আবির্ভাবের পূর্বে

আবির্ভাবের পূর্বে

মক্কায় হযরত ইসমাঈল (আ)

সায়্যিদুনা ইবরাহীম (আ) মক্কার দিকে আগমন করেন। মক্কা ছিল শুষ্ক ও ঘাস-পানিবিহীন পাহাড়বেষ্টিত। এখানে পানি, খাদ্যশস্য ও জীবন যাপনের অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রীর এমন কিছু ছিল না যা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন। তাঁর সাথে তাঁর স্ত্রী বিবি হাজেরা ও পুত্র ইসমাঈলও ছিলেন। বস্তুত এ সফর ছিল বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত মূর্তিপূজা থেকে হিজরত এবং এমন এক কেন্দ্রের ভিত্তি স্থাপনের জন্য তা করা হচ্ছিল যেখানে আল্লাহ্ তা‘আলার ইবাদত করা হবে এবং অন্য লোকদেরকেও এর দাওয়াত প্রদান করা হবে। এই কেন্দ্র হেদায়েতের একটি আলোকোজ্জ্বল মীনার, মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা ও আশ্রয়স্থল এবং তাওহীদ, দীনে হানীফ ও নির্ভেজাল দীনের দাওয়াতের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।

আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর এই নিষ্ঠাপূর্ণ আমলকে কবুল করেন, এই শুষ্ক উপত্যকায় খুব বরকত দান করেন এবং এই ক্ষুদ্র পবিত্র ও বরকতময় খানদানের জন্য যা কেবল মা ও ছেলেকে নিয়ে গঠিত ছিল (যাঁদেরকে হযরত ইবরাহীম এই বিজন ও ঘাসপানিহীন প্রান্তরে আল্লাহর ভরসায় ছেড়ে গিয়েছিলেন) পানির একটি প্রস্রবণ প্রবাহিত করে দেন যা যমযম কূপ নামে কথিত। আল্লাহ্ তা‘আলা এতে প্রচুর বরকত দান করেন।

ইসমাঈল (আ) যখন কিছুটা বড় হলেন এবং চলতে ফিরতে ও দৌড়াদৌড়ি করতে লাগলেন তখন হযরত ইবরাহীম (আ) আল্লাহ তা‘আলার প্রেমের ওপর

তাঁর ভালবাসাকে কুরবানী দিতে চাইলেন এবং তাঁকে (ইসমাঈলকে) যবাহ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কেননা স্বপ্নে তাঁকেই এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সৌভাগ্যবান পুত্র আল্লাহর নির্দেশের সামনে মস্তক অবনত করলেন এবং অত্যন্ত সন্তুষ্ট চিত্তে ও প্রশান্তির সঙ্গে এর জন্য তৈরি হলেন। কিন্তু আল্লাহ্ তা‘আলা ‘যিবহিন আজীম’- কে এর ফিদয়া হিসাবে কবুল করলেন এবং পুত্র ইসমাঈলকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখেন যাতে দাওয়াত ইলাল্লাহ্-র ক্ষেত্রে তিনি স্বীয় পিতাকে সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারেন এবং খাতামুন্নাবিয়্যীন ও সায়্যিদু’ল-মুরসালীন (স)-এর সর্বোচ্চ পিতামহ, অধিকন্তু এই মুসলিম উম্মাহর সর্বোচ্চ পিতৃপুরুষ হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করতে পারেন। এই উম্মাহর ওপর দাওয়াত ইলাল্লাহ ও জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর দায়িত্ব কিয়ামত তক সোপর্দ করা হয়েছে।

হযরত ইবরাহীম (আ) মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং পিতা-পুত্র মিলে আল্লাহর ঘর নির্মাণ করতে শুরু করেন। তাঁদের দু‘আ ছিল এই যে, আল্লাহ্ তা‘আলা এই ঘরকে কবুল করুন, এতে বরকত দিন এবং তাঁরা দু’জনই যেন ইসলামের ওপর বাঁচেন ও মরেন এবং তাঁদের ইনতিকালের পর তাঁদের বংশধরগণ এই সম্পদ ও উত্তরাধিকার যেন লাভ করেন। তাঁরা এই দাওয়াতের কেবল হেফাজতই করবে না, বরং প্রতিটি বদ, প্রতিটি কুদৃষ্টি, এ পথের প্রতিটি কাঁটা ও প্রতিটি কংকর থেকে একে সযত্নে দূরে রাখবে। শুধু তাই নয়, এই দুনিয়াতে এর পতাকাবাহী হিসাবে থাকবে, একে সব কিছুর ওপর অগ্রাধিকার দেবে, এ পথে কোন কুরবানী দিতেই সে পিছপা হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না এই দাওয়াত গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁরা আরও দু‘আ করেন যে, আল্লাহ্ তা‘আলা যেন তাঁদের বংশধরদের মাঝে এমন একজন নবীর আবির্ভাব ঘটান যিনি তাঁর সর্বোচ্চ পিতামহ ইবরাহীম (আ)-এর দাওয়াতকে নতুনভাবে জীবন দান করবেন এবং এই কাজের পূর্ণতা দান করবেন যেই কাজ তাঁরা শুরু করছেন।

“স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা‘বাঘরের প্রাচীর তুলছিল তখন তারা বলেছিল হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এই কাজ কবুল কর; নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞাতা। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উভয়কে তোমার একান্ত অনুগত কর এবং আমাদের বংশধর থেকে তোমার এক অনুগত উম্মত কর। আর আমাদেরকে ইবাদতের নিয়ম-পদ্ধতি দেখিয়ে দাও এবং আমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হও। তুমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মধ্যে থেকে তাদের নিকট এক রাসূল পাঠাও যে তোমার আয়াতসমূহ তাদের নিকট তিলওয়াত (আবৃত্তি) করবে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে পবিত্র করবে। তুমি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (সূরা বাকারা : ১২৭-২৯)।

হযরত ইবরাহীম (আ) এও দু‘আ করেছিলেন যে, এই ঘর সব সময় যেন শান্তি ও নিরাপত্তার দোলনা হতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের সন্তান-সন্ততিদেরকে মূর্তিপূজা থেকে যেন নিরাপদ রাখেন যার প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞা এত বেশী আর কোন কিছুতে ছিল না এবং যার থেকে বড় বিপদ স্বীয় ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য আর কিছুকে তিনি মনে করতেন না। এজন্য যে, আম্বিয়া-ই কিরামের পর তাঁদের জাতিগোষ্ঠীর পরিণতি তাঁদের চোখের সামনে ছিল এবং তাঁরা দেখেছিলেন যে, তাঁদের ক্রমাগত চেষ্টা-সাধনা ও মহান আত্মত্যাগ সত্ত্বেও এসব জাতিগোষ্ঠী কিভাবে তাঁদের পথ থেকে সরে গিয়েছিল এবং তাঁদের দুনিয়া থেকে বিদায় নিতেই শয়তান ও ফাসাদ সৃষ্টিকারী হাঙ্গামাবাজরা স্ব স্ব যুগের দাজ্জাল, মূর্তিপূজক ও জাহিলিয়াতের নিশানবরদাররা তাদেরকে শিকার বানিয়েছে এবং গ্রাসে পরিণত করেছে।

তাঁরা আল্লাহ তা‘আলার দরবারে এই আকাঙ্ক্ষাও ব্যক্ত করেন যে, তাঁদের সন্তান ও সন্তানের সন্তান-সন্ততিরা যেন এই দাওয়াত ও জিহাদের সঙ্গে আগাগোড়া সম্পর্ক কায়েম রাখে এবং তাঁর মূর্তিভাঙ্গা, শিরক ও মূর্তিপূজার প্রতি তাঁর ঘৃণা ও অসন্তোষ, সত্যের পথে অব্যাহত প্রয়াস ও চেষ্টা-সাধনা, স্বীয় মূর্তি নির্মাণকারী ও মূর্তি বিক্রেতা পিতার মোকাবিলায় তাঁর কোমর বেঁধে দাঁড়ানো, সত্যকথন ও অন্তর্জ্বালা, তাঁর হিজরত ও দেশত্যাগকে সব সময় মনে রাখে এবং এটা অনুভব করে যে, এত বড় নাযুক ও গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য এই বিরান, বালুকাপূর্ণ ও

প্রস্তরসংকুল কংকরময় যমীন (যা না কৃষি উপযোগী ছিল আর না ছিল যেখানে সভ্যতা-সংস্কৃতির লালন-পালনের ও উন্নতি-অগ্রগতির কোন উপকরণ) মনোনয়নের গূঢ় রহস্য কি এবং পৃথিবীর বড় বড় বসতি ও উদ্যান-পুষ্পোদ্যান, শহর, কৃষি ও বাণিজ্য, শিল্প-সাহিত্যের কেন্দ্রের ওপর, যেখানে সব ধরনের আরাম-আয়েশের উপকরণ মজুদ ছিল, এই বিজন মরু-কান্তর ও নাম-পরিচয়হীন ভূমিখণ্ডকে কেন অগ্রাধিকার দেওয়া হল?

তিনি (হযরত ইবরাহীম আ) আল্লাহর নিকট এও দু‘আ করেন যে, তাঁদের বংশধরদের জনপ্রিয়তা, চিত্তাকর্ষণ, গ্রহণযোগ্যতা, খ্যাতি, সৃষ্টিকুলের আশ্রয়স্থল ও ধরাতলের কেন্দ্র হওয়ার যেন সৌভাগ্য লাভ ঘটে। মানুষের অন্তর যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁদের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তারা যেন পৃথিবীর প্রতিটি কোণ থেকে এসে তাঁদের ভালবাসা ও ভক্তি-শ্রদ্ধার অর্ঘ্য তাঁদেরকে পেশ করে, প্রয়োজনীয় জীবনোপকরণ (রিযিক) আপনাআপনি সকল দিক থেকে যেন তাঁদের কাছে পৌঁছতে থাকে, সর্বপ্রকার ফলমূল, চেষ্টা-সাধনার সর্বোত্তম ফসল, উপকারিতা ও কল্যাণ লাভ যেন তাঁদের ভাগ্যে জোটে।

“আর স্মরণ কর, ইবরাহীম বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! এই নগরীকে (মক্কা মুকাররামাকে) নিরাপদ কর এবং আমাকে ও আমার পুত্রদেরকে প্রতিমা পূজা থেকে দূরে রাখ। হে আমার প্রতিপালক! এই সকল প্রতিমা বহু মানুষকে গোমরাহ করেছে। সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সেই আমার দলভুক্ত; কিন্তু কেউ আমার অবাধ্য হলে তুমি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরদের কতককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় তোমার পবিত্র ঘরের নিকট। হে আমাদের প্রতিপালক! এইজন্য যে, ওরা যেন সালাত কায়েম করে। অতএব, তুমি কিছু লোকের অন্তর ওদের প্রতি অনুরাগী করে দাও এবং ফলাদি দ্বারা ওদের জীবিকার ব্যবস্থা কর যাতে ওরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে” (সূরা ইবরাহীম : ৩৫-৩৭ আয়াত)।

কুরায়শ গোত্র

এই সব দু‘আ ও আশা-আকাঙ্ক্ষা এক এক করে পূরণ হয়। আল্লাহ তা‘আলা এই দু’জনের সন্তান-সন্ততির মধ্যে বরকত দান করেন। ফলে এই ইবরাহীমী আরবীয় খানদান ফলেফুলে সুশোভিত হয় এবং শাখা-প্রশাখায় পল্লবিত হয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ইসমাঈল (আ) জুরহুম গোত্রের সঙ্গে আত্মীয়তা বন্ধনে আবদ্ধ হন যাদেরকে আরব ‘আরিবার মধ্যে গণ্য করা হয়। ইসমাঈল (আ)-এর সন্তান-সন্ততির মাঝে খুব বরকত হয়, এমন কি এই বংশে আদনানের জন্ম হয় যাঁর বংশধারা স্মৃতি ও সতর্কতা, ধারাবাহিকতা ও সমাবেশের দিক দিয়ে আরব বংশধারায় সর্বাধিক প্রোজ্জ্বল ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।

আদনানের অনেক ছেলেমেয়ে হয়, তন্মধ্যে মা‘আদ ইবন ‘আদনান সবচেয়ে বেশী মশহুর। মা‘আদ-এর বংশে মুদার খ্যাতির অধিকারী হন এবং তাঁর বংশে ফিহির ইবন মালিক খান্দানের নাম উজ্জ্বল করেন। ফিহির ইবন মালিক ইবন নাদর-এর সন্তানের নাম কুরায়শ হিসাবে পরিচিত হয় আর এই নাম তাঁর সমস্ত নামের ওপর এমনভাবে ছেয়ে যায় যে, তা কুরায়শ গোত্র হিসাবে কথিত হয়। আরববাসী কুরায়শদের উচ্চ বংশ-মর্যাদা, নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব, বাকপটুতা ও ভাষার অলংকার, বর্ণনাশক্তি, উন্নত চরিত্র, বীরত্ব ও অটুট বলের ওপর পরিপূর্ণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন এবং এখন এটা এমন এক বাস্তব সত্যে পরিণত হয়েছে যা প্রবাদবাক্যের মত বিখ্যাত, সকল মতানৈক্যের ঊর্ধ্বে।

কুসায়্যি ইবন কিলাব-এর বংশধর

ফিহিরের বংশে কুসায়্যি ইবন কিলাবের জন্ম হয় আর মক্কার নেতৃত্ব থাকে জুরহুম গোত্রের হাতে। এরপর একদিন বায়তুল্লাহর তত্ত্বাবধায়ক ও রক্ষক খুযাআ তাদের ওপর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করেন। এরপর কুসায়্যি ইবন কিলাব-এর সৌভাগ্য তারকা উদিত হয় এবং তাঁর যোগ্যতা ও খেদমত সামনে আসে। বায়তুল্লাহর খেদমতের এই দায়িত্ব তাঁকে সোপর্দ করা হয়। কুরায়শদের সকলেই তাঁর পতাকাতলে সমবেত হয় এবং খুযাআ গোত্রকে মক্কা থেকে বেদখলপূর্বক এর শাসন-শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনা তিনি স্বহস্তে গ্রহণ করেন। কুসায়্যি ইবন কিলাব খুবই

সর্বজনগ্রাহ্য ও জনপ্রিয় সর্দার ছিলেন। বায়তুল্লাহর দেখাশোনা ও দ্বাররক্ষা ছিল তাঁর জিম্মার অন্তর্ভুক্ত। এর চাবি ছিল তাঁরই নিয়ন্ত্রণে। তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে কেউ এতে প্রবেশ করতে পারত না। এরই সাথে হাজ্জীদের যমযমের পানি পান করানো (সিকায়া)ও বার্ষিক ভোজ (রিফাদা), নদওয়া অর্থাৎ পরামর্শ সভা যা বিভিন্ন পরামর্শে, যুদ্ধের ময়দানে পতাকাবাহী ও সেনাপতি নির্বাচনে প্রভৃতির জন্য প্রয়োজন মাফিক অনুষ্ঠিত হত, সবকিছুই তাঁর এখতিয়ারাধীন ছিল আর এভাবে মক্কার সমগ্র আভিজাত্য ও সর্বপ্রকার মর্যাদা তারা লাভ করেছিল।

তাঁর বংশধরদের মধ্যে আবদ মানাফ সর্বাধিক সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তি লাভ করেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন হাশিম। হাজ্জীদের পানি পান করানো ও বার্ষিক ভোজ প্রদানের দায়িত্ব ছিল তাঁর জিম্মায়। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা)-র দাদা আবদুল মুত্তালিব-এর পিতা। হাজ্জীদের পানি পান ও বার্ষিক ভোজ প্রদানের মহাদায়িত্ব স্বীয় পিতৃব্য আল-মুত্তালিব ইবন আবদ মানাফ থেকে লাভ করেন। তিনি তাঁর গোত্রে যে সম্মান, সুনাম, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন তা তখন পর্যন্ত তাঁর পিতৃ-পিতামহদের মধ্যে আর কেউ পাননি।

বনী হাশিম

বনী হাশিম ছিল কুরায়শ গোত্রের সোনালী ও গুরুত্বপূর্ণ অলংকারতুল্য। ইতিহাস ও সীরাত গ্রন্থসমূহ এদের যেসব ঘটনা ও অবস্থা আমাদের জন্য সংরক্ষিত রেখেছে (যা প্রকৃত অবস্থা থেকে খুবই কম) যদি আমরা তা পর্যালোচনা করি তাহলে আমরা পরিমাপ করতে সক্ষম হব যে, তাদের ভদ্রোচিত মানবিক অনুভূতির কতটা প্রকাশ ঘটেছিল এবং প্রতিটি বিষয়ে ভারসাম্য, সুষ্ঠু জ্ঞানবুদ্ধি, আল্লাহর চোখে বায়তুল্লাহর যে মর্যাদা ও সম্মান-এর পূর্ণ অনুভূতি, জুলুম ও মানুষের অধিকার হরণ থেকে বিরত থাকা, উন্নত মনোবল, দুর্বল ও মজলুম মানুষের সাথে সমবেদনা ও সহানুভূতি, দানশীলতা ও বীরত্ব, মোটকথা আরবদের নিকট অশ্বারোহণের যতগুলো মহৎ ও প্রশংসনীয় গুণ রয়েছে এবং এতে যতটা সমুন্নত ও সূক্ষ্ম অর্থ লুকিয়ে রয়েছে তার ঝলক তাঁদের জীবনচরিতে আমরা দেখতে পাই। এ সেই জীবনচরিত ও কর্মনৈপুণ্য যা রাসূলুল্লাহ (সা)-র পূর্বপুরুষদের জন্য সবদিক দিয়েই উপযোগী এবং তিনি যেই মহান ও উন্নত চরিত্রের আপন কথা ও কর্মের মাধ্যমে

দাওয়াাত দিয়েছেন তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কেবল এতটুকু পার্থক্য ছিল যে, তারা ওয়াহী বিচ্ছিন্ন যুগে ছিলেন এবং জাহিলিয়াতের আকীদা-বিশ্বাস ও উপাসনাগুলোতে আপন গোত্রের সঙ্গে মোটামুটি শরীক ছিলেন।

মক্কায় মূর্তিপূজা এবং এর মূল উৎস ও ইতিহাস

কুরায়শ গোত্র হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ ও তাঁদের সর্বোচ্চ পিতামহ হযরত ইসমাঈল (আ)-এর দীনের ওপর আগাগোড়া প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং তাওহীদ ও এক আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীর ওপর দৃঢ়পদ ছিল। এভাবে আমর ইবন লুহায়্যি আল-খুযাঈর আমল আসল। সেই ছিল প্রথম ব্যক্তি যে হযরত ইসমাঈল (আ)-এর দীনে পরিবর্তন সাধন করে, মূর্তি স্থাপন করে, পশুর প্রতি সম্মান ও একে সাইবা বানানোর প্রথা কায়েম করে এবং হালাল-হারামের নতুন নিয়ম তৈরি করে, ঐশী বিধানের সঙ্গে যার কোন সম্পর্ক ছিল না এবং যা ছিল ইবরাহীমী শরীয়ত থেকে একেবারে পৃথক। এটা সৃষ্টি হয় এভাবে যে, এই ব্যক্তি মক্কা থেকে সিরিয়ায় যায় এবং দেখতে পায় যে, সেখানকার লোকেরা মূর্তি পূজা করে। এটি তার খুব পছন্দ হয়। অতঃপর সেখান থেকে কিছু মূর্তি সংগ্রহ করে এবং মক্কায় স্থাপন করে। সে লোকদেরকে এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও পূজা করবার নির্দেশ দেয়।

এও সম্ভব ও যুক্তিযুক্ত মনে হয় যে, সে সিরিয়ায় যেতে ‘বাতরা’ হয়ে অতিক্রম করে যাকে প্রাচীন ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদ বাতরা ও বাাতরাহ (patra) বলে এসেছেন। এটি পূর্ব জর্দাানের দক্ষিণে অবস্থিত বিখ্যাত পাহাড়ী কসবা যার উল্লেখ রোমক ও গ্রীকদের এখানে দেখতে পাওয়া যায়। কথিত আছে, একে নাবাতীয়রা, যারা ছিল মূলত আরব, হাজার বছর আগে নির্মাণ করেছিল। বরাবর এরা মিসর, সিরিয়া, ফোরাত উপত্যকা ও রোম সফর করত এবং হতে পারে যে, ফোরাত উপত্যকায় পৌঁছতে গিয়ে তারা অবশ্যই হেজায অতিক্রম করে থাকবে। এরা প্রকাশ্য মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিল। পাথর কেটে তারা মূর্তি তৈরি করত এবং তার পূজা

করত। ঐতিহাসিকদের ধারণা, উত্তর হেজাযের বিখ্যাত মূর্তি ‘লাত’ যাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূর্তি মনে করা হত, প্রকৃতপক্ষে ‘বাতরা’ থেকেই আমদানী করা হয়েছিল এবং গুরুত্বপূর্ণ ও বিশিষ্ট মূর্তিগুলোর অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছিল।

ঐতিহাসিক ফিলিপ কে হিট্টির বিখ্যাত গ্রন্থ History of Syria-তেও এর সমর্থন মেলে। এতে ঐসব নাবাতিয় এলাকার (বর্তমান পূর্ব জর্দান) ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য হল :

“ঐসব উপাস্য দেবদেবীর সর্দার ছিল যু‘শ-শারা যা ছিল একটি সমান্তরাল স্তম্ভ কিংবা কৃষ্ণ চতুর্ভুজ প্রস্তর সদৃশ। লাত, আরবরা যার পূজা করত, প্রকৃতপক্ষে যি‘শ-শারার সঙ্গেই সম্পর্কিত ছিল। অপর নাবাতী মূর্তি, যার উল্লেখ ঐসব ঐতিহাসিক নিদর্শন ও প্রাচীন নাবাতিয় লিপি ও চিত্রে পাওয়া যায় তা ‘মানাত’ ও ‘উয্যা’। ঐ সব লিপিতে ‘হুবল’ দেবতার উল্লেখও পাওয়া যায়।

মনে রাখতে হবে যে, এটা সেই যুগ যে যুগে মূর্তিপূজার বিভিন্ন ধরন আরব উপদ্বীপের চতুর্দিকে ও জলে-স্থলে সর্বত্র বিস্তার লাভ করছিল এবং হযরত ঈসা মসীহ (আ) ও তাঁর হাওয়ারীদের দাওয়াত তখনও প্রকাশ পায়নি যিনি মূর্তি পূজার এই অগ্রাভিযান থামিয়ে দেন। তিনি এর দ্রুত গতি ও তৎপরতা হ্রাস করেন। থাকল ইয়াহূদী ধর্ম। ইয়াহূদী ধর্ম সীমিত ও বংশীয় ধর্ম ছিল যে ধর্ম কেবল বনী ইসরাঈলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং বনী ইসরাঈল ছাড়া আর কাউকে তাওহীদ তথা একত্ববাদের দাওয়াত দেবার অনুমতি এতে ছিল না। De lacy O’Leary তদীয় Arabia before Muhammad নামক গ্রন্থে বলেন :

“একথা বলা কিছুমাত্র ভুল হবে না যে, মূর্তির উপাসনা প্রকৃতপক্ষে সিরিয়ার ধর্ম যা আরব উপদ্বীপ সিরীয় ও গ্রীকদের মিলিত ঐতিহ্য থেকে পেয়েছে যা সিরিয়ায় সাধারণ ব্যাপার ছিল এবং সম্ভবত আরবের অবশিষ্ট অংশে এর বেশি রেওয়াজ বা প্রচলন ছিল না।”

ঠিক তেমনি ফোরাত উপত্যকা ও আরব উপদ্বীপের পূর্ব দিকে মূর্তিপূজা

ব্যাপক ছিল এবং যেহেতু এই এলাকার সঙ্গে আরব উপদ্বীপের বন্ধুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল সেহেতু কিছুমাত্র অসম্ভব নয় যে, আরব উপদ্বীপে মূর্তিপূজার বিস্তার লাভে এই এলাকারও একটা হিস্যা রয়েছে। Georges Roux তদীয় Ancient Iraq নামক গ্রন্থে এ কথা পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন যে, ইরাকের প্রাচীন ঐতিহাসিক লিপিপ্রণালী এটা প্রকাশ করছে যে, মূর্তিপূজা সেখানে খৃষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দী এবং এর পর পর্যন্ত ব্যাপক ছিল। এই দেশ ঐসব মূর্তি ও উপাস্য দেবদেবীর কেন্দ্র ছিল। এখানে বিদেশী মূর্তি যেমন ছিল, তেমনি স্থানীয় মূর্তিও ছিল।

একটি বর্ণনাতে এও পাওয়া যায় যে, কুরায়শদের মধ্যে মূর্তিপূজার সূচনা ক্রমান্বয়ে হয়েছে। এর একটি ব্যাখ্যা আরব ঐতিহাসিকদের বর্ণনা থেকেও পাওয়া যেতে পারে। প্রথমে ঐসব লোক যখন মক্কা থেকে কোথাও সফর করত তখন হারাম শরীফের কিছু পাথর ‘তাবারক’ হিসাবে সম্মানের সঙ্গে নিয়ে যেত। এরপর যে পাথর তাদের বেশি পছন্দ হত তার ইবাদত করতে থাকত। তাদের সন্তান-সন্ততি ও নতুন বংশধর এর বিস্তৃত বিবরণ সম্পর্কেও ছিল অজ্ঞ। তারা প্রকাশ্য মূর্তিপূজা গ্রহণ করে এবং এভাবে অপরাপর পথভ্রষ্ট জাতিগোষ্ঠীর মত এরাও গোমরাহীর অতলে গিয়ে নিক্ষিপ্ত হয়। এতদসত্ত্বেও ইবরাহীমী যুগের কিছু অবশিষ্ট আমল ও বিবরণকে তারা নিজেদের বুকে সযত্নে তুলে রাখে। যেমন বায়তুল্লাহর তা‘জীম, তাওয়াফ, হজ্জ ও ওমরাহ। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের পর্যায়ক্রমিক ইতিহাস ও উপায়-উপকরণ থেকে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পর্যন্ত এবং ভূমিকা থেকে পরিণতি পর্যন্ত তাদের ক্রমিক স্থানান্তরের পর্যালোচনা থেকে ঐসব ঐতিহাসিকের এ কথা সমর্থিত হয় যে, আরবদের মধ্যে, বিশেষ করে কুরায়শদের ভিতর মূর্তিপূজার সূচনা কিভাবে হয়েছিল। অপরাপর কতক মুসলিম জাতিগোষ্ঠী ও ফেরকার মধ্যে ছবি, প্রতিকৃতি ও মাযারের সঙ্গে সম্পর্ক, পবিত্রতা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে যে বাড়াবাড়ি পরিলক্ষিত হয় সে সব ইতিহাস থেকেও এর সত্যতা সমর্থিত হয়। এজন্যই ইসলামী শরীয়ত সেই সমস্ত রাস্তা ও চোরাপথ প্রথমেই বন্ধ করে দিয়েছে যা শিরক অথবা ব্যক্তি, স্থান, স্মৃতিচিহ্নের পবিত্রতা জ্ঞান ও সম্মান প্রদর্শনের

ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির দিকে টেনে নিয়ে যায়।

আসহাবুল ফীল-এর ঘটনা

ঐ যুগেই এমন একটি বিপর্যয়কর ঘটনা সংঘটিত হয় যার চেয়ে বড় কোন ঘটনা আরবদের ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। এ কথার প্রমাণ যে, বড় কোন ব্যাপার নিকট ভবিষ্যতে সংঘটিত হতে যাচ্ছে এবং আল্লাহ্ তা‘আলা আরবদের জন্য কোন কল্যাণপ্রদ বিষয়ের অভিপ্রায় পোষণ করেন এবং কা‘বার শান ও মর্যাদা এভাবে উজ্জ্বল ও প্রোজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠবে যেই শান ও মর্যাদা পৃথিবীর আর কোন ইবাদতগাহের, আর কোন উপাসনাগৃহের হবে না। এরই সাথে এই ঘরের সঙ্গে ধর্মের ইতিহাস এবং মানবতার ভবিষ্যতের সেই চিরন্তন পয়গাম, অবিনশ্বর কর্মনৈপুণ্য বিজড়িত যা তাকে আনজাম দিতে হবে এবং পূর্ণতা পর্যন্ত পৌঁছতে হবে।

আল্লাহর নজরে বায়তুল্লাহর সম্মান ও মর্যাদা

এবং এ ব্যাপারে কুরায়শদের আকীদা

কুরায়শরা এই আকীদা ও বিশ্বাস পোষণ করত যে, আল্লাহর দৃষ্টিতে এই ঘরের

একটি বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে এবং তিনিই এই ঘরের সহায়ক, রক্ষক ও সাহায্যকারী। তাদের এই আকীদা-বিশ্বাস রাসূলুল্লাহ (সা)-র পিতামহ কুরায়শ সর্দার আবদুল মুত্তালিব ও হাবশা (আবিসিনিয়া)-র বাদশাহ আবরাহার কথোপকথন থেকে পরিষ্কার প্রতিভাত হয়। আবদুল মুত্তালিবের দু’শ উট আবরাহার লোকেরা ধরে নিয়ে যায়। এ জন্য তিনি আবরাহার সাথে দেখা করতে যান এবং ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চান। আবরাহা তাঁকে খুবই সম্মান করে, সিংহাসন থেকে নেমে আসে এবং পাশে বসিয়ে আগমনের হেতু জিজ্ঞাসা করে। তিনি বলেন : আমার দু’শ উট বাদশাহর লোকেরা ধরে নিয়ে এসেছে। আমি সেগুলো ফিরিয়ে নিতে চাই। বাদশাহ আবদু’ল-মুত্তালিবকে এই সামান্য ও ব্যক্তিগত দাবি পেশ করায় অত্যন্ত বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, তুমি দু’শ উটের কথা বলতে এসেছ যা আমার লোকেরা নিয়ে এসেছে, অথচ সেই ঘরের কথা ভাবছ না যার ওপর তোমাদের ও তোমাদের পিতা-পিতামহের ধর্ম প্রতিষ্ঠিত এবং যে ঘর ধ্বংসিয়ে দেবার জন্য আমার আগমন। এর জন্য তুমি কিছু বলছ না?

আবদু’ল-মুত্তালিব অত্যন্ত আস্থা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এর জবাব দেন এবং বলেন : আমি উটের মালিক, সেজন্য আমি আমার মালিকানাধীন বিষয়ের ভাবনা ভাবছি। কা’বা ঘরের মালিক যিনি তিনিই তাঁর ঘরের ভাবনা ভাবছেন এবং তিনিই এর হেফাজত করবেন।

বাদশাহ বলল : ঐ ঘর আমার হাত থেকে কি করে বাঁচতে পারে? তিনি উত্তর দেন : انت ذاك = তা তুমি জান আর জানে ঘরের মালিক। (ওটা আমার দেখার বিষয় নয়)।

এরপর যা কিছু ঘটেছে তার বিস্তৃত বিবরণ সামনে আসছে এবং এ থেকে এটা পরিষ্কার প্রতিভাত হয় যে, এখন আর কোন আক্রমণকারীর সাহস হবে না এর প্রতি কুনজরে দেখা এবং এর ওপর হস্তক্ষেপ করার। তাঁর ঘর ও তাঁর দীনের হেফাজত আল্লাহ তা’আলার নিজস্ব দায়িত্ব ছিল এবং এ কাজের পূর্ণতা দান তাঁকেই করা দরকার ছিল।

গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই যে, আবরাহা আল-আশরাম আবিসিনিয়া অধিপতি সম্রাট নাজাশী কর্তৃক নিযুক্ত সান‘আর গভর্নর ছিল। সে সান‘আয় একটি বিরাট গির্জা নির্মাণ করে এবং এর নাম রাখে আল-কুল্লায়স। উদ্দেশ্য ছিল, মানুষ হজ্জের নিমিত্ত আরবে না গিয়ে সান‘আগামী হবে। কেননা এটা

তার জন্য খুবই মনোকষ্টের কারণ ছিল যে, কা‘বা আল্লাহর বান্দাদের আশ্রয়কেন্দ্র ও প্রত্যাবর্তনস্থল হিসাবে অবশিষ্ট থাকুক এবং লোকে দূর-দরাজ এলাকা থেকে কাফেলার পর কাফেলা এসে সেখানে উপস্থিত হোক। সে চাইত, এই মর্যাদা তৎকর্তৃক নির্মিত গির্জা লাভ করুক।

আরবদের জন্য ব্যাপারটি ছিল খুবই মর্মপীড়ার কারণ। কেননা কা‘বার প্রতি ভালবাসা ছিল তাদের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত এবং এ ভালবাসা তাদের অস্থিমজ্জায় মিশে গিয়েছিল। তারা কোন ঘর, উপাসনালয় ও ধর্মীয় কেন্দ্রকেই এর সমকক্ষ মনে করত না এবং একে ছেড়ে কোন বৃহৎ থেকে বৃহত্তর সম্পদ গ্রহণ করতেও তারা রাজি ছিল না। এই ব্যাপারটা তাদের মন-মস্তিষ্ককে দারুণভাবে নাড়া দিল এবং সর্বত্র এর গুঞ্জন শুরু হল। এরই মাঝে এক কানানী যুবক এ ব্যাপারে একটা কিছু করার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল এবং উল্লেখিত গির্জায় গিয়ে পায়খানা করল এবং একে অপবিত্র করে দিল। ফলে সংকট এক নতুন মোড় নিল। আবরাহা এতে দারুণভাবে ক্রুদ্ধ হল এবং তক্ষুনি কসম খেল যে, সে স্বয়ং কা‘বার ওপর হামলা করবে এবং একে মাটির সাথে না মিশিয়ে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে না।

আবরাহা তার বাহিনী নিয়ে চলল এবং বিরাট সংখ্যক হাতী সঙ্গে নিল। আরবরা হাতী সম্পর্কে আগেভাগেই অনেক কিছু শুনেছিল। এ সংবাদ তাদের নিকট বিদ্যুতের মত আপতিত হল এবং তারা এই আক্রমণ সংবাদে ভীষণভাবে ভীত ও সন্ত্রস্ত হল। তারা চেষ্টা করল যাতে এই বাহিনীকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়া থেকে বাধা দেওয়া যায়। কিন্তু খুব শিগগিরই তারা বুঝতে পারল যে, আবরাহার সেনাবাহিনীকে মোকাবিলা করা তাদের সাধ্যের বাইরে। অতএব, নিতান্ত নিরুপায় হয়ে গোটা বিষয়টি আল্লাহর নিকট সোপর্দ করল। তাদের পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে, এই ঘরের যিনি মালিক তিনি স্বয়ং একে রক্ষা করবেন।

কুরায়শরা সেনাবাহিনী আভিযান ও জুলুম-নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচার নিমিত্ত পাহাড় ও উপত্যকায় গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং অপেক্ষা করতে থাকে যে, আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর ঘরের সম্মান ও সম্ভ্রম রক্ষায় কি করেন। আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর সঙ্গী কুরায়শদের কিছু লোক কা‘বার দরজার শিকল ধরে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটিতে মগ্ন হয়ে যান এবং আবরাহা ও তার বাহিনীর পরাজয়ের নিমিত্ত আল্লাহর সাহায্যের জন্য দু‘আ করেন। এদিকে আবরাহা তার বাহিনীসহ কা‘বার দিকে অগ্রসর হয়। ‘মাহমূদ’ নামক হাতীকে সে হামলার জন্য তৈরি করে। কিন্তু মক্কার পথে হাতী এক জায়গায় বসে পড়ে। কয়েকবার মারপিট সত্ত্বেও সে উঠতে অস্বীকার করে। কিন্তু ইয়ামানের দিকে খেদাতে চাইলে সে তক্ষুণি উঠে দ্রুতবেগে সামনে অগ্রসর হয়। সেই সময় আল্লাহ্ তা‘আলার সমুদ্রের দিক থেকে এক ঝাঁক পাখি প্রেরণ করেন। পাখিগুলোর পাঞ্জায় ছিল ছোট ছোট নুড়ি পাথর। পাখির ঝাঁক আবরাহার বাহিনীর ওপর নুড়ি পাথর নিক্ষেপ করতে লাগল। এ সব পাথর যার গায়ে লাগল সেই লাশে পরিণত হল। এতদ্দৃষ্টে আবিসিনিয়ার লোকেরা যে দিক দিয়ে এসেছিল প্রাণভয়ে সেদিকেই দৌড়ে পালাতে লাগল। পাখিগুলো অবিরত পাথর নিক্ষেপ করছিল আর বাহিনীর লোকেরা লাশে পরিণত হচ্ছিল। আবরাহা নিক্ষিপ্ত পাথরে আহত হয়ে যায়। তাকে উঠিয়ে নেয়া হয়। তার শরীরের এক একটি অঙ্গ খসে খসে পড়ে। অবশেষে সান‘আয় পৌঁছে তার করুণ মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনাই কুরআন কারীমে এভাবে বর্ণিত হয়েছে:

“তুমি কি দেখ নি তোমার প্রতিপালক হাতীওয়ালাদের সঙ্গে কী করেছিলেন? তিনি কি ওদের কৌশল ব্যর্থ করে দেননি? তিনি ওদের বিরুদ্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি প্রেরণ করেন, যারা ওদের ওপর প্রস্তর-কাঁকর নিক্ষেপ করে। অতঃপর তিনি ওদেরকে ভক্ষিত ঘাসের ন্যায় করেন।”

ফীল (হাতী)-এর ঘটনা ও তার প্রভাব

আল্লাহ্ তা‘আলা যখন আবিসিনিয়ার লোকদেরকে মক্কা থেকে ব্যর্থ ও বিফল অবস্থায় ফিরিয়ে দিলেন এবং তাদের ওপর এই আযাব অবতীর্ণ হল তখন আরবদের

দিল স্বভাবতই কুরায়শদের প্রতি সম্মান ও মর্যাদাবোধের সৃষ্টি হল। তারা বলতে লাগল যে, নিশ্চিতই এরা আল্লাহ্ওয়ালা মানুষ। তাদের পক্ষ হয়ে আল্লাহ পাক তাদের দুশমনকে পরাভূত ও পর্যুদস্ত করেছেন, এমন কি তাদের লড়তে পর্যন্ত হয়নি। তাদের দিলে কা‘বার মর্যাদা ও মাহাত্ম্য পূর্বের তুলনায় অনেক গুণ বেড়ে যায় এবং আল্লাহ্ নিকট কুরায়শদের সম্মান ও মর্যাদার ব্যাপারে তাদের প্রতীতি বৃদ্ধি পায়।

এ ছিল আল্লাহ তা‘আলার এক প্রকাশ্য নিদর্শন এবং এ কথার ভূমিকা যে, সত্ত্বর মক্কায় এমন একজন নবীর আবির্ভাব ঘটবে যিনি কা‘বাকে মূর্তির আবর্জনা ও জঞ্জাল থেকে মুক্ত করবেন, পবিত্র করবেন। তাঁর হাতে এর শান দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে। তাঁর প্রচারিত দীনের এই ঘরের সঙ্গে খুব গভীর, স্থায়ী ও চিরন্তন সম্পর্ক কায়েম হবে। এই ঘটনা থেকে এও পরিমাপ করা যাচ্ছিল যে, ঐ নবীর আবির্ভাবের পবিত্র দিন খুব বেশী দূরে নয়।

আরবদের মাঝে এই ঘটনার অনিবার্যভাবে গভীর প্রভাব পড়ে। এর থেকে তারা নতুন তারিখ গণনা শুরু করে। অনন্তর তাদের লেখায় এ ধরনের রেওয়াজ দেখা যায় যে, এই ব্যাপারটা ‘আমুল-ফীল অর্থাৎ হাতীর বছরে দেখা গিয়েছিল, অমুক ‘আমুল-ফীলে জন্ম নেয়, এই ঘটনা ‘আমুল-ফীলের এত বছর পরের। ‘আমুল-ফীল ছিল খৃষ্টীয় ৫৭০ সাল।