মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) আরব উপদ্বীপে আবির্ভূত হলেন কেন?

মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) আরব উপদ্বীপে আবির্ভূত হলেন কেন?

আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছা ও হিকমতের ফায়সালা ছিল যে, মানবতার হেদায়াত ও নাজাত তথা পথপ্রদর্শন ও মুক্তির এই সূর্য যদ্দ্বারা সমগ্র সৃষ্টিজগতে আলো বিস্তার লাভ করে, জাযীরাতু’ল-আরবের দিগ্বলয় থেকে উদিত হবে যা ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে অন্ধকার ভূভাগ আর যে ভূভাগের এই প্রখর আলোক-রশ্মির সর্বাধিক প্রয়োজন ছিল।

আল্লাহ তা‘আলা এই দাওয়াতের জন্য আরবদেরকে নির্বাচিত করেন এবং তাদেরকে সমগ্র বিশ্বে এর তাবলীগ তথা প্রচার-প্রসারের জিম্মাদার বানান এ জন্য যে, তাদের হৃদয়পট ছিল একেবারেই স্বচ্ছ ও নির্মল। পূর্ব থেকে কোন অংকিত ছবি কিংবা চিত্র এতে ছিল না যা মোছা কঠিন হত। এর বিপরীতে রোমক, পারসিক অথবা ভারতীয়দের, যাদের নিজেদের উন্নতি-অগ্রগতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলা এবং নিজেদের সভ্যতা-সংস্কৃতি ও দর্শনের ব্যাপারে বিরাট গর্ব ছিল, আর এর দরুন তাদের ভেতর এমন কিছু মানসিক গ্রন্থি ও চিন্তাগত জটিলতা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল যা দূর হওয়া সহজ ছিল না। আরবদের দিল ও دماغ তথা মন-মস্তিষ্কের নিষ্কলংক পট কেবল সেই মামূলী ও হালকা রচনার সঙ্গে পরিচিত ছিল যা তাদের মূর্খতা, অশিক্ষা ও বেদূঈন জীবন তার ভেতর অংকিত করে দিয়েছিল যা ধোয়া ও মুছে ফেলা এবং তদন্তলে নতুন চিত্র অংকন করা খুবই সহজ ছিল। বর্তমান শাস্ত্রীয় পরিভাষায় তারা ‘অকাট ও নির্ভেজাল মূর্খতা’র শিকার ছিল, আর এটাই ছিল সেই ভুল যার প্রতিবিধান হতে পারত। অপরাপর সুসভ্য ও উন্নত জাতিগোষ্ঠী ছিল মিশ্রিত তথা ভেজাল মূর্খতার ভেতর লিপ্ত যার চিকিৎসা ও প্রতিবিধান এবং তা ধুয়ে সেখানে নতুন হরফ লেখা সব সময় অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে থাকে।

এই আরবরা তাদের আপন প্রকৃতিতে ছিল সমুজ্জ্বল। মজবুত ও লৌহসম সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তির অধিকারী ছিল তারা। যদি হক কথা তাদের উপলব্ধি তে ধরা না দিত তাহলে তারা এর বিরুদ্ধে তলোয়ার হাতে তুলে নিতে এতটুকু ইতস্তত করত না। আর যদি সত্য স্বচ্ছ-সুন্দর দর্পণের ন্যায় তাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে ধরা পড়ত তাহলে তা তারা মনে-প্রাণে গ্রহণ করত, প্রাণের অধিক ভালবাসত, তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরত এবং এর জন্য প্রয়োজনে জীবন বিলিয়ে দিতেও এতটুকু দ্বিধা করত না।

এই আরবীয় মন-মানসিকতা সুহায়ল ইবন ‘আমরের সেই কথার ভেতর প্রতিফলিত হয় যে কথা হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের সময় তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়েছিল। সন্ধি চুক্তির সূচনা হয়েছিল নিম্নোক্ত বাক্য দ্বারা هذا ما قضى عليه محمد رسول الله অর্থাৎ এ সেই ফয়সালা যা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ করেছেন। এতে সুহায়ল বলে ওঠে, والله لوكنا نعلم انك رسول الله ما صددناك عن البيت ولا قاتلناك অর্থাৎ আল্লাহর কসম! যদি আমরা জানতাম ও মানতাম যে, আপনি আল্লাহর রাসূল, তাহলে কখনো আপনাকে আল্লাহর ঘর যিয়ারতে বাধা দিতাম না, আর আপনার সঙ্গে লড়াই-সংঘর্ষেও প্রবৃত্ত হতাম না। এই একই মন-মানসিকতা ইকরিমা (রা) ইবন আবী জাহলের কথায়ও ফুটে ওঠে যখন ইয়ারমুক যুদ্ধ প্রবল তুঙ্গে। তখন তাঁর ওপর প্রতিপক্ষের প্রবল চাপ। রোমক সৈন্যরা প্রচণ্ড বিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে হযরত ইকরিমা (রা)-র দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। তখন তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে চিৎকার দিয়ে বলেছিলেন: জ্ঞানবুদ্ধির দুশমনেরা! (যত দিন অবধি আমার মাথায় এ সত্য আসেনি) আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-র মোকাবিলায় সর্বত্র প্রবল প্রতিপক্ষ হিসাবে মুখোমুখি হয়েছি। আর আজ আমি তোমাদের থেকে পালিয়ে যাব? এরপর তিনি হাঁক ছেড়ে বলে ওঠেন: এমন কেউ আছ, যে আমার হাতে মৃত্যুর শপথ নিতে পার? এতে কিছু সংখ্যক লোক এগিয়ে এলেন এবং বায়আত নিলেন। এরপর সকলে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করতে লাগলেন, অতঃপর আহত হয়ে শাহাদাত লাভ করলেন।

আরবের লোকেরা ছিল বড়ই বাস্তবতাপ্রিয়, চিন্তাশীল, মননশীল, ধীরস্থির প্রকৃতির, স্পষ্টভাষী, কঠোরপ্রাণ ও সহিষ্ণু। তারা না অন্যকে প্রতারিত করত আর না নিজেদেরকে প্রতারণার মধ্যে রাখা পছন্দ করত। তারা সত্য ও পরিপক্ব কথায় অভ্যস্ত, কথার সম্মান রক্ষাকারী এবং সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তির অধিকারী ছিল। এর একটি

সুস্পষ্ট নমুনা ও প্রমাণ আমরা দেখতে পাব আকাবার দ্বিতীয় বায়আতে যার পরই হিজরতের সূচনা হয় মদীনা তায়্যিবাহর দিকে।

ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন যে, যখন আওস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয় আকাবা উপত্যকায় রসূলুল্লাহ (সা)-র হাতে বায়আত গ্রহণের উদ্দেশ্যে সমবেত হয় তখন আব্বাস ইবন উবাদা আল-খাযরাজী স্বীয় গোত্রকে সম্বোধন করে বলেন : হে খাযরাজের লোকেরা! তোমাদের কি জানা আছে, তোমরা মহানবী (সা)-এর হাতে কোন বিষয়ের ওপর বায়আত গ্রহণ করতে যাচ্ছ? উত্তরে তারা বললঃ আমরা জানি। তিনি বললেনঃ তোমরা তাঁর হাতে সাদা-কালো সকল বর্ণের মানুষের সাথে যুদ্ধের ওপর বায়আত করছ (অর্থাৎ বিপুল সংখ্যক ও বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে যুদ্ধের শপথ নিতে চলেছ)। যদি তোমরা ভেবে থাক, তোমাদের সম্পদ লুণ্ঠিত হবে, ধ্বংস ও বরবাদ হবে, তোমাদের অভিজাত সন্তান ও গোত্রের নেতৃত্ববর্গ নিহত হবে, সেক্ষেত্রে তোমরা তাঁকে শত্রুর হাতে তুলে দিয়ে নিজেরা সরে দাঁড়াবে তাহলে শুরুতেই এই বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে যাক। আর তা এজন্য যে, যদি এমন কিছু কর তবে আল্লাহর কসম! দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানেই তোমরা লজ্জিত ও অপমানিত হবে। আর তোমাদের ফয়সালা যদি এই হয়ে থাকে যে, যেই বস্তুর জন্য তোমরা তাঁকে দাওয়াত দিয়েছ তা তোমরা পূরণ করবে, এতে তোমাদের গোটা বিত্ত-সম্পদ তছনছ হয়ে গেলেও, তোমাদের নেতা ও অভিজাত সম্প্রদায় মারা গেলেও তোমরা পরওয়া করবে না, তবে তোমরা তাঁর হাতে হাত দিও। সেক্ষেত্রে আল্লাহর কসম! এতে দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় জাহানেই তোমাদের জন্য সাফল্য ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তারা সকলেই সমস্বরে বললঃ আমরা আমাদের বিত্ত-সম্পদের ধ্বংস ও নেতৃত্ববর্গের মৃত্যু সকল কিছুর বিনিময়েও আপনার হাতে বায়আত করতে চাই। কিন্তু হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যদি আমাদের প্রতিজ্ঞা পূরণ করি সেক্ষেত্রে এসবের বিনিময়ে আমরা কি পাব? আল্লাহর রাসূল (সা) বললেন, জান্নাত। তারা বললঃ আপনি হাত বাড়িয়ে দিন। তিনি দস্ত মুবারক সামনে বাড়িয়ে দিলে সকলেই বায়আত করল।

প্রকৃত ব্যাপার এই যে, তারা সেই প্রতিজ্ঞা পালন করেছিল যেই প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্য তারা রাসূল আকরাম (সা)-এর হাতে বায়আত নিয়েছিল। হযরত সা‘দ ইবন মু‘আয (রা) তাঁর বিখ্যাত উক্তির মধ্যে সব কিছুর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন : আল্লাহর কসম! (ইয়া রাসূলাল্লাহ!) আপনি যদি

চলতে চলতে বারকুল -গিমাদ অবধি পৌঁছে যান তখনও আমরা আপনার সাথে চলতে থাকব। যদি আপনি সমুদ্র পার হতে চান তবে সেক্ষেত্রেও আমরা আপনার সঙ্গে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ব।

অটুট সংকল্প ও সুদৃঢ় এই ইচ্ছাশক্তি ও সততা, কর্মের স্থিরতা, সত্যের সামনে মস্তক অবনত করে দেয়ার মেযাজ ও মানসিকতা সেই বাক্য থেকেও স্পষ্ট প্রতিভাত যা মুসলিম ফৌজের বিখ্যাত সিপাহসালার উকবা ইবনে নাফে (রা) উচ্চারণ করেছিলেন, যখন বিজয়ের পর বিজয়ের মাধ্যমে সম্মুখে অগ্রসর হতে গিয়ে আটলান্টিক মহাসমুদ্র তাঁর পথের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ সময় তিনি বলেছিলেনঃ হে আল্লাহ! এই মহাসমুদ্র আমার অগ্রযাত্রার পথের প্রতিবন্ধক। নইলে আমার মন চায়, সমান্তরাল গতিতে আমি সামনে এগিয়ে যাই এবং জলে-স্থলে তোমার নামের মহিমা গাই।

এর বিপরীতে গ্রীস, রোম ও পারস্যের লোকেরা যুগ স্রোতে ভেসে যেতে ও হাওয়ার অনুকূলে পাল তুলতে অভ্যস্ত ছিল। কোন প্রকার জুলুম ও বাড়াবাড়ি তাদের ভেতর আন্দোলন সৃষ্টি করতে ছিল অক্ষম। নীতিপরায়ণতা ও সত্যের প্রতি কোন আকর্ষণ তাদের ভেতর ছিল না। কোন দাওয়াত বা আহ্বান ও আকীদা-বিশ্বাস তাদের ধ্যান-ধারণা, চিন্তাধারা ও তাদের আবেগ-অনুভূতির ওপর এভাবে ছাপ ফেলত না যার জন্য নিজেদের সত্তাকে তারা বিস্মৃত হতে পারে এবং নিজেদের আরাম-আয়েশ ও পার্থিব ভোগ-বিলাসকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। 

আরবগণ সভ্যতা-সংস্কৃতি, ভোগ-বিলাস ও আরামপ্রিয়াতা থেকে সৃষ্ট এইসব রোগ-ব্যাধি ও খারাপ অভ্যাস থেকে ছিল মুক্ত যার চিকিৎসা বড় কঠিন। এটা কোন ঈমান-আকীদার জন্য উত্তাপ সৃষ্টিতে ও আত্মোৎসর্গের ক্ষেত্রে সর্বদাই প্রতিবন্ধক হয়ে থাকে এবং অধিকাংশ সময় মানুষের পায়ে বেড়ি পরিয়ে দেয়। 

তাদের ভেতর সত্যবাদিতা ছিল, আমানতদারীও ছিল, ছিল বীরত্বও। মোনাফেকী, গাদ্দারী ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তাদের প্রকৃতি ছিল সামঞ্জস্যহীন। লড়াই-এর ক্ষেত্রে জীবনবাজি রেখে লড়াকু যোদ্ধা, অশ্বপৃষ্ঠে অধিকক্ষণ 

অতিবাহিতকারী, কঠোর প্রতিরোধ ক্ষমতা ও সহ্য শক্তির অধিকারী, সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত, অশ্বারোহণ ও যুদ্ধ-বিগ্রহপ্রিয় যা এমন এক সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর জন্য আবশ্যকীয় শর্ত যাকে দুনিয়ার কোন বড় কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখে যেতে হবে, বিশেষত সেই যুগে যখন লড়াই-সংঘাত ও অভিযান পরিচালনার ধারাবাহিকতা চলতে থাকে এবং বীরত্ব ও শৌর্য-বীর্যের সাধারণ প্রচলন ঘটতে থাকে।

দ্বিতীয় বিষয় এই যে, তাদের চিন্তাধারাগত ও কার্যকর সমূহ শক্তি এবং স্বভাবজাত প্রাকৃতিক যোগ্যতাসমূহ নিরাপদ ও সুরক্ষিত ছিল এবং কাল্পনিক দর্শন, অনুপকারী যুক্তি-তর্কের কচকচানি ও খুটিনাটি বিষয়াদি, ইলমে কালামের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও নামুক অধ্যায়সমূহে অথবা স্থানীয় ও আঞ্চলিক গৃহযুদ্ধগুলোতেও তা বিনষ্ট হয় নি। এটি একটি উর্বর এবং এই দিক দিয়ে নিরাপদ ও সুরক্ষিত জাতিগোষ্ঠী ছিল। তাদের জীবন উত্তাপ, আবেগ-উদ্দীপনা, আনন্দ-প্রফুল্লতা, অটুট সংকল্প ও লৌহ সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তি দ্বারা ছিল ভরপুর।

স্বাধীনতা ও সাম্য, প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর সঙ্গে ভালবাসা, অনাড়ম্বর ও সারল্য তাদের অস্থি-মজ্জায় মিশে ছিল। তাদেরকে কখনো বিদেশী শক্তির সামনে মস্তকাবনত হতে হয়নি। এই জাতি গোলামী, একজন আরেক জনের ওপর ছড়ি ঘোরাবে এবং প্রভুত্ব করবে এরূপ অর্থের সঙ্গে অপরিচিত ছিল। তারা ইরানী ও রোমক রাজতন্ত্রের গর্ব ও অহমিকা এবং মানুষ মানুষকে ঘৃণা ও অবজ্ঞার চোখে দেখবে এরূপ অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত ছিল না। এর বিপরীতে পারস্য সম্রাটদেরকে (যারা আরব উপদ্বীপের প্রতিবেশী ছিল) অতি মানব জ্ঞান করা হত। যদি পারস্য সম্রাট রক্ত মোক্ষণ করাতেন কিংবা কোন ঔষধ ব্যবহার করতেন তবে রাজধানীতে ঘোষণা প্রদান করা হত যে, আজ মহামান্য সম্রাট রক্ত মোক্ষণ করিয়েছেন কিংবা ঔষধ ব্যবহার করেছেন। এই ঘোষণার পর শহরে কোন পেশাজীবী আপন পেশায় নিমগ্ন হতে কিংবা কোন সরকারী কর্মকর্তা বা সভাসদ কাজ করতে পারত না। যদি কখনও সম্রাটের হাঁচি আসত তবে তাঁর জন্য কোন মঙ্গলবাণী উচ্চারণের অধিকার ছিল না। যদি তিনি নিজে কোন মঙ্গলবাক্য উচ্চারণ করতেন তবুও এর সমর্থনে কিছু বলা যেত না। যদি তিনি কখনও কোন উযীর কিংবা আমীরের বাসভবনে গমন করতেন তবে এই দিনটিকে খুবই অস্বাভাবিক ও গুরুত্ববহ মনে করা হত। সেই দিন থেকে সেই খান্দানের নতুন বর্ষপঞ্জী শুরু হত

এবং চিঠিপত্রে নতুন তারিখ বসানো হত। একটি নির্ধারিত সময়সীমার জন্য তার ট্যাক্স মাফ করা হত। উল্লেখিত ব্যক্তিকে নানা রকমের সম্মান, পুরস্কার, ক্ষমা ও পদোন্নতি দ্বারা ভূষিত করা হত কেবল এই জন্য যে, সম্রাট পদধূলি দ্বারা তাকে ধন্য ও অনুগৃহীত করেছেন।

এ সেই সব আদব, বন্দেগী ও সম্রাটকে তাজীম প্রদর্শনের আবশ্যকীয় শর্তের অতিরিক্ত যেগুলো প্রদর্শন করা সাম্রাজ্যের কর্মকর্তা, দরবারের সভাসদবর্গ ও অপরাপর সকল মানুষের জন্য অপরিহার্য ছিল। যেমন সম্রাটের সামনে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা (অর্থাৎ বুকের ওপর হাত রেখে আদবের সাথে মাথা নীচু করে দেওয়া), তাঁর সামনে এভাবে আদবের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা যেভাবে নামাযে আল্লাহর সামনে কেউ দাঁড়ায়। এ সেই সম্রাটের আমলের কথা বলা হচ্ছে যিনি নওশেরওয়ানে ‘আদিল বা ন্যায়বিচারক নওশেরওয়াঁ নামে পৃথিবী খ্যাত অর্থাৎ খসরূ ১ম (৫৩১-৫৭৯ খৃ.)। এ থেকে পরিমাপ করা যেতে পারে যে, ইরানের সেই সম্রাটের অবস্থা কি হবে যারা জুলুম-নিপীড়ন ও নির্দয়তার ক্ষেত্রে স্ব স্ব আমলে কুখ্যাত ছিলেন।

মুক্ত চিন্তা ও মতামত প্রকাশ (সমালোচনা নয়) বিস্তৃত ইরানী সাম্রাজ্যে প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল। এ ব্যাপারে ঐতিহাসিক তাবারী “ন্যায়বিচারক সম্রাট নওশেরওয়াঁ”র একটি চিত্তাকর্ষক কাহিনী বর্ণনা করেছেন যদ্দ্বারা আমরা পরিমাপ করতে পারি যে, ইরানী রাজতন্ত্রে মতামত ও চিন্তার স্বাধীনতার ওপর কত কঠিন বাধা নিষেধ আরোপিত ছিল এবং শাহী দরবারে মুখ খোলার কী মূল্য পরিশোধ করতে হত। ঘটনাটি “সাসানী আমলে ইরান” নামক গ্রন্থের লেখক ঐতিহাসিক তাবারীর সূত্রে লিপিবদ্ধ করেছেন।

“সম্রাট একটি কাউন্সিল সভার আয়োজন করেন এবং রাজস্ব বিভাগের

পরিচালক/সচিবকে নির্দেশ দেন জমির খাজনার নতুন ধার্যকৃত হার সজোরে পাঠ করে শোনাতে। তিনি তা পাঠ করলে সম্রাট খসরূ (নওশেরওয়াঁ) উপস্থিত লোকদেরকে দু’বার জিজ্ঞেস করেন : কারো কোন আপত্তি নেই তো? সকলেই ছিল নিশ্চুপ। যখন সম্রাট তৃতীয়বারের মত একই প্রশ্ন করলেন তখন একজন দাঁড়িয়ে সসম্মানে জিজ্ঞেস করল সম্রাটের ইচ্ছা কি এই যে, অস্থাবর জিনিসের ওপর স্থায়ী ট্যাক্স বসাবেন যা কাল-পরিক্রমায় অবিচার ও বে-ইনসাফীতে পর্যবসিত হবে? এতে সম্রাট ক্রোধে চিৎকার করে বলে ওঠেন ওহে অভিশপ্ত বেআদব! তোর পরিচয় কি ? কোত্থেকে এসেছিস তুই? সে উত্তরে জানাল যে, সে রাজস্ব কর্মকর্তাদের একজন। সম্রাট তখন নির্দেশ দেন কলমদানি দিয়ে পিটিয়ে তাকে মেরে ফেলতে। এরপর পরিচালক/সচিবদের সকলেই তাকে কলমদানি দিয়ে পেটাতে শুরু করে। ফলে বেচারা সেখানেই মারা যায়। এরপর সকলেই বলল সম্রাট! আপনি যে ট্যাক্স আমাদের ওপর ধার্য করেছেন তা খুবই যুক্তিযুক্ত ও ন্যায়ানুগ হয়েছে।“

ভারতবর্ষে সম্মান ও সম্ভ্রমের অপমান ও অবমাননা এবং সেইসব পশ্চাৎপদ শ্রেণীর প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞা প্রদর্শন (যাদেরকে বিজয়ী আর্য জাতিগোষ্ঠী ও দেশীয় আইন একটি নিকৃষ্টতম সৃষ্টি হিসাবে অভিহিত করেছিল এবং যারা গৃহপালিত পশু থেকে কেবল এ দিক দিয়ে ভিন্ন ছিল যে, এরা দু’ পায়ে ভর দিয়ে চলত এবং দেখতে মানুষের মত) কল্পনাতীত ছিল। উক্ত আইনে এটি নিয়মিত ধারা হিসাবে বর্ণিত ছিল যে, যদি কোন শূদ্র কোন ব্রাহ্মণকে মারার উদ্দেশ্যে হাত ওঠায় কিংবা লাঠি ওঠায় তবে তার হাত কেটে দিতে হবে। যদি লাথি মারে তবে তার পা কেটে দিতে হবে। যদি সে দাবি করে যে, সে ব্রাহ্মণকে লেখাপড়া শেখাতে পারে, তবে তাকে ফুটন্ত তেল পান করানো হবে। এই আইনের দৃষ্টিতে কুকুর, ব্যাঙ, গিরগিটি, কাক, উল্লু ও অচ্ছ্যুৎ বা অস্পৃশ্য শ্রেণীর কাউকে হত্যা করলে তার জরিমানা ছিল একই রূপ।

রোমকরাও এ ব্যাপারে ইরানীদের থেকে বেশী কিছু ভিন্ন ছিল না, যদিও নির্লজ্জতা ও মানবতাকে অপমান-াপদস্ত করার ক্ষেত্রে এই সর্বনিম্ন পর্যায়ে তারা পৌঁছতে পারেনি। একজন পাশ্চাত্য ঐতিহাসিক Victor Chopart তাঁর The Roman World নামক গ্রন্থে বলেন :

“রোম সম্রাট কাইজারকে উপাস্য মনে করা হত। বিষয়টি মৌরছী ও পারিবারিকভাবে ছিল না, বরং যিনিই সিংহাসন ও রাজমুকুটের মালিক হতেন তাকেই খোদার আসনে অধিষ্ঠিত করা হত যদিও তার ভেতর এমন কোন নিশানী কিংবা চিহ্ন থাকত না যা তাকে এই স্তরে অধিষ্ঠিত হবার দিকে ইঙ্গিত দেয়। Augustus-এর শাহী উপাধি এক সম্রাট থেকে অপর সম্রাট অবধি সংবিধান ও আইন অনুযায়ী স্থানান্তরিত হত না, বরং রোমক সরকারী সংসদের কাজ কেবল এতটুকুই ছিল যে, এমন প্রতিটি নির্দেশ যা তরবারির তীক্ষ্ণ ধারের জোরে প্রচারিত হবে তা প্রচারিত হতে দেওয়া। এই রাজত্ব ও বাদশাহী ছিল কেবল এক ধরনের সামরিক একনায়কতন্ত্রেরই রূপ।”

যদি এর তুলনা করা হয় আরবদের সেই স্বাধীনতাপ্রিয়তা, আত্মসম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার সঙ্গে যা ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে তাদের মাঝে দেখতে পাওয়া যায়, তাহলে এই দুই জাতিগোষ্ঠীর মেযাজ এবং আরব ও অনারব সমাজের পার্থক্য সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হবে। তারা কখনো ও কোন সময় তাদের বাদশাহকে ابیت اللعن ও عم صباحاً (অর্থাৎ আপনি সর্বপ্রকার দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকুন এবং আপনার প্রভাত্ কল্যাণময় হোক)-এর মত শব্দসমষ্টি দ্বারা সম্বোধন করত। এই স্বাধীনতা ও আত্মপরিচিতি, আপন মান-সম্ভ্রমের হেফাজত ও রক্ষণাবেক্ষণ আরবদের মধ্যে এই পরিমাণে ছিল যে, তারা তাদের বাদশাহ ও আমীর-উমারার কোন কোন দাবি ও ফরমায়েশ পূরণ করতেও অনেক সময় আপত্তি করত। এই সম্পর্কিত একটি চিত্তাকর্ষক কাহিনী ইতিহাসের পাতায় বর্ণিত হয়েছে যে, একবার এক আরব বাদশাহ বনী তামীমের এক ব্যক্তির নিকট একটি ঘোটকী, যার নাম ছিল সিকাব, চেয়ে বসে। লোকটি ঘোটকী দিতে পরিষ্কার অস্বীকার করে এবং নিম্নোক্ত বিখ্যাত কবিতা আবৃত্তি করে

“হে রাজন ! এ বহু দামী ও সুন্দরী ঘোটকী; একে না ধারে দেওয়া যায়, না বিক্রয় করা যায়। আপনি একে পাবার জন্য চেষ্টা করবেন না, আপনার হাত থেকে একে ফেরানো আমার পক্ষে সম্ভব।” দীওয়ান-ই হামাসা, বাবুল-হামাসা, পৃ. ৬৭-৬৮।

এই স্বাধীনতা, আত্মশাসন, আত্মার সমুন্নতি, আভিজাত্য ও অটুট মনোবল সর্বস্তরের জনগণের মধ্যেই বর্তমান ছিল এবং নারী-পুরুষ সকলের মধ্যেই পাওয়া যেত। এর একটি নমুনা আমরা হীরার শাসনকর্তা আমর ইব্‌ন হিন্দ-এর হত্যার ঘটনায় দেখতে পাই। আরব ঐতিহাসিকগণ ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, আমর ইব্‌ন হিন্দ বিখ্যাত আরব ঘোড়সওয়ার ও কবি ‘আমর ইব্‌ন কুলছূমকে দাওয়াত দেন এবং আগ্রহ ব্যক্ত করেন যে, তাঁর (কবির) মা শাসনকর্তার মা’র সঙ্গে দাওয়াতে যেন শরীক হন। অনন্তর ‘আমর ইব্‌ন কুলছূম বনূ তাগলিবের একটি জামা‘আতের সঙ্গে জযীরা থেকে হীরা অভিমুখে রওয়ানা হন এবং তাঁর মা লায়লা বিন্তে মুহালহিলও বনূ তাগলিবের কিছু সংখ্যক দায়িত্বশীল লোকের সঙ্গে রওয়ানা হয়। ‘আমর ইব্‌ন হিন্দের তাঁবু হীরা ও ফুরাতের মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপন করা হয়। একদিকে ‘আমর ইব্‌ন হিন্দ আপন তাঁবুতে প্রবেশ করেন এবং অপরদিকে লায়লা ও হিন্দ তাঁবুর এক পৃথক কামরায় সমবেত হন। ‘আমর ইব্‌ন হিন্দ তাঁর মাকে বলে দিয়েছিলেন যে, যখন খাবার পরিবেশন করা হবে তখন নওকরদের একটু আলাদা করে দেবে এবং কোন প্রয়োজন দেখা দিলে লায়লাকে দিয়ে তা করিয়ে নেবে। অতঃপর ‘আমর ইব্‌ন হিন্দ দস্তরখান বিছানোর নির্দেশ দিলেন, এরপর খাবার পরিবেশন করলেন। এরই ভেতর হিন্দ লায়লাকে সম্বোধন করে বলল, বোন! এই পাত্রটা আমাকে একটু উঠিয়ে দাও তো। লায়লা বলল, যার প্রয়োজন সে নিজেই উঠিয়ে নিক। এরপর হিন্দ দ্বিতীয়বার চাইল এবং পীড়াপীড়ি করতে থাকল। এ সময় লায়লা চিৎকার করে উঠল, হায়! কী লজ্জা ও অপমান! ওহে বনূ তাগলিব! এই আওয়াজ ‘আমর ইব্‌ন কুলছূম শুনতেই তাঁর চক্ষু রক্তবর্ণ ধারণ করে। তিনি এক লাফে ‘আমর ইব্‌ন হিন্দের সামনে ঝুলন্ত তরবারি টেনে নেন এবং তা দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত হানেন। সেই সাথে বনূ তাগলিব তাঁর তাঁবু লুট করে এবং জযীরার দিকে ফিরে আসে। এই ঘটনাকে উপলক্ষ করেই ‘আমর ইব্‌ন কুলছূম সেই বিখ্যাত কাসীদা পাঠ করেন যা “ঝুলন্ত সপ্তক” (সাব‘আঃ মু‘আল্লাকা)-এর অন্তর্গত।

ঠিক এমনই একটি ঘটনা সংঘটিত হয় যখন হযরত মুগীরা ইব্‌ন শু‘বা (রা) মুসলিম পক্ষের দূত হিসাবে পারসিক সেনাপতি রুস্তমের দরবারে গিয়েছিলেন। রুস্তম পূর্ণ জাঁকজমক ও শাহী ठाটবাটের সঙ্গে স্বীয় সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন। মুগীরা ইব্‌ন শু‘বা (রা) আরবদের অভ্যাস মাফিক রুস্তমের পাশাপাশি স্থাপিত

কুরসীতে গিয়ে বসে পড়েন। তাঁর দরবারী রা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাঁকে টেনে নীচে নামিয়ে আনে। এতে তিনি বলেন : আমরা খবর পেয়েছিলাম তোমরা নাকি খুবই বুদ্ধিমান। কিন্তু আমার চোখে তোমাদের চেয়ে বেওকুফ আর কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। আমরা আরবরা তো সকলের সঙ্গে সমান ব্যবহার করে থাকি। আমাদের মধ্যে কেউ কাউকে গোলাম বানায় না একমাত্র যুদ্ধাবস্থা ছাড়া। আমার ধারণা ছিল, তোমরাও তোমাদের জাতির সঙ্গে ঠিক তেমনি সাম্যের আচরণ করে থাকবে। এর চেয়ে এই ভাল ছিল যে, তোমরা আমাকে প্রথমেই অবহিত করতে যে, তোমরা একে অপরকে নিজেদের খোদা বানিয়ে রেখেছ এবং এ বিষয়ে তোমাদের সঙ্গে নিষ্পত্তি হবে না। এমতাবস্থায় আমরা তোমাদের সঙ্গে এই আচরণ করতাম না, আর তোমাদের নিকটও আগমন করতাম না। অথচ তোমরা নিজেরাই আমাদেরকে দাওয়াত দিয়েছ।

আরব উপদ্বীপে শেষ নবী প্রেরণের দ্বিতীয় কারণ হল, আরব উপদ্বীপে ও মক্কা মু‘আজ্জমায় কা‘বার অস্তিত্ব ও উপস্থিতি যা হযরত ইবরাহীম ও হযরত ইসমাইল (আ) এজন্যই নির্মাণ করেছিলেন যেন তাতে এক আল্লাহর ইবাদত করা হয় এবং এই জায়গাটি চিরদিনের তরে তওহীদের দাওয়াতের কেন্দ্রে পরিণত হয়।

বাইবেল (পুরাতন নিয়ম) গ্রন্থে ব্যাপক পরিমাণ বিকৃতি সত্ত্বেও “বাক্কা উপত্যকা” শব্দটি অদ্যাবধি বর্তমান, কিন্তু অনুবাদকগণ একে বুকআ’ উপত্যকা বানিয়ে দিয়েছেন এবং একে নির্দিষ্ট জ্ঞাপকের পরিবর্তে অনির্দিষ্ট জ্ঞাপকে পরিণত করেছেন। مزامير داؤد -এর শব্দসমষ্টি যা আরবী ভাষায় এসেছে তা এই :

“বরকতময় ও পবিত্র সেই মানুষ যার ভেতর তোমার পক্ষ থেকে শক্তি নিহিত, যাঁর অন্তরে রয়েছে তোমার ঘরের রাস্তা যিনি বুকআ উপত্যকা অতিক্রমরত অবস্থায় তাকে একটি কুয়া বানান” (গীত সংহিতা, ৮৪:৫,৬,৭; পবিত্র গ্রন্থ, ব্রিটিশ এন্ড ফরেন বাইবেল সোসাইটি)।

কিন্তু ইয়াহুদী পণ্ডিতগণ কয়েক শতাব্দী পর অনুভব করতে সক্ষম হন যে, এই অনুবাদ ভুল। অনন্তর Jawish Encyclopaedia-তে এই স্বীকারোক্তি বর্তমান যে, এটি এক নির্দিষ্ট উপত্যকা যেখানে পানি পাওয়া যেত না। যারা উপরোল্লিখিত কথা লিখেছেন তাদের মস্তিষ্কে এমন একটি উপত্যকার ছবি ছিল যার ছিল বিশেষ কুদরতী অবস্থা, যার প্রতিনিধিত্ব তারা উল্লিখিত শব্দসমষ্টি দ্বারা করেছেন।

ঐ সব সহীফার ইংরেজী অনুবাদকগণ অনুবাদের ক্ষেত্রে আরবী অনুবাদকদের তুলনায় অধিকতর বিশ্বস্ততা ও সতর্কতার প্রমাণ দিয়েছেন। তাঁরা “বাক্কা” শব্দটিকে মূল সহীফার ন্যায় অবিকৃত ও বিশুদ্ধ অবস্থায় হুবহু অবশিষ্ট রেখেছেন এবং ইংরেজী “b” ছোট অক্ষরে না লিখে বড় অক্ষরে “B” লিখেছেন যেমন সাধারণত Noun-এর ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। ইংরেজী অনুবাদ নিম্নে উদ্ধৃত করা গেল :

Blessed is the man whose strength is in thee in whose heart are the ways of them. Who passing through the Valley of Baca make it a well. psalm 84. 5-6.

“মুবারকবাদ সেই সব লোকের প্রতি সম্মান ও শক্তি রয়েছে তোমার সাথে, যাদের অন্তরে তাদের রাস্তা রয়েছে যা বাক্কা উপত্যকা অতিক্রম করবে এবং তাকে একটি কুয়া বানাবে।”

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পবিত্র আবির্ভাব ছিল হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ)-এর সেই দু‘আর ফল যা তাঁরা কা‘বা গৃহের ভিত্তি উত্তোলন করতে গিয়ে ও তা পুন নির্মাণ করার সময় করেছিলেন। দু‘আটি এই :

“হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মধ্য থেকে তাদের নিকট এক রাসূল প্রেরণ কর যে তোমার আয়াতসমূহ তাদের নিকট আবৃত্তি করবে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে পবিত্র করবে। তুমি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (সূরা বাকারা , ১২৯ আয়াত)।

আল্লাহ তা‘আলার এক চিরন্তন নিয়ম এই যে, তিনি তাঁর মুখলিস (একনিষ্ঠ), সাদিকীন (সত্যনিষ্ঠ) ও আপন মহান সত্তার সঙ্গে মিলনাকাঙ্ক্ষী ও ক্ষমা ভিক্ষার আঁচল বিস্তারকারীদের দু‘আ অবধারিতভাবে কবুল করে থাকেন। আম্বিয়া-ই কিরাম ও নবীয়ে মুরসালদের মরতবা তো তাঁদের চেয়েও উচ্চে।

আসমানী সহীফা ও সত্য সংবাদসমূহ এইসব উদাহরণে ভরপুর। স্বয়ং তাওরাতে এর প্রমাণ বিদ্যমান যে, আল্লাহ তা‘আলা হযরত ইবরাহীম (আ)-এর এই দু‘আ কবুল করেন। পুস্তকে (২০) পরিষ্কারভাবে লিখিত আছে :

“এবং ইসমাঈলের অনুকূলে আমি তোমার কথা শুনলাম। দেখ, আমি তাকে প্রাচুর্য দান করব, তাকে সৌভাগ্যশালী করব এবং তাকে খুব বর্ধিত করব; তার থেকে বার জন সর্দার জন্ম নেবে এবং তাকে বিরাট বড় জাতি (قوم) বানাব।”

এজন্যই রসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি তাঁর নিজের সম্পর্কে বলতেন, انا دعوة ابراهيم وبشرى عيسى “আমি ইবরাহীম (আ)-এর দু‘আ এবং ঈসা (আ)-র সুসংবাদের ফসল।”১ তাওরাত (ওল্ড টেস্টামেন্ট বা পুরাতন নিয়ম)-এ বিকৃতি সত্ত্বেও অদ্যাবধি এর সাক্ষ্য মিলবে যে, এই দু‘আ কবুল হয়। দ্বিতীয় বিবরণ পুস্তকে (১৫-১৮) মূসা (আ)-র ভাষায় উদ্ধৃত হয়েছে : يقيم لك الرب الهك نبيا من وسطك من اخوتك مثلى له تسمعون “খোদাওয়ান্দ তোমার প্রভু তোমার নিমিত্ত তোমারই ভেতর থেকে তোমারই ভাইদের থেকে আমার মত একজন নবী পাঠাবেন; তোমরা গভীর মনোযোগের সাথে তাঁর কথা শুনবে।” اخوتك (তোমার ভাই) শব্দ নিজে থেকেই বলে দিচ্ছে যে, এর দ্বারা বনী ইসমাঈলকেই বোঝানো হচ্ছে, যে বনী ইসরাঈলের চাচার বংশধর। উক্ত সহীফাতেই দু’টি শ্লোকের পর এই বাক্য লিপিবদ্ধ রয়েছে :

“আর খোদাওয়ান্দ আমাকে বললেন যে, তারা যা বলেছে তা ভালই বলেছে। আমি তাদের নিমিত্ত তাদের ভাইদের মধ্যে থেকে তোমার মত একজন নবী পাঠাব, আর আমি আমার বাক্য তার মুখে নিক্ষেপ করব এবং যা কিছু আমি তাকে বলব সে তা সব তাদেরকে বলবে (যাত্রাপুস্তক-২,১৮:১৭-১৮)।”

اجعل كلامى فى فمه (আমি আমার কথা তার মুখে নিক্ষেপ করব) এই বাক্যটি মুহাম্মাদ (সা)-কে নির্দিষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে। কেননা তিনিই একমাত্র নবী

যাঁদের ওপর আল্লাহর কালাম শব্দগত ও অর্থগতভাবে নাযিল হয়েছে এবং আল্লাহ তা‘আলা তার ঘোষণাও দিয়েছেন :

“এবং তিনি মনগড়া কথা বলেন না; এতো ওহী যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়” (সূরা নাজ্ম ৩-৪)।

অন্যত্র বলা হয়েছে :

“কোন মিথ্যা এতে অনুপ্রবেশ করে না, সামনে থেকেও নয়, পেছন থেকেও নয়; এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসার্হ আল্লাহর নিকট থেকে অবতীর্ণ” (হামীম আস-সাজদা-৪২ আয়াত)।

এর বিপরীতে বনী ইসরাঈলের নবীদের সহীফাসমূহ আদৌ এ দাবি করে না যে, সেগুলো শব্দগত ও অর্থগতভাবে আল্লাহর কালাম। তাদের পণ্ডিতগণও সেসবকেও তাদের নবীদের দিকে সম্পর্কযুক্ত করার ক্ষেত্রে কৃত্রিমতার আশ্রয় গ্রহণ করে না। Jewish Encyclopaedia-তে বলা হয়েছে :

“ওল্ড টেস্টামেন্ট (পুরাতন নিয়ম)-এর প্রথম পাঁচটি পুস্তক (যেমন প্রাচীন ইয়াহুদী ধর্মীয় বর্ণনাসমূহ আমাদেরকে বলে) মূসা নবীর রচনা। শেষ আটটি শ্লোক বাদে [যেগুলোতে মূসা (আ)-র ইনতিকালের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে] রিব্বী (ইয়াহূদী ‘আলিম) এই বৈপরীত্য ও একে অপরের থেকে ভিন্ন বর্ণনার ওপর গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে যা এসব সহীফায় এসেছে এবং এর মধ্যে আপন প্রজ্ঞা ও মেধার সাহায্যে সংস্কার-সংশোধন করে থাকে।”

ইনজীল চতুষ্টয়ের সম্পর্ক যতখানি, যেগুলোকে “নিউ টেস্টামেন্ট বা নতুন নিয়ম” বলা হয়, সেগুলো শব্দগত ও অর্থগতভাবে আল্লাহর কালাম হওয়ার ব্যাপারে দূরতম সম্পর্কও নেই। এ ব্যাপারে তারাই সন্দেহ নিরসন করতে পারেন যারা এগুলো পড়ে দেখেছেন। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, এসব পুস্তক জীবনী ও কাহিনীমূলক পুস্তক হিসাবেই অধিক প্রতিভাত। আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব হিসাবে, যার ভিত্তি হয় ওহী ও ইলহাম, তা এতে খুবই কম দৃষ্ট হয়।২ এর পরের নম্বরে

আসে জযীরাতু’ল-আরবের তথা আরব উপদ্বীপের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান যা একে দাওয়াতের কেন্দ্র হিসাবে সর্বাধিক উপযোগী রূপ দান করেছে, যেখান থেকে এই দাওয়াত ও পয়গাম সমগ্র বিশ্বে পৌঁছে দেয়া যায় এবং পৃথিবীর তাবৎ জাতিগোষ্ঠীকে সম্বোধন করা যায়। একদিকে এটি এশিয়া মহাদেশের একটি অংশ, অপরদিকে তা আফ্রিকা মহাদেশ, এরপর ইউরোপেরও কাছাকাছি এবং এসব সেই এলাকা যা সভ্যতা ও কৃষ্টি, জ্ঞান ও শিল্পকলা, ধর্ম ও দর্শনের সর্বদা ই কেন্দ্র থেকেছে এবং যেখানে বিরাট বিস্তৃত ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য কায়েম হয়েছে। অতঃপর এই এলাকা বাণিজ্যিক কাফেলার অতিক্রমস্থলও ছিল যার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের লোক একে অপরের সঙ্গে মিলিত হত। এটি ছিল কয়েকটি মহাদেশের সঙ্গমস্থল এবং এক জায়গার নির্দিষ্ট বস্তুসামগ্রী ও উৎপাদিত দ্রব্য, যেখানে এর প্রয়োজন পড়ত, সেখানে স্থানান্তরিত করত। এই আরব উপদ্বীপ দুই বিরাট প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মাঝে অবস্থিত ছিল : খৃষ্টান শক্তি ও অগ্নি উপাসক শক্তি, প্রাচ্য শক্তি ও পাশ্চাত্য শক্তি। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা নিজস্ব স্বাধীনতা ও আপন ব্যক্তিত্বের সর্বদা ই হেফাজত করেছে এবং নিজেদের কতিপয় সীমান্ত এলাকা ও কতকগুলো গোত্র ব্যতিরেকে তারা কখনো ঐ সব শক্তির অধীনতা স্বীকার করেনি। আরব উপদ্বীপ বিনা প্রশ্নে নির্দ্বিধায় নবুওতের এমন এক বিশ্বব্যাপী দাওয়াতের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারত যা আন্তর্জাতিক রেখার ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে, মানবতাকে সমুন্নত মঞ্চ থেকে সম্বোধন করবে, সর্বপ্রকার রাজনৈতিক চাপ ও বিদেশী প্রভাব থেকে পরিপূর্ণরূপে স্বাধীন হবে।

এই সমস্ত কারণে আল্লাহ তা‘আলা আরব উপদ্বীপ ও মক্কা মুকাররামাকে রাসূল (সা)-এর আবির্ভাব, আসমানী ওহীর অবতরণ এবং দুনিয়ার বুকে ইসলাম প্রচারের বিশ্বব্যাপী কেন্দ্র ও সূচনাবিন্দু হিসাবে নির্বাচিত করেন।

“আল্লাহই বেশী জানেন তাঁর পয়গাম কোথায় এবং কাকে সোপর্দ করবেন” —(সূরা আন‘আম, ১২৪ আয়াত)।