অধ্যায় আঠারো

মূতার১ যুদ্ধ

(জুমাদা’ল-উলা, ৮ হি.)

নবীয়ে রহমত সা. · সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী

মুসলিম দূতকে হত্যা

রাসূলুল্লাহ (সা) হারিছ ইবন উমায়র আল-আযদী (রা)-কে তাঁর পত্র দিয়ে বুসরার শাসনকর্তা শুরাহবীল ইবন ‘আমর আল-গাসসানীর নিকট পাঠান। সে ছিল রোম সাম্রাজ্যের অধীন। শুরাহবীল প্রথমে তাঁকে বাঁধবার হুকুম দেয়, এরপর তাঁকে সামনে ডেকে শহীদ করে দেয়।২ দূত হত্যার কখনো কোনদিন নিয়ম ছিল না, তা প্রতিপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধ যত তীব্রই হোক না কেন এবং পত্রের বিষয়বস্তু যত তিক্তই হোক। এটি ছিল এমন এক ঘটনা যা উপেক্ষা করার বা পাশ কাটিয়ে যাবার মত ছিল না। এটি ছিল সাধারণ দূতদের জন্য বিপদাশঙ্কার কারণ এবং পত্র ও পত্র লেখকের উভয়ের জন্য চরম অপমান। এ জন্য এ ধরনের গোস্তাখী প্রদর্শনকারীর শায়েস্তা ও মজলুমের বদলা গ্রহণ করা সঙ্গত কারণে জরুরী ছিল যাতে করে ভবিষ্যতে কেউ এ জাতীয় দুঃখজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে সাহসী না হয় এবং দূতদের রক্ত বৃথা না যায়।

রোম সাম্রাজ্যে প্রথম মুসলিম ফৌজ

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট এই খবর পৌঁছতেই তিনি একটি সেনাবাহিনী বুসরায় প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেন। এ ঘটনা ৮ম হিজরীর জুমাদা’ল-উলার।

তিন হাজার মুজাহিদবিশিষ্ট একটি সেনাবাহিনী এর জন্য তৈরি হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) এই অভিযানে বিশিষ্ট, বড় বড় জলীলুল কদর ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী আনসার ও মুহাজির থাকা সত্ত্বেও একজন মুক্ত গোলাম যায়দ ইবন হারিছা (রা)-কে বাহিনীর অধিনায়ক (আমীর) নিযুক্ত করেন। এরই সাথে তিনি এও হেদায়াত দান করেন যে, যদি সে শহীদ হয় কিংবা আহত হয় তবে জা‘ফর ইবন আবী তালিব (রা) আমীর হবে। যদি সেও একই অবস্থার সম্মুখীন হয় তাহলে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) বাহিনীর আমীর হবে। রওনা হওয়ার সময় যখন ঘনিয়ে এল তখন লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সা) নিযুক্ত আমীরদেরকে বিদায় জানান এবং তাঁদেরকে নিজেদের সালাম পেশ করেন।৩ তাঁদের সামনে ছিল এক দীর্ঘ ও কষ্টপূর্ণ সফর এবং তাদের মোকাবিলা হতে যাচ্ছিল এমন এক দুশমনের সঙ্গে যার পৃষ্ঠপোষক ছিল তৎকালীন এক সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য।

মুসলিম ফৌজ রওনা হল এবং সামনে অগ্রসর হয়ে মা‘আন নামক স্থানে ছাউনি ফেলল। এখানে মুসলমানরা জানতে পারলেন যে, হেরাক্লিয়াস বলকা’ নামক স্থানে এক লক্ষ রোমক সৈন্য সমভিব্যাহারে অবস্থান করছেন এবং তাঁর সঙ্গে বিরাট সংখ্যক আরব কবিলা, যথা লাখম, জুযাম, বলকায়ন, বাহরা ও বিল্লী এসে মিলিত হয়েছে। মুসলমানরা দু’রাত মা‘আনেই কাটিয়ে দিলেন এবং অবস্থা সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলেন। সিদ্ধান্ত হল যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে পত্র পাঠানো হোক এবং দুশমনের সংখ্যা সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করা হোক। এতে হয় তিনি অতিরিক্ত সৈন্য পাঠিয়ে আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করবেন অথবা মোকাবিলা করার হুকুম করবেন আর তা তামিল করা হবে।৪

“আমরা শত্রুর সাথে সংখ্যা ও শক্তির ভিত্তিতে লড়াই করি না”

এ সময় আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) মুসলিম মুজাহিদদের সাহস জোগালেন, উৎসাহিত করলেন এবং বললেন : আল্লাহর কসম! আজ তোমরা একে অপছন্দনীয় ও তিক্ত মনে করছ যার জন্য তোমরা বেরিয়েছিলে আর যা ছিল তোমাদের আন্তরিক কামনা অর্থাৎ শাহাদাতের সৌভাগ্য লাভ। তিনি বললেন : আমরা দুশমনের মোকাবিলা সংখ্যা কিংবা শক্তির ভিত্তিতে করি না। আমরা তো এর মোকাবিলা করি সেই দীনের শক্তিতে যদ্বারা আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সৌভাগ্যমণ্ডিত করেছেন। অতএব, তোমরা রওনা হও। উভয় অবস্থাই আমাদের জন্য কল্যাণকর; জিতলেও লাভ আর শাহাদাত অর্জনেও লাভ। এতচ্ছ্রবণে লোকেরা তখনই দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং রওনা হয়ে গেলেন।

কাফনবাঁধা মুজাহিদবৃন্দ

মুসলিম বাহিনী যখন বলকার কাছাকাছি পৌঁছল তখন রোমক ও আরবদের একটি বিশাল বাহিনী তাদের সামনে ছিল। এই বাহিনী মাশরিক নামক স্থানে মোতায়েন ছিল। মুসলমানদের দেখে তারা আরও নিকটবর্তী হল। মুসলমানরা মূতা নামক একটি গ্রামে মোর্চাবন্দী হল এবং এভাবে যুদ্ধের সূচনা ঘটল।৫

যায়দ ইবন হারিছা (রা), যিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রদত্ত পতাকা বহন করছিলেন, যুদ্ধের সূচনা করলেন এবং শেষাবধি শহীদ হলেন। বল্লমের আঘাত তাঁর গোটা দেহ ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল। এবার হযরত জা‘ফর (রা) স্বহস্তে পতাকা তুলে নিলেন এবং যুদ্ধ করতে থাকলেন। যুদ্ধের চাপ বৃদ্ধি পেতে তিনি অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে পড়লেন এবং ঘোড়ার সামনের দু’পা কেটে দিলেন এবং মাটিতে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে লাগলেন। ইতোমধ্যে শত্রুর আঘাতে তাঁর দক্ষিণ বাহু বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তিনি তখন বাম হাতে পতাকা ধরলেন। বাম হাতও কাটা পড়লে তিনি পতাকা কর্তিত বাহুর অবশিষ্ট অংশ দিয়ে জাপটে ধরলেন। অবশেষে এক সময় তিনিও শাহাদাতের পরম সৌভাগ্যে ধন্য হলেন। এ সময় তাঁর বয়স ছিল ৩৩ বছর।৬ তাঁর বুক ও দুই বাহুর মাঝে এবং সামনের অংশে নব্বইটি জখম ছিল যার সবগুলোই ছিল তলোয়ার ও বল্লমের। এসবের একটিও পৃষ্ঠদেশে ছিল না।৭ মোট কথা, এভাবে এই নির্ভীক যুবক জান্নাতের নে‘মতসমূহের গান গাইতে গাইতে এবং শত্রুর সংখ্যাধিক্য, শক্তি, শান-শওকত, আসবাবপত্র ও পার্থিব বাহ্যিক আড়ম্বর ও সাজসজ্জাকে দু’পায়ে দলতে দলতে এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেন।

জা‘ফর (রা)-এর শাহাদাতের পর ‘আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) পতনোন্মুখ পতাকা হাত দিয়ে সামলে নিলেন এবং সামনে অগ্রসর হলেন। তিনিও তাঁর অশ্ব পরিত্যাগ করলেন। ইতোমধ্যে তাঁর পিতৃব্য পুত্র একটি হাড্ডি, যার গায়ে কিছুটা গোশত লেগেছিল, নিয়ে আসলেন এবং বললেন : এইটুকু খেয়ে নাও যাতে কিছুটা গায়ে শক্তি ফিরে আসে। কয়েক দিন যাবত তোমার পেটে দানাপানি তো কিছুই পড়েনি। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) তাঁর হাত থেকে নিয়ে কিছুটা গোশত মুখে দিলেন, এরপর তা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। তলোয়ার হাতে নিয়ে তিনি সামনে অগ্রসর হলেন এবং শত্রুর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে অবশেষে শাহাদাতের অমিয় পেয়ালা পান করলেন।৮

হযরত খালিদ (রা)-এর অভিজ্ঞ নেতৃত্ব

এরপর সকলে মিলে যুদ্ধের অধিনায়কত্বের দায়িত্বভার হযরত খালিদ ইবন ওয়ালীদ (রা)-এর ওপর চাপিয়ে দিলেন এবং তিনি মুসলিম পতাকা নিজ হাতে তুলে নিলেন। তিনি খুব বীর পুরুষ এবং যুদ্ধ বিষয়ে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মুসলিম বাহিনীকে দক্ষিণ দিকে ঘুরিয়ে নিলেন আর শত্রু উত্তর দিকে চলে গেল।৯ অপর দিকে রাত্রির অন্ধকার সমগ্র বিশ্বচরাচরকে গ্রাস করল এবং উভয় পক্ষ এই অবকাশকে দুর্লভ সুযোগ মনে করল এবং যুদ্ধ অব্যাহত না রাখার ভেতর নিজেদের কল্যাণ দেখতে পেল।

এটি এক বাস্তব সত্য যে, পশ্চাদপসরণ (যেমনটি ইরাকী জেনারেল মাহমুদ শীছ খাত্তাব মনে করেন) পরাজয়ে রূপান্তরিত হয়ে যাবার আশংকায় খুবই কঠিন ও দুরূহ হয়ে ওঠে আর পরাজয় এমন এক বিপদ হয়ে দেখা দেয় যা পরাজিতদের জন্য সাধারণত খুবই ক্ষতির কারণ হয়। এজন্য মূতায় মুসলমানদের মামূলী ক্ষতি সেই সামরিক উপকারিতার তুলনায় নেহায়েত অকিঞ্চিৎকর যে, এর দ্বারা রোমকদের সামরিক শক্তি, তাদের শৃঙ্খলা ও সংগঠন এবং তাদের যুদ্ধ-পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্যাদি জানা যায় যা পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে মুসলমানদের কাজে লেগেছে।১০

হযরত খালিদ (রা) তাঁর লোকদেরকে একটা বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আপন বাহিনীর পশ্চাতে মোতায়েন করেন। তারা প্রভাতে এত বুলন্দ আওয়াজে ধ্বনি তুলে যুদ্ধের ময়দানে এসে উপস্থিত হয় যে, শত্রু ভেবে বসে, বুঝি বা মদীনা থেকে নতুন কোন সাহায্যকারী বাহিনী এসে গেছে। ফলে রোমক ফৌজের অন্তরে মুসলমানদের ভীতিকর প্রভাব পড়ে এবং তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে থাকে যে, তিন হাজার ফৌজই যখন আমাদের সামনে এই বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে এবং তুলকালাম কাণ্ড ঘটাচ্ছে, তখন তাদের আরও নতুন সাহায্যকারী সৈন্য, যার সংখ্যা ও শক্তির পরিমাপ আমাদের জানা নেই, না জানি এ মুহূর্তে কী করে বসে! এই ভেবে রোমকদের মনোবল ভেঙে যায় এবং তারা যুদ্ধের ইচ্ছা পরিত্যাগ করে। আর এভাবেই আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদেরকে যুদ্ধের কষ্ট-তকলীফ থেকে মুক্ত ও নিরাপদ রাখেন।১১

চোখে দেখা অবস্থা

এদিকে মুসলমানরা যুদ্ধের ময়দানে তাদের বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করছিলেন আর ওদিকে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় বসে সাহাবায়ে কিরাম (রা)-এর নিকট চাক্ষুষ অবস্থা বর্ণনা দিচ্ছিলেন। আনাস ইবন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) যায়দ, জা‘ফর ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)-এর শাহাদাতের খবর মদীনায় এসে পৌঁছবার আগেই দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “এখন যায়দ পতাকা হাতে নিল, সে শহীদ হল। জা‘ফর পতাকা নিল, সেও শহীদ হল। ইবন রাওয়াহা নিল, সেও শহীদ হল (সে সময় তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল), এমন কি শেষ অবধি আল্লাহর তলোয়ারগুলোর ভেতর একটি তলোয়ার (সাইফুল্লাহ খালিদ ইবন ওয়ালীদ রা) পতাকা হাতে তুলে নিলেন এবং আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদের বিজয় দান করলেন।”১২

জা‘ফর তায়্যার

জা‘ফর (রা) সম্পর্কে তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা তার দুই বাহুর বিনিময়ে তাকে দুটো পাখা দান করেছেন যার সাহায্যে সে বেহেশতের যেখানে খুশি উড়ে বেড়ায়।১৩ এজন্য তাঁর উপাধি হয় জা‘ফর তায়্যার (উড্ডয়নরত জা‘ফর) ও যুল-জানাহায়ন (দুই বাহু বা ডানাবিশিষ্ট)।

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ভালবাসা ও সান্ত্বনা দান

রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত জা‘ফর (রা)-এর স্ত্রীকে বললেন, জা‘ফরের বাচ্চাদেরকে আমার কাছে নিয়ে এস। তারা যখন এল তিনি তখন তাদের আপন চোখের সঙ্গে ঠেসে ধরলেন আর তাঁর চোখ থেকে এমনি অবিরল ধারায় অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল। এরপর তিনি তাদেরকে তাঁর শাহাদাতের খবর দিলেন। যখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শাহাদাতের খবর এসে পৌঁছল তখন তিনি আপন পরিবারস্থ লোকদেরকে বললেন, জা‘ফরের ঘরের লোকদের জন্য খাবার তৈরি কর। এই দুর্ঘটনা তাদেরকে খাবার রান্না করবার দিকে মনোযোগ দেবার মত অবস্থায় রাখেনি। তাঁর নিজের চেহারা মুবারক থেকেও দুঃখ ও বিষাদের চিহ্ন প্রকাশ পাচ্ছিল।১৪

হামলাকারী, পলাতক নন

প্রত্যাবর্তনকালে সেনাবাহিনী যখন মদীনার নিকটবর্তী হল তখন রাসূলুল্লাহ (সা) ও মুসলমানগণ সামনে এগিয়ে গিয়ে তাঁদেরকে অভ্যর্থনা জানান। শিশুরাও তাঁদের পেছনে দৌড়াচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) ছিলেন তখন সওয়ারী পৃষ্ঠে। তিনি বললেন, “তোমরা সকলে বাচ্চাদেরকে নিজেদের সঙ্গে বসিয়ে নাও আর জা‘ফরের বাচ্চা আমাকে দাও।” তাঁর নিকট তখন জা‘ফর পুত্র আবদুল্লাহকে নিয়ে আসা হল। তিনি তাকে নিজের কোলে বসিয়ে নিলেন। মুসলমানরা যেহেতু যুদ্ধের ময়দান থেকে পিছ হটতে অভ্যস্ত ছিলেন না, এটা ছিল তাদের প্রথম ঘটনা, এজন্য তারা ঐসব গাজী মুজাহিদদের উপর ধূলি নিক্ষেপ করছিলেন এবং বলছিলেন : পলাতকেরা! আল্লাহর রাস্তা থেকে পালিয়েছ? তিনি তখন তাদের রক্ষার্থে বললেন : পলাতক নয়, আল্লাহ চাহে তো তারা হামলাকারী (হবে)।১৫

মূতার যুদ্ধ ও মক্কা বিজয়ের মধ্যবর্তী কাল

মূতার যুদ্ধ ও মক্কা বিজয়ের মাঝামাঝি যাতু’স-সালাসিল নামে একটি সারিয়্যা (অভিযান) ৮ম হিজরীর জুমাদা’ল-উখরা মাসে পাঠানো হয়। এই জায়গাটি ওয়াদীউল-কুরার পশ্চাতে ও কুদা‘আ গোত্রের এলাকায় অবস্থিত ছিল। মুসলিম বাহিনী এই সুযোগে শত্রু সম্পূর্ণ নির্মূল করেন। দ্বিতীয় সারিয়্যার নাম ছিল সারিয়্যাতুল-খাবত। এর আমীর ছিলেন আবূ উবায়দা ইবনুল-জাররাহ (রা)। এই সারিয়্যা ৮ম হিজরীর রজব মাসে পাঠানো হয়। এতে মুহাজির ও আনসারদের ৩০০ জন শরীক ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) জুহায়না নামক একটি গোত্রকে শায়েস্তা করবার জন্য সমুদ্র নিকটবর্তী এই অভিযান পাঠিয়েছিলেন। রাস্তায় এই সব মুজাহিদকে দুঃসহ ক্ষুধা ও উপবাসের সম্মুখীন হতে হয়, এমন কি গাছের পাতা খেয়েও দিন কাটাতে হয়। সে সময় সমুদ্র তাদের জন্য আম্বর নামক একটি বৃহদাকায় মাছ সরবরাহ করে যা খেয়ে মুসলিম বাহিনী অর্ধমাস অবধি অতিবাহিত করে। মাছ থেকে প্রচুর তেলও পাওয়া যায় এবং তা বেশ কাজে লাগে। এর ফলে তাদের স্বাস্থ্য ও শক্তির উন্নতি হয় এবং হৃত শক্তি ফিরে আসে। শরীর তরতাজা হয়ে যায়। হুজুর (সা) এই ঘটনা শ্রবণে বলেন, এটি আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে তোমাদের মেহমানদারী ছিল। তিনিও এর (মাছের) কিছু অংশ গ্রহণ করেন।১৬

টীকা

  1. ১মূতা পূর্ব জর্ডান-এর কির্ক শহরের দক্ষিণে ১২ কি. মি. দূরত্বে অবস্থিত; মদীনা ও মূতার মধ্যে দূরত্ব প্রায় ১১০০ কি. মি.। মুসলমানরা এই দূরত্ব উট ও অশ্বপৃষ্ঠে এভাবে অতিক্রম করেন যে, তাঁদের রসদ সরবরাহের ধারা ছিল বিচ্ছিন্ন, কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার কোন ব্যবস্থা ছিল না এবং গোটা সফরই ছিল দুশমনের পেটের ভেতর।
  2. ২যাদু’ল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪১৪।
  3. ৩সীরাত ইবন হিশাম, ২খ, ৩৭৩; যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪১৫।
  4. ৪সীরাত ইবন হিশাম, ২খ, ৩৭৩; যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪১৫
  5. ৫সীরাত ইবন হিশাম, ৩৭৭-৭৮।
  6. ৬যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪১৫।
  7. ৭ইবন কাছীর, ৩য় খণ্ড, ৪৭৪ ও যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪১৫; সহীহ বুখারী বর্ণিত : আমরা নিহতদের ভেতর তাঁকে দেখলাম। তার শরীরে ৯০টির বেশি তীর ও বল্লমের আঘাত ছিল।
  8. ৮যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪১৫; সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৩৭৯।
  9. ৯প্রাগুক্ত।
  10. ১০আর-রাসূলুল-কায়েদ, ২০৬-৭।
  11. ১১ওয়াকেদীর মাগাযী।
  12. ১২সহীহ বুখারী, মূতা যুদ্ধ শীর্ষক অধ্যায়।
  13. ১৩সহীহ বুখারীতে বর্ণিত যে, হযরত ওমর (রা)-এর যখন হযরত জা‘ফর (রা)-এর ছেলের সাথে দেখা হত, তখন তিনি বলতেন, “আসসালামু আলাইকা ইয়া ইবন যী’ল-জানাহায়ন” এবং দ্র. যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪১৫।
  14. ১৪সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৩৮০-৮১।
  15. ১৫ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল বর্ণিত।
  16. ১৬যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪১৭ পৃ.। সহীহ বুখারীতে এই বর্ণনা “সীফুল-বাহর যুদ্ধ” শীর্ষক অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।