জাযীরাতুল-আরব

জাযীরাতুল-আরব

জাযীরাতুল-আরবের সীমা

জাযীরাতুল-আরব দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে পৃথিবীর বৃহত্তম উপদ্বীপ। ‘আরব পণ্ডিতগণ পরোক্ষভাবে এই এলাকার নামকরণ করেছেন জাযীরাতু’ল-আরব। এর তিন দিকেই পানি। এই ভূখণ্ডটি এশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। এর পূর্বে আরব উপসাগর যাকে গ্রীকগণ পারস্য উপসাগর নামে জানে। এর দক্ষিণে ভারত মহাসাগর ও এর পশ্চিমে লোহিত সাগর যা এর আধুনিক মানচিত্রে দেখানো হয়ে থাকে। গ্রীক ও ল্যাটিন পরিভাষায় একে আরব উপসাগর (Sinus Arabicus) নামকরণ করা হয়েছে এবং প্রাচীন আরবী গ্রন্থে একে বাহ্-ই-কুলযুম নামে স্মরণ করা হয়। এর উত্তর সীমান্ত সেই কাল্পনিক সীমান্ত যা (আরব পণ্ডিতদের পরিভাষায়) আকাবা উপসাগর থেকে আরব উপসাগরে শাতিল আরবের মোহনা অবধি অতিক্রম করে।

মুসলমানরা জাযীরাতু’ল-‘আরবকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেছে। ১. হেজায, আয়লা (আকাবা) থেকে ইয়ামন অবধি এবং তাদের মতে একে হেজায এজন্যই বলা হয় যে, তা সেই পাহাড়ী সিলসিলা নিয়ে গঠিত যা তিহামাকে (যা লোহিত সাগরের উপকূলীয় বেলাভূমি) নজ্দ থেকে পৃথক করে। ২. তিহামা যার কথা

এইমাত্র বলা হয়েছে। ৩. ইয়ামন। ৪. নজদ; এ সেই উচ্চ অংশ যা হেজাযের পাহাড়গুলো থেকে শুরু হয়ে পূর্ব দিকে বাহরায়েন প্রান্তর অবধি বিস্তৃত। এ বিস্তৃত ও উচ্চ এলাকায় বহু মরুভূমি ও পাহাড়-পর্বত অবস্থিত। ৫. আরূদ, এর পূর্ব দিকে বাহরায়েন ও পশ্চিম দিকে হেজায অবস্থিত। ইয়ামন ও নজদের মধ্যখানে অবস্থিত হওয়ার কারণে একে আরূদ বলা হয়। একে ইয়ামামাও বলা হয়।

জাযীরাতুল আরবের প্রাকৃতিক অবস্থা ও এর অধিবাসী

এই গোটা উপদ্বীপের ওপর মরুপ্রান্তরীয় প্রভাব প্রবল এবং প্রাকৃতিক কার্যকারণ, ভূমিগত বিপর্যয় ও স্বীয় ভৌগোলিক অবস্থানের দরুন এর ওপর শুষ্ক আবহাওয়ার আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। এজন্যই অতীত ও বর্তমান কালে এর অধিবাসীদের সংখ্যা খুবই কম থেকেছে এবং সভ্য সমাজ ও বিরাট কেন্দ্রীয় হুকুমতের অস্তিত্ব এখানে লাভ করতে পারেনি। বেদুইন জীবনধারা ও এর দেহাতী রঙ, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের প্রতি প্রবল ঝোঁক এবং নানা গোত্রের লড়াই-সংঘর্ষের কারণে কৃষ্টি-সভ্যতা শ্যামল-সবুজ এলাকা ও ঐসব জায়গায় গিয়ে জড়ো হয় যেখানে বেশ ভাল বৃষ্টিপাত হয় অথবা যেখানে স্রোতস্বিনী ও ঝর্ণাধারা উৎসারিত হয় কিংবা যেখানে পানি ভূ পৃষ্ঠের কাছাকাছি পাওয়া যায় এবং যেখানে কুয়া খনন করা যায়। এজন্য বলা দরকার যে, আরব উপদ্বীপে জীবনের স্পন্দন পানির বদৌলতেই বেঁচে থাকত। অনন্তর কাফেলা সেদিকেই তার গতি পরিচালিত করত, এরই অনুসন্ধানে ব্যাপৃত থাকত এবং প্রকৃতি বেদুইনদেরকে সব জায়গা থেকে নিয়ে এসে শ্যামল সবুজ এলাকায় জড়ো করত। তারা কৃষকদের মত যমীনের এক অংশে মাটি কামড়ে পড়ে থাকত না, বরং তারা কোন ভূখণ্ডে ততক্ষণ পর্যন্ত অবস্থান করত যতক্ষণ সেখানে পশু খাদ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ঘাসপাতা ও পানি পাওয়া যেত। এই সুবিধা খতম হতেই তারা নতুন জায়গার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ত।

এই জন্য তাদের জীবন ছিল কষ্টসহিষ্ণুতা ও কঠোরতার প্রতিমূর্তি এবং তাদের সমাজ গোত্রের রূপ ধারণ করত। একজন বেদুইনের জন্য গোত্র হত হুকুমত ও জাতীয়তার সমর্থক। এই গোত্রীয় জীবন আরামপ্রিয়তা, স্থিতি ও সংহতি সম্পর্কে হত অজ্ঞ ও অপরিচিত এবং তা কেবল শক্তির ভাষা বুঝত। এ ছিল এমন এক জীবন যা মানুষের জন্য কষ্ট ও দুর্ভোগই ডেকে নিয়ে আসত এবং প্রতিবেশী

সুসভ্য জনবসতির নিমিত্ত বিপদ হয়ে থাকত। অতএব তারা নিজেদের মধ্যেও লড়াই করত এবং এর থেকে ফুরসং মিলতেই সভ্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষে প্রবৃত্ত হত।

কিন্তু অন্য দিক থেকে একজন আরব আপন গোত্রের আদব ও প্রথা-পদ্ধতির প্রতি হত অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও একনিষ্ঠ। কখনো কোন সময় সে হত অত্যন্ত উদারচিত্ত ও সহৃদয় মেহবান, যে মেহমানদারীর সর্ববিধ দায়িত্ব অত্যন্ত সন্তুষ্ট চিত্তে আনজাম দিত। যুদ্ধ শেষে সম্পাদিত সন্ধিচুক্তির ব্যাপারে অনুগত থাকত, বন্ধুত্বের হক আদায় করত, প্রচলিত রসম-রেওয়াজ তথা প্রথা-পদ্ধতির শেষ সীমা অবধি সম্মান করত। এইসব বৈশিষ্ট্যের সাক্ষ্য তাদের কাব্যে ও সাহিত্যে, তাদের বিচার ব্যবস্থায়, দৃষ্টান্তে, তাদের উপমা-উৎপ্রেক্ষায়, তাদের রীতিনীতি ও চলনে-বলনে খুব বেশিই পাওয়া যায়।

একজন আরব সাম্যের ভক্ত, স্বাধীনতাপ্রিয়, বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন, কর্মতৎপর ও কর্মী পুরুষ হত। সে নীচ ও হীন কাজ এড়িয়ে চলত। সে তার সীমিত জিন্দেগী ও বেদুইন জীবনের ওপর কেবল সন্তুষ্টই ছিল না বরং গর্বিত ছিল, আপন ভাগ্যে খুশী ও তৃপ্ত ছিল। ধর্মের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অধিকাংশ সময় দুর্বল হত। তাদের গোত্রীয় প্রথা ও পিতৃপুরুষের আচার-পদ্ধতির প্রতি ঈমান হত এর তুলনায় অনেক বেশি মজবুত। তাদের নৈতিক ও চারিত্রিক লক্ষ্য সেই অভিজাতসুলভ ও পুরুষোচিত গুণাবলী দ্বারা ব্যাখ্যাত ছিল যাকে তারা মুরুওয়াত বা মনুষ্যত্ব শব্দ দ্বারা ব্যাখ্যা করত, নিজেদের কাব্যে ও সাহিত্যে যার গুণ গাইত এবং প্রশংসা কীর্তন করত।

তমদ্দুন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রসমূহ

যে সব জায়গায় বৃষ্টি, ঝর্ণা কিংবা কুয়ার পানি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত সেখানে গ্রাম, পল্লী, মৌসুমী বাজার ও মেলার আকারে একটি তমদ্দুন গড়ে উঠত। এসব জিনিসের দ্বারা আরবদের জীবনের ওপর একটি সাধারণ প্রভাব পড়ত। জীবনের এসব কেন্দ্রে যেই সমাজ ও পরিবেশের উদ্ভব হত তার একটি বিশেষ রঙ ও স্বতন্ত্র ধারা হত, তার মধ্য দিয়েই আবহাওয়া, শিল্প, পেশা ও সেই সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থার ভিন্ন ভিন্ন রঙ ফুটে উঠত। অনন্তর মক্কায় এক বিশেষ সমাজ ছিল যার স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঠিক তেমনি হীরা ও ইয়াছরিববাসীদের সমাজও স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর ছিল। ইয়ামনের সমাজ আরব

সমাজগুলোর মধ্যে আপন বিশিষ্ট অবস্থা, প্রাচীন সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও নতুন সব রাজনৈতিক কারণে সবচেয়ে বেশি উন্নত ছিল এবং খাদ্যোৎপাদন, পশু পালন, খনিজ সম্পদ আহরণ, নগর ও দুর্গ নির্মাণের ক্ষেত্রে অনেক দূর অগ্রসর ছিল। বিভিন্ন শিল্প ও জীবনের প্রয়োজনীয় উপকরণের জন্য তারা বাইরে থেকে নানা রকম সামান ও বিভিন্ন প্রকার দ্রব্য আমদানী করত এবং ইরাক, সিরিয়া ও আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষা করত।

আরবদের স্তরবিন্যাস ও শ্রেণীবিভাগ

বর্ণনাকারী ও ঐতিহাসিকগণ এ বিষয়ে একমত যে, প্রাচীন আরবগণ নিম্নোক্ত তিন ভাগে বিভক্ত : ১. আরব বায়েদাহ, যারা ইসলামের পূর্বেই খতম হয়ে গিয়েছিল। ২. আরব আরিবাহ, এরা হচ্ছে বনু কাহতান যারা আরব বায়েদার পর এসেছিল। ৩. আরব মুস্তারিবাহ, হযরত ইসমাইল (আ)-এর বংশধর যারা হেজাযে বসতি স্থাপন করেছিল। তারা বংশধারার দিক দিয়ে আরবদেরকে দু’ভাগে বিভক্ত করেন : ১. কাহতানী, যাদের আবাদীর প্রাথমিক কেন্দ্র ছিল ইয়ামন এবং ২. আদনানী, যারা প্রথমে হেজাযে বসতি স্থাপন করেছিল। এভাবেই বংশ বিশেষজ্ঞগণ আদনানের দু’টি উপশাখা আছে বলে মত ব্যক্ত করেন : একটি রবীআ ও অন্যটি মুদার। বনু কাহতান ও বনু আদনান ছিল সেই প্রাচীনকাল থেকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী। ঠিক তেমনি রবীআ ও মুদার গোত্রের মধ্যেও শতাব্দী কাল থেকে শত্রুতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে আসছিল। বংশ বিশেষজ্ঞগণ এ বিষয়ে একমত যে, কাহতানীগণ হল আসল এবং অধিকতর প্রাচীন আর আদনানীগণ এর শাখা যারা তাদের থেকে আরবী শেখে এবং এরপর তাদেরকে হযরত ইসমাইল (আ)-এর বংশধরগণ হেজাযে হিজরত করবার পর আপন করে নেয়। হযরত ইসমাইল (আ) আরব মুস্তারিবাহ অর্থাৎ আদনানীদের পূর্বপুরুষ।

আরবের লোকেরা বংশধারার দিকে বিশেষ খেয়াল রাখত এবং একে বিরাট গুরুত্ব দিত। এর স্বীকৃতি অনারব পণ্ডিতগণও সর্বদাই দিয়ে এসেছেন। অনন্তর ইরানী সেনাপতি রুস্তম তার সভাসদদেরকে, যখন তারা মুসলমানদের পক্ষ থেকে

আগত দূত হযরত মুগীরা ইবন শু‘বা (রা)-র ছিন্ন বস্ত্র ও জীর্ণ অবস্থার দরুন অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল, সতর্ক করেন যে, তোমরা তো দেখছি আজীব আহমক আর আশ্চর্য রকম বোকা! তোমরা এও জান না, আরবের লোকেরা খানাপিনা ও পোশাক-পরিচ্ছদকে আদৌ গুরুত্ব দেয় না, বরং তারা বংশধারাকে হেফাজত করে থাকে।

ভাষাগত ঐক্য

এই বিরাট বিস্তৃত এলাকার জন্য যা একটি ছোটখাট মহাদেশের মতই প্রায়, এ বিষয়টি মোটেই আশ্চর্যজনক হত না যদি এই ভূখণ্ডে ভাষার আধিক্য ও বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যেত। কেননা গোত্রগুলোর মাঝে বেশ দীর্ঘ দূরত্ব রয়েছে এবং এজন্যও যে, দক্ষিণ অঞ্চলের লোক উত্তর অঞ্চলের লোকের সঙ্গে এবং পূর্বাঞ্চলের লোক পশ্চিমাঞ্চলের লোকের সঙ্গে খুব কমই মিলিত হত। তারা গোত্রীয় অহমিকা ও বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও অভিজাত্যবোধের শিকার থাকত এবং রোম ও পারস্য সীমান্তের নিকটবর্তী বসবাসরত আরব গোত্রগুলো তাদের ভাষা দ্বারা স্বাভাবিকভাবেই, আর তা কমই হোক অথবা বেশি, প্রভাবিত ছিল এবং এটা অনিবার্যও ছিল। অতএব, এ সমস্ত কারণেই মধ্য-ইউরোপ ও ভারত উপমহাদেশে ভাষার বিস্ময়কর আধিক্য পরিলক্ষিত হয়। ভারতীয় সংবিধানে স্বীকৃত জাতীয় ভাষার সংখ্যা ১৫টি। এর ভেতর কতকগুলো স্থানীয় ভাষাও রয়েছে যেগুলোর ব্যবহারকারীদের দোভাষীর প্রয়োজন দেখা দেয় অথবা ইংরেজীর সাহায্য গ্রহণ করতে হয়।

কিন্তু জাযীরাতুল আরবের স্বীয় বিস্তৃতি ও গোত্রের আধিক্য সত্ত্বেও শুরু থেকেই এই বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রয়েছে যে, ইসলামের আবির্ভাব থেকে অদ্যাবধি এর একটিই অভিন্ন ও সাধারণ ভাষা আরবী যা চিরকাল থেকে এই উপদ্বীপের অধিবাসী বেদুইন ও সভ্য কাহতানী ও আদনানী লোকদের কথোপকথন ও পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষার সূত্র হিসাবে চলে আসছে। এ ভাষায় যদিও উচ্চারণগত ও স্থানীয় আঞ্চলিক বুলির মধ্যে কিছুটা স্বাভাবিক পার্থক্য বর্তমান (যা ভাষা দর্শন, ভৌগোলিক ও স্বাতন্ত্র্যপ্রিয় প্রবণতার কারণে জন্মলাভ করে, দূরত্বের কারণে উচ্চারণ ভঙ্গির ভেতর পার্থক্য সৃষ্টি হওয়া অনিবার্যও বটে), তথাপি এর ভেতর একটি ভাষাগত ঐক্যও বিদ্যমান থেকেছে। ইসলামের দাওয়াতের জন্য সহজসাধ্যতা, ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে ত্বরিত গতি, বিস্তৃত জনগোষ্ঠীকে একক (কুরআনী) আরবী ভাষায় সম্বোধন করা এবং এর দ্বারা প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে এই ভাষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

জাতি-গোষ্ঠীর ইতিহাসে জাযীরাতুল-আরব

প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে জানা যায় যে, জাযীরাতুল-আরবে প্রাচীন প্রস্তর যুগ (Chellean) থেকে মানব বসতির প্রমাণ পাওয়া যায় এবং যেসব পুরাতন কীর্তি পাওয়া গেছে সে সবই প্রস্তর যুগের প্রাথমিক আমলের সঙ্গে সম্পর্কিত। আরবদের উল্লেখ তাওরাতেও করা হয়েছে যদ্দ্বারা আরবদের সঙ্গে গ্রীকদের সম্পর্কের কথা জানা যায়। তাওরাতে আরবদের যে উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায় তার ইতিহাস ৭৫০-২০০ খৃ. পূ. সনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তেমনি তালমুদেও আরবদের দিকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জুযীফস ফিলাফিউস-এর পুস্তকে (যিনি ৩৭ থেকে ১০০ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন) আরবদের সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য ও নাবাতীয়দের অবস্থার সন্ধান মিলে। কিছু কিছু ভুলত্রুটি ও কিছু কিছু ভুল বোঝাবুঝি সত্ত্বেও, যা ঐসব প্রাচীন রচনাবলীতে পাওয়া যায়, ইসলামের পূর্বে লিখিত গ্রীক ও ল্যাটিন গ্রন্থসমূহেও ঐতিহাসিক অবস্থা, ঘটনাবলী ও গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক তথ্যাদি পাওয়া যায়। সে সবের ভেতর এমন বহু আরব গোত্রের নামও পাওয়া যায় যে, যদি এইসব বই-পুস্তক না থাকত তাহলে আমরা তাদের সম্পর্কে অবহিত হতে পারতাম না। আলেকজান্দ্রিয়া সেইসব গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের অন্তর্গত হিসেবে বিবেচিত হত যেখানে আরবদের অবস্থা, অভ্যাস ও দেশের উৎপাদনের অবস্থা ও প্রকৃতি জানার বিশেষ ব্যবস্থা ছিল যাতে সেখানকার জিনিসপত্র রোম সাগর উপকূলে অবস্থিত দেশগুলোর বণিকদের পর্যন্ত পৌঁছান যায়।

আরবদের কথা সর্বপ্রথম উল্লেখ করেছেন প্রাচীন গ্রীক ঐতিহাসিক আখীলাস (খৃ. পূ. ৫২৫-৪৫৬) ও হেরোডোটাস (খৃ. পূ. ৪৮০-৪২৫)। এ ছাড়া প্রাচীন আমলের আরও কিছু লেখক আছেন যাঁদের বর্ণনায় আরব ও আরব শহরগুলো সম্পর্কে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এসব লেখকের মধ্যে টলেমীর নাম উল্লেখযোগ্য, যিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় খৃ. দ্বিতীয় শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং যিনি অংকশাস্ত্রে আল-মাজেস্তী নামক গ্রন্থ লেখেন যা আরব পাঠ্য তালিকায় একটি পরিচিত পুস্তক। খৃষ্টীয় উৎসেও আরব জাহিলিয়াত ও আরব ইসলাম সম্পর্কে প্রচুর তথ্য-উপকরণ পাওয়া যায় যদিও এর বেশীর ভাগ খৃষ্টবাদের প্রচার এবং এর কেন্দ্রগুলোর বিস্তারিত বিবরণসম্বলিত।

তাওরাতে যেসব আরবদের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায় তারা আ‘রাব অর্থাৎ বেদুইন আরব আর এজন্য যে, তাওরাতে আরব বেদুইনের গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ রয়েছে। তেমনি গ্রীক ও রোমকদের পুঁথি-পুস্তকে ও ইনজীল চতুষ্টয়ে

(সুসমাচারসমূহে) যেখানে এ ধরনের গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করা হয়েছে তদ্দ্বারা বেদুইন আরবদেরকেই বোঝানো হয়েছে যারা রোমান সাম্রাজ্যে ও গ্রীক সীমান্ত এলাকাগুলোতে আক্রমণ চালাত, কাফেলা লুট করত এবং ব্যবসায়ী বণিক ও পর্যটকদের নিকট থেকে ট্যাক্স আদায় করত। সিসিলীয় ডেভিড রুশ আরবদের সম্পর্কে লিখেছেন যে, তারা স্বাধীনতাপ্রেমি, উন্মুক্ত ও খোলা পরিবেশে জীবন যাপনকারী, স্বাধীন ইচ্ছা ও অভিরুচির ধারক। এজন্য হেরোডোটাস এদের সম্পর্কে লিখেছেন যে, তারা সর্বদা এমন সব শক্তির বিরুদ্ধে মোকাবিলা করে যারা তাদেরকে গোলাম বানাতে ও হেনস্থা করতে, লাঞ্ছিত ও অপমানিত করতে চেষ্টা করে। স্বাধীনতা আরবদের এমন এক অনন্য বৈশিষ্ট্য যার জন্য তারা গ্রীক ও ল্যাটিন লেখকদের দৃষ্টিতে এক উজ্জ্বল স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী।

আরব ও ভারতবর্ষের মধ্যকার সম্পর্ক তেমনি পারস্পরিক জানাশোনা, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক লেনদেনে খুবই প্রাচীন এবং এ সম্পর্ক ইসলাম ও এর বিজয়ের বহু পূর্বের। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতবর্ষ আরবদের নিকট সবচেয়ে বেশী পরিচিত এবং ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে খুব কাছাকাছি ছিল যা ভারতীয় ও আরব উৎস ও আধুনিক গবেষণা থেকে জানা যায়।

নবুওয়াত ও আসমানী ধর্মগুলোর সঙ্গে আরব উপদ্বীপের সম্পর্ক

আরব উপদ্বীপ বহু নবীর দাওয়াতী কেন্দ্র ও আম্বিয়া আলাইহিমু’স-সালামের জন্মস্থান ছিল। কুরআন পাক বলে :

“স্মরণ কর, আদ সম্প্রদায়ের ভ্রাতার (অর্থাৎ হূদ-এর) কথা, যাঁর পূর্বে এবং পরেও সতর্ককারীরা এসেছিল, সে তার আহকাফবাসী (ইয়ামানের অন্তর্গত একটি বালুকাময় উচ্চ উপত্যকার নাম) সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছিল এই বলে : আল্লাহ্ ভিন্ন কারও ইবাদত কর না। আমি তোমাদের জন্য মহাদিবসের শাস্তির আশঙ্কা করছি” (সূরা আহকাফ : ২১)।

এই আয়াত দ্বারা হযরত হূদ (আ)-কে বোঝানো হয়েছে যাঁকে ‘আদ গোত্রের নিকট পাঠানো হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে আদ গোত্রের সম্পর্ক ছিল আরব বায়েদার সঙ্গে এবং তারা থাকত আহকাফে। حقـف বলা হয় বালির উঁচু টিলাকে। আদ সম্প্রদায়ের বসতি ছিল জাযীরার দক্ষিণে উঁচু টিলার ওপর যা আজকাল রুবউল-খালীর দক্ষিণ-পশ্চিমে হাদারামাওতের কাছাকাছি অবস্থিত। এখানে এখন জীবনযাত্রার কোন লক্ষণই আর অবশিষ্ট নেই, নেই কোন বসতি, অথচ এককালে তা ছিল শস্য-শ্যামল এলাকা ও উদ্যানপূর্ণ শহর যেখানে আদ-এর মত প্রবল পরাক্রমশালী সম্প্রদায় বাস করত। তাদেরকে আল্লাহ পাক (তাদের অবাধ্যতার দরুন) প্রবল বায়ুর দ্বারা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন আর ঝঞ্ঝাবায়ু তাদেরকে বালুর তুফানে ঢেকে ফেলেছিল।

আলোচ্য আয়াত আমাদেরকে এও বলে দিচ্ছে যে, হযরত হূদ (আ) এই এলাকায় আগমনকারী প্রথম ও শেষ নবী ছিলেন না। তাঁর আগেও ও পরেও নবী এসেছেন। এজন্যই কুরআন বলছে :

এমনিভাবে ছামূদ জাতির নবী হযরত সালিহ (আ)-এর আবির্ভাবও আরব উপদ্বীপেই হয়। ছামূদগণ ‘আল-হিজর’ নামক স্থানে বসবাস করত যা তাবুক ও হেজাজের মধ্যবর্তী একটি এলাকা। হযরত ইসমাইল (আ) জন্মের পরই মক্কায় এসে গিয়েছিলেন, সেখানেই বসবাস করেন এবং সেখানেই ইনতিকাল করেন। যদি অ রব উপদ্বীপকে আরও একটু বিস্তৃত করে মাদয়ানকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাহলে হযরত শু‘আয়ব (আ)-ও আরব প্রমাণিত হন। কারণ মাদয়ান সিরীয় এলাকায় আরব সীমান্তে অবস্থিত ছিল। আবুল ফিদা বলেন :

“মাদয়ানবাসী ছিল আরব এবং মাদয়ানেই থাকত যা মা‘আন-এর নিকটবর্তী ও সিরিয়ার সেদিকে অবস্থিত ছিল যে দিকটি ছিল হেজায় সংলগ্ন এবং মৃত সাগর (Dead Sea)-এর কাছাকাছি। তারা ছিল লূত (আ)-এর সম্প্রদায়ের পরবর্তী কালের।”

আরব ভূখণ্ড ছিল বহু নবী-রাসূলের আশ্রয় ও প্রত্যাবর্তনস্থল যাঁদের ওপর আল্লাহর বিশাল বিস্তৃত যমীন সংকীর্ণ করে তোলা হয়েছিল এবং তাঁরা নিজ দেশেই পরদেশী ও পরবাসী হয়ে গিয়েছিল। অনন্তর ঐসব নবী-রাসূল এই দূর-দরাজ ভূখণ্ডকেই বাছাই করছিলেন যে ভূখণ্ড প্রতাপশালী বাদশাহ ও অত্যাচারী শাসকদের

প্রভাব থেকে ছিল দূরে— যেমনটি হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সঙ্গে মক্কায় এবং হযরত মূসা (আ)-এর ক্ষেত্রে মাদয়ানে ঘটেছিল। এতদ্ভিন্ন আরও বহু ধর্ম আপন আপন কেন্দ্রগুলোতে ফলে-ফুলে শোভিত হবার সুযোগ না পেয়ে অবশেষে এই উপদ্বীপে এসে বসতি স্থাপন করেছিল। অনন্তর ইয়াহূদীদের একটি বিরাট দল রোমকদের জুলুম-নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ইয়ামান ও ইয়াছরিবে আগমন করে এবং খৃষ্ট ধর্ম রোম সম্রাটের জুলুম ও হত্যার কবল থেকে পালিয়ে এসে নাজরানে আশ্রয় নেয়।

আবির্ভাবের পূর্বে

মক্কায় হযরত ইসমাঈল (আ)

সায়্যিদুনা ইবরাহীম (আ) মক্কার দিকে আগমন করেন। মক্কা ছিল শুষ্ক ও ঘাস-পানিবিহীন পাহাড়বেষ্টিত। এখানে পানি, খাদ্যশস্য ও জীবন যাপনের অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রীর এমন কিছু ছিল না যা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন। তাঁর সাথে তাঁর স্ত্রী বিবি হাজেরা ও পুত্র ইসমাঈলও ছিলেন। বস্তুত এ সফর ছিল বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত মূর্তিপূজা থেকে হিজরত এবং এমন এক কেন্দ্রের ভিত্তি স্থাপনের জন্য তা করা হচ্ছিল যেখানে আল্লাহ্ তা‘আলার ইবাদত করা হবে এবং অন্য লোকদেরকেও এর দাওয়াত প্রদান করা হবে। এই কেন্দ্র হেদায়েতের একটি আলোকোজ্জ্বল মীনার, মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা ও আশ্রয়স্থল এবং তাওহীদ, দীনে হানীফ ও নির্ভেজাল দীনের দাওয়াতের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।

আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর এই নিষ্ঠাপূর্ণ আমলকে কবুল করেন, এই শুষ্ক উপত্যকায় খুব বরকত দান করেন এবং এই ক্ষুদ্র পবিত্র ও বরকতময় খানদানের জন্য যা কেবল মা ও ছেলেকে নিয়ে গঠিত ছিল (যাঁদেরকে হযরত ইবরাহীম এই বিজন ও ঘাসপানিহীন প্রান্তরে আল্লাহর ভরসায় ছেড়ে গিয়েছিলেন) পানির একটি প্রস্রবণ প্রবাহিত করে দেন যা যমযম কূপ নামে কথিত। আল্লাহ্ তা‘আলা এতে প্রচুর বরকত দান করেন।

ইসমাঈল (আ) যখন কিছুটা বড় হলেন এবং চলতে ফিরতে ও দৌড়াদৌড়ি করতে লাগলেন তখন হযরত ইবরাহীম (আ) আল্লাহ তা‘আলার প্রেমের ওপর

তাঁর ভালবাসাকে কুরবানী দিতে চাইলেন এবং তাঁকে (ইসমাঈলকে) যবাহ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কেননা স্বপ্নে তাঁকেই এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সৌভাগ্যবান পুত্র আল্লাহর নির্দেশের সামনে মস্তক অবনত করলেন এবং অত্যন্ত সন্তুষ্ট চিত্তে ও প্রশান্তির সঙ্গে এর জন্য তৈরি হলেন। কিন্তু আল্লাহ্ তা‘আলা ‘যিবহিন আজীম’- কে এর ফিদয়া হিসাবে কবুল করলেন এবং পুত্র ইসমাঈলকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখেন যাতে দাওয়াত ইলাল্লাহ্-র ক্ষেত্রে তিনি স্বীয় পিতাকে সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারেন এবং খাতামুন্নাবিয়্যীন ও সায়্যিদু’ল-মুরসালীন (স)-এর সর্বোচ্চ পিতামহ, অধিকন্তু এই মুসলিম উম্মাহর সর্বোচ্চ পিতৃপুরুষ হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করতে পারেন। এই উম্মাহর ওপর দাওয়াত ইলাল্লাহ ও জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর দায়িত্ব কিয়ামত তক সোপর্দ করা হয়েছে।

হযরত ইবরাহীম (আ) মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং পিতা-পুত্র মিলে আল্লাহর ঘর নির্মাণ করতে শুরু করেন। তাঁদের দু‘আ ছিল এই যে, আল্লাহ্ তা‘আলা এই ঘরকে কবুল করুন, এতে বরকত দিন এবং তাঁরা দু’জনই যেন ইসলামের ওপর বাঁচেন ও মরেন এবং তাঁদের ইনতিকালের পর তাঁদের বংশধরগণ এই সম্পদ ও উত্তরাধিকার যেন লাভ করেন। তাঁরা এই দাওয়াতের কেবল হেফাজতই করবে না, বরং প্রতিটি বদ, প্রতিটি কুদৃষ্টি, এ পথের প্রতিটি কাঁটা ও প্রতিটি কংকর থেকে একে সযত্নে দূরে রাখবে। শুধু তাই নয়, এই দুনিয়াতে এর পতাকাবাহী হিসাবে থাকবে, একে সব কিছুর ওপর অগ্রাধিকার দেবে, এ পথে কোন কুরবানী দিতেই সে পিছপা হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না এই দাওয়াত গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁরা আরও দু‘আ করেন যে, আল্লাহ্ তা‘আলা যেন তাঁদের বংশধরদের মাঝে এমন একজন নবীর আবির্ভাব ঘটান যিনি তাঁর সর্বোচ্চ পিতামহ ইবরাহীম (আ)-এর দাওয়াতকে নতুনভাবে জীবন দান করবেন এবং এই কাজের পূর্ণতা দান করবেন যেই কাজ তাঁরা শুরু করছেন।

“স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা‘বাঘরের প্রাচীর তুলছিল তখন তারা বলেছিল হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এই কাজ কবুল কর; নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উভয়কে তোমার একান্ত অনুগত কর এবং আমাদের বংশধর থেকে তোমার এক অনুগত উম্মত কর। আর আমাদেরকে ইবাদতের নিয়ম-পদ্ধতি দেখিয়ে দাও এবং আমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হও। তুমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মধ্যে থেকে তাদের নিকট এক রাসূল পাঠাও যে তোমার আয়াতসমূহ তাদের নিকট তিলওয়াত (আবৃত্তি) করবে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে পবিত্র করবে। তুমি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (সূরা বাকারা : ১২৭-২৯)।

হযরত ইবরাহীম (আ) এও দু‘আ করেছিলেন যে, এই ঘর সব সময় যেন শান্তি ও নিরাপত্তার দোলনা হতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের সন্তান-সন্ততিদেরকে মূর্তিপূজা থেকে যেন নিরাপদ রাখেন যার প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞা এত বেশী আর কোন কিছুতে ছিল না এবং যার থেকে বড় বিপদ স্বীয় ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য আর কিছুকে তিনি মনে করতেন না। এজন্য যে, আম্বিয়া-ই কিরামের পর তাঁদের জাতিগোষ্ঠীর পরিণতি তাঁদের চোখের সামনে ছিল এবং তাঁরা দেখেছিলেন যে, তাঁদের ক্রমাগত চেষ্টা-সাধনা ও মহান আত্মত্যাগ সত্ত্বেও এসব জাতিগোষ্ঠী কিভাবে তাঁদের পথ থেকে সরে গিয়েছিল এবং তাঁদের দুনিয়া থেকে বিদায় নিতেই শয়তান ও ফাসাদ সৃষ্টিকারী হাঙ্গামাবাজরা স্ব স্ব যুগের দাজ্জাল, মূর্তিপূজক ও জাহিলিয়াতের নিশানবরদাররা তাদেরকে শিকার বানিয়েছে এবং গ্রাসে পরিণত করেছে।

তাঁরা আল্লাহ তা‘আলার দরবারে এই আকাঙ্ক্ষাও ব্যক্ত করেন যে, তাঁদের সন্তান ও সন্তানের সন্তান-সন্ততিরা যেন এই দাওয়াত ও জিহাদের সঙ্গে আগাগোড়া সম্পর্ক কায়েম রাখে এবং তাঁর মূর্তিভাঙ্গা, শিরক ও মূর্তিপূজার প্রতি তাঁর ঘৃণা ও অসন্তোষ, সত্যের পথে অব্যাহত প্রয়াস ও চেষ্টা-সাধনা, স্বীয় মূর্তি নির্মাণকারী ও মূর্তি বিক্রেতা পিতার মোকাবিলায় তাঁর কোমর বেঁধে দাঁড়ানো, সত্যকথন ও অন্তর্জ্বালা, তাঁর হিজরত ও দেশত্যাগকে সব সময় মনে রাখে এবং এটা অনুভব করে যে, এত বড় নাযুক ও গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য এই বিরান, বালুকাপূর্ণ ও

প্রস্তরসংকুল কংকরময় যমীন (যা না কৃষি উপযোগী ছিল আর না ছিল যেখানে সভ্যতা-সংস্কৃতির লালন-পালনের ও উন্নতি-অগ্রগতির কোন উপকরণ) মনোনয়নের গূঢ় রহস্য কি এবং পৃথিবীর বড় বড় বসতি ও উদ্যান-পুষ্পোদ্যান, শহর, কৃষি ও বাণিজ্য, শিল্প-সাহিত্যের কেন্দ্রের ওপর, যেখানে সব ধরনের আরাম-আয়েশের উপকরণ মজুদ ছিল, এই বিজন মরু-কান্তর ও নাম-পরিচয়হীন ভূমিখণ্ডকে কেন অগ্রাধিকার দেওয়া হল?

তিনি (হযরত ইবরাহীম আ) আল্লাহর নিকট এও দু‘আ করেন যে, তাঁদের বংশধরদের জনপ্রিয়তা, চিত্তাকর্ষণ, গ্রহণযোগ্যতা, খ্যাতি, সৃষ্টিকুলের আশ্রয়স্থল ও ধরাতলের কেন্দ্র হওয়ার যেন সৌভাগ্য লাভ ঘটে। মানুষের অন্তর যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁদের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তারা যেন পৃথিবীর প্রতিটি কোণ থেকে এসে তাঁদের ভালবাসা ও ভক্তি-শ্রদ্ধার অর্ঘ্য তাঁদেরকে পেশ করে, প্রয়োজনীয় জীবনোপকরণ (রিযিক) আপনাআপনি সকল দিক থেকে যেন তাঁদের কাছে পৌঁছতে থাকে, সর্বপ্রকার ফলমূল, চেষ্টা-সাধনার সর্বোত্তম ফসল, উপকারিতা ও কল্যাণ লাভ যেন তাঁদের ভাগ্যে জোটে।

“আর স্মরণ কর, ইবরাহীম বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! এই নগরীকে (মক্কা মুকাররামাকে) নিরাপদ কর এবং আমাকে ও আমার পুত্রদেরকে প্রতিমা পূজা থেকে দূরে রাখ। হে আমার প্রতিপালক! এই সকল প্রতিমা বহু মানুষকে গোমরাহ করেছে। সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সেই আমার দলভুক্ত; কিন্তু কেউ আমার অবাধ্য হলে তুমি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরদের কতককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় তোমার পবিত্র ঘরের নিকট। হে আমাদের প্রতিপালক! এইজন্য যে, ওরা যেন সালাত কায়েম করে। অতএব, তুমি কিছু লোকের অন্তর ওদের প্রতি অনুরাগী করে দাও এবং ফলাদি দ্বারা ওদের জীবিকার ব্যবস্থা কর যাতে ওরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে” (সূরা ইবরাহীম : ৩৫-৩৭ আয়াত)।

কুরায়শ গোত্র

এই সব দু‘আ ও আশা-আকাঙ্ক্ষা এক এক করে পূরণ হয়। আল্লাহ তা‘আলা এই দু’জনের সন্তান-সন্ততির মধ্যে বরকত দান করেন। ফলে এই ইবরাহীমী আরবীয় খানদান ফলেফুলে সুশোভিত হয় এবং শাখা-প্রশাখায় পল্লবিত হয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ইসমাঈল (আ) জুরহুম গোত্রের সঙ্গে আত্মীয়তা বন্ধনে আবদ্ধ হন যাদেরকে আরব ‘আরিবার মধ্যে গণ্য করা হয়। ইসমাঈল (আ)-এর সন্তান-সন্ততির মাঝে খুব বরকত হয়, এমন কি এই বংশে আদনানের জন্ম হয় যাঁর বংশধারা স্মৃতি ও সতর্কতা, ধারাবাহিকতা ও সমাবেশের দিক দিয়ে আরব বংশধারায় সর্বাধিক প্রোজ্জ্বল ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।

আদনানের অনেক ছেলেমেয়ে হয়, তন্মধ্যে মা‘আদ ইবন ‘আদনান সবচেয়ে বেশী মশহুর। মা‘আদ-এর বংশে মুদার খ্যাতির অধিকারী হন এবং তাঁর বংশে ফিহির ইবন মালিক খান্দানের নাম উজ্জ্বল করেন। ফিহির ইবন মালিক ইবন নাদর-এর সন্তানের নাম কুরায়শ হিসাবে পরিচিত হয় আর এই নাম তাঁর সমস্ত নামের ওপর এমনভাবে ছেয়ে যায় যে, তা কুরায়শ গোত্র হিসাবে কথিত হয়। আরববাসী কুরায়শদের উচ্চ বংশ-মর্যাদা, নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব, বাকপটুতা ও ভাষার অলংকার, বর্ণনাশক্তি, উন্নত চরিত্র, বীরত্ব ও অটুট বলের ওপর পরিপূর্ণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন এবং এখন এটা এমন এক বাস্তব সত্যে পরিণত হয়েছে যা প্রবাদবাক্যের মত বিখ্যাত, সকল মতানৈক্যের ঊর্ধ্বে।

কুসায়্যি ইবন কিলাব-এর বংশধর

ফিহিরের বংশে কুসায়্যি ইবন কিলাবের জন্ম হয় আর মক্কার নেতৃত্ব থাকে জুরহুম গোত্রের হাতে। এরপর একদিন বায়তুল্লাহর তত্ত্বাবধায়ক ও রক্ষক খুযাআ তাদের ওপর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করেন। এরপর কুসায়্যি ইবন কিলাব-এর সৌভাগ্য তারকা উদিত হয় এবং তাঁর যোগ্যতা ও খেদমত সামনে আসে। বায়তুল্লাহর খেদমতের এই দায়িত্ব তাঁকে সোপর্দ করা হয়। কুরায়শদের সকলেই তাঁর পতাকাতলে সমবেত হয় এবং খুযাআ গোত্রকে মক্কা থেকে বেদখলপূর্বক এর শাসন-শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনা তিনি স্বহস্তে গ্রহণ করেন। কুসায়্যি ইবন কিলাব খুবই

সর্বজনগ্রাহ্য ও জনপ্রিয় সর্দার ছিলেন। বায়তুল্লাহর দেখাশোনা ও দ্বাররক্ষা ছিল তাঁর জিম্মার অন্তর্ভুক্ত। এর চাবি ছিল তাঁরই নিয়ন্ত্রণে। তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে কেউ এতে প্রবেশ করতে পারত না। এরই সাথে হাজ্জীদের যমযমের পানি পান করানো (সিকায়া)ও বার্ষিক ভোজ (রিফাদা), নদওয়া অর্থাৎ পরামর্শ সভা যা বিভিন্ন পরামর্শে, যুদ্ধের ময়দানে পতাকাবাহী ও সেনাপতি নির্বাচনে প্রভৃতির জন্য প্রয়োজন মাফিক অনুষ্ঠিত হত, সবকিছুই তাঁর এখতিয়ারাধীন ছিল আর এভাবে মক্কার সমগ্র আভিজাত্য ও সর্বপ্রকার মর্যাদা তারা লাভ করেছিল।

তাঁর বংশধরদের মধ্যে আবদ মানাফ সর্বাধিক সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তি লাভ করেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন হাশিম। হাজ্জীদের পানি পান করানো ও বার্ষিক ভোজ প্রদানের দায়িত্ব ছিল তাঁর জিম্মায়। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা)-র দাদা আবদুল মুত্তালিব-এর পিতা। হাজ্জীদের পানি পান ও বার্ষিক ভোজ প্রদানের মহাদায়িত্ব স্বীয় পিতৃব্য আল-মুত্তালিব ইবন আবদ মানাফ থেকে লাভ করেন। তিনি তাঁর গোত্রে যে সম্মান, সুনাম, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন তা তখন পর্যন্ত তাঁর পিতৃ-পিতামহদের মধ্যে আর কেউ পাননি।

বনী হাশিম

বনী হাশিম ছিল কুরায়শ গোত্রের সোনালী ও গুরুত্বপূর্ণ অলংকারতুল্য। ইতিহাস ও সীরাত গ্রন্থসমূহ এদের যেসব ঘটনা ও অবস্থা আমাদের জন্য সংরক্ষিত রেখেছে (যা প্রকৃত অবস্থা থেকে খুবই কম) যদি আমরা তা পর্যালোচনা করি তাহলে আমরা পরিমাপ করতে সক্ষম হব যে, তাদের ভদ্রোচিত মানবিক অনুভূতির কতটা প্রকাশ ঘটেছিল এবং প্রতিটি বিষয়ে ভারসাম্য, সুষ্ঠু জ্ঞানবুদ্ধি, আল্লাহর চোখে বায়তুল্লাহর যে মর্যাদা ও সম্মান-এর পূর্ণ অনুভূতি, জুলুম ও মানুষের অধিকার হরণ থেকে বিরত থাকা, উন্নত মনোবল, দুর্বল ও মজলুম মানুষের সাথে সমবেদনা ও সহানুভূতি, দানশীলতা ও বীরত্ব, মোটকথা আরবদের নিকট অশ্বারোহণের যতগুলো মহৎ ও প্রশংসনীয় গুণ রয়েছে এবং এতে যতটা সমুন্নত ও সূক্ষ্ম অর্থ লুকিয়ে রয়েছে তার ঝলক তাঁদের জীবনচরিতে আমরা দেখতে পাই। এ সেই জীবনচরিত ও কর্মনৈপুণ্য যা রাসূলুল্লাহ (সা)-র পূর্বপুরুষদের জন্য সবদিক দিয়েই উপযোগী এবং তিনি যেই মহান ও উন্নত চরিত্রের আপন কথা ও কর্মের মাধ্যমে

দাওয়াাত দিয়েছেন তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কেবল এতটুকু পার্থক্য ছিল যে, তারা ওয়াহী বিচ্ছিন্ন যুগে ছিলেন এবং জাহিলিয়াতের আকীদা-বিশ্বাস ও উপাসনাগুলোতে আপন গোত্রের সঙ্গে মোটামুটি শরীক ছিলেন।

মক্কায় মূর্তিপূজা এবং এর মূল উৎস ও ইতিহাস

কুরায়শ গোত্র হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ ও তাঁদের সর্বোচ্চ পিতামহ হযরত ইসমাঈল (আ)-এর দীনের ওপর আগাগোড়া প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং তাওহীদ ও এক আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীর ওপর দৃঢ়পদ ছিল। এভাবে আমর ইবন লুহায়্যি আল-খুযাঈর আমল আসল। সেই ছিল প্রথম ব্যক্তি যে হযরত ইসমাঈল (আ)-এর দীনে পরিবর্তন সাধন করে, মূর্তি স্থাপন করে, পশুর প্রতি সম্মান ও একে সাইবা বানানোর প্রথা কায়েম করে এবং হালাল-হারামের নতুন নিয়ম তৈরি করে, ঐশী বিধানের সঙ্গে যার কোন সম্পর্ক ছিল না এবং যা ছিল ইবরাহীমী শরীয়ত থেকে একেবারে পৃথক। এটা সৃষ্টি হয় এভাবে যে, এই ব্যক্তি মক্কা থেকে সিরিয়ায় যায় এবং দেখতে পায় যে, সেখানকার লোকেরা মূর্তি পূজা করে। এটি তার খুব পছন্দ হয়। অতঃপর সেখান থেকে কিছু মূর্তি সংগ্রহ করে এবং মক্কায় স্থাপন করে। সে লোকদেরকে এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও পূজা করবার নির্দেশ দেয়।

এও সম্ভব ও যুক্তিযুক্ত মনে হয় যে, সে সিরিয়ায় যেতে ‘বাতরা’ হয়ে অতিক্রম করে যাকে প্রাচীন ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদ বাতরা ও বাাতরাহ (patra) বলে এসেছেন। এটি পূর্ব জর্দাানের দক্ষিণে অবস্থিত বিখ্যাত পাহাড়ী কসবা যার উল্লেখ রোমক ও গ্রীকদের এখানে দেখতে পাওয়া যায়। কথিত আছে, একে নাবাতীয়রা, যারা ছিল মূলত আরব, হাজার বছর আগে নির্মাণ করেছিল। বরাবর এরা মিসর, সিরিয়া, ফোরাত উপত্যকা ও রোম সফর করত এবং হতে পারে যে, ফোরাত উপত্যকায় পৌঁছতে গিয়ে তারা অবশ্যই হেজায অতিক্রম করে থাকবে। এরা প্রকাশ্য মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিল। পাথর কেটে তারা মূর্তি তৈরি করত এবং তার পূজা

করত। ঐতিহাসিকদের ধারণা, উত্তর হেজাযের বিখ্যাত মূর্তি ‘লাত’ যাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূর্তি মনে করা হত, প্রকৃতপক্ষে ‘বাতরা’ থেকেই আমদানী করা হয়েছিল এবং গুরুত্বপূর্ণ ও বিশিষ্ট মূর্তিগুলোর অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছিল।

ঐতিহাসিক ফিলিপ কে হিট্টির বিখ্যাত গ্রন্থ History of Syria-তেও এর সমর্থন মেলে। এতে ঐসব নাবাতিয় এলাকার (বর্তমান পূর্ব জর্দান) ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য হল :

“ঐসব উপাস্য দেবদেবীর সর্দার ছিল যু‘শ-শারা যা ছিল একটি সমান্তরাল স্তম্ভ কিংবা কৃষ্ণ চতুর্ভুজ প্রস্তর সদৃশ। লাত, আরবরা যার পূজা করত, প্রকৃতপক্ষে যি‘শ-শারার সঙ্গেই সম্পর্কিত ছিল। অপর নাবাতী মূর্তি, যার উল্লেখ ঐসব ঐতিহাসিক নিদর্শন ও প্রাচীন নাবাতিয় লিপি ও চিত্রে পাওয়া যায় তা ‘মানাত’ ও ‘উয্যা’। ঐ সব লিপিতে ‘হুবল’ দেবতার উল্লেখও পাওয়া যায়।

মনে রাখতে হবে যে, এটা সেই যুগ যে যুগে মূর্তিপূজার বিভিন্ন ধরন আরব উপদ্বীপের চতুর্দিকে ও জলে-স্থলে সর্বত্র বিস্তার লাভ করছিল এবং হযরত ঈসা মসীহ (আ) ও তাঁর হাওয়ারীদের দাওয়াত তখনও প্রকাশ পায়নি যিনি মূর্তি পূজার এই অগ্রাভিযান থামিয়ে দেন। তিনি এর দ্রুত গতি ও তৎপরতা হ্রাস করেন। থাকল ইয়াহূদী ধর্ম। ইয়াহূদী ধর্ম সীমিত ও বংশীয় ধর্ম ছিল যে ধর্ম কেবল বনী ইসরাঈলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং বনী ইসরাঈল ছাড়া আর কাউকে তাওহীদ তথা একত্ববাদের দাওয়াত দেবার অনুমতি এতে ছিল না। De lacy O’Leary তদীয় Arabia before Muhammad নামক গ্রন্থে বলেন :

“একথা বলা কিছুমাত্র ভুল হবে না যে, মূর্তির উপাসনা প্রকৃতপক্ষে সিরিয়ার ধর্ম যা আরব উপদ্বীপ সিরীয় ও গ্রীকদের মিলিত ঐতিহ্য থেকে পেয়েছে যা সিরিয়ায় সাধারণ ব্যাপার ছিল এবং সম্ভবত আরবের অবশিষ্ট অংশে এর বেশি রেওয়াজ বা প্রচলন ছিল না।”

ঠিক তেমনি ফোরাত উপত্যকা ও আরব উপদ্বীপের পূর্ব দিকে মূর্তিপূজা

ব্যাপক ছিল এবং যেহেতু এই এলাকার সঙ্গে আরব উপদ্বীপের বন্ধুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল সেহেতু কিছুমাত্র অসম্ভব নয় যে, আরব উপদ্বীপে মূর্তিপূজার বিস্তার লাভে এই এলাকারও একটা হিস্যা রয়েছে। Georges Roux তদীয় Ancient Iraq নামক গ্রন্থে এ কথা পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন যে, ইরাকের প্রাচীন ঐতিহাসিক লিপিপ্রণালী এটা প্রকাশ করছে যে, মূর্তিপূজা সেখানে খৃষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দী এবং এর পর পর্যন্ত ব্যাপক ছিল। এই দেশ ঐসব মূর্তি ও উপাস্য দেবদেবীর কেন্দ্র ছিল। এখানে বিদেশী মূর্তি যেমন ছিল, তেমনি স্থানীয় মূর্তিও ছিল।

একটি বর্ণনাতে এও পাওয়া যায় যে, কুরায়শদের মধ্যে মূর্তিপূজার সূচনা ক্রমান্বয়ে হয়েছে। এর একটি ব্যাখ্যা আরব ঐতিহাসিকদের বর্ণনা থেকেও পাওয়া যেতে পারে। প্রথমে ঐসব লোক যখন মক্কা থেকে কোথাও সফর করত তখন হারাম শরীফের কিছু পাথর ‘তাবারক’ হিসাবে সম্মানের সঙ্গে নিয়ে যেত। এরপর যে পাথর তাদের বেশি পছন্দ হত তার ইবাদত করতে থাকত। তাদের সন্তান-সন্ততি ও নতুন বংশধর এর বিস্তৃত বিবরণ সম্পর্কেও ছিল অজ্ঞ। তারা প্রকাশ্য মূর্তিপূজা গ্রহণ করে এবং এভাবে অপরাপর পথভ্রষ্ট জাতিগোষ্ঠীর মত এরাও গোমরাহীর অতলে গিয়ে নিক্ষিপ্ত হয়। এতদসত্ত্বেও ইবরাহীমী যুগের কিছু অবশিষ্ট আমল ও বিবরণকে তারা নিজেদের বুকে সযত্নে তুলে রাখে। যেমন বায়তুল্লাহর তা‘জীম, তাওয়াফ, হজ্জ ও ওমরাহ। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের পর্যায়ক্রমিক ইতিহাস ও উপায়-উপকরণ থেকে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পর্যন্ত এবং ভূমিকা থেকে পরিণতি পর্যন্ত তাদের ক্রমিক স্থানান্তরের পর্যালোচনা থেকে ঐসব ঐতিহাসিকের এ কথা সমর্থিত হয় যে, আরবদের মধ্যে, বিশেষ করে কুরায়শদের ভিতর মূর্তিপূজার সূচনা কিভাবে হয়েছিল। অপরাপর কতক মুসলিম জাতিগোষ্ঠী ও ফেরকার মধ্যে ছবি, প্রতিকৃতি ও মাযারের সঙ্গে সম্পর্ক, পবিত্রতা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে যে বাড়াবাড়ি পরিলক্ষিত হয় সে সব ইতিহাস থেকেও এর সত্যতা সমর্থিত হয়। এজন্যই ইসলামী শরীয়ত সেই সমস্ত রাস্তা ও চোরাপথ প্রথমেই বন্ধ করে দিয়েছে যা শিরক অথবা ব্যক্তি, স্থান, স্মৃতিচিহ্নের পবিত্রতা জ্ঞান ও সম্মান প্রদর্শনের

ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির দিকে টেনে নিয়ে যায়।

আসহাবুল ফীল-এর ঘটনা

ঐ যুগেই এমন একটি বিপর্যয়কর ঘটনা সংঘটিত হয় যার চেয়ে বড় কোন ঘটনা আরবদের ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। এ কথার প্রমাণ যে, বড় কোন ব্যাপার নিকট ভবিষ্যতে সংঘটিত হতে যাচ্ছে এবং আল্লাহ্ তা‘আলা আরবদের জন্য কোন কল্যাণপ্রদ বিষয়ের অভিপ্রায় পোষণ করেন এবং কা‘বার শান ও মর্যাদা এভাবে উজ্জ্বল ও প্রোজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠবে যেই শান ও মর্যাদা পৃথিবীর আর কোন ইবাদতগাহের, আর কোন উপাসনাগৃহের হবে না। এরই সাথে এই ঘরের সঙ্গে ধর্মের ইতিহাস এবং মানবতার ভবিষ্যতের সেই চিরন্তন পয়গাম, অবিনশ্বর কর্মনৈপুণ্য বিজড়িত যা তাকে আনজাম দিতে হবে এবং পূর্ণতা পর্যন্ত পৌঁছতে হবে।

আল্লাহর নজরে বায়তুল্লাহর সম্মান ও মর্যাদা

এবং এ ব্যাপারে কুরায়শদের আকীদা

কুরায়শরা এই আকীদা ও বিশ্বাস পোষণ করত যে, আল্লাহর দৃষ্টিতে এই ঘরের

একটি বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে এবং তিনিই এই ঘরের সহায়ক, রক্ষক ও সাহায্যকারী। তাদের এই আকীদা-বিশ্বাস রাসূলুল্লাহ (সা)-র পিতামহ কুরায়শ সর্দার আবদুল মুত্তালিব ও হাবশা (আবিসিনিয়া)-র বাদশাহ আবরাহার কথোপকথন থেকে পরিষ্কার প্রতিভাত হয়। আবদুল মুত্তালিবের দু’শ উট আবরাহার লোকেরা ধরে নিয়ে যায়। এ জন্য তিনি আবরাহার সাথে দেখা করতে যান এবং ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চান। আবরাহা তাঁকে খুবই সম্মান করে, সিংহাসন থেকে নেমে আসে এবং পাশে বসিয়ে আগমনের হেতু জিজ্ঞাসা করে। তিনি বলেন : আমার দু’শ উট বাদশাহর লোকেরা ধরে নিয়ে এসেছে। আমি সেগুলো ফিরিয়ে নিতে চাই। বাদশাহ আবদু’ল-মুত্তালিবকে এই সামান্য ও ব্যক্তিগত দাবি পেশ করায় অত্যন্ত বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, তুমি দু’শ উটের কথা বলতে এসেছ যা আমার লোকেরা নিয়ে এসেছে, অথচ সেই ঘরের কথা ভাবছ না যার ওপর তোমাদের ও তোমাদের পিতা-পিতামহের ধর্ম প্রতিষ্ঠিত এবং যে ঘর ধ্বংসিয়ে দেবার জন্য আমার আগমন। এর জন্য তুমি কিছু বলছ না?

আবদু’ল-মুত্তালিব অত্যন্ত আস্থা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এর জবাব দেন এবং বলেন : আমি উটের মালিক, সেজন্য আমি আমার মালিকানাধীন বিষয়ের ভাবনা ভাবছি। কা’বা ঘরের মালিক যিনি তিনিই তাঁর ঘরের ভাবনা ভাবছেন এবং তিনিই এর হেফাজত করবেন।

বাদশাহ বলল : ঐ ঘর আমার হাত থেকে কি করে বাঁচতে পারে? তিনি উত্তর দেন : انت ذاك = তা তুমি জান আর জানে ঘরের মালিক। (ওটা আমার দেখার বিষয় নয়)।

এরপর যা কিছু ঘটেছে তার বিস্তৃত বিবরণ সামনে আসছে এবং এ থেকে এটা পরিষ্কার প্রতিভাত হয় যে, এখন আর কোন আক্রমণকারীর সাহস হবে না এর প্রতি কুনজরে দেখা এবং এর ওপর হস্তক্ষেপ করার। তাঁর ঘর ও তাঁর দীনের হেফাজত আল্লাহ তা’আলার নিজস্ব দায়িত্ব ছিল এবং এ কাজের পূর্ণতা দান তাঁকেই করা দরকার ছিল।

গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই যে, আবরাহা আল-আশরাম আবিসিনিয়া অধিপতি সম্রাট নাজাশী কর্তৃক নিযুক্ত সান‘আর গভর্নর ছিল। সে সান‘আয় একটি বিরাট গির্জা নির্মাণ করে এবং এর নাম রাখে আল-কুল্লায়স। উদ্দেশ্য ছিল, মানুষ হজ্জের নিমিত্ত আরবে না গিয়ে সান‘আগামী হবে। কেননা এটা

তার জন্য খুবই মনোকষ্টের কারণ ছিল যে, কা‘বা আল্লাহর বান্দাদের আশ্রয়কেন্দ্র ও প্রত্যাবর্তনস্থল হিসাবে অবশিষ্ট থাকুক এবং লোকে দূর-দরাজ এলাকা থেকে কাফেলার পর কাফেলা এসে সেখানে উপস্থিত হোক। সে চাইত, এই মর্যাদা তৎকর্তৃক নির্মিত গির্জা লাভ করুক।

আরবদের জন্য ব্যাপারটি ছিল খুবই মর্মপীড়ার কারণ। কেননা কা‘বার প্রতি ভালবাসা ছিল তাদের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত এবং এ ভালবাসা তাদের অস্থিমজ্জায় মিশে গিয়েছিল। তারা কোন ঘর, উপাসনালয় ও ধর্মীয় কেন্দ্রকেই এর সমকক্ষ মনে করত না এবং একে ছেড়ে কোন বৃহৎ থেকে বৃহত্তর সম্পদ গ্রহণ করতেও তারা রাজি ছিল না। এই ব্যাপারটা তাদের মন-মস্তিষ্ককে দারুণভাবে নাড়া দিল এবং সর্বত্র এর গুঞ্জন শুরু হল। এরই মাঝে এক কানানী যুবক এ ব্যাপারে একটা কিছু করার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল এবং উল্লেখিত গির্জায় গিয়ে পায়খানা করল এবং একে অপবিত্র করে দিল। ফলে সংকট এক নতুন মোড় নিল। আবরাহা এতে দারুণভাবে ক্রুদ্ধ হল এবং তক্ষুনি কসম খেল যে, সে স্বয়ং কা‘বার ওপর হামলা করবে এবং একে মাটির সাথে না মিশিয়ে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে না।

আবরাহা তার বাহিনী নিয়ে চলল এবং বিরাট সংখ্যক হাতী সঙ্গে নিল। আরবরা হাতী সম্পর্কে আগেভাগেই অনেক কিছু শুনেছিল। এ সংবাদ তাদের নিকট বিদ্যুতের মত আপতিত হল এবং তারা এই আক্রমণ সংবাদে ভীষণভাবে ভীত ও সন্ত্রস্ত হল। তারা চেষ্টা করল যাতে এই বাহিনীকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়া থেকে বাধা দেওয়া যায়। কিন্তু খুব শিগগিরই তারা বুঝতে পারল যে, আবরাহার সেনাবাহিনীকে মোকাবিলা করা তাদের সাধ্যের বাইরে। অতএব, নিতান্ত নিরুপায় হয়ে গোটা বিষয়টি আল্লাহর নিকট সোপর্দ করল। তাদের পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে, এই ঘরের যিনি মালিক তিনি স্বয়ং একে রক্ষা করবেন।

কুরায়শরা সেনাবাহিনী আভিযান ও জুলুম-নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচার নিমিত্ত পাহাড় ও উপত্যকায় গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং অপেক্ষা করতে থাকে যে, আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর ঘরের সম্মান ও সম্ভ্রম রক্ষায় কি করেন। আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর সঙ্গী কুরায়শদের কিছু লোক কা‘বার দরজার শিকল ধরে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটিতে মগ্ন হয়ে যান এবং আবরাহা ও তার বাহিনীর পরাজয়ের নিমিত্ত আল্লাহর সাহায্যের জন্য দু‘আ করেন। এদিকে আবরাহা তার বাহিনীসহ কা‘বার দিকে অগ্রসর হয়। ‘মাহমূদ’ নামক হাতীকে সে হামলার জন্য তৈরি করে। কিন্তু মক্কার পথে হাতী এক জায়গায় বসে পড়ে। কয়েকবার মারপিট সত্ত্বেও সে উঠতে অস্বীকার করে। কিন্তু ইয়ামানের দিকে খেদাতে চাইলে সে তক্ষুণি উঠে দ্রুতবেগে সামনে অগ্রসর হয়। সেই সময় আল্লাহ্ তা‘আলার সমুদ্রের দিক থেকে এক ঝাঁক পাখি প্রেরণ করেন। পাখিগুলোর পাঞ্জায় ছিল ছোট ছোট নুড়ি পাথর। পাখির ঝাঁক আবরাহার বাহিনীর ওপর নুড়ি পাথর নিক্ষেপ করতে লাগল। এ সব পাথর যার গায়ে লাগল সেই লাশে পরিণত হল। এতদ্দৃষ্টে আবিসিনিয়ার লোকেরা যে দিক দিয়ে এসেছিল প্রাণভয়ে সেদিকেই দৌড়ে পালাতে লাগল। পাখিগুলো অবিরত পাথর নিক্ষেপ করছিল আর বাহিনীর লোকেরা লাশে পরিণত হচ্ছিল। আবরাহা নিক্ষিপ্ত পাথরে আহত হয়ে যায়। তাকে উঠিয়ে নেয়া হয়। তার শরীরের এক একটি অঙ্গ খসে খসে পড়ে। অবশেষে সান‘আয় পৌঁছে তার করুণ মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনাই কুরআন কারীমে এভাবে বর্ণিত হয়েছে:

“তুমি কি দেখ নি তোমার প্রতিপালক হাতীওয়ালাদের সঙ্গে কী করেছিলেন? তিনি কি ওদের কৌশল ব্যর্থ করে দেননি? তিনি ওদের বিরুদ্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি প্রেরণ করেন, যারা ওদের ওপর প্রস্তর-কাঁকর নিক্ষেপ করে। অতঃপর তিনি ওদেরকে ভক্ষিত ঘাসের ন্যায় করেন।”

ফীল (হাতী)-এর ঘটনা ও তার প্রভাব

আল্লাহ্ তা‘আলা যখন আবিসিনিয়ার লোকদেরকে মক্কা থেকে ব্যর্থ ও বিফল অবস্থায় ফিরিয়ে দিলেন এবং তাদের ওপর এই আযাব অবতীর্ণ হল তখন আরবদের

দিল স্বভাবতই কুরায়শদের প্রতি সম্মান ও মর্যাদাবোধের সৃষ্টি হল। তারা বলতে লাগল যে, নিশ্চিতই এরা আল্লাহ্ওয়ালা মানুষ। তাদের পক্ষ হয়ে আল্লাহ পাক তাদের দুশমনকে পরাভূত ও পর্যুদস্ত করেছেন, এমন কি তাদের লড়তে পর্যন্ত হয়নি। তাদের দিলে কা‘বার মর্যাদা ও মাহাত্ম্য পূর্বের তুলনায় অনেক গুণ বেড়ে যায় এবং আল্লাহ্ নিকট কুরায়শদের সম্মান ও মর্যাদার ব্যাপারে তাদের প্রতীতি বৃদ্ধি পায়।

এ ছিল আল্লাহ তা‘আলার এক প্রকাশ্য নিদর্শন এবং এ কথার ভূমিকা যে, সত্ত্বর মক্কায় এমন একজন নবীর আবির্ভাব ঘটবে যিনি কা‘বাকে মূর্তির আবর্জনা ও জঞ্জাল থেকে মুক্ত করবেন, পবিত্র করবেন। তাঁর হাতে এর শান দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে। তাঁর প্রচারিত দীনের এই ঘরের সঙ্গে খুব গভীর, স্থায়ী ও চিরন্তন সম্পর্ক কায়েম হবে। এই ঘটনা থেকে এও পরিমাপ করা যাচ্ছিল যে, ঐ নবীর আবির্ভাবের পবিত্র দিন খুব বেশী দূরে নয়।

আরবদের মাঝে এই ঘটনার অনিবার্যভাবে গভীর প্রভাব পড়ে। এর থেকে তারা নতুন তারিখ গণনা শুরু করে। অনন্তর তাদের লেখায় এ ধরনের রেওয়াজ দেখা যায় যে, এই ব্যাপারটা ‘আমুল-ফীল অর্থাৎ হাতীর বছরে দেখা গিয়েছিল, অমুক ‘আমুল-ফীলে জন্ম নেয়, এই ঘটনা ‘আমুল-ফীলের এত বছর পরের। ‘আমুল-ফীল ছিল খৃষ্টীয় ৫৭০ সাল।