মক্কা : রাসূল আকরাম (সা)-এর আবির্ভাবের সময়

মক্কা : রাসূল আকরাম (সা)-এর আবির্ভাবের সময়

মক্কা একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর

অনেক লোক যারা হূযূর আকরাম (সা)-এর আবির্ভাবকালীন অবস্থা সম্পর্কে খুব ভাল রকম ওয়াকিফহাল নন, আরবদের ইতিহাস, সামাজিক জীবন, তাদের কাব্য, সাহিত্য ও তাদের গোত্রীয় প্রথাসমূহ সম্পর্কে যাঁদের খুব বেশি গভীর দৃষ্টি নেই তারা মনে করেন যে, রাসূল (সা)-এর আবির্ভাবের সময় মক্কা একটি ছোট গাঁও-গ্রামের মতই ছিল, জীবন যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সকল দিক থেকেই শৈশব অবস্থায় ছিল। তা ছিল কতকগুলো গোত্রের কতিপয় জনবসতির নাম যেখানে পশম নির্মিত তাঁবু ও ডেরার (যার চতুর্দিকে উট, ভেড়া, বকরী ও ঘোড়া বাঁধার জায়গা ছিল) ভেতর তারা জীবন যাপন করত। তারা বেশির ভাগ উপত্যকার ধারে ও পাহাড়-পর্বতের কোলে বা পাদদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত। তাদের খাবার

ছিল শুকনো রুটি কিংবা উটের গোশত যা তারা ঠিকমত রান্না করতেও জানত না। উটের পশম নির্মিত কাপড় পরিধান করত। তাদের পানাহারের মধ্যে কোন প্রকার নতুনত্ব ছিল না, যেমন ছিল না পোশাকে কোন রকম দর্শনীয় সৌন্দর্য, জীবনে ছিল না উষ্ণতা ও উত্তাপ, অনুভূতিতে ছিল না সূক্ষ্ম রুচিবোধ ও কমনীয়তা, না চিন্তা-চেতনায় উন্নত মার্গে ভ্রমণ।

মক্কার এই যে অন্ধকার ও নিকৃষ্ট চিত্র যা সীরাত ও ইতিহাস বিষয়ক সাধারণ গ্রন্থগুলোতে দেখতে পাওয়া যায় এবং এর অধিকাংশই অনারব ভাষাগুলোতে লিখিত, তা ঐতিহাসিক সত্যের বিপরীত যা ইতিহাসের বিভিন্ন পুস্তকে, সাহিত্যে ও জাহিলী যুগের নানা কবিতায় পাওয়া যায়। সে সবের মধ্যে মক্কা ও মক্কার অধিবাসীদের আচার-অভ্যাস, প্রথা-পদ্ধতি, সংবিধান ও আইন-কানুনের (যা প্রাথমিক গ্রাম্য বেদুঈন জীবন যাপন থেকে প্রাথমিক নাগরিক ও সাংস্কৃতিক জীবন যুগে প্রবেশ করেছিল) খসড়া পেশ করা হয়েছে।

এই চিত্র কুরআন মজীদের সেসব বৈশিষ্ট্য ও নামের সঙ্গেও কোন সামঞ্জস্য রাখে না যেখানে মক্কাকে ‘উম্মুল-কুরা’ নামে স্মরণ করা হয়েছে।

“আর এভাবে আমি তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় যাতে তুমি সতর্ক করতে পার মক্কা ও তার চারপাশের জনগণকে এবং সতর্ক করতে পার কিয়ামত দিবস সম্পর্কে যে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। সেদিন একদল জান্নাতে প্রবেশ করবে আর একদল করবে জাহান্নামে প্রবেশ” (সূরা শূরাঃ ৭ আয়াত)।

অন্য জায়গায় এ সম্পর্কে বলা হয়েছে :

“শপথ তীন ও যয়তুনের, শপথ সিনাই (তূর) পর্বতের এবং শপথ এই নিরাপদ নগরীর” (সূরা তীন : ১-৩ আয়াত)।

এক স্থানে বলা হয়েছে :

“শপথ করছি এই নগরীর আর তুমি এই নগরের অধিবাসী” (সূরা বালাদ : ১-২)।

প্রকৃত বিষয় এই যে, মক্কা খৃষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যভাগেই অন্ধকার ও মূর্খতার যুগ থেকে সভ্যতার যুগে প্রবেশ করছিল, যদিও এ সভ্যতা আপন সীমিত বৃত্তের মধ্যেই বৃত্তাবদ্ধ ছিল। এই শহর এমন এক ব্যবস্থাপনার অধীন ছিল যা পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্য, সাধারণ ও সামষ্টিক সমঝোতা ও শ্রেণীবিভাগের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। আর এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কুসায়্যি ইবন কিলাবের হাতে যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ঊর্ধ্বতন পঞ্চম পুরুষ।

প্রথম দিকে মক্কার জনবসতি ছিল স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত সীমিত। এই স্থানটি ‘জাবাল আবু কুবায়স’ (যা ছিল সাফা পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত) এবং ‘জাবাল আহমার’-এর মধ্যবর্তীতে অবস্থিত ছিল। জাহিলী যুগে একে ‘আ‘রাফ’ বলা হত যা ছিল “কু‘আয়কি‘আন উপত্যকা”-র একেবারে সামনে। কিন্তু বায়তুল্লাহর দৌলতে এর খাদেম, রক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক ও অধিবাসীদের সাধারণভাবে যে সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল, অধিকন্তু সেখানে যে অসাধারণ শান্তি ও নিরাপত্তা ছিল তজ্জন্য ঐ সব গোত্রের জন্য মক্কায় খুবই আকর্ষণ ছিল। অনন্তর কালপ্রবাহে এর জনসংখ্যা আপন গতিতেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাঁবু ও ক্ষুদ্র ডেরার স্থলে প্রস্তর ও গুহানির্মিত ঘরবাড়ি নির্মিত হয় এবং জনবসতির এই অব্যাহত ধারা মসজিদুল-হারাম থেকে মক্কার উচ্চ ও নিম্নভূমি অবধি বিস্তার লাভ করে। প্রথম দিকে এইসব লোক নিজেদের বাড়িঘরের ছাদও বায়তুল্লাহর মত চতুর্ভূজাকৃতির বানাত না। তারা অনুভব করত যে, এটা এক ধরনের বেআদবী। অবশ্য ক্রমে ক্রমে এই সম্ভ্রমবোধ আর অবশিষ্ট থাকেনি এবং এ ক্ষেত্রে নানা রকমের অবকাশ সৃষ্টি করা হতে থাকে। তথাপি তখন ঘরবাড়ি তৈরির সময় কা‘বার প্রতি সম্ভ্রমবোধবশত এতটুকু অবশ্যই লক্ষ্য রাখা হত যাতে ঘরবাড়ি কা‘বা থেকে উঁচু না হয়।

কতক বর্ণনাকারীর বর্ণনা এই যে, মক্কার লোকেরা কা‘বার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবশত নিজেদের বাড়িঘর গোলাকৃতি বানাত। প্রথম যে ব্যক্তি চতুর্ভূজাকৃতির বাড়ি বানায় তার নাম হামীদ ইবন যুহায়র। তার এই কাজ কুরায়শরা পছন্দ করেনি।

মক্কার ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ও নেতৃবর্গের বাড়িঘর হত প্রস্তর নির্মিত। এতে কয়েকটি কামরা থাকত এবং সামনাসামনি দু’টো দরজা থাকত যাতে ঘরের একাংশে মেহমানের উপস্থিতিতে মহিলারা দ্বিতীয় দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে।

মক্কার নতুন নির্মাণ এবং এর মূল প্রতিষ্ঠাতা

মক্কার এই বিস্তৃতি, উন্নতি-অগ্রগতি ও নতুন নির্মাণের ভেতর সবচেয়ে বড়

অবদান ছিল কুসায়্যি ইবন কিলাবের। আর তা এজন্য যে, তিনিই সর্বপ্রথম কুরায়শদেরকে এই লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং বসবাসের জন্য বিভিন্ন জায়গার যথারীতি সীমানা নির্ধারণ করেন। আরবী পরিভাষায় একে রিবায় (رباع) বলা হয়। কুরায়শদের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা ও বংশকে দিয়ে এসব বাড়িঘরে আবাদ করান। তাঁর বংশধরগণ মক্কার জমিজমার বণ্টন ও সীমানা নির্ধারণের কাজ অব্যাহত রাখে, নিজেরাও বসতি স্থাপন করে এবং জমিজমা অন্যদের নিকট বিক্রি করে। বেচাকেনা ও নির্মাণের এই ধারা কোনরূপ মতভেদ ও বিবাদ-বিসংবাদ ছাড়াই কুরায়শ ও অপরাপর শাখা-প্রশাখার মধ্যে চলতে থাকে।

জীবন সংগঠন ও পদের বণ্টন

কুসায়্যি স্বীয় জাতিগোষ্ঠী ও মক্কাবাসী উভয়ের ওপর প্রভাবশালী ছিলেন, হিজাবা (বায়তুল্লাহর রক্ষণাবেক্ষণ), সিকায়া (হাজ্জী ও মুসাফিরদের পানির ব্যবস্থা), রিফাদা (আল্লাহ্র ঘর যিয়ারতকারী হাজ্জীদের বার্ষিক ভোজ প্রদান), নদওয়া (পরামর্শ সভা) ও লিওয়া (যুদ্ধের পতাকা প্রদান তথা সামরিক বিষয়াদি) সব কিছু তাঁরই হাতে ন্যস্ত ছিল।

তিনি দারুন-নদওয়া একেবারে মসজিদুল হারাম সংলগ্ন নির্মাণ করেন এবং এর দরজা রাখেন কা‘বার দিকে। এটা কুসায়্যি ইবন কিলাবের বাসগৃহও ছিল। কুরায়শদের পরামর্শ, সিদ্ধান্ত ও মক্কার সামাজিক কেন্দ্র ছিল এ ঘর। কুরায়শদের কোন লোক, সে পুরুষ হোক অথবা নারী, বিয়ে করতে চাইলে, কোন গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎক্ষণিক ব্যাপারে পরামর্শের আবশ্যকতা অনুভব করলে, কোন গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিতে কিংবা এর প্রস্তুতির পর্যায় আসলে, এমন কি কোন মেয়ে শিশু যখন বড় হত তখন তাকে ওড়না পরিধান অনুষ্ঠান এখানেই সম্পন্ন করা হত। কুসায়্যির ব্যক্তিত্ব তাঁর জীবিতকালে এবং তাঁর মৃত্যুর পরও যেই ধর্মীয় মর্যাদা লাভ করেছিল তাতে তৎকর্তৃক প্রদত্ত সনদ ব্যতিরেকে কোন কাজই হতে পারত না। আইন ছিল এই যে, দারুন-নদওয়ায় বনী কুসায়্যি ব্যতিরেকে অপরাপর গোত্রের কেবল তারাই আসতে পারত যার বা যাদের বয়স ৪০ বছরের কম নয়। অবশ্য বনী কুসায়্যি ও তাদের মিত্র গোত্রের সকল লোক, তা সে বড় হোক অথবা ছোট, এতে অংশ গ্রহণের অধিকার ছিল। দারু’ন-নদওয়ায় আর যাদের গোত্র ও

খান্দানের শরীক হওয়ার অনুমতি ছিল তারা ছিল হাশিম, উমায়্যা, মাখযূম, জুমাহ, সাহ্ম, তায়ম, ‘আদী, আসাদ, নাওফাল ও যুহরাঃ। এই দশজন বিভিন্ন খান্দানের লোক ছিলেন।

এদের ইনতিকালের পর কতগুলো পদের নতুন বণ্টন ঘটে। বনী হাশিমকে সিকায়া, বনী উমায়্যাকে কুরায়শদের পতাকা ইকাব, বনী নাওফালকে রিফাদাঃ, বনী ‘আবদুদ্দারকে লিওয়া অর্থাৎ সামরিক বিষয়াদি, সুদানা ও হিজাবাঃ এবং বনী আসাদকে পরামর্শের পদ দান করা হয়।

কুরায়শদের বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে যাঁরা বিচক্ষণ, দূরদর্শী, বুদ্ধিজীবী ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী ছিলেন তাঁদের মধ্যে নিম্নোক্ত দায়িত্বসমূহ বণ্টন করা হয়েছিল : (হযরত) আবু বকর (সিদ্ধীক) যিনি তায়ম গোত্রের ছিলেন –তাঁর নিকট রক্তপণ, ক্ষতিপূরণ, জরিমানা প্রভৃতি, খালিদ ইবনু’ল-ওয়ালীদ-এর নিকট ছিল কুব্বা ও আ‘ইন্নার পদ। তিনি ছিলেন বনী মাখযূম গোত্রের। কুব্বা সেই তাঁবুকে বলা হয় যেখানে সামরিক প্রয়োজনের সাজ-সরঞ্জামাদি রাখা হয়। আ‘ইন্নাঃ বলা হয় সেই সব সামানকে যা যুদ্ধকালীন কুরায়শদের ঘোড়ার ওপর থাকত। দূতগিরি ছিল (হযরত) ওমর ইবনু’ল-খাত্তাব-এর নিকট। যখন কোন গোত্রের সঙ্গে যুদ্ধ করা উদ্দেশ্য হত তখন তাঁকে দূত হিসাবে প্রতিপক্ষের নিকট পাঠানো হত। যখন অন্য কোন গোত্র এ ব্যাপারে গর্ব করত তখন তার মোকাবিলার জন্য তাঁকে (ওমরকে) নির্বাচিত করা হত এবং তাঁর মনোনয়নে সকলেই সম্মত থাকত। সাফওয়ান ইবন উমায়্যাঃ (বনী জুমাহ)-র দায়িত্বে ছিল “আয়সার ও আয়লাম” -এর কাজ। কোন রকমের বিরাট কোন পদক্ষেপ এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া নেওয়া হত না। হারিছ ইবন কায়স-এর যিম্মায় ছিল আইন-শৃঙ্খলা, ব্যবস্থাপনা ও প্রতিমার নামে জমাকৃত মালামাল। এই সব যিম্মাদারী ও উচ্চপদ তারা তাদের পিতা-পিতামহদের থেকে উত্তরাধিকার ও পারিবারিকসূত্রে লাভ করেছিল।

বাণিজ্যিক তৎপরতা ও আমদানি-রপ্তানি

কুরায়শরা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে দু’টো সফর করত : একটি সিরিয়ার দিকে গ্রীষ্ম

মৌসুমে, আরেকটি শীতকালে ইয়ামনের দিকে। পবিত্র মাসগুলো (রজব, যূল-কা‘দাঃ, যুল-হিজ্জাঃ ও মুহাররাম) তাদের নিকট সম্মানিত ও পবিত্র মাস হিসাবে পরিগণিত হত এবং এসব মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ পরিহার করা হত। এই সব মাসে তাদের বাজার বসত বায়তুল্লাহর পাশে হারাম শরীফের ভিতর এবং জাযীরাতু‘ল- আরব থেকে দূরদরাজ এলাকা থেকে লোকজন এতে অত্যন্ত আগ্রহ ও উৎসাহ ভরে শরীক হত। এসব বাজারে দৈনন্দিন জীবনের নিত্য-প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী তারা পেত। মক্কার ইতিহাসে আমরা যেসব বাজারের সন্ধান পাই তার থেকে পরিমাপ করা যায় যে, সেখানকার বাসিন্দারা সভ্যতা-সংস্কৃতি ও প্রগতির কোন পর্যায়ে উন্নীত ছিল। ঐসব বাজারের মধ্যে একটি বাজার নির্দিষ্ট ছিল আতর বিক্রেতাদের জন্য, একটি নানারকম ফলমূলের জন্য, একটি সবজির জন্য, একটি বাজার কেবল হাজ্জামদের জন্য। এসব বাজার খুবই বিস্তৃত ও প্রশস্ত ছিল যেখানে বাণিজ্যিক কাফেলাগুলো বাইরে থেকে গম, ঘি, মধু ও বিভিন্ন রকমের দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে আসত। বিরাট পরিমাণে এগুলো মজুদ থাকত। ইয়ামামা ছিল মক্কাবাসীদের জন্য খাদ্যশস্যের বাজার। এসব বাজার ছাড়াও একটি গলি জুতার দোকানের জন্য এবং একটি কাপড়ের জন্য নির্দিষ্ট ছিল।

মক্কার বাসিন্দাদের কিছু কিছু চিত্তবিনোদন কেন্দ্রও ছিল যেখানে গ্রীষ্মকালে দিনের বেলা অপরাহ্নে মক্কার ফূর্তিওয়াজ ও আমোদপ্রিয় সৌখিন যুবকেরা সমবেত হত। যারা বেশী ধনী ও আরাম-আয়েশ ও বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত ছিল তারা শীতকাল মক্কায় কাটাত আর গ্রীষ্মকাল অতিবাহিত করত তায়েফে। মক্কার কিছু যুবকও উত্তম বসন-ভূষণ ও সৌন্দর্যের জন্য মশহুর ছিল। তাদের কারো কারো পোশাক কয়েক‘শ দিরহামে তৈরি হত।

বাণিজ্যিক তৎপরতা ও গতিবিধি মক্কায় তখন চরম বিকাশমান অবস্থায় ছিল। সেখানকার বণিকরা আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ সফর করত এবং সেসব দেশের উৎপন্ন দ্রব্যাদি, উপহার-উপঢৌকন ও নির্দিষ্ট দ্রব্যাদি কিংবা সেসব জিনিস যেসবের তাদের দেশ মুখাপেক্ষী ছিল সেগুলো তারা সাথে নিয়ে আসত। আফ্রিকা থেকে যেসব জিনিস তারা আমদানী করত সে সবের মধ্যে গজদন্ত, স্বর্ণ, আবনুস

কাঠ, ইয়ামন থেকে চামড়া, আগরবাতি ও লোবান, ইরাক থেকে গরম মশলা, ভারতবর্ষ থেকে স্বর্ণ, টিন, অলঙ্কারাদি, গজদন্ত, চন্দন কাঠ, গরম মশলা, যাফরান, মিসর ও সিরিয়া থেকে বিভিন্ন রকমের তেল, খাদ্যশস্য, বিভিন্ন প্রকার পণ্যদ্রব্য, যুদ্ধাস্ত্র, রেশম ও নানা জাতের মদ ছিল এর অন্তর্ভুক্ত।

তারা কোন কোন সুলতান ও আমীর-উমারাকে মক্কার উৎপাদিত শিল্পসামগ্রী সওগাত হিসাবে প্রেরণ করত। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিশিষ্ট সামগ্রী হত চামড়াজাত। অনন্তর কুরায়শরা যখন আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশীর দরবারে ‘আবদুল্লাহ ইবন রবী‘আ ও ‘আম্র ইবনু’ল-আস ইবন ওয়াইলকে তাদের প্রতিনিধি হিসাবে পাঠায় এবং যেসব মুসলমান সেখানে হিজরত করে গিয়েছিলেন তাঁদের ফেরত আনবার জন্য চেষ্টা করেছিল তখন তারা মক্কার খাস তোহফা হিসাবে তাঁকে (সম্রাটকে) চামড়াও দিয়েছিল।

মহিলারাও বাণিজ্যিক কারবার করত এবং সিরিয়া ও অন্যান্য দেশে তাদের বাণিজ্য কাফেলা গমন করত। এ ব্যাপারে হযরত খাদীজা (রা) বিনতে খুওয়াইলিদ ও আবু জাহলের মা হানজালিয়াঃ সর্বাধিক বিখ্যাত ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলার এই এরশাদ থেকে এর সত্যতা সমর্থিত হয় :

“পুরুষ যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ এবং নারী যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ” (সূরা নিসা : ৩২ আয়াত)।

অর্থনৈতিক অবস্থা, ওজন ও পরিমাপ ব্যবস্থা

এসব কারণে মক্কা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ছিল অনেক অগ্রসর। মক্কার বাসিন্দাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা ছিল খুবই সম্পদ ও প্রাচুর্যে ভরা এবং তাদের নিকট একটা বিশেষ পরিমাণের সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়ে গিয়েছিল। কুরায়শদের বাণিজ্য কাফেলা, যা বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে সিরিয়া থেকে প্রত্যাবর্তন করছিল, এক হাজার উটসংবলিত ছিল এবং এসব উটের পিঠে পঞ্চাশ হাজার দীনার মূল্যের মাল-সামান চাপানো ছিল।

মক্কার লোকেরা রোমান, বায়জান্টাইন, ইরানী ও সাসানী মুদ্রা ব্যবহার করত। মক্কা ও জাযীরাতু’ল-আরবে তৎকালে দু’ধরনের মুদ্রা প্রচলিত ছিল। একটি ছিল দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা) এবং অপরটি ছিল দীনার (স্বর্ণ মুদ্রা)। দিরহাম ছিল দু’প্রকারঃ এক প্রকার ছিল যার ওপর পারস্যের ছবি ও মোহর ছিল। একে বলা হত “বাগলিয়া

ও সওদা দামিয়া”। দ্বিতীয় প্রকার মুদ্রা যার ওপর রোমের ছবি ছিল এবং একে বেশির ভাগ “তাবারিয়া” ও “বায়যান্টিয়া” বলা হত। এসব ছিল রৌপ্য মুদ্রা। এগুলো বিভিন্ন ওজন ও মাপের ছিল। এজন্য মক্কার লোকেরা এর সংখ্যার ওপর নয়, পরিমাপের ওপর কারবার করত। আলিমদের বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, দিরহাম, শরীয়তে যা নির্ভরযোগ্য, যবের পঞ্চান্নটি দানার সমান এবং দশ দিরহাম সাত মিছকাল স্বর্ণের সমান। আর নির্ভেজাল স্বর্ণের এক মিছকাল ৭২টি দানার সমান এবং এর ওপর (ইবন খালদূনের ভাষ্য অনুসারে) সকলেই একমত।

নবী যুগে যে মুদ্রা প্রচলিত ও যার বেশি ব্যবহার ছিল তা অধিকাংশেই ছিল রৌপ্যের। আলিমদের ভাষ্য যে, সে যুগে রৌপ্যের প্রচলন ছিল, স্বর্ণের নয় (মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বা, ৩য় খণ্ড, ২২২ পৃ.)।

দীনার সম্পর্কে যতদূর জানা যায় তা হত স্বর্ণের এবং জাহিলিয়াত ও ইসলামের প্রাথমিক যুগে সিরিয়া ও হেজাযে এর প্রচলন ছিল। এসব মুদ্রা ছিল রোমান যা রোমেই তৈরি হত এবং এর ওপর রোম সম্রাটের ছবি অংকিত থাকত। রোমক ভাষায় একে কিন্দাহ বলা হত যা ইবন ‘আবদিল-বার লিখিত ‘আত-তামহীদ’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়। দীনার শব্দটি মূলত একটি প্রাচীন রোমক মুদ্রা Denarius থেকে আরবী ভাষায় এসেছে এবং কোন কোন পাশ্চাত্য দেশে শব্দটি অদ্যাবধি প্রচলিত। ইনজীলে এর উল্লেখ কয়েকবার করা হয়েছে। দীনারের ওজন এক মিছকালের সমমানের মনে করা হত এবং খাঁটি স্বর্ণের এক মিছকাল, যেমন পূর্বেই বলা হয়েছে, মধ্যম ধরনের ৭২টি যবের দানার সমমানের ধরা হত। এটা বিখ্যাত যে, জাহিলিয়াত ও ইসলাম কোন যুগেই এতে পরিবর্তন ঘটেনি। দাইরাতু’ল-মা‘আরিফ আল-ইসলামিয়াতে বলা হয়েছে যে, বায়যান্টাইন দীনার ৪/২৫ গ্রাম-এর সমান। প্রাচ্যবিদ Zambaur-এর গবেষণাপ্রসূত সিদ্ধান্ত এই যে, মক্কার মিছকাল ৪/২৫ গ্রামের সমান হত (দ্র. দীনার শিরো. ৯থ)। দিরহাম ও দীনারের ভিতর আনুপাতিক পার্থক্য ছিল ৭/১০।

এর বিনিময় সম্পর্কে বলা যায় যে, হাদীস, ফিক্‌হ ও ইতিহাস গ্রন্থ থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে, সে যুগে এক দীনার দশ দিরহামের সমতুল্য ছিল। আবূ দাঊদ শরীফে আমর ইবন শু‘আয়ব (র) থেকে বর্ণিত আছে যে, দিয়াত (রক্তপণ)-এর মূল্য ছিল ৮০০ দীনার অথবা রাসূলুল্লাহ (সা)-র যমানায় ৮০০ দীনার অথবা ৮০০০ দিরহাম। এরপর সাহাবাগণ এরই ওপর আমল করেন, এমন কি এরই ওপর উম্মতের ঐক্যমত্য (ইজমা‘) প্রতিষ্ঠিত হয়। মশহূর হাদীসগুলোতে দিরহামের

নিসাব ও এর ওয়াজিব পরিমাণ সম্পর্কে যে স্পষ্ট বিবরণ বর্ণিত হয়েছে (জমহূর ফকীহদেরও একই অভিমত) তা থেকে পূর্ণরূপে প্রমাণিত হয় যে, স্বর্ণের নিসাব বিশ দীনার এবং এ থেকে আমরা এও জানতে পারি যে, জাহিলিয়াত যুগে ও ইসলামের সূচনায় এক দীনার-এর মূল্য দশ দিরহাম অথবা সমমানের মুদ্রার সমতুল্য ছিল।

ইমাম মালিক (র) তদীয় ‘মুওয়াত্ত্বা’ গ্রন্থে লিখেছেন, “বিশুদ্ধ মত, যে ব্যাপারে আমাদের নিকট কোন মতভেদ নেই তা এই যে, যাকাত বিশ দীনার কিংবা দু’শ’ দিরহামের ওপর ওয়াজিব।”

মাপজোখের যে তূলাদণ্ড সেই যুগে প্রচলিত ছিল তার মধ্যে ছিল সা‘, মুদ্দ, রতল, আওকিয়া ও মিছকাল। এরই মধ্য থেকে আরও কিছু নতুন প্রকার তারা বের করেছিল। অংকশাস্ত্র সম্পর্কেও তারা জানত এবং মীরাছ বণ্টনের ক্ষেত্রে কুরআনুল করীম তাদের সেই হিসাবের ওপর আস্থা রেখেছে।

কুরায়শদের ধনিক শ্রেণী

যেসব ঘরে স্বাচ্ছন্দ্য ও সম্পদের প্রাচুর্য ছিল তাদের মধ্যে বনু উমায়্যা ও বনু মাখযুম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব ব্যক্তির মধ্যে ওয়ালীদ ইবনু’ল-মুগীরা, ‘আবদুল-উযযা (আবু লাহাব), আবু উহায়হা ইবন সাঈদ ইবনি’ল-‘আস (যার আবু সুফিয়ানের কাফেলায় ত্রিশ হাজার দীনার পরিমাণ অংশীদারিত্ব ছিল), ‘আবদুল্লাহ ইবন রবী‘আ আল-মাখযুমীর মত লোক ছিলেন। এঁদের মধ্যে ‘আবদুল্লাহ ইবন জাদ‘আন আত-তায়মী সবচেয়ে মশহুর ছিলেন যাঁর সম্পর্কে কথিত আছে যে, তিনি স্বর্ণের পেয়ালায় পানি পান করতেন এবং তাঁর একটি লঙ্গরখানা ছিল যেখানে গরীব ও ক্ষুধার্ত লোকদেরকে খেতে দেওয়া হত। ‘আব্বাস ইবন ‘আবদু’ল-মুত্তালিব ছিলেন কুরায়শ ধনিকশ্রেনীর অন্যতম। তিনিও তাঁর ধন-সম্পদ প্রচুর পরিমাণে দরিদ্র লোকদের জন্য খরচ করতেন। অন্য দিকে তিনি আবার সুদী লেনদেনও করতেন। এরপর এল ইসলামের যুগ। সুদ হারাম ঘোষিত হল। রাসূলুল্লাহ (সা) বিদায়ী হজ্জ হাজ্জাতু’ল-বিদা‘তে সুদী কায়কারবার নির্মূলের ঘোষণা দিলেন এবং এর সূচনা

করলেন আপন চাচা ‘আব্বাস ইবন ‘আবদুল-মুত্তালিব থেকে এবং বললেন : প্রথম সুদ যা আমি রহিত ঘোষণা করছি তা ‘আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবের প্রাপ্য সুদ।

তাদের মধ্যে এমন সব বিলাসী আয়েশী ধনী লোকও ছিল যাদের ঘরে রাত্রিকালীন মাহ্ফিল অনুষ্ঠিত হত। ফরাশ পাতা কামরায় দস্তরখান সাজান হত, এরপর চলত শরাব পানের আসর।

গোত্রীয় নেতৃবর্গের মাহফিল জমত বেশির ভাগ বায়তুল্লাহর সামনে যেখানে কাব্য চর্চা ও কবিতা পাঠ চলত। জাহিলি যুগের বিশিষ্ট কবি যেমন লবীদ ইবন রবী‘আ এতে শরীক হতেন। এমনও উল্লিখিত আছে যে, ‘আবদু’ল-মুত্তালিবের ফরাশ কা‘বার ছায়ায় বিছানো হত। তাঁর ছেলেরা তাঁর প্রতি আদব ও শ্রদ্ধাবশত ফরাশের বাইরে চতুর্দিকে উপবেশন করত এবং যতক্ষণ তিনি আগমন না করতেন কেউ ফরাশের ওপর উপবেশন করত না।

মক্কার শিল্প ও সাহিত্য-সংস্কৃতি

মক্কার লোকদের দৃষ্টিতে শিল্প ও কৃষির খুব বেশি গুরুত্ব ছিল না, বরং এ সবকে তারা অবজ্ঞার চোখেই দেখত এবং নিজেদের জন্য লজ্জা ও অপমানকর মনে করত। তথাপি কতকগুলো শিল্প যেগুলোর প্রয়োজন তারা ভীষণভাবে অনুভব করত সেগুলো সেখানে বর্তমান ছিল এবং মক্কার কিছু কিছু লোক এর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। বর্ণিত আছে যে, হযরত খাব্বাব ইবনু’ল-আরাত (রা) তলোয়ার তৈরি করতেন। নির্মাণ প্রভৃতি কর্মে, সকলেই যার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করত, রোমক ও পারসিক শ্রমিকের সাহায্য গ্রহণ করা হত।

নিরক্ষরতা ছিল ব্যাপক। এতদসত্ত্বেও কিছু কিছু লেখাপড়া জানা লোক সেখানে ছিল। কুরআন মজীদ এজন্যই তাদেরকে “উম্মী” অর্থাৎ নিরক্ষর বলে অভিহিত করেছে।

“আর তিনিই যিনি নিরক্ষর লোকদের মধ্যে তাদেরই ভেতর থেকে একজন রাসূল পাঠালেন।”

মক্কার লোকদেরকে গোটা আরব উপদ্বীপে উত্তম রুচিসম্পন্ন, প্রকৃতিগত সৌন্দর্য ও কমনীয় সাজসজ্জাপ্রিয়তার জন্য বিশিষ্ট বলে মনে করা হত, যেমন প্রতিটি প্রাচীন সভ্যতার অধিকারী রাজধানীর ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। তাদের ভাষা সম্পর্কে যতটা বলা যায় সে ক্ষেত্রে তারা ছিল সনদ ও মানদণ্ডের অধিকারী এবং

জাযীরাতু’ল-আরবের চতুর্দিকে তাদের ওপর নির্ভর করা হত। মক্কার অধিবাসীবৃন্দ সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট ও অলঙ্কারপূর্ণ বাকশৈলীর অধিকারী কথামালার ওস্তাদ ছিল এবং নীচতা ও বাজারিপনা থেকে, অধিকন্তু অনারব প্রভাব থেকে বহু দূরে ও নিরাপদ অবস্থানে তারা অবস্থান করত। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ভারসাম্য, শারীরিক গঠন, সৌন্দর্য, পরিমিত, ভারসাম্য প্রভৃতির ক্ষেত্রেও অন্যান্য এলাকার তুলনায় তারা বিশিষ্ট ছিল। বীরত্ব ও মহানুভবতার সেই উন্নত গুণাবলীর অধিকারী ছিল যাকে আরবী ভাষায় ‘আল-ফুতুওয়া:’ ও ‘আল-মুরুওয়া:’ হিসাবে অভিহিত করা হত যার উল্লেখ আরব কবি ও বক্তাগণ বারবার করেছেন। এজন্য তারা ভাল ও মন্দ উভয় ক্ষেত্রেই সকলের ওস্তাদ ছিল।

তাদের চিত্তাকর্ষনীয় বিষয়ের মধ্যে ছিল ক্রমানুসারে বংশবৃত্তান্ত, আরবদের সংবাদ বিবরণ, কাব্য ও কবিতা, জ্যোতির্বিদ্যা, পাখির আচরণ থেকে সু ও কু-ধারণা গ্রহণ এবং কিছু পরিমাণ চিকিৎসা যা তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রবীণদের বর্ণিত বিবরণের ওপর ভিত্তিশীল ছিল। অশ্বারোহণ, অশ্বের পরিচয় জ্ঞান, দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নানা গুণের সম্পর্কে গভীর জ্ঞান, আকৃতি ও চেহারা দৃষ্টে অন্তর্নিহিত ভাব ও শুভাশুভ নিরূপণ বিদ্যার মত জ্ঞানও এর অন্তর্গত। চিকিৎসার যে সব পন্থা-পদ্ধতি তাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল তন্মধ্যে দাগ দেওয়া, নষ্ট ও পচে যাওয়া অঙ্গ কেটে বাদ দেওয়া, শিঙ্গা লাগানো ও বিভিন্ন রকমের ঔষধ ব্যবহারের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়।

সামরিক শক্তি বা যুদ্ধ-ক্ষমতা

সামরিক শক্তি সম্পর্কে বলা যায় যে, কুরায়শ স্বভাবগতভাবেই শান্তিপ্ৰিয় ও নিরাপত্তাকাঙ্ক্ষী ছিল। অপরাপর সমসাময়িক জাতিগোষ্ঠীর ন্যায় তাদের জীবন ও জীবিকার বেশির ভাগ নির্ভরতা ছিল বাণিজ্যের বিকাশ ও বিস্তার, কাফেলাসমূহের অবিরত আনাগোনা, হাট-বাজার, বাণিজ্য কেন্দ্রের সংগঠন ও ব্যবসায়ী-বণিক ও পর্যটকদের আগমনের ওপর, যদ্দারা তাদের ধর্মীয় মর্যাদা ও গুরুত্বও বৃদ্ধি পেত, অর্থনৈতিক মুনাফাও অর্জিত হত এবং সর্বপ্রকার রিযিক তথা জীবনোপকরণ বিভিন্ন দিক থেকে সেখানে গিয়ে পৌঁছত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

“অতএব তাদের উচিত সেই ঘরের প্রভু প্রতিপালকের ইবাদত করা যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় খাবার দিয়েছেন এবং ভয়ের হাত থেকে নিরাপত্তা দান করেছেন” (সূরা কুরায়শ : ৩-৪ আয়াত)।

আরবের ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে দীর্ঘ ও রক্তাক্ত যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে এবং যার পরিণতিতে (যেমন জাহিলী যুগের কবি জুহায়র ইবনে আবী সুলমা তার “মু‘আল্লাকায়” উল্লেখ করেছেন) হাজারও শিশু যাতীম, হাজারও মহিলা স্বামীহারা বিধবা হয়ে যেত, তারা যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি ও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব-প্রতিক্রিয়া থেকে অজ্ঞ ছিল না। তারা মক্কার ‘হারব আল-ফুজ্জার’ তথা অন্যায় যুদ্ধ ও মদীনার “বু‘আছ” যুদ্ধের বিভীষিকা দর্শন করেছিল যে, তা তাদের এই দু’টো শহরের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক জীবনের ওপর কী প্রভাব ফেলেছিল। এজন্য বাস্তববাদী মানুষ হিসাবে তারা আরবের অন্যান্য যুদ্ধবাজ গোত্রগুলোর মত (যাদের পেশাই ছিল যুদ্ধ) অপ্রয়োজনে যুদ্ধ ডেকে আনবার জন্য প্রস্তুত ছিল না।

অন্য কথায় আমরা এও বলতে পারি যে, কুরায়শরা (যতক্ষণ না তাদের গোত্রীয় ও ধর্মীয় মর্যাদাবোধকে কেউ চ্যালেঞ্জ করে) “নিজেও বাঁচ, অপরকেও বাঁচতে দাও” এই নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু এরই সাথে সাথে তারা সমীহ করবার মত সামরিক শক্তিরও অধিকারী ছিল। বীরত্ব ও বাহাদুরীর ক্ষেত্রে তারা ছিল প্রবাদ বাক্যের মত এবং অশ্বারোহণে ছিল একক ও অনন্য। অনন্তর الغضبة المضرية তথা ‘মুদারী ক্রোধ’ সমগ্র আরবে ছিল পরিচিত এবং তা ভাষা সাহিত্যে, উপমা ও বাগধারার অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

কুরায়শরা কেবল এই ব্যক্তিগত শক্তির ওপর সন্তুষ্ট হয়ে চুপ করে থাকেনি। তারা বরং “আহাবীশ”-এর সমীহযোগ্য শক্তি থেকে ফায়দা গ্রহণ করতে থাকে যারা মক্কার বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত কতক আরব গোত্র কিনানা ও খুযায়মা ইবন মুদরিকার জঠরে জন্ম নিয়েছিল। খুযা‘আ ছিল কুরায়শদের হালীফ তথা মিত্র গোত্র। এতদ্ভিন্ন কুরায়শদের নিকট এক বিরাট সংখ্যাক ক্রীতদাস বর্তমান ছিল যারা বিভিন্ন লড়াই সংঘর্ষে তাদের পতাকাতলে অবস্থান করত। তারা একই মুহূর্তে কয়েক হাজার যোদ্ধাকে যুদ্ধের ময়দানে পাঠাতে পারত। আহযাব (খন্দক) যুদ্ধে এই সংখ্যা দশ হাজার পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছিল। আর এটা ছিল জাহিলিয়াত যুগের ইতিহাসে আরব উপদ্বীপের সবচেয়ে বড় যোদ্ধা সংখ্যা।

মক্কা আরব উপদ্বীপের বড় শহর, আধ্যাত্মিক ও সামাজিক কেন্দ্র

এই ধর্মীয় অবস্থান ও কেন্দ্রীয় মর্যাদা, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য ও প্রাচুর্য, বাণিজ্যিক তৎপরতা এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে উন্নতির কারণে মক্কা আরব উপদ্বীপের একটি বৃহৎ শহরে পরিণত হয়েছিল এবং ইয়ামানের বিখ্যাত শহর সান‘আর সমকক্ষতার দাবি করছিল। যখন খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের মধ্যভাগে সান‘আর

ওপর পর্যায়ক্রমে আবিসিনিয়া ও ইরানের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং হীরা ও গাসসানী সাম্রাজ্যের সেই পূর্বকার শান-শওকত অপসৃত হতে থাকে তখন মক্কা আরব উপদ্বীপের এমন একটি ধর্মীয় ও সামাজিক রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে যে ক্ষেত্রে তার কোন অংশীদার ও সমকক্ষ ছিল না।

নৈতিক দিক

মক্কার নৈতিক ও চারিত্রিক দিক ছিল খুবই দুর্বল। কতিপয় জাহিলী প্রথা ও মূল্যবোধ ভিন্ন সেগুলোকে তারা নিজেদের বুকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিল। জুয়ার ছিল ব্যাপক প্রচলন এবং এ ব্যাপারে তারা গর্ব করত। মদ্যপানের সাধারণ প্রচলন ছিল। বিলাসিতা, ইন্দ্রিয় পূজা ও নাচগানের আসর জমত অধিক হারে এবং এতে মদ্যপানের ছড়াছড়ি চলত। বহু রকমের অশ্লীলতা, জুলুম-নির্যাতন, অপরের অধিকার হরণ, বেইনসাফী ও অবৈধ উপার্জনকে তাদের সমাজে খারাপ চোখে দেখা হত না।

এই নৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতনের (যা সাধারণভাাবে আরব উপদ্বীপ, বিশেষভাবে মক্কায় আমরা দেখতে পাই) সবচেয়ে সত্য ও নাযুক চিত্র তাই যা কুরায়শদেরই এক সন্তান এবং মক্কার মূল ও প্রাচীন বাসিন্দা জা‘ফর ইবনে আবী তালিব আবিসিনিয়া অধিপতি নাজাশীর সামনে পেশ করেছিলেন। সেখানে তিনি তৎকালীন আরব সমাজের ও জাহিলী কর্মকাণ্ডের ছবি এঁকেছিলেন। তাঁর বর্ণনা ছিল এইরূপ

“রাজন! আমরা ছিলাম জাহিলিয়াতের ঘোরতম তমসায় নিমজ্জিত একটি জাতি। আমরা মূর্তি পূজা করতাম, মৃত জীব ভক্ষণ করতাম, সর্বপ্রকার নির্লজ্জ কাজ করতাম, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীর সাথে খারাপ আচরণ করতাম এবং শক্তিশালী ও সবল দুর্বলকে শোষণ করত।”

ধর্মীয় দিক

ধর্মীয় দিক (নৈতিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে) আরও বেশি দুর্বল ছিল। এর কারণ ছিল এই যে, নবী যুগ থেকে তাদের দূরত্ব অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিল। মূর্খতা ছিল ব্যাপক। মূর্তি পূজা, যা তারা তাদের প্রতিবেশী জাতিগোষ্ঠীর কাছ থেকে শিখেছিল, তাদের অন্তরে আসন গেড়ে বসেছিল। মূর্তির সঙ্গে তাদের এক ধরনের ভালবাসা জন্মে গিয়েছিল। অনন্তর কেবল কা‘বার ভেতর ও প্রাঙ্গণে ৩৬০টি মূর্তি স্থান পেয়েছিল। এসবের মধ্যে সবচেয়ে বড়টির নাম ছিল ‘হুবল’

যাকে সম্বোধন করে আবূ সুফিয়ান ওহুদ যুদ্ধে বলেছিল أُعْلُ هُبَلُ -হুবলের জয় হোক। এটি কা‘বার অভ্যন্তরে একটি গড়ের ওপর স্থাপিত ছিল যার ভিতর (ভক্তদের) পেশকৃত নযরানা জমা হত। এই মূর্তি লাল আকীক পাথরের নির্মিত ছিল, মানব আকৃতিতে এর ডান হাত ছিল ভাঙ্গা। কুরায়শরা এটি এভাবেই পেয়েছিল। এর সঙ্গে তারা একটি স্বর্ণ নির্মিত হাত লাগিয়ে দিয়েছিল। কা‘বার সামনে থাকত দু’টো মূর্তি যার একটির নাম ছিল ‘ঈসাফ’, অপরটির নাম ছিল ‘নায়েলা’। একটি ছিল একে বারে কা‘বা সংলগ্ন, আরেকটি ছিল যমযমের কাছে। কুরায়শরা কা‘বা সংলগ্ন মূর্তিটাকেও অপর মূর্তিটার কাছে সরিয়ে নেয়। এটা ছিল সেই জায়গা যেখানে আরবরা কুরবানী প্রভৃতি করত। সাফা পর্বতের ওপরও একটি মূর্তি ছিল যার নাম ছিল نهيك مجاود الريح এবং মারওয়ার ওপর যে মূর্তিটি স্থাপিত ছিল তার নাম ছিল مطعم الطير।

মক্কার প্রতি ঘরেই একটি করে মূর্তি ছিল। ঘরের লোকেরা এগুলোকে পূজা করত। ‘উযযা ছিল ‘আরাফাতের নিকটবর্তী এবং এর নিকট একটি উপাসনা-গৃহ নির্মাণ করা হয়েছিল। কুরায়শদের নিকট এই মূর্তিটি সমস্ত মূর্তির তুলনায় অধিক সম্মানিত ছিল। তারা ঐসব মূর্তির সামনে তীর নিক্ষেপপূর্বক ভাগ্যের ফলাফল জানতে চেষ্টা করত। الخلصة নামক মূর্তিটি মক্কার উচ্চভূমিতে স্থাপিত ছিল। এই মূর্তিকে হার পরিধান করানো হত। যব ও গমের নযরানা একে পেশ করা হত। দুধ দিয়ে একে ধৌত করা হত। মক্কার অলিতে-গলিতে মূর্তি ফেরী করে বিক্রি করা হত। দেহাতী লোকেরা এটা পছন্দ করত, খরিদ করত, এর দ্বারা আপন ঘরের সৌন্দর্য বর্ধন করত।

এইভাবে এই জাতিগোষ্ঠী (নিজেদের সকল বীরত্ব ও সাহসিকতা, বিশ্বস্ততা, আত্মোৎসর্গ ও নিজেদের ঔদার্যমণ্ডিত আরবীয় গুণাবলী সত্ত্বেও) মূর্তি পূজা, মূর্তির প্রতি ভালবাসা ও প্রণয়াসক্তি, অদ্ভুত ও অলীক কল্পনার প্রতি আকর্ষণ, সঠিক ধর্মীয় উপলব্ধির অভাব ও অজ্ঞতা আর পবিত্রতা, স্বচ্ছ ও সূক্ষ্ম দীনে হানীফ ও মিল্লাতে ইবরাহীমী থেকে দূর ও সম্পর্কহীনতার এমন নিম্নতম পর্যায়ে অবস্থান করছিল যেখানে দুনিয়ার খুব কম জাতিগোষ্ঠীই পৌঁছে থাকবে।

এই হল খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যভাগের মক্কা যা রাসূলুল্লাহ (সা)-র আবির্ভাব এবং এর শীতল ও অন্ধকার গগন হতে ইসলাম রবি উদিত হওয়ার পূর্বে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। আল্লাহ তা‘আলা যথার্থই বলেছেন :

(এই কুরআন প্রবল পরাক্রান্তশালী ও দয়াময়ের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে) “যাতে তুমি সেই সব লোককে ভীতি প্রদর্শন করতে পার যাদের পিতা-পিতামহদেরকে সতর্ক করা হয়নি। ফলে তারা গাফিল হয়ে আছে” (সূরা ইয়াসীন : ৬ আয়াত)।