বনী কুরায়জার যুদ্ধ
(৫ম হিজরী)
বনী কুরায়জার চুক্তিভঙ্গ
রাসূলুল্লাহ (সা) যখন মদীনায় তশরীফ এনেছিলেন তখন তিনি মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে এমন একটি চুক্তিনামা লিপিবদ্ধ করেছিলেন যেই চুক্তিনামায় ইয়াহূদীদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছিল এবং তাদের সঙ্গেও পারস্পরিক চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছিল। এই চুক্তিতে তাদের ধর্ম ও ধন-সম্পদের হেফাজতের যিম্মাদারী গ্রহণ করা হয়েছিল। এজন্য কিছু শর্ত তাদের অনুকূলে আরোপ করা হয়েছিল আর কিছু শর্ত তাদের ওপর চাপানো হয়েছিল। এই চুক্তিনামার বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল নিম্নরূপ :
“ইয়াহূদীদের মধ্যে যারা আমাদের সহযোগী হবে তাদের সাথে সাহায্য-সহযোগিতা ও সাম্যের আচরণ করা হবে। তাদের ওপর জুলুম করা হবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করা হবে না। মদীনার কোন মুশরিক কুরায়শদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা ও আশ্রয় যেমন দেবে না, তেমনি কোন মু’মিন মুসলমানের মোকাবিলায় তার জন্য বুকও পেতে দেবে না। ইয়াহূদীরা লড়াইয়ের ময়দানে যতদিন শরীক থাকবে মুসলমানদের মতই যুদ্ধের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করবে। ইয়াহূদীদের বিভিন্ন গোত্র মুসলমানদের সঙ্গে একই জাতিগোষ্ঠীর মত বসবাস করবে। ইয়াহূদীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে, মুসলমানরাও তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবে। তারা তাদের অধীনস্থ গোলাম এবং নিজেদের ব্যাপারে পরিপূর্ণ স্বাধীন থাকবে।”
অঙ্গীকারপত্রে এও ছিল যে, এই অঙ্গীকারনামা ও লিখিত চুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধে একে অপরকে সাহায্য করা বাধ্যতামূলক হবে। বৈধ ও ঐশী আনুগত্যের সীমারেখার ভেতর কল্যাণ কামনা, নিষ্ঠা ও মঙ্গলাকাঙ্ক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করবে। ইয়াছরিবের উপর বহিঃশত্রুর হামলা হলে সকলে সম্মিলিতভাবে তার মোকাবিলা করবে। কিন্তু বনী নাদীর-এর সর্দার হুয়াই ইবন আখতাব ইয়াহূদী বনী কুরায়জাকে মুসলমানদের সঙ্গে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গে এবং কুরায়শদের সঙ্গে ঐক্য ও বন্ধুত্ব স্থাপনে উৎসাহী করে তোলে, অথচ তাদের সর্দার কা’ব ইবন আসাদ আল-কুরাজী বলেছিল, আমি মুহাম্মাদ (সা)-এর ভেতর সততা, সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা ছাড়া আর কিছু দেখিনি। যাই হোক, কা’ব ইবন আসাদ নিজের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে এবং তার ও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ভেতর যা কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছিল তা থেকে সে নিজেকে মুক্ত করে নেয়।
রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের চুক্তিভঙ্গের ব্যাপারে অবহিত হতেই আওস গোত্রের সর্দার হযরত সা’দ ইবন মু’আয (রা)-কে (আওস ছিল বনু কুরায়জার মিত্র) ও খাযরাজ গোত্রের সর্দার সা’দ ইবন উবাদা (রা)-কে আনসারদের কিছু লোকসহ এই সংবাদের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পাঠান। তাঁরা সেখানে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে, তারা যতটা শুনেছেন অবস্থা তার চেয়েও খারাপ। কুরায়জার লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে অশোভন কথাবার্তা বলে এবং তিক্ত ভাষায় বলতে থাকে : কিসের আল্লাহর রাসূল! আমাদের ও মুহাম্মাদ (সা)-এর মাঝে কোন চুক্তি নেই।
তারা রীতিমত যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দেয় এবং মুসলমানদের পৃষ্ঠদেশে ছুরিকাঘাত করতে চেষ্টা চালায়। এ ধরনের কাজ প্রকাশ্য ও খোলাখুলি আক্রমণ এবং সামনাসামনি যুদ্ধের থেকেও অনেক বেশি কঠিন ও ও বিপজ্জনক। এ ধরনের অবস্থার চিত্রাঙ্কন করা হয়েছে কুরআনুল-করীমের নিম্নোক্ত আয়াতে :

“আর তারা যখন তোমাদের ওপর, ওপর ও নীচের দিক থেকে আক্রমণোদ্যত হল” (সূরা আহযাব, আয়াত ১০)।
মুসলমানদের জন্য এ অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটময় এবং এ অবস্থা স্বাভাবিকভাবেই সকলেই অনুভব করে। এ অবস্থা আমরা এ থেকেও অনুমান করতে পারি যে, সা’দ ইবন মু’আয (রা), যিনি তাদের সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ঠ, বিপদে-আপদে সাহায্য-সহযোগিতাকারী ও রোগে-শোকে সহানুভূতিশীল ছিলেন, খন্দক যুদ্ধের সময় তাঁর কাঁধে একটি তীর লাগে। এর ফলে সেখানকার একটি নাযুক ও গুরুত্বপূর্ণ শিরা কেটে যায়। তিনি যখন তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত জানলেন তখন তিনি এই দু’আ করেছিলেন : হে আল্লাহ! আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত মৃত্যু দিও না যতক্ষণ না আমার চোখ বনী কুরায়জার ধ্বংস দেখে শীতল হয়।
বনী কুরায়জা অভিমুখে অগ্রাভিযান
রাসূলুল্লাহ (সা) মুসলমানদেরকে নিয়ে যখন খন্দক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করলেন এবং মদীনায় পৌঁছে মুসলমানরা সবাই অস্ত্র পরিত্যাগ করলেন তখন হযরত জিবরাঈল (আ) আগমন করলেন এবং বললেন : হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অস্ত্র পরিত্যাগ করেছেন? তিনি বললেন : হ্যাঁ। এতে হযরত জিবরাঈল বললেন : ফেরেশতারা এখনও তাদের অস্ত্র পরিত্যাগ করেনি। আল্লাহ পাক আপনাকে বনী কুরায়জা অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি সেদিকেই অগ্রসর হচ্ছি যাতে তাদের ভেতর ভীতি ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে পারি। রাসূলুল্লাহ (সা) একজন ঘোষককে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে ঘোষণা দিতে বললেন, মুসলমান মাত্রই যেন যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ে এবং আসরের নামায বনী কুরায়জা পল্লীতে গিয়ে পড়ে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বনী কুরায়জা পল্লীতে পৌঁছেই তাদেরকে অবরোধ করলেন, আর এই অবরোধ চলল পঁচিশ দিন ধরে। অবশেষে অবরোধের কারণে তারা অস্থির হয়ে উঠল। আল্লাহ তা’আলা তাদের অন্তরে ভীতির সৃষ্টি করলেন।
অনুতপ্ত ও লজ্জিত আবূ লুবাবা ও তাঁর তাওবার কবূলিয়ত
ইতোমধ্যে বনী কুরায়জা রাসূলুল্লাহ (সা)-র নিকট বার্তা পাঠায়, আপনি
আমাদের কাছে বনী আমর ইবন আওফকে পাঠিয়ে দিন (এরা আওস গোত্রের মিত্র ছিল) যাতে আমরা আমাদের ব্যাপারে তার সঙ্গে পরামর্শ করতে পারি। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে রাসুলুল্লাহ (সা) আবূ লুবাবা (রা)-কে সেখানে পাঠালেন। তাকে দেখতেই কুরায়জার নারী-পুরুষ দাঁড়িয়ে যায় এবং মহিলা ও শিশুরা চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। এতদ্দৃষ্টে আবূ লুবাবার মন কিছুটা দ্রবীভূত হয়। এরপর ঐ সমস্ত লোক বলতে লাগল: আবূ লুবাবা! আমরা কি মুহাম্মাদ (সা)-এর ফয়সালা অবনত মন্তকে মেনে নেব? তিনি বললেন: হ্যাঁ, সেই সঙ্গে তিনি গলার দিকে ইশারা করে তাদেরকে বুঝিয়ে দিলেন, তাদের গলায় ছুরি চালানো হবে। আবূ লুবাবা (রা) বলেন, আমি সেখান থেকে সরিওনি -এমন সময় আমার মনে হল যে, (গোপনীয়তা প্রকাশ করে) আমি আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের খেয়ানত করেছি। অনন্তর তিনি তখনই ফিরে আসলেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে উপস্থিত হওয়ার পরিবর্তে মসজিদে নববীর একটি খুঁটির সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেললেন এবং ঘোষণা করলেন, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত এই স্থান ত্যাগ করব না যতক্ষণ না আল্লাহ তা’আলা আমার অপরাধ ক্ষমা করেন। তিনি আল্লাহ তা’আলার সঙ্গে এই অঙ্গীকার করেন যে, তিনি ভবিষ্যতে বনী কুরায়জা এলাকায় পাও রাখবেন না এবং সেই জায়গার চেহারাও দেখবেন না যেখানে তিনি আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের খেয়ানত করেছিলেন।
অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তাঁর তাওবা কবুল করেন এবং এই আয়াত নাযিল করেন:

“আর কোন কোন লোক রয়েছে যারা তাদের পাপ স্বীকার করেছে, তারা মিশ্রিত করেছে একটি নেক কাজ ও অন্য একটি বদকাজ। শীঘ্রই হয়তো আল্লাহ্ তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, দয়াময়” (সূরা তওবা, আয়াত ১০)।
এই আয়াত নাযিল হতেই লোকেরা তাঁর হাতের বাঁধন খোলার জন্য তৎক্ষণাৎ দ্রুতবেগে ধাবিত হল। কিন্তু তিনি অস্বীকৃতি জ্ঞাপনপূর্বক বললেন: না, কখনও নয়। আল্লাহ্র কসম! যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ্র রাসূল নিজে তাঁর মুবারক হাতে আমাকে মুক্ত করবেন আমি এই অবস্থায় থাকব। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা) ফজরের নামাযের জন্য বাইরে তশরীফ নিলেন এবং তাঁর কাছ দিয়ে গেলেন তখন
তার বাঁধন খুললেন। তিনি খেজুরের একটি খুঁটির সঙ্গে প্রায় বিশ রাত বাঁধা অবস্থায় ছিলেন। প্রতিটি সালাতের সময় তাঁর স্ত্রী আসতেন এবং সালাতের জন্য তাঁকে বাঁধনমুক্ত করতেন। সালাত শেষ হতেই তিনি আবার নিজেকে বেঁধে নিতেন।
সা‘দ ইবন মু‘আয (রা)-এর সত্যপ্রীতি ও অটল সিদ্ধান্ত
বনু কুরায়জা রাসুলুল্লাহ (সা)-এর ফয়সালা মেনে নেয়। কিন্তু আওস গোত্রের মনে বনু কুরায়জার জন্য সহানুভূতি কাজ করছিল। তারা দ্রুতবেগে রাসুলুল্লাহ (সা)-এর কাছে এল এবং বলতে লাগল : ইয়া রাসূলাল্লাহ! খায়রাজের মোকাবিলায় আমাদের তাদের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে আর তারা আমাদের ভাইদের মিত্র (অর্থাৎ বনী কায়নুকা)-দের সঙ্গে মিলে যা করেছে, আপনার তা জানা। রাসুলুল্লাহ (সা) এ কথা শুনে বললেন : আওসের লোকসকল! তোমরা কি এ ব্যাপারে রাজি আছ যে, তোমাদেরই কোন লোক তাদের ব্যাপারে ফয়সালা করে দিক। তারা সমস্বরে বলল : জী হ্যাঁ, আমরা তৈরী। তিনি তখন বললেন : আমি এ দায়িত্ব সা‘দ ইবন মু’আযকে সোপর্দ করতে যাচ্ছি। তাঁকে ডাকা হল। তিনি যখন আসলেন তখন তার গোত্রের লোকেরা বলল : আবু আমর! আপন মিত্রের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করবেন। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা) আপনার হাতে এই মামলা এজন্যই সোপর্দ করেছেন যাতে আপনি তাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করেন। তারা যখন এ ব্যাপারে বেশী পীড়াপীড়ি করতে থাকল তখন তিনি বললেন, সা‘দ ভাগ্যক্রমে এই সুযোগ পেয়েছে যে, আজ তাঁকে ঐশী নির্দেশের সামনে হাজির হতে হচ্ছে যে মুহূর্তে কারোর ভর্ৎসনার পরওয়া তিনি করবেন না। হযরত সা‘দ (রা) বললেন : আমি এই ফয়সালা দিচ্ছি যে, পুরুষদেরকে হত্যা করা হোক, তাদের ধন-সম্পদ (মুসলমানদের মধ্যে) বণ্টন করা হোক, শিশু ও মহিলাদেরকে গোলাম-বাঁদীতে পরিণত করা হোক। (এর ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে) রাসুলুল্লাহ (সা) বললেন : তুমি আল্লাহর নির্দেশ मुताबिक ফয়সালা করেছ।
ইসরাঈলী শরীয়ত (ধর্মীয় বিধান) অনুযায়ী শাস্তি
এই ফয়সালা ছিল ইসরাঈলের শরীয়তের সামরিক বিধি मुताबिक। তাওরাতের ১১-১৩ আয়াতে আছে :
“যখন তুমি কোন নগরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে তাহার নিকটে উপস্থিত হইবে, তখন তাহার কাছে সন্ধির কথা ঘোষণা করিবে। তাহাতে যদি সে সন্ধি করিতে সম্মত হইয়া তোমার জন্য দ্বার খুলিয়া দেয় তবে সেই নগরে যে সমস্ত লোক পাওয়া যায় তাহারা তোমাকে কর দিবে ও তোমার দাস হইবে। কিন্তু যদি সে সন্ধি না করিয়া তোমার সহিত যুদ্ধ করে, তবে তুমি সেই নগর অবরোধ করিবে। পরে তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু তাহা তোমার হস্তগত করিলে তুমি তাহার সমস্ত পুরুষকে খড়গধারে আঘাত করিবে; কিন্তু স্ত্রীলোক, বালক-বালিকা ও পশু প্রভৃতি নগরের সর্বস্ব, সমস্ত লুট দ্রব্য আপনার জন্য লুটস্বরূপ গ্রহণ করিবে আর তোমার ঈশ্বর প্রদত্ত শত্রুদের লুট ভোগ করিবে” (দ্বিতীয় বিবরণ, অধ্যায় ২০, আয়াত ১০-১৪, পবিত্র বাইবেল, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি, ঢাকা-১৯৭৩)।
বনী ইসরাঈলের মধ্যে প্রাচীনকাল থেকেই এ নিয়মই প্রচলিত ছিল। তাওরাত গ্রন্থে আছে, “পরে মোশির প্রতি প্রভুর দত্ত আজ্ঞানুসারে তাহারা মিডিয়নের সহিত যুদ্ধ করিল ও সমস্ত পুরুষকে বধ করিল। আর তাহারা মিডিয়নের রাজগণকে তাহাদের অন্য নিহত লোকদের সহিত বধ করিল; ইবি, রেশম, সূর, হূর ও রেবা, মিডিয়নের এই পাঁচ রাজাকে বধ করিল; বিয়োরের পুত্র বিলিয়মকেও খড়গ দ্বারা বধ করিল। আর ইস্রায়েল সন্তানগণ মিডিয়নের সকল স্ত্রীলোক ও বালক-বালিকাদিগকে বন্দী করিয়া লইয়া গেল এবং তাহাদের সমস্ত পশু, সমস্ত মেষপাল ও সমস্ত সম্পত্তি লুটিয়া লইল, আর তাহাদের সমস্ত নিবাস-নগর ও সমস্ত ছাউনি পোড়াইয়া দিল।”
মূসা (আ)-র যুগে এই বিধানের ওপর আমল করা হত এবং এর ওপর তাঁর অনুমোদন ও সমর্থন ছিল। তাওরাত গ্রন্থেই আছে :
“আর মোশি, ইলিয়াসর যাজক মণ্ডলীর সমস্ত অধ্যক্ষ তাহাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ
করিতে শিবিরের বাহিরে গেলেন। তখন যুদ্ধ হইতে প্রত্যাগত সেনাপতিদের অর্থাৎ সহস্র পতিদের ও শতপতিদের উপরে মোশি ক্রুদ্ধ হইলেন। মোশি তাহাদিগকে কহিলেন, তোমরা কি সমস্ত স্ত্রীলোককে জীবিত রাখিয়াছ?”
হযরত সা‘দ ইবন মু‘আয (রা)-এর এই ফয়সালা ও নির্দেশ পালিত হয়। এবং এভাবেই মদীনা ইয়াহূদী ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত, ধোঁকা, প্রতারণা ও ফেতনার হাত থেকে মুক্ত ও নিরাপদ হয়ে গেল। মুসলমানরা নিশ্চিন্ত হল যে, এখন আর তারা পেছন থেকে আক্রান্ত হবে না এবং কোন রকম অভ্যন্তরীণ চক্রান্তও মাথা চাড়া দেবার সুযোগ পাবে না।
খাযরাজ গোত্র সালাম ইবন আবি’ল-হাকীককেও হত্যা করে, যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এই সব দল এনে খাঁড়া করেছিল এবং তাদেরকে অসৎ উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। এর আগে আওস গোত্র কা‘ব ইবন আল-আশরাফকে খতম করেছিল। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে শত্রুতা সাধনে ও তাঁর বিরুদ্ধে লোক ক্ষেপানো ও গোলযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সেই ছিল অগ্রগামী। এ দু’জনের হত্যার ফলে মুসলমানরা ফেতনা-ফাসাদের আড্ডা থেকে মুক্তি পায় যারা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সার্বক্ষণিকভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকত এবং নিত্য-নতুন আন্দোলন ও পরিকল্পনা সৃষ্টি করতে থাকত। সকলেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
রাসূলুল্লাহ (সা) বনী কুরায়জার সঙ্গে যেই ব্যবহার করেন তা সামরিক কৌশল, আরবের ইয়াহূদী গোত্রগুলোর প্রকৃতি ও পতিত স্বভাব मुताबिक ছিল। তাদের জন্য এ ধরনের শক্ত রকমের ও শিক্ষণীয় শাস্তিরই দরকার ছিল যার ফলে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গকারী ও ধোঁকাবাজরা যেন চিরদিনের তরে শিক্ষা পেয়ে যায় এবং ভবিষ্যৎ বংশধরগণও এ থেকে শিক্ষা লাভ করতে পারে। R.V.C. Bodley তাঁর The Messenger-The life of Muhammad নামক গ্রন্থে এই ঘটনার ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে লিখেছেন:
“মুহাম্মাদ (সা) আরবে একা ছিলেন। এই ভূখণ্ডটি আকার আয়তনের দিক দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশ এবং এর জনসংখ্যা ছিল পঞ্চাশ লাখ। তাদের নিকট এমন কোন সেনাবাহিনী ছিল না যারা লোকদেরকে আদেশ পালনে ও আনুগত্য প্রদর্শনে বাধ্য করতে পারে, কেবল একটি ক্ষুদ্র সেনাদল ছাড়া, সংখ্যা ছিল তিন হাজার। এই বাহিনীও আবার সম্পূর্ণরূপে অস্ত্রসজ্জিত ছিল না। আর মুহাম্মাদ (সা) যদি এক্ষেত্রে কোনরূপ শৈথিল্য কিংবা গাফিলতিকে প্রশ্রয় দিতেন এবং বনী
কুরায়জাকে তাদের বিশ্বাস ভঙ্গের কোনরূপ শাস্তি দান ব্যতিরেকেই ছেড়ে দিতেন তাহলে আরব উপদ্বীপে ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হত। এতে কোনই সন্দেহ নেই যে, ইয়াহুদীদের হত্যার ব্যাপার খুবই কঠিন ছিল। কিন্তু ইয়াহুদীদের ধর্মের ইতিহাসে এটা কোন নতুন ব্যাপার ছিল না এবং মুসলমানদের দিক দিয়ে এ কাজের পেছনে পূর্ণ বৈধতা ও অনুমোদন বর্তমান ছিল। এর ফলে অপরাপর আরব গোত্রসমূহ ও ইয়াহূদীরা কোনরূপ চুক্তিভঙ্গ ও গাদ্দারী করবার পূর্বে বারবার চিন্তা-ভাবনা করতে বাধ্য হয়। কেননা এর পরিণতি কত খারাপ হতে পারে তা তারা দেখেছিল এবং স্বচক্ষেই দেখেছিল যে, মুহাম্মাদ (সা) তাঁর ফয়সালা কার্যকর করার ক্ষমতা রাখেন।”
স্যার স্টানলী লেনপুল লিখছেন: “মনে রাখতে হবে যে, তাদের অপরাধ ছিল দেশের সঙ্গে গাদ্দারী এবং তাও আবার অবরোধকালীন। যে সব লোক ইতিহাসে এটা পড়েছে যে, (জেনারেল) ওয়েলিংটনের ফৌজ যে পথ দিয়ে যেত সে সব পথ চিনতে পারা যেত পলাতক সৈনিক ও লুটপাটকারীদের লাশ দ্বারা যা গাছের ডালে লটকানো থাকত, তাদের একটি গাদ্দার গোত্রের একটি কাতুকুতু ফয়সালার প্রেক্ষিতে নিহত হওয়ার ব্যাপারে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।”
মদীনায় ইয়াহূদীদের এই সর্বশেষ কেল্লা ও মোর্চার পতনে আরেকটি লাভ হল এই যে, মুনাফিক শিবির স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে যায়, মুনাফিকদের তৎপরতায় ভাটা পড়ে, তাদের মনোবল স্তিমিত হয়ে যায় এবং তাদের আস্থা ও নির্ভরতার অনেকটাই ও বড় বড় আশা-ভরসা কর্পূরের মত উবে যায়। কেননা এটাই ছিল তাদের সুদৃঢ় দুর্গগুলোর সর্বশেষ দুর্গ যা বিজিত হয়। ড. ইসরাঈল ওয়েলফিনসন বনী কুরায়জা যুদ্ধের ওপর পর্যালোচনা পেশ করতে গিয়ে এই বাস্তব সত্যকে নিম্নোক্ত ভাষায় স্বীকৃতি দিয়েছেন:
“মুনাফিকদের সম্পর্কে যতটা বলা যায় তা এই যে, বনী কুরায়জা যুদ্ধের পর তাদের আওয়াজ উচ্চগ্রাম থেকে নিম্নগ্রামে নেমে আসে এবং এরপর তাদের কথা ও কাজে এমন কোন কিছু প্রকাশ পায়নি যা রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাহাবাদের ফয়সালার বিরুদ্ধে যেত যেমনটি এর পূর্বে আশংকা করা হত।”
ক্ষমা ও বদান্যতা
রাসূলুল্লাহ (সা) নজদের দিকে কিছু সওয়ারীকে একটি অভিযানে প্রেরণ করেন। প্রত্যাবর্তনকালে তারা বনী হানীফার সর্দার ছুমামা ইবন আছালকে বন্দী করে নিয়ে আসে এবং তাকে মসজিদের একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখে। রাসূলুল্লাহ (সা) এদিক দিয়ে অতিক্রম করলে তাকে সম্বোধন করে বলেন : ছুমামা! তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও? ছুমামা বললেন : হে মুহাম্মাদ (সা)! যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন তবে এমন একজনকে হত্যা করবেন যার ঘাড়ে রক্ত আছে। যদি আমার সঙ্গে সদয় ব্যবহার করেন তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ও সদয় ব্যবহারের স্বীকৃতি প্রদানকারীর সঙ্গে সদয় ব্যবহার করবেন। আর আপনি যদি ধন-দৌলত চান তাহলে তাও আপনি বলুন, আপনি যা চাইবেন পাবেন। এ কথা শুনে তিনি সামনে এগিয়ে গেলেন। দ্বিতীয়বার তিনি যখন এদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন তখনও তিনি তাকে একই প্রশ্ন করলেন এবং তিনিও তাঁকে একই উত্তর দিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) পূর্বের ন্যায় একই আচরণ করলেন। তৃতীয়বার যখন তিনি এদিক দিয়ে অতিক্রম করছিলেন তখন তিনি ছুমামাকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। অনন্তর তাকে মুক্তি দেয়া হল। এরপর ছুমামা মসজিদের নিকটবর্তী একটি খেজুর বাগানে গিয়ে গোসল করলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে হাজির হয়ে ইসলাম কবুল করলেন এবং আরয করলেন, আল্লাহ্ কসম! এক সময় ছিল যখন আপনার চেহারার চেয়ে বেশি খারাপ আর কারো চেহারা আমার কাছে লাগত না। কিন্তু আজ আপনার নূরানী চেহারা আমার নিকট দুনিয়ার যাবতীয় জিনিসের মোকাবিলায় অধিকতর প্রিয়। আল্লাহ্ কসম! আপনার ধর্মের চাইতে বেশি হিংসা-বিদ্বেষ আর কোন ধর্মের প্রতি আমি পোষণ করতাম না। কিন্তু আজ আপনার ধর্ম দুনিয়ার তাবৎ ধর্ম ও মাযহাবের তুলনায় আমার নিকট অধিকতর প্রিয় ও ভালবাসার। আমার ঘটনা এই যে, আমি উমরার নিয়তে যাচ্ছিলাম। এমন সময় আপনার সওয়ারীরা আমাকে বন্দী করে। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে সুসংবাদ দান করলেন এবং উমরা আদায়ের নির্দেশ দিলেন। ছুমামা যখন কুরায়শদের সঙ্গে মিলিত হলেন তখন তারা বলল, ছুমামা! তুমি বেদ্বীন হয়ে গেছ। তিনি জবাবে বললেন : না, আল্লাহ্ কসম! আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতের ওপর ঈমান এনেছি। আল্লাহ্ কসম করে বলছি, তোমাদের কাছে ইয়ামামা থেকে গমের একটি দানাও আসবে না যতক্ষণ না আল্লাহ্ রাসূল (সা) তার অনুমোদন দেন। ইয়ামামা ছিল মক্কার খাদ্যশস্যের পাইকারী বাজার আর সেখান থেকেই তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য আসত। এরপর তিনি তাঁর এলাকায় ফিরে যান এবং গম বোঝাই উটের কাফেলা মক্কা গমনে বাধা
দেন। এর প্রতিক্রিয়ায় কুরায়শদের না খেয়ে মরবার উপক্রম হল। অবশেষে তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-র খেদমতে আবেদন পেশ করল যাতে তিনি ছুমামাকে কুরায়শদের নিকট খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য সামগ্রী প্রেরণের অনুমতি দেয়ার নির্দেশ দেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের আবেদন কবুল করেন।
বনী মুস্তালিক যুদ্ধ ও হযরত আয়েশা (রা)-এর প্রতি অপবাদের ঘটনা
ষষ্ঠ হিজরীর শা‘বান মাসে রাসূলুল্লাহ (সা) খবর পান যে, বনী মুস্তালিক (খুযা‘আ গোত্রের একটি শাখা) যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এই খবর পেতেই তিনিও তাদের মোকাবিলায় বের হন। তাঁর সাথে মুনাফিকদের একটি বিরাট দলও সহগামী হয় যা ইতোপূর্বে আর কোন অভিযানে দেখা যায়নি। তাদের নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি ইবন উবায়্যি ইবন সেলুলও সাথে ছিল। আহযাব যুদ্ধে (যে যুদ্ধে কুরায়শরা পূর্ণ ঐক্যের পরিচয় দিয়েছিল এবং অন্যান্য গোত্রকেও তাদের সঙ্গী বানিয়েছিল) মুসলমানদের বিজয় ও সাফল্য তাদের ক্রোধাগ্নিকে আরও উস্কে দেয়। মুসলমানদের সৌভাগ্য তারকা ছিল ক্রমোন্নতির পথে ধাবমান। উপর্যুপরি সাফল্য মক্কার কাফির এবং মদীনা ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাসকারী ইয়াহূদী ও মুনাফিকদের জন্য ছিল গলার এমন একটি কাঁটা যার জন্য তাদের জীবনের শান্তি ও স্বস্তি বলতে কিছু ছিল না। তারা বুঝে নিয়েছিল, মুসলমানদেরকে এখন আর যুদ্ধের ময়দানে ও সংখ্যা শক্তির আধিক্যে বা সামরিক সাজ-সরঞ্জামের দ্বারা পরাজিত করা যাবে না। এজন্য তারা ভেতরে থেকে পদে পদে বাধা সৃষ্টি ও গোলযোগ পাকানোর পথ ধরল। মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির নিমিত্ত জাতীয় ও গোত্রীয় অহমিকায় ফুঁ দিতে লাগল। নবুওয়াত ও রিসালাতের মহামর্যাদাকে হেয় ও অসম্মান এবং এর ওপর মুসলমানদের আস্থা ও নির্ভরতাকে দুর্বল করার তারা পরিকল্পনা তৈরি করে। তারা নবুওয়াতের শানের বিরুদ্ধে বল্গাহীন উক্তি ও অপবাদ আরোপের বিপজ্জনক অভিযান চালাবার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের ধারণা ছিল যে, এভাবেই তারা এই নতুন ও অনন্য সমাজের ভিত্তি নড়বড়ে করে তুলতে পারবে যে সমাজের প্রত্যেক সদস্য একে অপরের দর্পণস্বরূপ। যখন সে তার ভাই সম্পর্কে কোনরূপ অশোভন ও অসৌজন্যমূলক কথা শোনে তখন সে নিজের সম্পর্কে পর্যালোচনা করে দেখে। যদি সে নিজের আত্মাকে পাক-সাফ পায় তাহলে সে যে রকম নিজের সম্পর্কে
ভিত্তিহীন ও অমূলক কথা বলে না, তেমনি অপরের বেলাও তা বলে না। তেমনি নবুওয়াতের আহলে বায়তের ওপর তার যদি আস্থা না থাকে তাহলে এই সমাজের একে অপরের ওপর থেকেও আস্থা উঠে যাবে, কারো ওপরই আর আস্থা অবশিষ্ট থাকবে না। এটি নিঃসন্দেহে মুনাফিকদের অত্যন্ত বিপজ্জনক ও গভীর একটি ষড়যন্ত্র ছিল। এই কূটচাল ও প্রতারণা বনী মুস্তালিক যুদ্ধে যেভাবে নগ্নভাবে ধরা পড়ে এতটা অন্য কোন যুদ্ধে ধরা পড়েনি।
অবশেষে যুদ্ধের মুহূর্ত ঘনিয়ে এল। রাসুলুল্লাহ (সা) মোকাবিলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন এবং বনী মুস্তালিকের ঝর্ণাধারার পাশে, যাকে মার্ব-মুরায়সী বলা হয়, তিনি অবস্থান নেন। স্থানটি সমুদ্রউপকূল অভিমুখী “কুদায়েদ” নামক জায়গার নিকট অবস্থিত ছিল। এখানেই উভয় সৈন্যদল পরস্পরের মুখোমুখি হয় এবং পরিণতিতে বনী মুস্তালিক পরাজিত হয়।
এ সময় হযরত ওমর (রা)-এর একজন আজীরের (اجير) যিনি বনী গিফার গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন এবং খাযরাজ গোত্রের মিত্র, জুহায়নার জনৈক লোকের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধে। এমন সময় জুহায়নী লোকটি চিৎকার দিয়ে ডাক দেয় : ওহে আনসাররা! আমার সাহায্যে এগিয়ে এস। ওদিকের (اجير) লোকটিও তার সাহায্য এগিয়ে আসার জন্য মুহাজিরদের ডাক দেয়। এতচ্ছ্রবণে মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি ইবন সেলূল খুবই ক্রোধান্বিত হয়। সে তখন তার লোকজনের মধ্যে উপবিষ্ট ছিল। সে বলল : আচ্ছা! মুহাজিরদের সাহস তাহলে এতদূর পৌঁছে গেছে? তারা কি না আমাদের এলাকায় এসে আমাদের সঙ্গেই লড়াইয়ে প্রবৃত্ত হতে চলেছে আর নিজেদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে প্রয়াস পাচ্ছে? আল্লাহ্ কসম! ব্যাপারটা ঠিক এরকম যে রকমটি এই প্রবাদ বাক্যে বর্ণনা করা হয়েছে : سمن كلبك يأكلك = তোমার কুকুরকে খাইয়ে-দাইয়ে খুব মোটা তাজা কর; শেষে সে তোমাকেই খাবে। আল্লাহ্ কসম! যখন আমরা মদীনা ফিরে যাব তখন সেখানকার সম্মানিত ও নেতৃত্বস্থানীয় লোকেরা সেখানকার ছোট লোকদেরকে বের করে দেবে। এরপর সে নিজের লোকদের দিকে ফিরে বলল : এসব কিছু তোমরা নিজের হাতে করেছ। তোমরা নিজেদের বাড়িতে তাদেরকে জায়গা দিয়েছ। নিজেদের সম্পদ নিজেদের ও তাদের ভেতর ভাগ-বণ্টন করেছ।
আল্লাহ্ কসম! তোমরা যদি নিজেদের হাত একটু গুটিয়ে নিতে আর এভাবে উদার হস্তে ও অকৃপণভাবে সব কিছু না করতে তাহলে তারা অবশ্যই অন্য ঘর দেখত।
রাসূলুল্লাহ (সা) যখন একথা শুনতে পেলেন তখন তিনি তাঁর বাহিনীকে ফিরে যাবার নির্দেশ দিলেন যাতে লোকে ফেতনার মাঝে নিক্ষিপ্ত না হয় এবং শয়তান যেন কুমন্ত্রণা দানের সুযোগ না পায়। এই প্রত্যাবর্তন ছিল তাঁর স্বাভাবিক নিয়মের খেলাফ। নির্দেশ পেতেই সকলেই রওয়ানা হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে গেল। সেদিন তিনি অব্যাহতভাবে পথ চললেন। চলতে চলতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। তারপর সারা রাত ধরে সফর অব্যাহত থাকল। এরপর এক সময় ভোর হল। অব্যাহত গতিতে চলল পথ চলা। এভাবেই বাড়ল বেলা। সূর্যতাপে পথ চলা দুষ্কর হয়ে দাঁড়াল। কষ্ট হতে লাগল সকলের। এ সময় তিনি যাত্রা বিরতি দিলেন। পথশ্রমে সকলেই এতটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, শুতে না শুতেই সকলে গভীর নিদ্রার কোলে ঢলে পড়লেন। আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যির ছেলে আবদুল্লাহ বাহিনীর পূর্বেই মদীনায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। তিনি তাঁর পিতার পথ আগলে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি তাঁর পিতাকে দেখতেই নিজের উট বসিয়ে দিলেন এবং বললেন : আমি তোমাকে যতক্ষণ পর্যন্ত ছেড়ে দেব না যতক্ষণ না নিজের মুখে বলবে, তুমিই ছোটলোক এবং মুহাম্মাদ (সা) সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা) সেদিকে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি এসব শুনে আবদুল্লাহকে ডেকে বললেন : ওকে যেতে দাও। সে যতক্ষণ আমাদের ভেতর আছে আমরা তার সাথে ভাল ব্যবহারই করব।
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিয়ম ছিল যখন তিনি সফরের ইচ্ছা করতেন তখন তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে লটারী করতেন। যাঁর নাম উঠত তাঁকে তিনি সাথে নিতেন। বনী মুস্তালিক যুদ্ধে হযরত আয়েশা (রা)-র নাম ওঠে। ফলে এ সফরে তিনিই হন তাঁর সফর সঙ্গী। প্রত্যাবর্তনকালে মদীনার নিকটবর্তী হতেই সেখানেই অবস্থান করেন এবং রাত্রির কিছু অংশ সেখানেই যাপন করেন। এরপর তিনি যাত্রা শুরুর ঘোষণা দেন। হযরত আয়েশা (রা) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে গেলে গলার হারটি কোথাও খুলে পড়ে যায় যা তিনি টের পাননি। তিনি তাঁর হাওদায় ফিরে আসার পর জানতে পারেন যে, তাঁর গলায় হার নেই। হার্যের খোঁজে তিনি পুনরায় সেখানে যান। ইতোমধ্যে যাত্রার ঘোষণা দেওয়া হয়ে গেছে। তাঁর হাওদা উটের পিঠে ওঠাবার দায়িত্ব যার ওপর ছিল তিনি নিয়মাফিক আসেন এবং এই ধারণায় যে, তিনি (হযরত আয়েশা) হাওদার ভেতরেই আছেন, হাওদা উঠিয়ে রওয়ানা হয়ে পড়েন।
হযরত আয়েশা (রা) এ সময় খুবই অল্প-বয়স্কা এবং খুবই হালকা-পাতলা গড়নের ছিলেন। এজন্য তিনি বুঝতে পারেননি যে, তিনি (হযরত আয়েশা) ভেতরে নেই। এ ব্যাপারে তাঁর কোনরূপ সন্দেহও হয়নি। হযরত আয়েশা (রা) ফিরে এসে দেখতে পান সেখানে কেউ নেই, সকলেই রওয়ানা হয়ে গেছে। তিনি তখন (কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে) সেখানেই চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। ইতোমধ্যে সাফওয়ান ইবন মু’আত্তাল আস-সুলামী, যিনি কোন এক প্রয়োজনে কাফেলার থেকে পেছনে পড়ে গিয়েছিলেন, এসে উপস্থিত হন। তিনি হযরত আয়েশা (রা)-কে এভাবে দেখতেই বুঝতে পারেন যে, এতো দেখছি রাসুলুল্লাহ (সা)-এর জীবন-সঙ্গিনী। তিনি ইন্না লিল্লাহ পড়ে নিজের উটটি তাঁর কাছে ঠেলে দেন এবং স্বয়ং পেছনে সরে যান। হযরত আয়েশা (রা) উটের পিঠে চড়ে বসলে তিনি উটের রশি (নাকাল) ধরে কাফেলা ধরবার জন্য দ্রুত অগ্রসর হন। তিনি যখন কাফেলার কাছাকাছি উপস্থিত হন তখন কাফেলা মনযিলে পৌঁছে ছাউনি ফেলেছে এবং বিশ্রাম করছে। এখানেই ঘটনার শেষ। এতে কারো মনেই সন্দেহের সামান্যতম রেখাপাতও করেনি। কেননা মরুচারী জীবনে ও কাফেলার আনাগোনায় তারা এতে অভ্যস্ত ছিল। সম্মান ও মর্যাদার হেফাজত তাদের অস্থি-মজ্জায় মিশে ছিল এবং এই ধরনের নীচ কল্পনা তাদের আরবী গুণাবলীর সঙ্গে আদৌ কোন সম্পর্ক রাখত না। জাহিলিয়াত ও ইসলাম উভয় যুগই এই নীতি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ছিল। জাহিলী যুগের জনৈক কবি বলেন :

“যদি প্রতিবেশী কোন মহিলার ওপর আমার নজর পড়ে যায় তাহলে আমি আমার চোখ নামিয়ে নিই যতক্ষণ না সে তার বাসার ভেতর অন্তর্হিত হয়।”
অপরদিকে সাহাবায়ে কিরাম (রা)-এর রাসুলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে এমন সম্পর্ক
ছিল এমন যেমন সম্পর্ক থাকে পিতার সাথে সন্তানের। তাঁর পবিত্র সহধর্মিণীগণ ছিলেন মু’মিনদের মাতৃসম। তিনি স্বয়ং তাঁদের দৃষ্টিতে প্রকৃত পিতা, এমন কি সমগ্র দুনিয়া থেকেও প্রিয় ছিলেন। সাফওয়ান ইবনে মু’আত্তালও দীনদারী, তাকওয়া-পরহেযগারী, লজ্জাশীলতা ও শালীনতাবোধের ক্ষেত্রে সুনামের অধিকারী ছিলেন। এও কথিত আছে যে, মহিলাদের প্রতি তাঁর কোনরূপ দুর্বলতা কিংবা আকর্ষণ ছিল না।
মোটের ওপর এটা এমন কোন সমস্যা ছিল না যা লোকের মনোযোগ আকর্ষণের বিষয় হতে পারে। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি ইবনে সেলূল ব্যাপারটা লুফে নেয় এবং মদীনায় এসে এর খুব ফলাও প্রচার করে। মুনাফিকরা এ ধরনের সুযোগের প্রতীক্ষায় ছিল, একে দুর্লভ মুহূর্ত জ্ঞানে এর খুব ফলাও করে। তাদের কাছে এটি এমন এক অস্ত্র ছিল যদ্বারা মুসলমানরা খুব সহজেই ফেতনায় পড়তে পারত এবং মাকামে রিসালাত ও আহলে বায়ত-এর সঙ্গে তাঁদের ভক্তি-শ্রদ্ধা ও ভালবাসার সম্পর্ক দুর্বল করা যেত। এর দ্বারা মুসলমানদের পারস্পরিক আস্থা এবং একে অপরের ভরসা ও নির্ভরতা আহত হত। এই চক্রান্তে এমন কিছু সরল অন্তঃকরণবিশিষ্ট মুসলমানও শিকার হন যাঁদের কথা বলার আগ্রহ ছিল বেশি এবং যাঁরা কোনরূপ খোঁজ-খবর ছাড়াই ও যাচাই-বাছাই না করেই শোনা কথা বলতে ছিলেন অভ্যস্ত।
হযরত আয়েশা (রা) যখন মদীনায় আকস্মিকভাবেই এ কথা শুনতে পেলেন তখন তিনি বিস্ময়ে ও দুঃখে হতবাক হয়ে গেলেন। দুঃখ ও বিষাদে তাঁর অবস্থা এমন হল যে, তাঁর কান্না থামতে চাইত না। রাতের ঘুম উড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জন্য ব্যাপারটা ছিল খুবই কঠিন ও নাযুক। তিনি যখন জানতে পারলেন যে, কথা কোথা থেকে শুরু হয়েছিল তখন আগমন করলেন এবং আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি সম্পর্কে কিছু বলার অনুমতি চাইলেন। তিনি মসজিদের মিম্বরে বসলেন এবং বললেন, “মুসলমানগণ! আমাকে সেই লোকের বিষয়ে কিছু বলার ব্যাপারে কে অনুমতি দেবে যে ব্যক্তি আমার পরিবারের লোকদের সম্পর্কে আমাকে কষ্ট দিচ্ছে যার সম্পর্কে আমি জানি? আল্লাহ্ কসম! আমি আমার ঘরের লোকদের সম্পর্কে যতটা জানি তাতে আমি তৃপ্ত। লোকে এ ব্যাপারে যে লোক সম্পর্কে
বলাবলি করছে তার সম্পর্কেও আমি ভালই জানি। সে যখন আমার ঘরে আসত আমার সাথেই আসত।” আওস গোত্রের কিছু লোক এ কথা শুনে রাগে ও ক্রোধে অধীর হয়ে বলতে লাগল, যে লোক এত বড় কথা মুখ দিয়ে বের করেছে আমরা তার গর্দান উড়িয়ে দেবার জন্য তৈরী, চাই সে আওস গোত্রের লোকই হোক, চাই খাযরাজের। ‘আবদুল্লাহ ইবন উবায়্যি ছিল খাযরাজ গোত্রের। এ কথা শোনার পর তার ভেতর গোত্রীয় অহমিকা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। ফলে উভয় গোত্রই উত্তেজিত হয়ে পড়ল। শয়তান উভয়ের ঘাড়ে সওয়ার হওয়ার উপক্রম করতেই এবং লড়াই বাঁধবার মত অবস্থা সৃষ্টি হতেই রাসুলুল্লাহ (সা)-র ক্ষিপ্র বুদ্ধি, কৌশল, ধৈর্য ও সহনশীলতার বরকতে ব্যাপারটা বেশি দূর গড়াবার আগেই মিটে যায়। এদিকে হযরত আয়েশা (রা) আপন নির্দোষিতা সম্পর্কে পূর্ণ বিশ্বাসী। এজন্য তিনি চলনে-বলনে আস্থা, আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসে উজ্জীবিত ছিলেন এবং এসব তাঁর চেহারায় ফুটে উঠত। তাঁর অবস্থা ছিল নিরপরাধ ও নিষ্পাপ সেই ব্যক্তির ন্যায় যিনি সব রকম সন্দেহ-সংশয়ের ঊর্ধ্বে। তাঁর পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁকে শেষাবধি এই অপবাদ থেকে মুক্তি দেবেন এবং নবুওয়াতের অঞ্চল প্রান্তে অমূলক সন্দেহ ও অপবাদের কলঙ্ক থাকতে দেবেন না। কিন্তু তাঁর এ ধারণা ছিল না যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর জন্য বিশেষভাবে ওযাহী নাযিল করবেন এবং এই আয়াত কুরআন মজীদের অংশ হিসাবে কিয়ামত অবধি পঠিত হতে থাকবে।
তাঁকে বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। তাঁর সম্পর্কে কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হয় এবং সপ্ত আসমানের ওপর থেকে তাঁর নির্দোষিতা ঘোষিত হয় :

“যারা মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। তোমরা একে নিজেদের জন্য খারাপ মনে কর না, বরং এটা তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক। তাদের প্রত্যেকের জন্যে ততটুকু আছে যতটুকু সে গোনাহ করেছে এবং তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে তার জন্য রয়েছে বিরাট শাস্তি। তোমরা যখন এ কথা শুনলে, তখন ঈমানদার পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করনি এবং কেন বলনি যে, এটাাতো নির্জলা অপবাদ” (সূরা নূর, ১১-১২ আয়াত)?
এভাবেই এই বিরাট ফেতনা চিরতরে খতম হয়ে যায় এবং এ কথা এভাবে মুছে যায় যেন কোন কিছুই হয়নি। মুসলমানগণ স্বাভাবিক নিয়মমাফিক একইরূপ উৎসাহ-উদ্দীপনা সহকারে নিজেদের সেই মহান কর্মের পূর্ণতা সাধনে মশগুল হয়ে যায় যার ওপর কেবল তাদের নয়, বরং সমগ্র মানবতার সাফল্য ও কামিয়াবী ছিল নির্ভরশীল।