পরিচিতি

পরিচিতি
গ্রন্থ : গ্রন্থকার : অনুবাদক

গ্রন্থ

আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভীর-র আরবী গ্রন্থ আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা,-এর মুহাম্মদ আল-হাসানীকৃত উর্দু অনুবাদ ‘নবীয়ে রহমত’ বর্তমান বিশ্বের সীরাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে একটি অনন্যসাধারণ গ্রন্থ। প্রাচীন ও আধুনিক উৎসসমূহ থেকে সতর্কতার সাথে ইল্ম ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ে আধুনিক যুগ-মানস ও যুগ-জিজ্ঞাসাকে সামনে রেখে এরূপ আরেকখানি গ্রন্থ কোনও ভাষায় লিখিত হয়েছে কি না অন্ততঃ আমাদের তা জানা নেই। এ শুধু তত্ত্ব ও তথ্যের সমাহার, পরম শ্রদ্ধা নিবেদন, উত্তম সাহিত্য ও জীবনআলেখ্য নয়, বরং এ সব কিছুরই সমাহার, অথচ অতিশয়োক্তিমুক্ত, স্বচ্ছ ও ঝরঝরে বর্ণনাভঙ্গিতে লিখিত একখানা সুখপাঠ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ গ্রন্থ। হিন্দী, ইংরেজী, ইন্দোনেশীয়, তুর্কী প্রভৃতি ভাষায় এর বিভিন্ন সংস্করণ প্রকাশিত হয়ে আরব-আজম ও প্রাচ্য-প্রতীচ্যের দেশে দেশে ইতিমধ্যেই সাড়া জাগিয়েছে।

গ্রন্থকার

মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (র) সেই যে ত্রিশের দশকে তাঁর পূর্বপুরুষ বালাকোটের শহীদ আমীরুল-মু’মিনীন হযরত সাইয়েদ আহমদ বেরলভী (রহ)-এর অনুপম চরিত্রগ্রন্থ ‘সীরাতে সাইয়েদ আহমদ শহীদ’ লিখে তারুণ্যদীপ্ত বয়সেই উর্দু সাহিত্যের আসরে নিজের একটি উল্লেখযোগ্য আসন করে নিলেন, তারপর বিগত প্রায় পৌনে এক শতাব্দী ধরে তাঁর কলম অবিশ্রান্তভাবে লিখে চলেছে মুসলিম ইতিহাসের গৌরবদীপ্ত অধ্যায়গুলোর ইতিবৃত্ত। পাঁচ খণ্ডে রচিত ‘তারীখে দাওয়াত ও আযীমত’ তাঁর এমনি একটি অমূল্য গ্রন্থ। সীরাত থেকে ইতিহাস, ইতিহাস থেকে দর্শন ও সাহিত্য পর্যন্ত সর্বত্রই তাঁর অবাধ গতি। উর্দু থেকে তাঁর আরবী রচনাই যেন অধিকতর অনবদ্য। তাঁর “মা-যা খাসিরা’ল-

‘আলামু বি-ইনহিত্বাতি’ল-মুসলিমীন” (মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো?) একখানি চিন্তাসমৃদ্ধ অনবদ্য আরবী গ্রন্থ যার অনুবাদ পৃথিবীর অনেক ভাষায় হয়েছে। ‘নবীয়ে রহমত’ ছাড়াও অতি সম্প্রতি রচিত ‘আল-মুরতাজা’ শীর্ষক হযরত আলী (রা)-এর জীবনী গ্রন্থখানা আরবী, উর্দু ও ইংরেজী ভাষায় প্রচুর সুনাম অর্জন করেছে। সমসাময়িক বিশ্বে তাঁর চাইতে অধিকতর খ্যাতিমান ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অন্য কোনও আলেম আছেন কি না এবং থাকলেও তাঁর মত এত অধিক স্বীকৃতি লাভ করেছেন কিনা সন্দেহ রয়েছে। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের প্রায় সকল জনপদে যেমন তিনি আমন্ত্রিত হয়ে সে সব দেশ সফর করেছেন, তেমনি নোবেল পুরস্কার তুল্য মুসলিম বিশ্বের সবচাইতে মূল্যবান বাদশাহ ফয়সাল পুরস্কারে তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন। তিনি একাধারে ‘রাবেতায়ে আলমে ইসলামী’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, লখনৌর বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘দারুল উলূম নাদওয়াতুল-‘উলামা’-এর রেক্টর এবং ভারতীয় মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফরম “মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড”-এর সভাপতি। তাঁর অস্তিত্ব কেবল ভারতীয় মুসলমানদের জন্যই নয়, গোটা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য এক বিরাট নেয়ামত। তাঁর বেশ ক’টি বই ইতিমধ্যেই বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। একাধিক বার তিনি বাংলাদেশ সফরও করেছেন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ এ পর্যন্ত ৬ খণ্ডে প্রকাশিত ‘কারওয়ানে জিন্দেগী’ শুধু তাঁর আত্মজীবনী নয়, এটা সমসাময়িক বিশ্বের অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ও ব্যক্তিত্বের এক অপূর্ব আলেখ্যও বটে। তাঁর রচনায় আল্লামা শিবলীর অনবদ্যতা, আল্লামা সাইয়েদ সুলায়মান নদভীর সূক্ষ্মদর্শিতা, মাওলানা মানাযির আহসান গিলানীর সতর্কতা, মাওলানা আশরাফ আলী থানবীর তাওয়া, সর্বোপরি তাঁর পূর্বপুরুষ সাইয়েদ আহমদ বেরলভী (র)-এর দরদ প্রতিফলিত হয়েছে। শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া (র), মাওলানা মনযূর নোমানী (র) ও রইসুত-তাবলীগ মাওলানা ইউসুফ (র)-এর অনেক মূল্যবান গ্রন্থে তাঁর লিখিত সারগর্ভ ভূমিকাগুলো পড়বার মতো। আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে তিনি মাওলানা আহমদ আলী লাহোরী (র) এবং মাওলানা শাহ আব্দুল কাদির রায়পুরী (র)-এর খলীফা।

১৪২০ হিজরীর ২২শে রমযান/১৯৯৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর রোজ শুক্রবার বেলা ১১.৫০ মিনিটে সূরা ইয়াসীন তেলাওয়াতরত অবস্থায় তিনি ইনতিকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। দায়েরায়ে শাহ আলামুল্লাহয় পারিবারিক কবরস্তানে তাঁকে দাফন করা হয়।

অনুবাদক

মাওলানা আবু সাঈদ মুহাম্মদ ওমর আলী প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ ডিগ্রী নিয়ে যখন মাওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন (১৯৭৮) তখনো তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভা সম্পর্কে কেউ কিছু জানত না। সিলেটের আল্লামা মুহাম্মদ মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ)-এর সুকঠিন উর্দু গ্রন্থ “ফাত্হুল-করীম ফী সিয়াসাতিন নাবিয়্যিল-আমীন”-এর বঙ্গানুবাদ ‘ইসলামের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক অধিকার’ অনুবাদের মাধ্যমে সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর প্রথম প্রবেশ। অতঃপর একে একে ‘ইসলামে প্রতিরক্ষা কৌশল’ [‘মহানবীর (সা) প্রতিরক্ষা কৌশল’ নামে ২য় সং. প্রকাশিত], ইসলামী রেনেসাঁর অগ্রপথিক (৩ খণ্ড), ঈমান যখন জাগলো, খালিদ বিন ওয়ালীদ, মুহাম্মদ বিন কাসিম প্রভৃতির মত কয়েকটি অনুবাদ গ্রন্থ তিনি পাঠক সমাজকে উপহার দেন। এ পর্যায়ে তার সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে ‘নবীয়ে রহমত’। এমন একটি গ্রন্থের অনুবাদে যেটুকু যোগ্যতা ও নিষ্ঠার প্রয়োজন তা যে আবু সাঈদ মুহাম্মদ ওমর আলীর রয়েছে বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে পাঠক নিজেই তাঁর পরিচয় পাবেন। অনুবাদক বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইসলামী বিশ্বকোষ বিভাগের পরিচালক এবং বিশ্বকোষ সম্পাদনা পরিষদের সদস্য-সচিবরূপে দেশের বয়োবৃদ্ধ সুধীদের যে মূল্যবান সাহচর্য পেয়েছেন ও পাচ্ছেন তা তাঁকে যে কতটুকু পরিশীলিত ও যোগ্য করে তুলেছে “নবীয়ে রহমত”-এর পাতায় পাতায় তার পরিচয় রয়েছে। আমরা মরহুম গ্রন্থকারের জান্নাতী রূহের দারাজাতের বুলন্দী ও অনুবাদকের কর্মময় জীবনের সাফল্য কামনা করি।

আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী
তারিখ: ২৫/১১/২০০২ ঈ.