অন্ধকার যুগ
খ্রীষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে বিভিন্ন ধর্ম ও তার অনুসারিগণ : এক নজরে
খ্রীষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী পৃথিবীর বড় বড় ধর্ম, প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থ ও সেসবের বিধবিধানসমূহ (যেগুলো ধর্ম, নীতি-নৈতিকতা ও জ্ঞানের ময়দানে বিভিন্ন সময় তাদের নির্ধারিত ভূমিকা পালন করেছিল) শিশুদের ক্রীড়া-কৌতুকের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল এবং বিকৃতির পতাকাবাহী, মোনাফিক, খোদাভীতিহীন ও বিবেকবঞ্চিত ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের ব্যক্তিগত স্বার্থের লক্ষ্যে এবং কালের কুটিল চক্রান্তের ও বিপর্যয়ের এমন শিকারের পরিণত হয়েছিল যে, সেসবের আসল রূপ চিনে নেয়া কষ্টকরই নয় বরং বলা চলে, অসম্ভব ছিল। যদি ঐসব ধর্মের প্রাথমিক প্রতিষ্ঠাতা, পতাকাবাহী ও তাদের সম্মানিত নবীগণ পুনরায় ফিরে এসে এই অবস্থা দেখতেন তবে তাঁরা তাঁদের রেখে যাওয়া ধর্মকে নিজেরাই চিনতে পারতেন না এবং ঐসব ধর্মের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করার জন্য কখনো প্রস্তুত হতেন না।
ইয়াহূদী ধর্ম ছিল কতকগুলো নিস্প্রাণ রীতিনীতি ও কিংবদন্তীর সমাহার যার মধ্যে জীবনের কোন স্পন্দন অবশিষ্ট ছিল না। এতদ্ভিন্ন ইয়াহূদী ধর্ম স্বয়ং একটি বংশীয় ও সম্প্রদায়গত ধর্ম বিধায় এর নিকট বিশ্বের জন্য কোন পয়গাম, পৃথিবীর তাবৎ জাতিগোষ্ঠীর জন্য কোন আবেদন এবং মানবতার জন্য, তার রোগমুক্তির নিমিত্ত কোন প্রতিকার ও প্রতিষেধক ছিল না।
এই ধর্ম স্বীয় তৌহিদী আকীদার ওপরও [বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে তার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পরিচিতি ছিল যার ভেতর তার সম্মান ও মর্যাদা এবং প্রাচীন কালে বনী ইসরাইলের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ওপর শ্রেষ্ঠত্বের রহস্য প্রচ্ছন্ন ও লুক্কায়িত
রয়েছে এবং যার অসিয়ত করেছিলেন হযরত ইবরাহীম ও হযরত ইয়া‘কূব (আ) তদীয় পুত্রদেরকে] দৃঢ়পদ থাকতে পারেনি। ইয়াহূদীরা প্রতিবেশী জাতিগোষ্ঠীর প্রভাবে অথবা বিজয়ী জাতিগোষ্ঠীগুলোর চাপে তাদের বহু ‘আকীদা তথা ধর্মবিশ্বাস কবুল করে নেয় এবং তাদের বহু অভ্যাস, শির্কমূলক, পৌত্তলিক ও জাহিলী গল্পগুচ্ছ তথা কিংবদন্তী গ্রহণ করে, বিবেকবান কোন কোন ইয়াহূদী ঐতিহাসিক যার স্বীকারোক্তি করেছেন। Jewish Encyclopaedia-র নিবন্ধকার লিখেছেন :
মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে নবীদের ক্রোধ ও কুপিত হওয়া থেকে একথা প্রকাশ পায় যে, দেবতাদের পূজা-অর্চনা ইসরাঈলী সাধারণের অন্তর-রাজ্যে আসন গেড়ে বসেছিল এবং ব্যাবিলনের নির্বাসন থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় পূর্ণরূপে এর উৎসাধন হয়নি। কল্পনা পূজা ও জাদুর মাধ্যমে বহু শির্কমূলক ধ্যান-ধারণা ও রসম-রেওয়াজ পুনর্বার জনগণ গ্রহণ করেছিল। তালমূদ থেকেও এর সাক্ষ্য মেলে যে, মূর্তিপূজার মধ্যে ইয়াহূদীরা বিরাট আকর্ষণ খুঁজে পেত।
ব্যাবিলনের তালমূদ (যাকে ইয়াহূদীদের মধ্যে সীমাতিরিক্ত পবিত্র জ্ঞান করা হত এবং কোন কোন মুহূর্তে তাওরাতের ওপরও একে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে যা খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে ইয়াহূদীদের মধ্যে জনপ্রিয় ও প্রচলিত ছিল) স্বল্পবুদ্ধিতা, কটুকাতব্য, খোদার সমীপে ধৃষ্টতা ও গোস্তাজী প্রদর্শন, মূলতত্ত্ব ও স্বীকৃত সত্যের সঙ্গে এবং দীন ও বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে ঠাট্টা-মশকরার এমন সব অদ্ভুত ও বিস্ময়কর নমুনা দ্বারা পূর্ণ যদ্দৃষ্টে ঐ শতাব্দীতে ইয়াহূদী সমাজের চেতনা ও উপলব্ধিগত অধঃপতন এবং ধর্মীয় রুচি বিকৃতির পূর্ণ পরিমাপ করা যায়।
খৃষ্টবাদ তার জন্ম ও বিকাশের প্রথম প্রভাতেই চরমপন্থীদের সৃষ্ট বিকৃতি, মূর্খ জাহিলদের মনগড়া ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও রোমক খৃষ্টানদের পৌত্তলিকতার শিকার হয়ে গিয়েছিল। হযরত ঈসা (আ)-র সহজ-সরল তথা অনাড়ম্বর ও পবিত্র শিক্ষামালা ঐ সমস্ত ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। তাওহীদ ও ইখলাসের সাথে আল্লাহর ইবাদতের নূর গভীর মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল।
চতুর্থ শতাব্দীর শেষে খৃষ্টান সমাজে ত্রিত্ববাদের আকীদা-বিশ্বাস কিভাবে অনুপ্রবেশ করেছিল এবং কিভাবে তা সংক্রমিত হয়েছিল সে সম্পর্কে একজন খৃষ্টান মনীষী লিখেছেন :
“এই আকীদা বা ধর্মবিশ্বাস যে, ‘এক আল্লাহ্ তিনটি মৌলিক বস্তুর সংমিশ্রণ’ চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দিকেই খৃষ্টান বিশ্বের গোটা জিন্দগী ও চিন্তাধারায় অনুপ্রবেশ করেছিল এবং দীর্ঘকাল যাবত সরকারী ও স্বীকৃত আকীদা-বিশ্বাস হিসেবে, যা গোটা খৃষ্টান বিশ্ব মান্য করত, অবশিষ্ট থাকে। এমন কি খৃষ্টীয় উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে এই আকীদা-বিশ্বাসের পরিবর্তন ও এই আকৃতি ধারণ পর্যন্ত পৌঁছবার গোপন রহস্য ভেদ হয়।”
একজন সমসাময়িক খৃষ্টান ঐতিহাসিক খৃষ্টান সমাজে পৌত্তলিকতার সূচনা, এর নিত্য-নতুন রূপ এবং অপরাপর মুশরিক ও পৌত্তলিক জাতিগোষ্ঠীর (তাদের ধর্মীয় ও জাতীয় প্রথা-পদ্ধতি ও নিদর্শনসমূহ, আচার-অভ্যাস, পালা-পার্বণ ও অনুষ্ঠানগুলোতে) অন্ধ আনুগত্য, ভয়-ভীতি কিংবা মূর্খতার ভিত্তিতে তাদের হুবহু নকল করবার প্রবণতা এবং এ ব্যাপারে খৃষ্টানদের নিত্য-নতুন কলাকৌশল খুব আলোচনা করেছেন। তিনি তাঁর The History of Christianity in the Light of Modern Knowledge নামক গ্রন্থে বলেন :
“পৌত্তলিকতা শেষ হল বটে কিন্তু একেবারে ধ্বংস হল না, বরং তা আত্মস্থ করে নেওয়া হল। প্রায় সবকিছুই, যা পৌত্তলিকতার মধ্যে ছিল, তা খৃষ্ট ধর্মের নামে চলতে লাগল। যে সমস্ত লোকের তাদের দেবদেবী ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের থেকে হাত গুটাতে হয়েছিল তারা অবচেতনভাবে খুব সহজেই ধর্মের জন্য জীবন উৎসর্গকারী কোন শহীদকে প্রাচীন দেবতাদের গুণে গুণান্বিত করে কোন স্থানীয় প্রস্তর কিংবা ধাতুনির্মিত প্রতিকৃতিকে তার নামে নামকরণ করল এবং এভাবে কুফরী মতবাদ ও পৌরাণিক কাহিনী ঐ সব স্থানীয় শহীদদের নামে নামাঙ্কিত হয়ে গেল এবং আল্লাহ্ গুণে গুণান্বিত ওলী-আউলিয়ার আকীদার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হল। ঐ সব ওলী-আউলিয়া একদিকে তো আরআইসীনদের আকীদা-বিশ্বাসের ভিত্তিতে মানুষ ও তদীয় স্রষ্টার মাঝে স্বর্গীয় ও ঐশ্বরিক মর্যাদার অধিকারী মানুষের রূপ ধারণ করল এবং অপরদিকে এ মধ্যযুগের পবিত্রতা ও সাধুতার প্রতীকে পরিণত হল। পৌত্তলিক হোলী ও দেয়ালী উৎসব গ্রহণ করে সে সবের নাম পাল্টে দেওয়া হয়।
এমন কি ৪০০ খৃ. পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে সূর্য দেবতার প্রাচীন উৎসব যীশু খৃষ্টের জন্মদিনের রূপ পরিগ্রহ করল।”
খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতে সিরিয়া ও ইরাকের খৃষ্টান এবং মিসরের খৃষ্টানদের যুদ্ধ পূর্ণ শক্তিতে চলছিল। আর এই যুদ্ধ চলছিল যীশু খৃষ্টের হাকীকত ও মাহিয়ত নিয়ে অর্থাৎ যীশুর পবিত্র সত্তা ঐশ্বরিক অথবা পার্থিব এবং তাতে কোন্ অংশ কতটা। এই যুদ্ধের দরুন শিক্ষায়তন, গির্জা ও বাড়ীঘর সবকিছু প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে পরিণত হয়ে গিয়েছিল যারা একে অপরকে কাফির তথা অবিশ্বাসী ঘোষণায় ছিল মত্ত। তারা একে অপরের রক্ত পিয়াসীতে পরিণত হয়েছিল। তাদের যুদ্ধরত দেখে মনে হচ্ছিল, এ বুঝি দু’টি ভিন্ন ধর্ম ও বিরোধী জাতিগোষ্ঠীর যুদ্ধ। সেজন্য খৃষ্টানদের এ অবকাশ ছিল না যে, বিশ্বব্যাপী অরাজকতা, বিপর্যয়রোধে ও অবস্থার সংশোধনে তারা প্রয়াস চালাবে এবং মানবতাকে কল্যাণ ও মুক্তির জন্য পয়গাম দেবে।
মজূসীরা (ইরানের অগ্নিউপাসক পার্শী সম্প্রদায়) প্রাচীনকাল থেকে সৃষ্টির মৌলিক উপাদান চতুষ্টয়ের বৃহত্তম উপাদান অগ্নির পূজা করত এবং তারা এর জন্য নির্দিষ্ট অগ্নিকুণ্ডলী তৈরি ও উপাসনা গৃহ নির্মাণ করেছিল। দেশের সর্বত্র অগ্নিপূজার ব্যাপক প্রচলন ছিল। এজন্য খুবই সুশৃঙ্খল আইন ও সূক্ষ্ম বিধি-বিধান নির্ধারিত ছিল এবং তদানুযায়ী আমল করা ছিল বাধ্যতামূলক। অগ্নিপূজা ও সূর্যকে পবিত্র জ্ঞান করা ব্যতিরেকে আর সব দর্শন ও ধর্মবিশ্বাস সেখানে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। তাদের নিকট ধর্ম কতিপয় প্রথা-পদ্ধতি কিংবা কয়েকটি আচার-অনুষ্ঠানের বেশী আর কোন মূল্য বহন করত না যেগুলো তারা নির্দিষ্ট জায়গায় প্রতিপালন করত। উপাসনা গৃহের বাইরে তারা ছিল একেবারে মুক্ত ও স্বাধীন যেখানে তারা নিজেদের খেয়াল-খুশী ও মর্জি মুতাবিক জীবন যাপন করত। একজন অগ্নিউপাসক ও একজন বেদীন, বিবেকহীন ও অপদার্থের মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য ছিল না।
‘সাসানী আমলে ইরান’ গ্রন্থের লেখক আৰ্থার ক্রিস্টিনসেন সে যুগের ধর্মীয় দায়িত্ব ও কর্তব্যের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে লিখেছেন, “সরকারী কর্মচারীদের জন্য দিনে চারবার সূর্য পূজা করা আবশ্যিক কর্তব্য ছিল। চন্দ্র-পূজা,
অগ্নিপূজা ও পানিপূজা ছিল এর অতিরিক্ত। শয়ন, জাগরণ, গোসল, পৈতা পরিধান, খানাপিনা, হাঁচি দেওয়া, চুল ছাঁটা, নখ কাটা, পেশাব- পায়খানা, প্রদীপ জ্বালানো, মোটকথা সকল কাজের জন্যই মন্ত্র ছিল এবং এগুলো করা তাদের জন্য ছিল জরুরী। তাদের ওপর এও নির্দেশ ছিল যে, শিখা সদা প্রজ্জ্বলিত ও অনির্বাণ থাকবে, কোন অবস্থাতেই তা নির্বাপিত হতে পারবে না এবং আগুন ও পানি একে অপরের সঙ্গে যেন না মেশে আর ধাতব পদার্থে যেন মরিচা না পড়ে। কেননা ধাতব পদার্থ তাদের দৃষ্টিতে পবিত্র ছিল।”
ইরানের লোকেরা আগুনের দিকে মুখ করে পূজা করত। ইরানের শেষ সম্রাট ইয়াযদাগির্দ একবার সূর্যের কসম খেয়ে একথা বলেছিলেন :
“আমি সূর্যের কসম খাচ্ছি যিনি সবচেয়ে বড় উপাস্য।” তিনি সেইসব খৃষ্টানকে, যারা খৃষ্ট ধর্ম থেকে তওবা করেছিল, বাধ্য করেছিলেন তাদের ধর্মনিষ্ঠা প্রমাণের জন্য সূর্যের পূজা করতে। ইরানের লোকেরা সর্বকালে ও সর্বযুগেই দ্বিত্ববাদের শিকার ছিল অর্থাৎ তারা দুই খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিল। এমন কি এটাই তাদের আলামত ও পরিচয়জ্ঞাপক চিহ্নে পরিণত হয়। তারা দুই খোদার সমর্থক ছিল। এক খোদা আলোর বা কল্যাণের যাকে তারা আহূরমাযদা বা যাযদান বলত। দ্বিতীয় খোদা অন্ধকার বা মন্দের যার নাম রেখেছিল তারা আহরিমান। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, এই দুই খোদার মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও শক্তি পরীক্ষা আগাগোড়া চলে আসছে।
“ইরানী ধর্মের এসব ঐতিহাসিক তাদের উপাস্য মা’বূদদের সম্পর্কে যেসব কাহিনী লিখেছেন এবং গোটা পৌরাণিক উপাখ্যান তৈরি করেছেন তা তাদের অত্যন্ত বিস্ময়প্রিয়তা এবং বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি বিষয়ে গ্রীক কিংবা ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনী থেকে কোনভাবেই কম নয়।”
বৌদ্ধ ধর্ম, যা ভারতবর্ষ ও মধ্য এশিয়াতে বিস্তার লাভ করেছিল, তাও একটি পৌত্তলিক ধর্মে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। মূর্তি বৌদ্ধ ধর্মের লাগাম ধরে পথ চলছিল। যেখানেই তাদের কাফেলা বিশ্রাম মানসে কিছুক্ষণের জন্য হলেও ছাউনি ফেলত সেখানেই গৌতম বুদ্ধের মূর্তি স্থাপন করা হত এবং দেখতে না দেখতেই
একটি উপাসনাগৃহ তৈরি হয়ে যেত।
জ্ঞানী পণ্ডিতমহল এখন পর্যন্ত এই ধর্ম ও এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে সন্দিহান যে, আসমান-যমীন, এমন কি স্বয়ং মানুষের স্রষ্টা আল্লাহর অস্তিত্বে তার বিশ্বাস ছিল কি না অর্থাৎ তিনি স্বয়ং স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন কি না। তাঁরা তো বিস্মিত যে, স্রষ্টার প্রতি ঈমান ও গভীর বিশ্বাস ছাড়া এই বিরাট ধর্ম কি করে টিকে রইল!
থাকল হিন্দু ধর্ম! এ হিন্দু ধর্ম তো দেবদেবীর আধিক্যের ক্ষেত্রে অপরাপর ধর্মের তুলনায় অনেক অগ্রসর। খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে মূর্তি পূজার ছিল রমরমা রাজত্ব। এই শতকে তাদের উপাস্য দেবতার সংখ্যা তেত্রিশ কোটিতে গিয়ে উপনীত হয়েছিল। মোটের ওপর প্রতিটি বৃহৎ কিংবা ভয়াবহ অথবা উপকারী বস্তুই ছিল তাদের উপাস্য দেবতা। মূর্তি নির্মাণ ও ভাস্কর্য তৈরি বিদ্যা চরমোৎকর্ষ লাভ করেছিল এবং এ ক্ষেত্রে নিত্য-নতুন কলাকৌশল উদ্ভাবিত হচ্ছিল।
একজন হিন্দু মনীষী (সি.ভি. বৈদ্য) তদীয় History of Medieval Hindu India নামক গ্রন্থে রাজা হরিশ (৬০৬-৬৪৮ খৃ.) সম্পর্কে লিখেছেন। মনে রাখতে হবে যে, এ সেই যুগ যার পরেই আরব উপদ্বীপে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে।
“এ যুগে হিন্দু ধর্ম ও বৌদ্ধমত উভয়ই সমভাবে পৌত্তলিক ছিল, বরং খুব সম্ভব পৌত্তলিকতার দিক দিয়ে বৌদ্ধমত হিন্দু ধর্মের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে গিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে এ ধর্মের যাত্রাই শুরু হয়েছিল আল্লাহ্ অস্তিত্বের অস্বীকৃতির মধ্য দিয়ে। কিন্তু শেষাবধি সে বুদ্ধকেই সবচে’ বড় খোদার আসনে বসিয়ে দিল। পরে আরও অন্যান্য খোদা যেমন Bodhisatvas-এর বৃদ্ধি ঘটতে থাকে, বিশেষত বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান শাখায় পৌত্তলিকতা চূড়ান্তভাবে আসন গেড়ে বসে। ভারতবর্ষে তা এতটা উন্নতি করতে সক্ষম হয় যে, প্রাচ্য ভাষাগুলোতে
বুদ্ধের নাম পৌত্তলিকতার সমার্থকে পরিণত হয়।”
এতে কোনই সন্দেহ নেই যে, সে যুগে মূর্তিপূজা গোটা বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত ছিল। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবী পৌত্তলিকতার মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। খৃষ্ট ধর্ম, সেমিটিক ধর্মসমূহ, বৌদ্ধ ধর্ম মূর্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জ্ঞাপনে একে অপরকে অতিক্রম করবার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিল।
আরো একজন হিন্দু মনীষী তাঁর Popular Hinduism the Religion of the Masses নামক গ্রন্থে বলেন :
খোদা তৈরির কর্ম-কৌশল এখানেই শেষ হয়ে যায়নি, বরং বিভিন্ন যুগে এই খোদায়ী একাডেমী বা কাউন্সিল এত বিরাট পরিমাণে বৃদ্ধি পায় যে, তার পরিমাপ করাই কঠিন। এগুলোর মধ্যে ভারতবর্ষের প্রাচীন বাসিন্দাদের বহু উপাস্য দেবতাও ছিল যেগুলোকে হিন্দু ধর্মের দেবতা ও ভগবানগুলোর সাথে একীভূত করে নেয়া হয়েছিল। কালক্রমে এসব দেবতার সংখ্যা তেত্রিশ কোটিতে গিয়ে উপনীত হয়।
আরবদের সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় তাতে দেখা যায় যে, প্রাচীন কালে তারা দীনে ইবরাহীম (আ)-এর ধারক-বাহক ছিল এবং তাদের ভূখণ্ডেই আল্লাহ্ সর্বপ্রথম ঘর নির্মিত হয়। কিন্তু নবুওয়াত ও আম্বিয়ায়ে কিরামের সঙ্গে কালের দূরত্ব এবং আরব উপদ্বীপে বৃত্তাবদ্ধ হবার কারণে তারা খুবই নিম্নস্তরের পৌত্তলিকতার মধ্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল যাদের দৃষ্টান্ত ভারতবর্ষের মূর্তিপূজক ও মুশরিক ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যেত না। তারা শিরক ও মূর্তি পূজার ক্ষেত্রে বহু দূর এগিয়ে গিয়েছিল এবং এক আল্লাহ্ পরিবর্তে বহু উপাস্য দেবতায় তারা বিশ্বাস করত। এসব স্বনির্মিত উপাস্য দেবতা গোটা সৃষ্টি জগতের ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা বিধানে
আল্লাহ্ শরিক, কল্যাণ-অকল্যাণ ও লাভ-ক্ষতির মালিক এবং কাউকে জীবিত রাখার বা মারার ব্যক্তিগত ক্ষমতার অধিকারী বলে বিশ্বাস করত। গোটা আরব জাতিগোষ্ঠী পৌত্তলিকতার মধ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল। প্রতিটি গোত্র ও প্রতিটি এলাকার পৃথক উপাস্য দেবতা ছিল। যদি বলা হয় যে, আরবের প্রতিটি ঘরই একেকটি পুতুল গৃহে পরিণত হয়েছিল তবে তা অত্যুক্তি হবে না।
স্বয়ং কা‘বা শরীফের অভ্যন্তরে ও এর প্রাঙ্গণে, যে গৃহ হযরত ইবরাহীম (আ) কেবল আল্লাহ্ ইবাদত-বন্দেগীর জন্যই নির্মাণ করেছিলেন, তিন শত ষাটটি মূর্তি স্থান পেয়েছিল।
তারা মূর্তিপূজা ও দেবদেবীর পূজা-অর্চনা থেকে অগ্রসর হয়ে শেষাবধি সব ধরনের পাথরকেই পূজা করতে শুরু করেছিল। তারা ফেরেশতা, জিন ও তারকারাজিকেও তাদের উপাস্য জ্ঞান করত। তারা বিশ্বাস করত যে, ফেরেশতারা আল্লাহ্ কন্যা সন্তান এবং আল্লাহ্ অংশীদার। এজন্য তারা এসবের শক্তি ও প্রভাবে বিশ্বাসী ছিল এবং এর পূজা-অর্চনাকে অপরিহার্য জ্ঞান করত।
এক নজরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও জাতিগোষ্ঠী
এই ছিল সেই সব ধর্মের অবস্থা যা আপন আপন যুগে আল্লাহ্ দিকে মানুষকে আহ্বান জানাবার নিমিত্ত পৃথিবীর বুকে আবির্ভূত হয়েছিল। যেসব দেশ সুসভ্য হিসাবে পরিচিত ছিল, যেসব দেশে বিশাল হুকুমত প্রতিষ্ঠিত ছিল, নানাবিধ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যের সরব চর্চা ছিল এবং যেসব দেশকে সভ্যতা-সংস্কৃতি, শিল্প ও কৃষ্টি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য চর্চার কেন্দ্র মনে করা হত, সেসব দেশে ধর্মের অবয়ব ও আকৃতি ছিল একেবারেই বিকৃত। সেসব ধর্ম আপন মৌল সত্তা, মূল্য ও মর্যাদা, শক্তি ও কল্যাণকামিতা খুইয়ে বসেছিল। সংস্কারক এবং চরিত্র ও নৈতিকতার শিক্ষক বহুদূর অবধি কোথাও দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না।
প্রাচ্যের রোমক সাম্রাজ্য
প্রাচ্যের রোমান সাম্রাজ্যে ট্যাক্সের বোঝা এতই দুর্বহ হয়ে পড়েছিল যে, দেশের গণমানুষ আপন হুকুমতের মোকাবিলায় বিদেশী শাসনকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করেছিল। বারবার বিপ্লব ও বিদ্রোহ দেখা দিত। কেবল ৫৩৩ খৃষ্টাব্দে একটি দাঙ্গায় কনস্টান্টিনোপলের ত্রিশ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। তাদের রাত দিনের সবচেয়ে বড় ভাবনা ও আকর্ষণই ছিল, যে কোন উপায়েই হোক সম্পদ অর্জন, অতঃপর অর্জিত সম্পদ আরাম-আয়েশ ও বিলাসী জীবন যাপনে ব্যয় করা। ক্রীড়া-কৌতুক ও চিত্তবিনোদনের মাঝে তারা এত দূর অগ্রসর হয়েছিল যে, তা অন্ধত্ব ও বর্বরতার স্তর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।
Civilization Past and Present নামক গ্রন্থের লেখকবৃন্দ বায়যানটাইন সমাজের এই অদ্ভুত বৈপরীত্য, নৈতিক অরাজকতা ও চারিত্রিক বিপর্যয়, খেল-তামাশাপ্রিয় স্বভাব ও চিত্তবিনোদন প্রীতির ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে লিখেছেন, “বায়যানটাইনীয় সমাজ জীবনে বিরাট বৈপরীত্য পাওয়া যেত। ধর্মীয় ঝোঁক তাদের মন-মস্তিষ্কে গভীরভাবে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছিল। দুনিয়া বর্জন ও বৈরাগ্যবাদ সাম্রাজ্যের সর্বত্র বিস্তার লাভ করেছিল এবং সাধারণ স্তরের একজন নাগরিকও গভীরতর ধর্মীয় আলোচনায় উৎসাহের সঙ্গে অংশ গ্রহণ করত। এরই সাথে সর্বসাধারণের দৈনন্দিন জীবনের ওপর প্রচ্ছন্নপ্রিয়তা ও গোপনীয়তার ছাপ লেগেছিল। কিন্তু এর বিপরীতে এই সব লোকই আবার সর্বপ্রকার খেল-তামাশার প্রতি অস্বাভাবিক রকম আগ্রহীও ছিল। সার্কাসের ছিল বিশাল ময়দান যেখানে একই সঙ্গে আশি হাজার দর্শক উপবেশন করতে পারত। এখানে রথের বিরাট দৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হত। জনসাধারণকে ‘নীল’ ও ‘হরিৎ’ দুই গ্রুপে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। বায়যান্টীয়দের মধ্যে রূপ ও সৌন্দর্যের প্রতি ভালবাসাও ছিল,
আবার জুলুম-নিপীড়ন, কালিন্য ও কদর্যতার প্রতি আকর্ষণও ছিল। তাদের ক্রীড়া-কৌতুক অধিকাংশ সময় রক্তাক্ত ও কষ্টদায়ক হত। তাদের যন্ত্রণা ও কষ্ট ভয়ানক ও ভীতিপ্রদ হত এবং তাদের বিশিষ্ট লোকদের (Elites) জীবনে ছিল আনন্দ-আয়েশ, ষড়যন্ত্র, লৌকিকতা ও যাবতীয় মন্দের জগাখিচুড়ি।
মিসর (যা ছিল প্রাচুর্যের অধিকারী বায়যানটাইন সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ) বিরাট ধর্মীয় নিপীড়ন ও নিকৃষ্টতম রাজনৈতিক জোর-জবরদস্তির শিকার এবং এরই সাথে সাথে বায়যানটাইন সাম্রাজ্যের প্রাচুর্যের এক বিরাট মাধ্যম ছিল, ছিল এর উৎসও। এর উদাহরণ ছিল সেই গাভীর মত যাকে বেশ ভালোভাবে দোহন করা হবে বটে, কিন্তু খোরাক দেওয়া হবে স্বল্প থেকে স্বল্পতর পরিমাণ।
সিরিয়া ছিল বায়যানটাইন সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রদেশ। এ ছিল রোমকদের সম্প্রসারণশীল ও সাম্রাজ্যলিপ্সু মানসিকতার শিকার, যেখানে কেবল শক্তির জোরে বিদেশীদের মতই শাসন ক্ষমতা চালানো হত এবং শাসিত প্রজাবর্গ কখনও স্নেহ ও ভালবাসার মুখ দেখতে পেত না। দারিদ্র্যের অবস্থা ছিল এই যে, অধিকাংশ সিরীয়বাসী তাদের ঋণ পরিশোধের জন্য তাদের শিশু সন্তানদেরকে বিক্রয় করতে বাধ্য হত। বিভিন্ন রকম জুলুম-নির্যাতন, অধিকার হরণ, ক্রীতদাসে পরিণত করা এবং লোকদের বেগার শ্রমদানে বাধ্য করা ছিল সাধারণ রেওয়াজ।
পারসিক সাম্রাজ্য
ইরানের প্রাচীনতম ধর্ম মাযদাইয়্যাত ধর্মের স্থান দখল করল যরদশ্ত ধর্ম। এ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা যরদশ্ত খৃ. পূ. সপ্তম শতাব্দীতে আবির্ভূত হন। পারসিক সাম্রাজ্য প্রাচ্যের রোমান সাম্রাজ্যের তুলনায় (মহান রোম সাম্রাজ্য থেকে পৃথক হওয়ার পর) আপন আয়তন, আয়-আমদানির উপায়-উপকরণ ও শান-শওকতের ক্ষেত্রে অনেক বড় ছিল। এর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল সম্রাট আরদেশীরের হাতে ২২৪ খৃষ্টাব্দে। আপন উত্থানকালে আসিরিয়া, খুযিস্তান, মিডিয়া, পারস্য, আযারবায়জান, তারারিস্তান, সারাখস, মারজান, কিরমান, মার্ভ,বলখ, সুগাদ, সীস্তান, হেরাত, খুরাসান, খাওয়ারিয়ম, ইরাক ও ইয়ামন সবগুলোই তাঁর শাসনাধীনে ছিল। কোন এক যুগে
সিন্ধুনদের অববাহিকার মধ্যবর্তী জেলাসমূহ ও তার গতিপথের আশেপাশের প্রদেশগুলো অর্থাৎ কচ্ছ, কাঠিয়াওয়াড়, মালব ও সেসবের গোটা এলাকা তাদের শাসনাধীনে ছিল।
তেসিফোন (আল-মাদায়েন) ছিল এই সাম্রাজ্যের রাজধানী এবং তা ছিল শহরসমূহের এক সমষ্টি যা তার আরবী নাম থেকেই অনুমান করা যায়। পঞ্চম শতাব্দী ও এর পরবর্তী কালে মাদায়েন আপন কৃষ্টি, উন্নতি, অগ্রগতি, বিলাস ও প্রাচুর্যের শীর্ষদেশে উপনীত হয়েছিল (বিস্তারিত জানতে চাইলে দেখুন অধ্যাপক আর্থার ক্রিস্টিনসেনকৃত ‘সাসানী আমলে ইরান’ নামক পুস্তক)।
যরথুস্ত্র ধর্ম প্রথম দিন থেকেই আলো ও অন্ধকার, ভাল ও মন্দের দ্বন্দ্ব এবং ভালোর খোদা ও মন্দের খোদার মধ্যকার সংঘাত-সংঘর্ষের মতবাদের ওপর কায়েম ছিল। খৃষ্টীয় ৩য় শতাব্দীতে “মানী” নামক একজন দার্শনিক এই ধর্মের সংস্কারক হিসাবে আবির্ভূত হন। এরপর সম্রাট শাহপূর [সাসানী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট আরদেশীর (মৃ.২৪১ খৃ.)-এর পরবর্তী শাসক] প্রথমে এই ধর্মের অনুসারী ও আহ্বায়ক, অতঃপর এর বিরোধী হয়ে যান। বিরোধী হওয়ার কারণ এই ছিল যে, মানী দুনিয়া থেকে যাবতীয় মন্দ ও অন্যায়-অরাজকতার বীজ নির্মূল করবার জন্য নিঃসঙ্গ ও একক জীবন যাপনের আহ্বান জানাতেন। তার আহ্বান ছিল এই যে, আলো ও অন্ধকারের মিশ্রণ স্বয়ংসু নিজেই এমন এক অন্যায় ও মন্দ যার হাত থেকে মুক্তি লাভ করা মানুষের জন্য জরুরী। তিনি আত্মবিলুপ্তি ও নাস্তির মধ্যে বিলীন হবার জন্য ও অন্ধকারের ওপর আলোর প্রাধান্য অর্জনের নিমিত্ত মানব বংশের ধারা খতম করার এবং দাম্পত্য সম্পর্ক নিঃশেষ করার পন্থা অবলম্বন করেন। কয়েক বছর তিনি নির্বাসনে কাটান। এরপর ইরানে ফিরে আসেন এবং ১ম বাহরামের শাসনামলে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তার প্রদত্ত শিক্ষামালা তার মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকে এবং ইরানী চিন্তা-চেতনা ও ইরানী সমাজকে বহুকাল অবধি প্রভাবিত করতে থাকে।
ঈসায়ী ৫ম শতাব্দীর সূচনায় মাযদাক আবির্ভূত হন। তিনি বিত্ত-সম্পদ ও নারীর ক্ষেত্রে পূর্ণ সাম্য ও সম-শরীকানার প্রকাশ্য ও খোলাখুলি আহ্বান জানান এবং এসব বস্তুর অগাধ ভোগ-ব্যবহার সমগ্র মানব সমাজের জন্য কোনরূপ বাধা-বন্ধন ছাড়াই বৈধ ঘোষণা করেন। তার এই আহ্বান খুব দ্রুত জোরদার হয়ে ওঠে। অবস্থা এই দাঁড়ায় যে, মানুষ যে ঘরে যার ঘরে যখন ইচ্ছা অবাধে ঢুকে পড়ত এবং তার
মাল-আসবাব ও মহিলাদের জোরপূর্বক দখল করে নিত। একটি প্রাচীন ইরানী দস্তাবেযে যা ‘নামায়ে তানাস্যুর’ নামে পরিচিত- এই অবস্থার চিত্র অংকন করা হয়েছে যা মাযদাকী মতবাদের উত্থান, একচ্ছত্র শাসন ও ক্ষমতারোহণ যুগে দৃষ্টিগোচর হয়।
“লোকলজ্জা ও সম্ভ্রমবোধ উঠে গেল। এমন সব লোকের জন্ম হল যাদের ভেতর না নম্রতা ও সৌজন্যবোধ ছিল, আর না ছিল মৌরসী জমি-জিরাত। তাদের ভেতর বংশ, পরিবার কিংবা জাতিগোষ্ঠীর প্রতি মমতা বোধও ছিল না। তাদের ভেতর শিল্প ও কৃষিও ছিল না, ছিল না কোনরূপ চিন্তা-ভাবনার লেশ। তাদের কোন পেশা ছিল না। তারা যত রকমের চোগলখুরী ও শয়তানীতে সিদ্ধহস্ত, গালিগালাজ ও অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহারে পটু এবং অপরের দোষারোপ করতে ওস্তাদ ছিল। এটাই ছিল তাদের জীবন-জীবিকা আর এসবকে মাধ্যম বা পুঁজি করেই তারা পদ ও সম্পদ লাভে চেষ্টা করত।”
আর্থার খ্রীস্টিনসেন তাঁর ‘সাসানী আমলে ইরান’ নামক গ্রন্থে বলেন : ফল এই দাঁড়াল যে, চতুর্দিকে কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেল। লুটতরাজকারীরা আমীর-উমারার বাড়িঘরে ঢুকে পড়ত ও মাল-মাত্ত্বা লুট করে নিয়ে যেত। মেয়েদেরকে জোর করে ছিনিয়ে নিত এবং জমি-জায়গা দখল করে নিত। এভাবে ক্রমান্বয়ে জমি-জিরাত পতিত ও অনাবাদী থাকতে শুরু করল। কেননা নতুন যারা জমির মালিক হল তারা কৃষি সম্পর্কে আদৌ ওয়াকিফহাল ছিল না।
এসব থেকে একথা সুস্পষ্ট জানা যায় যে, প্রাচীন ইরানের চরমপন্থী আহ্বান ও আন্দোলনে সাগ্রহে সাড়া দেবার বিস্ময়কর যোগ্যতা ছিল এবং তারা সব সময় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে ও চরম পন্থা গ্রহণে আগ্রহী ছিল। একদিকে তারা ‘খাও, দাও ও ফূর্তি কর’ এর মত চরম ভোগবাদ, অপরদিকে সর্বোচ্চ ধরনের বৈরাগ্য ও সন্ন্যাসবাদের মাঝে ঘড়ির পেন্ডুলামের মত আন্দোলিত হতে থাকে। কখনও বা তারা খান্দানী ও মৌরসী সামন্তবাদী ব্যবস্থা, আবার কখনও বা ধর্মীয় ইজারাদারীর চাপের মুখে অবস্থান নেয়, কখনো নেয় তারা লাগামহীন সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ ও অবাধ স্বেচ্ছাচারিতা, বেআইনী কার্যক্রম ও অরাজকতার মত পরিবেশের ছত্রছায়ায়। এজন্য তাদের মধ্যে কখনোই ভারসাম্য ও শান্তি- সমঝোতাবোধ জন্ম নিতে পারেনি যা স্বাভাবিক ও সুস্থ সমাজের জন্য অপরিহার্য।
এই আমলে (বিশেষ করে সাসানী শাসনামলে ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত) অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। গোটা দেশ ঐ সব রাজা-বাদশাহর দয়ার ওপর নির্ভরশীল ছিল যারা উত্তরাধিকারসূত্রে রাজমুকুট ও শাহী তখতের মালিক হত এবং নিজেদেরকে সাধারণ মানুষের তুলনায় শ্রেষ্ঠতর ভাবত। সম্রাটকে আসমানী খোদার বংশধর বলে মান্য করা হত। শেষ পারস্য সম্রাট ২য় পারভেয নিজের নামের সঙ্গে নিম্নোক্ত উপাধিসমূহ ব্যবহার করতেন :
“ঈশ্বরমণ্ডলীর মধ্যে অবিনশ্বর, মানব ও মানবমণ্ডলীর মাঝে অদ্বিতীয় ঈশ্বর, তাঁর নামের বিকাশ, সূর্যের সঙ্গে উদিতকারী, রাত্রির চক্ষুর সূর্যালোক।”
দেশের সমস্ত সম্পদ ও আয়-আমদানির উপায়-উপকরণ বা মাধ্যমসমূহকে ঐসব রাজা-বাদশাহর ব্যক্তিগত মালিকানাধীন মনে করা হত। সম্পদ মজুদকরণ, উপহার-উপঢৌকন ও মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী জড়ো করার পাগলামি, জীবন মানের সমুন্নতি, নিত্যনতুন জিনিসের প্রতি আকর্ষণ ও মোহ, জীবনকে ভোগ করা, খেলাধুলা ও ভোগ-বিলাসের প্রতি আগ্রহ, ধনী হবার ও দুনিয়ার মজা লুটবার প্রতিযোগিতা এত বেশি বেড়ে গিয়েছিল যে, এর ওপর কল্পনাবৃত্তি ও কাব্যের সংশয় জাগে এবং এর কল্পনা কেবল তিনিই করতে পারবেন যিনি প্রাচীন ইরানের ইতিহাস, কাব্য ও সাহিত্য খুব গভীর দৃষ্টিতে অধ্যয়ন করেছেন। মাদায়েন শহর, শাহী প্রাসাদ, বাহর-ই কিসরা² (সেই কার্পেট যার ওপর বসন্ত মৌসুমে পারস্য সম্রাটগণ মদ পান করতেন), কিসরার রাজমুকুট ও পারস্য সম্রাটদের সঙ্গে সম্পর্কিত খাদেম ও অনুচরবর্গ, স্ত্রী ও দাসীকুল, বালক ও কিশোর সেবকবৃন্দ, বাবুর্চী ও খানসামামণ্ডলী, পশু ও পক্ষীকুলের পরিচর্যাকারী, শিকারের উপকরণ ও বাসন-কোসনের সেইসব রূপক বিস্তারিত ও খুঁটিনাটি সম্পর্কে³ যিনি ওয়াকিফহাল তিনি কেবল এই একটি ঘটনা থেকেই এর পরিমাপ করতে পারবেন যে, মুসলিম বিজয়ের পরিণতিতে ইরানের শেষ সম্রাট ইয়াযদাগিরদ রাজধানী মাদায়েন থেকে যখন পালিয়ে যান তখন সেই অবস্থায়ও তাঁর সাথে এক হাজার বাবুর্চী, এক সহস্র গায়িকা, এক হাজার চাপাতি ব্যবস্থাপক, এক হাজার শকর (বাজপাখী) দেখাশোনার দায়িত্বে নিয়োজিত অনুচরবর্গ ও মোসাহেবদের একটি বিরাট দল ছিল। এত বড় বিরাট লোক-লস্কর সত্ত্বেও তিনি একে খুবই নগণ্য সংখ্যক এবং নিজেকে খুবই
মামূলী ও নগণ্য একজন আশ্রিত মনে করতেন। তিনি অনুভব করতেন যে, মোসাহেব ও চাকর-বাকরের সংখ্যা বিলাস-ব্যসন ও ক্রীড়া-কৌতুকের উপকরণের কমতির দরুন তাঁর অবস্থা নিতান্তই করুণার যোগ্য।
অপরদিকে গরীব জনসাধারণ ছিল অত্যন্ত দরিদ্র দশায় পতিত ও বিপদগ্রস্ত। নিজেদের দুর্দশায় কান্নাই ছিল তাদের একমাত্র সম্বল। ক্ষীণ প্রাণ ও জীর্ণশীর্ণ দেহটুকু বাঁচিয়ে রাখার জন্য তাদেরকে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হত। নানা রকম ট্যাক্স, রকমারী বিধিনিষেধ ও বেড়ি-বন্ধন তাদের জীবনকে সাক্ষাৎ জাহান্নামে পরিণত করে দিয়েছিল এবং তারা পশুর ন্যায় জীবন অতিবাহিত করছিল। এই দুঃখ-কষ্টে ও জুলুম-নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে ঐসব ট্যাক্স এবং সৈন্যবিভাগে বাধ্যতামূলক ভর্তির হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য বহু কৃষক ক্ষেত-খামার ছেড়ে দেয় এবং সাধু-সন্তদের খানকাহ ও মঠে গিয়ে আশ্রয় নেয়। তারা প্রাচ্যের সাসানী সাম্রাজ্য ও পাশ্চাত্যের বায়যানটাইন সাম্রাজ্যের দীর্ঘ ও রক্তাক্ত সংঘর্ষে (যা ইতিহাসের বিভিন্ন বিরতিতে চলতে থাকে এবং যে সংঘর্ষে না জনসাধারণের কোন কল্যাণ নিহিত ছিল আর না এতে তাদের কোন আকর্ষণ ছিল) নগণ্য ইন্ধন হিসাবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
ভারতবর্ষ
প্রাচীন কালে গণিতশাস্ত্রে, জ্যোতির্বিজ্ঞানে, চিকিৎসা ও দর্শনশাস্ত্রে ভারতবর্ষ পৃথিবী জোড়া খ্যাতি অর্জন করেছিল। ভারতবর্ষ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের সাধারণ অভিমত এই যে, এর ধর্মীয়, নৈতিক, চারিত্রিক ও সামাজিক দিকের অন্ধকারতম ও নিকৃষ্টতম যুগ খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রারম্ভ থেকে শুরু হয়। অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতা থেকে তাদের উপাসনাগৃহ অবধি মুক্ত ছিল না এবং এসব কর্মে কোন দোষ আছে বলে তারা মনে করত না। কেননা ধর্ম একে পবিত্র ও উপাসনার রঙে রঞ্জিত করে দিয়েছিল। নারীর কোন মূল্য, ইযযত-সম্মান ও সতীত্ব-সম্ভ্রম অবশিষ্ট ছিল না। জুয়া খেলায় স্বামী তার স্ত্রীকে অবধি বাজি ধরত ও হেরে গেলে স্ত্রী বিজয়ীকে দিয়ে দিত। স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকে জীবন্মৃত অবস্থায় কাল কাটাতে হত। সে না আর
বিয়ে করতে পারত আর না তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধার চোখে দেখা হত। স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রীকে স্বামীর চিতায় সহমরণে যাবার প্রথা উচ্চ ও স্বচ্ছল পরিবারগুলোতে প্রচলিত ছিল। আর এর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ততা ও আনুগত্য প্রকাশ এবং লজ্জা ও অবমাননার হাত থেকে মুক্তি। ইংরেজ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পরই কেবল এই নিষ্ঠুর প্রথার অবসান ঘটানো সম্ভব হয়।
ভারতবর্ষ তার প্রতিবেশী ও পৃথিবীর অপরাপর দেশগুলোর মধ্যে শ্রেণীগত বৈষম্য এবং মানুষের মধ্যে জাতপাত ও ভেদ বৈষম্যের ক্ষেত্রে ছিল অনেক অগ্রসর। এ ছিল এক কঠিন ও নির্দয় সমাজ ব্যবস্থা যেখানে দয়ামায়া ও কোমলতার কোন স্থান ছিল না। এই বিশেষ আচার-আচরণের পেছনে ধর্মের ও ধর্মীয় আকীদা-বিশ্বাসের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। আর্য আক্রমণকারীদের উপযোগিতা ও বিচক্ষণতা এবং ধর্ম ও পবিত্রতা রক্ষার ইজারাদার ব্রাহ্মণদের স্বার্থ চিন্তার এটাই ছিল দাবি। এই সমাজ ব্যবস্থা ঐসব পেশার ভিত্তির ওপর কায়েম ছিল যা বিভিন্ন জাতপাত ও শ্রেণীর ভেতর বংশ-পরম্পরায় চলে আসছিল। এর পেছনে সেই সব রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আইনের শক্তি ছিল যেগুলোকে ঐসব হিন্দু আইন প্রণেতাগণ প্রণয়ন করেছিলেন যারা ধর্মীয় মর্যাদারও অধিকারী ছিলেন। এই আইন গোটা সমাজে অক্ষরে অক্ষরে প্রচলিত ছিল এবং একেই জীবনবিধান মনে করা হত। এই জীবন-সংহিতা তথা সংবিধান ভারতবর্ষের অধিবাসীদেরকে চারটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছিল :
১. ধর্মের ইজারাদার ও পুরোহিতশ্রেণী যাদেরকে ‘ব্রাহ্মণ’ বলা হত।
২. সেনাদলে কর্মরত লোকজন যাদেরকে ‘ক্ষত্রিয়’ বলা হত।
৩. কৃষিজীবী ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায় যাদেরকে ‘বৈশ্য’ বলা হত।
৪. চাকর-বাকর ও সেবক শ্রেণী অর্থাৎ অচ্ছ্যুৎ বা শূদ্র সম্প্রদায়।
এই শেষোক্ত শ্রেণীটিই ছিল (যারা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ) অধঃপতনের চূড়ান্ত ধাপে উপনীত। তাদের সম্পর্কে বলা হত যে, তারা স্রষ্টার পা থেকে সৃষ্ট বিধায় উল্লিখিত তিনটি শ্রেণীর সেবা করা ও তাদের আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করাই কেবল তাদের কাজ।
এই সংবিধান ব্রাহ্মণদেরকে এত বেশি অধিকার দিয়েছিল এবং তাদেরকে এত বেশী উচ্চ মর্যাদা প্রদান করেছিল যে, অপর কেউ এক্ষেত্রে তাদের সমকক্ষ ছিল
না। ব্রাহ্মণের ছিল সাত খুন মাফ। আকাশ-পাতাল নিজেদের হাজারো পাপে ভরপুর করে দিলেও এবং লক্ষ অন্যায়-অপকর্মে ত্রিভুবন দূষিত ও কলুষিত করলেও তারা ছিল ধোয়া তুলসী পাতা। তাদের ওপর কোনরূপ ট্যাক্স ধার্য করা যেত না। কোন প্রকার পাপ কিংবা গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যেত না। এর বিপরীতে শূদ্র কিংবা অস্পৃশ্যদের উপার্জনের অধিকার ছিল না, অধিকার ছিল না তাদেরকে স্পর্শ করার। ধর্মগ্রন্থ পাঠেরও অধিকার ছিল না তাদের।
পেশাজীবি ও কামলা শ্রেণী (যাদেরকে চণ্ডাল বলা হত)-কে শহরের বাইরে থাকতে হত। রাতের বেলা শহরের বুকে অবস্থান ছিল তাদের জন্য নিষিদ্ধ। সূর্যোদয়ের পর তারা শহরে প্রবেশ করত কাজের জন্য আর সূর্য ডোবার আগেই শহর ছেড়ে তাদের বেরিয়ে আসতে হত।
গোটা দেশ ছিল অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার শিকার এবং তা খণ্ড খণ্ড হয়ে যাচ্ছিল। এতে শত শত রাজ্য ও সরকার ছিল যারা ছিল পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষে লিপ্ত। অশান্তি ও অব্যবস্থাপনা এবং প্রজাদের পক্ষে থেকে বেপরোয়া মনোভাব ছিল সর্বত্র, ব্যাপক ছিল জুলুম-নিপীড়নের রাজত্ব।
এতদ্ভিন্ন এই দেশটি গোটা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে জীবন অতিবাহিত করছিল। এখানকার জীবন ছিল স্থবির, আচার-অভ্যাস, প্রথা-পদ্ধতির গভীর নিগড়ে বন্দী এবং শ্রেণী সংঘাত ও শ্রেণী বৈষম্যের শিকার ছিল। রক্ত, বর্ণ ও গোত্রীয় অহমিকায় নিষ্পিষ্ট হচ্ছিল। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সাবেক অধ্যাপক বিদ্যাধর মহাজন নামক একজন হিন্দু ঐতিহাসিক ইসলাম আগমনের পূর্বে ভারতবর্ষের অবস্থা সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে বলেন :
“ভারতবর্ষের জনগণ গোটা বিশ্ব থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন। তারা নিজেদের মধ্যেই ছিল সীমাবদ্ধ এবং দুনিয়ার অবস্থাদি সম্পর্কে বেখবর। তাদের এই বেখবর অবস্থা তাদের অবস্থান খুবই দুর্বল করে দিয়েছিল। তাদের মধ্যে জড়তা ও স্থবিরতা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল এবং পরাজয় ও অধঃপতনের চিহ্ন ছিল স্পষ্ট প্রতিভাত। সে যুগের সাহিত্যের ভেতর কোন প্রাণ ছিল না। স্থাপত্য শিল্প, ভাস্কর্য ও অন্যান্য সূক্ষ্ম শিল্প-কলাও ছিল অধঃপতনের দিকে। জাতিভেদের বেড়াজাল ছিল কঠিন। বিধবাদের
বিয়ে করা হত না এবং তাদের আহার্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রে কঠিন কড়া বিধিনিষেধ আরোপিত ছিল। অচ্ছ্যুৎ ও অস্পৃশ্যরা জনপদের বাইরে থাকতে বাধ্য ছিল। ”
জাযীরাতুল আরব (আরব উপদ্বীপ)
আরবদের নৈতিক চরিত্রও বিগড়ে গিয়েছিল। তারা শরাব ও জুয়ায় ছিল আসক্ত। তাদের হৃদয়হীনতা ও জাহিলী আত্মমর্যাদাবোধের পরিমাপ করা যাবে আপন কন্যা সন্তানদের জীবিত দাফন করা থেকেই। কাফেলা লুণ্ঠন করা, নিরপরাধ লোকদেরকে তলোয়ারের মুখে নিক্ষেপ করা ছিল তাদের প্রিয় নেশা। তাদের নিকট নারীর কোন মর্যাদা ছিল না। তাদের ঘরের অন্যান্য সামগ্রী ও আসবাবপত্রের মতই কিংবা পশুর ন্যায় যেখানে খুশি স্থানান্তরিত করা হত অথবা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের মতই নারীও বণ্টিত হত। কিছু খাদ্য পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল, নারী তা ব্যবহার করতে পারত না। পুরুষ যত খুশী বিয়ে করতে পারত। কেউ কেউ দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক পেরেশানীর ভয়ে আপন সন্তানকে হত্যা করত।
গোত্রীয়, বংশীয় ও পারিবারিক, রক্ত সম্পর্কীয় ও স্বজনপ্রীতি ছিল সীমাতিরিক্ত। যুদ্ধ ছিল তাদের অস্থি-মজ্জায় মিশে এবং একে অপরকে হত্যা করা তাদের কাছে ক্রীড়া-কৌতুকের বেশী ছিল না। অনেক সময় মামুলি ঘটনাও বিরাট রক্তপাত ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণ হত। কোন কোন যুদ্ধ চল্লিশ বছর ধরে চলেছে এবং হাজার হাজার মানুষ এতে জীবন হারিয়েছে।
ইউরোপ
ইউরোপীয় জাতিগোষ্ঠী, যারা উত্তর ও পশ্চিমের এলাকায় বহুদূর অবধি বসতি স্থাপন করেছিল, মূর্খতা ও অশিক্ষার ভয়াবহ অন্ধকারে বসবাস করছিল এবং রক্তাক্ত লড়াই-সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল। মানবীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির কাফেলার পশ্চাতে এবং দুনিয়ার জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগৎ থেকে বহু দূরে ছিল তাদের অবস্থান। যেমন বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাদের কোন সম্বন্ধ ছিল না, তেমনি বহির্বিশ্বের কাছেও তাদের চাওয়া-পাওয়ার ছিল না। তাদের দেহ ছিল পুতিগন্ধময় আর মস্তিষ্ক ছিল অলীক কল্পনা বিলাসে ভরপুর। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে তাদের কোন লক্ষ্য ছিল না। পানি
তারা খুব কমই ব্যবহার করত। তাদের পাদরী ও বিশপ শরীরকে কষ্ট দিত আর সমাজ থেকে পালাবার ক্ষেত্রে তারা ছিল কঠোর ও চরমপন্থী। তাদের কাছে তখনও পর্যন্ত এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত স্থিরীকৃত হয়নি যে, নারী মানুষ না পশু, তাদের অবিনশ্বর আত্মা আছে কি না, তাদের মালিকানা ও ক্রয়-বিক্রয়ের অধিকার আছে কি না ?
Robert Brifault বলেন :
“পঞ্চম শতাব্দী থেকে নিয়ে খৃষ্টীয় দশম শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপে গভীর অন্ধকার বিরাজিত ছিল আর এই অন্ধকার গভীর থেকে গভীরতর এবং ভয়ানক থেকে ভয়ংকর হতে চলছিল। সেই যুগের বর্বরতা প্রাচীন কালের বর্বরতার তুলনায় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। কেননা তাদের উদাহরণ ছিল সেই মরা লাশের মত যা ফুলে ফেটে গিয়েছিল। সেই সংস্কৃতির নাম-নিশানা লোপ পাচ্ছিল আর তার ওপর ধ্বংসের মোহর মারা হয়েছিল। সেই সমস্ত দেশ যেখানে এই সংস্কৃতি প্রস্ফুটিত ও বিকশিত হয়েছিল এবং অতীতে চরমোৎকর্ষ লাভ করেছিল, যেমন ইতালি, ফ্রান্স, সেখানে চলছিল অরাজকতা ও ধ্বংসের রাজত্ব।”
গাঢ় অন্ধকার ও গভীর হতাশা
সংক্ষেপে বলা যায় যে, খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী, যেই শতাব্দীতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাব ঘটে, তা ছিল ইতিহাসের নিকৃষ্টতম যুগ এবং মানবতার ভবিষ্যৎ, তার স্থায়িত্ব ও উন্নতির দিক দিয়ে অত্যন্ত অন্ধকার ও হতাশাব্যঞ্জক। বিখ্যাত ইংরেজ লেখক H. G. Wells সাসানী ও বায়যানটাইন রাজত্বের আলোচনা করতে গিয়ে সেই যুগের চিত্রাংকন করেছেন। তাঁর ভাষায় :
“বিজ্ঞান ও রাজনীতি দুটোই সংঘর্ষমুখর ও ধ্বংসোন্মুখ রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে মৃত্যুর ঘুমে ছিল বিভোর। এথেন্সের শেষ দিককার দার্শনিকগণ তাদের ধ্বংস অবধি, যা তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, প্রাচীন যুগের সাহিত্যিক পুঁজিকে, যদিও কোনরূপ চিন্তা-ভাবনা ব্যতিরেকেই কিন্তু সীমাহীন শ্রদ্ধার সঙ্গে সংরক্ষণ করেছিল। কিন্তু তখন পৃথিবীতে মানুষের এমন কোন শ্রেণী অবশিষ্ট ছিল না যারা প্রাচীন কালের অভিজাতবর্গের মত নির্ভীক ও মুক্ত চিন্তার সমর্থক হত এবং প্রাচীনদের রচনাবলীর ন্যায় অনুসন্ধান ও গবেষণা কিংবা নির্ভীক মতামত দিত
প্রকাশের বাহক হত। এই শ্রেণীর নির্মূল হওয়ার বিশেষ কারণ হল রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা। কিন্তু এর আরও একটি কারণ ছিল হাদ্দরুন ঐ আমলে মানবীয় প্রতিভা ও বুদ্ধিমত্তা ভোঁতা ও উষর মরুভূমিতে পরিণত হয়েছিল। ইরান ও বায়যানটাইন এই দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে অসহযোগিতা ও অসহিষ্ণুতা বিরাজ করছিল। উভয় সাম্রাজ্যই ছিল এক নতুন ধরনের ধর্মীয় রাষ্ট্র যেখানে স্বাধীন মতামত প্রকাশের ওপর কড়া পাহারা বসানো হয়েছিল।”
বায়যানটাইন সাম্রাজ্যের ওপর পারসিক সাম্রাজ্যের আক্রমণ এবং পারসিক সাম্রাজ্যের ওপর বায়যানটাইনদের বিজয় কিছুটা বিস্তারিত আকারে আলোচনার পর খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে সামাজিক ও নৈতিক অধঃপতনের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে গ্রন্থকার বলেন :
যদি কোন রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বক্তা সপ্তম শতাব্দীর সূচনায় বিশ্বের সামগ্রিক অবস্থার পর্যালোচনা করতেন তাহলে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতেন যে, মাত্র কয়েক শতাব্দীর ব্যাপার, গোটা ইউরোপ ও এশিয়া মোঙ্গলদের পদানত হবে। পশ্চিম ইউরোপে না ছিল কোন শৃঙ্খলা, আর না ছিল একতা। বায়যানটাইন সাম্রাজ্য ও পারসিক সাম্রাজ্য একে অপরকে ধ্বংস করার ধনুর্বঙ্গ পণ করে বসেছিল। ভারতবর্ষও ছিল বিচ্ছিন্নতা ও বিপর্যয়ের শিকার।
বিশ্বব্যাপী বিপর্যয় ও অরাজকতা
মোটকথা, মহানবী মুহাম্মদ (সা)-এর আবির্ভাব কালে সমগ্র মানবতা আত্মহত্যার পথে ছিল দ্রুতবেগে ধাবমান। মানুষ তার খালিক ও মালিককে ভুলে গিয়েছিল এবং নিজেকে, নিজের ভবিষ্যৎ ও পরিণতিকে বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। তার ভেতর ভাল-মন্দ ও উত্তম-অধমের মধ্যে পার্থক্য করবার যোগ্যতাও আর অবশিষ্ট ছিল না। মনে হচ্ছিল, মানুষের দিল ও دماغ তথা মন-মস্তিষ্ক কোন কিছুর গভীরে হারিয়ে গেছে। তাদের দীন ও আখেরাতের দিকে মাথা তুলে চাইবারও বুঝি ফুরসং নেই! আত্মা ও হৃদয়-মনের খোরাক, পারলৌকিক কল্যাণ, মানবতার সেবা ও অবস্থার সংস্কার-সংশোধনের জন্য তাদের একটি মুহূর্তেরও বুঝি অবকাশ নেই। অনেক সময় গোটা দেশে এমন একটি লোক চোখে পড়ত না যার অন্তরে আপন দীনের জন্য সামান্যতম চিন্তা-ভাবনাও আছে, যে এক আল্লাহর ইবাদত করে, তাঁর সঙ্গে আর কাউকে শরীক করে না, যার অন্তরে মানবতার জন্য ব্যথা রয়েছে, দরদ রয়েছে এবং এই অন্ধকার ও ভয়াল পরিণতির ব্যাপারে যার অস্থিরতাও রয়েছে। এ
ছিল আল্লাহ তা‘আলার সেই ঘোষণার হুবহু প্রতিচ্ছবি :

“মানুষের কৃতকর্মের দরুন জলে-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে ওদেরকে ওদের কোন কোন কর্মের শাস্তি তিনি আস্বাদন করান যাতে ওরা ফিরে আসে” (সূরা রূম, ৪১ আয়াত)।