তায়েফ যুদ্ধ

তায়েফ যুদ্ধ
(শাওয়াল ৮ হিজরী)

ছাকীফের অবশিষ্ট বাহিনী

ছাকীফের অবশিষ্ট বাহিনী তায়েফে এল এবং এখানে এসে শহরের দরজা বন্ধ করে দিল। তারা দুর্গের ভেতর এক বছরের খাদ্যশস্য মজুদ করল এবং যুদ্ধের জন্য তৈরী হল। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে শায়েস্তা করার জন্য তায়েফ অভিমুখে রওনা হলেন এবং সেখানে শহরের কাছাকাছি ছাউনি ফেললেন। কিন্তু মুসলমানরা শহরে প্রবেশ করতে পারলেন না। কেননা শহরের সমস্ত দরজা প্রথম থেকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ছাকীফের লোকেরা মুসলমানদের ওপর এমন মুষলধারে তীর বর্ষণ শুরু করে যে, মনে হচ্ছিল যেন তীর নয়, পতঙ্গের পাল তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। ছাকীফের লোকদের দক্ষ তীরন্দায হিসাবে পূর্ব থেকেই খ্যাতি ছিল।

তায়েফ অবরোধ

রাসূলুল্লাহ (সা) এতদ্দৃশ্যে সেনাবাহিনীকে অন্যদিকে সরিয়ে দিলেন এবং পঁচিশ-তিরিশ দিন অবধি তাদেরকে অবরোধ করে রাখলেন। ইতোমধ্যে তাদের সঙ্গে বেশ প্রচণ্ড যুদ্ধও চলেছে এবং উভয় পক্ষের মাঝে প্রবল তীর বর্ষণও হয়েছে। এই যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল (সা) প্রথম বারের মত মিনজানীক ব্যবহার করেন। অবরোধ ছিল কঠোর প্রকৃতির। মুসলমানদের কয়েকজন কাফিরদের তীর বর্ষণে শাহাদাত বরণ করেন।

যুদ্ধের ময়দানে দয়া প্রদর্শন

অবরোধ ও যুদ্ধ দীর্ঘ হতে থাকলে আল্লাহর রাসূল (সা) ছাকীফ গোত্রের আঙুর বাগান কাটবার হুকুম দিলেন। এসব বাগানের আয়ের ওপর তাদের জীবিকা নির্বাহ হত। মুসলমানদের এসব বাগান কাটতে দেখে তারা অনন্যোপায় হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-র নিকট সনির্বন্ধ অনুরোধ পাঠাল যে, আল্লাহর ওয়াস্তে ও আত্মীয়তার দিকে তাকিয়ে বাগানগুলো যেন তিনি না কাটেন। তিনি তাদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে বলেন, আমিও আল্লাহর ওয়াস্তে ও আত্মীয়তার সম্পর্কের দিকে তাকিয়ে গাছ কাটা ছেড়ে দিলাম।

অতঃপর আল্লাহর রাসূল (সা) এই ঘোষণা দিয়ে দিলেন, যেসব ক্রীতদাস দুর্গ থেকে বেরিয়ে আমাদের কাছে চলে আসবে তারা মুক্ত ও স্বাধীন। অনন্তর এই ঘোষণা শ্রবণে দশজনের অধিক ক্রীতদাস বাইরে বেরিয়ে আসে যাদের ভেতর আবূ বাকরাও ছিলেন। পরবর্তী কালে আবূ বাকরা (রা) একজন বিখ্যাত হাদীস বর্ণনাকারী ও আলিম সাহাবীরূপে পরিচিত হন। তিনি সকলকেই মুক্ত করে দেন এবং এদের প্রত্যেককে এক একজন মুসলমানের হাতে সোপর্দ করেন এবং এদের খানাপিনার জিম্মাদারীও তাদেরকে অর্পণ করেন। এই ঘোষণা তাদের খুব মনঃকষ্টের কারণ হয়।

অবরোধের অবসান

আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে তায়েফ জয়ের আদেশ দেওয়া হয়নি। এজন্য তিনি হযরত ওমর (রা)-কে হুকুম দিলেন যে, ওমর (রা) যেন প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দেয়। তিনি ফিরে যাবার ঘোষণা দিতেই লোকে শোরগোল শুরু করে এবং তায়েফ জয় না করে ফিরে যেতে অনীহা প্রকাশ করে। তারা বলতে থাকে: আমরা তায়েফ জয় না করে কিভাবে ফিরে যেতে পারি? রাসূলুল্লাহ (সা) তখন বললেন: আচ্ছা, ঠিক আছে। চলো, আমরা লড়াই করি। তাঁরা লড়াইয়ের সূচনা করলেন এবং পরিণতিতে চরম আঘাত খেলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) ঘোষণা দিলেন: আমরা কাল ভোরে ইনশাআল্লাহ ফিরে যাব। মুসলমানরা এই ঘোষণা শুনে খুবই খুশী হন এবং প্রস্তুতিতে লেগে যান। আল্লাহর রাসূল (সা) এই দৃশ্য দেখে হাসতে লাগলেন।

হুনায়েনের গোলাম-বাঁদী ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ

আল্লাহ্ রাসূল (সা) তাঁর সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে জি’রানায় অবস্থান করেন এবং হাওয়াযিন গোত্রকে দশ-বিশ দিনের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের ও তাঁর খেদমতে হাজির হওয়ার মওকা দেন। এরপর তিনি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টন করতে শুরু করেন এবং মুওয়াল্লাফাতুল-কুলূব (অর্থাৎ সেইসব নও মুসলিম যাদের অন্তর-মন জয় ও প্রবোধ দানের নিমিত্তে অংশ দেওয়া হত)-এর হক সর্বাগ্রে দান করেন। আবূ সুফিয়ান ও তাঁর দুই পুত্র ইয়াযীদ ও মু’আবিয়াকে তিনি দিল খুলে দান করেন। হাকীম ইবনুল-হিযাম, নযর ইবনুল-হারিছ, ‘আলা ইবনুল-হারিছা ছাড়াও কুরায়শ নেতৃবর্গকে অত্যন্ত উদার হাতে ও বিপুল পরিমাণে দান করেন। অতঃপর তিনি সাধারণ যুদ্ধলব্ধ সামগ্রী চেয়ে আনেন এবং সমস্ত লোক ডেকে তাদের মধ্যে এসব সামগ্রী বণ্টন করে দেন।

আনসারদের ভালবাসা ও তাঁদের আত্মত্যাগ

এইসব সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে তিনি কুরায়শ সর্দার ও “মুওয়াল্লাফাতুল-কুলূব”-দেরকে বিরাট অংশ দান করেছিলেন এবং আনসারদেরকে দেওয়া হয়েছিল খুবই মা’মূলী পরিমাণ। ফলে কিছু আনসার যুবকের মধ্যে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেল এবং তাঁরা কানাঘুষা শুরু করলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বিষয়টা টের পেতেই তাঁদেরকে পৃথকভাবে এক জায়গায় জড়ো করলেন এবং তাঁদের সামনে এমন মর্মস্পর্শী ও শক্তিশালী ভাষণ দিলেন যে, তাঁদের হৃদয় বীণার তারে তা ঝংকার তুলল, চক্ষু হল অশ্রুসিক্ত এবং ভালবাসা ও আবেগের ধারা তাঁদের অন্তর-মাঝে উপচে পড়ল।

তিনি বললেন, “আমি কি তোমাদের কাছে এই অবস্থায় আসিনি যখন তোমরা গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট ছিলে? অতঃপর আল্লাহ তা’আলা আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে হেদায়েত দান করলেন। তোমরা গরীব ও দরিদ্র ছিলে; আল্লাহ তা’আলা আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে ধনী ও সম্পদশালী বানালেন। তোমরা একে অপরের শত্রু ছিলে; আল্লাহ তা’আলা আমার মাধ্যমে তোমাদের ভাঙা অন্তরগুলো জোড়া লাগালেন?”

সকলেই জওয়াব দিলেন: আল্লাহ ও তদীয় রাসূল (সা)-এর দয়া ও অনুগ্রহ সবচেয়ে বেশি। এরপর তাঁরা চুপ করলে তিনি বলেন: “ওহে আনসার! তোমরা কি আমার এই প্রশ্নের উত্তর দেবে?”

তারা বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা আপনার কথার কী জওয়াব দিতে পারি? সকল অনুগ্রহ ও দয়া আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের।”

তিনি বললেন: না, আল্লাহ্র কসম! যদি তোমরা চাও তবে বলতে পার আর তোমরা যা বলবে তা সত্য হবে এবং আমি তা সমর্থন করব। তোমরা বল যে, আপনি তো আমাদের কাছে এসেছিলেন এমন অবস্থায় যখন আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়েছিল। সে সময় আমরা আপনাকে সত্য বলে মেনেছি, আপনাকে সমর্থন করেছি। সবাই আপনাকে পরিত্যাগ করেছিল, আমরা আপনাকে সাহায্য করেছি। আপনাকে লোকেরা আশ্রয়চ্যুত করেছিল, আমরা আপনাকে আশ্রয় দিয়েছি। আপনার হাত ছিল খালি; আমরাই আপনাকে সমবেদনা জানিয়েছি, আপনাকে সান্ত্বনা দিয়েছি, শোকে-দুঃখে প্রবোধ দিয়েছি।

এরপর তিনি তাঁদের দিকে ফিরে এমন একটি কথা বললেন যার ভেতর গৌরব ও আস্থা যেমন ছিল, তেমনি এই বণ্টন ও বদান্যতার রহস্যও বলে দেওয়া হয়েছিল।

তিনি বললেন: ওহে আনসার সম্প্রদায়! দুনিয়ার কয়েক দিনের হাসি-খুশীর নিমিত্ত তাদের হৃদয়-মনকে উপশমিত করবার জন্য তাদেরকে কিছু দিয়েছি যাতে তারা ইসলামের ওপর দৃঢ়পদ থাকে। তোমাদেরকে ইসলামে তোমাদের গভীর আস্থার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। এখন তোমাদের মনে আমার সম্পর্কে নানা কথার উদ্ভাব ঘটেছে।

এরপর তিনি এমন এক কথা বললেন যা শুনে তাঁরা নিজেদেরকে আর সংবরণ করতে পারেন নি এবং ঈমানী ভালবাসার স্রোতধারা তাঁদের মনের গহীনে স্বতঃউৎসারিত হয়ে গেল।

তিনি বললেন: ওহে আনসার সম্প্রদায়! তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, লোক তাদের সঙ্গে ভেড়া-বক্রী নিয়ে যাক আর তোমাদের তাঁবুতে আল্লাহ্র রাসূলকে সাথে নিয়ে প্রত্যাবর্তন কর? ওরা ওদের সাথে যা নিয়ে যাচ্ছে তা থেকে অনেক উত্তম যা তোমরা নিজেদের সাথে নিয়ে যাবে। যদি হিজরত না থাকত তাহলে আমি আনসারদেরই একজন সদস্য থাকতাম। যদি সমস্ত লোক এক রাস্তায় ও এক উপত্যকার ভেতর দিয়ে পথ চলে আর আনসাররা অন্য উপত্যকায় পথ চলে তাহলে আমি আনসারদের সঙ্গে সেই উপত্যকার পথ ধরেই চলব। আনসাররা আমার শরীরের সঙ্গে লেগে থাকা অঙ্গাবরণ এবং অন্যান্য লোক চাদরতুল্য বহিরাবরণ। হে আল্লাহ! তুমি আনসারদের ওপর রহম কর, আনসার সন্তানদের ওপর রহম কর এবং আনসার সন্তানের সন্তানদের ওপর রহম কর।

এতদশ্ৰবণে সকল আনসার কান্নায় ভেঙে পড়লেন। চোখের পানিতে তাঁদের দাড়ি পর্যন্ত ভিজে গেল। তাঁরা বলতে লাগলেন: আল্লাহ্ রাসূল আমাদের ভাগে, আমাদের অংশে পড়েছেন, এতেই আমরা খুশী (আমরা আর কিছু চাই না)।

বন্দীদের প্রত্যর্পণ

হাওয়াযিন গোত্রের ১৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে এসে সাক্ষাৎ করল এবং তাঁর নিকট দয়াপরবশ হয়ে তাদের বন্দীদেরকে এবং তাদের মালমাত্তা ফিরিয়ে দেবার জন্য আবেদন জানাল। তিনি তাদেরকে বললেন, “তোমরা দেখতে পাচ্ছ যে, আমার সঙ্গে কারা কারা রয়েছেন। আমার নিকট সবচেয়ে পছন্দীয় কথা হল যা সত্য। এখন তোমরা বল, তোমাদের সন্তান-সন্ততি ও তোমাদের মহিলারা তোমাদের নিকট বেশি প্রিয়, নাকি তোমাদের মালমাত্তা ও অপরাপর সামগ্রী?”

উত্তরে তারা জানাল যে, তাদের সন্তান-সন্ততি ও মহিলারাই তাদের নিকট বেশি প্রিয়। এর সমতুল্য তারা অন্য কিছুকে মনে করে না। আল্লাহ্ রাসূল (সা) তখন তাদেরকে বললেন: যাও, কাল ভোরে সালাত আদায়ের পর তোমরা দাঁড়িয়ে বলবে, আমরা মুসলমানদের জন্য আল্লাহ্ রাসূল (সা)-কে সুপারিশকারী বানাচ্ছি এবং আল্লাহ্ রাসূল (সা)-এর সামনে মুসলমানদেরকে সুপারিশকারী বানিয়ে পেশ করছি, আপনি আমাদের গোলাম-বাঁদী ফিরিয়ে দিন। অতঃপর পরদিন তিনি যখন সালাত আদায় থেকে মুক্ত হলেন তখন তারা নির্দেশ মাফিক তাদের আবেদন পেশ করল। তখন তিনি বললেন: আমার অংশে ও বনী আব্দুল-মুত্তালিবের অংশে যা কিছু আছে তা তোমাদেরকে সমর্পণ করলাম। আর অন্যদের নিকট তোমাদের সুপারিশ করছি। অনন্তর সুপারিশের প্রেক্ষিতে মুহাজির ও আনসারগণ বললেন: আমাদের অংশে যা কিছু আছে আমরা আল্লাহ্ রাসূলের খেদমতে তা পেশ করলাম।

কিন্তু বনী তামীম, বনী ফাযারা ও বনী সুলায়ম-এর তিনজন তাদের অংশ ছাড়তে রাজী হল না। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে বুঝিয়ে বললেন: এই লোকগুলো মুসলমান হয়ে আমাদের কাছে এসেছে। আমি তাদের অপেক্ষাও করেছি এবং তাদেরকে এখতিয়ারও দিয়েছি। কিন্তু তারা তাদের সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রীদের তুলনায় অন্য কিছুকে প্রাধান্য দেয়নি। অতএব তোমাদের কাছে যদি এমন কোন বন্দী থাকে আর সে যদি খুশী মনে তা দিতে চায় তবে সেজন্য পথ খোলা

রয়েছে। আর যদি কেউ তার হক ছাড়তে না চায় তবুও সে তা তাদেরকে দিয়ে দিক। আমি তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে প্রাপ্ত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ থেকে এর ছয় গুণ বেশি দেবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।

সকলেই বলল : রাসুলুল্লাহ (সা)-এর খাতিরে আমরা খুশী মনে হাজির করছি। তিনি বললেন : আমার জানা নেই যে, তোমাদের মধ্যে কে এতে খুশী আর কে খুশী নও। এখন তোমরা ফিরে যাও। তোমাদের স্থানীয় নেতারা তোমাদের সঠিক অবস্থা সম্পর্কে আমাকে অবহিত করবে। মোটের ওপর সকলেই তাদের মহিলা ও শিশুদেরকে ফিরিয়ে দিল, একজনও এ ব্যাপারে পিছিয়ে রইল না। প্রত্যেক বন্দীকে রাসুলুল্লাহ (সা) পোশাকও দান করেছিলেন।

কোমল আচরণ ও বদান্যতা

মুসলমানরা এই অভিযানে যেই বিপুল সংখ্যক গোলাম-বাঁদী রাসুলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে পাঠিয়েছিলেন তাদের মধ্যে তাঁর ধাত্রীমাতা হালিমা সা’দিয়ার কন্যা দুধবোন শায়মাও ছিলেন। মুসলমানরা তাঁকে চিনতে পারেনি। এজন্য মুসলমানদের কেউ কেউ তাঁকে নেবার সময় কিছুটা কঠোরতা প্রদর্শন করলে তিনি নিজের পরিচয় পেশ করে বলেন, তোমাদের জানা উচিত যে, আমি তোমাদের সর্দারের দুধ-শরীক বোন। কিন্তু তারা তাঁর কথায় বিশ্বাস করেনি। তাঁকে রাসূল (সা)-এর খেদমতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

তিনি রাসুলুল্লাহ (সা)-র খেদমতে হাজির হয়ে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার দুধবোন। তিনি এর পরিচয়জ্ঞাপক কোন চিহ্ন আছে কিনা জানতে চাইলে শায়মা বললেন : হ্যাঁ, আছে। একবার আমি আপনাকে কোলে নিয়েছিলাম। সে সময় আপনি আমার পিঠ কামড়ে দিয়েছিলেন, কামড়ের দাগ আজও আমার পিঠে রয়ে গেছে। তিনি দাগ দেখে চিনতে পারলেন। তারপর তিনি নিজের চাদর বিছিয়ে তাঁকে বসতে দিলেন এবং বললেন : যদি তুমি চাও সম্মান ও প্রীতির সঙ্গে আমার সাথে থাকতে পার। আর চাইলে হাদিয়া-তোহফাসহ তুমি যেখানে যেতে চাও পাঠিয়ে দিতে পারি। তোমার গোত্রে ফিরে যেতে চাইলেও যেতে পার। শায়মা বললেন : আপনি আমাকে যা দেবার দিয়ে দিন এবং আমাকে আমার গোত্রের নিকট পৌঁছে দিন। আমি আমার লোকদের সঙ্গেই থাকতে চাই। তিনি তাঁকে প্রচুর উপহারসামগ্রী দান করলেন। শায়মা ইসলামও কবুল করেছিলেন। তিনি তাঁকে তিনটি গোলাম, একটি বাঁদী ও কিছু বকরী দান করেছিলেন।

জি’রানা থেকে ‘উমরা পালন

হুনায়ন যুদ্ধ থেকে অবসর মিলতেই রাসূলুল্লাহ (সা) জি’রানায় পৌঁছে গোলাম ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের কাজ শেষ করলেন এবং উমরা আদায়ের নিয়তে ইহরাম বাঁধলেন। এটি ছিল তায়েফবাসীদের মীকাত এবং মক্কা থেকে এক মনযিল দূরে অবস্থিত। ‘উমরা আদায়ের পর তিনি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলেন। এ ঘটনা ছিল ৮ম হিজরীর যী-কা’দা মাসের।

আপন খুশীতে, আপন ইচ্ছায়

তায়েফ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (সা) মুসলমানদেরকে বললেন: آئبون تائبون عابدون لربنا حامدون অর্থাৎ আমরা সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করছি, (গোনাহ থেকে) তওবা করছি, (সকল অবস্থায় আল্লাহ পাকের) ইবাদত করছি এবং আল্লাহ তা’আলা যিনি আমাদের প্রভু প্রতিপালক তাঁর প্রশংসা করছি।” সাহাবায়ে কিরাম আরয করলেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি ছাকীফ গোত্রের জন্য বদদু’আ করুন। তিনি তখন এই দু’আ করলেন: হে আল্লাহ্! ছাকীফকে হেদায়াত দিন এবং তাদেরকে এখানে নিয়ে আসুন।

ওরওয়া ইবন মাসউদ আছ-ছাকাফী আল্লাহ্র রাসূল (সা) মদীনায় পৌঁছবার পূর্বেই পথিমধ্যে মিলিত হন, ইসলাম কবুল করেন এবং সেখান থেকেই ইসলামের দাওয়াত প্রদান মানসে আপন গোত্রে ফিরে যান। তাঁকে তাঁর গোত্রে খুবই সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখা হত এবং তিনি তাদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু ইসলামের ঘোষণা দিতেই লোকে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তীরের আঘাতে তাঁকে শহীদ করে দেয়।

তাঁর শাহাদাতের পর ছাকীফ গোত্র কয়েক মাস অবধি অপেক্ষা করে। অতঃপর তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শক্রমে স্থির করে যে, সমগ্র আরব জাতি ইসলাম কবুলপূর্বক রাসূলুল্লাহ (সা)-র সামনে আত্মসমর্পণ করেছে। এক্ষণে তাদের গোটা আরবের বিপক্ষে লড়াই করবার মত শক্তি নেই। অতএব, আল্লাহ্র রাসূল সমীপে একটি প্রতিনিধি দল পাঠানোই ভাল হবে।

মূর্তিপূজার সঙ্গে আপোস সম্ভব নয়

প্রতিনিধি দলটি আল্লাহ্র রাসূল (সা)-এর খেদমতে উপস্থিত হলে তিনি তাদের জন্য মসজিদে নববীর এক কোণে একটি তাঁবু স্থাপন করেন। দলটি ইসলাম কবুল

করে এবং রাসুলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে দরখাস্ত পেশ করে যে, তাদের “লাত” নামক বিশিষ্ট মূর্তিটিকে যেন তিন বছর পর্যন্ত না ভাঙা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা) তাদের দরখাস্ত প্রত্যাখ্যান করেন। তারা এরপর দু’বছর, অতঃপর এক বছর, অবশেষে এক মাসের অবকাশ প্রার্থনা করে। কিন্তু তিনি তাদেরকে এক মাস সময় দিতেও অস্বীকার করেন এবং তাদের সঙ্গে হযরত আবূ সুফিয়ান ও মুগীরা ইবন শু’বা (রা) {শেষোক্ত সাহাবী ছাকীফ গোত্রেরই লোক ছিলেন}-কে হুকুম দেন যেন তাঁরা দু’জন গিয়ে উক্ত মূর্তিটিকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেন। এরপর প্রতিনিধি দল তাদের সালাত আদায় থেকে অব্যাহতি দানের জন্য আবেদন জানায়। তিনি বললেন: যেই ধর্মে সালাত নেই তাতে কোন কল্যাণ নেই।

এরপর তারা তাদের মিশন থেকে যখন মুক্ত হল এবং ঘরে ফেরার উদ্যোগ নিল তখন রাসুলুল্লাহ (সা) তাদের সঙ্গে আবূ সুফিয়ান ও মুগীরা ইবন শু’বা (রা)-কে পাঠিয়ে দেন। মুগীরা (রা) মূর্তি ভাঙার কাজটি সুষ্ঠুভাবেই সম্পন্ন করেন। এরপর ইসলাম গোটা ছাকীফ গোত্রে ছড়িয়ে পড়ে এবং তায়েফের প্রত্যেক মানুষ ইসলামের মহামূল্য নে’মত লাভে ধন্য হয়।

কা’ব ইবন যুহায়র-এর ইসলাম গ্রহণ

রাসুলুল্লাহ (সা)-এর তায়েফ থেকে প্রত্যাবর্তন করতেই আরবের প্রখ্যাত কবি যুহায়র ইবন আবী সুলমার পুত্র প্রখ্যাত কবি কা’ব ইবন যুহায়র পবিত্র খেদমতে হাজির হন। কবি কা’ব নিন্দাসূচক অনেক কবিতা রচনাপূর্বক রাসুলুল্লাহ (সা)-কে বহু কষ্ট দিয়েছিলেন। কিন্তু মক্কার লোকদের ইসলাম গ্রহণের ফলে দুনিয়া তার জন্য সংকীর্ণ ও সংকুচিত হয়ে যায় এবং স্বয়ং তার জীবনের প্রতিই বিতৃষ্ণা জন্মে যায়। এমন সময় তার মুসলিম ভ্রাতা বুজায়র (রা) তাকে পরামর্শ দেন যে, বাঁচতে চাইলে সে যেন লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে উপস্থিত হয় এবং ইসলাম কবুল করে। অন্যথায় তার পরিণতি খুব খারাপ হবে বলেও তিনি তাকে সতর্ক করে দেন।

কা’ব ভ্রাতা বুজায়র (রা)-এর পরামর্শ গ্রহণ করে মদীনায় এসে উপস্থিত হন এবং ফজর সালাত আদায়ান্তে যখন রাসূল (সা) উপবেশনরত ছিলেন ঠিক সেই সময় সেখানে উপস্থিত হয়ে পবিত্র সান্নিধ্যের কাছাকাছি বসেই মুসাফাহা করেন। আল্লাহ্র রাসূল (সা) তাকে চিনতেন না। অনন্তর কবি কা’ব বলেন, কা’ব ইবন যুহায়র অনুতপ্ত হৃদয়ে ও মুসলমান হয়ে আপনার খেদমতে হাজির। সে আপনার

নিরাপত্তা প্রার্থনা করছে। আপনি কি তার তওবা কবুল করবেন? এতদশ্রবণে জনৈক আনসারী তার দিকে ছুটে আসেন এবং বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি অনুমতি দিন, আল্লাহ্ দুশমনের গর্দান এখনই আমি উড়িয়ে দেই। তিনি তাকে নিবৃত্ত করে বললেনঃ না, থাক। ছেড়ে দাও তাকে। সে তওবা করে এবং তার অতীত অপকর্ম থেকে বিরত হয়ে এখানে এসেছে। এরপর কা’ব তাঁর প্রসিদ্ধ কবিতা কাসীদা-ই লামিয়া আবৃত্তি করেনঃ

“সু‘আদ পৃথক হয়ে গেছে, আমার হৃদয় তো প্রেমের রোগী; সে প্রেমের পেছনে এমনভাবে বন্দী যে, তার পায়ে বেড়ি পরানো হয়েছে আর তাকে মুক্ত করার জন্য মুক্তিপণও দেওয়া হয়নি।”

অতঃপর কবিতার শেষাংশে তিনি আবৃত্তি করেনঃ

“নিঃসন্দেহে রাসূল (সা) একটি নূর যদ্বারা চতুর্দিক আলোকিত হয় এবং তিনি আল্লাহ্ একটি উন্মুক্ত ধারালো তলোয়ার।”

কবিতা শুনে তিনি তাঁর চাদর মুবারক শরীর থেকে নামিয়ে তাঁকে দান করেন। কাসীদাতুল্ বুরদাহ্ নামে নামকরণ করা হয় উক্ত কাসীদাকে।