাবে ও অন্যের অংশ গ্রহণ ব্যতিরেকেই নিয়ন্ত্রণ জেঁকে বসেছিল।”
এই ঐতিহাসিক সত্য ও বাস্তবতাকে বসওয়ার্থ স্মিথ (Bosworth Smith) সংক্ষেপে কিন্তু জোর দিয়ে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন :
“সবচেয়ে বেশি দার্শনিক প্রবণতার অধিকারী একজন ঐতিহাসিক বলেন যে, এই সমস্ত বিপ্লবে, যে সব বিপ্লব মানুষের সামাজিক ইতিহাসের ওপর অবিনশ্বর ছাপ ফেলেছে, তার ভেতর কারুর আবির্ভাব ও প্রকাশ মানবীয় জ্ঞানের জন্য এতটা অপ্রত্যাশিত ছিল না যতটা ছিল আরবের এই ধর্মের।
“আমাদের প্রথম দৃষ্টিতেই এ কথা স্বীকার করতে হয় যে, ইতিহাসশাস্ত্র (যদি ইতিহাসশাস্ত্র নামে কোন বস্তু থেকে থাকে) এতে অক্ষম যে, সে কার্যকারণের সেই সব কড়ি তালাশ করবে যা তালাশ করা তার জন্য ফরয।”
নবীর আবশ্যকতা
খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যভাগে অবস্থার বিকৃতি এতটা বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং মানবতার অবনতি ও অধঃপতন সেই সীমায় পৌঁছে ছিল যে, তা আর কোন সংস্কারক (Reformer) ও চরিত্র শিক্ষকের সাধ্যের ভেতর ছিল না। সমস্যা কোন এক ‘আকীদা-বিশ্বাসের সংশোধন, কোন বিশেষ অভ্যাসের পরিবর্তন অথবা কোন ইবাদত-বন্দেগীর তরীকার প্রচলন কিংবা কোন সমাজের সামাজিক সংস্কারের ছিল না, না এর জন্য সেই সংস্কারক ও চরিত্র শিক্ষক যথেষ্ট ছিলেন যা থেকে কোন যুগ ও কোন এলাকা কখনো মুক্ত ছিল না। সমস্যা ছিল এই যে, জাহিলিয়াতের শেরেকী ও মূর্তিপূজামূলক এবং মানবতার এই ধ্বংসাত্মক আবর্জনাকে কিভাবে সরানো হবে ও পরিষ্কার করা হবে যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বংশানুক্রমে জমা হচ্ছিল যার নিচে আম্বিয়া-ই কিরাম (আ)-এর বিশুদ্ধ শিক্ষামালা ও সংস্কারকদের
চেষ্টা-সাধনা ও খেদমত সমাহিত ছিল। অতঃপর তদস্থলে সেই নতুন সুদৃঢ়, বিশাল বিস্তৃত ও সমুন্নত প্রাসাদোপম অট্টালিকা কিভাবে কায়েম করা হবে যার রহমতের ছায়াতলে গোটা মানবতা আশ্রয় গ্রহণ করবে। সমস্যা ছিল এই যে, সেই মানুষ কি করে বানানো যাবে যে তার সম্মুখবর্তী মানুষের তুলনায় সকল ক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী হবে এবং এমন দৃষ্টিগোচর হবে যে, সে যেন কেবল জন্মলাভ করেছে কিংবা সে এইমাত্র নবজীবন লাভ করেছে।

“যে ব্যক্তি মৃত ছিল, যাকে আমি পরে জীবিত করেছি এবং যাকে মানুষের মধ্যে চলবার জন্য আলো দিয়েছি- সে কি ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে অন্ধকারে রয়েছে এবং সেই স্থান থেকে বের হবার নয়?” (সূরা আন‘আম, ১২২ আয়াত)।
এই সমস্যা ও ফেতনা-ফাসাদের জড় চিরদিনের জন্য খতম করা এবং মূর্তিপূজার বুনিয়াদকে গড়ে মূলে এমনভাবে উৎসাধনের দরকার ছিল যে, দূর-দূরান্তেও এর কোন চিহ্ন ও নাম-নিশানা যেন অবশিষ্ট থাকতে না পারে এবং তৌহিদী ‘আকীদা-বিশ্বাস মানুষের মনের গহীনে কার্যত এমনভাবে যেন বদ্ধমূল ও দৃঢ়মূল করে দেওয়া যায় যার বেশি কল্পনা করাও কষ্টকর। তার ভেতর আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি কামনা, ইবাদত-বন্দেগীর প্রতি আগ্রহ ও ঝোঁক, মানবতার সেবা, হক-পরস্তীর আবেগ-উদ্দীপনা, প্রতিটি অশুভ ও মন্দ কামনার মুখে লাগাম দেবার ক্ষমতা, যোগ্যতা ও শক্তি পয়দা করতে হবে। সংক্ষেপে মানবতাকে (যা আত্মহত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল, বরং তার জন্য কোমর বেঁধে তৈরি ছিল এবং এক্ষেত্রে সজ্ঞানে চেষ্টার কোন কসূর সে করেনি) কোমর ধরে দুনিয়া ও আখিরাতের জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে হবে এবং তাকে শাহী সড়কে টেনে তুলতে হবে যার প্রথম সূচনা সেই পবিত্র জীবন যা আল্লাহ প্রেমিক ‘আরিফ ও ঈমানদারগণ এই দুনিয়াতেই লাভ করে থাকেন এবং দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত সূচনা সেই চিরস্থায়ী আবাস জান্নাত যার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির জীবন অবলম্বনকারীদেরকে।
রাসূলুল্লাহ (সা)-কে প্রেরণ করে আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতির যে উপকার করেছেন তার উল্লেখ করে আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মজীদে যেই ইরশাদ করেছেন এর চেয়ে অধিক সেই অবস্থার কোন চিত্র ও প্রতিনিধিত্ব হতে পারে না। ইরশাদ হচ্ছে :

“তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ কর : তোমরা ছিলে পরস্পরের শত্রু এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুণ্ডের ধারে ছিলে, আল্লাহ তা থেকে তোমাদেরকে রক্ষা করেছেন” (সূরা আল-ইমরান, ১০৩ আয়াত)।
মানুষের সমগ্র ইতিহাসে এর চেয়ে অধিক নাযুক ও জটিল কাজ এবং এর থেকে বিরাট ও ‘আজীমু’শ-শান যিম্মাদারী আর চোখে পড়ে না যা একজন নবী ও আল্লাহ প্রেরিত ব্যক্তি হিসাবে মুহাম্মাদ (সা)-এর ওপর চাপানো হয়েছিল। কোন জমিও এতটা উর্বর প্রমাণিত হয়নি এবং সজীব শ্যামলিমা নিয়ে আসতে পারেনি যেমনটি তিনি পেরেছিলেন। কোন চেষ্টা-সাধনাও এতটা ফলপ্রসূ ও কামিয়াব হয়নি যতটা তাঁর চেষ্টা-সাধনা সাধারণ মানবতার অনুকূলে উপকারী, জীবনদায়ক ও প্রাণসঞ্চারক প্রমাণিত হয়েছে। এইসব বিস্ময়কর বস্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিস্ময় এবং দুনিয়ার সর্ববৃহৎ মু’জিযা। একজন বিখ্যাত ফরাসী সাহিত্যিক ও কবি অত্যন্ত জোরের সাথে অলংকারিক ভাষায় সুস্পষ্টভাবে এর সাক্ষ্য দিয়েছেন। এই কবি ও সাহিত্যিক হলেন ল্যামার্টিন (Lamartine)। তিনি নবুওতে মুহাম্মাদীর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা পেশ করতে গিয়ে বলেন :
“কোন মানুষই কখনো চেতন কিংবা অবচেতনভাবে নিজের জন্য এত বড় উচ্চ ও মহত্তর লক্ষ্য নির্বাচিত করেনি। কারণ তা ছিল মানুষের শক্তিবহির্ভূত। অলীক ধারণা ও খোশকল্পনা, যা মানুষ ও তার স্রষ্টার মাঝে আড়াল ও পর্দায় পরিণত হয়েছিল, তাকে পর্যুদস্ত ও পরাভূত করা, মানুষকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করা এবং তাঁর সামনে এনে দাঁড় করানো, সেই যুগের মূর্তিপূজকদের বস্তুগত খোদার স্থলে এক আল্লাহর পবিত্র ও বুদ্ধিগ্ৰাহ্য ধারণাকে পুনর্বাসিত করা, এসবই ছিল সেই মহান লক্ষ্য। কোন মানুষ কখনো এত বড় বিরাট কাজ, যা কোন অবস্থাতেই মানবীয় শক্তির আওতাধীন ছিল না, এত দুর্বল উপকরণের সাথে কাঁধে তুলে নেয়নি।”
তিনি সম্মুখে অগ্রসর হয়ে বলেন :
“এর থেকেও অধিক তাঁর কৃতিত্বপূর্ণ অবদান এই যে, তিনি কুরবানগাহ, দেবতা, ধর্মবিশ্বাস, কল্পনা, আকীদা-বিশ্বাস ও অন্তররাজ্যে এক বিপ্লব সৃষ্টি করলেন
এমন একটি গ্রন্থকে ভিত্তি বানিয়ে যার প্রতিটি হরফ আইনের মর্যাদা রাখে। তিনি এমন একটি রুহানী মিল্লাত তথা আধ্যাত্মিক জাতি গঠন করলেন যা প্রতিটি বর্ণ, গোত্র, অঞ্চল ও ভাষাভাষী মানুষ নিয়ে গঠিত। এই মুসলিম মিল্লাতের বৈশিষ্ট্য, যেই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উম্মাহ মুহাম্মাদ (সা) আমাদের জন্য উত্তরাধিকার হিসাবে রেখে গেলেন তা হল এই—এই উম্মাহ মিথ্যা খোদাগুলোর প্রতি তীব্র ঘৃণা পোষণ করে এবং বস্তুর ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহর প্রতি গভীর আকর্ষণ ও টান অনুভব করে। এই প্রেম ও ভালবাসাই তাঁকে এক আল্লাহর প্রতি অবজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণে বাধ্য করে এবং এই ভালবাসাই মুহাম্মাদের অনুসারীদের সৎ গুণাবলীর ভিত্তি হিসাবে পরিগণিত হয়। স্বীয় আকীদা-বিশ্বাসকে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষের দ্বারা গ্রহণ করিয়ে নেয়া তাঁর এক বিরাট মু‘জিযা ছিল। কিন্তু অধিকতর সঠিক কথা এই যে, এটা ব্যক্তির নয়, বরং বুদ্ধির মু‘জিযা। আল্লাহর তাওহীদ তথা একত্ববাদের এমন এক যুগে ঘোষণা করা যখন দুনিয়া অসংখ্য কৃত্রিম ও মিনি খোদার পূজার ভারে চাপা পড়ে ছিল, স্বয়ং এক শক্তিশালী মু‘জিযা ছিল। মুহাম্মাদের মুখ দিয়ে যখনই এই আকীদা-বিশ্বাস ঘোষিত হল অমনি মূর্তির সমস্ত প্রাচীন মণ্ডপগুলোতে ধুলো উড়তে লাগল এবং এক-তৃতীয়াংশ পৃথিবী ঈমানী উত্তাপে ভরপুর হয়ে গেল।”
এই ব্যাপক ও বিশ্বজোড়া বিপ্লব এবং মানবতার নতুনতর জীবন, নবতর গঠন ও বিনির্মাণের মহান কাজ এক নতুন নবুওয়াত ও রিসালাতের প্রত্যাশী ছিল যা সমস্ত নবুওয়াত ও রিসালাতের চেয়ে হবে অধিক বলিষ্ঠ এবং এমন এক নবীর প্রার্থী ছিল যিনি হেদায়েত ও সত্য-সুন্দর দীন তথা দীনে হকের পতাকা গোটা বিশ্বজাহানে চিরকালের জন্য উড্ডীন করবেন। আল্লাহ তা‘আলার এরশাদ :

“কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল তারা এবং মুশরিকরা আপন মতে অবিচলিত ছিল তাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ না আসা পর্যন্ত, আল্লাহর নিকট থেকে এক রসূল যে তেলাওয়াত করে পবিত্র গ্রন্থ, যাতে আছে সঠিক বিধান” (সূরা বায়্যিনা : ১-৩ আয়াত)।