প্রতিনিধি দলের আগমনের বছর
(৯-১০ হি.)
মদীনায় প্রতিনিধিদলের অব্যাহত আগমন এবং আরব জীবনে এর প্রভাব
প্রথমে আল্লাহ পাক রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মুবারক হাতে মক্কা বিজয় দান করলেন। অতঃপর তাবূক যুদ্ধ থেকে বিজয়ী বেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। এর আগে তিনি দুনিয়ার বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ ও আমীর-উমারার নামে পত্র পাঠান যে সব পত্রে তাঁদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল। কেউ কেউ নম্র ও যুক্তিপূর্ণ ভাষায় এর জওয়াব প্রদান করেন। কোন কোন বাদশাহ খুশি মনে এবং সম্মান ও ভক্তি সহকারে একে অভ্যর্থনা জানান। কেউ কেউ দ্বিধা-সংশয় ও ভয়-ভীতির মধ্যে কাটান আর কেউ ধৃষ্টতাপূর্ণভাবে একে প্রত্যাখ্যান করে এবং পত্রের সঙ্গে অবমাননাকর ও গর্বোদ্ধত আচরণ করে। আর এর ফলে অনতিবিলম্বে তাদেরকে নিজেদের দেশ ও জীবন খোয়াতে হয়। এসব এমন ঘটনা ছিল যার চর্চা চলছিল সারা আরব জুড়ে এবং সর্বত্রই এর আলোচনা চলত।
মক্কা বিজয়ের পর (যা ছিল আরব উপদ্বীপের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক কেন্দ্র) কুরায়শ সর্দারদের ইসলাম গ্রহণ এবং সত্য সুন্দর ধর্মের বিরোধিতার সবচেয়ে বড় দুর্গের পতন তাদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে যারা দোদুল্যমান অবস্থায় ছিলেন কিংবা ইসলামের ব্যর্থতার স্বপ্ন দেখছিলেন। এসব ঘটনা তাদের ও ইসলামের মধ্যবর্তী পুরাতন বাধা-প্রতিবন্ধকতা দূর করে দেয় এবং তাদের ও ইসলাম কবুলের মাঝে যেই দূরত্ব ছিল তা হ্রাস পায়। মশহুর মুহাদ্দিছ ‘আল্লামা মুহাম্মাদ তাহির পাটনী (মৃ. ৯৮৬ হি.) তদীয় “মাজমা’উ বিহারিল-আনওয়ার” গ্রন্থে এ বিষয়টির ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে লিখেছেন :
“এই বছরটি প্রতিনিধিদলের আগমনের বছর। আরব গোত্রগুলো ইসলামের সঙ্গে কুরায়শদের ব্যবহার ও আচরণের অপেক্ষা করছিল। কেননা কুরায়শরাই ছিল সকলের নেতৃত্বস্থানীয় এবং তারাই ছিল আল্লাহর ঘরের যিম্মাদার। অতঃপর তারাই যখন ইসলামের সামনে নিজেদের মস্তক অবনত করে দিল, মক্কা বিজিত হল এবং ছাকীফ গোত্রও ইসলাম কবুল করল তখন তারা অনুভব করল যে, এখন আর তাদের ভেতর মুসলমানদের মোকাবিলা করার মত শক্তি নেই। ঠিক এমনি সময় চতুর্দিক থেকে প্রতিনিধিদলের ব্যাপকভাবে আগমন ঘটে এবং লোক দলে দলে
আল্লাহ্ দীনে (ইসলামে) প্রবেশ করতে থাকে।”
এ সব কিছুর প্রভাব আরবদের দিল ও দিমাগ তথা মন-মস্তিষ্কের (যারা আর যা-ই হোক মানুষই তো ছিল) ওপর পড়ে স্বাভাবিকভাবেই। ফলে ইসলামে প্রবেশ করা এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে তাদের হাজির হওয়ার একটি দরজা খুলে যায়। অতঃপর সত্যের অন্বেষায় বিভিন্ন প্রতিনিধিদল ইসলামের কেন্দ্রে এত অধিক হারে আসতে থাকে যেমন তসবীহমালার সূতা ছিঁড়ে গেলে এর দানাগুলো ঝরতে থাকে, ঠিক তেমনি তসবীহ দানাগুলোর ন্যায় অব্যাহতভাবে আরবের লোকেরা ইসলামের পক্ষপুটে আশ্রয় নিতে থাকে।
এই সব প্রতিনিধিদল তাদের স্ব স্ব এলাকা ও কেন্দ্রগুলোতে নতুন প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর হয়ে, ঈমানের নবতর নেশা, ইসলামের দাওয়াতের নতুনতর প্রেরণা ও আবেগ-উদ্দীপনা এবং শির্ক ও মূর্তিপূজা, এর চিহ্নাদি, জাহিলিয়াত ও এর প্রভাবসমূহের বিরুদ্ধে একটা তীব্র ঘৃণা নিয়ে ফিরে আসত।
ঐসব প্রতিনিধিদলের মধ্যে বনী তামীমেরও প্রতিনিধিদল ছিল যেই দলে তাদের গোত্রের মশহুর নেতৃবৃন্দ ও অভিজাত ব্যক্তিবর্গ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাদের খাতীব (বক্তা) ও কবির সঙ্গে মুসলমানদের খাতীব ও কবির মধ্যে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতায় মুসলিম খাতীব ও কবির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন হয়। বনু তামীমের নেতৃবৃন্দ ও অভিজাত ব্যক্তিবর্গও তা মেনে নেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁদের উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করেন।
বনী আমের-এর প্রতিনিধিদলও আগমন করে। সা‘দ ইবন বকরের পক্ষ থেকে যিমাম ইবন ছা‘লাবা প্রতিনিধি হিসাবে আসেন এবং দাঈ ও মুবাল্লিগ হিসাবে আপন গোত্রে প্রত্যাবর্তন করেন। প্রত্যাবর্তনের পর তার সম্প্রদায়ের সঙ্গে যে কথাবার্তা হয় তা ছিল এ ধরনেরঃ অমঙ্গল হোক লাত ও ‘উয্যাল! সকলেই চমকে উঠে বলল, “আরে যিমাম! তুমি বল কি? শ্বেত, কুষ্ঠ ও মৃগী রোগের শিকার হতে চাও নাকি (দেবতার অভিশাপকে ভয় কর)?” যিমাম বলতে লাগলেনঃ তোমাদের অকল্যাণ হোক। আল্লাহ্ কসম! এরা না কারো ক্ষতি করতে পারে, না পারে কারো উপকার করতে। আল্লাহ অবধারিতরূপে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন এবং তাঁর ওপর একটি কিতাব নাযিল করেছেন যার মাধ্যমে তোমরা যার ভেতর নিমজ্জিত তা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ভিন্ন আর কোন মা’বূদ নেই, তিনি এক ও অংশীহীন এবং মুহাম্মাদ (সা) তাঁর বান্দা ও রাসূল। আমি তাঁর কাছ থেকে সেসবই তোমাদের জন্য নিয়ে এসেছি যা তিনি আদেশ
দিয়েছেন এবং যা কিছু থেকে তিনি নিষেধ করেছেন। এরপর সেদিন সন্ধ্যা হতে না হতেই তাঁর মহল্লার সকল নারী-পুরুষের এমন কেউ ছিল না যে ইসলাম কবুল করেনি।
বনী হানীফার প্রতিনিধি দল আগমন করে যাদের মধ্যে মুসায়লামা কাযযাব (মিথ্যাবাদী)ও ছিল। সে ইসলাম গ্রহণ করে। ইসলাম পরিত্যাগ করত মুরতাদ্দ হওয়ার ফেতনা সেই উস্কে দেয় এবং এতেই সে মারা যায়।
বনী তাঈ প্রতিনিধি দলে বিখ্যাত অশ্বারোহী বীর যায়দ আল-খায়লও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর নাম পরিবর্তন করে “যায়দ আল-খায়র” রাখেন। তিনি দৃঢ় বিশ্বাসী মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হন।
সে যুগের বিখ্যাত দানবীর হাতেম তাঈ-এর পুত্র আদী ইবন হাতেমও পবিত্র খেদমতে হাজির হন। তিনি নবী করীম (সা)-এর মহানুভব চরিত্র, ব্যবহার ও বিনয় দৃষ্টে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং বলেনঃ আল্লাহ্র কসম! এ কোন বাদশাহর আচরণ নয়।
বনী যাবীদ-এর প্রতিনিধিদলও পবিত্র খেদমতে এসে উপস্থিত হয়। প্রতিনিধিদলে আরবের খ্যাতনামা বীর ‘আমর ইবন মা’দীকারিবও ছিলেন। কিনদাহ গোত্রের প্রতিনিধিদলে আশ‘আছ ইবন কায়স শামিল ছিলেন। আয্দ গোত্রের প্রতিনিধিদল হাজির হয়। হামীরের সুলতানের দূত এসে পৌঁছে এবং সুলতানের প্রেরিত পত্র পবিত্র খেদমতে হস্তান্তর করে। এতে সুলতানের ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ জানানো হয়েছিল।
মু‘আয ইবন জাবাল ও আবূ মূসা আশ’আরী (রা)-কে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি ইয়ামান প্রেরণ করেন এবং তাঁদেরকে এই উপদেশ দেন, يسرا ولا تعسرا وبشرا ولا تنفرا “দেখ, তোমরা উভয়ে নরম ও কোমল ব্যবহার করবে, কঠোরতা প্রদর্শন করবে না, তাদেরকে সুসংবাদ শোনাবে, ঘৃণা-বিদ্বেষ নিক্ষেপ করবে না।”
ফারওয়াহ ইবন আমর আল-জুযামী একজন দূত পাঠিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে তার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ দেন। ইনি রোম সাম্রাজ্যের পক্ষ থেকে মা’আন ও তৎসংনিহিত সিরীয় এলাকায় গভর্নর ছিলেন।
নাজরানে বনু আল-হারিছ ইবন কা’ব হযরত খালিদ (রা) ইবনুল-ওয়ালীদ-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত খালিদ (রা) সেখানে অবস্থান পূর্বক তাদেরকে
ইসলামের তা’লীম দেন। অতঃপর খালিদ (রা) বনু আল-হারিছের একটি প্রতিনিধিদল সমভিব্যাহারে প্রত্যাবর্তন করেন। প্রতিনিধিদলটি যখন তাদের নিজ এলাকায় ফিরে যায় তখন তাদের তা’লীমের জন্য রাসূল আকরাম (সা) আমর ইবন হাযমকে প্রেরণ করেন যাতে তিনি তাদেরকে সুন্নাহ, ইসলামের আদব ও রীতিনীতিসমূহ সম্পর্কে অবহিত করতে পারেন, পারেন যাকাত ও সাদাকার ব্যবস্থাপনা আনজাম দিতে। হামদান গোত্রের প্রতিনিধিদলও এ সময় এসে হাজির হয়।
মুগীরা ইবন শু’বা (রা)-কে নবী আকরাম (সা) লাত নামক মূর্তি ভাঙবার জন্য সদল প্রেরণ করেন। তিনি একে ভেঙে খানখান করে দেন। এরপর তিনি মূর্তিঘরের দেওয়ালে আরোহণপূর্বক একটি একটি করে এর প্রতিটি প্রস্তর খণ্ড খসিয়ে ছাড়েন এবং সকলে মিলে একে ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দেন। তিনি দলের অপরাপর সদস্যের সঙ্গে ঐদিনই ফিরে আসেন এবং রাসূল আকরাম (সা)-এর খেদমতে সব কিছু বিবৃত করেন। তিনি তাঁদের প্রশংসা করেন।
আবদুল কায়স গোত্রের প্রতিনিধি দল এসে উপস্থিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের খোশ আমদেদ জ্ঞাপন করেন। তিনি তাদেরকে সেই সব পাত্র ব্যবহার করতে নিষেধ করেন যার ভেতর দ্রুত নেশা জন্মে। হারাম ও নেশাকর বস্তু থেকে বাঁচার তাগিদে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে তিনি এসব নিষেধ করেন। কেননা তারা এতে খুব বেশি অভ্যস্ত ছিল।
আশ’আরী ও ইয়ামনবাসীদের প্রতিনিধি দল বিরাট আনন্দ-উল্লাস সহকারে এই কবিতা আবৃত্তি করতে করতে এসে উপস্থিত হয় :

“ কাল আমরা প্রেমাষ্পদের সঙ্গে মিলিত হব; মুহাম্মাদ ও তাঁর সাথীদের সঙ্গে।” তিনি এই প্রতিনিধিদল দৃষ্টে বলেন :

“তোমাদের নিকট ইয়ামনবাসীর আগমন ঘটেছে যারা খুবই নরম ও কোমল দিলের মানুষ। ঈমান ইয়ামনবাসীদেরই অংশ আর ইয়ামনের প্রজ্ঞাই প্রকৃত প্রজ্ঞা
পরিচায়ক।”
খালিদ ইবনুল-ওয়ালীদ (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (সা) একটি জামা’আত সহকারে ইসলাম প্রচারব্যাপদেশে ইয়ামনবাসীদের নিকট প্রেরণ করেন। এই জামা’আত সেখানে ছয় মাস অতিবাহিত করে। হযরত খালিদ (রা) তাদেরকে অব্যাহতভাবে দাওয়াত দিতে থাকেন, কিন্তু তারা তা কবুল করত না। এরপর তিনি হযরত আলী (রা)-কে পাঠান। তিনি সেখানে হূযূর (সা)-এর পত্র পাঠ করে শোনান। ফলে গোটা হামাদান গোত্র মুসলমান হয়ে যায়। হযরত আলী (রা) দরবারে নবুওতে এই সংবাদ প্রেরণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত আলী (রা)-এর পত্র পাঠান্তে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। অতঃপর মাথা উঠিয়ে বলেন: হামাদানীদের ওপর সালাম ও শান্তি বর্ষিত হোক।
মুযায়না গোত্রের প্রতিনিধি দল ছিল চারশ’ সদস্যবিশিষ্ট। নাজরানের খৃষ্টান প্রতিনিধি দলটি ছিল ষাটজন আরোহীর সমষ্টি। এঁদের ভেতর তাঁদের বড় পাদ্রী ও পণ্ডিত আবূ হারিছাও ছিলেন, ছিলেন তাঁদের নেতৃত্বস্থানীয় ও অভিজাত শ্রেণীর ২৪ জন। রোম সম্রাট তাঁদেরকে খুবই সম্মান ও সমীহ করতেন, তাঁদের সর্বপ্রকার আর্থিক সাহায্য প্রদান করতেন, তাঁদের গির্জা নির্মাণ করে দিতেন। এঁদের সম্পর্কে কুরআন করীমের অনেক আয়াত নাযিল হয়।
নাজরানবাসীদের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (সা) একটি পত্র প্রেরণ করেন। এতে তিনি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন। পত্র পাঠান্তে তারা একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে। প্রতিনিধিদল অনেক প্রশ্ন পেশ করে। প্রশ্নের উত্তরে সূরা আল-ইমরানের অনেকগুলো আয়াত নাযিল হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের মুবাহালার আহ্বান জানান। কিন্তু তাদের পক্ষে শুরাহবীল ভয়ে এই প্রস্তাবে রাজী হয়নি। পরদিন এই লোকগুলো পুনরায় পবিত্র খেদমতে উপস্থিত হলে তিনি তাদেরকে একটি লিখিত পত্র দেন। এতে নির্ধারিত রাজস্বের হার উল্লিখিত ছিল। অতঃপর নির্দিষ্ট রাজস্ব আদায়ের নিমিত্ত হযরত আবূ উবায়দা ইবনুল-জাররাহ (রা)-কে এই বলে তাদের সাথে পাঠিয়ে দেন যে, ইনি এই উম্মাহর আমীন তথা বিশ্বস্ততম ব্যক্তি (هذا امين هذه الامة)।
তুজীব গোত্রের প্রতিনিধি দলের আগমনে রাসূলুল্লাহ (সা) খুব খুশি হন। তিনি তাদেরকে বিরাট সম্মান ও খাতির-যত্ন করেন। তারা রাসূল (সা)-কে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। তিনি তাদেরকে লিখিত উত্তর প্রদান করেন। এরপর তাঁরা কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে বহু বিষয় জিজ্ঞেস করতে থাকেন। এজন্য তাদের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বিশেষ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। তিনি হযরত বিলাল (রা)-কে খুব এহতিমামের সঙ্গে তাদের যিয়াফত ও মেহমানদারী করতে বলেন। এরা কয়েকদিন তাঁর পবিত্র সান্নিধ্যে কাটান, কিন্তু বেশি দিন তারা অবস্থান করতে পারেননি। তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়, কেন তারা এত তাড়াহুড়া করছে? তারা উত্তরে জানান, আমরা আমাদের লোকদের কাছে গিয়ে বলতে চাই আমরা কিভাবে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর যিয়ারত লাভ করেছি, তাঁর সঙ্গে আমাদের কি কি কথা হয়েছে এবং তিনি আমাদের কথার কি জওয়াব দিয়েছেন। এরপর তারা ফিরে যান। অতঃপর হিজরীর ১০ম বর্ষে বিদায় হজ্বে মিনাতে তাঁরা নবী করীম (সা)-এর খেদমতে পুনরায় হাজির হন।
এইসব প্রতিনিধিদলের মধ্যে বনী ফাযারাহ্, বনী আসাদ, বাহরা‘ ও আযরাহর প্রতিনিধিদলও ছিল। এরা সকলেই ইসলাম কবুল করে। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে সিরিয়া বিজয়ের সুসংবাদ দান করেন। তিনি তাদেরকে মহিলা গণকের নিকট গমন করতে এবং তাদের নিকট ভাগ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে নিষেধ করেন। তারা যেসব পশু কুরবানী দিত তা থেকেও নিষেধ করেন এবং বলেন, কেবল ঈদুল আযহার কুরবানী তাদের জন্য অনুমোদিত। এছাড়া বালী, যী মারাহ ও খাওলানের প্রতিনিধিদল পবিত্র খেদমতে হাজির হয়। তিনি তাদের নিকট খাওলানের মূর্তি সম্পর্কে, যে মূর্তির তারা পূজা করত, জিজ্ঞেস করেন। জওয়াবে তারা জানায় : আপনার মুবারক হোক! আপনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা এর পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। অবশ্য প্রাচীন আমলের কিছু কিছু বৃদ্ধা মহিলা এখনও তা আঁকড়ে রেখেছে। আমরা যখন ফিরে যাব তখন ইনশাআল্লাহ ঐ মূর্তি ভেঙে ফেলব। মুহারিব, গাসসান, গামিদ ও নাখ‘আ-এর প্রতিনিধিদলেরও এ সময় আগমন ঘটে।
এইসব প্রতিনিধিদল নবী করীম (সা)-এর খেদমতে এসে দীন শিখত, ধর্মীয় জ্ঞান ও দীনের উপলব্ধি লাভ করত, মসলা-মাসায়েল জানত, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উন্নত ও মহান চরিত্র প্রত্যক্ষ করত এবং সাহাবায়ে কিরামের সাহচর্য ও সান্নিধ্য
তাদের ভাগ্যে জুটত। অধিকাংশ সময় মসজিদে নববীর অঙ্গনে তাদের জন্য তাঁবু স্থাপন করা হত। তারা সেখানেই থাকত, কুরআন মজীদ শ্রবণ করত, মুসলমানদের সালাত আদায় করতে দেখত। তাদের মনে কোন কিছু উদিত হলে অত্যন্ত সরল সোজা ও খোলা মনে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট জিজ্ঞেস করে জেনে নিত। তিনিও তাদেরকে পরিষ্কার ভাষায় ও হেকমতের সঙ্গে তাদের জিজ্ঞাসার উত্তর দিতেন, কুরআন মজীদ থেকে এর সাক্ষ্য পেশ করতেন। এর দ্বারা তাদের ঈমান আরও মজবুত হত এবং আত্মিক প্রশান্তি ও তৃপ্তি লাভ ঘটত।
একজন মহিলা মূর্তিপূজারী ও নবী করীম (সা)-এর কথোপকথন
কিনানা ইবন আব্দ যালীল ও আল্লাহর রাসূল (সা)-এর মধ্যে যেই কথোপকথন হয়েছিল এখানে তা পেশ করা হচ্ছে।
কিনানা : ব্যভিচার সম্পর্কে আমাদের সমস্যা হল এই যে, আমরা অনেক সময় নিঃসঙ্গ ও অবিবাহিত অবস্থায় থাকি। কাজেই এ আমাদের জন্য অপরিহার্য।
রাসূলুল্লাহ (সা) : এ তোমাদের ওপর হারাম। এ সম্পর্কে আল্লা তা‘আলার এরশাদ হল : وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنٰى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيْلًا “অবৈধ যৌন সংযোগের নিকটবর্তী হয়ো না, এ অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ” (সূরা ইসরা, ৩২ আয়াত)।
কিনানা : সুদ সম্পর্কে আপনি যা বলেন তাতে দেখা যায় আমাদের সমস্ত মালই তো সুদ আর সুদ।
রাসূলুল্লাহ (সা) : আসল পুঁজি তথা মূলধন নেবার অধিকার তোমাদের রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

“হে মু’মিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা কিছু বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও যদি তোমরা মু’মিন হও” (সূরা বাকারা ২৭৮, আয়াত)।
কিনানা : شراب (মদ)-এর ব্যাপারে আমাদের বক্তব্য হল, এতো আমাদের যমীনের নিংড়ানো নির্যাস এবং আমাদের জন্য তা খুবই জরুরী।
রাসূলুল্লাহ (সা) : আল্লাহ তা‘আলা একে হারাম ঘোষণাপূর্বক বলেন :

“হে মু’মিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি ও পাশা (সবই) অপবিত্র শয়তানী কর্মের অন্তর্গত; অতএব তোমরা এ সমস্ত পরিহার কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার” (সূরা আল-মায়িদা : ৯ আয়াত)।
কিনানা : রাব্বা মূর্তি সম্পর্কে আপনি কি বলেন?
রাসূলুল্লাহ (সা) : একে ভেঙে ফেল।
কিনানা ও তার সহচরবৃন্দ : যদি রাব্বা জানতে পারে যে, আপনি তাকে ভাঙতে চাচ্ছেন তাহলে সে তার সকল পূজারীকে খতম করে দেবে। এ সময় হযরত ওমর (রা) তাদের মাঝে হস্তক্ষেপপূর্বক বললেন : ইবন আব্দ যালীল! তোমাদের সর্বনাশ হোক, তোমরা কত মূর্খ। তোমরা কি এও জান না রাব্বা একটি প্রস্তরখণ্ড ব্যতিরেকে কিছু নয়?
কিনানা ও তার সহচরবৃন্দ : ইবন খাত্তাব! আমরা তোমার কাছে আসিনি। এরপর তারা পুনরায় রাসূলুল্লাহ (সা)-কে সম্বোধন করে বললঃ আপনি ওকে ভেঙে ফেলুন, আমরা ভাঙতে পারব না।
রাসূলুল্লাহ (সা) : আমি তোমাদের ওখানে লোক পাঠাব। সে তোমাদের হয়ে এ কাজ করবে।
অতঃপর রসূলুল্লাহ (সা) তাদের বিদায় নেবার অনুমতি দিলেন এবং তাদের পূর্ণ সম্মান ও মেহমানদারী করলেন। তারা নিবেদন করল : হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি আমাদের জন্য আমাদের কওমের কোন আমীর নিযুক্ত করে দিন। তিনি উছমান ইবন আবিল-আস (রা)-কে তাদের আমীর নিযুক্ত করে দিলেন। তিনি তাদের মধ্যে বয়সে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু ইলমে দীনের প্রতি তাঁর আগ্রহ সম্পর্কে রসূল (সা)-এর জানা ছিল। তিনি সেখানে যাবার পূর্বে কুরআন মজীদের আরও কিছু সূরাও মুখস্থ করে নিয়েছিলেন।
প্রতিনিধিদলসমূহের আগমনের এ বছর আরবে মূর্তিপূজা ও মূর্তিপূজকদের উৎখাতেরও বছর ছিল।
যাকাত ও সাদাকা ফরয হল
হিজরতের ৫ম বর্ষে যাকাত ফরয হয়। যে সমস্ত এলাকায় ইতোমধ্যেই ইসলাম পৌঁছে গিয়েছিল রাসূলুল্লাহ (সা) সেসব এলাকায় আমীর ও আমিল (গভর্নর) নিযুক্ত করে পাঠিয়ে দেন।