অধ্যায় বাইশ

তাবূক যুদ্ধ১

(রজব ৯ হি.)

নবীয়ে রহমত সা. · সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী

তাবূক যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ও এর কারণ

শত্রু অন্তরে ভয় ও ভীতিকর প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে এবং সেইসব লোকের চোখ খুলে দিতে (যারা মনে করতে শুরু করেছিল যে, ইসলামের এই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে আবার দপ করেই নিভে যাবে কিংবা তা আকাশে এক টুকরো মেঘের মতই দেখা দিয়ে আবার হঠাৎ করেই কোন দিগন্তে মিলিয়ে যাবে) তাবূক যুদ্ধের সেই প্রভাবই পড়েছিল যেই প্রভাব পড়েছিল মক্কা বিজয়ের। এই যুদ্ধ তৎকালীন বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্যের সঙ্গে সংঘর্ষের সমার্থক ছিল, আরবদের চোখে যেই সাম্রাজ্য অত্যন্ত বিশাল ও বিরাট প্রভাবশালী ছিল। অনন্তর আবূ সুফিয়ান যখন দেখতে পেলেন যে, রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রেরিত পত্রের কতটা গুরুত্ব দিলেন এবং এর দ্বারা তিনি কতখানি প্রভাবিত হলেন তখন তাঁর মুখ দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বেরিয়ে গেল, [এবং যা পড়ে হেরাক্লিয়াস পরিমাপ করে নিয়েছিলেন যে, জযীরাতুল-আরবে একজন নবী (আ)-এর আবির্ভাব ঘটতে যাচ্ছে] “মুহাম্মাদ ইবন ‘আবদুল্লাহ (সা)-এর মিশন দেখছি বিরাট শক্তি সঞ্চয় করেছে!২ তাঁকে রোমের সম্রাট অবধি ভয় করতে শুরু করেছে।” তিনি বলেন, “তখন থেকেই আমার বিশ্বাস দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হতে থাকে যে, একদিন তিনি অবশ্যই জয়যুক্ত হবেন। এমন কি আল্লাহ তা‘আলা আমার অন্তরে ইসলামপ্রীতির সঞ্চার করলেন” (এবং আমাকে ইসলাম গ্রহণের তৌফীক দিলেন)।

সে যুগে আরবদের লোকেরা রোমকদের সঙ্গে যুদ্ধের এবং তাদের ওপর আক্রমণ করবার স্বপ্নও দেখতে পারত না, বরং তারাই সর্বদা ভয়ে তটস্থ থাকত যে, না জানি তারা তাদের ওপর হামলা করে বসে। মোটকথা, তারা নিজেদেরকে এতটা যোগ্যও মনে করত না যে, কেউ তাদের দিকে তাকাবে এবং তাদেরকে আক্রমণস্থলে পরিণত করবে। মদীনার মুসলমানদের ওপর কখনো আকস্মিক বিপদ এসে দেখা দিলে কিংবা কোনরূপ হুমকি এসে হাজির হলে তাদের চিন্তাধারা বড়জোর গাসসানের খ্রীষ্টান আরব রাজ্যগুলোর দিকে যেত যারা ছিল রোম সম্রাটের অধীন।

৮ম হিজরীতে সংঘটিত আয়লার ঘটনায় হযরত ওমর (রা)-এর কথা থেকেও বিষয়টির ওপর আলোকপাত ঘটে। তিনি বলেন : আমার একজন আনসারী দোস্ত ছিলেন। আমি যখন হুযূর (সা)-এর দরবারে অনুপস্থিত থাকতাম তখন তিনি দরবারে নববীর রোয়েদাদ আমাকে শোনাতেন। আর যখন তিনি অনুপস্থিত থাকতেন তখন আমি তাঁকে খবরাদি পৌঁছাতাম। সে সময় আমরা গাসসানের এক বাদশাহর ভয়ে খুব ভীত থাকতাম। তার সম্পর্কে আমরা প্রায়ই শুনতাম যে, উক্ত বাদশাহ আমাদের ওপর আক্রমণ করতে ইচ্ছুক। আমরা সব সময় এই ধারণা করতাম কখন আমাদের ওপর আক্রমণ হয়। এ সময় একদিন আমার উক্ত আনসার দোস্ত আমার কাছে এলেন এবং আমার দরজায় আঘাত করতে লাগলেন। তিনি দরজায় আঘাত করছিলেন আর বলছিলেন, “দরজা খুলুন” “দরজা খুলুন”। আমি তাকে এভাবে দেখে শুধালাম, “গাসসানীরা কি হামলা করে বসেছে?”৩

এ সময় রোম সাম্রাজ্যের সৌভাগ্য রবি মধ্যাহ্ন গগনে দোর্দণ্ড প্রতাপে বিরাজ করছিল। হেরাক্লিয়াসের নেতৃত্বে তাঁর সেনাবাহিনী ইরানী ফৌজকে তছনছ করে দিয়েছিল এবং ইরানের অভ্যন্তরে বহুদূর অবধি ঢুকে পড়েছিল। অনন্তর এই বিপুল ও অস্বাভাবিক বিজয়ের আনন্দে ও কৃতজ্ঞতাস্বরূপ হেরাক্লিয়াস হুমস থেকে আয়লা অবধি একজন প্রবল পরাক্রান্ত বিজেতা হিসাবে শাহী জাঁকজমকের সঙ্গে সফর করেন।৪ এটি ৭ম হিজরীর ঘটনা। হেরাক্লিয়াস সে সময় ইরানীদের থেকে লব্ধ ক্রুশ কাষ্ঠ বহন করছিলেন। সমস্ত রাস্তা গালিচা ও ফরাশ দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। চতুর্দিক থেকে পুষ্প বৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছিল আর সম্রাট তার ভেতর দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করছিলেন। গৌরবমণ্ডিত এই বিজয়ের পর দু’বছরও অতিক্রান্ত হয়নি আল্লাহর রাসূল (সা) রোমকদের মোকাবিলায় মদীনা থেকে রওয়ানা হলেন। এই যুদ্ধের মাধ্যমে আরবদের মন-মস্তিষ্কের ওপর যার গভীর ছাপ পড়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা সিরিয়ার ওপর হামলার রাস্তা খুলে দেন, হযরত আবূ বকর ও হযরত ওমর (রা)-এর খিলাফত আমলে যা বিজিত হয়েছিল। এর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল কিন্তু এই তাবূক যুদ্ধেই।

এই যুদ্ধ কিভাবে সংঘটিত হয়েছিল সে সম্পর্কে নিম্নোক্ত ঘটনা বর্ণিত আছে : রাসূলুল্লাহ (সা) সংবাদ পান যে, রোমকরা আরবের উত্তর সীমান্তের ওপর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইবন সা‘দ ও তদীয় ওস্তাদ শায়খ ওয়াকিদী বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) নাবাতীদের থেকে সংবাদ পান যে, হেরাক্লিয়াস তাঁর সৈন্যদের এক বছরের খোরাকের ব্যবস্থা করেছেন এবং তাঁর সঙ্গে লাখম, জুযাম, ‘আমেলা ও গাসসান, অধিকন্তু আরবের অপরাপর বিজয়ী গোত্রসমূহকে শামিল করে নিয়েছেন এবং তাঁর বাহিনী ‘বালকা’ অবধি পৌঁছেও গেছে।৫

এই বর্ণনা বাদ দিলেও বলা যায় যে, এই যুদ্ধের আসল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল প্রতিবেশী হুকুমতগুলোকে ভীত-চকিত করে তোলা যদ্বারা ইসলামের কেন্দ্রভূমি ও ইসলামের বর্ধিত ও উঠতি দাওয়াত এবং এর ক্রমবর্ধমান শক্তি ও সামর্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবার সমূহ আশঙ্কা ছিল। এই যুদ্ধের মাধ্যমে সেই সব হুকুমতকেও সতর্ক করা দরকার ছিল যে, তারা যেন মুসলমানদের ওপর তাদের ভূখণ্ডে ঢুকে আক্রমণ করার স্পর্ধা ও দুঃসাহস না দেখায় এবং তাদেরকে সহজেই গিলে ফেলা যাবে এমনটিও যেন না ভাবে। যে ব্যক্তির এমত অবস্থা হবে সে এত বড় বিশাল সাম্রাজ্যের ওপর হামলা করতে পারে না আর না তাঁর সীমান্তে প্রবেশ করে তার জন্য কোন চ্যালেঞ্জ কিংবা বিপদ হয়ে দেখা দিতে পারে। তার পশ্চাতে সেই হেকমত ক্রিয়াশীল ছিল যার উল্লেখ কুরআন মজীদ তাবূক যুদ্ধ প্রসঙ্গে করেছে।

এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এই যুদ্ধের দ্বারা পূরণ হয়ে যায়। রোমকরা এর জওয়াব কোন পাল্টা আক্রমণ, অগ্রাভিযান, সামরিক চলাচল ও গতিবিধি ও ফৌজী তৎপরতা দ্বারা দেয়নি, বরং তারা এই প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় এক ধরনের পশ্চাদপসরণ ও নীরবতা অবলম্বন করে এবং এই নবউত্থিত শক্তি সম্পর্কে যতটা পরিমাপ তিনি এই সময় করতে সক্ষম হন তা ইতিপূর্বে তার কখনো হয়নি।

দ্বিতীয় উপকারিতা যা এই বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ থেকে পাওয়া গেল তা এই যে, যুদ্ধের ফলে জযীরাতুল-আরবের সেই সব গোত্র, অধিকন্তু সেই সব বিজয়ী ও ক্ষমতাসীন গোত্রের (যারা রোমক শাহানশাহর সঙ্গে সম্পর্কিত ও তাঁর অধীনে ছিল) অন্তরে মুসলমানদের ভীতিকর প্রভাব ও প্রতিপত্তি কায়েম হয়ে যায় এবং এর মাধ্যমে তারা ইসলাম সম্পর্কে গভীরভাবে ভাববার সুযোগ পায়। অধিকন্তু এও অনুভব করার মওকা পায় যে, ইসলাম কোন বুদবুদ নয় যা পানির ওপর ভেসে ওঠার পর মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। এর ভবিষ্যৎ অত্যন্ত আলোকোজ্জ্বল এবং সম্ভবত এর মাধ্যমে ঐসব জাতিগোষ্ঠী ইসলামে প্রবেশের কোন সুযোগ পেয়ে যাবে যা স্বয়ং তাদের ভূখণ্ডেও ও তাদেরই দেশে প্রকাশিত হয়েছে। ঐ সব লোকের উল্লেখ করতে গিয়ে, যারা এই যুদ্ধে বের হয়েছিল, কুরআন মজীদ এই সত্যের দিকেই ইঙ্গিত প্রদান করেছে:

রোমকদের মনে মূতা যুদ্ধের স্মৃতি তখন পর্যন্ত বেশ ভাল রকমই জাগরুক ছিল যে যুদ্ধে তাদের পরিপূর্ণ সান্ত্বনা লাভ ঘটে এবং যে যুদ্ধে প্রতিটি পক্ষই প্রত্যাবর্তনকেই দুর্লভ জ্ঞান করেছে আর এর দরুন বাইযান্টাইন সাম্রাজ্য ও এর সুবিশাল সেনাবাহিনীর যেই ভীতিকর প্রভাব আরবদের মানসপটে ছিল তা খুবই কমযোর হয়ে যায়।

সারকথা এই যে, এই যুদ্ধের সীরাত-ই নববী ও ইসলামের দাওয়াতের ইতিহাসে একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এবং এর দ্বারা সেইসব উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় যা মুসলমান ও আরবদের অনুকূলে খুবই সুদূরপ্রসারী ছিল এবং যার ইসলামের ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ও ভবিষ্যতে সংঘটিতব্য ঘটনাবলীর ওপর গভীর প্রভাব পড়ে।

যুদ্ধের সময়পর্ব

৯ম হিজরীর রজব মাসে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়।৬ তখন প্রচণ্ড গ্রীষ্ম মৌসুম। খেজুর পাকার সময়। রৌদ্রের প্রচণ্ড তাপ থেকে আশ্রয় খুঁজতে একটু ছায়া তখন অনেক মিষ্টি মধুর মনে হত। আর তিনি এমনি এক সময় এই যুদ্ধের নিমিত্ত দীর্ঘ সফরের নিয়ত করলেন। যেহেতু পানিবিশেষ শুষ্ক মরু বিয়াবান পাড়ি দিতে হবে, ওদিকে মোকাবিলা করতে হবে এক কঠিন শত্রুর, তাই তিনি মুসলমানদেরকে আগে ভাগেই এ সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এবারকার অভিযান কোন দিকে পরিচালিত হবে৭ যাতে তারা এজন্য ভাল রকম প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে। এই সময়টাই ছিল খুবই টানাটানির ও দুর্ভিক্ষের বছর।

মুনাফিকরা এ সময় বিভিন্ন বাহানা ও অজুহাত পেশ করে আপন আপন ঘরে বসে রইল। তাদেরকে শক্তিশালী ও বিপজ্জনক শত্রুর ভয়-ভীতি, কঠিন মৌসুম, জিহাদের প্রতি অনাকর্ষণ ও অনাগ্রহ ও দীনে হক তথা সত্য সুন্দর ধর্মে সন্দেহ ও সংশয় রাসূলুল্লাহ (সা)-র সাহচর্য ও সফরসঙ্গী হওয়া থেকে বিরত রাখল। এদের সম্পর্কেই আল্লাহ তা‘আলা ফরমান :

জিহাদ এবং বাহিনীতে যোগদানের জন্য সাহাবাদের আগ্রহ

রাসূলুল্লাহ (সা) এই সফরের ব্যবস্থাপনা খুবই যত্ন ও গুরুত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করেন এবং সকলকে প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন। তিনি ধনাঢ্য ও সম্পদশালী লোকদেরকে আল্লাহর রাহে অকৃপণভাবে দান করতে উৎসাহিত করেন। অনন্তর ধনিক শ্রেণীর বহু লোক এ সময় সামনে এলেন এবং তাঁরা ঈমান ও ছওয়াব হাসিলের প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে এতে অংশ গ্রহণ করেন। হযরত উছমান (রা) এই পুরো বাহিনীকে, যেই বাহিনীকে جَيْشُ الْعُسْرَةِ সংকটের বাহিনী বলা হত, সাকুল্যে রসদসামগ্রী সরবরাহের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এক হাজার দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) ব্যয় করেন। তাঁর এই বদান্যতার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) দু‘আ করেন। বহু সাহাবা যাঁদের সামর্থ্য ছিল না তাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে এসে সওয়ারীর জন্য দরখাস্ত পেশ করলেন। কিন্তু সওয়ারীর ব্যবস্থা না হওয়ায় তিনি তাঁদেরকে যুদ্ধে যোগদান থেকে অব্যাহতি দান করলেন। জিহাদে যোগ দিতে না পারায় তাঁদের মর্মপীড়ার কোন সীমা ছিল না। আল্লাহ তা‘আলা তাঁদেরকে এই দায়িত্ব পালন থেকে অব্যাহতি দেন। ইরশাদ হল :

কিছু মুসলমান এমনও ছিল যারা কোনরূপ সন্দেহ-সংশয় ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ব্যতিরেকেই কেবল ইচ্ছা ও সংকল্প গ্রহণে বিলম্বের দরুন এই যুদ্ধে শরীক হতে ব্যর্থ হয়।

মুসলিম বাহিনীর তাবুক যাত্রা

রাসূলুল্লাহ (সা) তিরিশ হাজার মুজাহিদসহ মদীনা থেকে তাবূক অভিমুখে রওয়ানা হন। এর পূর্বে আর কোন যুদ্ধে এত বিপুল সংখ্যক মুসলমান ছিল না। তিনি ছানিয়াতুল-বিদা‘ নামক স্থানে সৈন্যদের ছাউনি ফেলার নির্দেশ দিলেন এবং মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা আনসারী (রা)-কে মদীনার শাসক নিয়োগ করেন।

আহলে বায়ত-এর দেখাশোনার জন্য তিনি হযরত আলী (রা)-কে নিযুক্ত করেন। এতে মুনাফিকরা হযরত আলী (রা) সম্পর্কে ভীরু, কাপুরুষ ইত্যাকার নানা কথা বলাবলি শুরু করল এবং গুজবের ফানুস ওড়াতে লাগল। হযরত আলী (রা) এসব সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (সা)-কে অবহিত করলে তিনি তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন : তুমি কি এতে রাজি নও যে, মূসা (আ)-এর স্থলে ভ্রাতা হারূন (আ)-এর মতই আমার স্থলে তুমিও প্রতিনিধিত্ব কর। তবে হাঁ, একটা কথা, আমার পরে কোন নবী আসবে না।৮

তিনি এই বাহিনীসহ হিজর ও ছামূদ জাতিগোষ্ঠীর এলাকায় অবতরণ করলেন। তিনি সাহাবায়ে কিরাম (রা)-কে বললেন, “এটাই তাদের ভূখণ্ড যাদের ওপর আযাব নাযিল হয়েছিল।” তিনি আরও বললেন, “যখন তোমরা ঐসব লোকের বাড়িঘরে প্রবেশ করবে যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল, তখন অনুতপ্ত অবস্থায় প্রবেশ করবে এবং ভয়ে যে, না জানি তোমাদেরকেও সেই সব মুসীবতে না পেয়ে বসে যা তাদের ওপর এসেছিল।”৯ তিনি এও বলেছিলেন, “তোমরা এখানকার পানি পান করবে না এবং সালাতের জন্য এই পানি দিয়ে ওযুও করবে না। যদি এই পানি দিয়ে তোমরা আটার খামীর তৈরী করে থাক তাহলে তা তোমাদের উটগুলোকে খাইয়ে দাও এবং এর সামান্যতম অংশও তোমরা খাবে না।”

পানি ফুরিয়ে গেলে সকলেই তাদের অভিযোগ দরবারে রিসালতে পেশ করলেন এবং নিজেদের কষ্টের কথা তুলে ধরলেন। তিনি দু‘আ করলেন। ফলে দু‘আর বরকতে আল্লাহ পাক মেঘ পাঠালেন আর ঐ মেঘে এত বৃষ্টি হল যে, লোকেরা তৃপ্ত হলেন এবং নিজেদের প্রয়োজনীয় পানিও ধরে রাখলেন।১০

আরবদের রোমক ভীতি

রাসূলুল্লাহ (সা) যখন তাবূকের দিকে যাচ্ছিলেন তখন কিছু মুনাফিক তাঁর দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিত করে একে অন্যকে বলছিল : তোমরা কি মনে কর যে, বনী আল-আসফার অর্থাৎ রোমকদের সঙ্গে যুদ্ধ এতটাই সহজসাধ্য হবে যতটা সহজ মনে করছ স্বদেশের আরব গোত্রগুলোকে। আল্লাহর কসম! আমি দেখতে পাচ্ছি যে, কাল এরা সকলেই বালি ও কাদার মধ্যে পড়ে থাকবে।১১

রাসূলুল্লাহ (সা) ও আয়লার শাসনকর্তার মধ্যে সন্ধি

রাসূলুল্লাহ (সা) তাবূক পৌঁছলে সীমান্ত এলাকার শাসক ইউহান্না ইবন রূবা তাঁর খেদমতে হাজির হন, সন্ধি করেন ও জিযয়া পেশ করেন। জুরবা ও আযরাহের লোকেরাও আসে এবং তিনি তাদেরকে নিরাপত্তানামা প্রদান করেন যার মধ্যে দণ্ডবিধির যিম্মাদারী, পানি, স্থল ও সমুদ্রপথের হেফাজত এবং দুই পক্ষের শান্তির জামানত দান করা হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে মেহমানদারীও করেন।১২

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মদীনায় প্রত্যাবর্তন

এ সময় রোমকদের পশ্চাদপসরণ এবং সীমান্ত পেরিয়ে সৈন্যঅভিযানের ধারণা পরিত্যাগের খবর এসে পৌঁছে। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের এলাকায় ঢুকে তাদেরকে পশ্চাদ্ধাবন করা সমীচীন মনে করেননি। কেননা এই অভিযানের মাধ্যমে যেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিল করা প্রয়োজন ছিল তা হাসিল হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য উকাইদির ইবন আবদিল-মালিক আল-কিন্দী নামক দুমাতুল-জান্দাল-এর খৃষ্টান শাসক ও রোমক ফৌজের পৃষ্ঠপোষক১৩-এর পক্ষ থেকে আক্রমণের খবর এসে পৌঁছলে তিনি তাকে শায়েস্তা করার জন্য খালিদ (রা) ইবন ওয়ালীদের নেতৃত্বে ৫০০ সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। হযরত খালিদ (রা) ঝটিকা আক্রমণের মাধ্যমে উকাইদিরকে গ্রেফতার করত রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে পাঠিয়ে দেন। তিনি তাকে ক্ষমা করত জিযয়া প্রদানের শর্তে সন্ধি করেন এবং তাকে মুক্তি দেন।১৪

রাসূলুল্লাহ (সা) তাবূকে কয়েক রাত কাটিয়ে মদীনা তাইয়িবায় প্রত্যাবর্তন করেন।১৫

গরীব মুসলমানের জানাযায়

আবদুল্লাহ যুল-বিজাদায়েন (রা)-এর ইনতিকাল হয় তাবূকে। ইসলাম গ্রহণের জন্য তাঁর ছিল আন্তরিক চেষ্টা ও আগ্রহ। কিন্তু তাঁর সম্প্রদায় তাঁর ইসলাম গ্রহণের পথে বাধা সৃষ্টি করত এবং নানাভাবে তাঁর ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালাত। শেষাবধি তারা তাঁকে একটি মোটা খদ্দর বস্ত্রে ছেড়ে দেয়। লজ্জা নিবারণের মত এছাড়া তাঁর নিকট আর কোন কাপড় ছিল না। তিনি পালিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে এসে হাজির হন। এ সময় ঐ কাপড় খণ্ডটুকু ফেটে গিয়েছিল এবং দু’ টুকরো হয়ে গিয়েছিল। তিনি এক টুকরো দিয়ে লুঙ্গি বানালেন, আর এক টুকরো দিয়ে চাদর বানিয়ে শরীর ঢাকার ব্যবস্থা করলেন এবং এই অবস্থায় হুযূর (সা)-এর খেদমতে উপস্থিত হলেন। সেদিন থেকেই তাঁর উপাধি পড়ে যুল-বিজাদায়েন।

তাবূকে তাঁর ইনতিকাল হলে রাসূলুল্লাহ (সা), হযরত আবূ বকর ও হযরত ওমর (রা) রাতের অন্ধকারে তাঁর জানাযার অনুগমন করেন। এ সময় তাঁদের কারো হাতে ছিল আলোর মশাল যার আলোয় সবাই পথ চলছিলেন। কবর তৈরি ছিল। আল্লাহর রাসূল (সা) স্বয়ং কবরে অবতরণ করলেন। হযরত আবূ বকর ও হযরত ওমর (রা) লাশ নামাতে গেলে তিনি বললেন : তোমাদের ভাইকে আরও নিচে আমার কাছাকাছি করে দাও। উভয়ে লাশ ধরাধরি করে নিচে নামিয়ে দিলে তিনি তাঁকে কবরে শুইয়ে দিলেন এবং বললেন : اَللّٰهُمَّ اِنِّى اَمْسَيْتُ رَاضِيًا عَنْهُ فَارْضَ عَنْهُ “হে আল্লাহ! আমি তাঁর ওপর সন্তুষ্ট, তুমিও তাঁর ওপর রাজী হয়ে যাও।” বর্ণনাকারী আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ (রা) বলেন : এ সময় আমার আকাঙ্ক্ষা জাগছিল যে, হায়! এই কবরের অধিবাসী যদি আমি হতাম।১৬

কা‘ব ইবন মালিক (রা)-এর পরীক্ষা ও তাঁর সাফল্য

এই যুদ্ধ অভিযানে যোগদানের ব্যাপারে যাদের মনে এতটুকু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কিংবা কোন প্রকারের কুমন্ত্রণা ছিল না, অথচ শরীক হতে পারেননি তাঁদের মধ্যে ছিলেন কা‘ব ইবন মালিক, মুরারা ইবনু’র-রবী‘ ও হেলাল ইবন উমায়্যা (রা)। এঁরা ছিলেন প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। ইসলামের জন্য তাঁরা অপরিমেয় ও অমূল্য খেদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন এবং সত্যের পথে কঠিন ও দুঃসহ কষ্ট-নিপীড়ন সহ্য করেছিলেন। মুরারা ইবনু’র-রবী‘ ও হেলাল ইবন উমায়্যা (রা) বদর যুদ্ধেও অংশ গ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধ থেকে পালানো কিংবা যুদ্ধ থেকে পেছনে থাকা ছিল তাঁদের স্বভাববিরুদ্ধ। একে হিকমত ইলাহী ব্যতিরেকে অপর কিছুর সঙ্গে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল তাঁদের পরীক্ষা, তাঁদের আত্মার পরিশুদ্ধি ও মুসলমানদের প্রশিক্ষণ দান। এ ছিল কেবল অলসতা, ইচ্ছার দুর্বলতা, পার্থিব উপায়-উপকরণের ওপর প্রয়োজনাতিরিক্ত আস্থা ও নির্ভরতা এবং এর গুরুত্ব ও জোর তৎপরতার সাথে ব্যাপারটা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা না করার পরিণতি। এটি এমন এক বিষয় যা আল্লাহর বহু বান্দাকে, যাঁরা ঈমান এবং আল্লাহ ও তদীয় রাসূল (সা)-র প্রেমে অন্য মুসলমানদের তুলনায় কোন অংশেই কম ছিলেন না, বারবার ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং এটাই ছিল এমন একটি গূঢ় দিক যার প্রতি এ দলের তৃতীয় ব্যক্তি কা‘ব ইবন মালিক (রা) নিম্নোক্ত বাক্যে ইঙ্গিত প্রদান করেছেন:

“আমি প্রতিদিন এই নিয়তে বের হতাম যে, আমি সফরের জরুরী সামান নিয়ে নেব এবং তাদের সঙ্গে রওয়ানা হব। কিন্তু কোন কিছু না করেই ফিরে আসতাম। এরপর আমি মনে মনে বলতাম, আমার অসুবিধা কি? যখনই চাইব নিয়ে নেব (কেননা আমার পকেটে পয়সা আছে, আর বাজারে আছে জরুরী সামান)। আর এভাবেই করি করি করতে করতে রওয়ানা হওয়ার মুহূর্তটি ঘনিয়ে এল। রাসূলুল্লাহ (সা) ও মুসলমানরা রওয়ানা হয়ে গেলেন। কিন্তু তখনও আমি কোন সামানই সংগ্রহ করিনি। আমি মনে মনেই ভাবলাম : যাক না! আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর রওয়ানা হওয়ার এক-দু’দিন পরেই বেরিয়ে পড়ব, রাস্তায়ই কাফেলা ধরে ফেলব এবং শামিল হয়ে যাব। তাঁদের সকলের রওয়ানা হওয়ার পর আমি আমার সামান তৈরির জন্য বের হলাম। কিন্তু তারপরও কিছু না করেই ফিরে আসলাম। দ্বিতীয় দিনও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। কিছুই করা হল না আমার। তাঁরা দ্রুত গতিতে অগ্রসর হলেন এবং লড়াইয়ের ব্যাপার অনেক দূর অগ্রসর হল। আমি এরপরও ইচ্ছা করেছি যে, এখনও আমি মদীনা থেকে রওয়ানা হয়ে তাঁদেরকে ধরে ফেলব। কিন্তু হায়! আমি যদি তখনও তা করতাম। কিন্তু তাও হল না।”১৭

আল্লাহ তা‘আলা এই তিনজনের ঈমান, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি মহব্বত ও ভালবাসা, ইসলামের প্রতি বিশ্বস্ততা এবং সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে সর্বাবস্থায় দৃঢ়পদ থাকার নাযুক পরীক্ষা নিলেন। তাঁরা লোকের সম্মান, শ্রদ্ধা, অমুখাপেক্ষিতা, আল্লাহর রাসূলের লক্ষ্য ও মনোযোগ এবং উপেক্ষা ও অমনোযোগিতা, উভয় অবস্থাতেই এমন নিষ্ঠাবান ও উৎসর্গীকৃতপ্রাণ হিসাবে নিজেদেরকে প্রমাণ করলেন যার নজীর ধর্মীয় সমাজ ও জামা‘আতের ইতিহাসে (যা ঈমান ‘আকীদা, ভালবাসা ও আবেগের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়) মেলা ভার।

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, তাঁরা রাসূল (সা)-এর খেদমতে সত্য বিবৃত করেছেন এবং এর পেছনে যা কিছু প্রকৃত সত্য ছিল এতটুকু না লুকিয়ে বলে দেন যখন অন্য লোকেরা কথা বানিয়ে বানিয়ে বলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছিল। এ সময়ও তাঁরা নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন, যখন মুনাফিকরা সর্বপ্রযত্নে নিজেদেরকে এর থেকে মুক্ত অভিহিত করছিল। তিনি তাঁর দীর্ঘ অলঙ্কারপূর্ণ ও প্রভাবমণ্ডিত বর্ণনায় নিজের কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:

“যারা পেছনে থেকে গিয়েছিল অর্থাৎ যারা যুদ্ধে যোগদান করেনি তারা হুযূর (সা)-এর খেদমতে হাজির হল এবং কসম খেয়ে তাদের ওযর পেশ করতে লাগল। এদের সংখ্যা ছিল আশির ওপর। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের বাহ্যিক কথাগুলো কবুল করলেন, তাদের থেকে আনুগত্যের শপথ নিলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। তাদের অন্তরের লুক্কায়িত বিষয়গুলো আল্লাহ তা‘আলার নিকট সোপর্দ করলেন। আমিও তাঁর খেদমতে হাজির হলাম, সালাম পেশ করলাম। আমি যখন তাঁকে সালাম দিলাম তখন তিনি হালকা মুচকি হাসির সঙ্গে আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন। এরপর আমাকে কাছে ডাকলেন। আমি অগ্রসর হলাম এবং একেবারে সামনে বসে পড়লাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কেন পেছনে পড়ে রইলে? তুমি কি তোমার সওয়ারী খরিদ করনি? আমি বললাম : জী, হ্যাঁ! আল্লাহ্‌র কসম! আমি তা করেছিলাম। আল্লাহ্‌র কসম করে বলছি, আমি যদি তাঁর সামনে না হয়ে দুনিয়াবাসী কোন লোকের কাছে হতাম তাহলে মনে করতাম যে, আমি কিছু ওযর পেশ করে তাঁর অসন্তুষ্টির হাত থেকে বেঁচে যাই। আমার কথা বলার এবং সে কথাকে কি করে প্রমাণ করতে হয় তার ধরন জানা ছিল। কিন্তু আল্লাহ্‌র কসম করে বলছি, আমি বিশ্বাস করি, যদি আমি আজ মিথ্যা বলে তাঁকে সন্তুষ্ট করে নিই তাহলে সমূহ আশঙ্কা, আল্লাহ পাক সত্বর তাঁকে আমার ওপর নারাজ করে দেবেন। আর আমি যদি সত্য বলে আজ তাঁর মনটা তিক্ত ও বিষাদও করে দেই তবুও এর ভেতরই আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে ক্ষমা পাবার আশা আছে। আল্লাহর কসম! আমার কাছে কোন ওযর নেই এবং আল্লাহর কসম! যে সময় আমি পেছনে ছিলাম সেই সময়ের চেয়ে বেশি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ও প্রাচুর্যের মালিক আর কখনো ছিলাম না।”

শেষাবধি সেই ভয়ংকর মুহূর্তও এসে গেল। রাসূলুল্লাহ (সা) লোকদেরকে তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে নিষেধ করে দিলেন। মুসলমানরা তো “শুনলাম ও মেনে নিলাম”-এর কট্টর অনুসারী ছিলেন। অতএব, সকলেই তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন এবং ভিন্ন মানুষে পরিণত হলেন। এমন কি তাঁদের দৃষ্টিতে আসমান-যমীনের পরিবর্তন ঘটল। মনে হচ্ছিল, তাঁরা যেন সেই পৃথিবীতে নন যেই পৃথিবীতে তাঁরা আগে ছিলেন। এমতাবস্থায় তাঁদের পঞ্চাশ রাত্রি অতিবাহিত হল। মুরারা ইবনু’র-রবী‘, হেলাল ইবন উমায়্যা (রা) উভয়ে ক্লান্ত হয়ে আপন আপন ঘরেই বসে রইলেন এবং কান্নাকাটি করতে থাকলেন। কা‘ব ইবন মালিক (রা) এঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী যুবক ছিলেন। তিনি বাইরে বের হতেন, মুসলমানদের সাথে সালাত আদায় করতেন, বাজারে আসা-যাওয়া করতেন, কিন্তু অন্য কেউ তাঁর সাথে কথা বলত না।

কিন্তু এত সব সত্ত্বেও ভালবাসা ও বিশ্বস্ততার সেই সম্পর্ক ও যোগসূত্রের ওপর এর কোন প্রভাব পড়েনি যা তাঁদের ও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মাঝে কায়েম ছিল। এর ফলে তাঁদের এই অবস্থার ওপর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর স্নেহের সেই ধারাও কিন্তু হ্রাস পায়নি, বরং এই ধমক ও তিরস্কার তাঁদের প্রতি তাঁর স্নেহ-ভালবাসা, হৃদয়ের উত্তাপ, দরদ ও জ্বালা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি (কা‘ব) বলেন :

“আমি রাসূলুল্লাহ (সা) সমীপে হাজির হতাম এবং তাঁকে সালাম জানাতাম। সে সময় তিনি সালাত শেষে মজলিসে সাহাবী পরিবৃত্ত থাকতেন। আমি (সালামের পর) মনে মনে ভাবতাম যে, তিনি আমার সালামের জবাবে ঠোঁট নাড়িয়েছেন কি না। এরপর আমি সালাতের কাতারে তাঁর পাশে ও কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতাম এবং আড় নজরে তাঁকে দেখতাম। আমি যখন সালাতে মনোনিবেশ করতাম তখন তিনি আমার প্রতি দৃকপাত করতেন এবং এরপর আমি যখন তাঁর দিকে তাকাতাম তখন তিনি মুখ ফিরিয়ে নিতেন।”

মোটের ওপর জগৎ তাঁদের জন্য বদলে গেল এবং এখন একজনও তাঁদের ওপর মুখ ফিরিয়ে নিলেন যাঁর ওপর তাঁদের বিরাট গর্ব ও আস্থা ছিল, ছিল নির্ভরতা। তিনি বর্ণনা করেন :

“লোকের অত্যাচারে এই সময়টা আমার জন্য খুবই দীর্ঘ ও কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল। শেষে প্রাচীর অতিক্রম করে আমি আবূ কাতাদার চৌহদ্দীর মধ্যে পৌঁছে গেলাম। সম্পর্কে সে আমার চাচাতো ভাই হত এবং আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিল। আমি তাকে সালাম করলাম, কিন্তু আল্লাহর কসম করে বলছি, আমার সালামের জওয়াবটা পর্যন্ত সে দিল না। আমি বললাম : আবূ কাতাদা! আমি তোমাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, তুমি কি জান যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা)-কে ভালবাসি। এরপরও সে চুপ করে রইল। আমি দ্বিতীয়বারও তাকে একই কথা বললাম এবং তাকে আল্লাহর দোহাই দিলাম। সে নিশ্চুপ রইল। এরপর সে এতটুকু বলল যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভাল জানেন। এই কথায় আমার চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় অশ্রু বইতে লাগল। আমি তখনই ঘুরে দাঁড়ালাম এবং প্রাচীর অতিক্রম করে ফিরে এলাম।”১৮

ব্যাপারটা কিন্তু এখানেই শেষ হল না, বরং এই সর্বাত্মক বয়কটের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া তাঁদের স্ত্রীদের পর্যন্ত গিয়ে গড়াল। তাঁদের প্রতি নির্দেশ হল যে, তাঁরা যেন তাঁদের স্ত্রীদের পৃথক করে দেয়। নির্দেশ পালিত হল।

প্রেম ও বিশ্বস্ততা, দৃঢ়তা ও ধৈর্যের এই পরীক্ষার সর্বাধিক নাযুক মুহূর্ত এল তখন যখন গাসসান অধিপতি ভালবাসা ও সম্পর্কোন্নয়নের মাধ্যমে তাঁকে খরিদ করতে চাইল। স্মর্তব্য যে, ইনি ছিলেন এমন একজন বাদশাহ যাঁর মোসাহেব ও বন্ধু হওয়া এবং তাঁর মজলিসে হাজির হতে পারা সৌভাগ্যের ব্যাপার বলে মনে করা হত এবং এ ব্যাপারে পরস্পরে প্রতিযোগিতা চলত, আরব কবিরা বছরের পর বছর যাঁর বন্দনা গীত গাইত।১৯ গাসসান অধিপতির দূত তাঁর নিকট এমন এক মুহূর্তে এসে উপস্থিত হল যখন তিনি কঠিন মানসিক ও আত্মিক পেরেশানী, লোকদের সম্পর্কচ্ছেদ এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপেক্ষার মত কঠোর কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ছিলেন। দূত তাঁকে গাসসান অধিপতির পত্র হস্তান্তর করল। পত্রের বিষয়বস্তু ছিল নিম্নরূপ :

“আমি জানতে পেরেছি যে, তোমার প্রভু তোমার সঙ্গে নির্দয় ব্যবহার করেছেন। আল্লাহ তোমাদের জন্য লাঞ্ছনা ও নষ্ট হবার মত জায়গা নির্ধারণ করেননি। তুমি আমাদের কাছে চলে এস। আমরা তোমাদের সাথে সদয় ব্যবহার করব।”

এই পত্র কা‘ব ইবন মালিক (রা)-এর অন্তরে প্রচণ্ড ঈমানী মর্যাদাবোধ তরঙ্গায়িত করে দিল এবং তাঁর প্রেম ও ভালবাসা উদ্বেলিত হতে লাগল। তিনি একটি জ্বলন্ত চুলার পাশে গেলেন এবং পত্রটি তাতে নিক্ষেপ করলেন।

এরপর এই তিনজন মু’মিনেরই যখন পরীক্ষা পূর্ণ হল কুরআন মজীদ তাঁদের উল্লেখপূর্বক তাঁদের স্থায়িত্ব ও চিরন্তনতা দান করলেন। তাঁদের ঘটনা মুসলমানদের জন্য চিরদিনের নিমিত্ত একটি শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের উপকরণ সরবরাহ করে দিল, তাঁদের ঈমানী শক্তি ও ইসলামের সৌন্দর্যের পূর্ণ প্রমাণ মিলে গেল এবং তাঁদের নিমিত্ত বিশাল পৃথিবী তার বিশালতা ও বিস্তৃতি সত্ত্বেও সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল, এমন কি তাঁদের নিজেদের নফ্‌সও তাঁদের জন্য সংকীর্ণ ছিল। কিন্তু তথাপি তাঁদের পদদ্বয় সত্যের পথ থেকে এক মুহূর্তের তরেও বিচ্যুত হয়নি। তখন আল্লাহ তা‘আলা আসমানের উপর থেকে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতার ঘোষণা দিলেন এবং কেবল তাঁদের তাওবার উল্লেখই করলেন না যে, তাঁরা না জানি এর ফলে নিঃসঙ্গতা ও হীনম্মন্যতাবোধ অনুভব করে, এই বিষয়টি তাঁদের জন্য চোখ উঁচিয়ে চাইবার কারণ ঘটে, বরং তাঁদের তাওবার ভূমিকায় সায়্যিদুল-আম্বিয়া’ ওয়াল-মুরসালীন, মুহাজিরীন ও আনসারদের তাওবারও উল্লেখ করেছেন২০ যাঁরা এই যুদ্ধে সবার অগ্রগামী ছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল তাঁদেরকে সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন, তাঁদের মনকে প্রবোধ দেওয়া, লোকের চোখে তাঁদের সম্মান বৃদ্ধি ও মর্যাদা দ্বিগুণ-চতুর্গুণ বৃদ্ধি করা।

এক নজরে রাসূল (সা) পরিচালিত যুদ্ধাভিযানসমূহ

৯ম হিজরীর রজব মাসে সংঘটিত তাবূক যুদ্ধের সাথেই নবী করীম (সা) পরিচালিত যুদ্ধ ও যুদ্ধাভিযান (যার সংখ্যা ২৭টি), অধিকন্তু ছোটখাট যুদ্ধ ও নৈশ অভিযানসমূহের (যার সংখ্যা ৬০টি;২১ এছাড়া আরও কতকগুলো যুদ্ধ সংঘর্ষ অবধি গড়ায়নি) ধারা সমাপ্ত হয়।

এসব যুদ্ধ ও ছোটখাট অভিযান যা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নির্দেশে পাঠানো হয়েছিল, যে পরিমাণ রক্ত ঝরেছিল, যুদ্ধের সমগ্র ইতিহাসে আমরা এর চেয়ে কম রক্ত ঝরতে আর দেখিনি। এইসব যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ১০১৮-এর বেশি নয়। আর এই সংখ্যার মধ্যে উভয় পক্ষের নিহতরাই অন্তর্ভুক্ত।২২ কিন্তু এই নগণ্য সংখ্যা কত মানুষের রক্তকে সস্তা ও সুলভ হওয়ার হাত থেকে, সম্মান ও সম্ভ্রম হানির হাত থেকে বাঁচাল তার পরিপূর্ণ জরিপ করা মুশকিল, বরং বলা চলে অসম্ভব। এর পরিণতিতে জাযীরাতুল-আরবের চতুষ্পার্শ্বে এই রকম শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ কায়েম হয়ে গিয়েছিল যে, একজন মহিলা মুসাফির হীরা থেকে একাকী রওয়ানা হয়ে কা‘বা শরীফে এসে উপস্থিত হত এবং তাওয়াফ সমাপনান্তে ফিরে যেত এবং আল্লাহ ভিন্ন তাকে আর কাউকে ভয় করতে হত না।২৩ একজন মহিলা কাদেসিয়া থেকে উটে চড়ে আসত এবং বায়তুল্লাহ যিয়ারত করত, আর কাউকে সে ভয় করত না।২৪ এর পূর্বে অবস্থা ছিল এই যে, গোটা জাযীরাতুল আরবে হত্যা, ধ্বংস, প্রতিশোধাত্মক কর্মকাণ্ড, গৃহযুদ্ধ ও লড়াই-সংঘর্ষের অব্যাহত ধারা ছিল প্রতিষ্ঠিত এবং বড় বড় হুকুমতগুলোর কারাভাঁ (কাফেলা) অস্বাভাবিক রকমের প্রহরা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অভিজ্ঞ রাহবারের সাহায্য-সহায়তায় পথ চলত।

এইসব যুদ্ধ কুরআন মজীদের দু’টো বিজ্ঞ মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তন্মধ্যে একটি হল, اَلْفِتْنَةُ اَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ “গোলযোগ ও অরাজকতা হত্যা অপেক্ষাও ভীষণ গুরুতর।”২৫ দ্বিতীয়টি হল, وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيٰوةٌ يّٰاُولِي الْاَلْبَابِ “কিসাস গ্রহণের মধ্যেই জীবন নিহিত আছে, (জেনে রাখ) হে বুদ্ধিমানরা!”২৬ এর দরুন মানব জাতির এক বিরাট সময় বেঁচে গেল এবং অবস্থার সংস্কার ও সংশোধন এবং বিপদের প্রতিরোধের সেই দীর্ঘ প্রয়াস ও অব্যাহত প্রচেষ্টার দরকার হত না যা অধিকাংশ সময় নিষ্ফল হয়েছে। এ ছাড়া ঐসব যুদ্ধের ওপর যেইসব নৈতিক শিক্ষা এবং যেসব স্নেহসুলভ ও সহানুভূতিমূলক পথনির্দেশনার ছায়া ও প্রতিবিম্ব ছিল তা একে প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড ও ক্রোধাগ্নি নির্বাপিত করার পরিবর্তে চরিত্র সংশোধনমূলক কর্মকাণ্ড এবং হেদায়েত ও কল্যাণ লাভের মাধ্যম বানিয়ে দিয়েছিল। অনন্তর রাসূলুল্লাহ (সা) যখন কোন বাহিনী প্রেরণ করতেন তখন তাদেরকে নিম্নোক্ত হেদায়েত দিতেন:

“আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করার এবং যেসব মুসলমান তোমাদের সাথে রয়েছে তাদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহারের উপদেশ দিচ্ছি। তোমরা আল্লাহর নামে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হবে এবং আল্লাহরই পথে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে যারা আল্লাহর সঙ্গে কুফরী করেছে। গাদ্দারী করবে না, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ চুরি করবে না, কোন শিশু, নারী, অসহায় বৃদ্ধ কিংবা খানকাহ, গির্জা, মঠ, মন্দিরের ধর্মীয় পুরোহিত, বিশপ, যারা কোন না কোন ধর্মের সেবায় নিজেদেরকে উৎসর্গ করেছে, তাদেরকে হত্যা করবে না, খেজুর বৃক্ষ স্পর্শ করবে না, কোন গাছ কাটবে না, কোন গৃহ ধসিয়ে দেবে না।”২৭

এই সামরিক কর্মকাণ্ডের সফলতা এবং যত দ্রুত তা অর্জিত হয়েছে তার পরিমাপ এভাবে করা যেতে পারে যে, মাত্র দশ বছরের সংক্ষিপ্ত মুদ্দতে দৈনিক গড়ে জাযীরাতুল আরবের প্রায় ২৭৪ বর্গমাইল এলাকা ইসলামের অধীনে এসেছে। মুসলমানদের জীবন হানির হিসাব নিলে দেখা যাবে যে, গড় পড়তা মাসে একজন মানুষের অর্ধেক নিহত হয়েছে, দশ বছর পূর্ণও হয়নি দশ লাখ বর্গমাইল ইসলামের পদানত হয়েছে।২৮

এসব যুদ্ধ ও যুদ্ধাভিযানের তুলনা দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধের (যার প্রথমটি ১৯১৪ সালে শুরু হয়ে ১৯১৮ সালে শেষ হয় এবং দ্বিতীয়টি ১৯৩৯ সালে শুরু হয়ে ১৯৪৫ সালে শেষ হয়) সঙ্গে করুন তাহলেই এতদুভয়ের পার্থক্যের সঠিক পরিমাপ করতে পারবেন।

ইনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটেনিকার বিজ্ঞ নিবন্ধকার এ বিষয়ে যা কিছু লিখেছেন তা থেকে জানা যায় যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ছিল চৌষট্টি লক্ষ২৯ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ছিল সাড়ে তিন কোটি থেকে ছয় কোটির মধ্যে।৩০

এই দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধ মানবতার কোন খেদমতই আঞ্জাম দেয়নি, এ কথা সবাই জানে এবং মানব সমাজ এ থেকে কম বেশি কোন রকমের উপকারই পায়নি।

মধ্যযুগে এবং গির্জার জুলুম-নিপীড়ন ও ধর্মীয় পীড়নের যেসব লোক শিকার হয়েছিল তাদের সংখ্যাও হবে এক কোটি বিশ লাখের মত।৩১

ইসলামের প্রথম হজ্ব

৯ম হিজরীতে হজ্ব ফরয হয়।৩২ রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত আবূ বকর (রা)-কে আমীরুল-হজ্ব নিযুক্ত করেন এবং মুসলমানদের হজ্ব করাবার যিম্মাদারী তাঁকে সোপর্দ করেন। মুশরিক কাফিররাও হজ্বের জায়গাগুলোতে ছিল।৩৩ হযরত আবূ বকর (রা)-এর সঙ্গে মদীনা থেকে তিন শ‘ লোকের একটি কাফেলাও হজ্ব আদায়ের নিয়তে রওয়ানা হয়।৩৪

এ সময় সূরা বারা‘আত নাযিল হয় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর। তিনি হযরত আলী (রা)-কে ডেকে পাঠান এবং তাঁকে বলেন সূরা বারা‘আতের প্রথম দিককার আয়াত ও এতদ্সংক্রান্ত আহকাম তথা বিধানসমূহ নিয়ে সেখানে যেতে এবং কুরবানীর দিন যখন সমস্ত লোক মিনায় সমবেত হবে তখন এই ঘোষণা দিতে, “জান্নাতে কোন কাফির প্রবেশ করবে না এবং এ বছরের পর থেকে কোন কাফির মুশরিক হজ্ব করতে পারবে না, উলঙ্গ হয়ে কা‘বা শরীফ তাওয়াফ করতে পারবে না। আর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে কারও কোন চুক্তি সম্পাদিত হয়ে থাকলে নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ করা হবে।” হযরত আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উটনী পৃষ্ঠে আরোহণপূর্বক রওয়ানা হন এবং হযরত আবূ বকর (রা)-এর সঙ্গে পথিমধ্যে মিলিত হন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “আমীর হয়ে এসেছেন, না মা’মূর হয়ে?” হযরত আলী (রা) বললেন, “মা’মূর হয়ে”। অতঃপর উভয়ে মনযিলের দিকে রওয়ানা হলেন। হযরত আবূ বকর (রা) হজ্বের ব্যবস্থাপনায় মশগুল হলেন। কুরবানীর দিন হযরত আলী (রা) দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নির্দেশ ও হেদায়েত মুতাবিক ঘোষণা দেন।৩৫

টীকা

  1. ১তাবূক মদীনা মুনাওয়ারা ও দামিশকের মধ্যবর্তী স্থানে এবং আয়লার দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত। ইয়াকূত তদীয় মু‘জামুল-বুলদান গ্রন্থে আবূ যায়দ-এর বরাতে লেখেন, “তাবূক হিজর ও সিরিয়া সীমান্তের মাঝামাঝি হিজর থেকে চার মনযিল দূরত্বে অবস্থিত। কথিত আছে যে, আসহাবুল-আয়কা, যাদের মধ্যে হযরত শু‘আয়ব (আ) প্রেরিত হয়েছিলেন, এখানেই বাস করত।” তাবূক লোহিত সাগর থেকে ছয় মনযিল দূরে ‘ওসমা’ ও ‘শারবী’ নামক দু’টি পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত (বুস্তানীর দা.মা.)। এক্ষণে এটি সউদী সামরিক ছাউনি, মদীনা প্রশাসনের অধীন, মদীনা থেকে সাত শত কি.মি. দূরে।
  2. ২আবূ সুফিয়ান হুযূর (সা) সম্পর্কে ‘ইবন আবী কাবশা’ এই শব্দটি বিদ্রূপাত্মকভাবে বলেছিলেন। আবূ কাবশা সম্পর্কে দুটো উক্তি রয়েছে : একটি হল, তিনি খুযা‘আ গোত্রের কেউ ছিলেন যিনি তাঁর সময় মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ হবেন (মাজমা‘উ বিহারিল-আনওয়ার)।
  3. ৩বুখারী এই ঘটনা সূরা তাহরীমের তাফসীরে ও মুসলিম কিতাবুত-তালাকে উদ্ধৃত করেছেন।
  4. ৪মুসলিম, কিতাবুল-জিহাদ ওয়াস-সিয়ার।
  5. ৫আয-যুরকানী, মাওয়াহিব, ৩য় খণ্ড, ৬৩-৬৪।
  6. ৬তাবুক যুদ্ধের দিন-তারিখ নির্ধারণ সৌর বছরের নিরিখে খুবই কঠিন। যে তারিখ তিনি মদীনা থেকে তাবুকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন কোন কোন সীরাতকারের মতে উক্ত তারিখ ছিল নভেম্বর মাস। মাওলবী হাবিবুর রহমান খানের “জাদীদ মিফতাহুত-তাকবীম” দ্বারাও এমত সমর্থিত হয়। এদের ভেতর আল্লামা শিবলী নু‘মানীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ঘটনার অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য ও সহীহ হাদীছের স্পষ্ট ভাষ্য যা বুখারী, মুসলিমসহ সিহাহ সিত্তাহ দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, এই যুদ্ধ গ্রীষ্মকালে সংঘটিত হয়। কা‘ব ইবন মালিক (রা)-এর হাদীছে পরিষ্কার উল্লিখিত যে, أن رسول الله ﷺ غزاها في حرّ شديد حين طابت الثمار والظلال। এই হাদীছকেই এই ক্ষেত্রে মাপকাঠি ও বিচারের মানদণ্ড বানানো উচিত ও সময়ের যে হিসাব নিরূপণ এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় তাকে নির্ভরযোগ্য মনে করা ঠিক নয়। মূসা ইবন ‘উকবা ইবন শিহাব যুহরী থেকে যে বর্ণনা দিয়েছেন তার শব্দসমষ্টি এরূপ: “ফসল কাটার মরশুম, রাত্রিবেলা এবং ভীষণ গ্রীষ্মে যখন লোক খেজুর বাগানে থাকা পছন্দ করত” (এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়।) এ থেকেও অধিকতর স্পষ্ট মুনাফিকদের সেই উক্তি যার উল্লেখ আল্লাহ তা’আলা সূরা বারা‘আতে করেছেন এবং উক্ত উক্তি প্রত্যাখ্যান করেন: আর তারা বলল, “গরমের ভেতর অভিযানে বের হয়ো না।” বল, “উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচণ্ডতম” যদি তারা বুঝত (সূরা তাওবা, ৮১ আয়াত)।
  7. ৭বুখারী ও মুসলিম, কা‘ব ইবন মালিক (রা)-এর হাদীছ থেকে উদ্ধৃত।
  8. ৮বুখারী, তাবূক যুদ্ধ অধ্যায়।
  9. ৯যাদুল-মা‘আদ, ২য় খণ্ড, ৪০০।
  10. ১০সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৫২২; বুখারী, মুসলিমেও অনুরূপ হাদীসে আছে।
  11. ১১সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৫২৪-২৬।
  12. ১২প্রাগুক্ত, ৫২৫-২১।
  13. ১৩দুমাতুল-জান্দাল একটি বসতি গ্রাম। এখানে বেদূঈনেরা কেনাবেচার উদ্দেশ্যে আসা-যাওয়া করত অর্থাৎ এখানে বাজার ছিল। কিন্তু কাল পরিক্রমায় এটি অনাবাদী ও বিরান হয়ে যায়। উকাইদির একে নতুন রূপ দেন এবং যয়তুনের চাষাবাদ শুরু করেন। ফলে বেদূঈনদের যাতায়াত পুনরায় শুরু হয়। গ্রামটি ছিল একটি প্রাচীন পাঁচিল ঘেরা; পাঁচিলের অভ্যন্তরে একটি সুদৃঢ় দুর্গও ছিল। উত্তরের বেদূঈনদের মধ্যে এই দুর্গের একটা বিশেষ খ্যাতি ছিল। এজন্য এর একটা সামরিক গুরুত্ব ছিল। এর অধিকাংশ বাসিন্দা ছিল কালব গোত্রের। সেই যুগের নিয়ম মাফিক উকাইদির নিজেকে মালিক বাদশাহ বলতেন। সে যুগে দুমাতুল-জান্দালের লোকেরা খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী ছিল (দ্র. তারীখুল-আরব কাবলাল-ইসলাম, ড. জাওয়াদ আলীকৃত)।
  14. ১৪সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৫২৬।
  15. ১৫প্রাগুক্ত, ৫২৭ পৃ.।
  16. ১৬সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৫২৭-২৮।
  17. ১৭বুখারী, কিতাবুল-মাগাযী।
  18. ১৮কা‘ব ইবন মালিক (রা)-এর হাদীছ; সহীহ বুখারী।
  19. ১৯দ্র. জুফনা পরিবারের প্রশংসায় কবি হাসসান ইবন ছাবিত (রা)-এর বিখ্যাত কাসীদা যার দুটি পংক্তি হল: لله در عصابة نادمتهم – يوما بجلّق في الزمان الاول = يسقون من ورد البريص عليهم – بردى يصفق بالرحيق السلسل
  20. ২০যা ছিল একটি প্রসিদ্ধ ও সর্বজনস্বীকৃত সত্য এবং যার বাহ্যত কোন প্রয়োজন ছিল না।
  21. ২১ইবন কায়্যিম, যাদুল-মা‘আদ; ইরাকী জেনারেল ও লেখক মাহমুদ শীছ খাত্তাব-এর মতে যেসব যুদ্ধ স্বয়ং রাসূল (সা) নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তার সংখ্যা ২৮।
  22. ২২কাযী মুহাম্মাদ সুলায়মান মনসুরপুরী “রহমাতুল্লিল-‘আলামীন” গ্রন্থে এই সংখ্যাই বলেছেন।
  23. ২৩বুখারী, আলামাতুন-নুবুওয়াহ।
  24. ২৪সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৫৮১ পৃ.।
  25. ২৫সূরা বাকারা, ১৯১ আয়াত।
  26. ২৬সূরা বাকারা, ১৭৯ আয়াত।
  27. ২৭ওয়াকেদী, যায়দ ইবন আরকাম (রা) বর্ণিত।
  28. ২৮জেনারেল মুহাম্মদ আকবর খানের “হাদীছে দেফা” নামক পুস্তক (বর্তমান অনুবাদক কর্তৃক “মহানবী (সা)-র প্রতিরক্ষা কৌশল” নামে অনূদিত ও প্রকাশিত) থেকে তথ্য গৃহীত।
  29. ২৯১৯ম খণ্ড, ৯৬৬।
  30. ৩০প্রাগুক্ত, ১০১৩ পৃ.।
  31. ৩১John Davenport, An Apology for Mohammed and the Koran.
  32. ৩২কোন কোন আলিমের অভিমত হল, হজ্ব ষষ্ঠ হিজরীতে ফরয হয়। শায়খ মুহাম্মদ আল-হাদরামী তদীয় “তারীখ আত-তাশরীইল-ইসলামী” নামক পুস্তকে এই অভিমতই গ্রহণ করেছেন (দ্র. ৫২ পৃ.)।
  33. ৩৩ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৫৪৩ পৃ.।
  34. ৩৪যাদুল-মা‘আদ, ২য় খণ্ড, ২৪ পৃ.।
  35. ৩৫ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৫৪২-৪৩ পৃ.।