হুদায়বিয়ার যুদ্ধ (যি’ল-কা‘দাহ, ৬ হি.)

হুদায়বিয়ার যুদ্ধ
(যি’ল-কা‘দাহ, ৬ হি.)

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর স্বপ্ন এবং মক্কা প্রবেশের জন্য মুসলমানদের প্রস্তুতি

রাসূলুল্লাহ (সা) স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি মক্কায় প্রবেশ করেছেন এবং বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করছেন।

এ স্বপ্ন ছিল সত্য স্বপ্ন (رویائے صادقة), কিন্তু এতে কাল, মাস কিংবা বছরের কোন নির্ধারণ ছিল না। তিনি সাহাবায়ে কিরামকে মদীনায় এই স্বপ্নের কথা বলেন। এই সুসংবাদ শ্রবণে সকলেই আনন্দে উৎফুল্ল হন। মক্কা ও কা‘বা (যার প্রতি ভালবাসা ও সম্মানবোধ তাঁদের অস্থিমজ্জায় শামিল এবং তাদের শিরা-উপশিরায় মিশে ছিল) বহু দিন হয় তাঁদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছিল। তাঁদের হৃদয়-কন্দরে এর তাওয়াফ ও যিয়ারতের জন্য গভীর আকুতি বিরাজ করছিল এবং তাঁরা অস্থির চিত্তে সেই দিনের অপেক্ষা করছিলেন যেই দিন এই সৌভাগ্য তাঁরা আবারও লাভ করবেন। মুহাজিরদের মধ্যে মক্কার প্রতি আকর্ষণ স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত বেশি ছিল। কেননা তাঁরা সেখানেই জন্মেছিলেন, লালিত-পালিত ও বর্ধিত হয়েছিলেন এবং এর ভালবাসা তাঁদের প্রকৃতিতে মিশে গিয়েছিল। মোটকথা, দীর্ঘকাল থেকে তাঁরা এর দীদার ও যিয়ারত থেকে মাহরূম ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন তাঁদেরকে এই খবর শোনালেন তখন তাঁদের এ বিষয়ে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ হয়নি যে, এই স্বপ্নের তা‘বীর এই বছরেই বাস্তবে ফলবে। এ কথা তাঁদের আগ্রহের ধিকিধিকি আগুনকে আরও উস্কে দেয় এবং সকলেই তাঁর সঙ্গে রওয়ানা হওয়ার জন্য আগ্রহভরে রাজী হয়ে যায়। খুব কম লোকই ছিল যারা এ সফরে যেতে ইচ্ছুক ছিল না। উমরার উদ্দেশ্যে ইহরামও তিনি বেঁধে নিয়েছিলেন যাতে লোকেরা জানতে পারে যে, তিনি কেবল বায়তুল্লাহর

যিয়ারতের উদ্দেশ্যেই যাচ্ছেন।

সেখানে পৌঁছে তিনি খুযাআ গোত্রের এক গুপ্তচরকে কুরায়শদের অবস্থান ও গতিবিধি জানার উদ্দেশ্যে মোতায়েন করেন। তিনি যখন উসফান নামক একটি জায়গার নিকটবর্তী ছিলেন তখন গুপ্তচর তাঁকে অবহিত করে যে, কা’ব ইবন লুওয়াই গোত্র তাঁর মোকাবিলা করবার এবং তাঁর অগ্রাভিযান রোধ করবার জন্য আহাবীশ -কে একত্র করে রেখেছে এবং একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফৌজ সংগঠিত করেছে। তাদের ইচ্ছা, যুদ্ধ করে হলেও আপনাকে বায়তুল্লাহ পৌঁছতে তারা বাধা দেবে। রাসূলুল্লাহ (সা) অগ্রাভিযান অব্যাহত রাখলেন। তিনি যখন সেই ঘাঁটিতে গিয়ে পৌঁছলেন যেখান থেকে তাদের পানে উৎরাই শুরু হয় তখন তাঁর উটনী ‘কাসওয়া’ বসে পড়ল। এতদ্দৃষ্টে লোকে বলাবলি শুরু করল, ‘কাসওয়া বেঁকে বসেছে, কাসওয়া বেঁকে বসেছে’। রাসূল (সা) বললেন : কাসওয়া বেঁকে বসেনি, বেঁকে বসা তার অভ্যাস নয়। যিনি হাতীগুলোকে থামিয়ে দিয়েছিলেন তিনিই একেও থামিয়েছেন। কসম সেই সত্তার যাঁর হাতে আমার জান! ওই সব লোক এমন যে কোন পরিকল্পনা কিংবা প্রস্তাবই পেশ করুক না কেন, যার ভেতর আল্লাহ তা’আলার সম্মান রক্ষিত হয়েছে। আর তারা যদি আমার নিকট আত্মীয়তা সম্পর্কে দাবি জানায়, তাহলে আমি তাদের দাবি অবশ্যই পূরণ করব। অতঃপর তিনি তাঁর উটনীকে শাসাতেই উটনী লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু তার গতিপথ পাল্টিয়ে হুদায়বিয়া অভিমুখে চলতে শুরু করল এবং এর শেষ প্রান্তে পানির একটি অগভীর কুয়ার কাছে, যাতে যৎসামান্যই পানি ছিল, থেমে পড়ল। লোকে রাসূলুল্লাহ (সা)-র নিকট তাদের পিপাসার কথা জানাল। তিনি তখন তূণীর থেকে একটি তীর বের করে একে উল্লেখিত কুয়ার ভেতর নিক্ষেপ করতে বললেন। তীর নিক্ষেপ করতেই পানি প্রবল বেগে উথিত হতে লাগল। অতঃপর সকলেই তৃপ্তিভরে পানি পান করলেন।

মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশ করতে দিতে কুরায়শদের আপত্তি ও উদ্বেগ

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আগমন ও উল্লিখিত স্থানে তাঁর অবস্থানের খবর পেয়ে কুরায়শরা ভীষণ অস্থির হয়ে ওঠে এবং তারা ঘাবড়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের উদ্বেগ ও অস্থিরতা প্রশমনের নিমিত্ত সাহাবা-ই কিরামের মধ্যে থেকে কাউকে

মক্কায় পাঠানো সমীচীন মনে করলেন। এতদুদ্দেশ্যে তিনি হযরত ওমর (রা)-কে ডেকে পাঠালেন।

তিনি হাজির হলেন এবং বললেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! মক্কায় বনু আদিয়্যি ইবন কা’ব-এর একজন লোকও নেই যারা আমাকে তাদের আক্রোশ ও জিঘাংসার হাত থেকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসতে পারে। আপনি বরং উছমান (রা)-কে সেখানে যাবার জন্য বলুন। কেননা সেখানে তাঁর গোটা খানদানই বর্তমান রয়েছে এবং তিনি বার্তা বহনের দায়িত্ব বেশ ভালভাবেই আঞ্জাম দিতে পারবেন। তিনি তখন হযরত উছমান (রা)-কে ডেকে কুরায়শদের নিকট পাঠালেন এবং বললেন, তুমি গিয়ে তাদেরকে বল, আমরা যুদ্ধ করার জন্য আসিনি, আমরা ওমরাহ আদায়ের নিয়তে এখানে এসেছি। তাদেরকে ইসলামেরও দাওয়াত দেবে। তিনি তাঁকে এও বলে দিলেন, মক্কায় যে সব বিশ্বাসী (মু’মিন) নারী-পুরুষ রয়েছে তাদের কাছে গিয়ে বিজয়ের সুসংবাদ দেবে এবং তাদেরকে এ খোশ-খবরও শোনাবে যে, আল্লাহ তা’আলা মক্কায় তাঁর দীনকে বিজয়ী করবেন। ফলে তখন আর ঈমান গোপন করার প্রয়োজন থাকবে না।

প্রেম ও বিশ্বস্ততার পরীক্ষা

হযরত উছমান (রা) রওয়ানা হলেন। মক্কায় পৌঁছে তিনি আবূ সুফিয়ান ও কুরায়শ নেতৃবর্গের নিকট গেলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পয়গাম পৌঁছালেন। তিনি তাঁর বার্তা পেশ করলে হযরত উছমান (রা)-কে তারা বলল : তুমি চাইলে এই মুহূর্তে তাওয়াফ করে নিতে পার। উত্তরে তিনি বললেন : যতক্ষণ না রাসূলুল্লাহ (সা) তাওয়াফ করছেন ততক্ষণ আমি তাওয়াফ করতে পারি না।

হযরত উছমান (রা) ফিরে আসলে মুসলমানরা বলতে লাগল : আবূ আবদুল্লাহ! তুমি তো খুব মজায় ছিলে! তুমি তো তাওয়াফ করে তোমার দিলের আশা পূরণ করেছ। প্রত্যুত্তরে হযরত উছমান (রা) বললেন : তোমরা আমার সম্পর্কে অত্যন্ত খারাপ ধারণা করেছ। কসম সেই সত্তার যাঁর হাতে আমার প্রাণ! যদি আমাকে এক বছর কালও সেখানে অবস্থান করতে হত আর রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় তশরীফ নিতেন তবুও আমি ততক্ষণ পর্যন্ত তাওয়াফ করতাম না যতক্ষণ না তিনি তাওয়াফ করতেন।

কুরায়শরা আমাকে তাওয়াফ সেরে নেবার জন্য দাওয়াতও দিয়েছিল, কিন্তু আমি অস্বীকার করেছি।

বায়‘আত-ই রিদওয়ান

এদিকে রাসূলুল্লাহ (সা) খবর পান যে, হযরত উছমান (রা)-কে শহীদ করে ফেলা হয়েছে। খবর পেতেই তিনি সমবেত সকলকে বায়‘আত গ্রহণের দাওয়াত দেন। সকলেই উৎসাহ-উদ্দীপনা সহকারে তাঁর চতুর্পার্শ্বে সমবেত হন। সে সময় তিনি এক বৃক্ষতলে অবস্থান করছিলেন। তিনি তাদের থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন যে, তারা কেউ (জিহাদের ময়দান ছেড়ে) পালাবে না। রাসূলুল্লাহ (সা) স্বয়ং বাম হাত দিয়ে ডান হাত আঁকড়ে ধরেন এবং বলেনঃ এটি উছমান (রা)-এর পক্ষ থেকে। এটাই ছিল সেই বায়‘আত-ই রিদওয়ান যা হুদায়বিয়া নামক স্থানে একটি বাবলা গাছের নিচে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং কুরআন শরীফের নিম্নোক্ত আয়াতে এ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছেঃ

“আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষের নিচে আপনার কাছে শপথ করল। আল্লাহ অবগত ছিলেন যা তাদের অন্তরে ছিল। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয় পুরস্কার দিলেন” (সূরা আল-ফাতহ, ১৮ আয়াত)।

সালিশী আলোচনা ও সন্ধির প্রয়াস

এইরূপ অপরিবর্তিত পরিস্থিতিতেই হঠাৎ বুদায়ল ইবন ওয়ারা কা আল-খুযাঈ খুযাআ গোত্রের কিছু লোকসহ সেখানে পৌঁছান। তিনি এ ব্যাপারে আলোচনা করতে চান এবং তাঁর আগমনের হেতু জিজ্ঞেস করেন।

রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, আমরা কোন রকম যুদ্ধ-বিগ্রহের উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে আসি নি, আমরা কেবল ওমরার নিয়তে এসেছি। যুদ্ধ কুরায়শদেরকে আগেই চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। যদি তারা চায় তাহলে আমি তাদের সঙ্গে কিছু সময়ের জন্য সিদ্ধান্তে আসতে চাই এবং তারা আমার ও অপরাপর লোকদের মধ্যবর্তী রাস্তা ছেড়ে দেবে। আর যদি তারা চায় তাহলে তারা সেই দলেই শামিল হোক যে দলে আরও লোক শামিল হয়েছে। অন্যথায় তারা কিছু সময় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার অবকাশ তো অবশ্যই পাবে। কিন্তু তারা যদি যুদ্ধই করতে চায় এবং যুদ্ধ ব্যতিরেকে অন্য কোন কিছু কবুল করতে না চায় তাহলে সেই সত্তার কসম করে বলছি যাঁর কবজায় আমার প্রাণ! আমি এ ব্যাপারে ততক্ষণ যুদ্ধ চালিয়ে যাব

যতক্ষণ না আমার মস্তক আমার ধড় থেকে আলাদা হয়ে যায় কিংবা আল্লাহ তাঁর দীনকে বিজয়ী করেন।

বুদায়ল যখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পয়গাম তাদেরকে পৌঁছালেন তখন ওরওয়া ইবন মাসউদ আছ-ছাকাফী বললেন, তিনি তো খুবই বিচক্ষণতাসুলভ প্রস্তাব দিয়েছেন। আমার মত এই যে, তোমরা তাঁর এই প্রস্তাব মেনে নাও এবং আমাকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দাও। তারা অনুমতি দিতেই ওরওয়া ইবন মাসউদ গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে দেখা করলেন এবং আলোচনা শুরু করলেন। ওরওয়া খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আর তাঁদের অবস্থা তো ছিল এই যে, যদি রাসূলুল্লাহ (সা) থুথু ফেলতেন তাহলে কেউ না কেউ তা হাতে নিতেন এবং মুখমণ্ডল ও সর্বশরীরে তা মেখে নিতেন। তিনি কিছুর নির্দেশ দিতেই প্রত্যেক মানুষ তা পালন করতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। ওযু করলে ওযুর পানির ওপর জীবন উৎসর্গকারী এইসব ভক্তের দল এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তেন যে, মনে হত বুঝি বা লড়াই বেঁধে যায়। তিনি যখন কথা বলতেন তখন তাঁরা সকলেই তাঁর দিকে মনোযোগী হতেন। সম্মান ও আদবের কারণে কেউ তাঁর চোখের ওপর চোখ রেখে কথা বলতেন না। ওরওয়া কুরায়শদের নিকট ফিরে গিয়ে তাঁর সাথীদেরকে বললেনঃ হে আমার জাতিগোষ্ঠী! আমি রাজা-বাদশাহদের দরবারে গিয়েছি, আমি রোম, পারস্য ও আবিসিনিয়ার সম্রাটদের শান-শওকতও দেখেছি। কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি কোন বাদশাহ দেখি নি যাকে তার সভাসদ ও মোসাহেব এমন সম্মান ও আদব প্রদর্শন করে যেমনটি মুহাম্মাদ (সা)-এর সাথীরা তাঁকে করে থাকেন। এরপর তিনি সেখানে যা কিছু দেখেছিলেন তার বিস্তারিত তাদের দিলেন এবং বললেন, তিনি খুব উত্তম প্রস্তাব পেশ করেছেন। তোমরা তা মেনে নাও।

সন্ধি ও সুলেহনামা

এরই ভেতর বনী কিনানার আর এক ব্যক্তি মিকরায় ইবন হাফ্সও সেখানে গিয়ে পৌঁছান এবং উভয়েই তাদের চাক্ষুষ ঘটনাগুলো কুরায়শদের সামনে বর্ণনা করলেন। কুরায়শরা অতঃপর সুহায়ল ইবন আমরকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে প্রেরণ করল। তিনি তাকে আসতে দেখেই বললেন, তাকে আসতে দেখে মনে হচ্ছে কুরায়শরা সন্ধি করতে ইচ্ছুক। তিনি এও বললেন, তোমরা সন্ধির লিখিত দস্তাবেয তৈরি কর।

হিল্ম ও হিকমত-এর সম্মিলন

তিনি সন্ধিপত্রের মুসাবিদা তৈরির জন্য তাঁর সেক্রেটারী (হযরত আলী)-কে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, লেখ : بسم الله الرحمن الرحيم এতে সুহায়ল ইবন আমর আপত্তি তুললেন এবং বললেনঃ আমরা আল্লাহ সম্পর্কে জানলেও তাঁর রাহমান ও রাহীম হওয়া, আল্লাহ্ কসম! তাতো আমরা জানি না। সেই পুরনো দস্তুর মাফিক باسمك اللهم লেখ। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ ঠিক আছে, লেখ باسمك اللهم অর্থাৎ হে আল্লাহ! তোমার নামে। মুসলমানরা এতদ্দৃষ্টে বলে উঠলেনঃ না, আমরা তো بسم الله الرحمن الرحيم লিখব। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ باسمك اللهم ই লেখ।

এরপর তিনি বললেনঃ লেখ, এটা সেই সন্ধিপত্র যা আল্লাহর রাসূল সম্পাদন করছেন। এতদশ্রবণে সুহায়ল বললেনঃ আল্লাহর কসম! যদি আমরা বিশ্বাসই করতাম যে,আপনি আল্লাহর রাসূল, তাহলে আর আপনার বায়তুল্লাহ্ যাবার পথে কেন বাধা খাড়া করতাম? আর আপনার সঙ্গে এত যুদ্ধ-বিগ্রহই বা করতাম কেন? আপনি এর পরিবর্তে মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ লিখুন।

রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ আমি আল্লাহর রাসূল, তোমরা তা যতই অস্বীকার কর না কেন। লেখ, মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ। তিনি হযরত আলী (রা)-কে পূর্বের শব্দটি (রাসূলুল্লাহ) মুছে ফেলতে নির্দেশ দিলেন। এতে হযরত আলী (রা) বললেনঃ আল্লাহর কসম ! আমা দ্বারা তা সম্ভব হবে না। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ঠিক আছে, আমাকে জায়গাটা দেখিয়ে দাও। তাঁকে জায়গাটা দেখিয়ে দেওয়া হলে তিনি নিজেই তা মুছে দিলেন।

সন্ধি ও পরীক্ষা

রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ আল্লাহর রাসূল এই ব্যাপারটি (অর্থাৎ সন্ধি চুক্তিটি) এজন্য সম্পাদন করছেন যাতে তোমরা আমাদের ও আল্লাহর ঘরের মাঝে প্রতিবন্ধক না হও আর আমরা তা নির্বিঘ্নে তাওয়াফ করতে পারি। সুহায়ল বললেন, আমরা ভয় পাচ্ছি, না জানি আরবদের মাঝে এমন বলাবলি শুরু হয়ে যায় যে, আমরা ভয়ে এই সন্ধি চুক্তি করেছি। আগামী বছর আপনি তাওয়াফ করতে পারবেন। তিনি এই দফাটিও সন্ধি চুক্তির মাঝে শামিল করে নেন।

সুহায়ল বললেনঃ এটাও অপরিহার্য বিবেচিত হবে যদি আমাদের এখান থেকে কোন লোক আপনার ওখানে চলে যায়, চাই সে আপনার ধর্মেরই কেউ না হোক,

তবু আপনি তাকে আমাদের নিকট ফেরত পাঠাবেন। মুসলমানরা সুহায়লের এ ধরনের প্রস্তাবের কথা শুনে অদ্ভুত বিস্ময়ে বলে উঠলেনঃ সুবহানাল্লাহ ! কেউ যদি মুসলমান হয়ে আমাদের কাছে চলে আসে তাহলে তাকে আমরা মুশরিকদের নিকট কি করে সোপর্দ করতে পারি?

এ নিয়ে আলোচনা চলছিল, এমন সময় আকস্মিকভাবে সেখানে সুহায়ল পুত্র আবূ জান্দাল লোহার বেড়ি পরা অবস্থায় এসে উপস্থিত হন। তিনি মক্কার উচ্চ ভাগ থেকে এসেছিলেন এবং কোন রকম কুরায়শদের বন্দীদশা থেকে পালিয়ে মুসলমানদের অবধি এসে পৌঁছতে পেরেছিলেন। সুহায়ল বললেনঃ মুহাম্মাদ (সা)! এই প্রথম ব্যক্তি যাকে ফিরিয়ে দেবার দাবি (সন্ধি চুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে) আমি আপনার কাছে পেশ করছি। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ এখন ও তো সন্ধি পত্র লেখাও সম্পূর্ণ হয়নি। সুহায়ল উত্তর দিলেনঃ যদি তাই হয় তাহলে এরপর আমি কোন ব্যাপারেই আপনার সঙ্গে নিষ্পত্তিতে পৌঁছাতে প্রস্তুত নই। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ আমার বলায় তাকে অনুমতি দিন। সুহায়ল বললেনঃ আপনার বলায় আমি তাকে অনুমতি দিতে পারি না। রাসূলুল্লাহ (সা) তখন বললেন, ঠিক আছে, যা খুশি করুন। সুহায়ল বললেনঃ আমার কিছু করার নেই। এতদশ্রবণে আবূ জান্দাল বললেনঃ মুসলমানগণ ! আমি মুসলমান হয়ে তোমাদের কাছে এসেছি। এরপরও আমাকে মুশরিকদের নিকট সোপর্দ করা হচ্ছে। তোমরা কি দেখছ না যে, আমার সঙ্গে কী করা হচ্ছে? আল্লাহর রাস্তায় তিনি কঠিন দুঃখ-কষ্ট ও নির্যাতন সয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তার দাবির প্রেক্ষিতে তাঁকে ফিরিয়ে দিলেন। উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধির শর্ত হিসেবে এও স্থিরীকৃত হয় যে, দশ বছর পর্যন্ত উভয় পক্ষ রক্তপাত ও লড়াই-সংঘর্ষ এড়িয়ে চলবে যাতে লোকে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করতে পারে এবং কেউ কারো ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপ না করতে পারে। দ্বিতীয় বিষয় স্থিরীকৃত হয় যে, যদি কুরায়শদের কেউ তার অভিভাবকের বিনা অনুমতিতে মুহাম্মাদ (সা)-এর নিকট এসে পড়ে তাহলে তিনি তাকে ফিরিয়ে দেবেন। আর মুসলমানদের মধ্যে থেকে কেউ কুরায়শদের নিকট গিয়ে আশ্রয় নেয় তাহলে কুরায়শরা তাকে ফিরিয়ে দেবে না। অধিকন্তু কেউ চাইলে মুসলমানদের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করতে পারে, তাদের নিরাপত্তাধীনে প্রবেশ করতে পারে। আবার কেউ চাইলে কুরায়শদের সঙ্গেও মিত্রতা চুক্তি সম্পাদন করতে পারে, তাদের ছত্রছায়ায় গমন করতে পারে। এ ব্যাপারে সাধারণ অনুমতি রইল।

মুসলমানদের পরীক্ষা

মুসলমানরা যখন এই সন্ধি ও মদীনা প্রত্যাবর্তনের কথা শুনতে পেল এবং দেখল যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কিভাবে একে সহ্য করে নিলেন তখন এ বিষয়টি তাদের কাছে এতটা মর্মপীড়ার কারণ হল যে, তা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। হযরত ওমর (রা) তো সোজা হযরত আবূ বকর (রা)-এর কাছে গিয়েই হাজির। তিনি উত্তেজিতভাবে বলতে লাগলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কি আমাদেরকে একথা বলেন নি যে, আমরা বায়তুল্লাহ যাব এবং তাওয়াফ করব? এ কথা শুনে তিনি বলেন, হ্যাঁ! তিনি বলেছিলেন। কিন্তু তিনি কি তোমাদেরকে বলেছিলেন, তোমরা এ বছরই বায়তুল্লাহ যাবে এবং তাওয়াফও করবে?

সন্ধি চুক্তি সম্পাদিত হতেই রাসূলুল্লাহ (সা) কুরবানীর পশুগুলোর দিকে মনোনিবেশ করলেন এবং সেগুলো যবাহ করলেন। তিনি মাথা মুণ্ডন করলেন। মুসলমানদের জন্য এ ছিল এক বেদনাদায়ক ঘটনা। কেননা মদীনা থেকে বের হওয়ার সময় তাঁদের অন্তরে এ কল্পনা ঘূর্ণাক্ষরেও জাগেনি যে, তারা মক্কা গমনের ও ওমরাহ আদায়ের সুযোগ পাবে না। কিন্তু তারা যখন রাসূলুল্লাহ (সা)-কে কুরবানী করতে ও মস্তক মুণ্ডন করতে দেখলেন অমনি দ্রুততার সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং তাঁর অনুসরণে কুরবানী দিতে ও মস্তক মুণ্ডন করতে মশগুল হয়ে গেলেন।

অবমাননাকর সন্ধি অথবা সুস্পষ্ট বিজয়?

এরপর তিনি মদীনায় তশরীফ নেন এবং পথিমধ্যেই আল্লাহ তা‘আলা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেনঃ

“নিশ্চয় আমি তোমাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি যাতে আল্লাহ তোমার অতীত ও ভবিষ্যৎ ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন এবং তোমার প্রতি তাঁর নে‘মত পূর্ণ করেন ও তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করেন এবং তোমাকে সাহায্য করেন বলিষ্ঠ সাহায্য” (সূরা আল-ফাতহ্ ১-৩ আয়াত)।

(আয়াত শ্রবণের পর) হযরত ওমর (রা) জিজ্ঞেস করেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ! এটাই কি বিজয়? তিনি বললেন : হ্যাঁ।

ব্যর্থতার আড়ালে সাফল্যের হাতছানি

তিনি মদীনা পৌঁছতেই তাঁর নিকট আবূ বাসীর উতবা ইবন উসায়দ নামক একজন নওমুসলিম কুরায়শদের হাত থেকে পালিয়ে এসে উপস্থিত হন। কুরায়শরা তাঁর খোঁজে দু’জন লোক পেছন পেছনেই পাঠিয়ে দেয় এবং সন্ধি চুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে তাঁকে ফেরত দেবার দাবি জানায়। অনন্তর তিনি তাঁকে লোক দু’জনের নিকট সোপর্দ করেন। লোক দু’জন তাঁকে সাথে নিয়ে মক্কায় প্রত্যাবর্তনের পথে আবূ বাসীর কৌশল তাদের হাত থেকে পালাতে সমর্থ হন এবং সমুদ্র তীরবর্তী স্থানে গিয়ে আস্তানা গাড়েন। অপরদিকে আবূ জান্দাল ইবন সুহায়লও কোন কৌশলে কুরায়শদের খপ্পর থেকে পালাতে সক্ষম হন এবং আবূ বাসীরের সঙ্গে এসে মিলিত হন। এরপর অবস্থা দাঁড়াল এই যে, মক্কার কেউ মুসলমান হতেই কুরায়শদের হাত থেকে জীবন ও ঈমান বাঁচাতে পালিয়ে সোজা আবূ বাসীরের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হত। এভাবে ক্রমান্বয়ে তাঁদের একটি ক্ষুদ্র দল তৈরি হল। এরপর তাঁরা এ পথ দিয়ে সিরিয়ায় গমনাগমনকারী কুরায়শদের বাণিজ্য কাফেলা আটকাত এবং কাফেলার দ্রব্য-সম্ভার কেড়ে নিত। অতঃপর কাফেলার লোকদেরকে তাঁরা হত্যা করত। অবশেষে আর না পেরে কুরায়শরা আল্লাহর দোহাই ও আত্মীয়তা সম্পর্কের দোহাই পেড়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে আবেদন জানাল যে, তিনি যেন তাদেরকে ডেকে পাঠান। এরপর থেকে মক্কার কোন নও মুসলিম মদীনায় আঁ-হযরত (সা)-এর খেদমতে পৌঁছলে তাকে আর ফেরত দিতে হবে না, নিরাপদ শান্তিতে সে সেখানে অবস্থান করতে পারবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।

এই সন্ধি কিভাবে বিজয় ও সাফল্যে পরিবর্তিত হল?

পরবর্তীকালে সংঘটিত ঘটনাবলী প্রমাণ করে দেয় যে, হুদায়বিয়ার সন্ধি থেকেই (যেখানে রাসূলুল্লাহ সা নিজস্ব অবস্থান থেকে অনেকখানি নিচে নেমে এসে এই চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন এবং কুরায়শদের সমস্ত দাবি মেনে নিয়েছিলেন আর কুরায়শরাও একে তাদের বিরাট জিত ও লাভের সওদা বলে মনে করেছিল, পক্ষান্তরে মুসলমানরা একে তাদের ঈমাণী শক্তি ও নবীর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের প্রেরণাবলে বরদাশত করে নিয়েছিলেন) মূলত মুসলমানদের বিজয় ও সৌভাগ্যের

দ্বার উন্মোচিত হয় এবং এরই ফলে ইসলাম আরব উপদ্বীপে এত দ্রুততর গতিতে বিস্তার লাভ করে যা এর আগে আর কখনও হয়নি। এই সন্ধি মক্কা বিজয়ের দ্বারোদ্ঘাটনও করে এবং এরই পরিণতিতে রোম ও পারস্য সম্রাট, মিশর অধিপতি মুকাওকিস, আবিসিনিয়াধিপতি নাজাশী ও বিভিন্ন আরব নেতৃত্ববর্গকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করা সম্ভব হয়। আল্লাহ তা’আলা যথার্থই বলেছেন :

“আশ্চর্য নয় যে, তোমরা এক জিনিসকে খারাপ মনে করবে, অথচ তা তোমাদের পক্ষে মঙ্গলদায়ক এবং এও আশ্চর্য নয় যে, তোমরা এক জিনিসকে ভাল মনে করবে, অথচ তাই তোমাদের পক্ষে অমঙ্গলকর। আর আল্লাহ্ই ভাল জানেন, তোমরা জান না”(সূরা বাকারা, ২১৬ আয়াত)।

এই সন্ধি থেকে প্রাপ্ত সর্বোত্তম ফলাফল ও পরিণতির মধ্যে এও একটি যে, এই সর্বপ্রথম কুরায়শরা মুসলমানদের স্বতন্ত্র অবস্থান ও মর্যাদাকে স্বীকার করে নেয় এবং একটি মর্যাদাবান ও শক্তিশালী পক্ষ হিসাবে মেনে নেয় যার সঙ্গে সন্ধি করা চলে, আলোচনা করা যায় এবং তাদেরকে বৈধ স্থান দান করে। এই সন্ধি থেকে সর্বোত্তম যে ফল লাভ করা গিয়েছিল তা হল এই যে, যুদ্ধ বন্ধের ফলে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ সৃষ্টি হয় যদ্দরুন মুসলমান (যারা দীর্ঘ কাল ধরে এক অব্যাহত যুদ্ধে জড়িত ছিল যা তাদের সমগ্র শক্তি ও সামর্থ্য নিংড়ে ও শুষে নিয়েছিল) স্বস্তির নিঃশ্বাস নেবার এবং কিছুটা আরামে বসার, অধিকন্তু এই শান্তি ও স্বস্তিপূর্ণ অবকাশে পূর্ণ একাগ্রতা ও মনোযোগ সহকারে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাবার ও তাবলীগী দায়িত্ব পালনের সর্বোত্তম সুযোগ মিলে যায়।

এই সন্ধি মুসলমান ও কাফির মুশরিকদেরকে, যারা অদ্যাবধি পরস্পর সংঘর্ষরত ছিল, একে অপরের সঙ্গে মেলামেশার এবং একে অন্যকে বোঝবার মওকা এনে দেয়। এর ফলে ইসলামের সেই সব সৌন্দর্য ও গুণাবলী কাফির মুশরিকদের সামনে, যেমন শিরক ও মূর্তিপূজার অপবিত্রতা থেকে একেবারে মুক্তি, শত্রুতা, মানুষের রক্তের পিপাসা, হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের প্রতি সার্বিক ঘৃণা যা জাতীয় বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল, চারিত্রিক ও মানসিক অবস্থা ও বিপ্লব যা আঠার বছরের স্বল্প মুদ্দতে তাদের জীবনে ফুটে উঠেছিল, যারা অন্য কোন জাতির সদস্য কিংবা অপর কোন দেশের বাসিন্দা ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন তাদেরই গোত্রের ও গোষ্ঠীর সমবর্ণেরও, তাঁরা তাদেরই মত মক্কায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁদের জীবনের

একটি অংশ তাদেরই সঙ্গে ব্যয়িত হয়েছিল। তারপর এ কোন্ যাদুমন্ত্র বলে তাঁরা কয়েক বছরের মধ্যেই মাটি থেকে স্বর্ণপিণ্ডে এবং পাথর থেকে পরশ পাথরে পরিণত হলেন? ইসলামের শিক্ষা ও নবী করীম (সা)-এর সাহচর্য ব্যতিরেকে মক্কাবাসী ও মুহাজিরদের মধ্যে পার্থক্যকারী আর কোন জিনিস ছিল না। অনন্তর এই সন্ধির পর এক বছরও অতিবাহিত হয়নি এবং মক্কা বিজয়ের তখনও বাকি, এ সময় এত বিপুল সংখ্যক আরববাসী ইসলাম কবুল করে যা বিগত আঠার বছরেও করেনি।

ইমাম ইবন শিহাব যুহরী (মৃ. ১২৪ হি.) বলেন, “এর পূর্বে ইসলামের এত বড় বিজয় আর সাধিত হয়নি। উভয় পক্ষের (কুরায়শ ও মুসলিম) মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হল, যুদ্ধ বিরতি ঘোষিত হল এবং লোক নির্ভয়ে ও নির্ভাবনায় একে অপরের সঙ্গে মেলামেশা করতে লাগল, পরস্পরের সঙ্গে ওঠাবসা করতে লাগল, থাকতে লাগল, আলাপ-আলোচনার সুযোগ মিলল এবং যে কোন সমঝোদার মানুষের সঙ্গে ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা করা হল সেই ইসলামে দাখিল হল।”

“কেবল দু’বছরেই এত লোক ইসলামে দাখিল হল যতটা তখন পর্যন্ত হয়েছিল,বরং সম্ভবত তার চেয়েও বেশি।”

ইবন হিশাম বলেন, “যুহরীর মতের পক্ষে দলিল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে হুদায়বিয়ায় (জাবির ইবন আবদিল্লাহর বর্ণনা মুতাবিক) চৌদ্দশ’ সাহাবী ছিলেন আর এর দু’বছর পর মক্কা বিজয়ের সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন দশ হাজার সাহাবীর এক বিপুল সমাবেশ।”

এই যুদ্ধ বিরতি ও সন্ধির বদৌলতে সেই সব মুসলমান উপকৃত হয় যারা তাদের অপারগতা ও অসহায়ত্বের দরুন তখনও মক্কায় থেকে গিয়েছিল এবং কুরায়শদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকারে পরিণত হয়েছিল। এক আবূ জান্দালের হাতেই কুরায়শ যুবকদের এক বিরাট সংখ্যাক ইসলাম কবুল করে। ইসলামের এই নতুন দাঈ (আহ্বায়ক) ও মুবাল্লিগের তাবলীগী প্রয়াস এবং মক্কায় ইসলামের বিস্তার কাফির মুশরিকদের জন্য এক শিরঃপীড়ায় পরিণত হয়।

এইসব লোক (নও মুসলিম) আবূ বসীরের কাফেলার সঙ্গে মিলিত হয় এবং দেখতে দেখতে ইসলামের দাওয়াত, শক্তি ও শান-শওকতের এক বিরাট কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফলে তারা কুরায়শদের দুঃশ্চিন্তায় নিক্ষেপ করে। ফলে বাধ্য হয়ে

তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট আবেদন জানায় যেন তিনি তাদেরকে মদীনায় ডেকে নেন। তিনি তাই করেন। আর এভাবেই সমস্যা-সংকট আর দুঃখ-কষ্টের শিকার এইসব নওমুসলিমদের যাবতীয় দুর্ভোগের অবসান ঘটে। আর এসবই ছিল মূলতঃ এই সন্ধির বরকত ও এই যুদ্ধবিরতি চুক্তির ফল। এই সমঝোতামূলক ও শান্তিপ্রিয় আচরণ যা তিনি এ সময় দেখিয়েছিলেন, অধিকন্তু যুদ্ধের প্রতি নিস্পৃহ মানসিকতা, সন্ধির প্রতি আবেগোদ্দীপ্ত প্রেরণা, সহিষ্ণুতা ও ভারসাম্যমূলক কর্মপন্থার যে প্রকাশ তাঁর থেকে ঘটেছিল তার ফলে আরও একটি ফায়দা হয়েছিল এই যে, যে সব আরব কবিলা তখন পর্যন্ত ইসলামে প্রবেশ করেনি তারা এই নবতর ধর্ম এবং এর দাঈকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। তাদের অন্তর মানসে ইসলামের আজমত এবং এর প্রতি সেই ভক্তি-শ্রদ্ধা ও ভালবাসা সৃষ্টি হল যা এর পূর্বে ছিল না। এটি ছিল এমন এক তাবলীগী ও দাওয়াতী ফায়দা যাকে কিছুতেই মামূলী বলা চলে না, যদিও এর কোন চেষ্টা-তদবীর রাসূলুল্লাহ (সা)ও মুসলমানেরা করেন নি।

খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও আমর ইবনু’ল আস-এর ইসলাম গ্রহণ

হুদায়বিয়ার সন্ধি অন্তর রাজ্য বিজয়ী প্রমাণিত হয়। অনন্তর খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ, যিনি কুরায়শ অশ্বারোহী বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন এবং যিনি বিরাট বিরাট যুদ্ধ জয় করেছিলেন, হুদায়বিয়ার সন্ধির পরপরই ইসলাম কবুল করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে ‘সাইফুল্লাহ’ (আল্লাহর তলোয়ার) উপাধি দান করেছিলেন। আল্লাহর রাহে তিনি সর্বপ্রকার সফল, সার্থক ও সৌভাগ্যবান পুরুষ হিসেবে অভিহিত হন এবং আল্লাহ তা’আলা তাঁর হাতে সিরীয় এলাকার বিজয় দান করেন।

আমর ইবনুল আসও ছিলেন একজন বিরাট জেনারেল ও সিপাহসালার যিনি পরবর্তীকালে মিসর বিজেতা হিসাবে আবির্ভূত হন, তিনিও এ সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। উভয়ে মদীনায় হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণে সৌভাগ্যবান হন এবং উন্নত মর্যাদা লাভ করেন।