বদর যুদ্ধ : দ্বিতীয় হিজরী
বদর যুদ্ধের গুরুত্ব
হিজরতের দ্বিতীয় বছর রমযান মাসে বদরের সেই চূড়ান্ত ইতিহাস সৃষ্টিকারী যুদ্ধ সংঘটিত হয় যে যুদ্ধে মুসলিম উম্মাহর ভাগ্য ও দাওয়াতে হকের ভবিষ্যতের ফয়সালা হয় যার ওপর গোটা মানব জাতির ভাগ্য নির্ভর করছিল।
এরপর থেকে আজ পর্যন্ত মুসলমানরা যত বিজয় ও সাফল্য অর্জন করেছে, তাদের আজ পর্যন্ত যতগুলো সাম্রাজ্য কায়েম হয়েছে, তার সবগুলোই এই প্রকাশ্য ও অবধারিত বিজয়েরই কাছে ঋণী যা বদর প্রান্তরে সেই মুষ্টিমেয় দল লাভ করেছিল। এজন্যই আল্লাহ তা’আলা এই যুদ্ধকে “ইয়াওমুল-ফুরকান” বা ফয়সালার দিন বলে আখ্যায়িত করেছেন।

“যদি তোমাদের বিশ্বাস থাকে আল্লাহর ওপর এবং সে বিষয়ের ওপর যা আমি আমার বান্দার ওপর অবতীর্ণ করেছি ফয়সালার দিনে যে দিন সম্মুখীন হয়ে যায় সেনাদল” (সূরা আনফাল, ৪১ আয়াত)।
এই যুদ্ধের পশ্চাৎবর্তী কারণ হল : রাসূলুল্লাহ (সা) অবগত হন যে, আবু সুফিয়ান সিরিয়া থেকে কুরায়শদের এক বিরাট তেজারতী কাফেলা নিয়ে মক্কা যাচ্ছে। কাফেলায় প্রচুর মালমাতা ও দ্রব্যসামগ্রী রয়েছে। এ ছিল এমন এক সময় যখন মুসলমান ও মক্কার মুশরিকদের সাথে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ চলছিল এবং কুরায়শরা ইসলামের ক্রমবর্ধমান শক্তির মোকাবিলা, সত্যের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং মুসলমানদের জন্য বিভিন্ন রকমের অসুবিধা সৃষ্টি করতে চেষ্টার কোন ত্রুটি করেনি। তারা এজন্য তাদের সকল ধন-সম্পদ ও উপায়-উপকরণ, সমরোপকরণ ও জরুরী আসবাবপত্র ওয়াকফ করে রেখেছিল এবং তাদের সামরিক বাহিনী মদীনার সীমান্ত ও চারণক্ষেত্রগুলো পর্যন্ত পৌঁছে যেত।
রাসূলুল্লাহ (সা) যখন জানতে পারলেন যে, আবু সুফিয়ান, ইসলামের নিকৃষ্টতম দুশমন, এত বড় এক বিরাট কাফেলাসহ আসছে তখন তিন লোকদেরকে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তাদের মুখোমুখি হতে নির্দেশ দিলেন। কিন্তু এর জন্য তিনি খুব বেশি ব্যবস্থা ও চিন্তা-ভাবনা করেননি এজন্য যে, আর যা-ই হোক এটি একটি বাণিজ্যিক কাফেলা বৈ তো নয়, কোন সামরিক অভিযানে বহির্গত সেনাদল তো নয়।
ওদিকে আবূ সুফিয়ান সংবাদ পেলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এই কাফেলার মোকাবিলার জন্য মদীনা থেকে রওয়ানা হয়েছেন তখন তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তার দূত মক্কায় পাঠান এবং কুরায়শদের নিকট এই মর্মে ফরিযাদ জানান যে, তারা যেন তাঁর সাহায্যার্থে এগিয়ে আসে এবং মুসলমানদেরকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার পথে বাধা দেয়। আবূ সুফিয়ানের এই ফরিযাদ মক্কায় পৌঁছতেই কুরায়শরা পূর্ণ সমর প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করে এবং খুব দ্রুততার সঙ্গে এক বিপুল বাহিনী নিয়ে মোকাবিলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। কুরায়শ নেতৃবর্গের মধ্যে এমন কোন নেতা ছিল না যে এতে শরীক ছিল না। তারা পার্শ্ববর্তী সকল গোত্রকেই এতে শরীক করে। কুরায়শদের বিভিন্ন শাখার লোক এতে শামিল ছিল। এমন কেউ ছিল না যে এতে শরীক না হয়েছে। এই বাহিনী বিরাট জাঁকজমক, অহঙ্কার, ক্রোধ ও প্রতিশোধমূলক আবেগ-উত্তেজনা সহ রওয়ানা হয়।
আনসারদের প্রস্তাব এবং তাঁদের আনুগত্য ও প্রাণোৎসর্গ
রাসূলুল্লাহ (সা) যখন জানতে পারলেন যে, কুরায়শদের এক বিরাট বাহিনী রওয়ানা হয়েছে তখন তিনি সাথী সাহাবীদেরকে নিয়ে পরামর্শ করলেন। সে সময় তাঁর মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল আনসারদের দিকে। এজন্য যে, তিনি আনসারদের থেকে এই মর্মে বায়’আত গ্রহণ করেছিলেন যে, তাঁরা মদীনায় তাঁকে পূর্ণ হেফাজত ও সাহায্য করবেন। মদীনা থেকে রওয়ানা হওয়ার সময় তিনি এটা জানতে চান যে, এই মুহূর্তে আনসাররা কী চিন্তা করছে? সর্বাগ্রে মুহাজিররা নিজেদের কথা বললেন এবং খুব ভালোভাবে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে নিজেদের সমর্থনের নিশ্চিত আশ্বাস দিলেন। তিনি পুনর্বার পরামর্শ কামনা করলেন। মুহাজিরগণ পুনরায় তাঁকে সমর্থন দান করেন। এরপর তিনি যখন তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন তখন আনসারগণ বুঝতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জিজ্ঞাসার লক্ষ্য আনসারদের দিকে। অনন্তর হযরত সা’দ ইবন মু’আয (রা) তাৎক্ষণিক জওয়াব দান করেন এবং আরজ করেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! সম্ভবত আপনার কথার লক্ষ্যবস্তু আমরা এবং আপনি আমাদের কথা শুনতে চাচ্ছেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ! খুব সম্ভব আপনার এই ধারণা হচ্ছে যে, আনসাররা তাদের স্বদেশে ও নিজেদের ভূখণ্ডে আপনাকে সাহায্য করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। আমি আনসারদের পক্ষে থেকে বিনীত নিবেদন পেশ করছি এবং তাদের পক্ষ থেকে বলছি যে, আপনি যেখানে খুশি চলুন, যার সঙ্গে ইচ্ছা সম্পর্ক স্থাপন করুন এবং যার সঙ্গে ইচ্ছা সম্পর্ক ছিন্ন করুন, আমাদের ধন-সম্পদ যত খুশি গ্রহণ করুন এবং যত খুশি
আমাদেরকে দান করুন আর তা এজন্য যে, আপনি যা-ই কিছু গ্রহণ করবেন তা আপনি যা পরিত্যাগ করবেন তার তুলনায় আমাদের নিকট বেশি প্রিয় হবে। আপনি যা হুকুম করবেন আমরা তা অবনত মস্তকে মেনে নেব। আল্লাহর কসম! আপনি যদি চলা শুরু করেন, এমন কি “বারকু গামাদান” পর্যন্তও পৌঁছে যান তবু আমরা আপনার সঙ্গে চলতে থাকব। আল্লাহর কসম করে বলছি, আপনি যদি এই সমুদ্রেও প্রবেশ করেন সে ক্ষেত্রে আমরাও আপনার সঙ্গে সমুদ্রেই ঝাঁপিয়ে পড়ব।
হযরত মিকদাদ (রা) বললেন: আমরা আপনাকে তেমন কথা বলব না যে কথা মূসা (আ)-র কওম তাঁকে বলেছিল:

“যাও, তুমি ও তোমার রব উভয়ে মিলে যুদ্ধ কর, আমরা এখানেই বসে থাকব।” আমরা তো আপনার ডাইনে লড়ব, বামে লড়ব, আপনার সামনে লড়ব এবং আপনার পেছনেও লড়ব।
রাসূলুল্লাহ (সা)-র চেহারা এতদ্শ্রবণে আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সাহাবাদের মুখ থেকে উচ্চারিত এসব কথায় তিনি খুবই খুশি হন। এরপর তিনি সকলকে লক্ষ্য করে বলেন: سيروا وابشروا “চল এবং সুসংবাদ গ্রহণ কর।”
জিহাদ ও শাহাদাতের প্রতি বালকদের আগ্রহ
মুহাজিরবৃন্দ বদর প্রান্তরের দিকে রওয়ানা হলে উমায়র ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা) নামক এক বালক, যাঁর বয়স তখন ষোল বছর, মুজাহিদদের সঙ্গে রওয়ানা হন। তাঁর ভয় ছিল, না জানি রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে অল্পবয়স্ক ভেবে ফেরত দেন। এজন্য তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চোখে ধরা পড়া থেকে বাঁচতে লুকিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হযরত সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা) তাঁকে লুকিয়ে বেড়াবার কারণ জিজ্ঞেস করায় তিনি তাঁর ভয়ের কথা, আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেন এবং বলেন, আমি এই জিহাদে শরীক হতে চাই। সম্ভবত আল্লাহ তা’আলা
আমাকে ও শাহাদাত দান করবেন। তাঁর আশঙ্কাই অবশেষে সত্য হয়ে দেখা দিল। রাসূলুল্লাহ (সা) এই ধারণায় যে, সে এখনও যুদ্ধের বয়সে পৌঁছেনি, তাঁকে ফেরত পাঠাতে চান। এতে তিনি কাঁদতে থাকেন। এতদ্দৃষ্টে রাসূলুল্লাহ (সা) অভিভূত হন এবং তাঁকে যুদ্ধে অংশ গ্রহণের অনুমতি প্রদান করেন। অনন্তর তিনি এই যুদ্ধেই শাহাদাত লাভ করেন এবং আপন উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছান।
মুসলমান ও কাফিরদের মধ্যে সামরিক শক্তির পার্থক্য
রাসূলুল্লাহ (সা) দ্রুতবেগে যুদ্ধ ময়দানের দিকে রওয়ানা হলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল ৩১৩ জন মুসলমান। সমরোপকরণের স্বল্পতা এর থেকেই অনুমান করা যাবে যে, মুসলিম মুজাহিদদের নিকট কেবল দু’টি ঘোড়া ও সত্তরটি উট ছিল। এক একটি উটের পিঠে দু’জন তিনজন করে পালাক্রমে বসেছিলেন। এ ক্ষেত্রে কি সেনাপতি আর সাধারণ সৈনিক, অফিসার কিংবা অধীনস্থ সেপাইয়ের কোনরূপ পার্থক্য ছিল না। এমতরূপ ব্যবস্থাপনার মধ্যে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) নিজে হযরত আবূ বকর, ওমর (রা) ও বিশিষ্ট সাহাবায়ে কিরাম সকলেই শরীক ছিলেন।
জিহাদের সাধারণ পতাকা (اللواء) মুস‘আব ইবন উমায়র(রা)-কে, মুহাজিরদের পতাকা (راية) হযরত আলী (রা) এবং আনসারদের পতাকা হযরত সা’দ ইবন মু’আয (রা)-কে প্রদান করা হয়।
আবূ সুফিয়ান যখন জানতে পেলেন যে, মুসলিম বাহিনী রওয়ানা হয়ে গেছে তখন তিনি নিম্ন সমুদ্রউপকূলের দিকে গমন করেন এবং এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত্ত হয়ে যে, এখন আর তার কোনরূপ ভয়-ভীতির আশঙ্কা নেই আর কাফেলাও নিরাপদ, কুরায়শদেরকে এই পয়গাম পাঠান, তোমরা এখন ফিরে যাও। যে কাফেলার নিরাপত্তা বিধানের জন্য তোমরা এসেছিলে সে উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে গেছে। এতদ্শ্রবণে মক্কী বাহিনীর লোকজন ফিরে যেতে চাইল, কিন্তু আবূ জেহেল ফিরে যেতে অস্বীকার করল এবং অন্যদেরকেও ফিরতে বাধা দিল। সে যুদ্ধ ব্যতিরেকে ফিরে যেতে কিছুতেই প্রস্তুত ছিল না। কুরায়শ ফৌজের সংখ্যা ছিল এক হাজারের ওপর আর এর মধ্যে নির্বাচিত সমস্ত বড় সর্দার, যুদ্ধবাজ যুবক, সমীহ করার মত স্বীকৃত ঘোড়সওয়ার এবং অভিজ্ঞ সিপাহী শামিল ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) এতদ্দৃষ্টে বলেন: মক্কা তার সমস্ত কলিজার টুকরোগুলোকে আজ তোমাদের সামনে নিক্ষেপ করেছে।
পরামর্শের গুরুত্ব
কুরায়শ বাহিনী বদর প্রান্তরে পৌঁছে উপত্যকার একদিকে ছাউনি ফেলল আর মুসলমানরা শিবির স্থাপন করল অপরদিকে। এরই মাঝে হযরত হুবাব ইবনুল-মুনযির (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে হাজির হলেন এবং আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই মনযিল, আমরা যে শিবির স্থাপন করেছি তা কি আল্লাহ তা’আলার নির্দেশে যার মধ্যে কোন প্রকার রদবদল আমাদের জন্য অনুমোদিত নয়, নাকি এ সিদ্ধান্ত সামরিক কর্মকৌশল, তদবীর ও কুশলী ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ না, এতো কৌশল ও বুদ্ধিমত্তার ব্যাপার আর এ ক্ষেত্রে শত্রুর চোখে ধূলো দেবার সকল ব্যবস্থাই অবলম্বন করা যেতে পারে। তিনি বললেনঃ তাহলে হে আল্লাহর রাসূল! আমি বিনীত নিবেদন পেশ করব যে, এখানে শিবির স্থাপন সেই দৃষ্টিকোণ থেকে উপযোগী নয়। তিনি অন্য এক জায়গা চিহ্নিত করলেন যা যুদ্ধের জন্য অধিকতর উপযোগী ও অনুকূল ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ তুমি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত কথা বলেছ। এরপর তিনি তাঁর সকল সঙ্গী-সাথীকে নিয়ে সেদিকে চললেন এবং সেখানে অবস্থান গ্রহণ করলেন। জায়গাটা ছিল পানির কাছাকাছি।
রাসূলুল্লাহ (সা) ও সাহাবায়ে কিরাম (রা) রাত্রি পর্যন্ত সর্বাগ্রে পানির কাছে পৌঁছে গেলেন এবং এর হাওয তৈরি করলেন। তিনি কাফিরদেরকেও এর থেকে পানি পানের অনুমতি দিলেন।
এই রাত্রে আল্লাহ বৃষ্টির ব্যবস্থাও করে দিলেন যা কাফির মুশরিকদের জন্য দুর্ভোগ ও দুরবস্থা ডেকে আনল। ফলে তাদের অগ্রযাত্রা থেমে গেল। মুসলমানদের জন্য এই বৃষ্টি রহমতের বারিধারা হিসাবে প্রমাণিত হল যে বৃষ্টি প্রান্তরের বালুকণাগুলোকে আরও বেশি শক্ত ও দৃঢ় করে দিল এবং তাদের অন্তর-মানস শান্ত ও ভয়শূন্যতা দ্বারা পূর্ণ করলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

“আর তিনি তোমাদের ওপর আকাশ থেকে পানি অবতরণ করেন যাতে তোমাদেরকে পবিত্র করে দেন এবং যাতে তোমাদের থেকে অপসারিত করে দেন
শয়তানের অপবিত্রতা আর যাতে সুরক্ষিত করে দিতে পারেন তোমাদের পাগুলো” (সূরা আনফাল, ১১ আয়াত)।
সিপাহসালার হিসাবে রাসূলুল্লাহ (সা)
এ সময় তিনি অস্বাভাবিক ও অতুলনীয় নেতৃত্বসুলভ যোগ্যতা (তাঁর চিরন্তন ও বিশ্বজয়ী রিসালাতের সঙ্গে যা সাদৃশ্যপূর্ণ, এ সবের বুনিয়াদ এবং ইলহাম ও হেদায়েতের উৎস), পূর্ণ উজ্জ্বল্য ও প্রভাবের সঙ্গে দেদীপ্যমান ছিলেন। তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ কাতারবন্দী ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, বিপদ ও আকস্মিক হামলা রোধের কৌশল, শত্রুর সামরিক শক্তি, তাদের সৈন্যসংখ্যা, ছাউনি ও বিভিন্ন প্লাটূনের অবস্থানের সঠিক পরিমাপ, এগুলো ছিল সেই সব জিনিস যেগুলো থেকে তাঁর অস্বাভাবিক সামরিক মেধার পরিমাপ করা যায়। এর প্রয়োজনীয় বিস্তৃত বিবরণ সীরাত গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে।
সমর প্রস্তুতি
মহানবী (সা)-এর জন্য যুদ্ধক্ষেত্রের সামনে একটি টিলার ওপর ছাউনি ফেলা হয়। এরপর তিনি ময়দানে গমন করেন এবং জায়গায় জায়গায় হাত দিয়ে ইশারায় বলতে থাকেন, ইনশাআল্লাহ এখানে অমুক মারা যাবে, এখানে অমুকের পতন হবে, এই স্থানে অমুক নিহত হবে। অনন্তর একটি জায়গায়ও এর বিপরীত ঘটেনি, তিনি যা বলেছিলেন তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়, এতটুকু এদিক ওদিক হয়নি। যে জায়গা তিনি চিহ্নিত করেছিলেন তার আদৌ হেরফের হয়নি।
উভয় বাহিনী সামনাসামনি হতেই রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন : আল্লাহ! এই কুরায়শ-এর লোকেরা আজ পূর্ণ অহঙ্কার ও গর্বভরে এসেছে। এরা তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায় এবং তোমার রাসূলকে মিথ্যা সাব্যস্ত করছে।’
রাতটা ছিল জুমু’আর এবং রমযানের ১৭ তারিখ। ভোর হতেই কুরায়শ বাহিনী সর্বপ্রকার সামরিক অস্ত্রে সজ্জিত অবস্থায় ময়দানে এসে হাযির হয় এবং পরস্পর পরস্পরের মুখোমুখি অবস্থান গ্রহণ করে।
দরবারে ইলাহীতে কান্নাকাটি, দু‘আ ও মুনাজাত
রাসূলুল্লাহ (সা) কাতার ঠিক করেন। এরপর তিনি ‘আরীশে প্রত্যাবর্তন করেন। সাথে হযরত আবূ বকর (রা)-ও ছিলেন। এরপর তিনি আল্লাহর দরবারে
কান্নাকাটি, দু‘আ ও মুনাজাত পেশের ব্যাপারে কোনরূপ কার্পণ্য করেননি। তিনি বেশ ভালই জানতেন যে, আজ যদি মুসলমানদের ভাগ্যের ফয়সালা সংখ্যা ও শক্তির ওপর নির্ভর করে হয় তাহলে এর ফল কী দাঁড়াবে। এ সেই ফল যা কোন শক্তিশালী, শক্তিধর ও বিরাট জামা’আতের মোকাবিলায় কমযোর ও স্বল্প সংখ্যার অধিকারী দলের ক্ষেত্রে সর্বদা ঘটে থাকে। তিনি যখন নিক্তির উভয় পাল্লার দিকে দৃষ্টি ক্ষেপণ করলেন তখন পরিষ্কার দেখতে পেলেন যে, কাফির-মুশরিকদের পাল্লা ভারী। উভয়ের মাঝে কোন তুলনাই চলে না। তিনি মুসলমানদের পাল্লার ওপর সেই প্রস্তর খণ্ডটি স্থাপন করলেন যার ফলে মুসলমানদের পাল্লা আকস্মিকভাবেই ভারী হয়ে গেল। তিনি মহান শাহানশাহ রাজাধিরাজের দরবারে আপন ফরিয়াদ পেশ করলেন এবং তাঁর সাহায্য-সমর্থনের প্রার্থী হলেন যাঁর ফয়সালা ও নির্দেশ কেউ উপেক্ষা করতে পারে না, পারে না টলিয়ে দিতে। তিনি এই ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনীর (যে বাহিনী সর্বপ্রকার সাজ-সরঞ্জাম থেকে ছিল বঞ্চিত) অনুকূলে আল্লাহ তা‘আলার নিকট সুপারিশ করলেন। তিনি বললেন :

“হে আল্লাহ! যদি তুমি এই ক্ষুদ্র জামা‘আতটিকে ধ্বংস করে দাও তাহলে দুনিয়ার বুকে তোমার ইবাদত করবার কেউ থাকবে না।” তিনি আত্মবিস্মৃত প্রায় ও বেকারার অবস্থায় আল্লাহ তা‘আলার দরবারে দু‘আ করছিলেন আর বলছিলেন :

“হে আল্লাহ! তুমি আমাকে যার প্রতিশ্রুতি দিয়েছ তা পূর্ণ কর। আল্লাহ! আমি তোমার সাহায্য চাই; তোমার সাহায্য আমার প্রয়োজন।”
তিনি তাঁর দু’হাত উঠিয়ে দু‘আ করছিলেন, এমন কি তাঁর পবিত্র কাঁধ থেকে চাদর গড়িয়ে পড়ে। হযরত আবূ বকর (রা) তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন এবং আশ্বস্ত করছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর এত বেশী ক্রন্দন ও বেকারার অবস্থা দেখতে ও সইতে পারতেন না।
উম্মতের সঠিক পরিচয় এবং তার আসল অবস্থান ও পয়গাম নির্ধারণ
রাসূলুল্লাহ (সা) সেই সব কতিপয় পবিত্রাত্মার জন্য এই নাযুক ও সঙ্কটময় মুহূর্তে যেই সংক্ষিপ্ত শব্দসহকারে দু‘আ করেছেন তার ভেতর তাঁর চিত্তমুগ্ধকারক
মিষ্ট বচন ও আস্থা, অশান্ত ও অস্থিরচিত্ততা, আত্মিক প্রশান্তি ও তৃপ্তি এবং নম্রতা ও বিনয়ের সমস্ত দিক একই সঙ্গে মুক্ত ও বিকশিত ছিল। এটাই এই উম্মতের সঠিক ও সর্বোত্তম পরিচয়, পৃথিবীর জাতিগোষ্ঠীসমূহের মাঝে তার আসল অবস্থানগত মর্যাদা ও পয়গাম এবং দুনিয়ার বাজারে মূল্য, উপকারিতা ও প্রয়োজনীয়তার পূর্ণ বিশ্লেষণ ও নির্দিষ্টকরণসহ চিহ্নিতকরণ এবং এ কথার প্রকাশ ও ঘোষণা ছিল যে, এই উম্মত যেই সীমান্ত ও যুদ্ধক্ষেত্রের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানে আদিষ্ট ছিল তা ছিল আল্লাহর দিকে দাওয়াত প্রদান এবং ইখলাসের সাথে তাঁর ইবাদত ও পরিপূর্ণ অনুসরণের ক্ষেত্রে।
এই ফাতহুম-মুবীন বা অবধারিত ও সুস্পষ্ট বিজয় (যা সর্বপ্রকার আন্দায-অনুমান ও অভিজ্ঞতাকে ভুল প্রমাণিত করে) তাঁর সেই সব বাণীসমষ্টির ওপর চিরদিনের জন্য সমর্থনসূচক মোহর মেরে দেয় এবং এর বাস্তব ও কার্যকর প্রমাণ দেয় যে, তাঁর এ কথা হরফে হরফে সঠিক ছিল। আর এই উম্মাহর সঠিক, সত্য ও উজ্জ্বল চিত্র এটাই।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) সেনাবাহিনীর সামনে তশরীফ নিলেন এবং তাদেরকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও শাহাদাত লাভের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেন। ইতোমধ্যে উৎবা ইবন রবী‘আ, ভ্রাতা শায়বা ও পুত্র ওয়ালীদ সামনে অগ্রসর হল এবং কাতারের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর তারা প্রতিদ্বন্দ্বী আহ্বান করল। এর জবাবে আনসারদের মধ্যে থেকে তিনজন যুবক দাঁড়িয়ে গেল। তাঁদের দেখে তারা জিজ্ঞেস করলঃ তোমরা কারা? তাঁরা জানালেনঃ আমরা আনসার। বললঃ তোমরা শরীফ মানুষ বটে, তবে আমাদের সমপর্যায়ের নও। আমাদের মোকাবিলায় আমাদের ভাই-ভাতিজা (কুরায়শ)-দের মধ্যে থেকে কাউকে পাঠাও। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ উবায়দা ইবনুল-হারিছ, হামযা ও আলী (রা)! ওদের মোকাবিলায় তোমরা তিনজন অগ্রসর হও। এদেরকে দেখে তারা আশ্বস্ত হল এবং বললঃ হ্যাঁ, এবার আমাদের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী মিলেছে। এরা আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বটে।
সর্বপ্রথম এঁদের মধ্যে থেকে প্রবীণতম হযরত ‘উবায়দা ইবনুল’-হারিছ চীৎকার করে উৎবাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করলেন। হযরত হামযা (রা) শায়বাকে এবং হযরত ‘আলী (রা) ওয়ালীদ ইবন উৎবাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করলেন। অতঃপর হযরত হামযা ও ‘আলী (রা) আপন আপন প্রতিদ্বন্দ্বীকে মুহূর্তের মধ্যেই ধরাশায়ী ও নিহত করেন। হযরত উবায়দা (রা) ও উৎবার মধ্যে কিছুক্ষণ যুদ্ধ চলে। কিন্তু চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ঘটতে বিলম্ব হচ্ছিল বিধায় হযরত হামযা ও হযরত আলী (রা) স্ব স্ব
তলোয়ার হস্তে উৎবার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তাকে হত্যা করেন। অতঃপর আহত হযরত উবায়দা (রা)-কে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উঠিয়ে আনেন। আঘাত মারাত্মক ছিল বিধায় কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
যুদ্ধের সূচনা
এর পরপরই উভয় বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হয় এবং যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এ সময় মুসলমানদেরকে লক্ষ্য করে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ অগ্রসর হও সেই জান্নাতের দিকে যার প্রশস্ততা আসমান-যমীন সমান।
প্রথম শহীদ
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর যবান মুবারকে এ কথা উচ্চারিত হতেই হযরত উমায়র ইবনুল-হুमाम আনসারী (রা) বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেই জান্নাত কি আসমান ও যমীন সমান? তিনি বললেন, হ্যাঁ। এতে উমায়র (রা) বলে উঠলেনঃ বাহ! বাহ! রাসূলুল্লাহ (সা) তখন তাকে লক্ষ্য করে বললেন : এ তুমি কী বলছ? উমায়র (রা) বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! না, অন্য কিছু নয়। আমি এই ধারণার বশে বলছি যাতে এই জান্নাত আমার ভাগ্যে জুটে যায়। তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি এই জান্নাত লাভ করবে। এরপর উমায়র (রা) তাঁর তূণীর থেকে কিছু খেজুর বের করলেন এবং খেতে লাগলেন। এরপর হঠাৎ করেই বলে উঠলেনঃ যদি আমি এই খেজুরগুলো শেষ হওয়া অবধি অপেক্ষা করি তাহলে অনেক বেশি দেরী হয়ে যাবে। এতক্ষণ বেঁচে থাকার মত ধৈর্য আমার নেই। এই বলে অবশিষ্ট খেজুরগুলো তিনি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং শহীদ হয়ে গেলেন। বদর যুদ্ধে তিনিই ছিলেন প্রথম শহীদ।
অপরদিকে মুসলিম মুজাহিদবৃন্দ কাতারবন্দী অবস্থায় সীসা ঢালা প্রাচীরের মতোই কাফির বাহিনীর মোকাবিলায় দাঁড়িয়েছিলেন। ধৈর্য ও দৃঢ়তার তাঁরা প্রতিমূর্তি, দিল তাঁদের আল্লাহর স্মরণে মশগুল, আর যবান তাঁরই যিকর ও তাসবীহ পাঠে সিক্ত। রাসূলুল্লাহ (সা) পূর্ণরূপে যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি ছিলেন শত্রুর সবচেয়ে কাছাকাছি এবং তাঁর চেয়ে বেশি বীর বাহাদুর সে সময় আর কাউকে চোখে পড়ত না। আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদের সাহায্যের জন্য ফেরেশতা প্রেরণ করেন এবং তাঁরা মুশরিকদেরকে তছনছ করে ছাড়েন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

“আর স্মরণ কর, যখন তোমার প্রভু-প্রতিপালক নির্দেশ দান করেন ফেরেশতাদেরকে যে, আমি সাথে আছি তোমাদের। সুতরাং তোমরা মুসলমানদের অবিচলিত রাখ; আমি কাফিরদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করে দেব। সুতরাং তাদের গর্ দানের ওপর আঘাত হান এবং আঘাত হান তাদের সর্বাঙ্গে” (সূরা আনফাল, ১২ আয়াত)।
জিহাদের প্রতি আগ্রহ এবং শাহাদাত লাভের ব্যাপারে ভ্রাতৃ প্রতিযোগিতা
আজ প্রতিযোগিতা চলছিল শাহাদাতের মাধ্যমে অনন্ত সৌভাগ্য লাভের ব্যাপারে আর এ প্রতিযোগিতা চলছিল রক্ত সম্বন্ধীয় ভাই এবং হৃদয়ের গভীর বন্ধনে আবদ্ধ বন্ধুদের মধ্যে। হযরত আব্দুর রহমান ইবন ‘আউফ (রা) বর্ণনা করেন, বদর যুদ্ধে আমি আমার বাহিনীর মধ্যে অবস্থান করছিলাম। এমন সময় হঠাৎ চোখ তুলতেই দেখতে পেলাম আমার ডাইনে ও বামে দু’জন অল্পবয়স্ক তরুণ। এ দু’জন তরুণকে দেখে আমি খুব আশ্বস্ত হতে পারলাম না। আমি চিন্তা করছিলাম। এমন সময়ে তরুণ দু’জনের একজন তার সাথীর অগোচরে আমার কানের কাছে এসে চুপিসারে বললঃ চাচা! আমাকে একটু আবূ জেহেলকে দেখিয়ে দিন। আমি বললাম : তাকে তোমার কি দরকার? সে বললঃ আমি আল্লাহর সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করেছি যে, তাকে যেখানেই দেখতে পাই অমনি তার কর্ম সাবাড় করব, অন্যথায় নিজের জীবনটাই বিলিয়ে দেব। অপরজনও তেমনি চুপিসারে একই কথা আমার কানে কানে বলল। হযরত আব্দুর রহমান ইবন আউফ (রা) বলেন, আমি আবূ জেহেলের দিকে কেবলই ইশারা করেছি অমনি তরুণ দু’জন বাজপাখীর মতই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং সেখানেই তাকে লাশে পরিণত করল। তরুণদ্বয় ছিল ‘আফরার কলিজার টুকরো নয়নের পুতলি।
আবূ জেহেলের পতন হলে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আবূ জেহেল ছিল এই উম্মতের ফেরাউন।
প্রকাশ্য ও অবধারিত বিজয়
এই যুদ্ধ মুসলমানদের প্রকাশ্য ও অবধারিত বিজয় এবং কাফির-মুশরিকদের লাঞ্ছনাদায়ক পরাজয়ের ভেতর দিয়ে সমাপ্ত হলে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন :

“আল্লাহ্ যাবতীয় প্রশংসা যিনি তাঁর ওয়াদা পূরণ করেছেন, আপন বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই সকল দল ও গোষ্ঠীকে পরাভূত করেছেন।”
কুরআন মাজীদের নিম্নোক্ত আয়াত উল্লিখিত অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করছে :

“আর আল্লাহ পাক তোমাদেরকে বদর যুদ্ধে সাহায্য করেছিলেন। সে সময় তোমরা ছিলে অসহায়। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার” (সূরা আল-ইমরান, ১২৩ আয়াত)।
যুদ্ধের সমাপ্তিতে নিহত কাফিরদের লাশগুলো বদর প্রান্তরের গভীর কুয়াগুলোতে নিক্ষেপের জন্য রাসূল (সা) নির্দেশ দেন। নিক্ষেপের পর তিনি সেখানে গমন করেন এবং কুয়ার প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিহতদের লক্ষ্য করে বলেনঃ ওহে কুয়ার অধিবাসীবৃন্দ! তোমাদের প্রভু প্রতিপালক তোমাদেরকে যা বলেছিলেন তা কি সত্য পেয়েছ? আমার প্রভু আমাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা আমি সম্পূর্ণই সত্য পেয়েছি।
এই যুদ্ধে কাফিরদের সত্তুরজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি নিহত হয় এবং সত্তুরজন বন্দী হয়।
মুসলমান পক্ষে মুহাজিরদের ছয় এবং আনসারদের আটজন শাহাদাত বরণ করেন।
বদর যুদ্ধের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল
রাসূলুল্লাহ (সা) বিজয়ী বেশে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। এই সাফল্য ও বিজয় লাভের ফলে মদীনা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় তাঁর প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিপুল সংখ্যক মদীনাবাসী ইসলাম গ্রহণ করে।
এর আগে যুদ্ধের বিজয়বার্তা ঘোষণার জন্য তিনি দু’জন বিশেষ দূত মদীনায় প্রেরণ করেন। এঁদের একজন ছিলেন হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)। তিনি যুদ্ধের সুসংবাদ শোনাতে থাকেন এবং বলতে থাকেনঃ হে আনসার সম্প্রদায়। রাসূলুল্লাহ (সা)-র জীবনের নিরাপত্তা এবং কাফিরদের হত্যা ও গ্রেফতারী তোমাদের জন্য বরকতময় হোক। কুরায়শদের যেসব নেতা ও বীরপুরুষ এ যুদ্ধে মারা যায় তাদের একেকজনের নাম তিনি ঘোষণা করতে থাকেন এবং ঘরে ঘরে গিয়ে এই ঘটনা শোনাতে থাকেন। শিশুরা এসব কাহিনী তাদের সাথে সুর করে ও আগ্রহের সঙ্গে শোনাত, কবিতা পাঠ করত এবং গান গাইত। কিছু কিছু লোক এ সব সংবাদের সত্যতায় বিশ্বাসী ছিল আর কিছু লোক ছিল সন্দিহান ও দ্বিধান্বিত। ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা) স্বয়ং মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলেন। এরপর বন্দীদেরকে নিয়ে আসা হয়। এসব কয়েদীর তত্ত্বাবধানে ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা)-র গোলাম শিকরান। তিনি যখন রাওহা নামক স্থানে পৌঁছলেন তখন মুসলমানরা অগ্রসর হয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন, তাঁকে ও সঙ্গী মুসলমানদেরকে, যাঁদেরকে আল্লাহ তা’আলা বিজয়মণ্ডিত ও গৌরবান্বিত করেছিলেন, মুবারকবাদ পেশ করেন।
ওদিকে মক্কার মুশরিকদের ঘরে ঘরে শোকের মাতম উঠল এবং নিহতদের জন্য কান্নার রোল পড়ল। ইসলামের শত্রুদের অন্তরে মুসলমানদের ভীতিকর প্রভাব পড়ল। আবূ সুফিয়ান মানত করলেন, যতদিন না রাসূলুল্লাহ (সা) ও মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন ততদিন তিনি গোসল তো দূরের কথা মাথায় এক ফোঁটা পানিও ঢালবেন না। মক্কার দুর্বল ও অসহায় মুসলমানগণ কাফিরদের পরাজয় ও মুসলমানদের বিজয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন এবং তাঁরা নিজেদের ভেতর শক্তি ও সম্মানবোধ অনুভব করেন।
ঈমানী সম্পর্ক রক্ত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে
এই যুদ্ধে আবূ উযায়র ইবন উমায়র ইবন হাশিমকে বন্দী করে নিয়ে আসা হয়। সে ছিল হযরত মুস’আব ইবন উমায়র (রা)-এর সহোদর ভ্রাতা। মুস’আব ইবন উমায়র (রা) ছিলেন এই যুদ্ধে মুসলমানদের পতাকাবাহী। আর তাঁর ভাই ছিল কুরায়শ বাহিনীর পতাকাবাহী।
ঘটনা এই যে, একবার হযরত মুস’আব ইবন উমায়র (রা) যখন তাঁর ভাইয়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তিনি দেখতে পান যে, একজন আনসারী তাঁর ভাইয়ের
হাত বাঁধছে। হযরত মুস‘আব (রা) আনসারীকে বললেনঃ বেশ ভালোভাবে কষে বাঁধ। এর মা বিরাট ধনী মহিলা। এর মুক্তিপণ বাবদ বেশ ভাল অংকের টাকা পাবার আশা রয়েছে। এতচ্ছ্রবণে আবূ উযায়র মুস‘আবের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললঃ ভাই! তুমি ভাই হয়ে তাকে এই পরামর্শ দিচ্ছ? হযরত মুস‘আব ইবন উমায়র (রা) বললেনঃ তুমি আমার ভাই নও! আমার ভাই তো সেই যে তোমাকে কষে বাঁধছে।
যুদ্ধবন্দীদের সাথে মুসলমানদের আচরণ
রাসূলুল্লাহ (সা) যুদ্ধবন্দীদের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দেন এবং বলেন, استوصوا بهم خيراً “ওদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করবে”। উল্লিখিত আবূ উযায়রই বর্ণনা করেন, তারা যখন আমাকে বন্দী করে নিয়ে এল তখন জনৈক আনসারীর ঘরে আমার জায়গা মিলল। তারা আমাকে দুই বেলা রুটি খেতে দিত আর নিজেরা খেজুর খেয়ে থাকত। এ ছিল রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপদেশ ও নির্দেশেরই ফল। কেউ কোথাও থেকে এক টুকরা রুটি পেলেও তা আমাকে এনে দিত। আমার লজ্জা লাগত তা গ্রহণ করতে, তাই আমি তা ফিরিয়ে দিতাম। কিন্তু তারা আমাকে জোর করে দিত এবং নিজেরা তা হাত দিয়েও ধরত না। এসব যুদ্ধবন্দীর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চাচা ‘আব্বাস ইবন আবদি’ল-মুত্তালিবও ছিলেন, ছিলেন পিতৃব্য পুত্র আকীল ইবন আবী তালিবও।
তদীয় কন্যা হযরত যায়নব (রা)-এর স্বামী আবূ’ল-‘আস ইবনু’র-রবীও ছিলেন। এঁদের সঙ্গে কোনরূপ বিশেষ ব্যবহার করা হয়নি। সাধারণ যুদ্ধবন্দীদের সঙ্গে যেরূপ ব্যবহার করা হয়েছিল এঁদের সঙ্গেও সেই একই ব্যবহার করা হয়।
বাচ্চাদের লেখাপড়া শেখাবার বিনিময়ে বন্দীমুক্তি
বদরের যুদ্ধবন্দীদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা) ক্ষমা করেন এবং তাদের মুক্তিপণ গ্রহণ করেন। যে যে রকম ধনী ও বিত্তবান ছিল তার মুক্তিপণও ছিল সেই অনুপাতে। যার দেবার মত কিছুই ছিল না তাকে বিনা পণেই মুক্তি দেওয়া হয়। মোটরের ওপর কুরায়শরা তাদের বহু বন্দীকেই মুক্তি পণ্যের মাধ্যমে মুক্ত করে।
এমন কিছু বন্দীও ছিল যাদের মুক্তিপণ দেবার মত কিছু ছিল না। তাদের সম্পর্কে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, তারা আনসারদের শিশুদেরকে লেখাপড়া শেখাবে। একজন বন্দী দশজন মুসলিমকে লেখাপড়া শেখাবে ঠিক করে দেওয়া হয়। হযরত যায়েদ ইবন ছাবিত (রা) এভাবেই লেখাপড়া শিখেছিলেন। এই নির্দেশে জ্ঞান অর্জনকে যতখানি গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে এবং লেখাপড়া শেখাকে যতটা উৎসাহিত করা হয়েছে তা বেশি ব্যাখ্যার প্রয়োজন করবে না।
অপরাপর যুদ্ধ ও ছোটখাটো অভিযান
পূর্বেই বলা হয়েছে যে, আবূ সুফিয়ান কসম খেয়েছিলেন, যতদিন না মুসলমানদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারবেন ততদিন মাথায় এক ফোঁটা পানিও ঢালবেন না। তিনি তাঁর কসম পূর্ণ করবার নিয়তে কুরায়শদের দু’শ অশ্বারোহীসহ আক্রমণের উদ্দেশ্যে বের হন। বনী নাদীরের নেতা সাল্লাম ইবন মাশকামের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চাইতে সে কেবল অনুমতিই দিল না, বরং ডেকে যথাযথ মেহমানদারীও করল এবং মদীনার অবস্থা সম্পর্কে তাকে অবহিতও করল। আবূ সুফিয়ান কিছু লোক গোয়েন্দাগিরির উদ্দেশ্যে পাঠান যারা দু’জন আনসারকে শহীদ করে।
রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবায়ে কিরামসহ তাদের পশ্চাদ্ধাবনে বহির্গত হন। কিন্তু আবূ সুফিয়ান তার দলবলসহ মুসলমানদের পৌঁছবার পূর্বেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হন, পেছনে রেখে যান বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য ও অন্যান্য দ্রব্য যার বেশির ভাগ ছিল ছাতু। এজন্য এই গাযওয়াকে “গাযওয়াতুস সাবীক” বা ছাতুর যুদ্ধও বলে।
বনী কায়নুকা‘র সঙ্গে ব্যবহার
বনী কায়নুকা ছিল প্রথম ইয়াহুদী গোত্র যারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে, তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করে, মুসলমানদের কষ্ট দেয়। অনন্তর রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে অবরোধ করেন। পনের রাত এ অবস্থায় অতিক্রান্ত হয়। অবশেষে তারা মস্তক অবনত করে এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ফয়সালা মেনে নিতে সম্মত হয়। বনী কায়নুকা’র মিত্র আবদুল্লাহ ইবন উবাই (মুনাফিক সর্দার) তাঁর খেদমতে তাদের নিমিত্ত সুপারিশ পেশ করে। অনন্তর তিনি তাদের কথা বিবেচনাপূর্বক
অবরোধ তুলে নেন। কায়নুকা’র ছিল সাত শত যুদ্ধবাজ সৈনিক এবং পেশায় এদের অধিকাংশই স্বর্ণকার ও দোকানদার ছিল।
নবী করীম (সা) ঐ সব ইয়াহূদীদেরকে এই শর্তে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা দেন যে, তারা মদীনা থেকে বেরিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবে। অনন্তর তাদের বেশির ভাগ লোক পরম নির্ভয়ে সিরিয়ার দিকে চলে যায় এবং তাদের অস্থাবর সম্পত্তিও সাথে নিয়ে যায়। বনী কায়নুকা তাদের বিদ্রোহ ও প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের কারণে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষা করছিল, কিন্তু তারা নিরাপদে ইয়াছরিব থেকে চলে যায়।
কা’ব ইবনুল আশরাফ ছিল একজন বিরাট ইয়াহূদী সর্দার। সে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে আগাগোড়া কষ্ট দিত এবং অভিজাত মুসলিম মহিলাদের সম্পর্কে গায়কী কবিতা বলত। বদর যুদ্ধের পর সে মক্কায় গিয়ে কাফিরদের রাসূলুল্লাহ (সা) ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে শুরু করে। এমতাবস্থায় সে মদীনায় পৌঁছে। রাসূলুল্লাহ (সা) তার আগমন সংবাদ পেয়ে বলেনঃ কা’ব ইবনুল আশরাফ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে খুব কষ্ট দিয়েছে। তার কি কেউ কোন ব্যবস্থা করতে পারে? আনসারদের কিছু লোক এই খেদমত আঞ্জাম দেবার জন্য তক্ষুনি দাঁড়িয়ে গেল এবং তার কর্ম সাবাড় করল।