জন্ম থেকে নবুওয়াতের প্রারম্ভ পর্যন্ত

জন্ম থেকে নবুওয়াতের প্রারম্ভ পর্যন্ত

‘আবদুল্লাহ ও আমেনা

কুরায়শ সর্দার ‘আবদু’ল মুত্তালিবের ছিল দশ পুত্র। এঁদের সকলেই ছিলেন বিশিষ্ট ও খ্যাতিমান। তাঁর সকল পুত্রের মধ্যে আবদুল্লাহ খুবই প্রশংসনীয় গুণাবলী ও কেন্দ্রীয় মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাঁর পিতা তাঁর বিয়ে দিয়েছিলেন বনু যাহরার সর্দার ওয়াহ্ব-এর কন্যা আমেনার সঙ্গে যাঁকে সে সময় উচ্চ বংশ, সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক দিয়ে কুরায়শদের ভেতর সবচেয়ে সম্মানিতা মহিলা মনে করা হত।

রাসূলুল্লাহ (সা) মাতৃগর্ভে থাকাকালেই পিতা আবদুল্লাহ ইন্তিকাল করেন। হযরত আমেনা তাঁর জন্মের পূর্বেই এমন বহু নিদর্শন দেখতে পান যদ্বারা বোঝা যেত যে, তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ অত্যুজ্জ্বল ও মর্যাদাকর হবে।

তাঁর জন্ম ও বংশ

তাঁর জন্ম হয় ‘আমুল-ফীলের (মুতাবিক ৫৭০ খৃ.) রবীউল-আউয়াল মাসের ১২ তারিখে সোমবার দিন। এটি ছিল মানবতার ইতিহাসের সবচেয়ে আলোকোজ্জ্বল ও বরকতময় দিন।

তাঁর মুবারক বংশধারা নিম্নরূপ

মুহাম্মাদ ইবন ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আবদি’ল-মুত্তালিব ইবন হাশিম ইবন ‘আবদ মানাফ ইবন কুসায়্যি ইবন কিলাব ইবন মুররাহ ইবন কা‘ব ইবন লুওয়াই্য ইবন গালিব ইবন ফিহ্ ইবন মালিক ইবন আন-নাদ্‌র ইবন কিনানা ইবন খুযায়মা ইবন মুদরিকা ইবন ইলয়াস ইবন মুদার ইবন নাযার ইবন মা‘আদ্দ ইবন আদনান। 

‘আদনানের বংশক্রম উর্ধ্বে হযরত সায়্যিদুনা ইসমাইল ইবন ইবরাহীম (আ) পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে । রাসূল (সা)-এর জন্ম হতেই মা আমেনা এ সংবাদ দাদা

আবদুল মুত্তালিবকে পাঠান। সংবাদ পেতেই তিনি ছুটে আসেন, পরম স্নেহে দেখেন, যত্নের সঙ্গে কোলে তুলে নিয়ে কা‘বার ভেতর প্রবেশ করেন, আল্লাহ তা‘আলার হাম্দ বর্ণনা করেন এবং দু‘আ করেন। অতঃপর তাঁর নাম রাখেন মুহাম্মাদ। আরবে এ নাম ছিল একেবারেই নতুন। ফলে লোকে খুব বিস্মিত হয়।

দুগ্ধ পানকাল

কয়েক দিন পর্যন্ত তাঁর চাচা আবু লাহাবের বাঁদী ছুওয়ায়বা তাঁকে দুধ পান করায়। অতঃপর আবদুল মুত্তালিব স্বীয় পৌত্রের জন্য (এত বেশী ভালবাসা ও স্নেহের পাত্র তাঁর সন্তানদের মধ্যে আর কেউ ছিল না) কোন দেহাতী ধাত্রীর সন্ধান করতে থাকেন। সে যুগে আরবের লোকেরা তাদের শিশুদের দুধ পান ও প্রাথমিক লালন-পালনের জন্য শহরের তুলনায় দেহাতী এলাকাকেই বেশী পছন্দ করত এজন্য যে, সেখানকার আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে অধিক স্বচ্ছ, নির্মল ও পবিত্র হত এবং সেখানকার লোকের চরিত্রে ভারসাম্য ও শান্ত-সমাহিত প্রকৃতি পরিলক্ষিত হত। শহরের ফেতনা-ফাসাদ থেকেও তারা থাকত নিরাপদ এবং তাদের ভাষাও শুদ্ধ ও স্পষ্ট বলে স্বীকার করে নেওয়া হত।

বনী সা‘দ-এর মহিলারা এ কাজে পারদর্শিনী এবং ভাষার অলংকারিতা ও সুস্পষ্টতার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে খ্যাত ছিলেন। এঁদের মধ্যে হালিমা সা‘দিয়াও ছিলেন। তিনি এই বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী হন। তিনি শিশুর সন্ধানে গ্রাম থেকে শহরে এসেছিলেন। সময়টা ছিল খরা মরসুম। লোকে ভীষণ পেরেশানির মধ্যে ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা)কে ঐসব মহিলার সামনে পেশ করা হয়।

কিন্তু অধিকাংশ মহিলাই ভাবল যে, শিশুটি ইয়াতীম। যদি শিশুটির বাপ থাকত তাহলে কিছুটা লাভের আশা ছিল। মা আর দাদার কাছ থেকে কি আর মিলবে? ফলে তাঁর দিকে কেউ বেশি ভ্রূক্ষেপ করল না। প্রথম দিকে হালিমাও খুব বেশি আগ্রহ দেখান নি এবং খুব একটা মনোযোগীও হননি। তাঁর আগ্রহও ছিল অন্য শিশুদের দিকে। কিন্তু আকস্মিকভাবেই তাঁর অন্তরে শিশুটির প্রতি ভালবাসা ও

মমত্ববোধ সৃষ্টি হল। অন্য কোন বাচ্চাও সামনে ছিল না। অনন্তর তিনি ফিরে আসলেন এবং তাঁকে নিয়ে স্বীয় কাফেলায় ফিরে গেলেন। আর ঠিক তন্মুহূর্তে তাঁর বরকত তাঁরা খোলা চোখে দেখতে পেলেন। তাঁদের প্রতিটি জিনিসের ভেতর ভিন্ন আরেকটি চিত্র ফুটে উঠতে লাগল। তাঁরা দুধে, পশুতে, জীবন ও জীবনোপকরণে, মোটের ওপর সব কিছুতেই পরিষ্কার বরকত অনুভব করলেন। তার সাথে আরও যেসব ধাত্রী ছিল তারা তখন বলতে শুরু করল যে, হালিমা! তুমি খুব বরকতময় বাচ্চা পেয়েছ, খুবই বরকতময়। এখন তারা হালিমাকে হিংসা করতে লাগল।

কল্যাণ ও বরকতের অব্যাহত ধারা বজায় রইল, এমনকি বনী সা‘দ-এর ঐ গোত্রে তাঁর দু’বছর কেটে গেল। বিবি হালিমা তাঁর দুধ ছাড়িয়ে দিলেন। তাঁর লালন-পালন সাধারণ শিশুদের থেকে একটু ভিন্নভাবে হচ্ছিল। এ সময় তিনি হুজুর (সা)-কে নিয়ে তাঁর মা’র নিকট হাজির হন এবং সাথে সাথেই এই আকাঙ্ক্ষাও ব্যক্ত করেন যে, শিশুকে আরও কিছু দিনের জন্য তাঁর নিকট যেন থাকতে দেওয়া হয়। অনন্তর বিবি আমেনা শিশু মুহাম্মাদ (সা)-কে তাঁর নিকট ফিরিয়ে দেন।

ফিরে আসার পর যখন তিনি বনী সা‘দ-এ ছিলেন তখনকার এক ঘটনা। দু’জন ফেরেশতার আগমন ঘটে। তাঁর সীনামুবারক ফেড়ে ফেলা হয়। তাঁর পবিত্র হৃৎপিণ্ড থেকে গোশতের টুকরো কিংবা মাংসপিণ্ডের মত একটি কালো বস্তু বের করে তাঁরা ছুঁড়ে ফেলেন। অতঃপর তাঁর হৃৎপিণ্ড খুব ভালো করে ধুয়ে ও পরিষ্কার করে স্বস্থানে স্থাপন করেন এবং তা পুনরায় পূর্বের মতই হয়ে যায়।

রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর দুধ ভাইদের সঙ্গে জঙ্গলে বকরী চরাতেন। সেখানে অনাড়ম্বর ও কষ্টসহিষ্ণু নির্ভেজাল প্রকৃতি ও গ্রামের স্বচ্ছ ও নির্মল জীবন, শহরের কদর্যতা ও মলিনতা থেকে মুক্ত আবহাওয়া, বাকচাতুর্য ও অলংকারপূর্ণ পরিবেশে

তাঁর প্রতিপালন চলছিল যে ব্যাপারে বনী সা‘দের খুব সুনাম ও খ্যাতি ছিল। তিনি কখনো কখনো সাহাবায়ে কিরামকে বলতেনও, “আমি তোমাদের তুলনায় বেশি আরব কুরায়শী আর আমি সা‘দ ইবন বকর গোত্রে দুধ পান করেছি।”

বিবি আমেনা ও দাদা আবদুল মুত্তালিবের ওফাত

তাঁর বয়স যখন ছয় বছর তখন মা আমেনা তাঁর দাদার মাতৃকুলকে দেখাবার নিমিত্ত তাঁকে ইয়াছরিব নিয়ে যান। তিনি তাঁর প্রিয়তম স্বামী ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আবদুল-মুত্তালিবের কবর যিয়ারতেও ইচ্ছুক ছিলেন। মক্কা প্রত্যাবর্তনের পথে আল-আবওয়া নামক স্থানে বিবি আমেনার ইন্তিকাল হয়। এখন একদিকে মাতৃবিয়োগের শোক, অপরদিকে সফরের নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্ব। জন্মের পর থেকেই আগাগোড়া তাঁর সঙ্গে এ ধরনেরই ব্যাপার সংঘটিত হয়েছে। এ ছিল তরবিয়তে ইলাহী তথা খোদার্য়ী প্রশিক্ষণের সেই গূঢ় রহস্য যা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানেন না। উম্মে আয়মান বারাকা হাবশিয়া নামক একজন দাসী তাঁকে নিয়ে মক্কায় আসেন এবং আল্লাহর এই আমানত দাদা আবদুল মুত্তালিবের নিকট সোপর্দ করেন। এরপর তিনি দাদার স্নেহ ছায়ায় অবস্থান করেন যিনি তাঁকে মনপ্রাণ দিয়ে চাইতেন, ভালবাসতেন এবং ক্ষণিকের তরেও তিনি তাঁর এই ইয়াতীম পৌত্র সম্পর্কে গাফিল হতেন না। কা‘বা শরীফের ছায়ায় স্বীয় ফরাশের ওপর সাথে নিয়ে বসতেন এবং নানাভাবে স্নেহ ও ভালবাসার প্রকাশ ঘটাতেন।

তাঁর বয়স যখন আট বছর তখন দাদা ‘আবদুল-মুত্তালিবও ইন্তিকাল করেন ফলে তাঁকে পুনরায় পিতৃহীনতার স্বাদ গ্রহণ করতে হয় যা পূর্বের তুলনায় ছিল অনেক বেশি তিক্ত ও কঠিন। তিনি তাঁর পিতাকে কখনো দেখেন নি। পিতার স্নেহ ও ভালবাসার স্বাদ সম্পর্কেও তিনি অনবহিত ছিলেন। এ জন্য পিতার বিয়োগ ব্যথা স্বাভাবিকের বেশি কিছু ছিল না, কিন্তু দাদার স্নেহ-যত্ন ও আদর-ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হবার অনুভূতি ছিল উপলব্ধিসঞ্জাত ও অভিজ্ঞতালব্ধ। আর এতদুভয়ের মধ্যকার পার্থক্য সকলেই বুঝতে পারেন।

চাচা আবু তালিবের সঙ্গে

দাদার ইন্তিকালের পর তিনি চাচা আবু তালিবের সঙ্গে থাকতে লাগলেন। তিনি ছিলেন পিতা আবদুল্লাহ্ সহোদর। ‘আবদু’ল-মুত্তালিব তাঁকে তাঁর দেখাশোনা ও তাঁর সঙ্গে উত্তম আচরণের নিমিত্ত বরাবর উপদেশ দিতেন। এ জন্য তিনি একাগ্র চিত্তে তাঁর দিকে মনোযোগ দেন এবং আপন সন্তান ‘আলী, জা‘ফর ও ‘আকীল (রা)-এর চেয়েও বেশী কোমল, স্নেহপরবশ, যত্ন-তদবীর ও প্রতিপালনপ্রবণ হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে সাথে রাখেন।

বলা হয়ে থাকে যে, একবার আবু তালিব বাণিজ্য উপলক্ষে একটি কাফেলার অন্তর্ভুক্ত হয়ে সিরিয়া যাচ্ছিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বয়স ছিল নয় বছর। তিনি চাচাকে রওয়ানা হতে দেখেই জড়িয়ে ধরেন। আবূ তালিব এতে খুব অভিভূত হয়ে পড়েন এবং ভাতিজাকে সফরসঙ্গী হিসাবে গ্রহণ করেন।

এই বাণিজ্য কাফেলা ‘বুসরা’ নামক স্থানে পৌঁছল এবং সেখানে ছাউনি ফেলল। এটি সিরীয় এলাকায় অবস্থিত। এখানে বুহায়রা নামক একজন রাহেব (খৃষ্টান সাধু-সন্ন্যাসী)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে। রাহেব তাঁর খানকাহতে বসবাস করতেন। সাধু বুহায়রা অভ্যাসের বিপরীত এই কাফেলাকে দাওয়াত করেন, উষ্ণ আন্তরিকতা সহকারে সকলকে অভ্যর্থনা জানান এবং ভূরিভোজে আপ্যায়িত করেন এজন্য যে, তিনি এই কাফেলার সঙ্গে আল্লাহ্‌র বিশেষ রকমের আচরণ ও অস্বাভাবিক ঘটনাবলী দেখতে পাচ্ছিলেন। যখন তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে দেখতে পেলেন তখন তিনি আরও বেশি খাতির-যত্ন করেন এবং নিশ্চিত হন যে, বালকের ভেতর নবুওয়াতের লক্ষণসমূহ বিদ্যমান। তিনি আবূ তালিবকে তাঁর সমুন্নত মর্যাদা ও ‘আলীশান সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং বলেন, আপনি আপনার ভাতিজাকে নিয়ে ঘরে ফিরে যান এবং ইয়াহূদীদের হাত থেকে তাঁকে বিশেষভাবে হেফাজত করবেন। কেননা আপনার ভাতিজা ভবিষ্যতে বিরাট মর্যাদার অধিকারী হবেন। এরপর আবূ তালিব তাঁকে নিয়ে নিরাপদে মক্কায় ফিরে আসেন।

আসমানী প্রশিক্ষণ

রাসূলুল্লাহ (সা)-র লালন-পালন বিশেষ নিরাপদ ও কালিমামুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন হয় এবং জাহিলিয়াতের নাপাক ও খারাপ অভ্যাসসমূহ থেকে আল্লাহপাক তাঁকে সর্বদাই দূরে ও মুক্ত রাখেন যাঁকে তাঁর জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে প্রথম থেকেই সবচেয়ে বেশি প্রশংসনীয় গুণাবলী, উন্নত মনোবল, উত্তম চরিত্রে বিভূষিত, লাজনম্র, সত্যবাদী, আমানতদারী, কটুক্তি ও অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ থেকে দূরে বলে মনে করা হত। এমনকি তাঁর জাতির লোকেরা তাঁকে ‘আমীন’ (বিশ্বস্ত, আমানতদার) নামে স্মরণ করত।

আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁকে ঐসব বিষয় ও জাহিলিয়াতের সমস্ত আচার-অভ্যাস থেকে মুক্ত ও নিরাপদ রেখেছিলেন যেসব তাঁর শান ও মর্যাদার উপযোগী ছিল না। যদিও সেই সমাজে সে সবের মধ্যে কোন খারাপের কিছু আছে বলে মনে করা হত না। তেমনি এসব বিষয়ের উপর কারো দৃষ্টিও পড়ত না। তিনি আত্মীয়তার দিকে খেয়াল রাখতেন, লোকের দুর্বহ বোঝা হালকা করতেন এবং তাদের প্রয়োজন মেটাতেন। তিনি মেহমানের মেহমানদারী করতেন, কল্যাণমূলক ও তাকওয়া ভিত্তিক কাজকর্মে অন্যদেরকে সাহায্য করতেন। পরিশ্রম করে জীবিকা অর্জন করতেন এবং মামুলী ও যতটুকু না হলেই নয় ততটুকু খাদ্যকেই তিনি যথেষ্ট মনে করতেন।

রাসূলুল্লাহ্ (সা)-র বয়স তখন চৌদ্দ কি পনেরো। কুরায়শ ও কায়স গোত্রের মধ্যে আল-ফিযার-এর যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। তিনি এই যুদ্ধ খুব কাছ থেকে দেখেন। তিনি শত্রুর নিক্ষিপ্ত তীর কুড়িয়ে কুরায়শদের পৌঁছে দিতেন যা যুদ্ধের বিশেষ একটা পন্থা। এই সুযোগে তিনি যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করেন এবং অশ্বারোহণ ও সৈনিকবৃত্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে।

এরপর বয়স যখন কিছুটা বাড়ল তখন তিনি জীবিকার্জনের দিকে মনোযোগ প্রদান করা জরুরি বিবেচনা করলেন এবং বকরী চরানোর পেশা গ্রহণ করলেন যা সেই যুগে জীবিকার্জনের একটি অভিজাত উপায় হওয়ার সাথে সাথে মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ, দুর্বল ও অভাবী লোকদের ওপর স্নেহ ও ভালবাসার প্রেরণা সৃষ্টি, অধিকন্তু স্বচ্ছ ও নির্মল বায়ুর আমেজ লাভ এবং শরীরের শক্তি ও ব্যায়ামের উপকরণও এর ভেতর পাওয়া যায়। এর থেকেও বেশি যা তা হল এটি আম্বিয়ায়ে কিরামের সুন্নাত। অনন্তর নবুওয়াত লাভের পর একবার তিনি বলেন, এমন কোন নবী গত হননি যিনি বকরী না চরিয়াছেন। জিজ্ঞাসা করা হল হে আল্লাহ্ রসূল! আপনিও? বললেন : আমিও।

তিনি এর আগেও বনী সা‘দে থাকতে আপন দুধ ভাইদের সঙ্গে বকরী চরেছিলেন, সেজন্য তিনি এ কাজের সঙ্গে একেবারে অনবহিত ও অপরিচিত

ছিলেন না। সিহাহ সিত্তা থেকে প্রমাণিত যে, মক্কায় থাকাকালে কয়েক কীরাতের বিনিময়ে (যা তিনি বকরীর মালিকদের থেকে নিতেন) তিনি বকরী চরাতেন।

হযরত খাদীজা (রা)-র সঙ্গে বিবাহ

যখন তিনি পঁচিশ বছর বয়সে উপনীত হলেন তখন হযরত খাদীজা বিনতে খুওয়ায়লিদ-এর সঙ্গে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হযরত খাদীজা কুরায়শ গোত্রের খুবই প্রভাবশালী মহিলা ছিলেন এবং বোধশক্তি, দূরদর্শিতা, মহান চরিত্র ও ব্যবহার, অধিকন্তু ধন-সম্পদের দিক দিয়েও খ্যাতনাম্নী ছিলেন। তিনি ছিলেন বিধবা। তাঁর স্বামী আবু হালা ইতোপূর্বেই ইন্তিকাল করেছিলেন। বিয়ের সময় মহানবী (স)-এর বয়স ছিল পঁচিশ বছর আর হযরত খাদীজার বয়স ছিল ৪০ বছর।

হযরত খাদীজা তেজারতী কায়কারবারও করতেন। তাঁর থাকত টাকা-পয়সা তথা পুঁজি আর অন্যদের কায়িক শ্রম। বিনিময়ে শ্রমের ফসল হিসেবে তারা পেত পারিশ্রমিক। কুরায়শরা ছিল বিরাট বণিকগোষ্ঠী। হযরত খাদীজা রসূলুল্লাহ (সা)-র সত্যবাদিতা, উত্তম আখলাক ও কল্যাণকামী আবেগ-উদ্দীপনা সম্পর্কে তাঁর সিরিয়া সফর থেকে বেশ ভালভাবেই জানতে পেরেছিলেন যখন তিনি তাঁর (খাদীজার) পণ্যসম্ভার নিয়ে বাণিজ্য উপলক্ষে সিরিয়ায় গিয়েছিলেন এবং উল্লেখিত সফরে যেসব অভাবিতপূর্ব ব্যাপার সংঘটিত হয়েছিল সে সম্পর্কেও তাঁর জানা ছিল। অনন্তর তিনি তাঁর সঙ্গে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপনে আগ্রহী হন, অথচ ইতোপূর্বে তিনি কুরায়শদের বড় বড় সর্দারের বিবাহ প্রস্তাব নামঞ্জুর করেছিলেন। তাঁর চাচা সায়্যিদুনা হামযা এই পয়গাম তাঁকে পৌঁছে দেন। আবু তালিব বিয়ের খুতবা পাঠ করেন এবং এখান থেকেই তাঁর দাম্পত্য জীবনের সূচনা ঘটে। তাঁর সন্তান ইবরাহীম ছাড়া (যাঁর

ইনতিকাল শৈশবেই হয়েছিল) আর সকলেই ছিলেন হযরত খাদীজার গর্ভজাত ।

কা‘বার নবনির্মাণ এবং একটি বিরাট ফেতনার অবসান

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বয়স তখন পয়েন্টত্রিশ বছর। কুরায়শরা নতুনভাবে কা‘বা শরীফ নির্মাণ করতে চাইল এবং এর ওপর ছাদ ঢালাইয়ের মনস্থ করল। এর আগে এর ধরন ছিল এই রকম যে, মাটি ও পাথর সঙ্গে না জুড়ে ভারী পাথর ওপরে ও তলায় রেখে দেওয়া হয়েছিল যার উচ্চতা মানুষ সমানের চেয়ে বেশি ছিল। এখন সেটা ধ্বসিয়ে আবার নতুন করে তৈরি করা দরকার ছিল। দেওয়াল যখন উঁচু করে হাজরে আসওয়াদের উচ্চতা পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছল তখন হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে কুরায়শ নেতৃবর্গের মধ্যে বিরাট মতানৈক্য দেখা দিল। প্রত্যেক গোত্রই চাচ্ছিল যে, তার গোত্রই এই সৌভাগ্য লাভ করুক এবং তারা এই পাথর উঠিয়ে তার সঠিক স্থানে স্থাপন করুক। মতানৈক্য বৃদ্ধি পেতে পেতে অবশেষে তা যুদ্ধ-বিগ্রহে উপনীত হবার উপক্রম হল। জাহিলিয়াত যুগে এর থেকে ছোটখাটো ব্যাপার নিয়েও যুদ্ধ বেঁধেছে। আর এটাতো ছিল এক বিরাট ব্যাপার!

মোটকথা, যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। বনী আবদুদ্দার রক্তে পরিপূর্ণ একটি বিরাট বারকোষ (পানির পাত্র) তৈরি করে এবং তারা ও বনু আদী আমৃত্যু যুদ্ধের পারস্পরিক প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয় এবং রক্তে পূর্ণ বারকোষে হাত ডুবিয়ে এই অঙ্গীকার আরও দৃঢ়বদ্ধ করে। এটি ছিল এক বিরাট ধ্বংস এবং এক মহাফেতনা ও বিপর্যয়ের ভূমিকামাত্র। কুরায়শরা কয়েক দিন যাবত এই সংকটের মাঝে কালক্ষেপণ করে। অতঃপর সকলেই এই বিষয়ে একমত হয় যে, যে ব্যক্তি অমুক দিন সর্বপ্রথম মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে সে এ ব্যাপারে ফয়সালা প্রদান করবে। অনন্তর সর্বপ্রথম মসজিদুল হারামের দরজা পথে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রবেশ করেন। তাঁকে প্রবেশ করতে দেখেই সবাই সমস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে, এই যে, আমাদের ‘আল-আমীন’ আসছেন! আমরা তাঁর ফয়সালায় রাজি আছি।

রাসূলুল্লাহ (সা) সকল বৃত্তান্ত শ্রবণান্তে একটি চাদর চেয়ে পাঠান। এরপর চাদর বিছিয়ে হাজরে আসওয়াদ স্বহস্তে উঠিয়ে মাঝখানে রাখেন। অতঃপর সকল গোত্রের লোকদের ডেকে চাদরের এক একটি প্রান্ত ধরে ওঠাতে বলেন। সকলেই এ নির্দেশ পালন করল। এরপর যখন পাথরটি স্থাপনের জায়গার কাছাকাছি নেয়া হল তখন তিনি তা নিজ হাতে উঠিয়ে যথাস্থানে বসিয়ে দিলেন। অতঃপর বাকি

ইমারত নির্মিত হয়।

এভাবেই রাসূলুল্লাহ (সা) কুরায়শদেরকে এক বিরাট রক্তপাতের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলেন। এ ব্যাপারে তিনি যে জ্ঞান ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেন এর থেকে বড় আর কিছু হতে পারে না। নবুওয়াত লাভের পর তিনি সমগ্র মানব সমাজ ও বিশ্বের সকল জাতিগোষ্ঠীকে যেভাবে যুদ্ধের অনলকুণ্ড থেকে মুক্তি দেন এই ঘটনা ছিল যেন তারই ভূমিকা ও শুভ সূচনা এবং তাঁর বোধশক্তি ও বিচক্ষণতা, সর্বোত্তম শিক্ষা-মালা, নম্রতা ও স্নেহার্দ্রতা এবং বিবাদ-বিসংবাদের অবসান ও সমঝোতা স্থাপনের মুখপাত্র ও মশালবাহী। এ ছিল তাই যা তাঁকে রাহমাতুল্লিল-‘আলামীনের মহামর্যাদায় অভিষিক্ত করেছিল এবং তিনি সেই সহজ সরল ও নিরক্ষর জাতিগোষ্ঠীর সেই সব যুদ্ধবাজ ও পরস্পরের খুনপিয়াসী গোত্রের জন্য ‘নবীয়ে রহমত’ তথা দয়ার নবী করুণার ছবি প্রমাণিত হন।

হিলফুল-ফুযুল

রাসূলুল্লাহ (সা) হিলফুল-ফুযুল-এ শরীক থাকেন যা ছিল আরবদের সবচে’ অভিজাত ও মহানুভবতামূলক পারস্পরিক চুক্তি। এর বিবরণ এই যে, যাবীদ নামক স্থানের এক লোক মক্কায় কিছু বাণিজ্যিক পণ্য নিয়ে আসে এবং কুরায়শদের অন্যতম সর্দার ‘আস ইবনে ওয়ায়েল এসব পণ্য খরিদ করে। কিন্তু সে এসব পণ্যের মূল্য পরিশোধ করেনি। লোকটি তখন কুরায়শ নেতৃবর্গের নিকট সাহায্যপ্রার্থী হয়। কিন্তু আস ইবনে ওয়ায়েলের সামাজিক মর্যাদা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে তারা তাকে সাহায্য-সহায়তা প্রদানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে এবং ভালমন্দ বলে তাকে ফিরিয়ে দেয়। এরপর যাবীদ-এর লোকটি মক্কার লোকদের নিকট ফরিয়াদ জানায় এবং প্রত্যেক উৎসাহদীপ্ত, সাহসী ও ইনসাফের সমর্থক যার সঙ্গেই দেখা মিলেছে অভিযোগ পেশ করেছে। শেষাবধি ঐসব লোকের ভেতর আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধ জেগে ওঠে এবং তারা সকলে মিলে আবদুল্লাহ ইবনে জাদআনের ঘরে একত্র হয়। তিনি তাদের সকলকে দাওয়াত ও যিয়াফত করেন। এরপর তারা আল্লাহর নামে এই অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয় যে, তারা সবাই জালিমের মোকাবিলায় ও মজলুমের সাহায্য-সমর্থনে ‘একদেহ একপ্রাণ’ হয়ে থাকবে এবং একত্রে মিলে কাজ করবে যতক্ষণ না জালিম মজলুমের হক প্রদান করে। কুরায়শরা এই অঙ্গীকারের নাম দেয় ‘হিলফুল ফুযুল’ অর্থাৎ ফুযুলের অঙ্গীকার এবং বলতে থাকে যে, তারা একটা অতিরিক্ত কাজে, যা তাদের দায়িত্বের আওতায় পড়ে না,

হস্তক্ষেপ করেছে। এরপর তারা সকলে মিলে আস ইবন ওয়ায়েল-এর নিকট গমন করে এবং যাবীদীর পণ্য-দ্রব্যাদি তার নিকট থেকে যবরদস্তী গ্রহণপূর্বক তাকে ফেরত দেয়।

রাসূলুল্লাহ (সা) এই অঙ্গীকারে খুবই খুশী হয়েছিলেন এবং নবুওয়াত প্রাপ্তির পরও তিনি এর প্রশংসা করেন এবং বলেন, আবদুল্লাহ ইবন জাদআন-এর ঘরে আমি এমন একটি অঙ্গীকারে শরীক ছিলাম যার ভেতর সেই নামে ইসলামের পর আজও যদি আমাকে আহ্বান করা হয় তবে আমি তাতে সাড়া দেবার জন্য তৈরি আছি। তারা এ ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিল যে, তারা হকদারকে তার হক পৌঁছে দেবে এবং এই শপথেও আবদ্ধ হয়েছিল যে, কোন জালিম মজলুমদের ওপর প্রাধান্য লাভ করতে পারবে না।

আরব উপদ্বীপের অবস্থা এবং জাযীরার ধর্মীয়, সভ্যতা ও সংস্কৃতিগত ও রাজনৈতিক কেন্দ্র (মক্কা মুকাররমার) অবস্থানসমূহের ওপর দৃষ্টি ক্ষেপণকারী জানেন যে, এই শপথের ওপর বিবেকবান লোকদের প্রস্তুতির কারণ কেবল কোন ব্যক্তি কিংবা কয়েকজন লোকের হক নষ্ট হওয়ার পরিণতি ছিল না, বরং এর শক্তিশালী কার্যকারণ ছিল অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা, অশান্তি, নীতিহীনতা ও বেআইনী কার্যকলাপের সেই অবস্থা যা মক্কা ও তার আশেপাশে বিরাজ করছিল। অধিকন্তু এর আরও একটি কার্যকারণ ছিল শান্তি ও সংহতির, বিশেষত ফুজ্জার যুদ্ধের পর প্রয়োজন, মানুষের অধিকারের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা এবং মক্কায় আগত ব্যবসায়ী বনিক ও কারিগরদের হেফাজত ও সাহায্য-সমর্থনের গুরুত্বের অনুভূতি।

অনিশ্চিত অস্থিরতা

রাসূলুল্লাহ (সা) নিজের ভেতর এক ধরনের অদৃশ্য ও অনিশ্চিত অস্থিরতা অনুভব করতেন যার কারণ ও উৎস এবং যার ভবিষ্যৎ ও পরিণতি তাঁর জানা ছিল না। তাঁর মনে এ কথা কখনো ভুলেও জাগত না যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে ওয়াহী ও রিসালাত দ্বারা সরফরায করতে যাচ্ছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

“এভাবে আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ (ওয়াহী) করেছি রুহ তথা আমার নির্দেশ! তুমি তো জানতে না কিতাব কি এবং ঈমান কি। পক্ষান্তরে আমি একে করেছি আলো যদ্দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হেদায়াত (পথ-নির্দেশ) করি; তুমি তো প্রদর্শন কর সরল পথ” (সূরা শূরা : ৫২ আয়াত)।

“তুমি আশা কর নি যে, তোমার ওপর কিতাব অবতীর্ণ হবে। এতো কেবল তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। সুতরাং তুমি কখনো কাফেরদের সহায় হয়ো না” (সূরা কাসাস, ৮৬ আয়াত)।

আল্লাহ তা‘আলার খাস হেকমত ও প্রশিক্ষণ ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর লালন-পালন নিরক্ষর হিসাবে হয়। তিনি না পড়তে পারতেন, না লিখতে জানতেন। এভাবেই তিনি ইসলামের শত্রুদের অপবাদ আরোপ ও মিথ্যাচার থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেন এবং নিরাপদ থাকেন। কুরআন মজীদ এ কথার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন :

“তুমি এর আগে কিতাব পাঠ করনি এবং স্বহস্তে কোন কিতাব লেখ নি যে, মিথ্যাচারীরা সন্দেহ পোষণ করবে” (সূরা আনকাবুত : ৪৮ আয়াত)।

কুরআন মজীদ এজন্যই তাঁকে ‘উম্মী’ (নিরক্ষর) উপাধি দিয়েছে। বলা হয়েছে :

“যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক নিরক্ষর নবীর, যার উল্লেখ তাওরাত ও ইনজীল, যা তাদের নিকট আছে, তাতে লিখিত পায়” (সূরা আ‘রাফ : ১৫৭ আয়াত)।