মদীনায়

মদীনায়
মদীনা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কিভাবে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল?

আনসাররা আগেই জেনেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কা থেকে রওনা হয়ে গেছেন। অনন্তর তাঁরা একে তাঁদের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত করে নিয়েছিলেন যে, প্রত্যহ ফজর বাদ তাঁরা শহরের শেষ প্রান্তে চলে যেতেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অপেক্ষা করতেন এবং রৌদ্রতাপ প্রখর ও তীব্র না হওয়া অবধি এবং সহ্যের বাইরে না চলে যাওয়া ও ছায়ায় আশ্রয় নিতে বাধ্য না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা সে স্থান ত্যাগ করতেন না। এরপর তাঁরা যে যার ঘরে ফিরতেন। এ সময় ছিল গ্রীষ্ম মরশুম। ফলে রৌদ্রতাপের তীব্রতা ছিল প্রচণ্ড।

রাসূলুল্লাহ (সা) যে সময় মদীনায় গিয়ে উপস্থিত হন সে সময় আনসারগণ প্রতিদিনের স্বাভাবিক অপেক্ষার পর যার যার ঘরে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। সর্বাগ্রে জনৈক ইয়াহূদী রাসূলুল্লাহ (সা)-কে মদীনা পানে অগ্রসর হতে দেখে। ইয়াহূদী প্রতিদিন আনসারদেরকে এভাবে অপেক্ষা করতে দেখত। রাসূলুল্লাহ (সা)-কে দেখতে পেয়েই সে সজোরে ডাক দেয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-র আগমন বার্তা সম্পর্কে আনসারদেরকে অবহিত করে। রাসূল (সা)-এর আগমনবার্তা পেতেই যে যার বাড়ি-ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। তাঁরা দেখতে পান নবী (সা) একটি খেজুর গাছের ছায়ায় বিশ্রামরত, সাথে হযরত আবু বকর (রা)। হযরত আবু বকর (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রায় সমবয়সীই ছিলেন। আনসারদের অধিকাংশই ইতোপূর্বে আর কখনও রাসূলুল্লাহ (সা)-কে দেখেননি। ফলে অ্যাগ্রাতিশয্যে তাঁরা উভয়কেই ঘিরে ধরেন এবং কখনও বা রাসূল ভ্রমে হযরত আবু বকরকেও সালাম করছিলেন। ভিড় বাড়ছিল। হযরত আবু বকর (রা) অনুভব করছিলেন যে, লোকেরা বুঝতে পারছে না উভয়ের মধ্যে কে মাখদূম আর কে খাদেম। এই ভ্রম দূর করবার মানসে একটি চাদর নবী (সা)-এর মাথার ওপর ছায়াস্বরূপ তিনি মেলে ধরলেন। ফলে এ ভ্রম দূরীভূত হয়।

প্রায় পাঁচ শত আনসারের একটি বিরাট জামা’আত এই মুবারক কাফেলাকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করে। অবশেষে তাঁরা অত্যন্ত সম্ভ্রমের সাথে ও সৌজন্য সহকারে নবী করীম (সা) সমীপে নিবেদন পেশ করেন : হুজুর! তশরীফ নিয়ে চলুন। আপনি

এখন সর্বপ্রকারে ও সর্বপ্রযত্নে নিরাপদ। আপনি যাই বলবেন তা শোনা হবে ও মানা হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর সফরসঙ্গীসহ কাফেলার অগ্রভাগে থেকে সম্মুখে রওনা হলেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে অভ্যর্থনা জানাতে গোটা মদীনা যেন ভেঙে পড়ল। সবাই তাঁকে খোশআমদেদ জানাতে উদ্‌গ্রীব। মহিলারা দালানকোঠার ছাদে উঠে এই নবাগত কাফেলাকে দেখছিল এবং একে অপরকে বলছিল : এঁদের মধ্যে মহানবী (সা)-কে? হযরত আনাস (রা) বলেন : এরপর আমরা আর কখনো এই দৃশ্য দেখতে পাইনি।

মানুষ পথে-ঘাটে, লোক চলাচলের রাস্তায়, ঘরের ছাদে, খিড়কি পথে ও দরজায়, এক কথায় সর্বত্রই জমায়েত। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, মনিব-ভৃত্য সকলের মুখেই এক কথা এক আওয়াজ :

আল্লাহু আকবার, রাসূলুল্লাহ এসেছেন। আল্লাহু আকবার! মুহাম্মদ এসেছেন। আল্লাহু আকবার! আল্লাহর রাসূল আগমন করেছেন।

বা’রা ইবন আযিব (রা) তখন খুব ছোট ছিলেন, অল্পবয়স্ক ছিলেন। তিনি বলেন, আমি মদীনাবাসীকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আগমনে যত খুশী হতে দেখেছি অন্য কিছুতে তত খুশী হতে দেখিনি। দাস-দাসীরাও আনন্দের আতিশয্যে এই বলে চিৎকার করে ফিরছিল : রাসূলুল্লাহ (সা) এসেছেন, আল্লাহর রাসূল এসেছেন।

মুসলমানেরা তাঁর শুভাগমনে খুশী ও আনন্দাতিশয্যে তাকবীর ধ্বনি দেয়। মনে হচ্ছিল তাঁদের জীবনে এর চেয়ে বড় আনন্দ যেন আর কখনও আসেনি! মনে হচ্ছিল মদীনা যেন মুচকি মুচকি হাসছে আর গর্বে ও আনন্দে ফুলে ফুলে উঠছে। মদীনার কচি শিশুরা হেলেদুলে নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করছিল:

তরজমা : 

১. ছানিয়াতুল বিদা পাহাড়ের দিক থেকে পূর্ণিমার চাঁদের উদয় ঘটেছে।

২. এতদিন আল্লাহর নাম নেবার মত একজনও থাকবে আমাদের ওপর শুকরিয়া আদায় করা ওয়াজিব হবে।

৩. আমাদের মধ্যে প্রেরিত ওহে সজ্জন! আপনি বাধ্যতামূলক আনুগত্যের নির্দেশ নিয়ে এসেছেন।

হযরত আনাস ইবন মালিক আনসারী (রা) সে সময় খুবই অল্পবয়স্ক ছিলেন। তিনি বলেন, যে দিন রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় তশরীফ নেন সেদিন আমি উপস্থিত ছিলাম। আমি এর চাইতে সুন্দর ও আলোকোজ্জ্বল দিন আর দেখিনি যেদিন রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের এখানে (মদীনায়) তশরীফ আনেন।

কুবা মসজিদ ও মদীনার প্রথম জুমু‘আ

রাসূলুল্লাহ (সা) কুবায় চার দিন অবস্থান করেন এবং এখানে একটি মসজিদের বুনিয়াদ রাখেন। জুমু‘আর দিন তিনি সেখান থেকে সামনে অগ্রসর হয়ে বনী সালেম ইবন আওফ মহল্লায় গিয়ে উপস্থিত হন। সালাতের সময় হলে তিনি এখানেই মহল্লার মসজিদে জুমু‘আ আদায় করেন। এটিই ছিল জুমু‘আর প্রথম সালাত যা তিনি মদীনায় আদায় করেন।

আবু আইয়্যুব আনসারী (রা)-র গৃহে

রাসূলুল্লাহ (সা) যখন শহরের পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছিলেন তখন পথিমধ্যে লোকেরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে হুজুর আকরাম (সা) সমীপে দরখাস্ত পেশ করতে থাকে হযরত (সা) যেন তাদের ঘরে অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি তাদের ঘরে সম্মান, মর্যাদা ও সাজ-সামান ও সংখ্যাসহ অবস্থান করুন। কখনওবা তারা আগ্রহাতিশয্যে উটের রশি ধরেও টানছিল। তিনি তখন বলছিলেন : ওকে যেতে দাও! ওতো আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট। এমনটি কয়েকবারই হয়েছিল।

রাসূলুল্লাহ (সা) যখন বনী নাজ্জারের মহল্লা দিয়ে অতিক্রম করছিলেন তখন মহল্লার ছোট ছোট শিশু ও কিশোরীরা নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে তাঁকে অভ্যর্থনা জানায় :

“আমরা নাজ্জার গোত্রের মেয়ে। কী সৌভাগ্য আমাদের যে, মুহাম্মাদ আমাদের প্রতিবেশী!”

(এভাবে চলতে চলতে) তিনি যখন বনী মালিক ইবন আন-নাজ্জারের ঘর পর্যন্ত পৌঁছলেন তখন উটনী এক স্থানে, যেখানে আজ মসজিদে নববীর দরজা অবস্থিত, আপনাআপনি বসে পড়ল। সে সময় সেখানে খেজুরের একটি বাগান ছিল। জায়গাটি ছিল বনী নাজ্জারের দু’টি ইয়াতীম বালকের। তারা রাসূল (সা)-এর মাতৃকুলের দিক দিয়ে আত্মীয়তা সূত্রেও সম্পর্কিত ছিল।

রাসূলুল্লাহ (সা) উটনী পৃষ্ঠ থেকে নেমে আসেন। আবু আইয়্যুব আনসারী ( খালিদ ইবন যায়দ আন-নাজ্জারী আল-খাযরাজী) তক্ষুণি তাঁর সামানপত্র নামিয়ে বাসায় যান। রাসূলুল্লাহ (সা) এখানেই অবস্থান গ্রহণ করেন। আবু আইয়্যুব আনসারী (রা) হুজুর আকরাম (সা)-এর মেহমানদারী, সেবা-যত্ন ও ভক্তি-সম্মান প্রদর্শনে কোন ত্রুটিই রাখেননি। রাসূলুল্লাহ (সা) আবু আইয়্যুব আনসারী (রা)-র দ্বিতল গৃহের নীচতলায় অবস্থান গ্রহণ করেন। কিন্তু এতে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি অবমাননা হবে বিধায় তিনি তার নিজের ব্যবহৃত দ্বিতল রাসূল (সা)-এর জন্য ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করেন। তিনি নীচে নেমে রাসূল (সা)-এর খেদমতে এ ব্যাপারে আরজি পেশ করেন এবং ওপর তলায় অবস্থান নিতে অনুরোধ জানান। জবাবে তিনি বলেন : আবু আইয়্যুব! আমি আমার ও আমার সাক্ষাৎপ্রার্থীদের পক্ষে নীচের তলায় অবস্থান অধিকতর সুবিধাজনক হবে বলে মনে করি।

আবু আইয়্যুব আনসারী (রা)-র অবস্থা তেমন সচ্ছল ছিল না। কিন্তু আজ স্বয়ং তাঁরই গরীবালয়ে হুজুর আকরাম (সা)-এর অবস্থানে তাঁর খুশীর অন্ত ছিল না। এই বিরল ও দুর্লভ সম্মান ও সৌভাগ্যের (আল্লাহ তা’আলা যা তাঁকে দান করেছিলেন) কৃতজ্ঞতা প্রকাশে তাঁর ভাষা ছিল অক্ষম। প্রেম ও ভালবাসাই খেদমতের আদব শেখায় (অর্থাৎ প্রেমাাস্পদের খেদমত কিভাবে করতে হবে তার জন্য কোন নিয়মনীতি শেখার দরকার হয় না, প্রেমাবেগই এর জন্য যথেষ্ট)। আবু আইয়্যুব আনসারী (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর রাত্রের খাবার তৈরি করে পাঠাতাম। খাবার শেষে ভোজ্য উচ্ছিষ্ট কিছু ফিরে আসলে আমি ও আমার স্ত্রী উম্মু আইয়্যুব তা রাসূল যেখানটায় মুখ লাগিয়ে খেয়েছেন সেখান থেকে খেয়ে নিতাম এবং বরকত হাসিল করতাম। রাসূল (সা) নীচতলায় থাকতেন আর আমরা থাকতাম ওপর তলায়। একবার পানি রাখার মশকটা ভেঙে যায়। ফলে আমি আর উম্মু আইয়্যুব আমাদের পরিধেয় একমাত্র চাদর দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানি শুষে নিলাম যাতে তা কোনভাবে গলিয়ে নীচে অবস্থানরত আল্লাহর রাসূল (সা)-এর কষ্টের কারণ না হয়।

মসজিদে নববী ও গৃহ নির্মাণ

রাসূলুল্লাহ (সা) ইয়াতীম বালকদ্বয়কে ডেকে পাঠান এবং তাদের কাছ থেকে জায়গাটি মসজিদ নির্মাণের জন্য খরিদ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তারা বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনাকে এটি হাদিয়া হিসাবে পেশ করছি। কিন্তু তিনি এভাবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন, বরং কোন না কোনভাবে মূল্য দিয়ে জমিটুকু গ্রহণ করেন এবং সেখানে মসজিদ তৈরি করেন।

মসজিদ নির্মাণে তিনি স্বয়ং অংশ গ্রহণ করেন। তিনি ইট বহন করতেন আর সাহাবীরা তাঁকে অনুসরণ করতেন। এ সময় তিনি আবৃত্তি করতেন :

“হে আল্লাহ! আখেরাতের পুরস্কারই তো প্রকৃত পুরস্কার; অতএব, আনসার ও মুহাজিরদেরকে আপনি দয়া করুন।”

মুসলমানরা সে সময় খুবই আনন্দোৎফুল্ল ছিলেন। তাঁরা উদ্দীপনামূলক কবিতা পাঠ করতেন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন।

রাসূলুল্লাহ (সা) আবু আইয়্যুব আনসারী (রা)-র ঘরে সাত মাস অবস্থান করেন। মসজিদ ও বাসগৃহ নির্মাণের পর তিনি সেখানে স্থানান্তরিত হন।

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মদীনায় আগমনের পর মুহাজিরদের আগমন ধারা অব্যাহত থাকে। শেষাবধি মক্কায় কেবল দু’ধরনের লোকই অবশিষ্ট থেকে যায় : (১) যারা ফেতনা কিংবা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিপতিত হয়েছিলেন অথবা (২) শত্রু হস্তে বন্দী ছিলেন যেখান থেকে মুক্তির দৃশ্যত কোন রাস্তা ছিল না। অপরদিকে আনসারদের এমন কোন ঘর ছিল না যেখানে লোক ইসলাম কবুল না করেছে।

মুহাজির ও আনসারদের ভ্রাতৃবন্ধন

রাসূলুল্লাহ (সা) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে পরস্পরের শোকে-দুঃখে ও বিষাদ-বেদনায় সমবেদনা ও সাহায্য-সহানুভূতি প্রদর্শনের নিমিত্ত পারস্পরিক ভ্রাতৃবন্ধনের সূত্রপাত ঘটান। আনসার ও মুহাজিরগণ একে অপরের সঙ্গে ভ্রাতৃবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য এমনভাবে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতেন যে, অবশেষে তা লটারীতে গিয়ে উপনীত হত। তাঁরা মুহাজিরদেরকে নিজেদের ঘরবাড়ি, ঘরের তৈজসপত্র, টাকা-পয়সা, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, এমন কি যাবতীয় বিষয়-আশয় তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে দিয়ে দিয়েছেন যাতে সেগুলো তাঁরা তাঁদের প্রয়োজনমত ব্যবহার করতে পারেন এবং মুহাজিরদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার প্রদান করতেন।

একজন আনসারী তাঁর মুহাজির ভাইকে বলেছেন : দেখ, এই আমার ধন-সম্পদ; এর অর্ধেক তোমার, যেটা খুশী গ্রহণ কর। আমার দু’জন স্ত্রী। এদের যাকে তোমার পছন্দ বল, আমি তাকে তালাক দেই এবং তোমার সঙ্গে বিয়ে দেই। মুহাজির উত্তর দেন : আল্লাহ তা’আলা তোমার ঘরে-বাইরে ও বিষয়-আশয়ে বরকত দান করুন (ওসব তোমারই থাকুক)। দয়া করে তুমি আমাকে বাজারের রাস্তাটা বাতলে দাও (ওখানেই আমি আমার ভাগ্য পরীক্ষা করব)।

আনসারদের কাজ ছিল মুহাজিরদের অনুকূলে আপন স্বার্থ কুরবানী এবং তাদের মুহাজির ভাইদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার প্রদান। আর মুহাজিরদের কাজ ছিল এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া ও আত্মমর্যাদাবোধকে সমুন্নত রাখা।

ভ্রাতৃবন্ধন ও এর গুরুত্ব

এই ভ্রাতৃবন্ধন আপন প্রকৃতির দিক দিয়ে ছিল একক ও অনন্য, ইসলামী ও বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের বুনিয়াদ, দাওয়াতের অধিকারী (দাঈ) একটি উম্মাহর প্রতিষ্ঠার সূচনা যা এক নতুন পৃথিবী নির্মাণের জন্য আন্দোলিত হচ্ছিল এবং যা সঠিক, বিশুদ্ধ ও নির্দিষ্ট আকীদা-বিশ্বাস এবং দুনিয়াকে দুর্ভাগ্য ও বিশৃঙ্খলার হাত থেকে মুক্তি দানকারী নেক মকসুদ, ঈমান ও অর্থপূর্ণ ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যবদ্ধ কর্মতৎপর সম্পর্কের জন্য প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল। এভাবেই মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে এই সীমিত ভ্রাতৃত্ব মানবতার জগতে নতুন জীবন ও জিন্দেগীর পূর্বাভাস প্রমাণিত হয়। এজন্যই আল্লাহ তা’আলা একটি ছোট্ট শহরের এক ছোট্ট জামাআতকে সম্বোধন করতে গিয়ে বলেন :

“যদি তোমরা তা না কর তাহলে পৃথিবীতে এক মহা ফেতনা ও বিরাট বিপর্যয় দেখা দেবে” (সূরা আনফাল : ৭৩ আয়াত)।

মহানবী (সা)-এর মদীনার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ইয়াহূদীদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর এ সময় মুহাজির ও আনসারদের সমন্বয়ে মদীনার বিভিন্ন জাতি-গোত্র-সম্প্রদায় ও ইয়াহূদীদের নিয়ে একটি চুক্তি সম্পাদন করেন। এতে সকলকে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়, অমুসলিমদের যার যার ধর্ম পালন ও আপন সহায়-সম্পত্তি রক্ষার অধিকার স্বীকার করা হয়, তাদের যাবতীয় মৌলিক অধিকার এবং যার যার দায়িত্ব ও কর্তব্যের রূপ ও সীমারেখা চিহ্নিত করা হয়।

আযানের হুকুম

রাসূলুল্লাহ (সা) যখন মদীনার বুকে পরিপূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করলেন

এবং ইসলাম দৃঢ়তা ও সুসংহত রূপ লাভ করল তখন সালাতের জন্য মুসলমানদেরকে ডাকার সেই সব পন্থা যা ইয়াহূদী ও খৃষ্টানদের ভেতর প্রচলিত ছিল সেগুলো, যেমন ঘণ্টা বাজানো, শিঙ্গায় ফুক দেয়া, আগুনের মশাল জ্বালানো প্রভৃতি অপছন্দ করলেন। তখন পর্যন্ত মুসলমানরা কোনরকম পূর্ব ঘোষণা ও ডাকাডাকি ছাড়াই সালাতের ওয়াক্তে আপনাআপনিই হাজির হয়ে যেতেন। এমনি মুহূর্তে আল্লাহ পাক আযান দ্বারা মুসলমানদেরকে ধন্য ও গৌরবান্বিত করেন এবং স্বপ্নের মাধ্যমে কোন কোন সাহাবীকে এর বাস্তব রূপ ও দৃশ্যও দেখানো হয়। অনন্তর তিনি এই আযানকেই নির্ধারিত করেন এবং শারঈভাবেই এর প্রচলন ঘটান। অতঃপর আযান দানের এই মহান খেদমত হযরত বিলাল ইবন রাবাহ হাবশী (রা)-কে সোপর্দ করা হয়। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মুওয়ায্যিন এই উপাধিতে ভূষিত এবং কেয়ামত অবধি যত মুওয়ায্যিন আসবেন তাঁদের ইমাম হওয়ার অনন্য গৌরব লাভ করেন।

মদীনায় নিফাক ও মুনাফিকদের আবির্ভাব

মক্কায় নিফাক অর্থাৎ মুনাফাকী ছিল না আর তা এজন্য যে, সেখানে ইসলাম ছিল পরাজিত ও অসহায়। তার ভেতর অবস্থার পরিবর্তনের কোন শক্তি ছিল না। সে কাউকে সুবিধা প্রদান কিংবা ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখত না, বরং মক্কায় ইসলাম কবুল করার অর্থই ছিল সর্বপ্রকার বিপদ-আপদ ও ক্ষয়ক্ষতি বরণ, শত্রুতা ক্রয়, জেনেশুনে শত্রুকে উত্তেজিত করে তোলা ও তাকে আরও উস্কে দেওয়া। এরূপ দুঃসাহস একমাত্র সেই ব্যক্তিই করতে পারত যে কথায় সত্যবাদী ও সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তির অধিকারী, যার ঈমান মজবুত এবং যে নিজেকে, নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎকে বিপদের মুখে নিক্ষেপ করতে প্রস্তুত হত। মক্কায় উভয় শক্তির মধ্যে ভারসাম্য ছিল না। কাফির মুশরিকরা ছিল প্রবল শক্তির অধিকারী ও বিজয়ী আর মুসলমানরা ছিল মজলুম ও দুর্বল। কুরআন মজীদ এই অবস্থার একটি চিত্র আপন তেজস্বী ভঙ্গীতে পেশ করেছে এভাবে :

“আর স্মরণ কর যখন তোমরা ছিলে অল্প আর দুর্বল, আর ছিলে ভীত-সন্ত্রস্ত যে,

না জানি তোমাদেরকে লোকে ছোঁ মেরে নিয়ে যায়” (সূরা আনফাল, ২৬ আয়াত)।

ইসলাম যখন মদীনায় স্থানান্তরিত হল আর রাসূলুল্লাহ (সা) ও সাহাবা-ই কিরাম (রা) শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা লাভ করলেন, ইসলামী সমাজ তার সমগ্র শর্ত ও আবশ্যকীয় উপাদানসহ অস্তিত্ব লাভ করল তখন অবস্থার মধ্যে এক ধরনের বিশেষ পরিবর্তন দেখা দিল এবং নিফাক তথা মুনাফাকী মাথা গজাল। এটি ছিল এক ধরনের স্বভাবগত ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয় যা থেকে পালাবার কোন পথ ছিল না। সম্ভবও ছিল না এজন্য যে, নিফাক সব সময় সেখানেই জন্ম নেয় এবং হাত-পা মেলে যেখানে দুটো পরস্পরবিরোধী দাওয়াত ও প্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্ব বর্তমান থাকে। এমতাবস্থায় এ দুয়ের মধ্যবর্তী ও দ্বিধাগ্রস্ত পক্ষ এই দুই দাওয়াত ও নেতৃত্বের মাঝখানে দোলায়মান অবস্থায় থাকে। তারা দ্বিধাগ্রস্ত ও চিন্তাযুক্ত থাকে যে, কোন দাওয়াতকে তারা কবুল করবে এবং কোনটিকে তারা পরিত্যাগ করবে। কখনও তারা একটি দাওয়াত কবুল করে নেয় এবং সেই শিবিরে গিয়ে নাম লেখায়, তার সঙ্গে আবেগ উদ্দীপক ও বিশ্বস্ততার সম্পর্কও কায়েম করে। কিন্তু তাদের পার্থিব স্বার্থ ও প্রতিপক্ষ দাওয়াতের বিস্তার, তার বিজয়, প্রাধান্য ও উত্থান তাকে তার যথার্থ অবস্থান গ্রহণ এবং প্রথম দাওয়াতের পতাকাতলে আসার ঘোষণা প্রদান থেকে বিরত রাখে এবং তারা তাদের প্রাচীন পরিবেশের সঙ্গে একেবারে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে না। কুরআন মজীদ দ্বিধাগ্রস্ততা ও অস্থিরচিত্ততার এই অবস্থার খুবই নাযুক ও জীবন্ত চিত্র অংকন করেছে। ইরশাদ হচ্ছে :

“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে জড়িত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি সে কল্যাণপ্রাপ্ত হয় তবে ইবাদতের ওপর কায়েম থাকে আর যদি কোন পরীক্ষায় পড়ে তবে পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। ইহকাল ও পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্ত আর এটাই প্রকাশ্য ক্ষতি” (সূরা হজ্ব, ১১ আয়াত)।

এদের গুণপণা অপর এক আয়াতে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে :

“মাঝখানে ঝুলন্ত অবস্থায়, না এদিকে আর না ওদিকে” (সূরা নিসা, ১৪৩)।

আওস ও খাযরাজ গোত্রের এবং ইয়াহুদীদের সঙ্গে সম্পর্কিত এসব মুনাফিকদের নেতৃত্বে ছিল আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সেলুল। বু’আছ যুদ্ধের পর সকলে একমত হয়ে তাকে তাদের নেতা বলে স্বীকার করে নিয়েছিল। ইসলাম যখন এখানে প্রবেশ করে তখন তার রাজমুকুট পরিধানের প্রস্তুতি চলছিল। যখন সে দেখতে পেল যে, লোক বিপুল সংখ্যায় ও দ্রুততার সঙ্গে ইসলাম কবুল করছে তখন বিষয়টি কাঁটার মত তার দিলে খচখচ করে বিঁধতে থাকল। সে কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিল না। ইবনে হিশামের বর্ণনা: রাসূলুল্লাহ (সা) যে মুহূর্তে মদীনায় তশরীফ নেন সে সময় আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সেলুল ছিল মদীনাবাসীর সর্দার। আওস ও খাযরাজ গোত্র ইসলাম আগমনের পূর্বে তাকে ব্যতিরেকে আর কারো নেতৃত্বের ব্যাপারেই একমত হতে পারছিল না। এই দুই গোত্রের আর কাউকেই তারা তাদের নেতা বানাতে রাজী ছিল না। তার সম্প্রদায় রাজমুকুট হিসেবে শিরে ধারণের জন্য (كورِيون) একটি মুকুটও বানিয়ে রেখেছিল যা সে তাদের সম্রাট হিসেবে পরিধান করবে। এরকম একটি অবস্থায় আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূল (সা)-কে এখানে পাঠালেন। এরপর তার জাতি ও সম্প্রদায় তাকে পরিত্যাগপূর্বক যখন মুসলমান হয়ে গেল তখন তার দিলে কঠিন হিংসা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হল। সে অনুভব করল যে, রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে তার সর্দারী ও সম্মান থেকে বঞ্চিত করলেন। কিন্তু যখন সে এও দেখতে পেল যে, তার জাতিগোষ্ঠী কোন অবস্থাতেই ইসলাম পরিত্যাগ করতে রাজী নয় তখন সেও নেহায়েত অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইসলামে প্রবেশ করল বটে, কিন্তু মুনাফিকী, অন্তর্ জ্বালা ও হিংসা-বিদ্বেষকে আগাগোড়াই অন্তর মাঝে লুকিয়ে রাখল।

এ ধরনের সব লোকই ইসলামের প্রতি শত্রুতায় নেমে পড়ল যাদের অন্তরে কোন ক্ষোভ ছিল এবং যারা ছিল নেতৃত্বের অভিলাষী। সে এই নবতর ধর্মকে অপয়া ভাবতে লাগল যে ধর্ম তার পরিকল্পনাকে ধূলোয় মিশিয়ে দিল, তার সকল আশা-ভরসাকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিল, যা মদীনার রঙ পাল্টে দিয়ে মুহাজির ও আনসারদেরকে একদেহ একপ্রাণ উম্মাহ তৈরি করল, যাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করত এবং তাঁর প্রতি ভালবাসাকে নিজেদের পিতা-পুত্র ও স্ত্রীর ভালবাসার ওপরও অগ্রাধিকার প্রদান করত। এই দৃশ্য ঐসব মুনাফিকের অন্তর রাগে-দুঃখে ও হিংসা-বিদ্বেষ ভরে গেল এবং তারা মহানবী (সা)-এর বিরুদ্ধে নানা রকম ফন্দি-ফিকির ও চক্রান্ত করতে লাগল। এভাবেই মদীনায় ইসলামী তথা মুসলিম সমাজের ভেতরেই একটি বিরোধী যুদ্ধক্ষেত্র সৃষ্টি

হয়ে যায় যাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকা মুসলিম সমাজের পক্ষে জরুরী হয়ে দাঁড়ায়। কেননা এই দলটি কোমরেন ছুরি হিসাবে থেকে যায় এবং ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য প্রকাশ্য শত্রুর চেয়েও অধিক বিপজ্জনক প্রমাণিত হয়।

এটাই কারণ যে, কুরআন মজীদে অধিক সংখ্যায় তাদের কথা বর্ণিত হয় এবং তাদের কৃতকর্মের মুখোশ খুলে দেয়। ইসলামের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল বিভিন্ন ধরনের। এজন্য সীরাত গ্রন্থসমূহে অনিবার্যভাবেই তাদের উল্লেখ এসেছে এবং বর্তমান গ্রন্থেও তা থাকবে ইনশাআল্লাহ।

ইয়াহুদীদের শত্রুতার সূচনা

প্রথম দিকে কিছুটা নিরপেক্ষ ও নিশ্চুপ থাকার পর প্রথমবার ইয়াহুদীদের শত্রুতা ও বিদ্বেষাত্মক মানসিকতার চিহ্নাদি পরিস্ফুট হতে শুরু হয়। তাদের অবস্থান প্রথমে মুসলমান ও মুশরিকদের এবং মক্কাবাসী ও মদীনাবাসীদের মধ্যে নিরপেক্ষ ছিল, বরং সে সময় সম্ভবত ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি তাদের টান তুলনামূলকভাবে বেশীই ছিল। তার কারণ ছিল এই যে, নবুওয়াত, রিসালাত ও আখেরাত দিবসের ওপর (ঈমানের বেলায় কিছু কিছু খুঁটিনাটি বিষয়ে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও), অধিকন্তু আল্লাহ তা’আলার যাত ও সিফাত তথা তাঁর সত্তা, গুণাবলী ও তৌহিদী আকীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তারা ছিল মুসলমানদের খুবই কাছাকাছি, যদিও এই আকীদা-বিশ্বাসও অজ্ঞ ও মূর্খ জাতিগোষ্ঠীর প্রতিবেশে দীর্ঘকাল থাকা ও মূর্তিপূজার পরিবেশে নির্বাসনের এই দীর্ঘ কাল অতিবাহিত করার দরুন খুবই দুর্বল হয়ে গিয়েছিল এবং এতে চরম বাড়াবাড়ি ও কোন কোন নবীর পবিত্রতার ধারণাও অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিল যার কিছুটা পেছনের পৃষ্ঠাগুলোতে বিবৃত ও বর্ণিত হয়েছে।

সমস্ত কার্যকারণ এটা বলত যে, তারা ইসলামের সহযোগী ও সহযোদ্ধা হতে না পারলেও কমপক্ষে এ ব্যাপারে তারা অবশ্যই নিরপেক্ষ থাকবে এজন্য যে, ইসলাম তাদের ধর্মীয় গ্রন্থগুলোকে সমর্থন করে এবং রাসূলুল্লাহ (সা) বনী ইসরাইলের সমস্ত নবীর ওপর ঈমান আনয়নের দাওয়াত দিয়ে থাকেন। কুরআন মজীদ মু’মিনদের ভাষায় বলে :

“সকলেই আল্লাহর ওপর, তাঁর ফেরেশতাদের ওপর, তাঁর কিতাবসমূহের ওপর ও তাঁর রাসূলদের ওপর ঈমান রাখে (এবং তারা বলে), আমরা তাঁর

রাসূলদের মাঝে কোনরূপ ফারক করি না” (সূরা বাকারা, ২৮৫ আয়াত)।

যদি এমনটি হত তাহলে আজ কেবল ইসলামের ইতিহাসই নয়, বরং দুনিয়ার ইতিহাসের গতিধারাই ভিন্নতর হত এবং ইসলামের দাওয়াতকে সেইসব সমস্যা ও সংকটের সম্মুখীন হতে হত না যা ইসলাম ও ইয়াহুদীবাদের দ্বন্দ্ব এবং সেই সব প্রথম দিককার মুসলমান (যারা নিজেদের লালন-পালনের অবস্থায় ছিলেন) ও ইয়াহুদী (যারা শক্তিশালী, প্রভাবশালী, ধনবান ও শিক্ষিত ছিল)-দের ভেতর লড়াই-সংঘাত সৃষ্টি করে দিয়েছিল। এর পেছনে দুটো মৌলিক কারণ ছিল। প্রথমটি হল ইয়াহুদীদের ভেতরকার হিংসা-বিদ্বেষ, সংকীর্ণ মানসিকতা, স্থবির ও পরশ্রীকাতর প্রকৃতি এবং অপরটি হল তাদের বাতিল তথা ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস, নীচু প্রকৃতির আখলাক-চরিত্র ও মন্দ অভ্যাস যেগুলোর ব্যাপারে কুরআন মজীদে নানা জায়গায় সমালোচনা করা হয়েছে এবং তাদের সেই দীর্ঘ ইতিহাসের পর্দা উন্মোচন করা হয়েছে যা আম্বিয়ায়ে কিরাম (আ)-এর সঙ্গে লড়াই সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া, তাঁদের পেশকৃত দাওয়াত ও পয়গামের মোকাবিলা করা, তাঁদেরকে হত্যা করার অমার্জনীয় ধৃষ্টতা, শত্রুতা ও বিদ্রোহাত্মক আচরণ, সত্যের পথে বাধা প্রদান, আল্লাহ তা’আলার ওপর অপবাদ আরোপ, সম্পদ প্রীতি, নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সুদী কায়কারবারের প্রতি আকর্ষণ, অবৈধভাবে লোকের সম্পদ ভক্ষণ, হারাম মালের প্রতি আগ্রহ ও উৎসাহবোধ, তাওরাতে নিজেদের ইচ্ছা ও মর্জিমাফিক রদবদল, পরিমার্জন ও পরিবর্তন, জীবনের প্রতি সীমায়তিরিক্ত ভালবাসা এবং এ ধরনের আরও বহু কিছু তাদের জাতীয় ও বংশগত বৈশিষ্ট্যাবলী দ্বারা পূর্ণ।

যদি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর স্থলে কোন রাজনৈতিক নেতা হতেন তাহলে এই জটিল ও সঙ্গীন অবস্থা (যা সেই সময় মদীনায় কায়েম ছিল) পরিমাপপূর্বক তারই আলোকে কল্যাণ উপযোগী পদক্ষেপ নিতেন। তিনি যদি ইয়াহুদীদের সঙ্গে তোয়াজ-তদবির ও খোশামুদীর ব্যাপার নাও করতেন, তাহলে কমপক্ষে তাদেরকে উত্তেজিত করা ও তাদের শত্রুতা ক্রয় করা থেকে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতেন। কিন্তু তিনি (রাসূলুল্লাহ) রিসালাত ও নবুওয়াতের তাবলীগ, দীনে হক তথা সত্য-সুন্দর জীবন-ব্যবস্থার স্পষ্ট ও খোলাখুলি ঘোষণা, হক ও বাতিলের পার্থক্যকরণ এবং ফাসাদ ও গোমরাহীর মোকাবিলা ও উৎখাত উৎপাদনে ছিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট এবং তাঁকে এ ব্যাপারে যিম্মাদার ও দায়িত্বশীল বানানো হয়েছিল যে, তিনি দুনিয়ার তাবৎ জাতিগোষ্ঠী, ব্যক্তি, দল বা সম্প্রদায়কে, যাদের মধ্যে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানেরাও অন্তর্ভুক্ত, ইসলামের প্রকাশ্য ও খোলাখুলি দাওয়াত

জানাবেন, এজন্য তাঁকে বৃহৎ থেকে বৃহত্তর কুরবানী দিতে হোক এবং যত রকমের কঠিন থেকে কঠিনতর বিপদ-আপদ ও সমস্যা-সংকটের সম্মুখীনই হতে হোক। এটি নবুওয়াতের সেই মেযাজ ও রীতি-পদ্ধতি যার ওপর সমগ্র আম্বিয়া-ই কিরাম (আ) সর্বদাই আমল করেছেন। এই মেযাজ ও রীতি-পদ্ধতিই রাজনীতি ও নবুওয়াতের রাস্তাসমূহকে পৃথক করে দেয় এবং আম্বিয়া-ই কিরাম ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে বুনিয়াদী পার্থক্যের সৃষ্টি করে।

ইয়াহুদীদের আকীদা-বিশ্বাস, তাদের জীবন-যিন্দেগী ও তাদের সীরাত তথা জীবন-চরিত ও কর্মকাণ্ডের ওপর এতে কার্যকর আঘাত লাগে। ফলে তা তাদেরকে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরোধিতা ও শত্রুতায় টেনে নামায়। অনন্তর তারা তাদের এত দিনের পুরনো দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ বদলে দেয় এবং গোপন ও প্রকাশ্য উভয় পন্থায় ইসলামের বিরোধিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দানে নেমে পড়ে। ইয়াহুদী মনীষি ইসরাঈল ওয়েলফিনসন এই বিবাদ ও শত্রুতার কারণ কি তার ওপর কিছুটা সাহসিকতা সহকারে ও স্পষ্ট ভাষায় আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেন :

“যদি রাসূলের শিক্ষামালা কেবল মূর্তিপূজার বিরোধিতা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকত এবং ইয়াহুদীদের থেকে তাঁর নবুওয়াত ও রিসালাত মেনে নেবার দাবি না করা হত তাহলে আর ইয়াহুদী ও মুসলমানদের ভেতর কোন ঝগড়া দেখা দিত না। ইয়াহুদীরা সেক্ষেত্রে সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে রাসূল (সা)-এর শিক্ষামালাকে দেখত, তাঁকে সমর্থন করত এবং জানমাল দিয়ে তাঁকে সাহায্য করত, এমন কি তিনি (রাসূল) ঐ সব মূর্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতেন (আরব উপদ্বীপে যার রাজত্ব চলছিল) এবং পৌত্তলিক আকীদা-বিশ্বাসের অবসান ঘটাতেন যা গোটা আরবে ছড়িয়ে ছিল। কিন্তু এর জন্য শর্ত ছিল এই যে, তিনি তাদের ব্যাপারে ও তাদের ধর্মের ব্যাপারে কোনরূপ মাথা ঘামাবেন না এবং তাদেরকে এই নতুন নবুওয়াত ও রিসালাত কবুল করতে বাধ্যও করবেন না এজন্য যে, ইয়াহুদী মানসিকতা এমন কোন জিনিসের সামনে নরম হতে রাজী হয় না যা তাকে তার ধর্ম থেকে সরিয়ে দিতে চায়। তারা বনী ইসরাঈল ব্যতিরেকে আর কোন বংশের নবীকে মেনে নিতে রাজী হতে পারে না।”

ইয়াহুদীদেরকে এ বিষয়টিও উত্তেজিত করে তোলে যে, তাদের কোন কোন আলেম, যেমন আবদুল্লাহ ইবন সালাম, যাাঁকে তারা খুবই সম্মান করত, শ্রদ্ধা করত,

ইসলাম কবুল করেন। ইয়াহুদীরা ধারণাও করতে পারেনি যে, তাঁর মত একজন মানুষ মুসলমান হয়ে যাবেন। এটি তাদের বুকের হিংসা ও মনের দহন জ্বালাকে আরও বেশি উস্কে দেয়, বাড়িয়ে দেয়।

ইয়াহুদীরা কেবল ইসলামের বিরোধিতা এবং এর থেকে দূরে সরে যাওয়া ও নির্জনতা অবলম্বন করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং আরো সামনে অগ্রসর হয়ে তারা মুশরিক ও মূর্তিপূজকদেরকে সেই সব মুসলমানদের ওপর প্রকাশ্য অগ্রাধিকার দিতে থাকে যারা তৌহিদী আকিদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ইয়াহুদীদের শরীক ও সমর্থক ছিল। এটাই আশা করা গিয়েছিল আর যুক্তি-বুদ্ধির দাবিও ছিল এই যে, যখন কুরায়শদের ধর্ম ও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আনীত দীনের তুলনা করা হবে এবং এতদুভয়ের মধ্যে অগ্রাধিকার প্রদান ও বাছাইয়ের প্রশ্ন আসবে তখন তারা মুসলমানদের সাথে তাদের মতানৈক্য সত্ত্বেও শির্ক ও মূর্তি পূজার ওপর ইসলামের সত্যতা ও শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য দেবে। কিন্তু ইসলাম দুশমনি তাদেরকে এর অনুমতি দেয়নি। অনন্তর একবার ইয়াহুদী আলেমরা যখন কুরায়শ সর্দারদের সঙ্গে দেখা করতে মক্কায় যায় তখন কুরায়শ সর্দারগণ তাদেরকে বলেছিল, আপনারা সর্বপ্রথম আহলে কিতাব আর আমাদের ও মুহাম্মদ (সা)-এর মধ্যে যে মতানৈক্য ও বিভেদ চলছে তাও আপনাদের জানা। এ ব্যাপারে আপনারা কি বলেন, আমাদের ধর্মই উত্তম না ওদের? তারা জবাব দেয় : আপনাদের (অর্থাৎ কুরায়শদের) ধর্ম ওদের ধর্ম থেকে উত্তম এবং আপনারাই বেশি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

এই ইয়াহুদী মনীষী (ড. ইসরাঈল ওয়েলফিনসন) এই ঘটনার ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে লিখেন :

“কিন্তু একটি কথা, যে ব্যাপারে ঐসব লোককে আসলেই ভর্ৎসনা করা যেতে পারে এবং যে ব্যাপারে এমন প্রত্যেক লোক কষ্ট পাবে যারা এক আল্লাহ্য় বিশ্বাসী, চাই তারা ইয়াহুদীদের ভেতরকার কেউ হোক অথবা মুসলমানদের ভেতরকার

কেউ, আর সেই কথোপকথন যা ইয়াহুদী ও কুরায়শ মূর্তিপূজকদের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেই কথোপকথনে ঐ সব ইয়াহুদী কুরায়শের ধর্মকে ইসলামের পয়গম্বরের ধর্মের ওপর অগ্রাধিকার প্রদান করেছিল।”

সামনে অগ্রসর হয়ে তিনি লেখেন :

“সামরিক প্রয়োজন জাতির জন্য চালবাজি, মিথ্যা কথন ও শত্রুর ওপর বিজয় লাভের জন্য ফেরেব্বাজী তথা প্রতারণার নানা কলাকৌশলকে বৈধ বলে অভিহিত করেছে। কিন্তু সব কিছু সত্ত্বেও ইয়াহুদীদের এই মারাত্মক ভুলে জড়িয়ে পড়া কিছুতেই সঙ্গত হয়নি। কুরায়শের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের সামনে এ কথার স্পষ্ট উল্লেখ সমীচীন হয়নি যে, মূর্তিপূজা ইসলামের একত্ববাদ (আল্লাহ্ ওয়াহদানিয়াত যার অপর নাম তৌহীদ) থেকে শ্রেয়, চাই এর দরুন তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য না-ই বা হাসিল হল। যেই বনী ইসরাঈল দীর্ঘ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মূর্তিপূজারী জাতিসমূহের মোকাবিলায় নিজেদের প্রাচীন বাপ-দাদার নামের ওপর তৌহিদী পতাকা উড্ডীন রেখেছে এবং যারা ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে এই ‘আকীদা-বিশ্বাসের খাতিরে সংখ্যাতীত বিপদ-আপদ ও কষ্ট-মুসীবত বরদাশত করেছে এবং হত্যা ও রক্তের সাগর পাড়ি দিয়েছে, তাদের এটা কর্তব্য ছিল মুশরিকদেরকে ব্যর্থ ও বিফল করে দেবার জন্য নিজেদের জীবনের সার্বিক সম্পদ ও মূল্যবান থেকে মূল্যবান বস্তুও কুরবানী দেওয়া।”

কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াত এর দিকেই ইঙ্গিত প্রদান করেছে :

“তুমি কি সেইসব লোক দেখনি যাদেরকে কিতাবের কিছু অংশ দেওয়া হয়েছিল, যারা মূর্তি ও শয়তানের ওপর বিশ্বাস রাখে আর কাফিরদের সম্পর্কে বলে যে, এরা মু’মিনদের তুলনায় সোজা সঠিক পথে আছে?” (সূরা নিসা, ৫১ আয়াত)।

কেবলা পরিবর্তন

রাসূলুল্লাহ (সা) ও তামাম মুসলমান এ যাবত বায়তুল-মুকাদ্দাসের দিকে মুখ ফিরিয়ে সালাত আদায় করছিল। মদীনায় আগমনের পর এক বছর চার মাস কাল

এদিকেই মুখ ফিরিয়ে সালাত আদায় করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আন্তরিক কামনা ছিল যে, কা’বাকে মুসলমানদের কেবলা বানিয়ে দেয়া হোক। আরব মুসলমানগণও (যাদের লালন-পালন কা’বার প্রতি ভালবাসা ও সম্মানবোধের ওপর হয়েছিল আর এই ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ তাদের রক্ত-মাংসে ও অস্থি-মজ্জায় মিশে গিয়েছিল) অন্তর দিয়ে কামনা করত যে, যদি কা’বা তাঁদের কেবলা হত। তাঁরা কোন জায়গা কেই কা’বা এবং সায়্যিদুনা ইবরাহীম (আ) ও ইসমাঈল (আ)-এর কেবলার সমকক্ষ মনে করত না। বায়তুল-মুক্বাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করা এবং তাকে নিজেদের কেবলা হিসাবে মেনে নেওয়া তাঁদের জন্য ছিল এক কঠিন পরীক্ষা। কিন্তু কোনরূপ উচ্চবাচ্য ছাড়াই তাঁরা এই নির্দেশকে মেনে নেয়, سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا “আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম” এবং أَمَنَّا كُلٌّ مِّنْ عِندِ رَبِّنَا  “আমরা এর ওপর ঈমান আনলাম; যা কিছু আমাদের প্রভু প্রতিপালকের পক্ষ থেকেই” ব্যতিরেকে তাঁদের মুখ দিয়ে আর কিছু বের হয়নি। তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অনুসরণ ও আল্লাহর সামনে মস্তক অবনত করে দেওয়া ছাড়া আর কিছু জানত না, চাই তা তাঁদের ইচ্ছা-অভিরুচি, অভ্যাস ও রুচি-প্রকৃতির অনুকূল কিংবা প্রতিকূলই কেন না হোক। আল্লাহ যখন তাঁদের এই পরীক্ষা নিয়ে নিলেন এবং তাঁরা তাকওয়া তথা আল্লাহভীতি ও আনুগত্যের পূর্ণ প্রমাণ দিয়ে দিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সা) ও তামাম মুসলমানদের মুখ কা’বার দিকে ফিরিয়ে দিলেন। কুরআন মজীদে বলা হল :

“এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মাহ করেছি যাতে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমণ্ডলীর জন্য এবং যাতে রাসূল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য। আর আপনি যে কেবলার ওপর ছিলেন তাকে আমি এজন্যেই কেবলা বানিয়েছিলাম যাতে এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, কে রাসূলের অনুসারী থাকে আর কে পিঠটান দেয়। নিশ্চিতই এটা কঠোরতর বিষয়, কিন্তু তাদের জন্যে নয় যাদেরকে আল্লাহ হেদায়াত দান তথা পথপ্রদর্শন করেছেন” (সূরা বাকারা, ১৪৩ আয়াত)। 

মুসলমানগণ আল্লাহ ও তদ্বীয় রাসূলের আনুগত্য করতে গিয়ে নিজেদের মুখ তখনই কা’বার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন এবং সেটাই কেয়ামত অবধি মুসলমানদের কেবলা নির্ধারিত হয়। মুসলমান দুনিয়ার যে কোন অংশেই হোক না কেন, নিজেদের মুখ ঐ দিকে ঘুরিয়ে সালাত আদায় করার জন্য আদিষ্ট।

মদীনার মুসলমানদের সঙ্গে কুরায়শদের সংঘর্ষ

মদীনায় যখন ইসলাম সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হল এবং কুরায়শরা দেখতে পেল যে, ইসলামের বিস্তৃতি, জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর এই অবস্থা যদি আরও কিছু দিন চলে, তাহলে তাদের আর তখন করার মত কিছুই থাকবে না, সব কিছুই তাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে, তখন তারা এর বিরোধিতায় ও শত্রুতা সাধনে কোমর বেঁধে লেগে গেল এবং চতুর্দিকে ইসলামের বিরুদ্ধে শোরগোল শুরু করল। কিন্তু মুসলমানদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সবর এখতিয়ার ও ক্ষমার হুকুম এবং وَكُفُّوا أَيْدِيَكُمْ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ “আর তোমরা তোমাদের হাত সংযত রাখ এবং সালাত কায়েম কর”-এর তা’লীম দেওয়া হচ্ছিল। উদ্দেশ্য ছিল, এই যে জীবন, এই স্বাদ-আহাদ ও আরাম-আয়েশ তাদের চোখে যেন নিষ্প্রভ ও মূল্যহীন হয়ে যায় এবং (আল্লাহর) আনুগত্য ও নফসের বিরোধিতা, আত্মোৎসর্গ ও কুরবানীর মত কঠিন কাজ যেন তাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।

কিতাল (যুদ্ধ)-এর অনুমতি প্রদান

মুসলমানদের শক্তি যখন আরও কিছুটা বৃদ্ধি পেল এবং তাদের বায়ু আরেকটু শক্ত হল তখন তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হল। কিন্তু এ কেবল অনুমতিই ছিল, একে তাদের ওপর ফরয করা হয়নি। বলা হল :

“যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হল তদেরকে যাদের সাথে কাফিররা যুদ্ধ করে; কেননা তারা অত্যাচারিত। আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম” (সূরা হজ্জ, ৩৯ আয়াত)।

আবদুল্লাহ ইবন জাহশ-এর সারিয়্যা ও আবওয়া যুদ্ধ

রাসূলুল্লাহ (সা) বিভিন্ন গোত্র ও এলাকায় ছোট ছোট অভিযান (সারিয়্যা) ও অতর্কিত আক্রমণ পরিচালনার সূচনা করেন। এর ধরন অধিকাংশ সময় নিয়মিত যুদ্ধে গড়াত না। একে আমরা বড় জোর পারস্পরিক শক্তি পরীক্ষা, সংঘর্ষ ও অতর্কিত আক্রমণ হিসাবে ব্যাখ্যা করতে পারি। এর উদ্দেশ্য ছিল কাফির মুশরিকদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলা এবং ইসলামের শান-শওকত ও কর্মতৎপরতার প্রকাশ আর এসব ছোটখাট লড়াই-সংঘর্ষ ও অতর্কিত আক্রমণ থেকে এর পূর্ণ ফায়দা পাওয়া যায়।

এই সুযোগে আমরা বিশেষভাবে ‘আবদুল্লাহ ইবন জাহশ (রা)-এর সারিয়্যার কথা উল্লেখ করব। এই সারিয়্যা সম্পর্কে একটি আয়াতও নাযিল হয়েছিল। অধিকন্তু এ থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ হাকীকতের ওপরও আলোকপাত ঘটবে যে, কুরআন মজীদ মুসলমানদের কোন অন্যায়-বিচ্যুতি ও ভুলকে সমর্থন করে না, বরং সে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও দল সম্পর্কে কোন ফয়সালা দেবার ও রায় কায়েম করবার ক্ষেত্রে ইনসাফের তুলাদণ্ডে প্রতিটি কাজ ওজন করে। ঘটনাটি সংক্ষেপে এখানে পেশ করা হচ্ছে।

রাসূলুল্লাহ (সা) দ্বিতীয় হিজরীর রজব মাসে ‘আবদুল্লাহ ইবন জাহশ আল-আসাদীকে একটি অভিযানে প্রেরণ করেন এবং সাথে মুহাজিরদের আটজনকে পাঠান। তিনি তাকে একটি লিখিত পত্র দেন এবং নির্দেশ দেন যে, এই পত্র এখন খুলবে না। দু’দিনের পথ অতিক্রম করার পর পত্র খুলবে এবং পাঠ করবে। এরপর পত্রোল্লিখিত নির্দেশ পালন করবে, কিন্তু সাথীদের কাউকে সেই নির্দেশ পালনে বাধ্য করবে না।

আবদুল্লাহ ইবন জাহশ (রা) দুদিনের পথ অতিক্রম করে পত্র খুললেন এবং দেখতে পেলেন, এতে লেখা রয়েছে: যখন তোমরা এই পত্র দেখবে তখন সামনে অগ্রসর হয়ে মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী নাখলিস্তান (দ্রাক্ষাকুঞ্জ) গিয়ে অবতরণ করবে এবং সেখান থেকে কুরায়শদের গতিবিধির ওপর নজর রাখবে এবং আমাদেরকে তাদের খবরাখবর পাঠাতে থাকবে। ‘আবদুল্লাহ ইবন জাহশ (রা) পত্র পাঠান্তে বললেন: سَمْعًا وَطَاعَةً আমার মনিবের হুকুম আমার চোখের মণিতুল্য। এরপর তিনি স্বীয় সঙ্গী-সাথীদেরকে বললেন: রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, সামনে অগ্রসর হয়ে আমরা যেন নাখলিস্তানে অবতরণ করি এবং সেখান থেকে কুরায়শদের গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখি এবং সেসব

খবর তাঁকে অবহিত করি। তিনি আমাকে এও নির্দেশ দিয়েছেন যে, এ ব্যাপারে আমি যেন কাউকে বাধ্য না করি। এখন তোমাদের মধ্যে যার শাহাদাতের প্রতি সুতীব্র আগ্রহ ও বাসনা রয়েছে সে আমাদের সঙ্গে আসবে, আর যে তা চাও না সে ফিরে যাও। অবস্থা যা-ই হোক না কেন, আমাকে যে কোন মূল্যে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হুকুম তামিল করতেই হবে। এরপর তিনি সামনে রওয়ানা হলেন। তাঁর সকল সঙ্গী-সাথীই তাঁর সাথে থেকেছেন, পেছনে থাকতে একজনও রাজি হননি।

সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তিনি ও তাঁর সঙ্গী-সাথীরা নাখলিস্তানে অবস্থান নিলেন। ইতোমধ্যে একটি কুরায়শ কাফেলা সেখান দিয়ে অতিক্রম করে। এই কাফেলায় ‘আম্র ইবনুল-হাদরামীও ছিল। কুরায়শ এই কাফেলা দেখে ভয় পেয়ে যায়। তাদের ছাউনিও কাছাকাছি ছিল। ইতোমধ্যে ‘উক্বাশা ইবনে মিহসান, যাঁর মাথা ছিল ন্যাড়া, মাথা তুলে চাইল। কুরায়শরা তাঁকে দেখতে পেয়ে নিশ্চিত্ত হল এবং বললঃ ওদের ভয় পাবার কিছু নেই। এরা তো উমরা করতে যাচ্ছে। এ ঘটনা ছিল দ্বিতীয় হিজরীর রজব মাসের শেষ তারিখের। এরপর মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করল এবং সিদ্ধান্ত হল, যদি তোমরা এসব কাফিরকে এই রাত্রে ছেড়ে দাও তাহলে এরা মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে এবং তোমাদেরকে সেখানে যেতে বিরত রাখবে। আর যদি তোমরা ওদের সঙ্গে লড়াই-সংঘর্ষে প্রবৃত্ত হতে চাও তাহলে সম্মানিত ও পবিত্র মাসে যুদ্ধ করতে হয়। এতে সকলে দ্বিধা-দ্বন্দের মাঝে নিক্ষিপ্ত হয় এবং তাদের এ ধরনের পদক্ষেপে কিছুটা ভয়ের সঞ্চার হয়। অতঃপর তাঁরা নিজেদেরকে উৎসাহিত করে তোলে এবং সবাই একমত হয় যে, এদের যতজনকে সম্ভব হত্যা করা হবে এবং তাদের মাল-সামান হস্তগত করা হবে। অনন্তর তাঁদের মধ্যে থেকে সর্বপ্রথম ওয়াকেদ ইবন ‘আবদুল্লাহ আত-তামীমী তীর নিক্ষেপ করেন এবং ‘আম্র ইবনুল-হাদরামীকে মৃত্যুমুখে পাঠিয়ে দেন। দু’জনকে বন্দী করা হয়। ‘আবদুল্লাহ ইবন জাহ্শ (রা) ও সঙ্গী-সাথীবৃন্দ কাফেলা ও দু’জন বন্দীসহ প্রত্যাবর্তন করেন।

মদীনায় তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা)-র সামনে হাযির হতেই তিনি তাঁদেরকে বলেন, আমি তোমাদেরকে সম্মানিত মাসে যুদ্ধ করতে তো বলিনি? এরপর তিনি তাঁদের আনীত কোন জিনিস গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন, যা তারা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনীমত) হিসেবে এনেছিল।

রাসূলুল্লাহ (সা) যখন তাঁদেরকে এ কথা বললেন, তখন তো তাঁদের হাত-পা ফুলতে শুরু করল এবং তাঁদের আশঙ্কা হল যে, এখন তাঁদের ধ্বংস নিশ্চিত। অপরদিকে মুসলমানরাও তাঁদের খুব ভাল-মন্দ বলল এবং ভর্ৎসনা করল। কুরায়শরা বলল, নাও! মুহাম্মদ তো সম্মানিত ও নিষিদ্ধ মাসেও যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রক্তপাত জায়েয করে দিল। এ সময় আল্লাহ তা’আলা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করলেন :

“সম্মানিত মাস সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করে যে, তাতে যুদ্ধ করা কেমন? বলে দাও, এতে যুদ্ধ করা ভীষণ বড় পাপ। আর আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা ও কুফরী করা, মসজিদুল-হারামের পথে বাধা দেয়া ও সেখানকার অধিবাসীদেরকে বহিষ্কৃত করা আল্লাহর নিকট তার চেয়েও বড় পাপ। আর ফেতনা হত্যা অপেক্ষাও মহাপাপ” (সূরা বাকারা, ২১৭ আয়াত)। 

আল্লামা ইবনুল-কায়্যিম “যাদুল-মা’আদ” গ্রন্থে লিখেন :

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা দোস্ত ও দুশমনের মধ্যেও আদল ও ইনসাফ করেছেন এবং আপন মকবুল ও পছন্দনীয় বান্দাদের এই সম্মানিত মাসে গুনাহে লিপ্ত হওয়াকে সমর্থন করেননি, বরং একে এক গুরুতর বিষয় বলে অভিহিত করেছেন এবং সাথে সাথে এও প্রকাশ করে দিলেন যে, তাদের দুশমন মুশরিকরা সম্মানিত মাসে গুনাহে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে অনেক বেশি নিন্দা ও শাস্তির যোগ্য। বিশেষ করে এ অবস্থায় যে, তাঁর মকবুল বান্দারা এ ক্ষেত্রে ভিন্নতর ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়েছিল। বলা যায় যে, তাদের এ ব্যাপারে এক ধরনের বিচ্যুতি হয়েছিল যা আল্লাহ তা’আলা তৌহীদী আকীদা, আনুগত্য ও ইবাদত এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-র সাথে হিজরত ও আল্লাহর জন্য কুরবানীর বদৌলতে ক্ষমা করেছিলেন।”

রাসূলুল্লাহ (সা) আল-আবওয়া’ যুদ্ধে যাকে বুওয়াত-ও বলা হয়, স্বয়ং শরীক হয়েছেন। এটা ছিল তাঁর প্রথম যুদ্ধ। এটি যুদ্ধ পর্যন্ত গিয়ে গড়ায়নি। অনন্তর তিনি ফিরে আসেন। এরপর কয়েকটি ছোটখাট ও বড় ধরনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

সিয়াম ফরয হল

ইসলামী আকীদা-বিশ্বাস যখন মুসলমানদের অন্তর মানসে খুব দৃঢ়ভাবে গেঁথে গেল, যখন সালাতের জন্য তাঁদের পূর্ণ মানসিকতা সৃষ্টি হল আর তা বৃদ্ধি পেতে পেতে ইশ্ক বা ভালবাসার পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হল এবং তাঁদের মধ্যে শরীয়তের হুকুম-আহকাম ও আল্লাহর নির্দেশ পালন করার এমন এক মন ও মেয়াজ সৃষ্টি হয়ে গেল যে, মনে হচ্ছিল তারা যেন ঐ সব হুকুম-আহকামের অপেক্ষায় আছেন তখন আল্লাহ তা‘আলা সিয়ামের হুকুম নাযিল করলেন।

এটি ছিল হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষের ঘটনা। এ সময় এই আয়াত নাযিল হয় :

“হে মু’মিনগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম (রোযা) ফরয করা হয়েছে যেরূপ ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার” (সূরা বাকারা, ১৮৩ আয়াত)।

দ্বিতীয় এই আয়াত নাযিল হয় :

“রমযান মাসই হল সেই মাস যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন যা মানুষের জন্য হেদায়াত এবং সত্য পথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায়-অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে এই মাস পাবে সে এ মাসের সিয়াম পালন করবে” (সূরা বাকারা, ১৮৫ আয়াত)।