
ঈসায়ী ষষ্ঠ শতকের কথা। তখন ব্যাপক হারে আল্লাহ্র প্রিয় সৃষ্টি এই মানুষ আত্মহত্যার জন্য কেবল উদ্যতই ছিল না, বরং উন্মত্ত এক প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছিল। আত্মহত্যার প্রতি তাদের প্রবণতাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল যেন এ আত্মহত্যাই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়া। আত্মহত্যার জন্যে সে যেন মানত করেছে, কসম খেয়েছে। সে কসম যেন কোনক্রমেই ভাঙা যাবে না। পবিত্র কুরআন সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিরই চিত্রাঙ্কন করেছে অত্যন্ত নিপুণভাবে, যে চিত্রাঙ্কন অসম্ভব কোন সুদক্ষ শিল্পী, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক কিংবা ঐতিহাসিকের পক্ষে।

“আর তোমাদের প্রতি আল্লাহ্র অনুগ্রহকে স্মরণ কর : তোমরা ছিলে পরস্পরের শত্রু এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতি সঞ্চার করেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। তোমরা ছিলে অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে রক্ষা করেছেন” (সূরা আল ইমরান : ১০৩)।
ঐতিহাসিক ও জীবনচরিতকারদের প্রতি আল্লাহ রহম করুন! জাহেলী যুগের সঠিক ও যথার্থ চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরতে তারা সক্ষম হননি। আসলে এ জন্য তাঁরা সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাঁদের প্রতি আমরা ভীষণ কৃতজ্ঞ। কেননা তখনকার সেই অবর্ণনীয়, ভয়াবহ ও সঙ্গীন পরিস্থিতির সঠিক চিত্রাঙ্কন কলমের পক্ষে ছিল অসম্ভব। তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছিল ভাষা ও সাহিত্যের নাগালের বাইরে। সুতরাং একজন ঐতিহাসিকের পক্ষে তার যথার্থ চিত্রাঙ্কন কিভাবে সম্ভব?
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবকালে জাহেলী যুগের সমস্যা কি শুধু সামাজিক বিপর্যয় ও নৈতিক অবক্ষয়ের সমস্যা ছিল? শুধু মূর্তিপূজার সমস্যা ছিল? শুধু মদ-জুয়া, অশ্লীলতা, নগ্নতা, জুলুম-নির্যাতন ও অন্যায়-অবিচারের সমস্যা ছিল? নাকি জালিম শাসকের জুলুম ও অর্থনৈতিক শোষণের সমস্যা ছিল? সে
সমস্যা কি শুধু নিরপরাধ ও নিষ্পাপ নবজাত কন্যা সন্তানকে জীবন্ত প্রোথিত করার সমস্যা ছিল? না! বরং আসল সমস্যা ছিল গোটা মানবতাকে মাটিচাপা দিয়ে নির্দয়ভাবে হত্যা করার সমস্যা।
অন্ধকার যুগ পেরিয়ে গেছে। সে যুগের হিংস্র মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে মাটির নিচে। সেই লোমহর্ষক চিত্র এখন দৃষ্টির অন্তরালে। এখন কি করে আমরা তার চিত্রাঙ্কন করব? কিভাবে তা অনুভবযোগ্য ও দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তুলে ধরব? শুধু বলতে পারি— সে ছিল জাহেলী যুগ।
অন্ধকারাচ্ছন্ন এক পৃথিবী! সভ্যতা-সংস্কৃতি বিচ্ছিন্ন এক আঁধার দুনিয়া। সে যুগের সে পৃথিবীর বাসিন্দা ছাড়া কেউ বুঝতে পারবে না সে যুগকে। উপলব্ধি করতে পারবে না সে যুগের ভয়াবহতাকে। কোন চিত্রশিল্পী যদি এখন একটি ছবি আঁকে যাতে গোটা মানব জাতিকে এক দারুণ সুদর্শন ও দৃষ্টিরন্দন মানুষের আকৃতিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, সমস্ত সৃষ্টিলোকের ভেতরে যার সৌন্দর্যের অপূর্ব ঝলক নজরে পড়েছে, যাকে আল্লাহ খেলাফতের তাজ পাঠিয়েছেন, শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন সমস্ত সৃষ্টিলোকের মাঝে, যার আগমনে এই উজাড় ও বিরান পৃথিবী পরিণত হয়েছে বসন্ত বিরাজিত উদ্যানে। অতঃপর চোখের সামনে ভেসে উঠল আরেকটি চিত্র। একটু আগের সেই মানুষটি ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হচ্ছে এক গভীর পরিখায় যেখান থেকে উদগীরিত হচ্ছে আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোত। ঝাঁপ দেবার জন্যে সে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। পা সামনে বাড়িয়ে দিয়েছে, এক্ষুনি সে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কয়েক মুহূর্ত পেরুতে না পেরুতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল। হারিয়ে গেল ভয়ংকর অন্ধকারে, অনন্ত মৃত্যু বিভীষিকায়! তাহলে সম্ভবত চিত্রশিল্পীর এই চিত্রাঙ্কন রাসূলের আবির্ভাবকালীন জাহেলী যুগের কিঞ্চিৎ চিত্র ফুটে উঠতে পারে। এই বাস্তবতার দিকে ইশারা করেই আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে অত্যন্ত সংক্ষেপে, অথচ ই’জাযপূর্ণভাবে

“আর তোমরা ছিলে অগ্নিকুণ্ডের পাড়ে, সেখান থেকে তিনি তোমাদেরকে রক্ষা করলেন।”
এই বিষয়টি নবুওয়াতের ভাষায় আরো বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে এভাবে, “আমার এই দাওয়াত ও হিদায়াতের উপমা যা নিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি, এমন ব্যক্তির ন্যায় যে আগুন প্রজ্বলিত করল। যখন তার আলো আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ল তখন পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গ আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। অনুরূপ তোমরাও
আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত আর আমি তোমাদের বাহু ধরে তোমাদেরকে বাঁচাতে চাই” (সহীহ বুখারী)। আসলে মানবতার কিশতিকে নিরাপদে পাড়ে ভিড়ানোই ছিল মূল সমস্যা। কেননা মানুষ যখন সঠিক অবস্থায় ফিরে আসবে, যখন তার জীবনে আসবে স্বস্তি, ভারসাম্য ও সঠিক চেতনাবোধ, তখন মানুষের স্থাপত্যশিল্প, উন্নয়নশীলতা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি মূর্তিমান হয়ে বিকশিত হবে তাদের সামনে যাদের আছে যোগ্যতা, যারা মানবতার বন্ধু ও সাহায্যকারী। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় যে, গোটা মানবতাই নবী-রাসূলদের কাছে ঋণী। তাঁরাই তো মানবতাকে উদ্ধার করেছেন সেই মহাবিপদ থেকে, যা নাঙ্গা তলোয়ারের মত মানবতার মাথার ওপর এক চরম মুহূর্তের অপেক্ষা করছিল। দুনিয়ার কোন বিদ্যাপীঠ, কোন দর্শন কিংবা কোন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি তাঁদের ঋণ শোধ করতে পারবে? সত্যি কথা বলতে কি, বর্তমান পৃথিবী ও সাম্প্রতিক বিশ্বও তাঁদের কাছে ঋণী। কারণ তাঁরা মানবতাকে উদ্ধার না করলে কে পেত জীবনের স্বাদ ও স্বাধীনতার সুখ? কেননা পরিস্থিতি এমন নাজুক আকার ধারণ করেছিল যে, মানুষ অবস্থার নীরব ভাষায় বারবার শুনিয়ে দিয়েছে যে, সে এই পৃথিবীতে বসবাসের অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। তার হৃদয় এখন পাষাণ, দয়ামায়াশূন্য। মানবতার জন্য এখন সে বহন করে না কোন করুণা ও রহমতের পয়গাম। সে নিজের বিরুদ্ধে এখন নালিশ জানাচ্ছে মহাপ্রভুর আদালতে, সাক্ষ্য দিচ্ছে নিজের বিরুদ্ধে, চূড়ান্ত রায়ের জন্য মোকদ্দমার কাগজপত্র পুরা প্রস্তুত। এক কঠিন শাস্তির জন্য নিজেকে পেশ করেছে, বেছে নিয়েছে মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। সভ্যতা-সংস্কৃতি যখন স্বাভাবিক সীমারেখা অতিক্রম করে, বিস্মৃত হয়ে পড়ে চারিত্রিক উৎকর্ষের কথা, বরং আরো এক ধাপ সামনে বেড়ে পরিষ্কার ভাষায় অস্বীকার করে বসে চারিত্রিক উৎকর্ষের অবদানকে, যখন মানুষ গাফেল হয়ে যায় যাবতীয় মহান উদ্দেশ্য সম্পর্কে, যখন সে জাগতিকতাকে বুকে আঁকড়ে ধরে উপেক্ষা করে অন্য সব বাস্তবতাকে, যখন সে পাশবিকতার দিকচিহ্নহীন দিগন্তে লাগামহীন পাগলা ঘোড়ার মত ছুটে বেড়ায়, যখন সে সকল প্রকার মানবীয় গুণের বদলে হিংস্র শ্বাপদের আকৃতি ধারণ করে, যখন তার মাঝে জন্ম নেয় এক কাল্পনিক উধর, যখন সে স্বীকার করে নেয় নফসে আম্মারার পূর্ণ বশ্যতা, যখন মানবতাকে ঘিরে ফেলে পাগলামির ঘোর আচ্ছন্নতা, তখনই (মানবতার সেই মহাদুর্দিনে) অপারেশন ও অস্ত্রোপচারের জন্য আল্লাহ্ পাঠান একদল সার্জনকে। তাঁরা এসে শুরু করেন অস্ত্রোপচার, সমূলে কেটে ফেলেন বিষাক্ত অংশ, দূর করে দেন পাগলামির নেশা। কোন জাতির সভ্যতা-সংস্কৃতির বিকৃতি ও বিলুপ্তি দেশ ও রাজ্য হারানোর চেয়েও সাংঘাতিক ও ভয়াবহ। এক দুর্বল রোগী যদি পাগল হয়ে যায়, তাহলে তার
কারণে আশেপাশের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে ঠিকই, কিন্তু একটু ভেবে বলুন তো গোটা মানবতাই যদি পাগল হয়ে যায়, যদি ভেঙে যায় হাজার বছরের লালিত সভ্যতা-সংস্কৃতি, দলিত-মথিত হয়ে যায় মানবতা ও ইনসানিয়াতের সবুজ কোমল দুর্বাগুলো, তবে সীমা থাকবে কি অশান্তি ও নৈরাজ্যের?
সম্ভব হবে কি এর কোন চিকিৎসা?
বিশ্বাস করুন! জাহেলী যুগে সভ্যতা-সংস্কৃতি ও সুস্থ নগর জীবনের ওপরই শুধু বিপর্যয়ের ধস নেমে আসেনি, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও নগর জীবন পরিণত হয়েছিল এক বিকৃত গলিত লাশে। মানুষ মানুষকে শিকার করত হিংস্র নেকড়ের ন্যায়। তারপর তার হৃদয়হীনতার সামনে যখন সে মানুষটি মৃত্যুর সাথে লড়াই করত, মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করত তখন এই অমানবিক করুণ দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়েও মজা লুটত তার নিষ্ঠুর দৃষ্টি-পাষাণ হৃদয়, ঠিক সেভাবে যেভাবে আমাদের কারো হৃদয় ফুল বাগান ও গাছপালার মনোরম দৃশ্য ও ছায়া-ঘেরা পরিবেশ আনন্দ উদ্বেল হয়।
এবার দৃষ্টি ফেরান রোমান ইতিহাসের দিকে। দেখবেন তাদের বিজয় গাথা ও বীরত্বের ইতিহাস আলো ঝলমলে। মন কেড়ে নেয় তাদের সুচারু ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ রাজ্য পরিচালনা। সভ্যতা-সংস্কৃতিতেও পিছিয়ে নেই তারা। কিন্তু অপর দিকে কেমন করে তাদের অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতার চিত্র তুলে ধরেছেন একজন ইউরোপীয় ঐতিহাসিক তাও একটু পড়ে দেখুন।
“রোমানদের কাছে সবচেয়ে বেশি মজাদার ও চিত্তাকর্ষক দৃশ্য হত সেটি, যখন তরবারির যুদ্ধে দুই স্বগোত্রীয় পাহলোয়ানের মধ্যে পরাজিত ব্যক্তি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে রক্তে লাল হয়ে ঢলে পড়ত মৃত্যুর কোলে আর তার মুখ থেকে শেষবারের মত উচ্চারিত হত মৃত্যু পথযাত্রী মানুষের ব্যথা-করুণ গোঙানি। তখন তাদের আনন্দের আর সীমা-পরিসীমা থাকত না। মনে হত তারা যেন তলোয়ারের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত এই মানুষটির সামনে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে মজাদার দৃশ্য অবলোকন করছে। হাসি-উল্লাসের বিকৃত ধ্বনি তুলে তারা একে অপরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ত আনন্দের আতিশয্যে। এই মৃত্যু পথযাত্রী অসহায় মানুষটির গোঙানি তাদের কানে যেন মধু ঢালছে অপূর্ব সংগীতের সুর লহরীর মত। ওদিকে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী পুলিশ বাহিনীর কিছুই করার থাকত না। সবকিছু বেসামাল হয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত” (ড. মি. Lecky প্রণীত History of European Morals)।
মোটকথা, তখন মানুষ ছিল না, ছিল মানুষের খোলস। মানবতার মোকদ্দমা
চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় ছিল আল্লাহ্র আদালতে। ঠিক তখনই প্রেরিত হলেন মুহাম্মাদ (সা) আর ঘোষণা এল :

“হে নবী! তোমাকে আমি জগতসমূহের জন্য বিশেষ রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।”
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাব এক নতুন পৃথিবী
প্রকৃতপক্ষে বর্তমান যুগ ও আগামী দিনের অনাগত যুগ সম্পূর্ণরূপে মুহাম্মাদ (সা)-এর আবির্ভাব, তাঁর ব্যাপকভিত্তিক চিরন্তন দাওয়াত ও তাঁর চেষ্টা, সাধনা ও ত্যাগ-তিতিক্ষার কাছে ভীষণভাবে ঋণী। তিনিই নাঙ্গা তলোয়ারের নিচ থেকে মানবতাকে উদ্ধার করেছেন। অতঃপর মানবতার হাতে তুলে দিয়েছেন এক নতুন উপহার যা মানবতাকে দান করেছে এক নতুন জীবন, নতুন উদ্যম, নতুন শক্তি, নতুন সম্মান ও নতুন করে পথ চলার হিম্মত ও পাথেয়, আর সেই উপহারের বদৌলতেই মানবতা তাহযীব-তমদ্দুন, সভ্যতা-সংস্কৃতি, বিদ্যা-বুদ্ধি ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, সর্বোপরি ন্যায়নিষ্ঠা, আধ্যাত্মিকতা এবং চরিত্র ও সমাজ দর্শনের মাপকাঠিতে নতুন করে মানুষ গড়ার কত হাজারো মনযিল অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা এখন ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ মুহাম্মাদী (সা) অবদানের কথা এখানে উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করব যা মানব জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছে, সংশোধন ও সংস্কারের পথ বাতলে দিয়েছে, গোটা মানব সম্প্রদায়ের মাঝে জাগ্রত চেতনাবোধ সৃষ্টি করেছে এবং মানব ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, জন্ম দিয়েছে এমন এক বিশ্ব ও সমাজ ব্যবস্থা, ফেলে আসা পৃথিবীর সাথে কোন কিছুতেই যার বিন্দুমাত্র মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।
সুস্পষ্ট তাওহীদের আকীদা
তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ও অনুগ্রহ এই যে, তিনি দুনিয়াকে দান করেছেন তাওহীদের আকীদা। স্বচ্ছ, পবিত্র ও নজীরবিহীন এক বিপ্লবী আকীদা। এই আকীদা শক্তি ও বিশ্বাসে ভরা জীবনবোধ থেকে উৎসারিত হয়। এই আকীদা পাল্টে দেয় সব প্রতিকূলতা ও বাধা-বিপত্তি, বিনাশ করে দেয় বাতিল প্রভুদের রাজত্ব।
এই আকীদা আজ পর্যন্ত পৃথিবীকে কেউ দিতে পারেনি, পারবে না কেয়ামত পর্যন্ত। এই মানুষের ইতিহাস এক দীর্ঘ ইতিহাস; কাব্য, দর্শন, রাজনীতিতে যার
রয়েছে প্রভূত দাবি-দাওয়া, যে বিভিন্ন দেশ ও জাতিকে অসংখ্যবার গোলাম বানিয়েছে, যে মরুর বুকে পাথুরে জমিনের বুক চিরে বইয়ে দিয়েছে কত ছলছল ঝর্ণাধারা, মাঝে মাঝে আবার দাবি করে বসেছে প্রভুত্বেরও। এই মানুষ মাথা ঠেকাত অতি সামান্য জড় বস্তুর সামনে, যার নেই উপকার কিংবা অপকার করার কোন ক্ষমতা এবং দেওয়া ও ছিনিয়ে নেওয়া ছিল যার পক্ষে অসম্ভব।

নিজ হাতে গড়া মূর্তির পূজা করত তারা। ভয় করত সেই মূর্তিকে, মঙ্গল কামনা করত তার কাছে। এই মানুষ জাহেলী যুগে পাহাড়-পর্বত, নদীনালা, গাছপালা, জীবজন্তু, আত্মা-প্রেতাত্মা, মানুষ ও শয়তানের সামনেই শুধু সেজদায় লুটিয়ে পড়ত না, বরং ছোট্ট ছোট্ট কীট-পতঙ্গ পর্যন্ত তার আরাধ্যে পরিণত হয়েছিল। তার জীবন কাটত অপ্রাসঙ্গিক চিন্তা-ভাবনায়, অবাস্তব ধ্যান-ধারনায়, নিরর্থক আশা-আকাঙ্ক্ষায়। যার স্বাভাবিক পরিণতি ছিল কাপুরুষতা ও দুর্বলতা, চিন্তা-চেতনার দৈন্য ও মানসিক অস্থিরতা, আত্মবিশ্বাসশূন্যতা ও অস্থিতিশীলতা। তখনই এলেন আল্লাহ্র রাসূল, দান করলেন তাদেরকে স্বচ্ছ-সুন্দর পবিত্র সাহস ও হিম্মতে ভরপুর জীবন ও শক্তি সঞ্চারী এক আকীদা! তাওহীদের আকীদা।
নিষ্কৃতি পেল তারা তাগূতের ভয় ও শংকা থেকে। তারা এখন ভয় করে শুধু আল্লাহকেই। জন্ম নিয়েছে তাঁদের অন্তরে এই দৃঢ় বিশ্বাস যে, উপকার ও অপকার এবং দেয়া ও ছিনিয়ে নেয়ার ক্ষমতা কেবল আল্লাহ্র। শুধু তিনিই পারেন মানুষের প্রয়োজন পুরা করতে। তাঁদের কাছে পৃথিবীকে এখন আর আগের মত মনে হয় না। তাওহীদের এই নতুন আবিষ্কার ও এই নতুন পরিচয়ের মধ্য দিয়ে সব কিছুই এখন তাঁদের সামনে বদলে গেছে। দাসত্বের শৃংখল থেকে তারা আজ মুক্ত ও স্বাধীন। তাঁদের হৃদয়ে নেই সৃষ্টির ভয়, নেই সৃষ্টির কাছে তাঁদের কোন চাওয়া ও পাওয়া। তাঁদের হৃদয় জুড়ে আজ প্রশান্তি আর প্রশান্তি। তাঁদের চিন্তা-চেতনায় আর কোন গোলমাল নেই। সৃষ্টিলোকের ভেতরে নিজের অবস্থান সম্পর্কে আজ তাঁরা পূর্ণ সচেতন। আল্লাহ্র সৃষ্টির মাঝে তাঁরাই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, পৃথিবীর সরদার এবং আল্লাহ্র খলীফা বা প্রতিনিধি। প্রতিপালকের অনুসরণ ও মানবতার সেবার ভেতরেই আজ তারা খুঁজে পায় আপন অস্তিত্বের সার্থকতা। মহান স্রষ্টার আদেশ-নিষেধ বাস্তবায়নই এখন তাঁদের মহান দায়িত্ব ও একমাত্র ব্রত, যার ভেতর নিহিত রয়েছে মানবতার চিরন্তন বিজয় ও সাফল্য, দীর্ঘকাল ধরে যা থেকে পৃথিবী ছিলো বঞ্চিত।
মুহাম্মাদ (সা)-এর আবির্ভাবের পর সারা পৃথিবী জুড়ে গুঞ্জরিত হল তাওহীদের আকীদা (অথচ ইতোপূর্বে এই আকীদাই ছিল পৃথিবীর অন্যান্য আকীদার চেয়ে সবচেয়ে বেশী মজলুম ও অপরিচিত)। পৃথিবীর সমস্ত দর্শন ও মতবাদ এবং চিন্তা ও ভাবধারার ওপর বিরাট প্রভাব পড়ল এই নতুন আকীদার।
যে সব বড় বড় মাযহাব বা ধর্ম শির্ক এবং একাধিক উপাস্যের স্লোগানে মুখর ছিল, শেষ পর্যন্ত আকীদায়ে তাওহীদের প্রভাবে অনুচ্চ কণ্ঠে ও ফিসফিস করে হলেও এই নতুন আকীদার প্রভাবে তাদেরকে এ কথা স্বীকার করতে হয়েছে, “আল্লাহ এক, তাঁর কোন শরীক নেই।” শুধু তাই নয়, রাতারাতি তারা শির্কের অপবাদ থেকে বাঁচার জন্য নিজেদের শির্কী মতবাদের দার্শনিক ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে লাগল এবং তাকে আকীদায়ে তাওহীদের সাথে কিছুটা সামঞ্জস্য বিধানের কসরত চালাতে লাগল। ধর্মগুরুরা শির্কের কথা মুখে আনতে বেশ লজ্জাবোধ করতে লাগলেন। তখন সারা শির্কী পদ্ধতির ধারক-বাহকগণই চিন্তা-চেতনায় এবং বিশ্বাস ও অনুভূতিতে হীনমন্যতার শিকার হয়ে পড়েছিল। তাই মুহাম্মাদ (সা)-এর আকীদায়ে তাওহীদের এই উপহার ছিল বিশ্বমানবতার জন্য সবচেয়ে দামী উপহার।
ঐক্য ও সাম্য
নবীজীর দ্বিতীয় অনুগ্রহ এই যে, শতধা বিচ্ছিন্ন ও বহুধা বিভক্ত মানব সম্প্রদায়কে ঐক্য ও সাম্যের বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন তিনি। তাঁর আগমনের পূর্বকার চিত্র একটু কল্পনা করুন। এক গোত্রের সাথে আরেক গোত্রের কোন সম্পর্ক ছিল না। সবার মাঝে সম্পর্কহীনতার দুর্ভেদ্য প্রাচীর খাড়া হয়ে আছে। জাতীয়তাবাদ বন্দী হয়ে আছে সংকীর্ণতার নিগড়ে। পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যবধান ও পার্থক্য ছিল মানুষ ও প্রাণী, স্বাধীন ও গোলাম এবং আবদ্ ও মা’বুদের সম্পর্কের ব্যবধান ও পার্থক্যের মত। তখন একতা ও সাম্যের কোন ধারণাই তাদের ছিল না। তারপর নবীজী সবাইকে শুনিয়ে দিলেন সুদীর্ঘ কালের নীরবতাকে ভেঙে দিয়ে এবং স্তরে স্তরে জমে থাকা অন্ধকারকে ভেদ করে সেই বিপ্লবী ঘোষণা, যা হতবাক করে দিল মানুষের বিবেক-বুদ্ধিকে আর পরিস্থিতি মোড় নিল সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে।

“হে লোকসকল! তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের পিতৃপুরুষও এক। তোমরা সবাই আদম সন্তান আর আদমকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি সেই যে তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে অধিক ভয় করে। কোন অনারবের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই কোন আরবের কেবল তাকওয়া ছাড়া” (কানযুল-উম্মাল)।
এই ঘোষণার রয়েছে দু’টি দিক যার ওপর নির্ভর করে শান্তি ও নিরাপত্তা সর্বকালে সর্বস্থানে। একটি হল, আল্লাহ এক, অদ্বিতীয়। আর দ্বিতীয়টি হল, মানুষের উৎসস্থল এক-অদ্বিতীয়। সুতরাং মানুষ মানুষের ভাই দুই দিক থেকে প্রথমত, তাদের প্রতিপালক এক আর এটিই মূল। দ্বিতীয়ত তাদের পিতৃপুরুষ এক।

“হে লোকেরা! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক মুত্তাকী। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ-সব কিছুর খবর রাখেন।”
বিদায় হজ্জের বিশাল জনসমুদ্রে নবীর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল এই চিরন্তন বাণী।
সত্যি কথা বলতে কি, নবীজী যখন এই মহান ঐতিহাসিক ঘোষণা শোনানোর জন্য দাঁড়িয়েছিলেন তখন এই স্পষ্ট ও বিপ্লবী ঘোষণা শোনার জন্যে পৃথিবীর একেবারেই ‘মুড’ ছিল না। কেননা ভূমিকম্প থেকে এই ঘোষণা মোটেই কম ধ্বংসী ও কম মারাত্মক ছিল না। কারণ কিছু কিছু জিনিস এমন যার প্রতিক্রিয়া আমরা ধীরে ধীরে সয়ে নিতে পারি অথবা আড়াল থাকার কারণে কোন প্রতিক্রিয়াই অনুভূত হয় না। যেমন বিদ্যুৎ প্রবাহের কথাই ধরুন। আমরা যদি সরাসরি তা স্পর্শ করি তাহলে নিমিষেই আমাদেরকে ঢলে পড়তে হবে মৃত্যুর হিমশীতল কোলে। আর যদি আবরণের ওপর দিয়ে স্পর্শ করি তাহলে কোন বিপদাশংকাই নেই। আজ মানুষ পেরিয়ে এসেছে জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং চিন্তা ও গবেষণার এক সুদীর্ঘ পথ-পরিক্রমা। কিসের বদৌলতে? ইসলামী দাওয়াতের বদৌলতে, সর্বজনীন ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার বদৌলতে, ইসলামের অগণিত দাঈ, সংস্কারসেবী ও প্রশিক্ষণদাতাদের হাজারো ত্যাগ-তিতিক্ষা ও কোরবানীর
বদৌলতে। এসব কিছুর বদৌলতেই আজ এই বিপ্লবী ও ব্যতিক্রমী ঘোষণা নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে, যে বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া কারো পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব নয়। তাই আজ জাতিসংঘের মঞ্চ থেকে আরম্ভ করে বিশ্বব্যাপী সর্বত্রই ধ্বনিত হচ্ছে মানবাধিকার ও সাম্যের কথা। এই বাস্তবতার কথা আজ কারো কাছেই অস্পষ্ট নয়।
কিন্তু ইতিহাসের পাতায় একটু নজর দিলে দেখা যায় যে, পৃথিবীতে প্রাক-ইসলামী যুগে এমন সময়ও অতিবাহিত হয়েছে যখন মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ছিল আসমান-যমীন। কোন কোন বংশ নিজের সম্পর্ক জুড়ে দিয়েছিল চন্দ্র-সূর্যের সাথে, কেউ বা আবার স্বয়ং আল্লাহ্ সাথে।

আল-কুরআন আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন ইয়াহূদী-নাসারাদের ভ্রান্ত আকীদার কথা এভাবে :

মিসরীয় ফেরাউনরা নিজেদেরকে সূর্য দেবতার অবতার বলত আর হিন্দুস্তানের কতিপয় সম্প্রদায় নিজেদেরকে বলত সূর্য বংশ ও চন্দ্র বংশ। ইরানী বাদশাহগণ (যাদের উপাধি ছিল কিসরা) দাবি করত যে, তাদের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত রয়েছে খোদায়ী শোণিত ধারা। ইরানীদের কাছে তাদের গুণাবলী এভাবে পরিবেশিত হয়েছিল, “উপাস্যদের মধ্যে রয়েছে এমন মানুষ যার কোন বিলুপ্তি নেই এবং মানুষের মধ্যে রয়েছে এমন উপাস্য যার কোন দ্বিতীয় নেই। সমুচ্চ হোক তার কথা, উন্নত হোক তার সম্মান ও মর্যাদা। তিনি সূর্যের সাথে উদিত হন সূর্যালোক হয়ে আর ছাপিয়ে তোলেন অন্ধকার রাতকে উজ্জ্বল আলোকমালায়।”
অনুরূপ রোম সম্রাটদের মধ্যেও হত অনেক ‘ইলাহ’। তাদের যেই মসনদে আসীন হতেন, তিনিই তথাকথিত ‘ইলাহ’-এ পরিণত হয়ে যেতেন আর তার ‘লকব’ হত AUGUST আর চীনারা নিজেদের অধিপতিদেরকে মনে করত ইবনু’স-সামা আসমানের পুত্র বলে। তাদের ধারণা ছিল যে, আসমান পুরুষ এবং যমীন নারী আর এই দুইয়ের সম্মিলনেই অস্তিত্ব লাভ করেছে এই বিশ্বজগতের সৃষ্টিলোক।
আরবরা নিজেদের ছাড়া অন্য সবাইকে ভাবত ‘আজম’। কুরায়শরা মনে করত
তারাই আরব গোত্রসমূহের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত। তারা সর্বক্ষেত্রেই নিজেদের ঐতিহ্য বজায় রেখে চলত। কোন আনুষ্ঠানিকতাই অন্য কোন গোত্রের সাথে তারা অংশ নিত না। হাজীদের সাথে প্রবেশ করত না আরাফাতে, বরং হারামে থেকে যেত এবং মুযদালিফায় অবস্থান করত আর বলত, আমাদের কথা ভিন্ন। আমরা আহলুল্লাহ।
মানুষের সম্মান ও মর্যাদার ঘোষণা
মানব জাতির প্রতি রাসূল্রে আরাবীর তৃতীয় অনুগ্রহ এই যে, তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন মানবতার সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের শিক্ষা। তাঁর আবির্ভাবের পূর্বে মানুষ ও মানবতা অপমান ও লাঞ্ছনার এক দুর্বিষহ জীবনের ওপর দাঁড়িয়ে অসহায়ভাবে গুণছিল নাজাত ও মুক্তির প্রহর। এই মানুষের চেয়ে অপমানিত, লাঞ্ছিত, ধিকৃত ও অবহেলিত কোন জীব আর পৃথিবীতে ছিল না। দেবতা মনে করে যে সব জীব-জানোয়ার ও গাছপালার পূজা করা হত কিছু মনগড়া বিশ্বাস ও অনুভূতিকে কেন্দ্র করে সেগুলো পর্যন্ত ছিল এই মানুষের চেয়ে অধিক মূল্যবান, সম্মানিত ও সুরক্ষিত। শুধু তাই নয়, এসব কল্পিত উপাস্যদের জন্য অনেক নিষ্পাপ মানুষকে বলি দেয়া হত। তাদের তাজা খুন ও গোশত পেশ করা হত নৈবেদ্য হিসাবে দেবতার সামনে। তবু তাদের হৃদয় একটু কাঁপত না। তাদের পাষাণ হৃদয়ে উদ্রেক হত না সামান্য মানবতাবোধ। কেনই-বা বলছি সেই চৌদ্দ শ’ বছর আগের কথা। বিংশ শতাব্দীর এই সভ্য যুগেও তো হিন্দুস্তানসহ সভ্য হিসেবে কথিত দেশগুলোতে আমরা দেখে চলেছি এমন জঘন্য, বর্বর, লোমহর্ষক ও অমানবিক সব চিত্র।
তখন সেই জাহেলী যুগে এলেন আল্লাহর নবী। উদ্ধার করলেন মানবতাকে অপমান ও লাঞ্ছনার অতল গহবর থেকে, ফিরিয়ে দিলেন গৌরব ও হারিয়ে যাওয়া সম্মান-মর্যাদা, ফিরিয়ে দিলেন তার আত্মসম্মানবোধ ও গ্রহণযোগ্যতা। দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন য়া এই পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে বড় ও মহান আর কিছু নেই। মানুষ সবচেয়ে সম্মানিত ও শ্রেষ্ঠ। প্রেম-ভালবাসা পাওয়ার অধিক হকদার অন্য কিছু নয়, কেবল মানুষ।
মানুষই হেফাজতের অধিক দাবিদার। আল্লাহ নিজে বাড়িয়ে দিয়েছেন মানুষের মর্যাদা ও অবস্থান। ফলশ্রুতিতে এই মানুষই অর্জন করেছে তাঁর খলীফা ও প্রতিনিধি হওয়ার গৌরব।

“তিনি সেই সত্তা, যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য যা কিছু যমীনে রয়েছে।” মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সমস্ত সৃষ্টির নেতৃত্ব দেওয়ার ও সভাপতিত্ব করার অধিকার একমাত্র মানুষের।

“নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি। আমি তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে চলাচলের জন্য বাহন দান করেছি। তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদেরকে অনেক সৃষ্ট বস্তুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।” মানুষের সম্মান ও মাহাত্ম্যের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে আছে আল্লাহ্র নবীর এই বাণী :

“সমস্ত সৃষ্টিই আল্লাহ্র পরিবার। সুতরাং সৃষ্টিকুলের মধ্যে আল্লাহ্র কাছে সেই প্রিয়তম যে তার পরিবার-পরিজনের সাথে উত্তম আচরণ করে।”
সামনে হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত মহানবী (স)-এর যে হাদীসটি বিধৃত হচ্ছে মানবতার মাহাত্ম্যের ওপর এত বড় দলিল এবং মানবতার সেবায় নিজেকে পেশ করে আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের এত বড় প্রমাণ আর নেই। লক্ষ্য করুন হাদীসের কথা ও মর্ম। তিনি বলেন :
কেয়ামতের দিন আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের উদ্দেশ্য করে বলবেন, “হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ ছিলাম, তোমরা আমার সেবা-যত্ন করনি।” বান্দা আরয করবে, “হে আল্লাহ্! এ কেমন করে সম্ভব! আপনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক।” তিনি বলবেন, “তুমি কি জান না, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল, কিন্তু তুমি তার সেবা-যত্ন করনি? তার পাশে দাঁড়ালে সেখানে তো তুমি আমাকেই পেতে।”
“হে আদম সন্তান! আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম, তোমরা আমাকে অন্ন দাওনি।” বান্দা তখন আরয করবে, “প্রভু হে! কিভাবে সম্ভব, আপনি তো রাব্বুল-আলামীন।” আল্লাহ বলবেন, “আমার অমুক বান্দা ক্ষুধার্ত ছিল। তুমি তাকে খেতে দাওনি। তোমার কি জানা ছিল না যে, তাকে খাওয়ালে আমাকে কাছে পেতে?” “হে আদম সন্তান! আমি পিপাসার্ত ছিলাম, তোমরা আমায় পানি দাওনি।” বান্দা আরয করবে, “হে আমার প্রতিপালক! কিভাবে আপনাকে পানি পান করাব? আপনি যে তৃষ্ণা থেকে পবিত্র?” আল্লাহ বলবেন, “আমার অমুক বান্দা পিপাসার্ত ছিল, তুমি তার পিপাসা নিবারণ করনি। তোমার কি জানা ছিল না, তার পিপাসা মিটালে তা আমার কাছে পেতে?”
মানবতার মাহাত্ম্যের ও তার উন্নত অবস্থানের সাক্ষ্য বহনকারী এই ঘোষণার চেয়ে অধিক স্পষ্ট ও পরিষ্কার কোন ঘোষণা কি কল্পনা করা যেতে পারে? এমন উন্নত অবস্থান ও মহান মর্যাদা মানুষ কি লাভ করতে পেরেছে সে কালের কিংবা এ কালের কোন ধর্ম দর্শনের অনুসারী হয়ে? নজীর আছে কি? আল্লাহ্র রহমত লাভ করতে হলে সৃষ্টিলোকের ওপর রহম করতে হবে। আল্লাহ্র নবী ইরশাদ করেছেন :

“যাঁরা রহম করে তাদের প্রতিই الرحمن এর রহমত বর্ষিত হয়। পৃথিবীতে যারা আছে তোমরা তাদের প্রতি রহম কর, তবে আসমানে যিনি আছেন তিনিও তোমাদের প্রতি রহমত নাযিল করবেন।”
একটু ভেবে দেখুন তো, ইসলামপূর্ব যুগে মানবতার এই মুক্তি সংগ্রামে, মানুষের মাঝে একতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের এই জিহাদে বের হওয়ার পূর্বে কী ছিল পৃথিবীর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি? একজন মানুষের কিছু মাতাল ইচ্ছার মূল্য ছিল হাজার হাজার প্রাণের চেয়েও বেশি। একেকজন রাজ্যপাল ও সাম্রাজ্যবাদী সম্রাট বের হত আর দেশকে দেশ কবজা করে সেখানে বইয়ে দিত অমানবিকতার ঝড়ো হাওয়া। তাদের ইচ্ছার কাছে কত আযাদ মায়ের আযাদ সন্তানদের নিমিষেই বরণ করে নিতে হত গোলামী ও পরাধীনতার শৃংখল।
আলেকজান্ডার শুরু করল অভিযান! যেন কাবাডি খেলতে খেলতে হিন্দুস্থান পর্যন্ত পৌঁছে গেল আর চলতি পথে মাটির সাথে মিশিয়ে দিল কত সভ্যতা, কত সংস্কৃতি। বেরিয়ে এল সিজার হিংস্র শ্বাপদের জিঘাংসা নিয়ে আর ‘শেষ’ করে দিল কত মানুষের ছন্দময় জীবন!
এই আমাদের চোখের সামনেই তো ঘটে গেল দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধের প্রলয়কাণ্ড! এই যুদ্ধদ্বয়ের তাণ্ডবলীলায় স্তব্ধ হয়ে গেছে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের জীবন স্পন্দন।
জাতীয়তাবাদের মিথ্যা বড়াই, রাজনৈতিক অহংকারবোধ, ক্ষমতা লিপ্সা ও বিশ্ব বাজারের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য লাভের উদগ্র বাসনাই কি এই যুদ্ধ টেনে আনেনি?
হৃদয়ে হৃদয়ে ছেয়ে গেল আশা-আকাঙ্ক্ষার আলো, স্বাবলম্বিতা ও আত্মমর্যাদাবোধের দীপ্তি!
আল্লাহ্র রহমত ও করুণা থেকে মানুষ নিরাশ হয়ে পড়েছিল। তাদের মাঝে জন্ম নিয়েছিল ‘নিখুঁত মানব প্রকৃতি’ সম্পর্কে এক রকম পাপবোধ। এই ধারণা মানুষের মনে বেশ ভালভাবেই ঠাঁই করে নিয়েছিল যে, মানুষ জন্মগতভাবেই পাপী ও অপরাধী।
মূলত মানুষের নিখুঁত মানব-প্রকৃতি ও সুকুমার বৃত্তির এই দৈন্যদশা সৃষ্টি হওয়ার জন্যে কাজ করছিল যুগপৎ এশিয়ার কয়েকটি প্রাচীন ধর্ম এবং ইউরোপ, আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের বিকৃত খৃষ্ট ধর্ম। হিন্দুস্তানের প্রাচীন ধর্মগুলো মানুষের সামনে পেশ করেছিল ‘তানাসুখ’ -এর দর্শন আর খৃষ্ট ধর্ম প্রচার করে বেড়াচ্ছিল এই স্লোগান, “মানুষ আসলে জন্মগতভাবেই পাপী আর ঈসা মসীহ হলেন তাদের পাপের কাফফারা ও প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ।”
এই জঘন্যতম আকীদাদ্বয়ের প্রসার ঘটিয়ে তৎকালীন দুনিয়ায় সে আকীদার অনুসারী লাখো কোটি মানুষকে আপন সত্তা ও প্রকৃতি সম্পর্কে ভীষণভাবে সন্দিহান করে তোলা হয়েছিল এবং তাদের ভবিষ্যৎ, পরিণাম-ফল ও আল্লাহ্র রহমত লাভের আশা-ভরসাকে তাদের মন থেকে মুছে দেয়া হয়েছিল। তখনই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন : মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি একটি নিখুঁত ও পরিচ্ছন্ন ফলকের ন্যায়, আগে যাতে ছিল না কোন ধরনের লেখা ও চিহ্ন। পরবর্তীতে মানুষ তাতে আঁকে চোখ জুড়ানো সব নকশা ও চিত্র অর্থাৎ মানুষ নিজেই উদ্বোধন করে তার জীবন। আগামী দিনের কর্ম বিচারেই তার ভাগ্য নির্ধারিত হবে, আপন কর্মগুণেই তার বিচার হবে। সে হবে জান্নাতী কিংবা জাহান্নামী। অন্যের কর্মের ব্যাপারে সে মোটেই দায়ী নয়। পবিত্র কুরআনের একাধিক জায়গায় এই কথা পরিষ্কার করে বলে দেয়া হয়েছে যে, মানুষ কেবল নিজের কর্ম সম্পর্কেই জিজ্ঞাসিত হবে।

“(কিতাবে আছে) যে, কেউ কারো বোঝা বহন করবে না এবং মানুষ তাই
পায় যা সে করে। তার কর্ম শীঘ্রই দেখান হবে, অতঃপর তাকে দেয়া হবে পূর্ণ প্রতিদান” (সূরা নাজম, আয়াত-৩৮)।
স্বীয় স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কে এই ঘোষণা আবার ফিরিয়ে আনল তার হারানো বিশ্বাস ও অনুভূতি। ফলে সে এগিয়ে গেল সমুখপানে-দৃঢ়প্রত্যয়ী সংকল্প নিয়ে, বীরত্বব্যঞ্জক উদ্যমী মনোভাব নিয়ে, এগিয়ে গেল নির্ভীক ও নিঃশংক হয়ে, মানবতার এক নতুন পৃথিবী আবাদ করার লক্ষ্য নিয়ে। সুযোগের সদ্ব্যবহারে এখন সে মোটেই দ্বিধাগ্রস্ত নয়, সন্দিগ্ধ নয়। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপরাধ ও গুনাহকে ভুল-ত্রুটি ও পদস্খলনকে মানুষের জীবনের একটি আকস্মিক অবস্থা বলে চিহ্নিত করেছেন যাতে সে লিপ্ত হয়ে পড়ে কখনো অজ্ঞতাবশত, কখনো অসতর্কতাবশত, আবার কখনো বা শয়তানের ধোঁকার শিকার হয়ে। নইলে সততা, সততার যোগ্যতা, অপরাধ স্বীকার করে অনুতপ্ত হওয়া মানব স্বভাবের প্রকৃত দাবি ও ইনসানিয়াতের অলংকার। কোন ভুল হয়ে গেলে আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে ক্ষমাাওয়া, পুনর্বার তা না করার দৃঢ় সংকল্পে বুক বাঁধা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের বড় প্রমাণ, তার মৌলিকত্বের বড় নিদর্শন ও বহিঃপ্রকাশ, সর্বোপরি তা হযরত আদম (সা)-এর উত্তরাধিকার।
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গুনাহগার ও পাপীদের সামনে, পাপাচার ও অনাচারে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিদের সামনে খুলে দিয়েছেন তাওবার এক প্রশস্ত দরজা। ব্যাপকভাবে ডেকেছেন তাদেরকে তাওবার দিকে। তুলে ধরেছেন তাদের সামনে তাওবার ফযীলত ও বিস্তৃত ব্যাখ্যা, যে বিস্তৃতি উপলব্ধি করে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, তিনি দীনের এই বিশেষ ও মহান রুকনটিকে উম্মতের সামনে জীবন্ত করে তুলেছেন। তাই তাঁর অন্যান্য সুন্দর নামের মধ্যে একটি নাম হল نبي التوبة (তাওবার নবী)। কেননা বিগত জীবনের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও গুনাহ-খাতার জন্য একমাত্র বাধ্যতামূলক পন্থা হিসাবেই শুধু মানুষকে তিনি তাওবার দিকে ডাকেননি, বরং তাওবার শান ও মাহাত্ম্যকে তুলে ধরেছেন উম্মতের সামনে। ফলে তাওবা আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে ‘বিলায়াতের’ দরজা লাভ করার জন্য এক শ্রেষ্ঠ ইবাদতে পরিণত হয়ে গেছে, অথচ এই বিলায়াতই আবেদ-যাহিদ-এর কাছে এবং আল্লাহর নেক বান্দাদের নিকট চিরকালের ঈর্ষণীয় জিনিস।
আল-কুরআনেও আল্লাহ তা’আলা বর্ণনা করেছেন তাওবার ফযীলত ও তাঁর রহমতের বিস্তৃতির কথা। তাওবা করলে গুনাহগারের গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকে এমন চিত্তাকর্ষক ও আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে বয়ান করা হয়েছে এবং অবাধ্য ও গুনাহগার বান্দাদেরকে, কুপ্রবৃত্তি ও শয়তানের সাথে যুদ্ধে হেরে যাওয়া
হৃদয়গুলোকে আল্লাহর রহমতের দামান আঁকড়ে ধরার এবং দয়া ও করুণার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য এমনভাবে ডেকেছেন এবং তাঁর তরঙ্গায়িত ও সর্বব্যাপী রহমতকে এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যাতে মনে হয় আল্লাহ পাক শুধু সহনশীল, দয়ালু ও দানশীলই নন, বরং তিনি ভীষণ ভালোবাসেন (যদি আমার এই প্রকাশভঙ্গী ঠিক হয়) তওবাকারিদেরকে।
এবার পড়ুন কুরআনের আয়াতগুলো, অনুধাবন করুন তাঁর দয়া, করুণা ও মহব্বতের সেই নিঃসীমতা যা আয়াতের শব্দে শব্দে ঝরে পড়েছে, আলো ছড়াচ্ছে।

“বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহ্র রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চিতই আল্লাহ যাবতীয় গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু” (সূরা যুমার, আয়াত ৫৩)।
অপর এক আয়াতে গুনাহগার পাপী মানুষের উল্লেখ প্রসঙ্গে নয়, বরং অত্যন্ত শক্তিশালী, উত্তম চরিত্র-বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত জান্নাতী মানুষের আলোচনা প্রসঙ্গে গুনাহ থেকে তওবাকারী মানুষের উল্লেখ করতে গিয়ে ইরশাদ হয়েছে :

“তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল। আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদেরকে ভালোবাসেন। এবং যারা
কোন অশ্লীল কার্য করে ফেলে অথবা নিজেদের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ব্যতীত কে পাপ ক্ষমা করবে? এবং তারা যা করে ফেলে, জেনে শুনে তারই পুনরাবৃত্তি করে না।
“ওরাই তারা, যাদের পুরস্কার তাদের প্রতিপালকের ক্ষমা এবং জান্নাত যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর সৎকর্মশীলদের পুরস্কার কত উত্তম!”
এই আয়াতের চেয়েও আরো চিত্তাকর্ষক পদ্ধতি চোখে পড়ে নিম্নোক্ত আয়াতে। আল্লাহ এই আয়াতে তাঁর পুণ্যবান বান্দাগণের এক নূরানী তালিকা তৈরি করেছেন আর তা উদ্বোধন করেছেন আবেদ-যাহিদের বদলে তওবাকারীদের দিয়ে :

“তওবাকারী, ইবাদতকারী, শোকরগুযার, (দুনিয়ার সাথে) সম্পর্কচ্ছেদকারী, রুকূ‘কারী ও সেজদা আদায়কারী, সৎকাজের আদেশ দানকারী ও মন্দ কাজ থেকে নিবৃত্তকারী এবং আল্লাহর দেয়া সীমাসমূহের হেফাজতকারী (এরাই মু’মিন)। আর (হে পয়গম্বর!) আপনি মু’মিনদেরকে (জান্নাতের) সু-সংবাদ শুনিয়ে দিন” (সূরা তওবা, আয়াত ১১৩)।
গুনাহ করার পর তওবাকারী ক্ষমাপ্রাপ্ত হলে তার যে সম্মান ও মর্যাদা লাভ হয় তা ফুটে উঠেছে তাবূক যুদ্ধে কোন সংগত কারণ ছাড়াই পিছিয়ে পড়া তিন সাহাবীর তওবা কবুল করার কুরআনী ঘোষণায়। আয়াতে উক্ত তিন সাহাবীর আলোচনার আগে স্বোদ আল্লাহর নবী এবং সেই সব আনসার-মুহাজিরদের আলোচনাও করা হয় যারা তাবূক অভিযানে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন। তারপর যুদ্ধে পিছিয়ে পড়া তিনজনের কথা উল্লেখ করা হয়। কারণ হল, এই তিনজন যাতে একাকীত্ব অনুভব না করেন এবং কোন প্রকার হীনমন্যতা ও নীচ অনুভূতি তাদেরকে কষ্ট না দেয় আর দুনিয়াবাসীর কাছেও যাতে কেয়ামত পর্যন্ত এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই তিনজনও সেই মুবারক জামাতেরই সদস্য। সুতরাং লজ্জার কিছু নেই।
আছে কি ধর্ম, চরিত্র, প্রশিক্ষণ ও সংস্কার-সংশোধনের কোন ইতিহাসে তওবা
করার এমন চিত্তাকর্ষক, সুন্দর, মধুর ও হৃদয়গ্রাহী কোন নমুনা? এবার লক্ষ্য করুন কুরআনী আয়াত :

“আল্লাহ অনুগ্রহপরায়ণ হলেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি যারা কঠিন মুহূর্তে নবীর সঙ্গে অনুগমন করেছিল যখন তাদের এক দলের চিত্তবৈকল্যের উপক্রম হয়েছিল। অতঃপর তিনি দয়াপরবশ হন তাদের প্রতি; নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি দয়াশীল ও করুণাময়। এবং তিনি ক্ষমা করলেন অপর তিনজনকেও যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল, যে পর্যন্ত না পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে পড়েছিল এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়েছিল আর তারা বুঝতে পেরেছিল যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি সদয় হলেন তাদের প্রতি যাতে তারা তওবা করে। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু” (সূরা তওবা : আয়াত ১১৭-১১৮)।
আল্লাহ আরো ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর রহমত সব কিছুকে বেষ্টন করে রেখেছে :

“আমার রহমত প্রতিটি বস্তুতে ব্যাপ্ত” (সূরা আ’রাফ, আয়াত ১৫৬)।
এক হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে :

“নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী।”
আল্লাহ নৈরাশ্যকে কুফুরী, মূঢ়তা ও ভ্রষ্টতার শামিল হিসাবে চিহ্নিত করে বলেছেন, হযরত ইয়াকুব (আ)-এর ভাষায় :

“নিশ্চয়ই কাফির সম্প্রদায় ব্যতীত আল্লাহ্ রহমত থেকে কেউ নিরাশ হয় না” (সূরা ইউসুফ, আয়াত ৮৭)।
অন্যত্র হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে :

“পালনকর্তার রহমত থেকে পথভ্রষ্ট ছাড়া আর কে নিরাশ হয়?” (সূরা হিজ্ র্ আয়াত-৫৬)।
এইভাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) তওবার ফযীলত বয়ান করে এর প্রতি উম্মতকে উৎসাহিত করে ঘোষণা করলেন আল্লাহ্ রহমতের বিস্তৃতি ও ব্যাপকতার কথা এবং আল্লাহ্ ক্রোধ ও জালালিয়াতের ঘোষণা ও তার বিস্তৃতিতে ভীতসন্ত্রস্ত, নিরাশ ও মতোদ্যম হৃদয়গুলোকে শোনালেন এক নয়া জিন্দেগীর পয়গাম। হতাশা ঘেরা জীবনে সঞ্চার করলেন এক নতুন স্পন্দন, নতুন তৎপরতা। লাঞ্ছনা ও অভিশপ্ত দুনিয়ার আঁধার থেকে বের করে তাদেরকে নিয়ে গেলেন সম্মান, মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস ও আল্লাহ্ প্রতি অবিচল আস্থা স্থাপনের এক আলোকোজ্জ্বল নতুন পৃথিবীতে।
সমন্বয় সাধনের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত
প্রাচীন ধর্মগুলো, বিশেষত খৃষ্ট ধর্ম মানব জীবনকে দুই ভাগে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল : দীন ও দুনিয়া। আর ভূমণ্ডলকে ভাগ করেছিল দু’টি স্তরে। এক স্তরে কিছু সংখ্যক মানুষ মশগুল থাকবে কেবল দীন নিয়ে, অপর দিকে কিছু লোক ব্যস্ত থাকবে শুধু দুনিয়া নিয়ে।
এই দু’টি স্তর পরস্পর বিচ্ছিন্নই ছিল না, উভয়ের মাঝে আড়াল সৃষ্টি করে দাঁড়িয়েছিল এক বিরাট বাধা ও দুর্ভেদ্য প্রাচীর। এক দলের সাথে আরেক দলের কোন যোগাযোগ ও মিল ছিল না, বরং পারস্পরিক যুদ্ধ-কলহ ও হানাহানির এক সিলসিলা বিদ্যমান ছিল, বিরাজমান ছিল একে অপরের রক্তে হাত লাল করার এক উন্মত্ত জিঘাংসা। এদের প্রত্যেকেই দীন-দুনিয়ার একত্রীকরণ ও সহাবস্থান অসম্ভব মনে করত। তাই যখনই কোন মানুষ এই দু’টি পক্ষের কোন একটিকে গ্রহণ করতে চাইত অপরিহার্যভাবেই তখন তাকে অপর পক্ষ থেকে পরিপূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন ও সম্পর্কহীন হয়ে পড়তে হত, বরং অপর পক্ষের বিরুদ্ধে তাকে রীতিমত যুদ্ধ ঘোষণা করতে হত। এ যেন একই সঙ্গে দুই নৌকায় পা রাখা। দুনিয়াদারদের
মনোভাব ছিল এই যে, আসমান যমীনদের স্রষ্টার দিক থেকে মুখ না ফেরালে এবং পরকাল সম্পর্কে বেখবর না হলে অর্থনৈতিক বিপ্লব সাধন ও সমৃদ্ধি সাধন কোনভাবেই সম্ভব নয়। মন থেকে আল্লাহ্ ভয় না তাড়ালে এবং নৈতিক, চারিত্রিক ও দ্বীনি শিক্ষা বর্জন না করলে কোন প্রশাসনিক ক্ষমতাই টিকে থাকতে পারে না।
আর অপর দল মনে করে, “বৈরাগ্যবাদকে আঁকড়ে না ধরলে এবং দুনিয়ার সাথে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন না করলে দীনদার হওয়ার প্রশ্নই আসে না।” বলা বাহুল্য, যা কিছু সহজ মানুষ তাই পছন্দ করে এবং প্রকৃতিগতভাবে তা মেনে নিতেও প্রস্তুত হয়ে যায়। দীনের অর্থ যদি এই হয় যে, দুনিয়ার বাহ্যিক সরঞ্জাম ও উপায়-উপকরণ থেকে মোটেই ফায়দা হাসিল করা যাবে না তবে তা মানব প্রকৃতির সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে না, বরং তা হবে নির্দোষ ও নির্মল মানব প্রকৃতিকে গলা টিপে হত্যা করার শামিল। আর দীনের এই তথাকথিত ব্যাখ্যার পরিণতিতেই তৎকালীন যুগের সভ্য, ধীমান, যোগ্য ও শিক্ষিত সমাজের একটি বিরাট অংশ দীনের পরিবর্তে দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয় এবং দুনিয়াদারী নিয়ে ভীষণভাবে মেতে ওঠে। ফলে তিরোহিত হয়ে যায় তাদের হৃদয়-মন থেকে আধ্যাত্মিকতায় সফলতা অর্জনের এবং উন্নত নৈতিকতা বিনির্মাণের সমস্ত আশা-ভরসা। যারা ব্যাপক হারে দীন বর্জন করেছিল তারা এই ভেবে বসেছিল যে, বাস্তবিকই দীনের সাথে দুনিয়ার সম্পর্ক বিপরীতমুখী ও সাংঘর্ষিক। আর গির্জাকেন্দ্রিক উদ্দেশ্য-প্রণোদিত কর্মকাণ্ড যে দীন ও দুনিয়া সম্পর্কে এমনটি ভাবতে মানুষকে বাধ্য করেছিল তা বলাই বাহুল্য। ফলে প্রশাসন ক্রমশই ক্রুদ্ধ ও বিদ্রোহী হয়ে উঠতে লাগল দীনের প্রতিনিধিত্বকারী এই গির্জার প্রতি। তখন মানুষ হয়ে পড়েছিল বাঁধনমুক্ত উন্মুক্ত হাতির ন্যায় আর সমাজ ব্যবস্থা হয়েছিল দিকচিহ্নহীন মরুর বুকের লাগামহীন উটের ন্যায়।
দীন ও দুনিয়ার মধ্যকার এই দুস্তর ব্যবধান ও তার অনুসারীদের দ্বন্দ্ব-কলহ ও যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলেই দরজা খুলে যায় ধর্মহীনতা ও আল্লাহদ্রোহিতার যার প্রথম ও প্রধান শিকার ছিল পাশ্চাত্য দুনিয়া এবং সেই সব সম্প্রদায় যারা চিন্তা-চেতনা ও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্যকে মুরুব্বী হিসাবে গ্রহণ করেছিল কিংবা পাশ্চাত্যের আনুগত্য শর্তহীনভাবে মেনে নিয়েছিল।
আর পূর্বেই বলা হয়েছে যে, এর জন্য সর্বতোভাবেই দায়ী ছিল সীমালংঘনকারী ও চরমপন্থী ফাদার ও পাদ্রীরা যারা মানুষকে দীন সম্পর্কে ভুল তথ্য ও তত্ত্ব প্রদান করে দীনের এক অবাস্তব, অসংগত, হিংস্র ও ভয়ানক চিত্র তুলে ধরে মানুষকে দীন সম্পর্কে ভীষণভাবে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলছিল।
এই নাযুক পরিস্থিতিতেই আবির্ভাব ঘটল হযরত রাসূলে কারীম (সা)-এর। ঘোষিত হল, মানুষের সঠিক কর্মকাণ্ডের সাথে দীনের কোন বিরোধ নেই, থাকতে পারে না। মানুষের সমস্ত কর্মকাণ্ডের বুনিয়াদই হল মানুষের মূল লক্ষ্য। ইসলাম এই বিষয়টিকেই একটি ছোট ও গভীর অর্থবহ শব্দে প্রকাশ করেছে। শব্দটি হল النية “নিয়ত”, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

‘নিয়তের ওপর সমস্ত কাজের ফলাফল নির্ভর করে। মানুষ যা নিয়ত করবে তারই ফল সে লাভ করবে।’
মানুষের যাবতীয় কাজের উদ্দেশ্যই যদি হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ এবং তাঁর হুকুম পালন, তাহলে এসব কাজ তাকে পৌঁছে দেবে আল্লাহর নিকটতম সান্নিধ্যে, ইয়াকীন ও বিশ্বাসের সর্বোচ্চ চূড়ায়। ফলে তার সমস্ত কর্মই পরিগণিত হবে তখন ‘খালিস দীন’ হিসাবে। পার্থিব আবিলতার সামান্যতম স্পর্শও তাতে থাকবে না, হোক না সে কাজ জিহাদ ও লড়াই? হোক না সে কাজ দেশ শাসন ও রাজ্য পরিচালনা? হোক না সে দুনিয়ার বৈধ বস্তুসমূহ থেকে খিদমত গ্রহণ কিংবা মনের চাহিদা পূরণ কিংবা জীবিকা নির্বাহের তাগিদে চাকরি অনুসন্ধানে চেষ্টা-তদবির কিংবা দাম্পত্য জীবনের সুখ-সম্ভোগ? নিয়ত ঠিক থাকলে এ সবই বিবেচিত হবে ইবাদত হিসাবে। পক্ষান্তরে নিয়ত ঠিক না থাকলে বড় বড় ইবাদত, যথা : নামায, রোযা, হিজরত, জিহাদ, তাসবীহ-তাহলীল সবই পরিগণিত হবে দুনিয়াবী কাজ হিসাবে। তার জন্য কোন ছওয়াব তো মিলবেই না, বরং এই ইবাদতই তার শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পঞ্চম অনুগ্রহ এই যে, তিনি দীন ও দুনিয়ার মধ্যকার এই দুস্তর ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়েছেন এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও শত্রুভাবাপন্ন দল দু’টিকে অবিরাম হিংসা, হানাহানি ও জিঘাংসা থেকে মুক্ত করে গলায় গলায় মিলিয়ে দিয়েছেন, আবদ্ধ করেছেন ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক সুগভীর দৃঢ় বন্ধনে, উপহার দিয়েছেন শান্তি ও ঐক্যের এক নতুন পৃথিবী।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) একাধারে বশীর (সুসংবাদ প্রদানকারী) ও নাযীর (ভীতি প্রদর্শনকারী)। তিনি আমাদেরকে শিখিয়ে গেছেন এই মহান দু‘আ :

“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়ায় কল্যাণ দান কর এবং
পরকালেও কল্যাণ দান কর আর আমাদেরকে বাঁচাও জাহান্নামের আযাব থেকে।” তিনি আরো ঘোষণা করেছেন :

“নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু কেবল জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্র উদ্দেশ্যেই নিবেদিত।”
মানব জীবন কিছু বিচ্ছিন্ন ও বিপরীতমুখী এককের সমষ্টি নয়, বরং তা হল এমন এক সত্তার নাম জীবনের ইবাদত-বন্দেগী, আল্লাহ্র প্রতি ঈমান ও অবিচল আস্থা, বাস্তব জীবনের হাজারো কর্মব্যস্ততা মোটেই যা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুতরাং নিষ্ঠা থাকলে, নিয়ত সহীহ থাকলে, আল্লাহ্র সন্তুষ্টিই একমাত্র লক্ষ্য হলে আর এ সবই নবী-রাসূলগণের আনীত মাপকাঠিতে উতরে গেলে প্রমাণিত হবে যে, আমরা গ্রহণ করতে পেরেছি নবীজীর কাছ থেকে একতা ও সাম্যের শিক্ষা। নবীজী মিটিয়ে দিয়েছেন দীন ও দুনিয়ার মধ্যকার সকল বাধা-ব্যবধান। তিনি মানুষের গোটা জীবনকে ইবাদতে পরিণত করেছেন আর সমগ্র পৃথিবীকে পরিণত করেছেন ইবাদতগাহে। পারস্পরিক সংঘর্ষে লিপ্ত ক্ষয়িষ্ণু মানবতার হাত ধরে তিনি তাদের নিয়ে গেছেন নিষ্ঠা ও সততার এক বিস্তৃত অঙ্গনে।
সেই পুণ্য কাফেলায় রয়েছেন ফকীর-মিসকীনের পোশাকে কত রাজা-বাদশাহ! আবার রাজা-বাদশাহ ও আমীর-উমারার লেবাসে রয়েছেন কত আবেদ যাহিদ ও আল্লাহ্র পেয়ারা বান্দা।
এঁরা ধৈর্য ও সহনশীলতার সুউচ্চ পর্বতমালা! ইল্ম ও জ্ঞানের উচ্ছল ঝর্ণাধারা! এঁদের রজনী ভোর হয় ইবাদত-বন্দেগীর নিবিড়তায় আর দিবসে হয় এঁরা শাহসওয়ার! আল্লাহ্র পথের সৈনিক। কিন্তু কোথাও কোন বিরোধ নেই, কোন জটিলতা নেই, নেই কোন শূন্যতা।
মনযিলে মকসূদ
মুহাম্মাদ (সা)-এর ষষ্ঠ অনুগ্রহ কিংবা তাঁর ঘটানো ষষ্ঠ বিপ্লব এই যে, তিনি মানুষকে উপযুক্ত ও সম্মানজনক এক মনযিলের পথ দেখিয়েছেন যেখানে ব্যয় হবে তার সর্বশক্তি। তিনি তাদেরকে সন্ধান দিয়েছেন এক বিশাল বিস্তৃত মহাশূন্যের, যেখানে সে উড়ে বেড়াবে মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায়। নবীজীর আগমনের পূর্বে মানুষ নিজের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল। সে জানত না কোথায় যেতে হবে তাকে এবং কোথায় শেষ হবে তার এই যাওয়া। সর্বোত্তম ও বাস্তবভিত্তিক এমন কোন
ক্ষেত্র আছে কি যেখানে অনায়াসে বিলিয়ে দেয়া যেতে পারে তার শক্তি-ক্ষমতা, চেষ্টা-সাধনা এবং তার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা প্রতিভা? না, কিছুই সে জানত না। সে বন্দী ছিল মনগড়া, কল্পিত, মরীচিকাময় কিছু ক্ষুদ্র স্বার্থ ও হীন উদ্দেশ্যের নিগড়ে। সে ছিল সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ পৃথিবীর এক বাসিন্দা। এই জীবনকে কেন্দ্র করেই ব্যয়িত হত তার সকল শক্তি ও মেধা। বিপুল অর্থবল, অসীম শক্তিবল, কিছু সংখ্যক মানুষের ওপর মোড়লিপনা ও আধিপত্য লাভ এবং কোন ভূখণ্ডের মালিক হতে পারাই ছিল সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীর একজন বাসিন্দার সবচেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়া। জাহিলী সমাজে সেই গণ্য হত একজন সর্বোচ্চ সফল ব্যক্তি হিসাবে। বল্গাহারা জীবনের বাঁধনমুক্ত আমোদ-প্রমোদ, নারী কণ্ঠের মধুঢালা সুর লহরী, উপাদেয় ও বিলাসী খাবার, বুলবুলির মিষ্টি আওয়াজ, ময়ূরের পেখমের দৃষ্টি কাড়া সৌন্দর্য এবং চতুষ্পদ জন্তু-জানোয়ারের ভিড়ের ভেতর হারিয়ে যাওয়াই ছিল তার স্বপ্নসাধ।
অপরদিকে কিছু মানুষ ধর্না দিয়ে ঘুরে বেড়াত তৎকালীন রাজা-বাদশাহদের কাছে। তাদের বুদ্ধি ও মেধা উৎসর্গীকৃত হত তাদের নৈকট্য লাভের পিছনে এবং তাদের অমূলক্ প্রশস্তি গেয়ে। অত্যাচারী শাসকবর্গের নাচের পুতুল হয়ে তারা কেবল নাচত। কিছু মূল্যহীন নিরর্থক সাহিত্যকে বুকে চেপে রেখে তারা লাভ করত সান্ত্বনা। তখন এলেন মুহাম্মাদ (সা)। নির্ধারণ করে দিলেন মানুষের প্রকৃত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। মানুষের মাঝে এই বিশ্বাস দৃঢ়মূল করলেন যে, তার চেষ্টা-সাধনা, তার বুদ্ধি, মেধা ও প্রতিভা, তার আশা-আকাঙ্ক্ষা ও উচ্চাভিলাষ এবং তার মুক্ত স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ও কেন্দ্রবিন্দু হল আসমান-যমীনের সৃষ্টিকর্তার পরিচয় লাভ, তাঁর গুণাবলী, তাঁর কুদরত ও হিকমত এবং তাঁর বিশাল-বিস্তৃত ও অন্তহীন সাম্রাজ্যের মাহাত্ম্য ও চিরন্তনতার সম্যক পরিচিতি লাভ, তাঁর প্রতি অবিচল ঈমান ও দৃঢ় আস্থা রাখা, তাঁর ইচ্ছা ও সন্তুষ্টিতে আসে বিজয় ও সাফল্য এই কথা দ্বিধাহীন চিত্তে বিশ্বাস করা, সর্বদা সন্তুষ্ট থাকা তাঁর প্রতি, বিশ্বাস রাখা তাঁর সীমাহীন কুদরতের প্রতি, তাঁর সেই একত্বের প্রতি যা মিলন ঘটাতে পারে কখনো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অগণিত অংশের ভেতর, কখনো বিপরীতমুখী অংশের মাঝে এবং নিজের রূহ বা আত্মাকে সর্বদা তাঁর জিকিরে সজীব ও শক্তিশালী রাখা। তারপর এই সবের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে নৈকট্য ও ইয়াকীনের মহিমান্বিত জগতে প্রবেশ করা, সবশেষে উপনীত হওয়া সেই স্থানে যেখানে নূরের ফেরেশতারাও পৌঁছতে পারে না। এটাই মানুষের আসল সৌভাগ্য, তার পূর্ণত্বের শেষ ধাপ, তার হৃদয় ও আত্মার মি’রাজ।
জন্ম হলো নতুন পৃথিবী-নতুন মানুষ
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের বরকতে এবং তাঁর মহান শিক্ষার দৌলতে বদলে গেল পৃথিবী, বদলে গেল পৃথিবীর রসম-রেওয়াজ ও প্রশাসনিক কাঠামো। মানবতার উত্তরণ ঘটল গ্রীষ্মের খরতাপ, লু-হাওয়া, প্রচণ্ড দাহ ও দুর্ভিক্ষ ঘেরা এক ভয়ংকর ঋতু থেকে, এমন এক ঋতুতে যেখানে গলাগলি করছে ফুল আর বসন্ত, যেখানে উদ্যান ঘেঁষে বয়ে চলেছে ছলছল প্রবাহের উচ্ছল ঝর্ণাধারা। তাঁর আগমনে পাল্টে গেছে মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি, তাদের হৃদয়গুলো আপন প্রতিপালকের আলোয় ঝলমলিয়ে উঠল। মানুষ ব্যাপকভাবে ধাবিত হল আল্লাহ অভিমুখে। মানুষ সন্ধান পেল অপরিচিত এক নতুন স্বাদের, অজানা এক নতুন রুচির, অজ্ঞাত এক নতুন ভালোবাসার।
আগের সেই নিস্তেজ ঘুমন্ত হৃদয়গুলো জেগে উঠল ঈমানের উষ্ণতায়, মায়া-মমতার পরশে। সবার মাঝে পরিলক্ষিত হচ্ছে নতুন উদ্যম, নতুন তৎপরতা। মানুষ দলে দলে বেরিয়ে এসেছে সিরাতু’ল-মুস্তাকীম তালাশের জন্য, সম্মান ও মর্যাদার চূড়ায় আরোহণের জন্য। দেশ ও জাতি নির্বিশেষে সকলেই এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য ব্যাকুল, উন্মুখ। আরব, আজম, মিশর, তুর্কী, ইরান, খোরাসান, উত্তর আফ্রিকা, স্পেন, হিন্দুস্তান, আলজেরিয়া, পূর্ব হিন্দুস্তান সবাই এই ঊর্ধ্ব জগতের ইশক-মুহব্বত ও প্রেম-ভালোবাসায় বেকারার, দেওয়ানা। মনে হচ্ছে, মানবতা যেন চেতনা ফিরে পেয়েছে, দীর্ঘ ও গভীর নিদ্রাশেষে চোখ মেলে তাকিয়েছে। কিন্তু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকাকালীন যে সুদীর্ঘ সময় কেটে গেল তার ক্ষতিপূরণ কিভাবে হবে? আর তা যে না হলেই নয়! হ্যাঁ, এই ক্ষতিপূরণের ধারাবাহিকতায় তখন মানবতার একেকটি গোষ্ঠী থেকে জন্ম নিলেন আল্লাহর পথের অসংখ্য দাঈ, রব্বানী, মুখলিস, নিষ্ঠাবান মুজাহিদ, সংস্কারক, প্রশিক্ষক, আরিফে রব্বানী, আবেদ-যাহিদ, সৃষ্টির শোক-ব্যথার সমভাগী, মানবতার কল্যাণে আত্মোৎসর্গীকৃত ও নিবেদিতপ্রাণ এবং আরো এমন সব মনীষী ও ব্যক্তিত্ব, নূরের ফেরেশতাকুলের কাছেও যাঁরা ঈর্ষণীয়। তাঁরা সবাই মিলে কি করলেন? বিরান ও অনাবাদ হৃদয়গুলোকে আবাদ করলেন আল্লাহ প্রেমের মশাল জ্বেলে। বইয়ে দিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও হিকমত-মারেফাতের হাজারো সালসাবিল! নির্যাতিত মানুষের হৃদয়ে স্থাপন করলেন জুলুম-নিপীড়ন, অন্যায়-অবিচার এবং দুশমনী ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদদীপ্ত এক প্রচণ্ড দ্রোহ। নির্যাতিত, অবমানিত ও লাঞ্ছিত মানবতাকে শিক্ষা দিলেন সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব আর উপেক্ষিত, বিতাড়িত ও অসহায় মানব গোষ্ঠীকে টেনে নিলেন সেই বুকে, যা আবাদ হয়ে আছে শুধু প্রেম-ভালোবাসা ও মায়া-মমতায়।
মানবতার সেবায় নিবেদিত এই মুবারক জামাত থেকে পৃথিবী কখনো বঞ্চিত হয়নি। এঁরা ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন সর্বদা, সব জায়গায়। সংখ্যায় এঁরা অগণিত অথবা এঁদের সংখ্যা নিরূপণই অসম্ভব। এঁদের কোয়ানটিটির কথা বাদ দিয়ে আসুন এদের কোয়ালিটির আলোচনায়। উল্টে যান ইতিহাসের পাতা, দেখবেন তাঁদের উন্নত চিন্তা, জাগ্রত বিবেকবোধ, প্রশান্ত আত্মা, তীক্ষ্ণধী ও নির্মল স্বভাব-চরিত্র। আরো দেখবেন কেমন করে এঁরা আর্স্ত মানবতার ব্যথায় ব্যথিত হতেন এবং নিজেকে তাদের সেবায় বিলিয়ে দিতেন। সৃষ্টিলোকের দুঃখ-দুর্দশায় তাঁদের পবিত্র আত্মাগুলো বিগলিত হত সমবেদনায়, সহমর্মিতায়। মানবতার মুক্তির স্বার্থে নিজেদেরকে যে কোন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতেন তাঁরা হাসিমুখে। আর তাঁদের আমীর ও শাসকগণ ছিলেন পূর্ণ দায়িত্বসচেতন এবং আমানতদার। একদিকে রাত জেগে জেগে ইবাদত-বন্দেগীতে থাকতেন মশগুল, অপরদিকে শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণের প্রতিও রাখতেন সতর্ক দৃষ্টি। শাসক-শাসিতের মাঝে কোথাও কোন অমিল বা বিরোধ ছিল না। সবাই তাঁদের অনুগত। আরেকটু উল্টে যান ইতিহাসের পাতা। অবাক হবেন তাঁদের ইবাদত, দুনিয়াবিমুখতা, দু’আ মোনাজাত, চারিত্রিক উৎকর্ষ, মাহাত্ম্যবোধ, ছোট ও দুর্বলদের প্রতি ভালোবাসা ও প্রেমবোধ, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে তাঁদের মধুর বিনম্র আচরণ, দয়া ও করুণা এবং জানের দুশমনকে অকাপটে ক্ষমা করে দেয়ার কাহিনী পড়ে। মনে হবে কবি-সাহিত্যিকের পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব না তাঁদের উর্বর কল্পনা এবং তাঁদের বিরল প্রতিভার সিঁড়ি বেয়ে সেই চূড়ায় উপনীত হওয়া, যেখানে উপনীত হয়েছিলেন এঁরা বাস্তবতার সিঁড়ি বেয়ে। সত্যি কথা বলতে কি, অবিচ্ছিন্ন সূত্র ও সনদ আমাদের সংরক্ষণে না থাকলে এবং নির্ভরযোগ্য ইতিহাসের সাক্ষী না পেলে অনায়াসে এই সত্য ঘটনাকে কল্পকাহিনী ও রূপকথা বলে চালিয়ে দেয়া যেত। সত্যি, এই মহান ইনকিলাব, এই গৌরবদীপ্ত নতুন যুগের সূচনা মুহাম্মদ (সা)-এর এক অন্যতম মু‘জিযা এবং তাঁর এক মহানুগ্রহ। সর্বোপরি তা ইলাহী রহমতের এক মহাদান যা সীমাবদ্ধ নয় স্থান-কাল-পাত্রের কোন সংকীর্ণ গণ্ডিতে। মহান আল্লাহ সত্যি বলেছেন :

“আমি তো তোমাকে জগতসমূহের জন্য কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।” (২১:১০৭)