অধ্যায় উনিশ

মক্কা বিজয়

(৮ম হিজরী রমযান১)

নবীয়ে রহমত সা. · সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী

মক্কা বিজয়ের পটভূমি

দীনে হক তথা ইসলাম ও মুসলমানদের ধর্মীয় প্রশিক্ষণের ভিত্তি যখন আল্লাহর হুকুমে বেশ ভাল রকম সুদৃঢ় হয়ে গেল, আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদেরকে পরীক্ষা করে নিলেন এবং তাদের দিল ও নিয়তের পুরো পরীক্ষা নিলেন। এরপর কুরায়শদের জুলুম ও বিদ্রোহ, সত্য গ্রহণে অস্বীকৃতি, সত্যের পথে বাধার প্রাচীর খাড়া করা, মুসলমানদেরকে অব্যাহত ও ধারাবাহিক কষ্ট প্রদান ও নানা রকমের অভিযোগ আরোপ ও নিপীড়নের সকল সীমা ছাড়িয়ে গেল তখন আল্লাহর ফয়সালা হল, এখন রাসূলুল্লাহ (সা) ও মুসলমানগণ বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করুক। চাইলেন কা‘বাকে মূর্তির ময়লা ও আবর্জনাময় অস্তিত্ব, মিথ্যা ও অশ্লীল বাক্যের দুর্গন্ধ ও অপবিত্রতা থেকে তিনি পাক-সাফ করবেন, মক্কার পুরাতন সম্মান ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার করবেন, বায়তুল্লাহকে সমগ্র মানবতার নিমিত্ত হেদায়াত ও বরকতের উৎসে পরিণত করবেন এবং তাঁর রহমতের ধারাকে সমস্ত মানুষের জন্য ব্যাপক করে দেবেন।

বনী বকর ও বনী কুরায়শদের চুক্তিভঙ্গ

আল্লাহ তা‘আলা এই অবধারিত ও স্পষ্ট বিজয়ের জন্য বিশেষ উপকরণও সৃষ্টি করে দিলেন এবং স্বয়ং কুরায়শদেরকেই অজ্ঞাতসারে এর উপলক্ষে পরিণত করলেন। তাদের দ্বারা এমন একটি ব্যাপার সংঘটিত হল যা কেবল মক্কা বিজয়কেই বৈধতা ও অনুমোদন দান করল না, বরং তাকে অনিবার্য ও অপরিহার্য করে তুলল। وَلِلَّهِ جُنُودُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ “আর আল্লাহর নিয়ন্ত্রণেই আসমান ও যমীনের সেনাবাহিনী।”

হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তির একটি ধারা ছিল এই যে, যে ব্যক্তি বা যারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতিশ্রুতি ও আশ্রয়াধীনে আসতে চায় আসতে পারে। আর যে ব্যক্তি বা যারা কুরায়শদের আশ্রয় ও প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করতে চায় গ্রহণ করতে পারে, এ ব্যাপারে তারা স্বাধীন। এরই আওতায় বনূ বকর কুরায়শদেরকে অগ্রাধিকার দেয় এবং তাদের সাহায্য-সমর্থন ও আশ্রয় গ্রহণ করে। বনূ খুযা‘আ রাসূলুল্লাহ (সা)-র সাহায্য-সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণ করে।২

বনূ বকর ও খুযা‘আর মধ্যে বহু পুরনো শত্রুতা ছিল এবং তাদের মধ্যে প্রতিশোধ গ্রহণের এক অন্তহীন সিলসিলা চলে আসছিল। রাসূলুল্লাহ (সা)-র আবির্ভাবের প্রথম থেকেই ছিল। ইসলাম এসে এতদুভয়ের মধ্যে একটি প্রাচীর খাড়া করে দেয় এবং এই ব্যাপারটি ছাড়া আর কোন জিনিসের ওপর গভীরভাবে ভেবে দেখার অবকাশ লোকের হয়নি। যখন সন্ধি হল এবং এই চির বৈরী ও প্রতিপক্ষ গোত্র দু’টি পরস্পরবিরোধী শিবিরে বিভক্ত হল তখন বনূ বকর এই সুযোগকে এক দুর্লভ সুযোগ ভেবে খুযা‘আ গোত্র থেকে এতদিনের হিসাব চুকাতে চাইল। বনূ বকরের কিছু লোক চক্রান্ত করে বনূ খুযা‘আর ওপর সেই সময় রাত্রকালীন অতর্কিত হামলা চালাল যখন তারা একটি ঝর্ণার ধারে অবস্থান করছিল। লড়াই হল। এতে খুযা‘আ গোত্রের কয়েকজন মারা যায়।

কুরায়শরা বনী বকরকে অস্ত্রশস্ত্র দ্বারা সাহায্য করে এবং রাত্রির অন্ধকারে কুরায়শদের বড় বড় সর্দার এই যুদ্ধে অংশ নেয়। এরা খুযা‘আ গোত্রের লোকদেরকে ঠেলতে ঠেলতে হারাম শরীফ অবধি পৌঁছে যায়। কুরায়শদের কেউ কেউ তখন বলল : এখন আমরা হারাম শরীফের সীমানায় এসে গেছি। আমাদের উপাস্য মা‘বূদের দিকে একটু খেয়াল কর। এর জওয়াব মিলল : আজকের দিনে কোন মা‘বূদ নেই। বনী বকর! আজ তোমরা প্রাণভরে প্রতিশোধ নিয়ে নাও। এরপর আর তোমরা এর সুযোগ পাবে না।৩

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট ফরিয়াদ

এ সময় ‘আমর ইবন সালেম আল-খুযাঈ মদীনায় পৌঁছে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট এসে উপস্থিত হন এবং তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কিছু কবিতা পাঠ করেন। কবিতায় রাসূলুল্লাহ (সা) ও খুযা‘আ গোত্রের মধ্যে যে চুক্তি ছিল, ছিল পরস্পরকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি, তার দোহাই দিয়ে তাঁর সাহায্য-সমর্থন কামনা করলেন। অধিকন্তু ‘আমর এও অবহিত করেন যে, কুরায়শরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং আপনার সম্পাদিত চুক্তিপত্র ও অঙ্গীকারনামা খতম করেছে। তারা এই অবস্থায় তাদের ওপর রাত্রকালীন হামলা চালিয়েছে যখন তারা ঝর্ণার পাড়ে ছিল এবং রুকু ও সিজদারত অবস্থায় আমাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) এতচ্ছ্রবণে বললেন : ‘আমর ইবন সালেম! তোমাদেরকে অবশ্যই সাহায্য করা হবে।

শেষ সুযোগ

রাসূলুল্লাহ (সা) এই সংবাদের সত্যতা যাচাই করা সমীচীন মনে করলেন যাতে কুরায়শদের কাছে বলার মত আর কিছু না থাকে। তিনি তাদের নিকট লোক পাঠালেন এবং তাকে বলে দিলেন যে, তাদের সামনে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব পেশ করবে : (১) তারা খুযা‘আ গোত্রের নিহতদের রক্তপণ আদায় করবে অথবা (২) যারা এই চুক্তি ভেঙেছে এবং খুযা‘আদের ওপর হামলা করেছে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিতে হবে। এরা ছিল বনূ বকরের শাখা বনূ নাফাসার সঙ্গে সম্পর্কিত; (৩) অন্যথায় তারা যা করেছে তাই তাদের সঙ্গে করা হবে। এতে তাদের কোন কোন সর্দার বলল : এ ক্ষেত্রে আমরা সমান সমান প্রত্যুত্তর দেওয়া পছন্দ করি। আর এভাবে মুসলমানরা কুরায়শদের জিম্মাদারী থেকে মুক্ত হয়ে গেল এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সুযোগও মিলে গেল।৪

সন্ধি চুক্তি নবায়নের জন্য কুরায়শদের প্রয়াস

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট যখন এই খবর পৌঁছল তখন তিনি বললেন : আমি যেন দেখতে পাচ্ছি আবূ সুফিয়ান চুক্তি বহাল করবার এবং এর সময়সীমা বৃদ্ধির জন্য তোমাদের কাছে এসেছে। অনন্তর এমনটিই হল। কুরায়শরা যা করেছিল তাতে তাদের মনে এক ধরনের আশঙ্কা দেখা দিল এবং তারা এরূপ রূঢ় জবাব প্রদান সমীচীন হয়নি বলে মত প্রকাশ করল। তাদের কিছু অর্বাচীন লোকের এ ধরনের উত্তর প্রদানে তারা পস্তাতে লাগল। অবশেষে তারা আবূ সুফিয়ানকেই এই চুক্তি বহাল ও এর সময়সীমা বৃদ্ধির জন্য পাঠিয়ে দিল।৫

পিতামাতা ও সন্তানের মোকাবিলায় হুজূর (সা)-কে অগ্রাধিকার

আবূ সুফিয়ান রাসূলুল্লাহ (সা)-র সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে মদীনায় এলেন এবং স্বীয় কন্যা উম্মুল-মু’মিনীন উম্মু হাবীবা (রা)-র ঘরে গেলেন। সেখানে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বিছানায় বসার উপক্রম করতেই হযরত উম্মু হাবীবা (রা) তাকে থামিয়ে দিলেন। তিনি কন্যার এরূপ আচরণে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন : বেটি! আমি বুঝতে পারছি না যে, তুমি আমাকে এই বিছানার যোগ্য মনে করছ না, নাকি এই বিছানাই আমার যোগ্য নয় ভাবছ?

তিনি জওয়াব দিলেন : আসল কথা এই যে, এটি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বিছানা আর আপনি মুশরিক ও নাপাক। আমি পছন্দ করি না, আপনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বিছানায় বসেন। এতে তিনি বললেন : আল্লাহর কসম! আমার থেকে পৃথক হওয়ার পর তুমি অনেক বদলে গেছ।৬

আবূ সুফিয়ানের পেরেশানী ও ব্যর্থতা

এরপর আবূ সুফিয়ান সোজা রাসূলুল্লাহ (সা) সমীপে চলে গেলেন এবং তাঁর সঙ্গে কথা বললেন। কিন্তু তিনি তাঁর কথার কোন জওয়াব দিলেন না। এরপর আবূ সুফিয়ান হযরত আবূ বকর (রা)-এর কাছে গেলেন এবং তাঁকে অনুরোধ করলেন যে, তিনি যেন তার পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জওয়াবে তাঁর অক্ষমতার কথা ব্যক্ত করলেন। এভাবে তিনি পর্যায়ক্রমে হযরত ওমর, হযরত আলী ও হযরত ফাতেমা (রা)-এর সঙ্গে কথা বললেন এবং তাঁদেরকে তার ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করলেন। কিন্তু এদের কেউ তার সহযোগিতা করতে রাজি হলেন না। তাঁরা বললেন, সমস্যা এতটা গুরুত্বপূর্ণ ও নাজুক যে, আমরা এ ব্যাপারে কথা বলতে পারছি না। এতে তার হয়রানি ও পেরেশানী এতটা বৃদ্ধি পেল যে, তিনি হযরত ফাতেমা (রা)-কে বললেন : ওহে মুহাম্মাদ কন্যা! তুমি কি তোমার এই ছেলেকে (এই বলে তিনি হযরত হাসান ইবন আলী (রা)-র দিকে ইশারা করলেন যিনি তখন পাঁচ বছরের শিশু আর তিনি খেলছিলেন) ইশারা করতে পার যেন এতটা মুখ দিয়ে বলে, আমি উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করিয়ে দিয়েছি, এই বলে সে কেয়ামত পর্যন্ত আরবদের সর্দার হয়ে যেতে পারে। তিনি জওয়াব দিলেন : আমার বাচ্চা এতটা যোগ্য এখনও হয়নি (যে, এরূপ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে ভূমিকা রাখবে এবং দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করবে)। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (সা)-কে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউই সন্ধি কিংবা সমঝোতায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে না। এরপর হযরত আলী (রা) যখন তার (আবূ সুফিয়ানের) পেরেশানী দেখতে পেলেন তখন তিনি আবূ সুফিয়ানের মানসিক যন্ত্রণা ও বিপদ আঁচ করতে পারলেন। তিনি তাকে বললেন : আমি বুঝতে পারছি না যে, এ সময় কোনটা তোমার কাজে আসবে। তুমি বনী কিনানার সর্দার। তুমি দাঁড়িয়ে যাও এবং নিজে থেকেই সন্ধি বহালের পক্ষে লোকের মধ্যে সাধারণ ঘোষণা দিয়ে দাও। এরপর সোজা বাড়ির পথ ধর। আবূ সুফিয়ান জওয়াবে বললেন : তোমার ধারণায় এতে কি কোন ফায়দা হতে পারে? তিনি বললেন : আল্লাহর কসম! এর বেশি আমার মাথায় আর কিছু আসছে না। কিন্তু আমি এর বাইরে আর কোন উপায়ও তোমার জন্য দেখছি না। এতচ্ছ্রবণে আবূ সুফিয়ান মসজিদে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং ঘোষণা দিলেন : লোকসকল! আমি সন্ধি বহাল করে গেলাম। এরপর তিনি উটে চড়লেন ও মক্কার পথ ধরলেন।৭

কুরায়শরা যখন পুরো ঘটনা শুনতে পেল তখন তারা বলতে লাগল : তুমি তো আমাদের জন্য কিছুই নিয়ে আসতে পারনি। তুমি যা করে এসেছ তা আমাদের জন্য যেমন উপকারী নয়, তেমনি উপকারী নয় তোমার জন্যও।

মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি এবং হাতিব-এর পত্র

রাসূলুল্লাহ (সা) সকলকে জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন এবং এরও ব্যবস্থা নিলেন যাতে প্রস্তুতির যাবতীয় খবর গোপন থাকে এবং কাক-পক্ষীও যেন তা জানতে না পারে। এরপর তিনি মক্কা রওয়ানা হওয়ার ঘোষণা দিলেন এবং লোকদেরকে তৈরি থাকার ও সামান প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিলেন। তিনি এও বললেন : হে আল্লাহ! কুরায়শদের কোন গুপ্তচর কিংবা সংবাদবাহক যেন এই খবর সংগ্রহ না করতে পারে তার ব্যবস্থাও তুমিই করে দাও যাতে আমরা অতর্কিতে ও আকস্মিকভাবে তাদের ঘাড়ের ওপর গিয়ে হাজির হতে পারি।৮

মদীনার ইসলামী সমাজ আর যাই হোক, একটি মনুষ্য সমাজই ছিল এবং এই সমাজে মানবীয় আবেগ-অনুভূতি ও কামনা-বাসনা তার যাবতীয় বাস্তবতা নিয়েই বিদ্যমান ছিল যা যে কোন জীবন্ত, স্বভাবজাত ও কৃত্রিমতামুক্ত সমাজেই থেকে থাকে। এজন্য সে সমাজে সহীহ-শুদ্ধ কাজ যেমন সাধিত হয়, তেমনি ভুল-ত্রুটিও সংঘটিত হয়। হতে পারে যে, তারা তাদের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে কোন কোন সময় কোনরূপ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণেরও আশ্রয় নিয়ে থাকবেন এবং এসব ব্যাখ্যায় তারা সত্যের ওপরও থাকতে পারেন। মূলতঃ এটি সেই সমস্ত মানব সমাজেরই বৈশিষ্ট্য যেই সমাজে স্বাধীনতা ও পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) যদি তাদের কোন পদক্ষেপকে ভুল মনে করতেন তবে তার জন্য ওযর তালাশ করতেন এবং তাদের রে‘আয়েত করতেন ও তা উপেক্ষা (تسامح) করতেন। যারা ভুল করতেন তাদের জন্য তাঁর পবিত্র বক্ষ খুবই প্রশস্ত ছিল এবং তাদের সম্মান ও মর্যাদা, দাওয়াত ও জিহাদের ময়দানে তাদের কৃতিত্বপূর্ণ অবদান ও ইসলামের জন্য তাদের পূর্বেকার খেদমতের প্রতি সর্বদাই সহানুভূতিশীল ছিলেন। হাদীস, সীরাত ও ইসলামের ইতিহাস এ ধরনের খুব কম ঘটনার দলীল রেখেছে যা স্বয়ং নিজেই ঐসব গ্রন্থের আমানত ও দিয়ানত, সত্য কথন ও ইনসাফপ্রিয়তার সাক্ষী সনদ।

এ সব ঘটনার মধ্যে হাতেব ইবন আবী বালতা‘আর ঘটনাও রয়েছে। তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম যারা মক্কা থেকে (মদীনায়) হিজরত করেছিলেন এবং বদর যুদ্ধে শরীক হয়েছিলেন। বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন মক্কা থেকে যাত্রার অভিপ্রায় সম্পর্কে সাহাবাদেরকে অবহিত করেন এবং নীরবে এর জন্য প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় তখন হাতেব ইবন আবী বালতা‘আ (রা) একটি পত্র লেখেন এবং এতে মক্কার লোকদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মক্কা যাত্রার সংবাদ দেওয়া হয়েছিল। তিনি পত্র এক নারীকে দেন এবং তাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, সে যদি পত্রটি নিরাপদে কুরায়শদেরকে পৌঁছে দিতে পারে তবে তাকে কিছু পারিশ্রমিক প্রদান করা হবে। সে পত্রটি তার চুলের খোঁপার ভেতর লুকিয়ে রাখে এবং মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহর পক্ষ থেকে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হন এবং তৎক্ষণাৎ হযরত ‘আলী ও যুবায়র (রা)-কে তার পশ্চাদ্ধাবনে প্রেরণ করেন এবং বলেন : তোমরা দু’জন রওযাতু’ল-খাখ (মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী একটি স্থান)-এর নিকটবর্তী হলে সেখানে একটি মুসাফির নারীকে পাবে যার কাছে কুরায়শদের বরাবর লিখিত একটি পত্র পাবে (পত্রটি নিয়ে আসবে)। উভয়ে দ্রুত অশ্বারোহণে ধাবিত হলেন এবং সেখানে গিয়ে পৌঁছলেন ও পূর্বোল্লিখিত স্থানে এক নারীকে পেলেন। তাঁরা তাকে উটের পিঠ থেকে অবতরণ করতে বাধ্য করলেন এবং বললেন : তোমার কাছে কি কোন পত্র আছে? সে পত্রের কথা অস্বীকার করল। তার কাছের সামানপত্র খুঁজে দেখা হল, কিন্তু পত্রটির হদিস মিলল না। হযরত আলী (রা) তখন বললেন : আমি আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, আল্লাহর রাসূলের কথা ভুল হতে পারে না আর আমরাও মিথ্যা বলছি না। আল্লাহর কসম! তোমাকে পত্র বের করে দিতে হবে, অন্যথায় তোমার পরিধেয় বস্ত্র তল্লাশি করা হবে। অগত্যা সে অনন্যোপায় হয়ে বলল, ঠিক আছে, তোমরা মুখ ওদিকে ফেরাও। তাঁরা মুখ ফেরালে সে চুলের খোঁপার ভেতর থেকে পত্রটি বের করে দিল। পত্র পেতেই তাঁরা উভয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে এসে হাজির হলেন এবং পত্র সোপর্দ করলেন। পত্রটি খুলে দেখা গেল হাতেব (রা) ইবন আবী বালতা‘আর পত্র যেখানে কুরায়শদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মক্কা অভিযানে গমনের কথা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) হাতেব (রা)-কে ডেকে পাঠালেন। তিনি উপস্থিত হয়ে (সকল বিষয় সম্পর্কে অবগত হলেন এবং) বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি তাড়াহুড়া করবেন না। আল্লাহর কসম করে বলছি যে, আমি আল্লাহ ও তদীয় রাসূলে বিশ্বাসী। আমি আমার ধর্ম যেমন পরিবর্তন করিনি, তেমনি আমার বিশ্বস্ততাও বিকিয়ে দেইনি। কিন্তু কুরায়শদের সঙ্গে আমার তেমন সম্পর্ক নেই যেমন সম্পর্ক রয়েছে এসব মুহাজিরদের। এদের অনেকেরই তাদের মধ্যে আত্মীয়-স্বজন রয়েছে, তাদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে যারা তাদের মক্কায় অবস্থিত আত্মীয়তাসূত্রের লোকদের বিপদে আশ্রয় দেবে। কিন্তু আমার ব্যাপার ভিন্ন। আমার সেখানে কোন আত্মীয় নেই, আছে কেবল মিত্রতা সম্পর্ক, অথচ সেখানে আমার পরিবারের লোকেরা রয়েছে, বাচ্চা-কাচ্চা রয়েছে। ফলে তাদের পারিবারিক কিংবা খান্দানী সূত্রে আশ্রয় দেবার মত কেউ নেই।৯ আমি ভেবে দেখলাম যে, আমার যখন এসব নেই তখন আমি তাদের এমন কোন উপকার করি যার ফলে আমার পরিবারের লোকেরা যেন নিরাপদে থাকে। হযরত ওমর (রা) এতচ্ছ্রবণে বলে উঠলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন এখনই আমি এর গর্দান উড়িয়ে দিই। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঙ্গে খেয়ানত করেছে এবং সে মুনাফিকদের একজন। তদুত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : না, সে তো বদর যুদ্ধে শরীক ছিল। আর ওমর! তোমার কি জানা আছে যে, আল্লাহ তা‘আলা বদরে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদেরকে সম্বোধন করে বলেছেন, “তোমরা যা ইচ্ছা কর, আমি তোমাদের সব অন্যায়-অপরাধ ও ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছি”? এতচ্ছ্রবণে হযরত ওমর (রা)-এর চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হল। তিনি বললেন যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) বেশি জানেন।১০

মোটের ওপর রাসূলুল্লাহ (সা) রমযান মাসে মদীনা থেকে রওয়ানা হন। মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল দশ হাজার সাহাবার সমষ্টি।১১ মাররু’য-যাহরান উপত্যকায় এসে তিনি ছাউনি ফেলেন। মুসলিম বাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা কুরায়শদেরকে বেখবর রাখেন এবং তারা ভয়-ভীতি, অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার মিশ্রিত অবস্থার শিকার হয়।

ক্ষমার পরওয়ানা

পথিমধ্যে পিতৃব্য-পুত্র আবূ সুফিয়ান ইব্‌নু’ল-হারিছ ইবন ‘আবদি’ল-মুত্তালিব-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি তখন তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। কেননা আবূ সুফিয়ান নিন্দাসূচক কবিতা রচনাপূর্বক হুজূর আকরাম (সা)-কে অত্যন্ত কষ্ট দিয়েছিলেন। তিনি (আবূ সুফিয়ান) এ ব্যাপারে হযরত ‘আলী (রা)-এর নিকট গিয়ে অভিযোগ করেন। হযরত ‘আলী (রা) তাঁকে বলেন : রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সম্মুখভাগে গিয়ে হাযির হও এবং ইউসুফ (আ)-এর ভ্রাতৃকুল ইউসুফ (আ) সম্পর্কে যা বলেছিলেন, تَاللَّهِ لَقَدْ آثَرَكَ اللَّهُ عَلَيْنَا وَإِنْ كُنَّا لَخَاطِئِينَ “আল্লাহর কসম! আল্লাহ তোমাকে আমাদের ওপর মর্যাদা দান করেছেন। আর নিশ্চিত আমরাই ছিলাম অন্যায়কারী”১২ তাই বল। এ জন্য বল যে, তিনি পছন্দ করেন না কেউ উত্তম, মধুর ও কোমল কথা বলার ক্ষেত্রে তাঁকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাক। তিনি তাই করলেন এবং সামনে গিয়ে এ কথাই বললেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ ۖ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ ۖ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন। আর তিনিই দয়া প্রদর্শনকারীদের মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু।”১৩ এরপর তিনি খুব ভাল দৃঢ় বিশ্বাসী মুসলমানদের মধ্যে গণ্য হন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর আর কখনো লজ্জায় আল্লাহ্‌র রাসূলের দিকে চোখ তুলে তাকাননি।১৪

রাসূলুল্লাহ (সা) সমীপে আবূ সুফিয়ান

রাসূলুল্লাহ (সা) রাত্রে চতুর্দিকে আগুন জ্বালাবার নির্দেশ দেন। এ নির্দেশ পালন করা হয়। সে সময় আবূ সুফিয়ান ইবন হারব গোপনে সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে এবং অবস্থা আঁচ করার নিমিত্ত এ দিকে দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এমতাবস্থায় প্রান্তরব্যাপী অসংখ্য আগুন প্রজ্বলিত দেখতে পেয়ে ও চতুর্দিকে আলো আর আলো দেখে তিনি বিস্মিত হন। তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, এত বড় বিশাল বাহিনী এবং এ ধরনের আলো তো আর এর আগে কখনো দেখিনি! হযরত ‘আব্বাস (রা) ইবন আবদি’ল-মুত্তালিব ইতোপূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করত হিজরত করেছিলেন এবং এই বাহিনীতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি আবূ সুফিয়ানের কণ্ঠস্বর শুনে চিনে ফেলেন এবং তার দিকে এগিয়ে আসেন ও বলেন : রাসূলুল্লাহ (সা) এখন লোকজন পরিবেষ্টিত আছেন। এখন তুমি ভেবে দেখ কাল কুরায়শদের কী ভয়াবহ পরিণতি হবে! তারপর এই কথা ভেবে যে, যদি কোন মুসলমান তাকে দেখে তাহলে তক্ষুনি তার কর্ম সাবাড় করে দেবে, তাকে তাঁর পেছনে খচ্চরের পিঠে তুলে নেন এবং সোজা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে এসে হাজির হন। আবূ সুফিয়ানকে দেখেই তিনি বলে ওঠেন :

আবূ সুফিয়ান! তোমার মঙ্গল হোক! এখনও কি সময় আসেনি যে, তুমি এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে যিনি ভিন্ন আর কোন ‘ইলাহ’ নেই?

আবূ সুফিয়ান বললেন : আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক! আপনি কত মহানুভব, দয়ালু ও ধৈর্যশীল আর আপনি আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষাকারী। আল্লাহর কসম! আমি তো বুঝছি যে, যদি আল্লাহ ভিন্ন আর কোন মা‘বূদ কিংবা উপাস্য থাকত তাহলে আজ আমার অবশ্যই কোন উপকারে আসত।

এরপর তিনি বললেন : আবূ সুফিয়ান! আল্লাহ তোমাকে উপলব্ধি দান করুন। এখনও কি সে সময় আসেনি যে, তুমি এ কথা স্বীকার করবে যে, আমি আল্লাহর রাসূল?

আবূ সুফিয়ান বললেন : আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান! আপনি কত মহানুভব, দয়ালু ও সজ্জন আর আপনি আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষাকারী। কিন্তু এ বিষয়ে এখনও আমার কিছুটা সন্দেহ রয়ে গেছে। হযরত ‘আব্বাস (রা) কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলে উঠলেন : আরে আল্লাহর বান্দা! এখনও সন্দেহ সংশয়! বাঁচতে চাইলে কেউ এসে তলোয়ারের আঘাতে গর্দান উড়িয়ে দেবার আগেই ইসলাম কবুল করে ফেল এবং সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। এতচ্ছ্রবণে আবূ সুফিয়ান ইসলাম কবুল করেন এবং মুক্ত কণ্ঠে সাক্ষ্য ঘোষণা পূর্বক মুসলিম দলভুক্ত হন।১৫

সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা

রাসূলুল্লাহ (সা) ক্ষমা, শান্তি ও নিরাপত্তার বৃত্ত এই দিন প্রশস্ত থেকে প্রশস্ততর ও ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর করে দেন এবং বলেন, মক্কার বাসিন্দাদের মধ্যে কেবল তারাই নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করবে যারা নিজেরাই ক্ষমা ও নিরাপত্তা লাভে ইচ্ছুক নয় এবং যাদের নিজেদের জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা ধরে গেছে। এরপর তিনি ঘোষণা দেন, যে ব্যক্তি মাসজিদুল-হারামে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ, যে আপন ঘরে দরজা বন্ধ করে রাখবে সে নিরাপদ, আর আবূ সুফিয়ানের ঘরে যে প্রবেশ করবে সেও নিরাপদ।১৬

আল্লাহ্‌র রাসূল (সা) তাঁর বাহিনীর সদস্যদেরকে নির্দেশ দেন যে, আজ কেবল তাদের ওপর হাত ওঠানো হবে যারা মক্কায় প্রবেশ মুহূর্তে কোনরূপ বাধা দেবে কিংবা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। তিনি তাদেরকে আরও নির্দেশ দেন যে, মক্কার লোকদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করবে এবং এক্ষেত্রে যেন কোনরূপ হস্তক্ষেপ না করা হয়।১৭

আবূ সুফিয়ানের বিজয় মিছিল দর্শন

রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত ‘আব্বাস (রা)-কে বললেন আবূ সুফিয়ানকে এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিতে যেখান থেকে তিনি মুসলিম প্ল্যাটুনগুলোর অগ্রাভিযানের দৃশ্য দেখতে পান। বিজয়ী বাহিনীকে তখন সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের ন্যায় মক্কার উপকণ্ঠে আছড়ে পড়তে দেখা যাচ্ছিল। বিভিন্ন কবিলা আপন আপন পতাকা সহকারে পথ অতিক্রম করছিল। যখনই কোন কবিলা অতিক্রম করত তখন আবূ সুফিয়ান ‘আব্বাস (রা)-কে তাদের নাম জিজ্ঞেস করতেন, পরিচয় জানতে চাইতেন। নাম-পরিচয় পাবার পর তিনি বলতেন : এই গোত্রের সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক? অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে একটি সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে আসতে দেখা গেল যা বাহ্যত সবুজ দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল। এটি ছিল মুহাজির ও আনসারদের এমন একটি বর্ম পরিহিত বাহিনী যাদের কেবল চক্ষুই দেখা যাচ্ছিল।

আবূ সুফিয়ান এই দৃশ্য বিস্ময় বিহ্বল কণ্ঠে বলে উঠলেন : আল্লাহ্‌র অপূর্ব শান! ‘আব্বাস, ঐরা কারা? জবাবে হযরত ‘আব্বাস জানালেন : ইনি রাসূলুল্লাহ (সা)! মুহাজির ও আনসার পরিবেষ্টিত হয়ে চলেছেন। তিনি বললেন : এদের ভেতর এর পূর্বে এত শক্তি ও শান-শওকত আর কারো ছিল না। আল্লাহ্‌র কসম! ও হে আবূ’ল-ফযল! তোমার ভাতিজার ক্ষমতার পরাকাষ্ঠা আজকের সকালে কত বিশাল বিপুল! উত্তরে তিনি জানালেন : আবূ সুফিয়ান! তুমি ভুল করছ। এ ক্ষমতার পরাকাষ্ঠা নয়, নবুয়্যাতের (অতুলনীয়) মু‘জিযা।

এরপর আবূ সুফিয়ান (দৌড়ে মক্কায় গিয়ে) উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা দিলেন : ওহে কুরায়শ লোকেরা! মুহাম্মাদ (সা) আজ বিশাল ও বিপুল শক্তি সমভিব্যাহারে আমাদের দ্বারে সমুপস্থিত যা তোমাদের ধারণাতীত। এখন যারা আবূ সুফিয়ানের ঘরে আশ্রয় নেবে তারা নিরাপদ। লোকেরা এতচ্ছ্রবণে আবূ সুফিয়ানকে বলতে লাগল : তোমার ব্যাপারে আল্লাহই বুঝুন। তোমার ঘরের পরিসরই বা কতটুকু! তাতে আমাদের কতজনের আশ্রয় জুটবে? অতঃপর তিনি বললেন : যারা নিজেদের ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘরে অবস্থান করবে তারাও নিরাপত্তা লাভ করবে এবং যারা মাসজিদুল-হারামে আশ্রয় নেবে তারাও নিরাপদ। এরপরই লোকজন এদিক-ওদিক পালাল : কেউ বা আপন ঘরে, কেউ বা মাসজিদুল-হারামের দিকে ছুটল আশ্রয় নিতে।১৮

মক্কা প্রবেশ : অবনত মস্তকে, উদ্ধত কিংবা গর্বোন্নত মস্তকে নয়

রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় এভাবে প্রবেশ করেন যে, তাঁর মস্তক আনুগত্য ও বিনয়াধিক্যে একেবারে ঝুঁকে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল তাঁর চিবুক বুঝি-বা উটনীর কুঁজ স্পর্শ করবে। মক্কায় প্রবেশকালে তিনি সূরা ফাতহ্ পড়ছিলেন।১৯

বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশকালে (যা ছিল আরব উপদ্বীপের হৃৎপিণ্ড বিশেষ এবং এর আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র) ন্যায়বিচার ও সাম্য, বিনয় ও আনুগত্যের এমন কোন মানদণ্ড ছিল না যা তিনি অবলম্বন করেননি। তাঁরই মুক্ত দাস হযরত যায়দ পুত্র উসামা (রা)২০-কে এ সময় তিনি তাঁর বাহনে তাঁরই পশ্চাদ্দেশে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। বনী হাশিম ও কুরায়শ অভিজাতদের ভেতর, যাদের এক বিরাট সংখ্যক সেখানে বর্তমান ছিল, আর কারো এই সৌভাগ্য জোটেনি। দিনটি ছিল ২১শে রমযান শুক্রবার।

মক্কা বিজয়ের দিন জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কাঁপছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে অভয় দিয়ে বললেন : ভয় পেয়ো না, আশ্বস্ত হও। আমি কোন বাদশাহ নই। আমি এমন এক কুরায়শ মহিলার সন্তান যিনি গোশতের শুকনো টুকরো খেতেন।২১

ক্ষমা ও দয়া প্রদর্শনের দিন, রক্তপাতের নয়

আনসারদের আমীর ছিলেন হযরত সা‘দ ইবন ‘উবাদাহ (রা)। তিনি আবূ সুফিয়ানের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন :

الْيَوْمُ يَوْمُ الْمَلْحَمَةِ، الْيَوْمَ تُسْتَحَلُّ الْكَعْبَةُ، الْيَوْمَ أَذَلَّ اللّٰهُ قُرَيْشًا

“আজ প্রচণ্ড লড়াইয়ের দিন, আজ রক্তপাতের দিন; আজ কা‘বার সীমানায়ও সব কিছু বৈধ হবে। আজ আল্লাহ তা‘আলা কুরায়শদেরকে অপমানিত করেছেন।”

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) যখন আপন কোম্পানীসহ আবূ সুফিয়ানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তিনি এ সম্পর্কে অভিযোগ পেশ করেন এবং বলেন : হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আপনি কি শুনেছেন এইমাত্র সা‘দ কী বলে গেলেন? তিনি সা‘দ কি বলেছে তা জানতে চাইলে আবূ সুফিয়ান এর পুনরাবৃত্তি করলেন। সা‘দ (রা)-এর কথা তিনি পছন্দ করেননি। তিনি বললেন :

الْيَوْمُ يَوْمُ الْمَرْحَمَةِ، الْيَوْمَ يُعِزُّ اللّٰهُ قُرَيْشًا، وَيُعَظِّمُ اللّٰهُ الْكَعْبَةَ

“আজ তো দয়া ও ক্ষমা প্রদর্শনের দিন। আজ আল্লাহ তা‘আলা কুরায়শদেরকে সম্মানিত করবেন এবং কা‘বার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন।”২২

তিনি হযরত সা‘দ (রা)-কে ডেকে পাঠালেন এবং তাঁর হাত থেকে ইসলামের পতাকা নিয়ে তৎপুত্র কায়স ইবন সা‘দ (রা)-কে সোপর্দ করলেন। তিনি এই ধারণা করলেন যে, ইসলামের পতাকা তৎপুত্র কায়স (রা)-কে দেবার অর্থ হবে এই যে, যেন পতাকা তাঁর হাত থেকে ফেরত নেওয়া হয়নি।২৩

আর এভাবেই একটি হরফের পরিবর্তন (الملحمة-র পরিবর্তে المرحمة বলা) এবং এক হাতকে অপর হাত দ্বারা পরিবর্তনপূর্বক (যার একটি হাত পিতার এবং অপর হাতটি পুত্রের) তিনি সা‘দ ইবন উবাদার (যার ঈমানী ও মুজাহিদসুলভ কৃতিত্ব সূর্যের মত ভাস্বর) এতটুকু মনে আঘাত না দিয়ে আবূ সুফিয়ানের (যার অন্তরকে প্রবোধ ও সান্ত্বনা দেবার দরকার ছিল) মন জয়ের উপকরণ এত বিজ্ঞোচিত পন্থায়, বরং বলা যায় মু‘জিযাসুলভ পন্থায় আনজাম দিলেন যার থেকে উত্তম পন্থার কথা কল্পনাও করা যেত না। পিতার পরিবর্তে তাঁর পুত্রকে এই পদ দান করলেন যদ্বারা আবূ সুফিয়ানের আহত অন্তরকে প্রবোধ দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল। অপরদিকে তিনি সা‘দ ইবন উবাদা (রা)-কেও বিষণ্ণ ও মনঃক্ষুণ্ণ দেখতে চাইছিলেন না যিনি ইসলামের জন্য বিরাট বড় খেদমত আঞ্জাম দিয়েছিলেন।

মামূলী সংঘর্ষ

এই সময় সাফওয়ান ইবন উমায়্যা, ইকরিমা ইবন আবী জাহল, সুহায়ল ইবন ‘আম্র ও খালিদ ইবন ওয়ালীদ-এর সঙ্গী-সাথীদের মধ্যে কিছুটা সংঘর্ষ হয়। এতে এক ডজন কাফির মুশরিক মারা যায়। এরপর তারা পরাজয় স্বীকার করে পালিয়ে যায়। এর কারণ ছিল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মুসলিম বাহিনীর অধিনায়কদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, মক্কায় প্রবেশকালে কেবল তার বিরুদ্ধে সংগ্রামে প্রবৃত্ত হতে পারবে যারা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে প্রবৃত্ত হবে।২৪

হারাম শরীফ মূর্তিমুক্ত

রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় তাঁর অবস্থানস্থলে পৌঁছতেই লোকেরা নিশ্চিত হল। এ সময় তিনি বাইরে এলেন, বায়তুল্লাহর দিকে রওয়ানা হলেন এবং বায়তুল্লাহর চতুর্দিকে তাওয়াফ করলেন। এ সময় তাঁর হস্ত মুবারকে একটি ধনুক ছিল। কা‘বা শরীফে তখন ৩৬০টি মূর্তি ছিল। তিনি ধনুকের সাহায্যে মূর্তিগুলোর দিকে খোঁচা দিচ্ছিলেন আর বলছিলেন :

তিনি একথা বলছিলেন আর একটি একটি করে মূর্তিগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছিল।২৫

কা‘বা শরীফের দেওয়াল গাত্রে তিনি বেশ কিছু ছবি টাঙানো দেখতে পান। তাঁর হুকুমে সেগুলো নামিয়ে ফেলা হয় এবং ছিন্নভিন্ন করা হয়।২৬

আজ উত্তম আচার-আচরণ প্রদর্শনের দিন

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর তাওয়াফ শেষ হতেই কা‘বা শরীফের কুঞ্জিরক্ষক হযরত উছমান ইবন তালহা (রা)-কে ডেকে পাঠালেন। অতঃপর তার কাছ থেকে চাবি নিলেন। দরজা খোলা হল এবং তিনি কা‘বার ভেতরে প্রবেশ করলেন। মদীনায় হিজরতের পূর্বে একবার তিনি চাবি চাইলে তাঁকে রূঢ় ভাষায় উত্তর দেওয়া হয় এবং তাঁকে অসম্মানজনক কথা বলা হয়। তিনি সে দিন ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার অপূর্ব পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে বলেছিলেন : উছমান! এই চাবি তুমি কোন একদিন আমার হাতে দেখতে পাবে। সেদিন আমি যাকে ইচ্ছা তাকে এই চাবি দেব। এর উত্তরে তিনি (উছমান ইবন তালহা) বলেছিলেন : যদি এমনটাই হয় তবে সেই দিনটি হবে কুরায়শদের জন্য বড়ই অবমাননাকর ও ধ্বংসের। এতে আঁ-হযরত (সা) বলেন : না, সেদিন হবে প্রতিষ্ঠা ও সম্মানের। সেদিনের এই কথা উছমান ইবন তালহার অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল এবং তিনি অনুভব করেন যে, যেমনটি তিনি বললেন তেমনটাই হবে।

মহানবী (সা) যখন কা‘বা শরীফ থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন তখন তাঁর পবিত্র হাতে ছিল চাবি। তাঁকে দেখতেই হযরত আলী (রা) দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আরয করলেন : আল্লাহ আপনার ওপর দরূদ ও সালাম প্রেরণ করুন। আপনি হাজীদের পানি পান করাবার ব্যবস্থাপনা (সিকায়া)-র সাথে আল্লাহ্‌র ঘরের দ্বাররক্ষণ (হিজাবা)-এর দায়িত্ব আমাকে দান করুন। তিনি উছমান ইবন তালহা কোথায় তা জানতে চাইলেন। তাঁকে ডেকে আনা হলে তিনি বললেন : উছমান! এই নাও তোমার চাবি। আজ উত্তম ব্যবহার ও বিশ্বস্ততা প্রদর্শনের দিন। এই নাও চাবি। এ চাবি এখন থেকে তোমার কাছেই থাকবে আর একমাত্র জালিম ব্যতিরেকে অন্য কেউ এ চাবি তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবে না।২৭

তাওহীদের হক ও মানবীয় ঐক্যের ধর্ম

রাসূলুল্লাহ (সা) যখন কা‘বার ভেতর থেকে বের হওয়ার জন্য দরজা খুললেন তখন কুরায়শরা গোটা হারাম শরীফে কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এবং তিনি কি করেন তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। তিনি দরজার দুই বাহু ধরলেন। আর সব লোকেরা তাঁর নিচে ছিল। তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন :

لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، صَدَقَ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ، أَلَا كُلُّ مَأْثُرَةٍ وَمَالٍ وَدَمٍ فَهُوَ تَحْتَ قَدَمَيَّ هَاتَيْنِ، إِلَّا سِدَانَةَ الْبَيْتِ وَسِقَايَةَ الْحَاجِّ، يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ، إِنَّ اللّٰهَ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ نَخْوَةَ الْجَاهِلِيَّةِ وَتَعَظُّمَهَا بِالْآبَاءِ، النَّاسُ مِنْ آدَمَ، وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ

“এক আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই; তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি তাঁর ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছেন, স্বীয় বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং যৌথবদ্ধ দলসমূহকে একাই পরাজিত করেছেন। মনে রেখ, সর্বপ্রকার গর্ব, প্রতিহিংসা ও রক্তপণ আমার দুই পদতলে। কেবল কা‘বার অভিভাবকত্ব ও হাজ্জীদের পানি পানের বিষয় এর ব্যতিক্রম। ওহে কুরায়শ সম্প্রদায়! জাহিলী যুগের গর্ব ও বংশ গৌরব আল্লাহ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন। সমস্ত মানুষ আদম সন্তান আর আদম মাটি থেকে সৃষ্ট।”

এরপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াত তেলাওয়াত করলেন :

দয়ার নবী, করুণার ছবি

এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন :

“কুরায়শগণ! তোমরা কী আশা করছ যে, এক্ষণে আমি তোমাদের সঙ্গে কিরূপ ব্যবহার করব?” তারা জওয়াব দিল : আমরা তোমার নিকট উত্তম ব্যবহার পাবার আশা করি। তুমি হৃদয়বান ও শরীফ ভাই এবং হৃদয়বান ও শরীফ ভ্রাতুষ্পুত্র।

তিনি বললেন : আমি তোমাদেরকে তাই বলছি যা ইউসুফ (আ) তাঁর ভাইদেরকে বলেছিলেন :

لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ، اذْهَبُوا فَأَنْتُمُ الطُّلَقَاءُ

“তোমাদের বিরুদ্ধে আজ আর আমার কোন অভিযোগ নেই। যাও, তোমরা মুক্ত।”২৯

তারপর তিনি কা‘বার ওপর আরোহণপূর্বক বেলাল (রা)-কে আযান দিতে বললেন। কুরায়শ নেতৃবর্গ ও তাদের অভিজাতবৃন্দ এই ঘোষণা শুনল এবং তামাম মক্কা উপত্যকা আযানের শব্দে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল।

এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) উম্মু হানী বিনতে আবী তালিবের গৃহে তশরীফ নিলেন, সেখানেই গোসল করলেন এবং আট রাকাআত সালাতুল-ফাত্হ (বিজয়ের নামায) আদায় করেন।৩০

শরঈ ‘হদ’ জারীর ক্ষেত্রে ব্যক্তি বিশেষকে বিবেচনার সুযোগ নেই

বনী মাখযুমের ফাতিমা নাম্নী এক মহিলা এই সময় চুরির অপরাধে ধরা পড়ে। তার গোত্রের লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সা)-র প্রিয় ও একান্ত স্নেহভাজন, এই বিশ্বাসে হযরত উসামা ইবন যায়দ (রা)-এর নিকট আগমন করে এবং তাঁকে দিয়ে সুপারিশ করাতে চায়। বিষয়টি তিনি রাসূল আকরাম (সা)-এর খেদমতে পেশ করতেই তাঁর চেহারা মুবারকের পরিবর্তন ঘটে। তিনি বললেন : তুমি কি আমাকে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে নির্দিষ্ট কোন ‘হদ’ সম্পর্কে কথা বলছ? উসামা (রা) আরয করলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! আপনি আমার জন্য আল্লাহ তা‘আলার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। সন্ধ্যার সময় তিনি সর্বস্তরের লোকদেরকে সম্বোধন করলেন। প্রথমে তিনি আল্লাহ তা‘আলার হাম্দ ও ছানা বর্ণনা করলেন যা তাঁর মর্যাদার উপযুক্ত। অতঃপর তিনি বললেন :

“তোমাদের পূর্বকার লোকেরা এজন্যই ধ্বংস হয়েছিল যে, যখন তাদের শরীফ ও মর্যাদাবান লোকেরা চুরি করত তখন তাদেরকে ছেড়ে দিত আর দুর্বল ও কমজোর লোকেরা চুরি করলে তার ওপর শাস্তির বিধান কার্যকর করত। সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের জীবন! যদি মুহাম্মাদ কন্যা ফাতিমাও চুরি করত তবে আমি তার হাতও কেটে দিতাম।”

এরপর তিনি মহিলার হাত কাটবার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ পালিত হল। মহিলা এই বদ আমল থেকে তওবা করল। তার অবস্থা শুধরে গেল। মহিলার পরে বিয়েও হয়েছিল।৩১

শত্রুর সঙ্গে উত্তম আচরণ

বিজয় সম্পূর্ণ হল। রাসূলুল্লাহ (সা) সকলকেই নিরাপত্তা দান করলেন, দিলেন অভয়। কেবল নয়জন সম্পর্কে হত্যার নির্দেশ জারী করা হয়, এমন কি কা‘বার পর্দান্তরালে আশ্রয় নিলেও তাদেরকে ক্ষমা করা হবে না, বরং হত্যা করা হবে ঘোষিত হল। এদের মধ্যে এমন লোকও ছিল যে ইসলাম গ্রহণের পর মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল। এমন লোকও ছিল যে ধোঁকা দিয়ে কোন মুসলমানকে হত্যা করেছিল। এমন লোকও ছিল আল্লাহর রাসূলের কুৎসা রটনাই যার পেশায় পরিণত হয়েছিল। এদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন সা‘দ ইবন আবী সারাহও ছিল, যে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল। ‘ইকরিমা ইবন আবী জাহল ছিল যে ইসলামের প্রাধান্য ও বিজয়ে ঘৃণাবশে এবং জীবনের ভয়ে ভীত হয়ে ইয়ামানে পালিয়েছিল। তার পলায়নের পর তার স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে হাযির হয়ে তার নিরাপত্তা কামনা করল। যদিও তিনি জানতেন যে, সে তাঁর নিকৃষ্টতম শত্রুর পুত্র, তারপরও তিনি তাকে নিরাপত্তা দিলেন, দিলেন অভয়। এরপর ইকরিমার আগমনে তিনি খুশী হয়ে ও তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে এভাবে ছুটে গিয়েছিলেন যে, কাঁধের চাদর গড়িয়ে পড়েছিল। ইকরিমা ইসলাম গ্রহণ করলে তিনি আরও খুশী হন। মুসলমানদের মধ্যে তিনি বিশিষ্ট আসন লাভ করেন। রিদ্দার যুদ্ধগুলোতে ও সিরিয়ার বিভিন্ন যুদ্ধাভিযানে তিনি শানদার খেদমত আঞ্জাম দেন।

এদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রিয়তম চাচা সায়্যিদুনা হামযা (রা)-এর হন্তা (জুবায়র ইবন মুত’ইম-এর গোলাম) ওয়াহশীও ছিল যার রক্তপাতকে আল্লাহর রাসূল বৈধ করে দিয়েছিলেন। সেও ইসলাম কবুল করে। আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর ইসলাম গ্রহণও কবুল করেছিলেন।

এদের ভেতর হাব্বার ইবনুল-আসওয়াদও ছিল যেই নরাধম রাসূল কন্যা হযরত যয়নব (রা)-এর পার্শ্বদেশে নেযার আঘাত হেনেছিল। আঘাতের ফলে তিনি উটের পিঠ থেকে একটি পাথরের ওপর পড়েন এবং তাঁর গর্ভপাত ঘটে।

এরপর সে পালিয়ে যায়। পরে সেও ইসলাম কবুল করে। সারা নাম্নী এক নারী এবং অপর এক গায়িকা (যারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বিরুদ্ধে কুৎসামূলক গান গাইত) সম্পর্কে নিরাপত্তা চাওয়া হয়। তিনি তাদের উভয়কেই নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং উভয়ই ইসলাম কবুল করে।৩২

ওৎবা কন্যা হিন্দ ও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কথোপকথন

মক্কায় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে সকলে একটি সমাবেশে মিলিত হয়। তিনি তাদের বায়‘আত করবার নিমিত্ত সাফা পাহাড়ের ওপর আরোহণ করেন এবং সেখানে উপবেশনপূর্বক সাধ্যমত আল্লাহ ও তদীয় রাসূল (সা)-এর নির্দেশ শ্রবণ ও অনুসরণের ওপর তাদের থেকে বায়‘আত নেন।

পুরুষদের থেকে বায়‘আত গ্রহণ শেষে তিনি মহিলাদের থেকে বায়‘আত গ্রহণ করেন। এসব মহিলার মধ্যে আবূ সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে ওতবাও ছিলেন। তিনি মুখে নেকাব দিয়ে এসেছিলেন। সায়্যিদুনা হামযা (রা)-এর শহীদী লাশের সঙ্গে যা করেছিলেন, তদ্দরুন নিজেকে তিনি প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন না।

রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : তুমি এই কথার ওপর আমার নিকট বায়‘আত কর যে, আল্লাহর সঙ্গে তুমি কাউকে শরীক করবে না। হিন্দ বললেন : আল্লাহর কসম! আপনি আমাদের থেকে সেই স্বীকৃতি নিচ্ছেন যা আপনি পুরুষদের থেকে নেননি। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : আর চুরি করবে না। হিন্দ পুনরায় বললেন : আমি আবূ সুফিয়ানের সম্পদ থেকে অল্প বিস্তর নিয়েছি। জানি না এটা করা বৈধ হয়েছে, না কি অবৈধ। এতচ্ছ্রবণে সেখানে উপস্থিত আবূ সুফিয়ান বললেন : অতীতে যা কিছু হয়েছে তা থেকে তুমি মুক্ত। যা তুমি নিয়েছ তা তোমার জন্য বৈধ। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : আচ্ছা! তাহলে তুমিই ওতবা কন্যা হিন্দ? হিন্দ বললেন : হাঁ, আমিই হিন্দ! বিগত দিনগুলোতে আপনার সঙ্গে যত কিছু অন্যায় হয়েছে, যত ত্রুটি-বিচ্যুতি সংঘটিত হয়েছে সেসব মার্জনা করুন। আল্লাহ আপনাকেও ক্ষমা করুন। অতঃপর তিনি বললেন : আর ব্যভিচার করবে না। হিন্দ বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন শরীফ মহিলা কি ব্যভিচার করতে পারে?৩৩

এরপর তিনি বললেন : আপন সন্তানদের হত্যা করবে না। এই কথা শুনে হিন্দ বললেন : যত দিন তারা শিশু ছিল ততদিন আমরা তাদেরকে লালন-পালন করেছি। যখন তারা বড় হল তখন আপনি তাদেরকে হত্যা করলেন। এখন আপনি জানেন আর তারা জানে।

ইরশাদ হল : প্রকাশ্য অপবাদ দেবে না কাউকে। হিন্দ বললেন : আল্লাহর কসম! অপবাদ আরোপ খুবই দূষণীয় ও নিকৃষ্ট ব্যাপারে। কোন কোন সময় দেখেও না দেখার ভান করা, এড়িয়ে যাওয়া ও ক্ষমা করাই উত্তম। আল্লাহর রাসূল বললেন : আমার অবাধ্য হবে না, আমাকে অমান্য করবে না। তিনি বললেন : হ্যাঁ, ভাল কথা (এটি প্রযোজ্য)।৩৪

‘জীবনে-মরণে তোমাদেরই সাথে আমি’

আল্লাহ তা‘আলা যখন মক্কার দরজা তাঁর রাসূলের জন্য খুলে দিলেন যে মক্কা ছিল তাঁর জন্মস্থান ও মূল আবাস ভূমি, তখন আনসাররা পরস্পরে বলাবলি করতে লাগলেন যে, আল্লাহর রাসূলের জন্য আল্লাহ তা‘আলা তাঁর (রাসূলের) স্বদেশ ও স্বভূমিকে বিজয়ের ফসল হিসাবে দান করছেন। এখন কি আর তিনি মদিনায় ফিরবেন? এখন তিনি এখানেই থাকবেন।

রাসূলুল্লাহ (সা) আনসারদের এই পারস্পরিক কানাকানির কথা জানতে পেরে তাদেরকে ডাকলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা নিজেরা কী বলাবলি করছিলে?” অথচ একথা তাঁরা ছাড়া আর কারও জানবার কথা ছিল না। এক্ষণে আল্লাহর রাসূল ব্যাপারটা জেনে গেছেন দেখে তাঁরা খুবই লজ্জিত হলেন এবং শেষে স্বীকার করলেন। আল্লাহর রাসূল (সা) তখন বললেন : আল্লাহর পানাহ চাই! এটা কী করে হতে পারে (যে, আমি তোমাদেরকে পরিত্যাগ করব)? যত দিন বাঁচি তোমাদের মাঝেই বাঁচব আর মরলে তোমাদের মাঝেই মরব।৩৫

শত্রুর চক্ষু আনত এবং ফাসিক মুত্তাকীতে পরিণত

ফুযালার নিয়ত খারাপ হল। সে চক্রান্ত আঁটল যে, যখন আল্লাহর রাসূল তাওয়াফে মশগুল হবেন তখন তাঁর কাজ সাঙ্গ করা হবে যা আর কোন হতভাগা পারেনি। সে এই অভিপ্রায়ে তাঁর নিকটবর্তী হতেই তিনি তার দিকে তাকিয়ে ডাক দিলেন : ফুযালা! ফুযালা! ডাকে সাড়া দিতেই তিনি তাকে বললেন : তুমি এই মুহূর্তে মনে মনে কী ভাবছিলে বল দেখি? সে অস্বীকার করল। বলল : কৈ কিছু না তো। আমি আল্লাহকে স্মরণ করছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সা) একথা শুনে হেসে ফেললেন। এরপর বললেন : আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। অতঃপর আপন মুবারক হাত তার বুকে স্থাপন করলেন। তার অন্তর তন্মুহূর্তেই প্রশান্তিতে ভরে গেল।

ফুযালা বলতেন : তিনি তাঁর হাত আমার বুক থেকে সরাবার আগেই আল্লাহ তা‘আলার সমগ্র সৃষ্টির ভেতর তাঁর চেয়ে প্রিয় আমার নিকট আর কেউ ছিল না।

ফুযালা বলেন : এরপর আমি আমার ঘরের দিকে চললাম। পথিমধ্যে পরিচিত এক মহিলার সঙ্গে আমার দেখা। সে একান্তে আমার সঙ্গে কিছু কথা বলতে ও সময় কাটাতে চাইল। কিন্তু ফুযালার উত্তর ছিল : না, তা আর হয় না। আল্লাহ ও ইসলাম এক্ষণে আর আমাকে এর অনুমতি দেয় না।৩৬

জাহিলিয়াত ও মূর্তিপূজার নিদর্শনাদি নির্মূল

কা‘বার চতুর্দিকে যতগুলো মূর্তি ছিল সেগুলো ধ্বংস করার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাহিনী পাঠানো হল এবং সবগুলো মূর্তি ভেঙে টুকরো টুকরো করা হল। এসব মূর্তির মধ্যে ‘লাত’ ও ‘উযযা’-র মূর্তি যেমন ছিল, তেমনি ছিল ‘মানাত’-এর মূর্তিও। এরপর তাঁর ঘোষক মক্কায় ঘোষণা দিলেন যে, যেই ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের ওপর নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে সে যেন তার ঘরের প্রতিটি মূর্তিকেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। তিনি সাহাবায়ে কিরাম (রা)-এর মধ্য থেকে কয়েকজনকেও বিভিন্ন কবিলায় পাঠিয়ে দিলেন। তাঁরা সেখানে গিয়ে মূর্তি ভাঙার এই পবিত্র দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। জারীর (রা) বর্ণনা করেন : জাহিলী যুগে “যূল-খালসাহ” নামক একটি মূর্তিঘর ছিল। তেমনি “আল-কা‘বাতুল-ইয়ামানিয়্যা” ও “আল-কা‘বাতুশ শামিয়্যা” নামক পূজামণ্ডপও ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে বললেন : তুমি কি “যূল-খালসাহ” ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে আমাকে আরাম দেবে না? জারীর (রা) বলেন : আমি আহমাসের খ্যাতনামা দু’শ অশ্বারোহী সৈনিক নিয়ে সেখানে গেলাম এবং মূর্তিটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলাম। এছাড়া যত লোক সে সময় উক্ত মূর্তির পাশে উপস্থিত ছিল তাদেরকেও মরণ সাগরের ওপারে পাঠিয়ে দিলাম। এরপর ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে সব খবর শোনালাম। তিনি আমাদের জন্য এবং আহমাসের জন্য দু‘আ করলেন।৩৭

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় দাঁড়িয়ে এর সম্মান ও মর্যাদার ঘোষণা দিলেন এবং বললেন, “আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী কোন ব্যক্তির জন্যই জায়েয হবে না এর সীমারেখার ভেতর রক্তপাত করা কিংবা এখানকার কোন বৃক্ষ নিধন করা।” তিনি এও বললেন যে, “আমার পূর্বেও কারো পক্ষে এখানে এসব করা জায়েয ছিল না, আর আমার পরেও কারো জন্য কখনো তা জায়েয হবে না।” এরপর তিনি মদীনায় তশরীফ নিলেন।৩৮

মক্কা বিজয়ের প্রভাব

মক্কা বিজয় আরবদের অন্তর মানসের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। আল্লাহ তা‘আলা তাদের অন্তর মনকে ইসলাম কবুলের নিমিত্ত উন্মুক্ত করে দেন। ফলে তারা দলে দলে এসে অধিক হারে ইসলাম কবুল করতে শুরু করে। এমন কিছু কবিলা ছিল যারা কুরায়শদের সঙ্গে কোন না কোন চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। আর চুক্তির এই দায়বদ্ধতা তাদের ইসলাম গ্রহণের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছিল। কিছু কবিলা কুরায়শদের ভয় করত এবং কুরায়শদের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার আসন তাদের অন্তর রাজ্যে আসন গেড়েছিল। যখন তারা দেখল যে, স্বয়ং কুরায়শরাই ইসলামের সামনে অস্ত্র সমর্পণ করে দিয়েছে এবং মস্তক অবনত করেছে তখন তাদের মনেও ইসলাম কবুলের আগ্রহ সৃষ্টি হল এবং এই প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে গেল।

কোন কোন গোত্র বিশ্বাস করত যে, মক্কায় কোন জালিম ও জবরদখলকারী প্রবেশ করতে পারে না, পারে না খারাপ নিয়তে একে জয় করতে। তাদের ভেতর এমন লোকও বর্তমান ছিল যাদের সামনে হস্তিবাহিনী ধ্বংসের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল এবং তারা স্বচক্ষেই দেখেছিল যে, আবরাহার পরিণতি কি হল। তারা বলত, আরে যেতে দাও। তাঁর কওমের পেছনে দৌড়াবার প্রয়োজন নেই। যদি তিনি এই সংগ্রামে জিতে যান তাহলে এর অর্থ দাঁড়াবে এই যে, তিনি সত্য নবী।৩৯

এরপর আল্লাহ তা‘আলা যখন তাঁর নবীর হাতে মক্কা বিজয় করালেন এবং কুরায়শরা ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় ইসলামের সামনে মস্তক অবনত করতে বাধ্য হল তখন আরবরা ইসলামের দিকে ব্যাপকহারে এমনভাবে ঝুঁকতে শুরু করল যে, এর পূর্বে এর কোন নজীর মেলে না। তাদের বড় বড় দল ও গোত্র তাঁর নিকট উপস্থিত হল এবং আপন মৃত ভাগ্যকে জীবিত করল। এই মওকাতেই আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মজীদ ইরশাদ ফরমান:

কমবয়স্ক আমীর

মক্কা থেকে বিদায় নেবার প্রাক্কালে আল্লাহর রাসূল (সা) আত্তাব ইবন উসায়দকে মক্কার বিভিন্ন বিষয় এবং হজ্জ ব্যবস্থাপনা আনজাম দেবার জন্য আমীর নিযুক্ত করেন।৪১ তাঁর বয়স ছিল সে সময় বিশ বছরের কাছাকাছি। অথচ সে সময় তাঁর চেয়ে অধিক বয়সী, সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী লোক মক্কায় বর্তমান ছিল। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, দায়িত্ব ও পদ যোগ্যতা, দক্ষতা ও শক্তি-সামর্থ্যের ভিত্তিতে পাওয়া যায়। হযরত আবূ বকর (রা) তাঁর খিলাফত আমলেও তাঁকে আপন পদে বহাল রাখেন।৪২

টীকা

  1. ১মুতাবিক জানুয়ারি ৬৩০ খৃ.।
  2. ২সীরাত ইবনে হিশাম, ২য় খণ্ড, ৩৯০।
  3. ৩যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪১৯ ও সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৩৯০।
  4. ৪যুরকানী মাওয়াহিব গ্রন্থে ইবন আয়েয থেকে ইবন ওমরের বরাতে বর্ণনা করেন যে, যেই লোককে রাসূলুল্লাহ (সা) এই কাজের জন্য পাঠিয়েছিলেন তার নাম ছিল দামরা এবং কুরায়শদের যেই লোক এর উত্তর দিয়েছিল তার নাম ছিল কুর্ত ইবন আমর (২য় খণ্ড, ৩৪৯)।
  5. ৫যাদুল-মা‘আদ ৪২০/১ম খণ্ড ও সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ২৯৫-৯৬।
  6. ৬যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪২০ ও সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৩৯৬। মূল আরবী শব্দ এই : والله, لقد اصابك بعدي شيء অর্থাৎ কসম আল্লাহর! এই নতুন ধর্ম কবুল করার পর তুমি এখন আমাকে চেন না এবং নিজের দীন ও ঈমানের সামনে বাপের দিকেও খেয়াল নেই।
  7. ৭সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৩৯৫-৯৬।
  8. ৮যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪২১ পৃ. ও সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৩৯৭।
  9. ৯হাতেব (রা) ইবন আবী বালতা‘আ লাখম গোত্রের লোক ছিলেন। গোত্রটি উত্তর হেজায ও সিরিয়ার আরব কবিলাগুলোর অন্যতম। তারা কুরায়শদের ভেতর কাদের মিত্র ছিল সে সম্পর্কে কয়েকটি মত রয়েছে তন্মধ্যে একটি এই যে, তারা বনী আসাদ ইবন আবদি’ল-উযযার মিত্র ছিল। কেউ বা তাদেরকে হযরত যুবায়র (রা)-এর মিত্র বলেন। কেউবা বলেন যে, তিনি ‘আবদুল্লাহ ইবন হুমায়দ আসাদীর মুক্ত গোলাম ছিলেন (দ্র. ইবন হাজার আসকালানীকৃত “আল-ইসাবা”)। মশহুর বর্ণনা মুতাবিক মিসরের বাদশাহ মুকাওকিস-এর নামে হুজুর (সা)-এর লিখিত পত্র নিয়ে তিনিই গিয়েছিলেন। মারযুবানী “মু‘জামু’শ-শু‘আরা” গ্রন্থে তাঁকে জাহিলী যুগের কুরায়শ অশ্বারোহী ও কবিদের মধ্যে গণ্য করেছেন। মাদাইনীর বর্ণনা মুতাবিক ৩০ হিজরীতে হযরত উছমান (রা)-এর খিলাফত আমলে ইন্তিকাল করেন।
  10. ১০যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪২০ পৃ. ও সিহাহ সিত্তা।
  11. ১১সহীহ বুখারী; غزوة الفتح في رمضان শীর্ষক অধ্যায়।
  12. ১২সূরা ইউসুফ, ৯১ আয়াত।
  13. ১৩প্রাগুক্ত, ৯২ আয়াত।
  14. ১৪যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪২১।
  15. ১৫সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৪০৩ ও যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪২২।
  16. ১৬সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৪০৯; বর্ণনাটি বুখারী শরীফে সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত।
  17. ১৭প্রাগুক্ত।
  18. ১৮সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৪০৪; যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪২৩।
  19. ১৯ইবন কাছীর, ৩য় খণ্ড, ৫৫৪; সহীহ বুখারীতে মু‘আবিয়া ইবন কুরাহ থেকে বর্ণিত, আমি আল্লাহর রাসূল (সা)-কে মক্কা বিজয়ের দিন এই অবস্থায় দেখেছিলাম যে, তিনি তাঁর উটনী পৃষ্ঠে ছিলেন আর তরজী সহকারে সূরা ফাতহ্ তেলাওয়াত করছিলেন।
  20. ২০ইবন কাছীর, ৩য় খণ্ড, ৫৫৬।
  21. ২১সহীহ বুখারী, কিতাবুল-মাগাযী।
  22. ২২ইবন উমাবী মাগাযীতে এই বর্ণনার উল্লেখ করেছেন (দ্র. ফাতহুল-বারী, ৮ম খণ্ড, ৭); সহীহ বুখারীতে এই ঘটনা কিছুটা শব্দের হেরফেরসহ বর্ণনা করা হয়েছে এবং এতে সা‘দ ইবন উবাদার প্রশ্ন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উত্তর উল্লেখিত হয়েছে। উমাবীর পুরো নাম ইয়াহ্য়া ইবন সাঈদ ইবন আবান ও নির্ভরযোগ্য রাবীদের মধ্যে তাঁকে গণ্য করা হয়েছে যার জন্য হাদীসের পরিভাষায় صدوق অর্থাৎ সত্যবাদী শব্দ ব্যবহৃত হয়। সিহাহ সিত্তার সংকলকগণ তাঁর থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। ৫৯৪ হিজরীতে তাঁর ইন্তিকাল হয়।
  23. ২৩যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪২৩
  24. ২৪প্রাগুক্ত, ৪০৭-৮।
  25. ২৫যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪২৪, আরও দেখুন বুখারী।
  26. ২৬প্রাগুক্ত, ৪২৫ পৃ. ও বুখারী।
  27. ২৭যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪২৫, তাবাকাত ইবন সা‘দ-এর বরাতে।
  28. ২৮যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪২৪।
  29. ২৯প্রাগুক্ত।
  30. ৩০বুখারী ও যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪২৫।
  31. ৩১বুখারী ও মুসলিম।
  32. ৩২যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪২৫।
  33. ৩৩সীরাত ইবন কাছীর, ৩য় খণ্ড, ৬০৩।
  34. ৩৪সীরাত ইবন কাছীর, ৬০২-৩ পৃ., অন্যান্য উৎসে কিছুটা বেশি আছে।
  35. ৩৫সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৪১৬।
  36. ৩৬প্রাগুক্ত, ৪১৭ পৃ. ও যাদুল-মা‘আদ ১ম খণ্ড, ৪২৬।
  37. ৩৭সহীহ বুখারী, যুল-খালসা যুদ্ধ।
  38. ৩৮যাদুল-মা‘আদ ১ম খণ্ড, ৪২৫-২৬।
  39. ৩৯সহীহ বুখারী, আমর ইবন সালমা (রা) কর্তৃক বর্ণিত।
  40. ৪০কাযী মাওলানা মুহাম্মদ সুলায়মান মনসূরপূরী (র)-কৃত “রহমাতুল লিল-আলামীন” থেকে গৃহীত।
  41. ৪১ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৪৪০।
  42. ৪২আল-ইসাবা ও উসদুল-গাবা।