অধ্যায় চার
জাযীরাতুল-আরব১
জাযীরাতুল-আরবের সীমা
জাযীরাতুল-আরব দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে পৃথিবীর বৃহত্তম উপদ্বীপ। ‘আরব পণ্ডিতগণ পরোক্ষভাবে এই এলাকার নামকরণ করেছেন জাযীরাতু’ল-আরব।২ এর তিন দিকেই পানি। এই ভূখণ্ডটি এশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। এর পূর্বে আরব উপসাগর যাকে গ্রীকগণ পারস্য উপসাগর নামে জানে। এর দক্ষিণে ভারত মহাসাগর ও এর পশ্চিমে লোহিত সাগর যা এর আধুনিক মানচিত্রে দেখানো হয়ে থাকে। গ্রীক ও ল্যাটিন পরিভাষায় একে আরব উপসাগর (Sinus Arabicus) নামকরণ করা হয়েছে এবং প্রাচীন আরবী গ্রন্থে একে বাহ্র-ই-কুলযুম নামে স্মরণ করা হয়। এর উত্তর সীমান্ত সেই কাল্পনিক সীমান্ত যা (আরব পণ্ডিতদের পরিভাষায়) আকাবা উপসাগর থেকে আরব উপসাগরে শাতিল আরবের মোহনা অবধি অতিক্রম করে।
মুসলমানরা জাযীরাতু’ল-‘আরবকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেছে। ১. হেজায, আয়লা (আকাবা) থেকে ইয়ামন অবধি এবং তাদের মতে একে হেজায এজন্যই বলা হয় যে, তা সেই পাহাড়ী সিলসিলা নিয়ে গঠিত যা তিহামাকে (যা লোহিত সাগরের উপকূলীয় বেলাভূমি) নজ্দ থেকে পৃথক করে। ২. তিহামা যার কথা এইমাত্র বলা হয়েছে। ৩. ইয়ামন। ৪. নজদ; এ সেই উচ্চ অংশ যা হেজাযের পাহাড়গুলো থেকে শুরু হয়ে পূর্ব দিকে বাহরায়েন প্রান্তর অবধি বিস্তৃত। এ বিস্তৃত ও উচ্চ এলাকায় বহু মরুভূমি ও পাহাড়-পর্বত অবস্থিত। ৫. আরূদ, এর পূর্ব দিকে বাহরায়েন ও পশ্চিম দিকে হেজায অবস্থিত। ইয়ামন ও নজদের মধ্যখানে অবস্থিত হওয়ার কারণে একে আরূদ বলা হয়। একে ইয়ামামাও বলা হয়।৩
জাযীরাতুল আরবের প্রাকৃতিক অবস্থা ও এর অধিবাসী
এই গোটা উপদ্বীপের ওপর মরুপ্রান্তরীয় প্রভাব প্রবল এবং প্রাকৃতিক কার্যকারণ, ভূমিগত বিপর্যয় ও স্বীয় ভৌগোলিক অবস্থানের দরুন এর ওপর শুষ্ক আবহাওয়ার আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। এজন্যই অতীত ও বর্তমান কালে এর অধিবাসীদের সংখ্যা খুবই কম থেকেছে এবং সভ্য সমাজ ও বিরাট কেন্দ্রীয় হুকুমতের অস্তিত্ব এখানে লাভ করতে পারেনি। বেদুইন জীবনধারা ও এর দেহাতী রঙ, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের প্রতি প্রবল ঝোঁক এবং নানা গোত্রের লড়াই-সংঘর্ষের কারণে কৃষ্টি-সভ্যতা শ্যামল-সবুজ এলাকা ও ঐসব জায়গায় গিয়ে জড়ো হয় যেখানে বেশ ভাল বৃষ্টিপাত হয় অথবা যেখানে স্রোতস্বিনী ও ঝর্ণাধারা উৎসারিত হয় কিংবা যেখানে পানি ভূ পৃষ্ঠের কাছাকাছি পাওয়া যায় এবং যেখানে কুয়া খনন করা যায়। এজন্য বলা দরকার যে, আরব উপদ্বীপে জীবনের স্পন্দন পানির বদৌলতেই বেঁচে থাকত। অনন্তর কাফেলা সেদিকেই তার গতি পরিচালিত করত, এরই অনুসন্ধানে ব্যাপৃত থাকত এবং প্রকৃতি বেদুইনদেরকে সব জায়গা থেকে নিয়ে এসে শ্যামল সবুজ এলাকায় জড়ো করত। তারা কৃষকদের মত যমীনের এক অংশে মাটি কামড়ে পড়ে থাকত না, বরং তারা কোন ভূখণ্ডে ততক্ষণ পর্যন্ত অবস্থান করত যতক্ষণ সেখানে পশু খাদ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ঘাসপাতা ও পানি পাওয়া যেত। এই সুবিধা খতম হতেই তারা নতুন জায়গার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ত।
এই জন্য তাদের জীবন ছিল কষ্টসহিষ্ণুতা ও কঠোরতার প্রতিমূর্তি এবং তাদের সমাজ গোত্রের রূপ ধারণ করত। একজন বেদুইনের জন্য গোত্র হত হুকুমত ও জাতীয়তার সমর্থক। এই গোত্রীয় জীবন আরামপ্রিয়তা, স্থিতি ও সংহতি সম্পর্কে হত অজ্ঞ ও অপরিচিত এবং তা কেবল শক্তির ভাষা বুঝত। এ ছিল এমন এক জীবন যা মানুষের জন্য কষ্ট ও দুর্ভোগই ডেকে নিয়ে আসত এবং প্রতিবেশী সুসভ্য জনবসতির নিমিত্ত বিপদ হয়ে থাকত। অতএব তারা নিজেদের মধ্যেও লড়াই করত এবং এর থেকে ফুরসত মিলতেই সভ্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষে প্রবৃত্ত হত।
কিন্তু অন্য দিক থেকে একজন আরব আপন গোত্রের আদব ও প্রথা-পদ্ধতির প্রতি হত অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও একনিষ্ঠ। কখনো কোন সময় সে হত অত্যন্ত উদারচিত্ত ও সহৃদয় মেজবান, যে মেহমানদারীর সর্ববিধ দায়িত্ব অত্যন্ত সন্তুষ্ট চিত্তে আনজাম দিত। যুদ্ধ শেষে সম্পাদিত সন্ধিচুক্তির ব্যাপারে অনুগত থাকত, বন্ধুত্বের হক আদায় করত, প্রচলিত রসম-রেওয়াজ তথা প্রথা-পদ্ধতির শেষ সীমা অবধি সম্মান করত। এইসব বৈশিষ্ট্যের সাক্ষ্য তাদের কাব্যে ও সাহিত্যে, তাদের বিচার ব্যবস্থায়, দৃষ্টান্তে, তাদের উপমা-উৎপ্রেক্ষায়, তাদের রীতিনীতি ও চলনে-বলনে খুব বেশিই পাওয়া যায়।
একজন আরব সাম্যের ভক্ত, স্বাধীনতাপ্রিয়, বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন, কর্মতৎপর ও কর্মী পুরুষ হত। সে নীচ ও হীন কাজ এড়িয়ে চলত। সে তার সীমিত জিন্দেগী ও বেদুইন জীবনের ওপর কেবল সন্তুষ্টই ছিল না বরং গর্বিত ছিল, আপন ভাগ্যে খুশী ও তৃপ্ত ছিল। ধর্মের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অধিকাংশ সময় দুর্বল হত। তাদের গোত্রীয় প্রথা ও পিতৃপুরুষের আচার-পদ্ধতির প্রতি ঈমান হত এর তুলনায় অনেক বেশি মজবুত। তাদের নৈতিক ও চারিত্রিক লক্ষ্য সেই অভিজাতসুলভ ও পুরুষোচিত গুণাবলী দ্বারা ব্যাখ্যাত ছিল যাকে তারা মুরুওয়াত বা মনুষ্যত্ব শব্দ দ্বারা ব্যাখ্যা করত, নিজেদের কাব্যে ও সাহিত্যে যার গুণ গাইত এবং প্রশংসা কীর্তন করত।
তমদ্দুন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রসমূহ
যে সব জায়গায় বৃষ্টি, ঝর্ণা কিংবা কুয়ার পানি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত সেখানে গ্রাম, পল্লী, মৌসুমী বাজার ও মেলার আকারে একটি তমদ্দুন গড়ে উঠত। এসব জিনিসের দ্বারা আরবদের জীবনের ওপর একটি সাধারণ প্রভাব পড়ত। জীবনের এসব কেন্দ্রে যেই সমাজ ও পরিবেশের উদ্ভব হত তার একটি বিশেষ রঙ ও স্বতন্ত্র ধারা হত, তার মধ্য দিয়েই আবহাওয়া, শিল্প, পেশা ও সেই সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থার ভিন্ন ভিন্ন রঙ ফুটে উঠত। অনন্তর মক্কায় এক বিশেষ সমাজ ছিল যার স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঠিক তেমনি হীরা ও ইয়াছরিববাসীদের সমাজও স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর ছিল। ইয়ামনের সমাজ আরব সমাজগুলোর মধ্যে আপন বিশিষ্ট অবস্থা, প্রাচীন সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও নতুন সব রাজনৈতিক কারণে সবচেয়ে বেশি উন্নত ছিল এবং খাদ্যোৎপাদন, পশু পালন, খনিজ সম্পদ আহরণ, নগর ও দুর্গ নির্মাণের ক্ষেত্রে অনেক দূর অগ্রসর ছিল। বিভিন্ন শিল্প ও জীবনের প্রয়োজনীয় উপকরণের জন্য তারা বাইরে থেকে নানা রকম সামান ও বিভিন্ন প্রকার দ্রব্য আমদানী করত এবং ইরাক, সিরিয়া ও আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষা করত।
আরবদের স্তরবিন্যাস ও শ্রেণীবিভাগ
বর্ণনাকারী ও ঐতিহাসিকগণ এ বিষয়ে একমত যে, প্রাচীন আরবগণ নিম্নোক্ত তিন ভাগে বিভক্ত : ১. আরব বায়েদাহ, যারা ইসলামের পূর্বেই খতম হয়ে গিয়েছিল। ২. আরব আরিবাহ, এরা হচ্ছে বনু কাহতান যারা আরব বায়েদার পর এসেছিল। ৩. আরব মুস্তারিবাহ, হযরত ইসমাইল (আ)-এর বংশধর যারা হেজাযে বসতি স্থাপন করেছিল। তারা বংশধারার দিক দিয়ে আরবদেরকে দু’ভাগে বিভক্ত করেন : ১. কাহতানী, যাদের আবাদীর প্রাথমিক কেন্দ্র ছিল ইয়ামন এবং ২. আদনানী, যারা প্রথমে হেজাযে বসতি স্থাপন করেছিল। এভাবেই বংশ বিশেষজ্ঞগণ আদনানের দু’টি উপশাখা আছে বলে মত ব্যক্ত করেন : একটি রবীআ ও অন্যটি মুদার। বনু কাহতান ও বনু আদনান ছিল সেই প্রাচীনকাল থেকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী। ঠিক তেমনি রবীআ ও মুদার গোত্রের মধ্যেও শতাব্দী কাল থেকে শত্রুতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে আসছিল। বংশ বিশেষজ্ঞগণ এ বিষয়ে একমত যে, কাহতানীগণ হল আসল এবং অধিকতর প্রাচীন আর আদনানীগণ এর শাখা৪ যারা তাদের থেকে আরবী শেখে এবং এরপর তাদেরকে হযরত ইসমাইল (আ)-এর বংশধরগণ হেজাযে হিজরত করবার পর আপন করে নেয়। হযরত ইসমাইল (আ) আরব মুস্তারিবাহ অর্থাৎ আদনানীদের পূর্বপুরুষ।
আরবের লোকেরা বংশধারার দিকে বিশেষ খেয়াল রাখত এবং একে বিরাট গুরুত্ব দিত। এর স্বীকৃতি অনারব পণ্ডিতগণও সর্বদাই দিয়ে এসেছেন। অনন্তর ইরানী সেনাপতি রুস্তম তার সভাসদদেরকে, যখন তারা মুসলমানদের পক্ষ থেকে আগত দূত হযরত মুগীরা ইবন শু‘বা (রা)-র ছিন্ন বস্ত্র ও জীর্ণ অবস্থার দরুন অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল, সতর্ক করেন যে, তোমরা তো দেখছি আজীব আহমক আর আশ্চর্য রকম বোকা! তোমরা এও জান না, আরবের লোকেরা খানাপিনা ও পোশাক-পরিচ্ছদকে আদৌ গুরুত্ব দেয় না, বরং তারা বংশধারাকে হেফাজত করে থাকে।৫
ভাষাগত ঐক্য
এই বিরাট বিস্তৃত এলাকার জন্য যা একটি ছোটখাট মহাদেশের মতই প্রায়, এ বিষয়টি মোটেই আশ্চর্যজনক হত না যদি এই ভূখণ্ডে ভাষার আধিক্য ও বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যেত। কেননা গোত্রগুলোর মাঝে বেশ দীর্ঘ দূরত্ব রয়েছে এবং এজন্যও যে, দক্ষিণ অঞ্চলের লোক উত্তর অঞ্চলের লোকের সঙ্গে এবং পূর্বাঞ্চলের লোক পশ্চিমাঞ্চলের লোকের সঙ্গে খুব কমই মিলিত হত। তারা গোত্রীয় অহমিকা ও বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও আভিজাত্যবোধের শিকার থাকত এবং রোম ও পারস্য সীমান্তের নিকটবর্তী বসবাসরত আরব গোত্রগুলো তাদের ভাষা দ্বারা স্বাভাবিকভাবেই, আর তা কমই হোক অথবা বেশি, প্রভাবিত ছিল এবং এটা অনিবার্যও ছিল। অতএব, এ সমস্ত কারণেই মধ্য-ইউরোপ ও ভারত উপমহাদেশে ভাষার বিস্ময়কর আধিক্য পরিলক্ষিত হয়। ভারতীয় সংবিধানে স্বীকৃত জাতীয় ভাষার সংখ্যা ১৫টি। এর ভেতর কতকগুলো স্থানীয় ভাষাও রয়েছে যেগুলোর ব্যবহারকারীদের দোভাষীর প্রয়োজন দেখা দেয় অথবা ইংরেজীর সাহায্য গ্রহণ করতে হয়।
কিন্তু জাযীরাতুল আরবের স্বীয় বিস্তৃতি ও গোত্রের আধিক্য সত্ত্বেও শুরু থেকেই এই বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রয়েছে যে, ইসলামের আবির্ভাব থেকে অদ্যাবধি এর একটিই অভিন্ন ও সাধারণ ভাষা আরবী যা চিরকাল থেকে এই উপদ্বীপের অধিবাসী বেদুইন ও সভ্য কাহতানী ও আদনানী লোকদের কথোপকথন ও পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষার সূত্র হিসাবে চলে আসছে। এ ভাষায় যদিও উচ্চারণগত ও স্থানীয় আঞ্চলিক বুলির মধ্যে কিছুটা স্বাভাবিক পার্থক্য বর্তমান (যা ভাষা দর্শন, ভৌগোলিক ও স্বাতন্ত্র্যপ্রিয় প্রবণতার কারণে জন্মলাভ করে, দূরত্বের কারণে উচ্চারণ ভঙ্গির ভেতর পার্থক্য সৃষ্টি হওয়া অনিবার্যও বটে), তথাপি এর ভেতর একটি ভাষাগত ঐক্যও বিদ্যমান থেকেছে। ইসলামের দাওয়াতের জন্য সহজসাধ্যতা, ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে ত্বরিত গতি, বিস্তৃত জনগোষ্ঠীকে একক (কুরআনী) আরবী ভাষায় সম্বোধন করা এবং এর দ্বারা প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে এই ভাষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
জাতি-গোষ্ঠীর ইতিহাসে জাযীরাতুল-আরব
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে জানা যায় যে, জাযীরাতুল-আরবে প্রাচীন প্রস্তর যুগ (Chellean) থেকে মানব বসতির প্রমাণ পাওয়া যায় এবং যেসব পুরাতন কীর্তি পাওয়া গেছে সে সবই প্রস্তর যুগের প্রাথমিক আমলের সঙ্গে সম্পর্কিত। আরবদের উল্লেখ তাওরাতেও করা হয়েছে যদ্দ্বারা আরবদের সঙ্গে গ্রীকদের সম্পর্কের কথা জানা যায়। তাওরাতে আরবদের যে উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায় তার ইতিহাস ৭৫০-২০০ খৃ. পূ. সনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তেমনি তালমুদেও আরবদের দিকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জুযীফস ফিলাফিউস-এর পুস্তকে (যিনি ৩৭ থেকে ১০০ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন) আরবদের সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য ও নাবাতীয়দের অবস্থার সন্ধান মিলে। কিছু কিছু ভুলত্রুটি ও কিছু কিছু ভুল বোঝাবুঝি সত্ত্বেও, যা ঐসব প্রাচীন রচনাবলীতে পাওয়া যায়, ইসলামের পূর্বে লিখিত গ্রীক ও ল্যাটিন গ্রন্থসমূহেও ঐতিহাসিক অবস্থা, ঘটনাবলী ও গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক তথ্যাদি পাওয়া যায়। সে সবের ভেতর এমন বহু আরব গোত্রের নামও পাওয়া যায় যে, যদি এইসব বই-পুস্তক না থাকত তাহলে আমরা তাদের সম্পর্কে অবহিত হতে পারতাম না। আলেকজান্দ্রিয়া সেইসব গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের অন্তর্গত হিসেবে বিবেচিত হত যেখানে আরবদের অবস্থা, অভ্যাস ও দেশের উৎপাদনের অবস্থা ও প্রকৃতি জানার বিশেষ ব্যবস্থা ছিল যাতে সেখানকার জিনিসপত্র রোম সাগর উপকূলে অবস্থিত দেশগুলোর বণিকদের পর্যন্ত পৌঁছান যায়।
আরবদের কথা সর্বপ্রথম উল্লেখ করেছেন প্রাচীন গ্রীক ঐতিহাসিক আখীলাস (খৃ. পূ. ৫২৫-৪৫৬) ও হেরোডোটাস (খৃ. পূ. ৪৮০-৪২৫)। এ ছাড়া প্রাচীন আমলের আরও কিছু লেখক আছেন যাঁদের বর্ণনায় আরব ও আরব শহরগুলো সম্পর্কে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এসব লেখকের মধ্যে টলেমীর নাম উল্লেখযোগ্য, যিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় খৃ. দ্বিতীয় শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং যিনি অংকশাস্ত্রে আল-মাজেস্তী নামক গ্রন্থ লেখেন যা আরব পাঠ্য তালিকায় একটি পরিচিত পুস্তক। খৃষ্টীয় উৎসেও আরব জাহিলিয়াত ও আরব ইসলাম সম্পর্কে প্রচুর তথ্য-উপকরণ পাওয়া যায় যদিও এর বেশীর ভাগ খৃষ্টবাদের প্রচার এবং এর কেন্দ্রগুলোর বিস্তারিত বিবরণসম্বলিত।
তাওরাতে যেসব আরবদের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায় তারা আ‘রাব অর্থাৎ বেদুইন আরব আর এজন্য যে, তাওরাতে আরব বেদুইনের গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ রয়েছে। তেমনি গ্রীক ও রোমকদের পুঁথি-পুস্তকে ও ইনজীল চতুষ্টয়ে (সুসমাচারসমূহে) যেখানে এ ধরনের গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করা হয়েছে তদ্দ্বারা বেদুইন আরবদেরকেই বোঝানো হয়েছে যারা রোমান সাম্রাজ্যে ও গ্রীক সীমান্ত এলাকাগুলোতে আক্রমণ চালাত, কাফেলা লুট করত এবং ব্যবসায়ী বণিক ও পর্যটকদের নিকট থেকে ট্যাক্স আদায় করত। সিসিলীয় দিওদোরাস আরবদের সম্পর্কে লিখেছেন যে, তারা স্বাধীনতাপ্রেমী, উন্মুক্ত ও খোলা পরিবেশে জীবন যাপনকারী, স্বাধীন ইচ্ছা ও অভিরুচির ধারক। এজন্য হেরোডোটাস এদের সম্পর্কে লিখেছেন যে, তারা সর্বদা এমন সব শক্তির বিরুদ্ধে মোকাবিলা করে যারা তাদেরকে গোলাম বানাতে ও হেনস্থা করতে, লাঞ্ছিত ও অপমানিত করতে চেষ্টা করে। স্বাধীনতা আরবদের এমন এক অনন্য বৈশিষ্ট্য যার জন্য তারা গ্রীক ও ল্যাটিন লেখকদের দৃষ্টিতে এক উজ্জ্বল স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী।
আরব ও ভারতবর্ষের মধ্যকার সম্পর্ক তেমনি পারস্পরিক জানাশোনা, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক লেনদেনে খুবই প্রাচীন এবং এ সম্পর্ক ইসলাম ও এর বিজয়ের বহু পূর্বের। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতবর্ষ আরবদের নিকট সবচেয়ে বেশী পরিচিত এবং ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে খুব কাছাকাছি ছিল যা ভারতীয় ও আরব উৎস ও আধুনিক গবেষণা থেকে জানা যায়।৬
নবুওয়াত ও আসমানী ধর্মগুলোর সঙ্গে আরব উপদ্বীপের সম্পর্ক
আরব উপদ্বীপ বহু নবীর দাওয়াতী কেন্দ্র ও আম্বিয়া আলাইহিমু’স-সালামের জন্মস্থান ছিল। কুরআন পাক বলে :
এই আয়াত দ্বারা হযরত হূদ (আ)-কে বোঝানো হয়েছে যাঁকে ‘আদ গোত্রের নিকট পাঠানো হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে আদ গোত্রের সম্পর্ক ছিল আরব বায়েদার সঙ্গে এবং তারা থাকত আহকাফে। حقف বলা হয় বালির উঁচু টিলাকে। আদ সম্প্রদায়ের বসতি ছিল জাযীরার দক্ষিণে উঁচু টিলার ওপর যা আজকাল রুবউল-খালীর দক্ষিণ-পশ্চিমে হাদারামাওতের কাছাকাছি অবস্থিত। এখানে এখন জীবনযাত্রার কোন লক্ষণই আর অবশিষ্ট নেই, নেই কোন বসতি, অথচ এককালে তা ছিল শস্য-শ্যামল এলাকা ও উদ্যানপূর্ণ শহর যেখানে আদ-এর মত প্রবল পরাক্রমশালী সম্প্রদায় বাস করত। তাদেরকে আল্লাহ পাক (তাদের অবাধ্যতার দরুন) প্রবল বায়ুর দ্বারা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন আর ঝঞ্ঝাবায়ু তাদেরকে বালুর তুফানে ঢেকে ফেলেছিল।৭
আলোচ্য আয়াত আমাদেরকে এও বলে দিচ্ছে যে, হযরত হূদ (আ) এই এলাকায় আগমনকারী প্রথম ও শেষ নবী ছিলেন না। তাঁর আগেও ও পরেও নবী এসেছেন। এজন্যই কুরআন বলছে :
এমনিভাবে ছামূদ জাতির নবী হযরত সালিহ (আ)-এর আবির্ভাবও আরব উপদ্বীপেই হয়। ছামূদগণ ‘আল-হিজর’ নামক স্থানে বসবাস করত যা তাবুক ও হেজাজের মধ্যবর্তী একটি এলাকা। হযরত ইসমাইল (আ) জন্মের পরই মক্কায় এসে গিয়েছিলেন, সেখানেই বসবাস করেন এবং সেখানেই ইনতিকাল করেন। যদি আরব উপদ্বীপকে আরও একটু বিস্তৃত করে মাদয়ানকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাহলে হযরত শু‘আয়ব (আ)-ও আরব প্রমাণিত হন। কারণ মাদয়ান সিরীয় এলাকায় আরব সীমান্তে অবস্থিত ছিল। আবুল ফিদা বলেন :
“মাদয়ানবাসী ছিল আরব এবং মাদয়ানেই থাকত যা মা‘আন-এর নিকটবর্তী ও সিরিয়ার সেদিকে অবস্থিত ছিল যে দিকটি ছিল হেজায সংলগ্ন এবং মৃত সাগর (Dead Sea)-এর কাছাকাছি। তারা ছিল লূত (আ)-এর সম্প্রদায়ের পরবর্তী কালের।”
আরব ভূখণ্ড ছিল বহু নবী-রাসূলের আশ্রয় ও প্রত্যাবর্তনস্থল যাঁদের ওপর আল্লাহর বিশাল বিস্তৃত যমীন সংকীর্ণ করে তোলা হয়েছিল এবং তাঁরা নিজ দেশেই পরদেশী ও পরবাসী হয়ে গিয়েছিল। অনন্তর ঐসব নবী-রাসূল এই দূর-দরাজ ভূখণ্ডকেই বাছাই করছিলেন যে ভূখণ্ড প্রতাপশালী বাদশাহ ও অত্যাচারী শাসকদের প্রভাব থেকে ছিল দূরে— যেমনটি হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সঙ্গে মক্কায় এবং হযরত মূসা (আ)-এর ক্ষেত্রে মাদয়ানে ঘটেছিল। এতদ্ভিন্ন আরও বহু ধর্ম আপন আপন কেন্দ্রগুলোতে ফলে-ফুলে শোভিত হবার সুযোগ না পেয়ে অবশেষে এই উপদ্বীপে এসে বসতি স্থাপন করেছিল। অনন্তর ইয়াহূদীদের একটি বিরাট দল রোমকদের জুলুম-নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ইয়ামান ও ইয়াছরিবে আগমন করে এবং খৃষ্ট ধর্ম রোম সম্রাটের জুলুম ও হত্যার কবল থেকে পালিয়ে এসে নাজরানে আশ্রয় নেয়।৮
টীকা
- ১আমরা এই অংশে সীরাত পাঠকদের জন্য সেই সব মৌলিক জ্ঞাতব্য তথ্যসমূহ বাছাই ও মনোনীত করেছি যেগুলো জ্ঞাত হওয়া জরুরী। যেমন এই ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক অবস্থা, ভৌগোলিক বিবরণ, জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মসমূহের ইতিহাসে এর স্থান, এর বাসিন্দাদের প্রবণতা প্রভৃতি। এতে করে সীরাত অধ্যয়নকারী সেই পরিবেশ সম্পর্কে একবারে অনবহিত থাকবে না যেই পরিবেশে নবুওয়তের কর্মকাণ্ডের মহাঅভিযান সম্পাদন করা হয়েছিল। অত্র গ্রন্থের এই বিষয়বস্তুটি সেই সব প্রাচীন ও আধুনিক গ্রন্থ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে যেসব গ্রন্থ জাযীরাতু’ল-আরবের ওপর লেখা হয়েছে। আমরা বিশেষ করে ড. জাওয়াদ আলীর পুস্তক المفصل في تاريخ العرب قبل الاسلام (১-৯) থেকে বেশি উপকৃত হয়েছি। এর চেয়ে বেশি বিস্তারিত জায়গা সেই সব গ্রন্থ যা জাযীরাতু’ল-আরবের ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কে লেখা হয়েছে অথবা আরব কৃষ্টি ও আরবী সাহিত্যের ইতিহাস সম্পর্কিত। এর সংখ্যা অনেক।
- ২আরব দেশের ক্ষেত্রে জাযীরাতু’ল-আরবের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকে ব্যাপকভাবে চলে আসছে। বস্তুত প্রাচীনকালে জাযীরা ও জাযীরা-নুমার মধ্যে পার্থক্য করার এবং এর জন্য আলাদা শব্দ বলার রেওয়াজ ছিল না। কোন কোন পণ্ডিত একে আধুনিক ভৌগোলিক পরিভাষায় জাযীরা প্রমাণ করার জন্য চেষ্টা করেছেন যার একটি নমুনা ‘আল্লামা খাদরীর তারীখু’ল-উমাম আল-ইসলামিয়া নামক গ্রন্থে দেখা যাবে। কিন্তু এই প্রয়াস লৌকিকতামুক্ত নয় এবং এতে করে জাযীরাতু’ল-আরবের সীমান্ত বহু দূর অবধি নিয়ে যাবার দরকার হয়।
- ৩ভৌগোলিক বর্ণনাকারিগণ এই বণ্টনের সবচেয়ে পুরনো বর্ণনা হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) পর্যন্ত নিয়ে যান।
- ৪বর্তমান যুগের কতক বিশেষজ্ঞের অভিমত হল, মূল আরবগণ আদনানী এবং তারাই প্রথম আরব আরিবাহ। কিন্তু অধিকাংশ ঐতিহাসিকের ধারণা এর বিপরীত। তাঁদের বক্তব্য হল, এই বিভক্তি জাহিলী দলিল-প্রমাণের ওপর স্থাপিত নয়, বরং ইসলামী যুগে লিখিত কিতাবাদি থেকে গৃহীত এবং এর অধিকাংশ বর্ণনা সেইসব বর্ণনাকারীর বক্তব্যের ওপর স্থাপিত যারা কাহতানী ও ইয়ামানী বংশের সঙ্গে সম্পর্কিত। আল্লাহই ভাল জানেন।
- ৫আল-বিদায়া: ইবন কাছীর, ৭ম, পৃ. ৪০।
- ৬বিস্তারিত দ্র. মাওলানা সায়্যিদ সুলায়মান নদভীকৃত عرب وهند کے تعلقات নামক গ্রন্থ যা এ বিষয়ে সর্বোত্তম ও বিস্তৃত গ্রন্থ।
- ৭বিস্তারিত জানতে সূরা আল-হাক্কাহ ৬ ও ৭ নং আয়াত সামনে রাখুন।
- ৮নিবন্ধে এই শেষাংশে আমরা শায়খ মুহাম্মাদ আবু যাহরার ‘খাতামুন্নাবিয়্যীন’ গ্রন্থের ১ম খণ্ড ارض النبوة الاولى هي ارض العرب নামক অধ্যায় থেকে উপকৃত হয়েছি।