অধ্যায় বারো

ওহুদ যুদ্ধ

(শাওয়াল ৩ হি.)

নবীয়ে রহমত সা. · সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী

জাহিলী মর্যাদা বোধ ও প্রতিশোধ-স্পৃহা

বদর যুদ্ধে কুরায়শদের বড় বড় সর্দার মারা যায় এবং অবশিষ্ট ফৌজ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় মক্কার দিকে পালিয়ে যায়। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া মক্কাবাসীদের মন-মানসে তীব্র হয়ে দেখা দেয়। এই পরাজয় তাদের জন্য এক মহাদুর্ঘটনার চেয়ে কম ছিল না। অনন্তর সেই সব লোক যাদের বাপ-বেটা ও ভাই মারা গিয়েছিল তারা সকলে আবূ সুফিয়ানের নিকট গমন করে এবং তার সঙ্গে ও কুরায়শ কাফেলায় যেসব লোকের অংশ ছিল সেসব লোকের সঙ্গেও এ ব্যাপারে পরামর্শ করে এবং তাদের টাকা-পয়সায় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বিরুদ্ধে একটি নতুন যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু করে। কবিরা নিয়ম মাফিক তাদের আত্মসম্মানে ঘা দিতে শুরু করে এবং তাদের জাহিলী অহংবোধ উস্কে দেয়।

হিজরতের তৃতীয় বর্ষে শাওয়াল মাসের মাঝামাঝি কুরায়শদের এই বাহিনী পরিপূর্ণ সাজ-সরঞ্জামসহ রওয়ানা হয়। কুরায়শ যুবকদের সঙ্গে অপরাপর গোত্রের লোকেরাও ছিল যারা কুরায়শদেরকে তাদের নেতা হিসাবে গণ্য করত। তাদের সঙ্গে মহিলারাও ছিল যাদেরকে এই বাহিনীর সঙ্গে এই উদ্দেশ্যেই পাঠানো হয়েছিল যাতে পুরুষেরা তাদের কারণে পালানোর পথ বেছে না নিতে পারে।১ কুরায়শ নেতৃবর্গের সঙ্গে তাদের স্ত্রীরা ছিল। মোটের ওপর কুরায়শ বাহিনী রওয়ানা হয় এবং মদীনার সামনে গিয়ে ছাউনি ফেলে।

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অভিমত ছিল, মুসলমানরা মদীনাতেই থাকবে এবং ওদের সঙ্গে কোনরূপ লড়াই সংঘর্ষে যাবে না। যদি তারা হামলা করেই বসে তাহলে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। রাসূলুল্লাহ (সা) শহর ছেড়ে এবং মদীনার বাইরে গিয়ে তাদের সঙ্গে মোকাবিলায় যেতে পছন্দ করছিলেন না। আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর অভিমতও ছিল রাসূল (সা)-এর অনুরূপ। কিন্তু কতক মুসলমান যাঁরা বদর যুদ্ধে শরীক হতে পারেননি এবং যাদের আফসোস থেকে গিয়েছিল, তাঁরা বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি বাইরে বেরিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করুন যাতে তারা এটা বুঝতে না পারে যে, আমরা কাপুরুষতা ও দুর্বলতার কারণে বাইরে বের হচ্ছি না। এই সব লোক যখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে এ ধরনের কথাবার্তা বলছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সা) ঘরে তশরীফ নেন এবং লৌহবর্ম পরিধানপূর্বক বাইরে বেরিয়ে আসেন। এ সময় ঐ সব লোক যারা মদীনার বাইরে গিয়ে মোকাবিলার আহ্বান জানাচ্ছিল লজ্জিত হয়। তারা বলল : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আপনাকে আপনার মর্জির বিরুদ্ধে এই কাজে উদ্বুদ্ধ করেছি যা আমাদের করা উচিত নয়। যদি আপনি চান তবে তশরীফ রাখুন এবং এখানে থেকেই মোকাবিলা করুন। রাসূলুল্লাহ (সা) তখন বললেন : এটা নবীর শানের পরিপন্থী যে, যুদ্ধসাজে সজ্জিত হওয়ার পর যুদ্ধের পূর্বেই অস্ত্র রেখে দেয়।২ অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) এক হাজার সাথীসহ মোকাবিলার উদ্দেশ্যে বের হলেন। মদীনা থেকে কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর আবদুল্লাহ ইবন উবাই এক-তৃতীয়াংশ লোক নিয়ে রাসূল (সা)-কে পরিত্যাগ পূর্বক ফিরে যায়। সে বলল : আমার কথা তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন এবং যুবকদের কথা মেনে নিলেন।৩

ওহুদ প্রান্তরে

রাসূলুল্লাহ (সা) অগ্রাভিযান করত ওহুদ পর্বতের পাদদেশে (যা মদীনা মুনাওয়ারা থেকে তিন কি.মি. দূরত্বে অবস্থিত) ছাউনি ফেলেন। তিনি ওহুদ পর্বত পেছনে রাখেন এবং সেনাবাহিনীও সেই হিসাবে মোতায়েন করেন।৪ এরপর তিনি বলেন : যতক্ষণ না আমি হুকুম দেই কেউ যুদ্ধের সূচনা করবে না। এরপর তিনি নিয়ম মাফিক যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গী-সাথী ছিল ৭০০ জন। আবদুল্লাহ ইবন জুবায়র (রা)-কে তীরন্দায বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত করেন। এদের সংখ্যা ছিল ৫০ জন। তিনি তাদেরকে পরিষ্কার ভাষায় নির্দেশ দিলেন যে, তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে অশ্বারোহী বাহিনীর অগ্রাভিযান রুখবে এবং এ বিষয়ে খেয়াল রাখবে যেন তারা আমাদের পেছনে এসে হামলা না করতে পারে, চাই যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলেই থাকুক অথবা প্রতিকূলে।৫ তিনি তাদেরকে এও নির্দেশ দেন যে, তারা কোন অবস্থাতেই যেন তাদের অবস্থান পরিত্যাগ না করে এবং এই স্থান থেকে কোনমতেই যেন না সরে, যদি শত্রু মুসলিম বাহিনীকে ছোঁ মেরে তুলেও নিয়ে যায় তবুও নয়।৬

রাসূলুল্লাহ (সা) এ সময় দুটো লৌহবর্ম পরিধান করেছিলেন এবং মুস‘আব ইবন উমায়র (রা)-কে মুসলিম বাহিনীর পতাকা প্রদান করেন।

সমবয়সীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও অগ্রগামী হওয়ার প্রেরণা

রাসূলুল্লাহ (সা) কতিপয় বালককে বয়সের স্বল্পতার কারণে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরত পাঠান। হযরত সামুরা ইবন জুনদুব (রা) ও রাফে ইবন খাদীজ (রা) তাঁদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এ দু’জনের বয়স পনের বছরের বেশি ছিল না। রাফে’র পিতা রাফে’র পক্ষে সুপারিশ করতে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ছেলে রাফে খুব ভাল তীরন্দায। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর সুপারিশ কবুল পূর্বক তাকে (রাফে’কে) যুদ্ধে যোগদানের অনুমতি প্রদান করেন। এরপর সামুরা ইবন জুনদুব (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (সা)-র সামনে পেশ করা হয়। তিনিও রাফে’র সমবয়স্ক ছিলেন। তিনি তাঁকেও ফেরত পাঠান। সামুরা (রা) আরয করেন, হুজুর! আপনি রাফে’কে অনুমতি দিয়েছেন আর আমাকে ফেরত পাঠাচ্ছেন! অথচ মল্লযুদ্ধে আমি রাফে’কে হারিয়ে দিতে পারি। মল্লযুদ্ধ হল। সামুরা রাফে’কে পরাভূত করলেন আর এভাবেই তিনিও ওহুদ যুদ্ধে অংশ গ্রহণের অনুমতি লাভ করেন।৭

যুদ্ধের সূচনা

যুদ্ধ শুরু হল। উভয় পক্ষ একে অপরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। হিন্দ বিন্ত উতবা মহিলাদের মধ্যে ছিল। মহিলারা দফ বাজিয়ে পুরুষদেরকে যুদ্ধে অনুপ্রাণিত করছিল। অবশেষে যুদ্ধ প্রচণ্ডতম রূপ ধারণ করে। হযরত আবূ দুজানা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-র নিকট থেকে তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ঢুকে পড়লেন। কেউ তাঁর সামনে পড়লে আর রক্ষা ছিল না, তলোয়ারের আঘাতে দু’টুকরো হয়ে যেত।৮ এটি তৃতীয় হিজরীর শাওয়ালের ৭ তারিখের ঘটনা।

হযরত হামযা ও মুস‘আব ইবন উমায়র (রা)-এর শাহাদাত

হযরত হামযা (রা) এই যুদ্ধে বীরত্ব ও শৌর্য-বীর্যের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন এবং কুরায়শদের বড় বড় নেতৃস্থানীয় বীর পুরুষকে মৃত্যুর দুয়ারে পাঠিয়ে দেন। তাঁর সামনে দাঁড়াবার শক্তি ছিল না কারো। কিন্তু জুবায়র ইবন মুত‘ইম-এর গোলাম ওয়াহশী সুযোগের সন্ধানে ছিল। বর্শা নিক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বীকে কুপোকাত ও ধরাশায়ী করতে সে বিশেষ পারদর্শী ছিল। জুবায়র তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, সে যদি হামযাকে হত্যা করতে পারে তবে তাকে এর পুরস্কার হিসাবে মুক্তি দেওয়া হবে। তার পিতৃব্য তু‘আয়মা বদর যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। ফলে পিতৃব্যের শোক তার অন্তরে ছিল জাগরূক। অপর দিকে হিন্দ তাকে (ওয়াহশীকে) হযরত হামযা (রা)-কে হত্যা করতে উস্কানি দিচ্ছিল। সে তাঁর শাহাদাত দ্বারা তার অতৃপ্ত কলিজাকে তৃপ্ত ও শীতল করতে চাচ্ছিল। ওয়াহশী তার বর্শা তাক করে পূর্ণ শক্তিতে হযরত হামযা (রা)-র প্রতি নিক্ষেপ করে। ফলে তা তাঁর নাভীমূলে গিয়ে বিদ্ধ হয় এবং এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায়। হযরত হামযা (রা) মাটিতে নিক্ষিপ্ত হন এবং শাহাদাত বরণ করেন।৯ মুস‘আব ইবন উমায়র (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দিকে তার বুক পেতে দিয়ে লড়তে থাকেন এবং স্বীয় জীবন উৎসর্গ করেন। মুসলমানরা এই যুদ্ধে জীবন উৎসর্গের ও জানবাযীর হক আদায় করেন এবং সত্যের পথের প্রতিটি পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হন।১০

মুসলমানদের বিজয়

আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদেরকে সাহায্য করেন এবং আপন প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন। কাফির মুশরিকরা শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে এবং তাদের মহিলারা, যারা পুরুষদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করতে এসেছিল, পলায়ন করে। তাদেরকে পরিধেয় কাপড় গুটিয়ে পালাতে দেখা যাচ্ছিল।১১

পাশা উল্টাল, যুদ্ধের গতি মুসলমানদের বিরুদ্ধে গেল

কাফির মুশরিকরা পরাজিত হয়ে যখন পালাচ্ছিল এবং তাদের মহিলারাও যখন তাদের অনুসরণ করছিল তখন ঘাঁটি পাহারারত তীরন্দায়গণ এ দৃশ্য দেখে নিজেদের অবস্থান পরিত্যাগ করে এবং বাহিনীর সঙ্গে এসে মিলিত হয়। বিজয় লাভের ব্যাপারে তাঁদের নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল। তারা ময়দানে পৌঁছেই মালে গনীমত! মালে গনীমত! (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ! যুদ্ধলব্ধ সম্পদ!) এই ধ্বনি দিতে শুরু করে। এ সময় তাঁদের সেনানায়ক (আবদুল্লাহ ইবন জুবায়র) তাঁদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নির্দেশের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। কিন্তু উৎসাহ ও আবেগের আতিশয্যে তাঁরা কারো কথা শোনেনি। এখন আর মুশরিকদের পক্ষে ফিরে আসা সম্ভব নয়— এই বিশ্বাসে এই ফ্রন্ট তারা খালি করে দেয় এবং মুসলমানদের পশ্চাতে অবস্থানরত কুরায়শ অশ্বারোহী বাহিনীর রাস্তা খুলে যায়।১২ মুশরিকদের পতাকা যারা বহন করছিল তারা মারা গিয়েছিল। ভূলুণ্ঠিত পতাকার কাছে আসার কেউ সাহস পাচ্ছিল না। ঠিক এমনি মুহূর্তে কাফির মুশরিকরা পেছনে এসে ধ্বনি তুলল, মুহাম্মাদ (সা) মারা গেছেন। এতচ্ছ্রবণে মুসলিম বাহিনী অকস্মাৎ পেছনে ফিরল। ফলে কাফিরদের পক্ষে পুনর্বার হামলার সুযোগ মিলে গেল এবং এই সংকটময় মুহূর্তে থেকে তারা পুরোপুরি ফায়দা ওঠাল। মুহূর্তগুলো ছিল মুসলমানদের জন্য কঠিন পরীক্ষার। ইতোমধ্যে দুশমন রাসূলুল্লাহ (সা) পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এদের মধ্যে ‘আবদুল্লাহ ইবন কামিআ ও উতবা ইবন আবী ওয়াক্কাস নামক দুর্বৃত্তদ্বয় ছিল এক্ষেত্রে অগ্রগামী। এ সময় একটি পাথর রাসূলুল্লাহ (সা)-র পবিত্র মুখমণ্ডল আঘাত করে এবং তিনি এই আঘাতের ফলে ডান দিকে একটি গর্তে পড়ে যান, সামনের দাঁত ভেঙে যায়, মাথায় আঘাত লাগে এবং ঠোঁট রক্তাক্ত হয়ে যায়। চেহারা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। তিনি রক্ত মুছছিলেন আর বলছিলেন : সেই কওম কি করে সাফল্য লাভ করতে পারে যে তার নবীর চেহারাকে রক্তসিক্ত করতে পারে যিনি তাদেরকে তাদের প্রভুর দিকে আহ্বান জানিয়ে থাকেন?১৩

মুসলমানদের জানা ছিল না তিনি এখন কোথায়? হযরত আলী (রা) তাঁকে ঠেস দেন এবং হযরত তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ (রা) তাঁকে টেনে তোলেন। অনন্তর তিনি দাঁড়িয়ে পড়েন।১৪

আসলে এটি পলায়ন ছিল না, বরং এ ছিল সামরিক কলাকৌশলের একটি অঙ্গ যা প্রতিটি সেনাবাহিনীকে প্রয়োজন মুহূর্তে গ্রহণ করতে হয়। এরপর পরিস্থিতি সামলে নিয়ে পুনরায় আক্রমণোদ্যত হয়। মুসলমানদেরকে এ সময় পরীক্ষার যেই তিক্ত স্বাদ গ্রহণ করতে হয় এবং তাদেরকে যেই জীবন হানির সম্মুখীন হতে হয়, কয়েকজন মর্যাদাবান ও নেতৃস্থানীয় সাহাবীকে, যাঁরা ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য শক্তির উৎস এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মদদগার ও মুহাফিজ ছিলেন, শাহাদাত বরণ করতে হয়, তা সবই ছিল আসলে সেই সব তীরন্দাযদের পদস্খলন ও ভুলের পরিণতি যাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সেই স্পষ্ট নির্দেশ ও দিক-নির্দেশনাকে শেষ মুহূর্তাবধি পালন করেননি এবং নিজেদের অবস্থান পরিত্যাগ করেন যেই অবস্থানে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁদেরকে মোতায়েন করেছিলেন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

ভালোবাসা ও প্রাণোৎসর্গের নবতর দৃষ্টান্ত

হযরত আবূ উবায়দা ইবনুল-জাররাহ (রা) লৌহ শিরস্ত্রাণের একটি কড়া (যা হুযূর আকরাম-এর মাথায় ঢুকে গিয়েছিল)১৫ দাঁত দিয়ে কামড়ে তুলে ফেলেন। তা তুলতে গিয়ে তাঁর একটি দাঁতই পড়ে যায়। দ্বিতীয় কড়াটি বের করতে গিয়ে আরেকটি দাঁতও পূর্বের অবস্থা প্রাপ্ত হয়। হযরত আবূ দুজানা (রা) (কাফিরদের তীর বর্ষণের হাত থেকে রাসূলকে বাঁচাতে গিয়ে) ঢাল হিসেবে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে যান। ঝাঁকে ঝাঁকে তীর এসে পড়ছিল। কিন্তু সেই অবস্থায়ও তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-র ওপর উপুড় হয়ে ঝুঁকে পড়ে রাসূল (সা)-কে রক্ষা করতে থাকেন। তীরের আঘাতে তাঁর পিঠ চালুনির মত হয়ে যায়। সা‘দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা) সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে হুযূর (সা)-কে রক্ষা করতে গিয়ে শত্রুর ওপর তীর নিক্ষেপ করতে থাকেন। হুযূর (সা) এক একটি তীর আপন হাতে তাঁকে তুলে দিতে থাকেন এবং বলতে থাকেন : ارْمِ فِدَاكَ أَبِي وَأُمِّي তীর নিক্ষেপ করতে থাকো। তোমার জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক! কাতাদা ইবন নু‘মান (রা)-এর চোখে এমন আঘাত লাগে যে, চোখ কোটরের বাইরে বেরিয়ে আসে এবং গালের ওপর এসে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সা) আপন হস্ত মুবারক দিয়ে অক্ষি গোলকটিকে যথাস্থানে স্থাপন করে দেন। চোখটা এমনভাবে ঠিক হল যে, এর দৃষ্টিশক্তি আগের চেয়েও তীব্র হয়ে গেল।১৬

মুশরিকরা হুযূর আকরাম (সা)-এর অনুসন্ধান করছিল যে, তিনি জীবিত না মৃত? কিন্তু তকদীরে ইলাহীর ফয়সালা ছিল অন্য কিছু। তারা যখন দলে দলে হুযূর (সা)-এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল তখন প্রায় দশজন সাহাবী তাঁর সামনে আসেন এবং সকলেই একে একে হুযূর আকরাম (সা)-কে রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হন। অতঃপর হযরত তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ (রা) নিজের হাতকে সামনে বাড়িয়ে দেন এবং নিক্ষিপ্ত তীর ঠেকাতে থাকেন। এভাবে তীর ঠেকাতে গিয়ে তার হাতের আঙুলগুলো অব্যাহত জখমে রক্তাক্ত হয়ে যায় এবং হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সা) একটি পাথরের ওপর আরোহণ করতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু আহত হওয়ার দরুন তিনি বেশ দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে আরোহণ করতে কষ্ট হচ্ছিল। এতদ্দৃষ্টে হযরত তালহা (রা) হুযূর আকরাম (সা)-এর নিচে বসে গেলেন এবং তিনি তাঁকে অবলম্বন করে পাথরের ওপর আরোহণ করলেন। নামাযের সময় হলে তিনি বসে নামায আদায় করেন।১৭

এটি ছিল এমন এক মুহূর্ত যখন মুসলমানরা পরাজিত হয়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ছিল। কিন্তু আনাস ইবন নযর (রা) যিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খাদেম হযরত আনাস ইবন মালিক (রা)-এর চাচা ছিলেন, এ সময়ও পরাজয় স্বীকার করেননি। তিনি সামনে অগ্রসর হতে থাকেন। পথিমধ্যে হযরত সা‘দ ইবন মু‘আয (রা)-এর সঙ্গে তাঁর দেখা। তিনি জিজ্ঞেস করেন যে, তিনি কোথায় যাচ্ছেন? আনাস ইবন নযর (রা) বললেন : সা‘দ! আমি ওহুদ পাহাড়ের পিছন দিক থেকে জান্নাতের খোশবু পাচ্ছি।১৮ আনাস ইবন নযর (রা) আনসার ও মুহাজিরদের কিছু লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন যে, তাঁরা হাত-পা ছেড়ে দিয়ে বসে আছেন। তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এখানে বসে তোমরা কি করছ? তারা বললেন : রাসূলুল্লাহ (সা) শহীদ হয়ে গেছেন। আনাস ইবন নযর (রা) বললেন : তাঁর শাহাদাতের পর বেঁচে থেকে কি লাভ? ওঠো, যার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) জীবন দিয়েছেন তার ওপর তোমরাও জীবন দিয়ে দাও। এই বলে তিনি সামনে অগ্রসর হলেন এবং শত্রুর সঙ্গে বীর বিক্রমে লড়াই করে শহীদ হলেন। তদীয় ভ্রাতুষ্পুত্র হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) বলেন, ঐ দিন আমরা তাঁর শরীরে সত্তরটি জখম গণনা করছি। জখমের আধিক্যের কারণে তাঁকে চিনতে কষ্ট হচ্ছিল। তাঁর বোন তাঁর আঙুলের অস্থির ওপরের শৈশবের দাগ দেখে তাঁকে সনাক্ত করেন।১৯

যিয়াদ ইবনু’স-সাকান (রা) পাঁচজন আনসারসহ রাসূলুল্লাহ (সা)-কে হেফাজত করতে লড়াই করছিলেন এবং একে একে শহীদ হচ্ছিলেন, এমন কি শেষাবধি আঘাতে আঘাতে জর্জরিত ও ক্ষতবিক্ষত হয়ে তিনিও পড়ে যান। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন : তাঁকে আমার কাছে নিয়ে এস। লোকেরা তাঁকে উঠিয়ে এনে হুযূর আকরাম (সা)-এর সামনে শুইয়ে দিল। তিনি তাঁর মাথা উঠিয়ে আপন পায়ের ওপর রাখলেন। গণ্ডদেশ হুযূর (সা)-এর পদযুগলের ওপর থাকা অবস্থায় তাঁর জীবন প্রদীপ নিভে গেল।২০

‘আমর ইবনুল-জামূহ (রা) ছিলেন খঞ্জ। তাঁর ছিল চার পুত্র। সকলেই যুবক। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে কুরবানী ও আত্মোৎসর্গের প্রতিটি মুহূর্তেই উপস্থিত থাকতেন। তাঁরা যখন ওহুদ যুদ্ধের জন্য রওয়ানা হন তখন আমর ইবনুল-জামূহ (রা)-ও যাত্রার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। তাঁর পুত্ররা বলল : আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে (যুদ্ধে যোগদান থেকে) অব্যাহতি দান করেছেন। আপনি যদি ঘরেই থাকেন তাহলে ভাল হয়। আপনার পক্ষ থেকে আমরাই যথেষ্ট। আপনার ওপর জিহাদ ফরয নয়।

‘আমর ইবনুল-জামূহ (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে হাজির হলেন এবং আরয করলেন : হে আল্লাহর রাসূল! আমার ছেলেরা আমাকে জিহাদে অংশ গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখতে চাইছে। আল্লাহর কসম! আমি শাহাদাত লাভ করি এটা আমার ঐকান্তিক কামনা এবং আমি বেহেশতে এভাবেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে চাই, চলাফেরা করতে চাই। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে বললেন, আল্লাহ জিহাদ করা থেকে তোমাকে মাফ করেছেন। এরপর তিনি ছেলেদেরকে বললেন : তাকে জিহাদে যেতে দিলে তোমাদের কি-ইবা ক্ষতি হবে (সে তো তার বাসনা পূরণের সুযোগ পাবে)। অনন্তর তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-র সঙ্গে ওহুদ যুদ্ধে শরীক হন এবং তাঁর শাহাদাত লাভের আকাঙ্ক্ষাও পূর্ণ হয়।২১

হযরত যায়দ ইবন ছাবিত (রা) বর্ণনা করেন, “ওহুদ যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে সা‘দ ইবনু’র-রবী‘ (রা)-এর অনুসন্ধানে পাঠান এবং বলেন, যদি তার দেখা পাও তাহলে তাকে আমার সালাম বলবে এবং বলবে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) জানতে চেয়েছেন, এ সময় তুমি কেমন অনুভব করছ? যায়দ ইবন ছাবিত (রা) বলেন, নিহতদের লাশের ভেতর আমি তাঁকে তালাশ করলাম। এমন সময় তাঁকে এক স্থানে দেখতে পেলাম। আমি কাছে গেলাম। দেখতে পেলাম, তাঁর শেষ মুহূর্ত সমুপস্থিত। তাঁর শরীর নেযা, তলোয়ার ও তীরের সত্তরটি আঘাত ছিল। আমি বললাম : সা‘দ! রাসূলুল্লাহ (সা) তোমাকে সালাম দিয়েছেন এবং এই মুহূর্তে তোমার অবস্থা কেমন তা জানতে চেয়েছেন। জবাবে তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ (সা)-কে আমার সালাম দেবে এবং বলবে, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এক্ষণে জান্নাতের খোশবু অনুভব করছি। আর আমার কওম আনসারদেরকে বলবে, যদি শত্রু রাসূলুল্লাহ (সা) অবধি পৌঁছে যায় আর তোমাদের ধড়ে এক বিন্দু নিঃশ্বাসও বাকী থাকে তাহলে আল্লাহ তা‘আলার দরবারে তোমাদের কোন ওযর গ্রাহ্য হবে না। একথা বলতেই তাঁর প্রাণবায়ু বের হয়ে যায়।”২২

আবদুল্লাহ ইবন জাহশ (রা) ওহুদ যুদ্ধের সিলসিলায় বলেন : হে আল্লাহ! তোমার কসম, আমি কাল যেন এমন শত্রুর মোকাবিলা করি যে আমাকে হত্যা করবে, এরপর আমার পেট চিরবে এবং আমার নাক-কান কাটবে। এরপর তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করবে, এসব কি জন্য হয়েছিল? আমি জবাব দেব : তোমার জন্য।২৩

মুসলমানদের পুনরপি জমায়েত

মুসলমানরা যখন রাসূলুল্লাহ (সা)-কে চিনতে পারল তখন তারা যেন নব জীবন লাভ করল এবং আরেক বার তারা উঠে দাঁড়াল। তিনি তাদেরকে সাথে নিয়ে পুনর্বার উপত্যকার দিকে অগ্রসর হলেন। পথিমধ্যে উবাই ইবন খালাফ আঁ-হযরত (সা)-কে দেখা মাত্রই বলতে থাকে : মুহাম্মাদ! তুমি নিরাপদে থাকা পর্যন্ত আমার কল্যাণ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : ওকে আসতে দাও। অতঃপর সে একেবারে কাছে আসতেই তিনি একজন সাহাবীর কাছ থেকে নেযা নিয়ে তার গর্দানে মারলেন। আঘাত লাগতেই সে ঘোড়ার পিঠ থেকে গড়িয়ে পড়ল এবং কয়েকবার ডিগবাজি খেল।২৪ এ সময় হযরত আলী (রা) ঢাল ভর্তি করে পানি নিয়ে আসলেন এবং হুযূর (সা)-র চেহারা মুবারক থেকে রক্ত ধুয়ে পরিষ্কার করলেন। কন্যা হযরত ফাতিমা (রা) চেহারা মুবারক নিজ হাতে ধুচ্ছিলেন আর হযরত আলী (রা) ঢাল থেকে পানি নিয়ে ঢালছিলেন। হযরত ফাতিমা (রা) যখন দেখতে পেলেন যে, কোন কিছুতেই রক্তক্ষরণ বন্ধ হচ্ছে না, বরং আরও জোরে প্রবাহিত হচ্ছে তখন তিনি চাটাইয়ের একটি টুকরা পুড়িয়ে এর ভস্ম ক্ষত স্থানে লাগিয়ে বেঁধে দিলেন। এর ফলে তাৎক্ষণিকভাবে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে যায়।২৫

হযরত আয়েশা ও উম্মু সুলায়ম (রা) এই যুদ্ধে মশক ভর্তি করে কাঁধে বয়ে আহতদেরকে পানি পান করান। পানি ফুরিয়ে গেলে পুনরায় মশক ভর্তি করে পানি নিয়ে আসতেন। এভাবে বারবার পানি নিয়ে এসে তাঁদের পিপাসা মেটাতেন।২৬ উম্মু সালীত (রা) মশক পানি ভর্তি করে তাঁদের হাতে তুলে দিতেন।২৭

আবূ সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিন্তে উতবা কিছু সংখ্যক নারীসহ মুসলিম শহীদদের লাশগুলোর সঙ্গে অসম্মানসূচক আচরণ করে এবং সেগুলো কেটে কুটে বিকৃত করে। শহীদদের লাশের নাক-কান কাটতে শুরু করে। সে হযরত হামযা (রা)-র কলিজা টেনে বের করে চিবাতে থাকে, কিন্তু গলধঃকরণ করতে ব্যর্থ হয়ে উগরে দেয়।২৮

প্রত্যাবর্তনকালে আবূ সুফিয়ান পাহাড়ে আরোহণপূর্বক সজোরে ধ্বনি দিয়ে বলতে থাকেন : যুদ্ধ পাশা খেলার মত অনিয়মে ভরা। আজ এর জয় হচ্ছে তো কাল জয় হচ্ছে অন্যের। দেবতা হোবলের জয় হোক! রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : ওমর! দাঁড়িয়ে এর জবাব দাও আর বল : আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহান। তিনি ভিন্ন আর কেউ নেই।২৯ আমাদের নিহতরা জান্নাতে আর তোমাদের নিহতরা জাহান্নামে। এতচ্ছ্রবণে আবূ সুফিয়ান বললেন : لَنَا الْعُزَّى وَلَا عُزَّى لَكُمْ “আমাদের ওয্‌যা দেবতা রয়েছে আর তোমাদের ওয্‌যা নেই।”

রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : তোমরা এর জবাব দাও। সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন : আমরা এর কি জবাব দেব? তিনি বললেন : বল, اللّٰهُ مَوْلَانَا وَلَا مَوْلَى لَكُمْ “আল্লাহ আমাদের প্রভু আর তোমাদের কোন প্রভু নেই।”৩০ যখন তারা নিজেদের গন্তব্যে চলল আর মুসলমানরা তাদের নিজেদের গন্তব্য পথে চলতে শুরু করল তখন তারা পুনরায় চিৎকার করে বলে ওঠে : আগামী বছর বদর প্রান্তরে পুনরায় তোমাদের ও আমাদের মধ্যে যুদ্ধ হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) একজন সাহাবীকে বললেন, তুমি বল, হ্যাঁ, আমাদের ও তোমাদের মাঝে এই তারিখই বহাল রইল।৩১

লোকেরা আপন আপন নিহতদের জন্য শোকার্ত ছিলেন, ছিলেন বিষাদমগ্ন। তারা তাদের দাফন-কাফনে ছিলেন মশগুল। হযরত হামযা (রা)-এর শাহাদাতের বিরাট প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় রাসূলুল্লাহ (সা)-র ওপর যিনি ছিলেন আঁ-হযরত (সা)-এর চাচা ও দুধভাই এবং যিনি তাঁর জন্য সর্বদাই ঢালস্বরূপ ছিলেন।

একজন ঈমানদার মহিলার ধৈর্য

সাফিয়্যা বিনতে ‘আবদুল মুত্তালিব (রা) ছিলেন হযরত হামযা (রা)-র আপন বোন। তিনি শহীদ ভাইকে দেখার উদ্দেশ্যে আগমন করলে রাসূলুল্লাহ (সা) তদীয় পুত্র যুবায়র ইবনুল-আওয়াম (রা)-কে বলেন যে, তোমার মাকে ফিরিয়ে দাও। তাঁর ভাইয়ের লাশকে যেভাবে অসম্মান করা হয়েছে তা যেন তিনি দেখতে না পারেন। তিনি নির্দেশ মাফিক মাকে গিয়ে ফিরে যাবার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা)-র নির্দেশ জানিয়ে দিলেন। উত্তরে তিনি বলেন : তাকে ফিরে যেতে হবে কেন? আমি জানি যে, আমার ভাইয়ের লাশ বিকৃত করা হয়েছে। আর এ সবই হয়েছে আল্লাহর রাস্তায়। এজন্য আমি আল্লাহ চাহেত পুরস্কার ও ছওয়াব প্রাপ্তির আশা পোষণ করব এবং পরিপূর্ণ ধৈর্য ধারণ করব। এরপর তিনি লাশের নিকট গমন করলেন এবং শহীদ ভাইয়ের লাশ দেখলেন, ইন্না লিল্লাহ পাঠ করলেন এবং তাঁর জন্য প্রাণভরে আল্লাহর দরবারে মাগফিরাত কামনা করলেন। এরপর তিনি তাঁকে দাফন করবার নির্দেশ দিলেন এবং ওহুদের শাহাদতগাহের মাটি হল তাঁর শেষ বিশ্রামস্থল।৩২

মুস‘আব ইবন উমায়র (রা) এবং অপরাপর শহীদদের দাফন

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পতাকাবাহী হযরত মুস‘আব ইবন উমায়র (রা) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কুরায়শদের মধ্যে অন্যতম ধনীর দুলাল ছিলেন এবং আপন সৌন্দর্যপ্রিয়তা ও উত্তম বেশভূষার কারণে তিনি প্রবাদপুরুষে পরিণত হয়েছিলেন। শাহাদাত লাভের পর তাঁর ভাগ্যে একটি মাত্র কাফনের কাপড় জুটেছিল যা দৈর্ঘ্যে এতই ছোট ছিল যে, মাথা ঢাকতে গেলে পায়ের পাতা অনাবৃত হয়ে যায় আর পায়ের পাতা ঢাকতে গেলে মাথা উদলা হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) এতদ্দৃষ্টে বললেন : তাঁর মাথা ঢেকে দাও আর পায়ের পাতা ইযখির ঘাস দিয়ে ঢেকে দাও।৩৩

রাসূলুল্লাহ (সা) দুই দু’জন শহীদকে একই কবরে দাফনের নির্দেশ দেন। তিনি বলতেন, কুরআন মজীদের ইলম ও হেফজ-এর ক্ষেত্রে কার ভাগ বেশি? এরপর যার দিকে ইশারা করা হত তিনি সর্বপ্রথম তাঁকে কবরে নামানোর জন্য বলতেন এবং বলতেন যে, আমি কেয়ামতের দিন তাঁদের সাক্ষী হব। তিনি শহীদদেরকে আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় দাফন করবার নির্দেশ দেন।৩৪ তাঁদের জানাযা যেমন পড়া হয়নি, তেমনি তাঁদের গোসলও দেওয়া হয়নি।৩৫

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জন্য মহিলা সাহাবীর আত্মোৎসর্গ

মুসলমানগণ মদীনায় পৌঁছবারকালে বনী দীনার গোত্রের এক মহিলার বাড়ীর পাশ দিয়ে যেতে হয়। এই মহিলার স্বামী বাপ-ভাই সকলেই যুদ্ধে শহীদ হয়ে গিয়েছিলেন। মুসলমানরা তাঁকে এসব খবর দিতেই তিনি বলে ওঠেন : আগে তো বল, রাসূলুল্লাহ (সা) কেমন আছেন?

লোকেরা উত্তরে জানাল, তোমার ঐকান্তিক আরজ মাফিক হুজুর (সা) সহীহ-সালামতেই আছেন। মহিলা তখন বলতে লাগলেন : আমাকে দেখাও। আমি তাঁকে স্বয়ং দেখতে চাই। লোকেরা হুজুর (সা)-এর দিকে ইশারা পূর্বক দেখিয়ে দিতেই মহিলাটি সেদিকে গেলেন এবং হুজুর (সা)-এর চেহারা মুবারক দৃষ্টে বলে উঠলেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি সহীহ সালামতে থাকলে আর সকল মুসীবতই তুচ্ছ।৩৬

আত্মোৎসর্গ ও আনুগত্যের একটি দৃষ্টান্ত

এদিকে দ্বীনের দুশমন ও কাফির মুশরিকরা একে অপরকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করতে শুরু করল এবং বলতে লাগল : তোমরা কিছুই করতে দিলে না। তোমরা একদিকে তো তাদের শক্তি ও শৌর্য-বীর্যকে আহত করেছ, তাদের জোর ভেঙেছ, এরপর তাদেরকে পুরোপুরি দমন না করেই তাদেরকে ছেড়ে দিলে? (অতএব এবার মুসলমানদেরকে পুরোপুরি ধ্বংস সাধন মানসে তারা পুনরায় মদীনা আক্রমণের দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করে)। রাসূলুল্লাহ (সা) এ সংবাদ পেতেই সাহাবীদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, এখনই দুশমনকে পশ্চাদ্ধাবন করতে হবে। এ ছিল এমন এক মুহূর্ত যখন মুসলমানরা আঘাতে আঘাতে জর্জরিত। পরদিন রবিবার ভোরবেলা তাঁর ঘোষক ঘোষণা দিল যে, সকলে যেন শত্রুর পশ্চাদ্ধাবন করতে বেরিয়ে পড়ে। সাথে সাথে এ ঘোষণাও প্রদান করা হয় যে, এই পশ্চাদ্ধাবনে কেবল তারাই শরীক হবে যারা গতকাল এই যুদ্ধে শরীক ছিল। এদিকে অবস্থা তো ছিল এই যে, এমন একজন মুসলমানও এমন ছিলেন না যিনি কোন না কোনভাবে আহত না হয়েছেন, কোন না কোন প্রকার তকলীফের শিকার না হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা সকলেই অবনত মস্তকে রাসূলুল্লাহ (সা)-র সঙ্গে রওয়ানা হয়ে গেছেন। তাঁদের মধ্যে এমন একজনও ছিলেন না যিনি পেছনে থেকেছেন। সকলেই মদীনা থেকে আট মাইল দূরে হামরাউল আসাদ নামক স্থানে পৌঁছে অবস্থান নেন এবং সোমবার, মঙ্গলবার ও বুধবার মোট তিন দিন অবস্থান করেন। এরপর তিনি মদীনা প্রত্যাবর্তন করেন।৩৭

আল্লাহ তা‘আলা আনুগত্যের এই প্রেরণা ও রাসূল (সা)-এর নির্দেশ অবনত চিত্তে ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে মেনে নেবার কথা তাঁর অবিনশ্বর গ্রন্থে এভাবে বর্ণনা করেছেন :

প্রাণের থেকেও প্রিয়

হিজরতের তৃতীয় বছরে ‘আযল ও ক্বারা গোত্রের লোকেরা রাসূল (সা)-এর খেদমতে দরখাস্ত পেশ করে যে, তাদেরকে এমন কিছু লোক দেওয়া হোক যাঁরা তাদেরকে দীনের তা‘লীম দিতে পারেন। রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবায়ে কিরামের মধ্য থেকে ছয়জনের একটি দল এই কাজের জন্য পাঠান যাঁদের ভেতর হযরত আসেম ইবন ছাবিত, খুবায়ব ইবন ‘আদী ও যায়দ ইবনুদ-দাছিন্না (রা)-ও ছিলেন। তাঁরা ‘রাজী’ নামক স্থানে পৌঁছলে (‘রাজী’ উসফান ও মক্কার মাঝে অবস্থিত) গোত্রের লোকেরা গাদ্দারী করে এবং বলে, আমরা আল্লাহর সামনে প্রতিজ্ঞা করছি যে, আমরা কাউকে জানে মারব না। কিছু মুসলমান বললেন, আমরা মুশরিকদের কোন অঙ্গীকার কবুল করি না। তাঁরা মোকাবিলা করেন এবং শহীদ হন। যায়দ ইবনুদ-দাছিন্না, খুবায়ব ইবন ‘আদী ও ‘আবদুল্লাহ ইবন তারিক (রা) অস্ত্র সংবরণ করেন। তাঁদেরকে বন্দী করা হয়। ‘আবদুল্লাহ ইবন তারিক (রা)-কে পথিমধ্যে শহীদ, খুবায়ব ইবন ‘আদী ও যায়দ ইবনুদ-দাছিন্না (রা)-কে তারা মক্কার কুরায়শদের নিকট বিক্রি করে দেয়। খুবায়ব (রা)-কে হুজায়র ইবন আবী ইহাব ক্রয় করে তার বাপ ইহাবের হত্যার বিনিময়ে হত্যা করার উদ্দেশ্যে। যায়দ ইবনুদ-দাছিন্না (রা)-কে সাফওয়ান ইবন উমায়্যা তার পিতা উমায়্যা ইবন খালাফ-এর বদলি হিসাবে ক্রয় করে। যায়দ (রা)-কে হারাম শরীফের বাইরে হত্যার জন্য যখন নিয়ে যাওয়া হয় তখন সেখানে কুরায়শদের বহু লোক সমবেত ছিল। এদের মধ্যে আবূ সুফিয়ানও ছিলেন। তিনি হযরত যায়দ (রা)-কে বলেন : যায়দ! আমি তোমাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, তুমি কি এটা পছন্দ করবে যে, তুমি আরামে নিজের ঘরে ফিরে যাও আর তোমার জায়গায় মুহাম্মাদ (সা) হোক। হযরত যায়দ (রা) উত্তর দিলেন : আমি তো এও পছন্দ করি না যে, আমি আরামে ঘরে থাকি আর মুহাম্মাদ (সা)-এর পায়ে একটি কাঁটাও ফুটুক। এরপর আবূ সুফিয়ান মন্তব্য করেন, আমি কাউকে কোন লোককে এত ভালবাসতে দেখিনি যতটা ভালবাসে মুহাম্মাদ (সা)-কে তাঁর সঙ্গী-সাথীরা। এরপর তাঁকে শহীদ করে দেওয়া হয়।৩৮

এসব লোক হযরত খুবায়ব (রা)-কে যখন শূলে চড়াবার উদ্দেশ্যে নিয়ে এল তখন তিনি বললেন, যদি তোমরা এতে কিছু মনে না কর তবে তোমরা আমাকে দু’রাক‘আত সালাত আদায়ের অনুমতি দাও। তারা বলল : হ্যাঁ, পড়তে পার। তিনি দু’রাক‘আত সালাত অত্যন্ত প্রশান্তি ও পূর্ণ আদব সহকারে আদায় করলেন। অতঃপর তাদের দিকে ফিরে তিনি বললেন, যদি আমার এই ধারণা না হত যে, তোমরা একে (আমার সালাত আদায়কে) মৃত্যু ভয়ের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবে তাহলে আমি আরও সালাত আদায় করতাম। এরপর তিনি নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করেন :

فَلَسْتُ أُبَالِي حِينَ أُقْتَلُ مُسْلِمًا
عَلَى أَيِّ شِقٍّ كَانَ فِي اللّٰهِ مَصْرَعِي
وَذَلِكَ فِي ذَاتِ الْإِلَٰهِ وَإِنْ يَشَأْ
يُبَارِكْ عَلَىٰ أَوْصَالِ شِلْوٍ مُمَزَّعِ

“আমি যখন ইসলামের জন্য নিহত হচ্ছি তখন আমার আর এ ব্যাপারে কোন পরওয়া নেই আল্লাহর রাস্তায় কোন দিকে কাৎ হয়ে আমি জীবন দিচ্ছি। যা কিছু হচ্ছে নির্ভেজাল আল্লাহর জন্যই হচ্ছে। যদি তিনি চান তবে আমার ছিন্নভিন্ন ও কর্তিত দেহের ওপর বরকত নাযিল করবেন।”

এই কবিতা আবৃত্তি করতে করতেই তিনি সত্যের পথে শহীদ হলেন।৩৯

বী’র মা‘ঊনার ঘটনা

রাসূলুল্লাহ (সা) আমের ইবন মালিকের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত ও তবলীগের উদ্দেশ্যে একটি জামা‘আত পাঠান। এতে ৭০ জন সর্বোত্তম ও নির্বাচিত মুসলমান শামিল ছিলেন। জামা‘আত যথাসময়ে রওয়ানা হয় এবং বী’রে মা‘ঊনা নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে। এখানে বনী সুলায়ম-এর ‘উসায়্যা, রি‘ল ও যাকওয়ান গোত্র একত্র হয়ে গোটা কাফেলাকে ঘিরে ফেলে। কাফেলার লোকেরা এতদ্দৃষ্টে তলোয়ার হাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং সকলেই শাহাদাত বরণ করেন। কেবল কা‘ব ইবন যায়দ (রা) ভাগ্যক্রমে প্রাণে রক্ষা পান যিনি পরবর্তীকালে খন্দক যুদ্ধে শাহাদাত লাভ করেন।৪০

একজন শহীদের অন্তিম বাক্য যা ঘাতকের ইসলাম গ্রহণের উপলক্ষ ছিল

এই অভিযানে হযরত হারাম ইবন মিলহান (রা) শহীদ হন। তাঁকে জাব্বার ইবন সুলমা হত্যা করেন। হারাম ইবন মিলহান (রা) ইন্তিকালের সময় যেই বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন তাই তাঁর ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়। জাব্বার স্বয়ং বর্ণনা করেন, আমাকে যে জিনিস ইসলামের দিকে টেনে এনেছিল তা ছিল এই: আমি তাঁদের একজনের দুই কাঁধের মাঝখানে বল্লম নিক্ষেপ করি। দেখতে পেলাম বল্লম তাঁর বক্ষদেশ ভেদ করেছে। এ সময় তাঁর মুখ দিয়ে এই বাক্য উচ্চারিত হয়, فُزْتُ وَرَبِّ الْكَعْبَةِ، فُزْتُ وَرَبِّ الْكَعْبَةِ “কা‘বার প্রভু প্রতিপালকের কসম! আমি কামিয়াব হয়ে গেছি, হয়েছি সফলকাম।” আমি বিস্ময়ের সঙ্গে মনে মনে বললাম, “এ কী ধরনের কামিয়াবী! আমি কি তাঁকে হত্যা করিনি?” পরে আমি বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে গিয়ে জানতে পারলাম যে, এর অর্থ ছিল শাহাদাত লাভ যা ছিল তাঁর সফলতা লাভের কারণ। আমি বললাম : আল্লাহর কসম! তিনি সফলকাম হয়েছেন। আর এ বাক্যই তাঁর ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়।৪১

বনু নাদীরের নির্বাসন

রাসূলুল্লাহ (সা) একদা নাদীর গোত্রের নিকট গমন করেন। বনু নাদীর ছিল ইয়াহূদীদের সবচেয়ে বড় গোত্র। সেখানে গিয়ে তিনি তাদের নিকট বনী আমের-এর দু’জন নিহত ব্যক্তির রক্তপণের ক্ষেত্রে সাহায্য কামনা করেন। তাদের ও বনী আমের-এর মধ্যে পারস্পরিক মৈত্রী চুক্তি ছিল। তারা এ সময় নবী করীম (সা)-এর সঙ্গে খুবই মিষ্টি বাক্য বলে এবং খুবই আশা-ভরসার বাণী শোনায়, কিন্তু পর্দার অন্তরালে ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে।

রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের একটি ঘরের দেওয়াল সংলগ্ন জায়গায় বসা ছিলেন। তাঁকে এ অবস্থায় দেখে নিজেদের মধ্যে তারা বলাবলি করতে লাগল, এ রকম সুযোগ তোমরা আর কখনো পাবে না। যদি আমাদের একজন উপরে উঠে একটি ভারী পাথর তাঁর মাথার ওপর ফেলতে পার তবে আমরা চিরতরে তাঁর হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারি। হুযূর আকরাম (সা)-এর সঙ্গে এ সময় কয়েকজন সাহাবা বর্তমান ছিলেন। এঁদের মধ্যে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক, হযরত ওমর ও হযরত আলী (রা)-ও ছিলেন।

আল্লাহ তা‘আলা ওহী মারফত তদীয় রাসূলকে দুশমনের এই নাপাক অভিপ্রায় সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি তক্ষুণি সেখান থেকে উঠে পড়েন এবং মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। মদীনায় উপস্থিত হতেই সমর প্রস্তুতিতে মশগুল হন এবং তাদের মোকাবিলার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। তিনি সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তাদের গোত্রে গিয়ে ছাউনি ফেলেন। এ ঘটনা ছিল ৪র্থ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসের। তিনি ছয় রাত পর্যন্ত তাদেরকে অবরোধ করে রাখেন। তাদের অন্তরে আল্লাহ তা‘আলা এতটা ভীতি সৃষ্টি করেন যে, তারা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট আবেদন জানায়, আপনি আমাদেরকে এই শর্তে এখান থেকে অন্যত্র যাবার অনুমতি দিন যে, আমাদের জীবনের নিরাপত্তা থাকবে। যতটা পারি উট নিয়ে যেতে পারব। অবশ্য সাথে তারা কোন প্রকার অস্ত্রশস্ত্র নিতে পারবে না। তিনি তাদের আবেদন উল্লেখিত শর্তে কবুল করেন। ফলে তারা তাদের সকল আসবাবপত্র ও রসদ-সম্ভার যতটা উটের পিঠে চাপিয়ে নেওয়া সম্ভব ছিল নিয়ে যায়। অতঃপর এ দৃশ্যও দেখা যায় যে, একজন মানুষ তার সমস্ত ঘর-বাড়ী নিজের হাতেই ভাঙছে, ধসিয়ে দিচ্ছে এবং যতটা সামান উটের পিঠে চাপানো সম্ভব চাপিয়ে রওয়ানা হচ্ছে।৪২

এ যুদ্ধ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলার নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন :

তাদের মধ্যে থেকে কিছু লোক খায়বারে গিয়ে বসতি স্থাপন করে, কিছু লোক সিরিয়া পানে গমন করে, আর মুসলমানরা এর ফলে ধোঁকা ও প্রতারণা, ষড়যন্ত্র ও মুনাফিকীর এক বিরাট বড় আড্ডা থেকে নিষ্কৃতি পায়, অথচ লড়াই-সংঘাতের প্রয়োজনও পড়ল না। وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ “যুদ্ধে মু’মিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।” তাদের নির্বাসনের পর রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের সকল ধন-সম্পদ প্রথম দিককার মুহাজিরদের মধ্যে বণ্টন করে দেন।

যাতু’র-রিকা‘ যুদ্ধ

হি. চতুর্থ বছরে রাসূলুল্লাহ (সা) নজদ এলাকা অভিমুখে জিহাদের উদ্দেশ্যে মুখ ফেরালেন। বনী মুহারিব ও বনী ছা‘লাবা (গাতাফান গোত্র)-কে কিছুটা শিক্ষা দেওয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য। তিনি রওয়ানা হয়ে ‘নাখ্ল’ নামক স্থানে অবতরণ করেন। আবূ মূসা আল-আশ‘আরী (রা) বলেন, “আমাদের ছয় জনের মধ্যে একটি মাত্র উট ছিল। ফলে পদব্রজে চলতে গিয়ে সকলের পায়ে ফোস্কা পড়ে যায় এবং পায়ের নখ পর্যন্ত উপড়ে যায়। এই কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য লোকে নিজেদের পায়ে পট্টি বেঁধে নেয়। এজন্য এ যুদ্ধ গাযওয়া যাতু’র-রিকা অর্থাৎ পট্টিওয়ালা যুদ্ধ নামে খ্যাতি লাভ করে।”৪৩

উভয় পক্ষ একে অপরের নিকটবর্তী হয়। কিন্তু পরিণতি যুদ্ধ অবধি গড়ায়নি। লোকে একে অন্য থেকে ভীত ছিল। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা) সালাতু’ল-খাওফও আদায় করেন।৪৪

এই মুহূর্তে তোমাকে কে বাঁচাতে পারে?

এই যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনকালে রাসূলুল্লাহ (সা) দুপুর বেলা একটি বাবলা গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেন। এ সময় সাহাবায়ে কিরাম পাশাপাশি অন্যান্য বৃক্ষের তলায় আরাম করবার জন্য চলে যান। আর তিনি নিজে আপন তলোয়ারখানা গাছের ডালে লটকিয়ে এর ছায়ায় আরাম করতে থাকেন।

হযরত জাবির (রা) বর্ণনা করেন, ইতোমধ্যে আমাদের ঘুম পেয়ে গেল। আমরা কিছুটা ঘুমিয়েছি এমন সময় আমরা অনুভব করলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে ডাকছেন। আমরা গিয়ে দেখি যে, এক বেদুইন তাঁর পাশে বসা। তিনি বললেন, আমি শুয়ে ছিলাম। এমন সময় সে এই তলোয়ার হাতে উঠিয়ে নেয়। আমি চোখ মেলতেই দেখতে পেলাম সে আমার মাথার উপর তলোয়ার উঁচিয়ে রেখেছে। সে আমাকে বলল : এখন (আমার হাত থেকে) তোমাকে কে বাঁচাতে পারে? আমি বললাম : আল্লাহ। এই দেখ, এখন বসে আছে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে কোন সাজা দেননি।৪৫

সংঘর্ষবিহীন যুদ্ধাভিযান

হিজরী ৪র্থ বছরে শা‘বান মাসে রাসূলুল্লাহ (সা) বদরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। আবূ সুফিয়ান পূর্বেই তারিখ নির্ধারিত করেছিলেন। তিনি সেখানে পৌঁছে ছাউনি ফেলেন, আট রাত সেখানে অবস্থান করেন এবং আবূ সুফিয়ানের অপেক্ষায় থাকেন। আবূ সুফিয়ানও মোকাবিলার উদ্দেশ্যে বের হন, কিন্তু ফিরে যাবার মধ্যেই তিনি কল্যাণ দেখতে পান। তিনি তাঁর লোকদেরকে বলেন, এটা শুষ্ক ও দুর্ভিক্ষের বছর। আমার ফিরে যাবার ইচ্ছা আর তোমাদেরও ফিরে যাওয়াই ভাল। মোটের ওপর লড়াই-সংঘর্ষ পর্যন্ত আর গড়ায়নি। আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদেরকে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য থেকে নিরাপদ রাখেন।

দুমাতু’ল জান্দাল অভিযানেও যুদ্ধের প্রয়োজন দেখা দেয়নি। তিনি নিরাপদেই মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।৪৬

টীকা

  1. ১সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৬০-৬২।
  2. ২সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৬৩।
  3. ৩প্রাগুক্ত, ৬৪ পৃ.।
  4. ৪যুদ্ধক্ষেত্রের সঠিক অবস্থান ও সামরিক কৌশল অনুধাবনের জন্য ড. মুহাম্মদ হামীদুল্লাহর গ্রন্থ “নববী যুগের যুদ্ধক্ষেত্র” পাঠ করুন।
  5. ৫সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৬৬ পৃ.।
  6. ৬যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৩৪ পৃ.।
  7. ৭সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৬৬ পৃ.।
  8. ৮প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৭-৬৮।
  9. ৯সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৭০-৭২; পুরো ঘটনা স্বয়ং ওয়াহশীর ভাষায় বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে। দেখুন ওহুদ যুদ্ধ, হামযা হত্যা প্রসঙ্গ।
  10. ১০প্রাগুক্ত, ৭৩।
  11. ১১ঐ, ৭৭।
  12. ১২যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৩৫০ পৃ.।
  13. ১৩সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৭৮-৮০ পৃ.।
  14. ১৪প্রাগুক্ত।
  15. ১৫সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৮০-৮২ পৃ.; বুখারী ওহুদ যুদ্ধ সম্পর্কিত অধ্যায় إذ همت طائفتان منكم ان تفشلا শীর্ষক অধ্যায়।
  16. ১৬সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৮২ পৃ.।
  17. ১৭প্রাগুক্ত, ২য় খণ্ড, ৭৬ পৃ. ও যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৩৫০ পৃ.।
  18. ১৮প্রাগুক্ত, আসল বর্ণনা বুখারী ও মুসলিমে।
  19. ১৯সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৮৩ পৃ.।
  20. ২০প্রাগুক্ত, ৮১ পৃ.; এতদুপলক্ষে মাওলানা শিবলী নু’মানী “সীরাতুন্নবী”-তে ফারসীতে ও কাযী মুহাম্মদ সুলায়মান মনসুরপুরী “রাহমাতুল’লিল-আলামীন” গ্রন্থে উর্দুর এক একটি নির্বাচিত কবিতা উদ্ধৃত করেছেন যদ্দ্বারা ঘটনার চিত্রাংকন করা হয়েছে যার চেয়ে উত্তম চিত্র উদ্ধৃত করা কঠিন।
  21. ২১যাদু’ল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৩৫৩ পৃ.।
  22. ২২প্রাগুক্ত।
  23. ২৩প্রাগুক্ত।
  24. ২৪সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৮৪ পৃ.।
  25. ২৫সহীহ বুখারী, ওহুদ যুদ্ধ, ما اصاب النبي ﷺ من الجرح يوم احد এবং সহীহ মুসলিম, ওহুদ যুদ্ধ শীর্ষক অধ্যায়; কিছুটা পার্থক্যসহ ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৮৫ পৃ. ও যাদুল-মা‘আদ; এ (৩৫২, ১খ)।
  26. ২৬বুখারী, ওহুদ যুদ্ধ, اذ همت طائفتان منكم ان تفشلا ও মুসলিম, পুরুষদের সঙ্গে মেয়েদের যুদ্ধে গমন অধ্যায়।
  27. ২৭বুখারী।
  28. ২৮সীরাত ইবন হিশাম (২:৯১)।
  29. ২৯প্রাগুক্ত, এ (২:৯৩)।
  30. ৩০সহীহ বুখারী, ওহুদ যুদ্ধ শীর্ষক অধ্যায়।
  31. ৩১সীরাত ইবনে হিশাম, (২:৯৪)।
  32. ৩২সহীহ বুখারী, ওহুদ যুদ্ধ।
  33. ৩৩প্রাগুক্ত।
  34. ৩৪সহীহ বুখারী من قتل من المسلمين يوم احد শীর্ষক অধ্যায়।
  35. ৩৫শহীদদের গোসল না দেওয়া সম্পর্কে কোন মতভেদ নেই। তাঁদেরকে রক্তমাখা অবস্থায় দাফন করা হয়ে থাকে যাতে তাঁরা এই অবস্থায় আল্লাহর দরবারে পৌঁছতে পারেন। অবশ্য তাঁদেরকে জানাযা দেওয়া হবে কিনা সে সম্পর্কে ইমামদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালিক, শাফিঈ ও আহমদ ইবন হাম্বল (র)-র মতে জানাযা আদায় করা হবে না। ইমাম আবু হানীফা (র) ও অপরাপর ইমাম (যেমন আওযাঈ, সুফিয়ান ছওরী ও ইসহাক ইবন রাহওয়ায়হ)-এর মতে শহীদদের জানাযা আদায় করা হবে। ইমাম আহমদ (র)-এরও একটি মত এইরূপ। তাঁদের দলীল সেই বর্ণনা যে সব বর্ণনায় ওহুদের শহীদের জানাযা পাঠ করবার উল্লেখ রয়েছে। স্বয়ং উকবা ইবন আমের (রা) থেকে ইমাম বুখারী প্রমুখ বর্ণনা করেছেন যে, আঁ-হযরত (সা) একদিন ওহুদে গমন করেন এবং তিনি সেখানে শহীদদের তেমনি জানাযা নামায আদায় করেন যেমনভাবে মৃতদের জন্য আদায় করা হয় (বুখারী, কিতাবুল জানাইয)। বিস্তারিত জানতে চাইলে দেখুন শরহু মা‘আনিল-আছার, তাহাবী, বাবুস-সালাত আলা’শ-শুহাদা ও ইমাম যায়লাঈকৃত নাসবুর রায়াহ্; বাব আহাদীছ’স-সালাত ‘আলা’শ-শুহাদা।
  36. ৩৬সীরাত ইবন হিশাম।
  37. ৩৭সীরাত ইবন কাছীর, ৩য় খণ্ড, ৯৭ পৃ.।
  38. ৩৮ইবন ইসহাক বর্ণিত, ইবন হিশাম, ২/১৭৪।
  39. ৩৯বিস্তারিত দেখুন সীরাত ইবন হিশাম, ২/১৬৯-৭৬; সহীহ বুখারী, কিতাবুল-মাগাযী, বাবু’ত-তাওহীদ ওয়াল-জিহাদ; ইবন কাছীর, ২/১২৩-২৫।
  40. ৪০বুখারী, মুসলিম ও সীরাত ইবন হিশাম।
  41. ৪১এই ঘটনা বুখারীতে কিতাবুল-মাগাযীর রাজী যুদ্ধের অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে; ইবন হিশাম, ২/১৮৭।
  42. ৪২সীরাত ইবন হিশাম, ২খ., ১৯০-১।
  43. ৪৩সহীহ বুখারী, হযরত আবূ মূসা আল-আশ‘আরী (রা) বর্ণিত, যাতু’র-রিকা অভিযান শীর্ষক অধ্যায়। ইমাম বুখারী বলেন, যাতু’র-রিকা খায়বরের পর সংঘটিত হয়। হযরত আবূ মূসা আল-আশ‘আরী (রা) বর্ণিত।
  44. ৪৪সীরাত ইবন হিশাম, ২/২০৪।
  45. ৪৫সহীহ বুখারী, কিতাবুল-মাগাযী।
  46. ৪৬সীরাত ইবন হিশাম ১/২০৯-২১৩।