অধ্যায় চব্বিশ

হাজ্জাতু’ল-বিদায় বা বিদায় হজ্ব

(যি’ল-হজ্জ ১০ হি. / ফেব্রুয়ারী ৬৩২)

নবীয়ে রহমত সা. · সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী

হাজ্জাতু’ল-বিদায় ও এর সময় নির্বাচন

আল্লাহর ইচ্ছা পূর্ণ হল। উম্মাহর আত্মাসমূহ মূর্তিপূজার আবর্জনা ও জাহিলিয়াতের আদত-অভ্যাস থেকে পাক-পবিত্র হল এবং আলোকিত হল ঈমানী রৌশনীতে। তাঁদের দিলে প্রেম ও ভালবাসার স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হল। আল্লাহর ঘর খানায়ে কা‘বা মূর্তি থেকে ও মূর্তির পূতি-গন্ধময় আবর্জনা থেকে মুক্ত ও পাক-সাফ হল। মুসলমানদের ভেতর (যারা বহু দিন হয় বায়তুল্লাহর হজ্ব ও যিয়ারত করেনি) হজ্বের প্রতি নবতর আগ্রহের সৃষ্টি হয় এবং প্রেম ও ভালবাসার পেয়ালা কেবল পূর্ণই হয়নি বরং উছলে ও উপচে পড়ার উপক্রম হয়। অপরদিকে বিচ্ছিন্ন হবার মুহূর্তও খুব কাছাকাছি ঘনিয়ে আসে। আর অবস্থার দাবিও হল যে, উম্মাহকে বিদায় সালাম জানাতে হবে। তখন আল্লাহ তা‘আলা তদীয় হাবীব নবী করীম (সা)-কে (১০ম হি.) হজ্বের অনুমতি দিলেন। ইসলামে এটি ছিল তাঁর প্রথম হজ্ব।

বিদায় হজ্বের দাওয়াতী, তাবলীগী ও তরবিয়তী গুরুত্ব

তিনি মদীনা থেকে এই উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন যে, তিনি বায়তুল্লাহর হজ্ব করবেন, মুসলমানদের সঙ্গে মিলিত হবেন, তাঁদের দীনের তা‘লীম দেবেন, হজ্বের নিয়ম-কানুন শেখাবেন, সত্যের সাক্ষ্য প্রদান করবেন, আপন অপরিহার্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবেন, মুসলমানদের শেষ উপদেশ দেবেন, তাঁদের থেকে অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি নেবেন, জাহিলিয়াতের শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলবেন এবং পায়ের তলে দাফন করবেন। এই হজ্ব হাজারো ওয়াজ-নসীহত, হাজারো দরস ও তা‘লীমের স্থলাভিষিক্ত ছিল। এটি ছিল একটি চলতি ও ভ্রাম্যমাণ মাদ্রাসা, একটি সক্রিয় ও গতিশীল মসজিদ এবং একটি চলন্ত ছাউনি যেখানে একজন মূর্খ জাহিল ইল্‌ম্ দ্বারা সজ্জিত হবে, গাফিল তার গাফলত থেকে সজাগ হবে, অলস চঞ্চল হবে, কমযোর শক্তিশালী ও বলবান হবে। রহমতের একটি মেঘ সফরে ও বাড়ি-ঘরে অবস্থানরত সর্বাবস্থায় ও সর্বমুহূর্তে তাঁকে ছায়াদান করত। এ ছিল রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাহচর্য, তাঁর স্নেহ ও ভালবাসা, তাঁর প্রশিক্ষণ, তত্ত্বাবধান ও নেতৃত্বরূপী রহমতের মেঘ।

হাজ্জাতু’ল-বিদা‘র ঐতিহাসিক রেকর্ড

সাহাবায়ে কিরাম (রা)-এর ন্যায় বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ বর্ণনাকারিগণ এই সফরে নাযুক থেকে নাযুকতর দিক এবং ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটনার এমন একটি রেকর্ড আমাদের জন্য সংরক্ষণ করে গেছেন যার নজীর না রাজা-বাদশাহ কিংবা আমীর-উমারার সফরনামাগুলোতে পাওয়া যাবে, আর না পাওয়া যাবে উলামা ও মাশায়েখদের কাহিনীতে।১

বিদায় হজ্বের মোটামুটি পর্যালোচনা

আমরা এই হজ্ব সফরের সংক্ষিপ্তসার২ এখানে পেশ করছি যাকে ‘হাজ্জাতু’ল-বিদা‘, হাজ্জাতুল-বালাগ ও হাজ্জাতু’ত-তামাম’ নামে স্মরণ করা হয়ে থাকে। আসলে এগুলোরই সমাহার ছিল এই হজ্ব, বরং এসবের চাইতেও ভিন্ন কিছু। এ সফরে তাঁর সঙ্গে এক লক্ষের বেশি সাহাবী শরীক ছিলেন।

রাসূলুল্লাহ (সা) যেভাবে হজ্ব করলেন

রাসূলুল্লাহ (সা) হজ্বের এরাদা করলেন এবং দশম হিজরীর যি’ল-কা‘দা মাসে লোকদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, তিনি এবার হজ্বে যাচ্ছেন। এতচ্ছ্রবণে লোকে তাঁর সঙ্গে হজ্ব গমনের আশায় প্রস্তুতি শুরু করে দেয়।

এ খবর মদীনার চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং সে সব এলাকার লোকেরাও দলে দলে মদীনায় এসে উপস্থিত হয়। পথিমধ্যে এত বিপুল সংখ্যক লোক কাফেলায় শামিল হয় যে, এর সংখ্যা নিরূপণও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এ ছিল যেন এক মানব সমুদ্র!৩ সামনে পেছনে ডানে বামে যতদূর দৃষ্টি চলে শুধু মানুষ আর মানুষ তাঁকে ঘিরে রেখেছে। তিনি মদীনা থেকে ২৫ যি’ল-কা‘দা রোজ শনিবার জোহর বাদ রওয়ানা হন। তিনি প্রথমে জোহরের চার রাক‘আত সালাত আদায় করেন। এর পূর্বে তিনি খুতবা দেন এবং এতে এহরামের ওয়াজিব ও সুন্নাতসমূহের বর্ণনা দেন।

এরপর তিনি তালবিয়া পাঠ করতে করতে রওয়ানা হন।

لَبَّيْكَ اللّٰهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ

বিশাল জনসমুদ্র এই তালবিয়া কখনো সংক্ষেপে, কখনো বা কমিয়ে বাড়িয়ে বলছিল। কিন্তু এতে তিনি কাউকে কিছু বলেননি। তালবিয়া পাঠের সিলসিলা তিনি অব্যাহত রাখেন। অতঃপর তিনি ‘আরাজ নামক স্থানে পৌঁছে ছাউনি ফেলেন। এ সময় তাঁর সওয়ারী ও হযরত আবূ বকর (রা)-এর সওয়ারী একই ছিল।

অতঃপর তিনি সামনে অগ্রসর হলেন এবং আল-আবওয়া নামক স্থানে পৌঁছলেন। সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে উসফান ও সারিফ উপত্যকায় পৌঁছান। অতঃপর সেখান থেকে যাত্রা করে “যী-তুওয়া” নামক স্থানে মনযিল করলেন এবং শনিবার রাত সেখানে অতিবাহিত করেন। সেদিন ছিল যি’ল-হজ্জ মাসের ৪ তারিখ। ফজরের সালাত তিনি সেখানেই আদায় করেন। ঐদিনই তিনি গোসলও করেন এবং মক্কাভিমুখে রওয়ানা হন। তিনি দিনের বেলা উচ্চভূমি দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন। সেখান দিয়ে তিনি হারাম শরীফে প্রবেশ করেন। এ সময় ছিল চাশতের ওয়াক্ত। বায়তুল্লাহর ওপর চোখ পড়তেই তিনি বলেন :

اللّٰهُمَّ زِدْ بَيْتَكَ هٰذَا تَشْرِيفًا وَتَعْظِيمًا وَتَكْرِيمًا وَمَهَابَةً

“হে আল্লাহ! তোমার এই ঘরের সম্মান ও মর্যাদা, তা‘জীম ও তাকরীম এবং ভীতিকর প্রভাব বৃদ্ধি করে দাও।”

দস্ত মুবারক বুলন্দ করতেন, তাকবীর বলতেন এবং ইরশাদ করতেন :

اللّٰهُمَّ أَنْتَ السَّلَامُ، وَمِنْكَ السَّلَامُ، فَحَيِّنَا رَبَّنَا بِالسَّلَامِ

“হে আল্লাহ! তুমি শান্তিময় শান্তিপ্রদাতা আর তোমার পক্ষ থেকেই শান্তি এসে থাকে। হে আমাদের রব! আমাদের শান্তির সাথে বাঁচিয়ে রাখ।”

তিনি যখন হারাম শরীফে প্রবেশ করলেন তখন সর্বপ্রথম কা‘বা শরীফের দিকে ফিরলেন। হাজরে আসওয়াদ সামনাসামনি হতেই তিনি কোনরূপ বাধা-প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই তাতে চুমু দিলেন। এরপর তাওয়াফের উদ্দেশ্যে ডান দিকে ফিরলেন। এ সময় বায়তুল্লাহ তাঁর বাম দিকে ছিল। এই তাওয়াফের প্রথম তিন চক্রে তিনি রাম্ল করেন।৪

তিনি দ্রুত গতিতে চলছিলেন। ছোট ছোট কদম ফেলে চলছিলেন। চাদর এক কাঁধের ওপর ফেলে রেখেছিলেন, দ্বিতীয় কাঁধ ছিল খালি।৫ তিনি যখন হাজরে আসওয়াদ অতিক্রম করছিলেন তখন সেদিকে ইশারা করে আপন ছড়ির সাহায্যে ইস্তিলাম করছিলেন। তাওয়াফ শেষ হতেই তিনি মাকামে ইবরাহীমের পেছনে গেলেন এবং এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন : وَاتَّخِذُوْا مِنْ مَّقَامِ إِبْرٰهِيْمَ مُصَلًّى এরপর তিনি এখানে দু’রাক‘আত সালাত আদায় করলেন। সালাত সমাপনান্তে তিনি পুনরায় হাজরে আসওয়াদের নিকট গমন করলেন এবং এতে চুমু খেলেন। এরপর সাফা পর্বতের দিকে তাঁর সম্মুখস্থ দরজা হয়ে চললেন। কাছাকাছি হতেই তিনি বললেন :

إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِن شَعَائِرِ اللَّهِ، أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللّٰهُ بِهِ

“সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত। আমি সেখান থেকে শুরু করছি যদ্দ্বারা আল্লাহ শুরু করেছেন।”

এরপর তিনি এতে আরোহণ করলেন। এমন কি ততদূর অবধি আরোহণ করলেন যেখান থেকে বায়তুল্লাহ তাঁর দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল। অতঃপর তিনি কিবলার দিকে ফিরে আল্লাহ তা‘আলার ওয়াহদানিয়াত ও তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দিলেন :

لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ، لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَحْدَهُ، أَنْجَزَ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ

“আল্লাহ ভিন্ন কোন মা‘বূদ নেই; তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। রাজত্ব তাঁর আর সকল হাম্‌দ তথা প্রশংসাও তাঁরই। তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ ভিন্ন কোন মা‘বূদ নেই, তিনি এক; তিনি তাঁর ওয়াদা পালন করেছেন, আপন বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং সমস্ত দল ও উপদলকে একা পর্যুদস্ত করেছেন।”

মক্কায় তিনি ৪/৫ দিন (শনি, রবি, সোম, মঙ্গল ও বুধবার এই কয়দিন) অবস্থান করেন। বৃহস্পতিবার বেলা উঠতেই তিনি সমস্ত মুসলমানকে নিয়ে মিনায় গমন করেন। জোহর ও আসর সালাত তিনি এখানেই আদায় করেন এবং এখানেই রাত্রি যাপন করেন। এদিন ছিল বৃহস্পতিবার দিবাগত জুমু‘আর রাত্রি। সূর্য উঠতেই তিনি আরাফাতের দিকে অগ্রসর হলেন। তিনি দেখতে পেলেন যে, নামিরায় তাঁর জন্য তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে। অনন্তর তিনি এখানেই অবতরণ করলেন। বেলা ঢলে পড়তেই তিনি উটনী “কাসওয়া”-কে প্রস্তুত করার হুকুম দিলেন। অতঃপর সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে ‘আরাফাত প্রান্তরের মাঝখানে মনযিল করেন এবং আপন সওয়ারী পৃষ্ঠে থেকেই তিনি এক ওজস্বিনী ভাষণ দেন। এ ভাষণে তিনি ইসলামের বুনিয়াদসমূহ খোলাখুলিভাবে তুলে ধরেন এবং শিরক ও মূর্খতার বুনিয়াদ ধ্বংস করে দেন। এই ভাষণে তিনি সেই সব হারাম বস্তুকে হারাম বলে ঘোষণা করেন যেগুলো হারাম হওয়ার ব্যাপারে দুনিয়ার তাবত ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠী ঐকমত্য পোষণ করে। আর সেগুলো হল: অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, ধন-সম্পদ ছিনতাই করা, নারীর সতীত্ব-সম্ভ্রম নষ্ট করা। জাহিলিয়াতের তাবৎ বিষয়াদি ও প্রচলিত কাজগুলো আপন কদমতলে দাফন করেন। জাহিলিয়াত আমলের সুদ তিনি সমূলে খতম করেন এবং একে বিলকুল বাতিল বলে অভিহিত করেন। তিনি মহিলাদের সঙ্গে উত্তম আচার-আচরণের উপদেশ দেন এবং তাদের যে সমস্ত অধিকার রয়েছে, অধিকন্তু তাদের জিম্মায় যেসব অধিকার রয়েছে, তার বিশ্লেষণ করেন এবং বলেন যে, নিয়ম মোতাবেক আহার, পোশাক ও খোরপোশ তাদের অধিকার।

উম্মতকে তিনি আল্লাহর কিতাবের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকার ওসিয়ত করেন এবং বলেন: যতদিন তোমরা এর সঙ্গে নিজেদের ভালোভাবে আঁকড়ে রাখবে ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। তিনি তাদেরকে সতর্ক করেন যে, তাদের কাল কিয়ামত দিবসে তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে এবং তাদেরকে এর জবাব দিতে হবে। এ সময় তিনি উপস্থিত সকলকে জিজ্ঞেস করেন: তখন তাঁর সম্পর্কে কি বলবে এবং কি সাক্ষ্য দেবে? সকলেই সমস্বরে বললেন: আমরা সাক্ষ্য দেব যে, আপনি পয়গামে হক এতটুকু কমবেশী না করে পৌঁছে দিয়েছেন, আপন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কল্যাণ কামনার হকও আদায় করেছেন। এতদশ্রবণে তিনি আসমানের দিকে আঙুল ওঠালেন এবং তিনবার আল্লাহ তা‘আলাকে এ বিষয়ে সাক্ষী বানালেন এবং তাদের এও হুকুম দিলেন যে, যারা এখানে উপস্থিত আছে তারা অনুপস্থিত লোকদেরকে এ কথাগুলো যেন পৌঁছে দেয়।

খুতবা শেষ হতেই বিলাল (রা)-কে আযান দেবার হুকুম দিলেন। তিনি আযান দিলেন। এরপর তিনি জোহরের সালাত দুই রাক‘আত আদায় করলেন। ঠিক সেভাবে আসরেরও দুই রাক‘আতই পড়লেন। দিনটা ছিল জুমু‘আর দিন।

সালাত শেষ হতেই সওয়ারীতে আরোহণ করলেন এবং সেই উকূফের জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালেন যেখানে তিনি দীর্ঘক্ষণ ধরে দু‘আ করেছিলেন (জায়গাটি আজ অবধি আরাফাতে বিখ্যাত ও চিহ্নিত)। এখানে এসে তিনি তাঁর উটের ওপর বসলেন এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত দু‘আ ও মুনাজাত, শাহানশাহ রাজাধিরাজের সমীপে কান্নাকাটি, আপন দুর্বলতা ও অসহায়ত্বের বিনীত প্রকাশের মাঝেই মশগুল থাকলেন। দু‘আরত অবস্থায় তিনি তাঁর মুবারক হাত বুক পর্যন্ত তুলতেন যেন কোন ভিক্ষুক-প্রার্থী ও অসহায় মিসকীন এক টুকরো রুটির যাচ্ঞা করছে। দু‘আ ছিল এই :

اللّٰهُمَّ إِنَّكَ تَسْمَعُ كَلَامِي، وَتَرَى مَكَانِي، وَتَعْلَمُ سِرِّي وَعَلَانِيَتِي، لَا يَخْفَى عَلَيْكَ شَيْءٌ مِنْ أَمْرِي، أَنَا الْبَائِسُ الْفَقِيرُ، الْمُسْتَغِيثُ الْمُسْتَجِيرُ، وَالْوَجِلُ الْمُشْفِقُ، الْمُقِرُّ الْمُعْتَرِفُ بِذُنُوبِي، أَسْأَلُكَ مَسْأَلَةَ الْمِسْكِينِ، وَأَبْتَهِلُ إِلَيْكَ ابْتِهَالَ الْمُذْنِبِ الذَّلِيلِ، وَأَدْعُوكَ دُعَاءَ الْخَائِفِ الضَّرِيرِ، مَنْ خَضَعَتْ لَكَ رَقَبَتُهُ، وَفَاضَتْ لَكَ عَيْنَاهُ، وَذَلَّ جَسَدُهُ، وَرَغِمَ أَنْفُهُ لَكَ، اللّٰهُمَّ لَا تَجْعَلْنِي بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا، وَكُنْ بِي رَءُوفًا رَحِيمًا، يَا خَيْرَ الْمَسْئُولِينَ، وَيَا خَيْرَ الْمُعْطِينَ

“হে আল্লাহ! তুমি আমার কথা শুনে থাক এবং আমার জায়গাও তুমি দেখ। আমার গোপন ও প্রকাশ্য সব তুমি জান। তোমার কাছে আমার কোন কিছু প্রচ্ছন্ন বা লুক্কায়িত নেই, থাকতে পারে না। আমি বিপদগ্রস্ত, মুখাপেক্ষী, ফরিয়াদী, আশ্রয়প্রার্থী, অসহায় আপন গুনাহর স্বীকৃতি প্রদান করছি, মেনে নিচ্ছি আমার সকল অপরাধ। তোমার সামনে অসহায় ভিক্ষুকের মত হাত পাতছি আর কাতরভাবে চাইছি যেভাবে অবহেলিত ও লাঞ্ছিত গোনাহগার কাতরভাবে চাইতে থাকে। তোমার কাছে চাইছি যেভাবে চাইতে থাকে ভীত-শংকিত বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি, তেমনিভাবে চাইছি যেমন অবনত শিরে চায় কেউ। আর তার চোখ দিয়ে ঝরতে থাকে অশ্রুরাশি আর সমগ্র দেহমন দিয়ে যে তোমার দরবারে কাতর প্রার্থনা জানায় আর তোমার সামনে নাক ঘষতে থাকে। প্রভু হে! তোমার সকাশে দু‘আ কামনায় আমাকে ব্যর্থকাম কর না এবং আমার অনুকূলে তুমি বড়ই মেহেরবান ও দয়ালু হিসাবে ধরা দাও। ওহে সর্বোত্তম প্রার্থনা পূরণকারী ও সর্বোত্তম সর্বপ্রদাতা প্রভু!”

এ সময় এই আয়াত নাযিল হয় : (সূরা মাইদা-৩)

সূর্যাস্তের পর তিনি আরাফাত থেকে রওয়ানা হলেন এবং উসামা ইবন যায়দ (রা)-কে নিজের পেছনে বসিয়ে নিলেন। তিনি দৃঢ় প্রশান্ত চিত্তে ও ভাবগম্ভীর মর্যাদা সহকারে সম্মুখে অগ্রসর হলেন। উটনীর রশি তিনি এভাবে গুছিয়ে নিয়েছিলেন যে, মনে হচ্ছিল তাঁর মস্তক মুবারক বুঝি উটনীর কুঁজ স্পর্শ করবে। তিনি বলে চলছিলেন, লোক সকল! নিরাপদ প্রশান্তির সঙ্গে চল। গোটা রাস্তা তিনি তালবিয়া পাঠ করেছিলেন যতক্ষণ না তিনি মুযদালিফা গিয়ে পৌঁছেন— এ ধারা অব্যাহত থাকে। মুযদালিফায় পৌঁছেই তিনি হযরত বিলাল (রা)-কে আযান দিতে বলেন। আযান দেওয়া হল। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং উট বসানো ও সামান নামানোর আগে মাগরিবের সালাত আদায় করলেন। লোকেরা সামান নামালে তিনি সালাতু‘ল-এশাও আদায় করলেন, এরপর তিনি আরাম করবার জন্য শুয়ে পড়লেন এবং ফজর অবধি ঘুমালেন।

আওয়াল ওয়াকতে তিনি সালাতুল-ফজর আদায় করলেন। এরপর তিনি সওয়ারীর পৃষ্ঠে আরোহণ করলেন এবং মাশ‘আরুল-হারাম-এ আসেন ও কেবলা-মুখী হয়ে দু‘আ ও মিনতিভরা কান্না, তাকবীর-তাহলীল ও যিকর-এ মশগুল হন। পূর্ব আকাশ ফর্সা হয়ে যাওয়া অবধি তিনি এতে মশগুল রইলেন। এ ছিল সূর্যোদয়ের পূর্বের অবস্থা। অতঃপর তিনি মুযদালিফা থেকে রওয়ানা হন। ফযল ইবন আব্বাস (রা) এ সময় তাঁর উটনী পৃষ্ঠে তাঁর পশ্চাতে উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি বরাবরের মতোই তালবিয়া পাঠ করছিলেন। তিনি ইবন আব্বাস (রা)-কে নির্দেশ দিলেন জামরায়ে ‘আকাবায় পাথর নিক্ষেপের জন্য সাতটি পাথর কুড়িয়ে নিতে। ওয়াদীয়ে মুহাসসারের মাঝামাঝি পৌঁছতেই তিনি তাঁর উটনীর গতি বাড়িয়ে দিলেন এবং তা আরও দ্রুত করলেন। কেননা এটি সেই জায়গা যেখানে হস্তিবাহিনীর ওপর আল্লাহর আযাব নাযিল হয়েছিল। এভাবে তিনি মিনায় পৌঁছলেন এবং সেখান থেকে জামরাতুল-আকাবায় তশরীফ নেন এবং সওয়ারীতে আরোহণপূর্বক সূর্যোদয়ের পর শয়তানের উদ্দেশ্যে পাথর নিক্ষেপ করেন এবং তালবিয়া পাঠ বন্ধ করেন।

এরপর মিনায় প্রত্যাবর্তন করেন। এখানে তিনি একটি বাগ্মিতাপূর্ণ খুতবা দান করেন। এতে তিনি কুরবানীর দিনের সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কে সকলকে অবহিত করেন এবং আল্লাহ তা‘আলার নিকট এই দিনটির যে বিশেষ মর্যাদা রয়েছে তা বর্ণনা করেন। অপরাপর সমস্ত শহরের ওপর মক্কার যে শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য রয়েছে তার উল্লেখ করেন এবং যেই আল্লাহ্‌র কিতাব (কুরআনুল কারীম)-এর আলোকে তাদের নেতৃত্ব দেবে তাঁর অনুসরণ ও আনুগত্য তাদের ওপর ওয়াজিব বলে অভিহিত করেন। এরপর তিনি উপস্থিত লোকদেরকে তাঁর থেকে হজ্ব ও কুরবানীর মসলা-মাসায়েল ও নিয়ম-কানুন জেনে নিতে বলেন। তিনি লোকদেরকে এও বলেন : দেখ, আমার পর তোমরা কাফিরদের মত হয়ে যেও না, তাদের মত পরস্পরের গলা কাটতে লেগে যেও না। তিনি আরও নির্দেশ দেন, কথাগুলো অপর লোকদের পৌঁছে দেবে। খুতবায় তিনি এও ইরশাদ করেন :

اعْبُدُوا رَبَّكُمْ، وَصَلُّوا خَمْسَكُمْ، وَصُومُوا شَهْرَكُمْ، وَأَطِيعُوا ذَا أَمْرِكُمْ، تَدْخُلُوا جَنَّةَ رَبِّكُمْ

“আপন প্রভু প্রতিপালকের ইবাদত কর, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় কর, (রমযান) মাসের সিয়াম পালন কর, শাসন কর্তৃত্বে সমাসীন ব্যক্তির নির্দেশ পালন কর, আপন প্রভু প্রতিপালকের জান্নাতে প্রবেশ করবে।”

সে সময় তিনি লোকদের সামনে বিদায়ী কথাও বলেন এবং এজন্যই এই হজ্জের নাম হয় “হাজ্জাতুল-বিদা” বা বিদায় হজ্জ।

অতঃপর তিনি মিনায় কুরবানীর স্থলে পৌঁছেন এবং তেষট্টিটি উট স্বহস্তে কুরবানী করেন। যতগুলো উট তিনি কুরবানী দিয়েছিলেন হিসাব করে দেখা যায় তত বছরই তিনি হায়াত পেয়েছিলেন। এরপর তিনি থামেন এবং হযরত আলী (রা)-কে বলেন ১০০ পূরণ হওয়ার যতগুলো বাকী আছে তা পূরণ করতে। মোটের ওপর কুরবানী সম্পূর্ণ হতেই ক্ষৌরকার ডেকে পাঠান, মস্তক মুণ্ডন করেন এবং মুণ্ডিত কেশ মুবারক নিকটস্থ লোকদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। এরপর তিনি মক্কায় রওয়ানা হন। তাওয়াফ-ই ইফাদা আদায় করেন যাকে তাওয়াফ-ই যিয়ারাতেও বলা হত। অতঃপর তিনি যমযম কূপের নিকট গমন করেন এবং দাঁড়িয়ে পানি পান করেন। এরপর ঐদিনই মিনায় ফিরে আসেন এবং সেখানেই রাত্রি যাপন করেন। দ্বিতীয় (পর) দিন সূর্যাস্তের তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন। সূর্যাস্তের সময় হতেই তিনি সওয়ারী থেকে অবতরণ করেন, পাথর নিক্ষেপের জন্য গমন করেন এবং জামরা-ই উলা থেকে পাথর নিক্ষেপ শুরু করেন, এরপর জামরা-ই উস্তা ও অতঃপর জামরায়ে আকাবায় সমাপ্ত করেন। মিনায় তিনি দুইটি খুতবা দেন। তন্মধ্যে একটি দেন কুরবানীর দিন যার কথা আমরা একটু আগেই উল্লেখ করেছি, দ্বিতীয়টি কুরবানীর পরদিন।

এখানে তিনি যাত্রা বিরতি করেন এবং আয়্যামু’ত-তাশরীক-এর তিন দিনই পাথর নিক্ষেপ করেন। অতঃপর তিনি মক্কা যাত্রা করেন, শেষ রাত্রে বিদায়ী তাওয়াফ করেন, লোকজনকে তৈরি হওয়ার নির্দেশ দেন এবং মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।৬

পথে গাদীর-ই খুম৭ নামক স্থানে পৌঁছে তিনি একটি খুতবা৮ দেন এবং হযরত আলী (রা)-এর মর্যাদা ও ফযীলত বর্ণনা করেন। এ সময় তিনি বলেন :

مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ، اللّٰهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ، وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ

“আমি যার প্রিয়, আলীও তার প্রিয় হওয়া উচিত। হে আল্লাহ! যে আলীকে ভালবাসবে তুমিও তাকে ভালবাস আর যে তার সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করবে তুমিও তার সঙ্গে শত্রুতা পোষণ কর।”

তিনি যুল-হুলায়ফা এসে রাত্রি যাপন করেন। সওয়াদ-ই মদীনার প্রতি দৃষ্টিপাত হতেই তিনি তিনবার তাকবীর বলেন এবং পাঠ করেন :

لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

“আল্লাহ ব্যতিরেকে কোন ইলাহ নেই; তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই; তাঁরই নিমিত্ত সাম্রাজ্য এবং তাঁরই নিমিত্ত হাম্দ বা প্রশংসা আর তিনি সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।”

তিনি আরও পাঠ করেন :

آيِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ سَاجِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ، صَدَقَ اللّٰهُ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ

“প্রত্যাবর্তন করছি তওবারত, অনুগত, সিজদারত, আমাদের প্রভু প্রতিপালকের দরবারে প্রশংসারত অবস্থায়। আল্লাহ তাঁর ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছেন, তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন, সমস্ত দল-উপদলকে এককভাবে পরাজিত করেছেন।”৯

তিনি দিনের বেলায় মদীনা তায়্যিবায় প্রবেশ করেন।

বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহ (সা)-র খুতবা

এখানে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আরাফাত ময়দানে প্রদত্ত খুতবার পূর্ণ অংশ পেশ করছি, ঠিক তেমনি আয়্যামু’ত-তাশরীকের মধ্যবর্তীতে তৎকর্তৃক প্রদত্ত খুতবাও আমরা নিম্নে উদ্ধৃত করছি। কেননা এই দুইটি অমূল্য খুতবা সীমাহীন গুরুত্ববহ উপদেশে পরিপূর্ণ ও বহুল ফলপ্রসূ।

আরাফার খুতবা

إن دماءكم وأموالكم حرام عليكم كحرمة يومكم هذا، في شهركم هذا، في بلدكم هذا، ألا إن كل شيء من أمر الجاهلية تحت قدمي موضوع، ودماء الجاهلية موضوعة، وإن أول دم أضع من دمائنا دم ابن ربيعة بن الحارث، كان مسترضعا في بني سعد فقتلته هذيل، وربا الجاهلية موضوع، وأول ربا أضع من ربانا ربا العباس بن عبد المطلب، فإنه موضوع كله، فاتقوا الله في النساء، فإنكم أخذتموهن بأمانة الله، واستحللتم فروجهن بكلمة الله، ولكم عليهن أن لا يوطئن فرشكم أحدا تكرهونه، فإن فعلن ذلك فاضربوهن ضربا غير مبرح، ولهن عليكم رزقهن وكسوتهن بالمعروف، وقد تركت فيكم ما لن تضلوا بعده إن اعتصمتم به: كتاب الله، وأنتم تسألون عني، فما أنتم قائلون؟ قالوا: نشهد أنك قد بلغت وأديت ونصحت، فقال بإصبعه السبابة يرفعها إلى السماء وينكتها إلى الناس: اللهم اشهد، ثلاث مرات

“তোমাদের রক্ত এবং তোমাদের ধন-সম্পদ তেমনি পবিত্র ও সম্মানিত যেমন পবিত্র ও সম্মানিত তোমাদের এই দিন, তোমাদের এই মাস ও তোমাদের এই শহর। মনে রেখ, জাহিলী যুগের সকল কিছুই আমার পদতলে পিষ্ট করা হল এবং জাহিলী যুগে অনুষ্ঠিত সকল রক্তপাত (খুনের বদলে খুন, প্রতিশোধাত্মক হত্যাকাণ্ড) আজ নিষিদ্ধ করা হল এবং সর্বপ্রথম আমি (আমার বংশের) ইবন রবী‘আ ইবন হারিছের রক্তের বদলা বাতিল ঘোষণা করছি, যে বনী সা‘দ-এ লালিত-পালিত হয়েছিল এবং হুযায়ল গোত্র তাকে হত্যা করেছিল। জাহিলী যুগের সকল সুদ বাতিল ঘোষিত হল এবং সর্বপ্রথম আমি (আমার বংশের) আব্বাস ইবন ‘আবদিল-মুত্তালিবের সুদ বাতিল ঘোষণা করছি। কেননা এর সবটাই বাতিল। নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসাবে গ্রহণ করেছ এবং তাদের সতীত্ব-সম্ভ্রমকে আল্লাহর কালেমার বিনিময়ে তোমাদের জন্য হালাল করেছ। আর তোমাদের ব্যাপারে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হল, কোন লোককে যেন তোমাদের শয্যাপাশে না আসতে দেয় যাকে তোমরা অপছন্দ কর। তারা যদি তা করে তবে তোমরা তাদেরকে প্রহার করবে, তবে এমনভাবে যেন তার চিহ্ন বাইরে ফুটে না ওঠে। আর তাদের ব্যাপারে তোমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হল, তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদের খোরপোশের ব্যবস্থা করবে। আর আমি তোমাদের কাছে একটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, তোমরা যদি তা মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরে থাক তবে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না : আর তাহল আল্লাহর কিতাব। তোমাদেরকে আমার সম্পর্কে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসা করা হবে সেদিন তোমরা তার কি জবাব দেবে? সাহাবায়ে কিরাম (রা) সমস্বরে উত্তর দিলেন : আমরা বলব, আপনি আল্লাহর পয়গাম আমাদেরকে পৌঁছে দিয়েছেন, আপন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং উম্মাহকে উপদেশ দিয়েছেন। অতঃপর তিনি আসমানের দিকে শাহাদাত অঙ্গুলি উঁচিয়ে তিনবার বললেন : হে আল্লাহ! সাক্ষী থাক।”

আইয়াম-ই তাশরীক-এর মধ্যবর্তীতে যে খুতবা দিয়েছিলেন তার বক্তব্য নিম্নরূপ :

يا أيها الناس، هل تدرون في أي شهر أنتم، وفي أي يوم أنتم، وفي أي بلد أنتم؟ فقالوا: في يوم حرام، وبلد حرام، وشهر حرام، قال: فإن دماءكم وأموالكم وأعراضكم عليكم حرام كحرمة يومكم هذا، في شهركم هذا، في بلدكم هذا، إلى يوم تلقونه، ثم قال: اسمعوا مني تعيشوا، ألا لا تظلموا، ألا لا تظلموا، ألا لا تظلموا، إنه لا يحل مال امرئ مسلم إلا بطيب نفس منه، ألا وإن كل دم ومال ومأثرة كانت في الجاهلية تحت قدمي هذه إلى يوم القيامة، وإن أول دم يوضع دم ربيعة بن الحارث بن عبد المطلب، كان مسترضعا في بني ليث فقتلته هذيل، ألا وإن كل ربا في الجاهلية موضوع، وإن الله عز وجل قضى أن أول ربا يوضع ربا العباس بن عبد المطلب، لكم رءوس أموالكم لا تظلمون ولا تظلمون، ألا وإن الزمان قد استدار كهيئته يوم خلق السماوات والأرض، ثم قرأ:

“লোক সকল! তোমরা কি জান কোন মাস, কোন দিন এবং কোন শহরে তোমরা আছ? জবাবে লোকেরা বলল : সম্মানিত দিনে, সম্মানিত শহরে এবং সম্মানিত মাসে আমরা আছি। তিনি বললেন : তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-সম্পদ সম্মানিত যেমন পবিত্র ও সম্মানিত আজকের এই দিন, এই মাস ও এই শহর। অতঃপর বললেন : আমার কথা শোন যাতে তোমরা সহীহ-শুদ্ধ জীবন যাপন করতে পার। সাবধান! তোমরা জুলুম করবে না। সাবধান! তোমরা জুলুম করবে না। খবরদার! তোমরা জুলুম করবে না। আর কোন মুসলমানের ধন-সম্পত্তি থেকে তার সম্মতি ব্যতিরেকে কোন কিছু গ্রহণ করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। সর্বপ্রকার রক্ত, সব ধরনের ধন-সম্পদ, যা জাহিলী যুগ থেকে চলে আসছে — তা কিয়ামত অবধি বাতিল ঘোষিত হল। আর সর্বপ্রথম যে রক্ত (প্রতিশোধ হিসাবে) বাতিল ঘোষিত হচ্ছে তা রবী‘আ১০ ইবনুল-হারিছ ইবন আবদিল-মুত্তালিবের রক্ত, যে বনী লায়ছ-এ প্রতিপালিত হয়েছিল এবং যাকে হুযায়ল (গোত্রের) লোকেরা হত্যা করেছিল। জাহিলী যুগের সর্বপ্রকার সুদ রহিত করা হল এবং আল্লাহ তা‘আলার ফয়সালা এই যে, সর্বপ্রথম যেই সুদ রহিত করা হবে তা হবে আব্বাস ইবন ‘আবদুল-মুত্তালিবের সুদ। তবে তোমরা তোমাদের মূলধন ফিরে পাবে। এ ব্যাপারে তোমরা নিজেরা অত্যাচারিত হবে না আর তোমরাও কারো ওপর জুলুম করবে না। আদিতে তিনি যখন আসমান-যমীন সৃষ্টি করেছিলেন, কালের আবর্তন-বিবর্তনে আজ সেখানেই এসে পৌঁছেছে।” এরপর তিনি তেলাওয়াত করলেন :

ألا لا ترجعوا بعدي كفارا يضرب بعضكم رقاب بعض، ألا إن الشيطان قد أيس أن يعبده المصلون، ولكنه في التحريش بينكم، واتقوا الله في النساء، فإنهن عندكم عوان لا يملكن لأنفسهن شيئا، وإن لهن عليكم حقا، ولكم عليهن حقا: أن لا يوطئن فرشكم أحدا غيركم، ولا يأذن في بيوتكم لأحد تكرهونه، فإن خفتم نشوزهن فعظوهن واهجروهن في المضاجع واضربوهن ضربا غير مبرح، ولهن رزقهن وكسوتهن بالمعروف، وإنما أخذتموهن بأمانة الله، واستحللتم فروجهن بكلمة الله عز وجل، ألا ومن كانت عنده أمانة فليؤدها إلى من ائتمنه عليها، وبسط يديه وقال: ألا هل بلغت؟ ألا هل بلغت؟ ثم قال: ليبلغ الشاهد الغائب، فرب مبلغ أسعد من سامع

“আর হ্যাঁ, আমার পর আমার অবর্তমানে তোমরা পরস্পর মারামারি করে কাফির হয়ে যেও না। মনে রেখ! শয়তান এ বিষয়ে নিরাশ হয়ে গেছে যে, যারা সালাত আদায় করে তারা কোনদিন তার পূজারী হবে। তবে হ্যাঁ, সে তোমাদের বিভিন্ন রকমের চক্রান্তে উস্কানি দেবে। নারীদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে। কেননা তারা তোমাদের তত্ত্বাবধানে আছে। তারা নিজেদের ব্যাপারে স্বাধীনভাবে কিছু করতে সক্ষম নয়। তোমাদের ওপর তাদের অধিকার রয়েছে এবং তাদের ওপরও তোমাদের অধিকার রয়েছে। তাদের ওপর তোমাদের অধিকার হল, তারা আপন স্বামী ছাড়া তাদের শয্যায় কাউকে প্রবেশাধিকার দেবে না এবং তোমাদের অপছন্দনীয় কাউকে তোমাদের ঘরে প্রবেশের অনুমতি দেবে না। যদি তাদের থেকে অবাধ্যতার আশংকা কর তাহলে তাদেরকে উপদেশ দাও, বোঝাও এবং তাদেরকে শয্যায় পরিত্যাগ কর, পৃথক করে দাও এবং তাদের হালকাভাবে প্রহার কর; আর তাদের ন্যায়সঙ্গতভাবে খোরপোশ প্রদান কর। এ তাদের প্রাপ্য অধিকার। কেননা তোমরা তাদেরকে আল্লাহর নামে তাঁর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর নামে তাদের সতীত্ব-সম্পদ নিজেদের জন্য বৈধ করেছ। মনে রেখ, কারো কাছে অপর কারোর আমানত রক্ষিত থাকলে সে যেন আমানতকারীর নিকট তা প্রত্যর্পণ করে। এতদূর বলার পর তিনি আপন হস্তদ্বয় প্রসারিত করলেন এবং বললেন : আমি কি তোমাদেরকে পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি? আমি কি পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি? অতঃপর যারা এখানে উপস্থিত আছ তারা যেন অনুপস্থিত লোকদের কাছে তা পৌঁছে দেয়। কেননা এমন অনেক অনুপস্থিত লোক আছে যারা উপস্থিত শ্রোতাদের তুলনায় অধিকতর ভাগ্যবান হয়ে থাকে।”

টীকা

  1. ১উদাহরণত এসব বর্ণনায় এত দূর পর্যন্ত পাওয়া যায় যে, তিনি এহরামের সময় কি ধরনের সুগন্ধি ব্যবহার করেছিলেন, কুরবানীর পশু চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে দাগ দিয়েছিলেন, কোন পার্শ্বে ছিল তা, কোন জায়গায় তিনি বিছানা স্থাপন করেছিলেন, কোন স্থানে তাঁকে শিকারকৃত একটি বন্য গর্দভ হাদিয়া হিসাবে পেশ করা হয়েছিল। এমন কি মিনা-র রাতে এই বিশাল ভীড়ের ভেতর সাপ বের হওয়ার এবং তার জীবন নিয়ে বেরিয়ে যাবার ঘটনারও উল্লেখ রয়েছে এসব বর্ণনায়। এতদ্ভিন্ন এই সফরে তিনি যে সমস্ত লোককে নিজের সঙ্গে আপন সওয়ারীতে উঠিয়ে নিয়েছিলেন (ঐদের সংখ্যা আটত্রিশ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে) তাঁদের নাম, এমন কি সেই ক্ষৌরকারের নামেরও উল্লেখ রয়েছে যিনি হুযূর (সা)-এর ক্ষৌরকর্ম সম্পাদনের সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। কর্তিত চুল বণ্টন করার বিস্তারিত বিবরণও এতে রয়েছে যে, ডান পাশের চুল কাদের দেওয়া হয়েছিল, বাম পাশের চুল কাদের দেওয়া হয়েছিল। বিস্তারিত জানতে চাইলে দেখুন শায়খুল হাদীছ মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া (র)-এর حجة الوداع وجزء عمرات النبى صلى الله عليه وسلم শীর্ষক গ্রন্থ এবং বর্তমান লেখকের প্রণীত গ্রন্থের ভূমিকা (বৈরুত সং.)।
  2. ২আমরা এই সংক্ষিপ্তসার হাফেয ‘আল্লামা ইবনুল-কায়্যিম-এর যাদুল-মা‘আদ থেকে গ্রহণ করেছি।
  3. ৩এই সংখ্যা এক লক্ষ চৌদ্দ হাজার থেকে এক লক্ষ তিরিশ হাজার পর্যন্ত বলা হয়েছে।
  4. ৪রাম্‌ল সম্পর্কে জানার জন্য হজ্ব ও যিয়ারত সম্পর্কিত কিতাবাদি দেখুন।
  5. ৫একে ইসলামী পরিভাষায় ইযতিবা‘ (اضطباع) বলা হয়। বিস্তারিত জানতে হজ্ব সম্পর্কিত কিতাবাদি দেখুন।
  6. ৬এই অংশটি যাদু’ল-মা‘আদ থেকে সংক্ষেপে গ্রহণ করা হয়েছে (১৮০-২৪৯ পৃ., ১ম খণ্ড) এবং সে সব আলোচনা বাদ দেওয়া হল যেখানে লেখক বিস্তৃত বর্ণনার আশ্রয় নিয়েছেন। ফকীহ ও মুহাদ্দিছদের মতপার্থক্যও বাদ দেয়া হয়েছে।
  7. ৭গাদীর খুম মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী একটি স্থান। জুহফা থেকে এর ব্যবধান দু’মাইলের।
  8. ৮ইমাম আহমদ, নাসাঈর বর্ণনানুসারে এই খুতবা প্রদানের একটি বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল এই যে, কিছু লোক হযরত আলী (রা)-এর বিরুদ্ধে অহেতুক অভিযোগ উত্থাপন করেছিল এবং তাদের সাথে তাঁর কিছুটা মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। এমন কিছু লোক আলী (রা) সম্পর্কে আপত্তি তুলেছিল যারা ইয়ামনে তাঁর সাথে ছিলেন। তারা হযরত আলী (রা)-র ইনসাফপূর্ণ আচরণ সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছিল যে, তিনি পক্ষপাতিত্বের আশ্রয় নিয়েছিলেন (ইবন কাছীর, ৪র্থ খণ্ড, ৪১৫-১৬)।
  9. ৯মুসলিম, আবু দাউদ প্রভৃতি গ্রন্থে হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) কর্তৃক বর্ণিত। বর্ণনাটি জাফর সাদিক (র) মুহাম্মদ আল-বাকির (র) থেকে এবং তিনি হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণনা করেন।
  10. ১০সহীহ মুসলিম, সুনানে আবী দাউদ প্রভৃতি গ্রন্থে রবী‘আর পরিবর্তে ইবন রবী‘আ বলা হয়েছে। আর এটাই এর মর্ম। কেননা রবী‘আ ইবনুল-হারিছ রাসূল (সা)-এর সম্পর্কিত ভাই। তিনি তাঁর ইন্তিকালের পরেও হযরত ওমর (রা)-এর খিলাফতকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। যেই বর্ণনায় রবী‘আ ইবনুল-হারিছ-এর রক্তপণের কথা বলা হয়েছে তার ব্যাখ্যা এই যে, তিনি পুত্র নিহত হারিছের রক্তপণের অভিভাবক বিধায় যে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে এটা দাবি করার অধিকারী; আর তাই তাঁর নাম নেওয়া হয়েছে। নববীকৃত মুসলিমের ভাষ্য, ১৮৩ পৃ.।