অধ্যায় সতেরো
খায়বার যুদ্ধ
(৭ হিজরী)
আল্লাহর পুরস্কার
আল্লাহ তা‘আলা হুদায়বিয়াতে অনুষ্ঠিত বায়‘আতে রিদওয়ান-এ অংশ গ্রহণ-কারীদেরকে, যাঁরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা)-এর আনুগত্য করেছিলেন এবং আল্লাহ তা‘আলার হুকুমকে নিজেদের প্রবৃত্তিজাত কামনা-বাসনা, স্বীয় অভিমত ও বোধশক্তির ওপর অগ্রাধিকার দান করেছিলেন, আসন্ন বিজয় ও প্রচুর ধন-সম্পদের সুসংবাদ দান করেন। ইরশাদ হয় :
খায়বার যুদ্ধ ছিল এসব বিজয়ের প্রারম্ভ ও সূচনামাত্র। খায়বার ছিল একটি ইয়াহুদী নয়া উপনিবেশ। এখানে বড় বড় মজবুত ও সুদৃঢ় দুর্গ ছিল।১ এটি ছিল ইয়াহূদীদের সামরিক অবস্থান এবং জাযীরাতু’ল-আরবে তাদের শেষ দুর্গ। এই ইয়াহূদীরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বরাবর শত্রুতা সাধনে লিপ্ত থাকত এবং একথা কোন সময় ভুলত না যে, তাদের অপরাপর ভাইদের সঙ্গে যা হয়েছে তা তাদের সঙ্গেও হতে পারে। তারা গাতফান কবিলার সঙ্গে মিলিত হয়ে মদীনা তায়্যিবার ওপর হামলার চক্রান্ত করছিল।২ রাসূলুল্লাহ (সা)-ও ইরাদা করলেন যে, এখন তাঁদেরকেও তাদের চক্রান্তের হাত থেকে মুক্তি পেতে হবে এবং সেই সব ফ্রন্টের দিক থেকে নিশ্চিন্ত হতে হবে যাতে নিরাপত্তা অর্জিত হয়। এই এলাকা মদীনার উত্তর-পূর্বে ৭০ মাইল দূরে অবস্থিত ছিল।
নবী করীম (সা)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী
রাসূলুল্লাহ (সা) হুদায়বিয়া থেকে বেরিয়ে মদীনায় যি’ল-হাজ্জ মাসের গোটা এবং মুহাররাম মাসের কিছু অংশ অবস্থান করেন। এরপর তিনি খায়বার অভিমুখে রওনা হন। ‘আমের ইবনু’ল-আকওয়া’ (রা) বাহিনীর সাথে ছিলেন এবং নিম্নোক্ত ছন্দোবদ্ধ কবিতা আবৃত্তি করছিলেন :
وَاللّٰهِ لَوْلَا اللّٰهُ مَا اهْتَدَيْنَا
وَلَا تَصَدَّقْنَا وَلَا صَلَّيْنَا
إِنَّا إِذَا قَوْمٌ بَغَوْا عَلَيْنَا
وَإِنْ أَرَادُوا فِتْنَةً أَبَيْنَا
فَأَنْزِلَنْ سَكِينَةً عَلَيْنَا
وَثَبِّتِ الْأَقْدَامَ إِنْ لَاقَيْنَا“কসম হে আল্লাহ! যদি তুমি আমাদেরকে হেদায়াত না করতে তাহলে আমরা হেদায়াত পেতাম না। না আমরা সাদাকা দিতাম আর না আমরা সালাত আদায় করতাম।
“আমরা তো সেই যাদের ওপর কোন সম্প্রদায় বা জাতিগোষ্ঠী হামলা করলে কিংবা অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইলে আমরা তাদেরকে স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান করি।
“অতএব, তুমি আমাদের ওপর সাকীনা (খাস রহমত, প্রশান্তি) নাযিল কর এবং শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলার মুহূর্তে আমাদের কদমসমূহকে দৃঢ় রাখ।”
রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর এই ঈমানী বাহিনী সহকারে সেখানে গমন করলেন। বাহিনীর সংখ্যা ছিল ১৪০০ এবং তাঁদের সঙ্গে ছিল দু’শ ঘোড়া। তিনি তাদেরকে খায়বার অভিযানে অংশ গ্রহণের অনুমতি দেননি যারা হুদায়বিয়াতে অনুপস্থিত ছিল। মহিলা সাহাবীর সংখ্যা যাঁরা রোগীদের চিকিৎসা সেবা, আহতদের ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ ও পট্টি বাঁধা এবং খাদ্য ও পানির এন্তেজামের যিম্মাদারী ছিল তাঁরা ছিল ২০ জন।
তিনি ইয়াহূদী ও গাতফান গোত্রের মাঝখানে অবস্থিত রাজী নামক স্থানে ছাউনি ফেলার নির্দেশ দিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, তাদের ও খায়বারবাসীদের মধ্যকার রসদ সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা খতম করা। এজন্য যে, তারা পরস্পর মিলিত, সংঘবদ্ধ ও একে অপরের সমর্থক ছিল। সত্বর এর সুফল দেখা দিল। এরা তাদের সমর্থন ও সাহায্য করতে সক্ষম হল না। তারা নিজেদের ঘরবাড়ী ও কারকারবার নিয়েই পড়ে রইল এবং রাসূলুল্লাহ (সা) ও খায়বারবাসীদের জন্য তারা রাস্তা পরিষ্কার করে দিল।
রাসূলুল্লাহ (সা) বাহিনীর জন্য খাদ্য সরবরাহের নির্দেশ দিলে দেখা গেল কেবল ছাতু পাওয়া গেছে। অনন্তর ছাতু খেয়েই সকলে পরিতৃপ্ত হল।৩ এরপর খায়বারের সামনে তাশরীফ নিলে তিনি আল্লাহর দরবারে দু‘আ করলেন, খায়বার বিজয়ের জন্য সাহায্য ভিক্ষা চাইলেন এবং এই স্থানের অনিষ্টকারিতা ও স্থানীয় লোকদের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় কামনা করলেন। তাঁর মুবারক অভ্যাস ছিল যখন তিনি কোন যুদ্ধে গমন করতেন তখন রাত্রিকালে হামলা করতেন না, বরং ভোর হওয়া অবধি অপেক্ষা করতেন। যদি আযানের শব্দ কানে ভেসে আসত তাহলে তিনি অভিযান স্থগিত রাখতেন, হামলা করতেন না। ঠিক তেমনি এখানেও তিনি রাত্রি অতিবাহিত করলেন। সকাল হল, আযানের আওয়াজ শুনতে পেলেন না। এতদ্দৃষ্টে তিনি হামলার নিয়তে সামনে অগ্রসর হলেন। পথিমধ্যে খায়বারের কৃষক মজুরদেরকে কাস্তে-কোদাল হাতে দেখতে পেলেন। তারা যখন রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর বাহিনী দেখতে পেল তখন চিৎকার দিয়ে বলে উঠল : মুহাম্মাদ ও তাঁর বাহিনী এসে গেছে, আর এই বলে তারা পালিয়ে গেল। এতদ্দৃষ্টে তিনি বললেন : اللّٰهُ أَكْبَرُ، خَرِبَتْ خَيْبَرُ আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ! খায়বার ধ্বংস হল। إِنَّا إِذَا نَزَلْنَا بِسَاحَةِ قَوْمٍ فَسَاءَ صَبَاحُ الْمُنْذَرِينَ “আমরা যখন কোন জাতির ওপর আক্রমণোদ্যত হই তখন তাদের সকাল খারাপ হয়ে থাকে যাদেরকে প্রথমেই ভীতি প্রদর্শন ও সতর্ক করা হয়েছে।”৪
বিজয়ী ও সফল অধিনায়ক
রাসূলুল্লাহ (সা) সর্বপ্রথম খায়বারের দুর্গগুলোর দিকে মনোযোগ দিলেন এবং এক এক করে ঐ সব দুর্গ জয় করা শুরু করলেন। ঐ সব কেল্লার মধ্যে এমন একটি কেল্লা ছিল যা নামকরা ইয়াহূদী ঘোড়সওয়ার মারহাবের তখ্তগাহ ছিল।৫ এটি হযরত আলী (রা) জয় করেন। ঘটনা এই যে, এই দুর্গ মুসলমানদের পক্ষে জয় করা খুবই কঠিন ও কষ্টকর প্রমাণিত হয়। কোনভাবেই এটি জয় করা যাচ্ছিল না। হযরত আলী (রা)-র চোখ সে সময় যন্ত্রণাকাতর ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) ফরমান : আগামী কাল পতাকা এমন ব্যক্তি গ্রহণ করবে যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালবাসেন; তার মাধ্যমেই এই দুর্গের বিজয় হবে। এই মহান পদ লাভের জন্য বড় বড় সাহাবায়ে কিরাম (রা) প্রার্থী ছিলেন। সবাই আশা করছিলেন যে, এই মহাসৌভাগ্য তাঁর কপালেই জুটুক। সকালে তিনি হযরত আলী (রা)-কে ডেকে পাঠালেন। তাঁর চোখে তখন যন্ত্রণা। তিনি আসলে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর মুখের লালা তাঁর চোখে লাগিয়ে দিলেন এবং তাঁর জন্য দু‘আ করলেন। তাঁর চোখের যন্ত্রণার তখনই এমন উপশম ঘটল যে, মনে হচ্ছিল চোখে বুঝি কখনো কোন অসুখই করেনি! তিনি তাঁকে পতাকা হস্তান্তর করেন।৬ হযরত আলী (রা) আরয করেন, “আমি ইয়াহূদীদের সঙ্গে ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ করব যতক্ষণ না তারা মুসলমান হয়ে যায়?” রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : তুমি এখান থেকে রওনা হও, তাদের সামনে গিয়ে ছাউনি ফেল। এরপর তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দাও এবং আল্লাহ তা‘আলার এই ক্ষেত্রে যে হক বা অধিকার রয়েছে সে সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত কর। আল্লাহর কসম! যদি তোমার দ্বারা একটি লোকও আল্লাহ তা‘আলা হেদায়াত দান করেন তাহলে তা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম হবে।৭
শেরে খোদা বনাম খ্যাতনামা ইয়াহূদী বীর
হযরত আলী (রা) ইসলামী পতাকা ও মুসলিম সেনাবাহিনী সমভিব্যাহারে খায়বারে উপস্থিত হলে খ্যাতনামা ইয়াহূদী অশ্বারোহী বীর মারহাব কবিতা আবৃত্তি করতে করতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে এল। অতঃপর উভয়ে লড়াইয়ে প্রবৃত্ত হল।
হযরত আলী (রা) প্রথমে তার ওপর একটিই কঠিন আঘাত হানলেন। আঘাতের ফলে তার ঢাল কেটে লৌহ শিরস্ত্রাণ ভেদ করে মেরুদণ্ডে গিয়ে তা পৌঁছে। আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদেরকে বিজয় দান করেন।৮
মুহাম্মাদ ইব্ন মাসলামা (রা)-ও এই যুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন এবং প্রতিপক্ষের কয়েকজন অশ্বারোহী বীর ও সৈনিককে হত্যা করেন।
মেহনত কম, পারিশ্রমিক বেশি
খায়বারের একজন হাবশী গোলাম, যে তার মালিকের নির্দেশে বকরী চরাত, একদিন দেখতে পেল, খায়বারের লোকজনের হাতে অস্ত্র এবং তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। সে তখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করল : আপনারা কি চান আর কিবা আপনাদের অভিপ্রায়? তারা জবাব দিল : আমরা ঐ লোকটির সাথে যুদ্ধ করতে যাচ্ছি যেই লোকটি নবুওয়াতের দাবিদার। নবুওয়াতের উল্লেখ তার অন্তর মানসে একটি বিশেষ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল। সে তার বকরীর পাল নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে উপস্থিত হল এবং জিজ্ঞেস করল : আপনি কি বলে থাকেন এবং কোন জিনিসের দাওয়াত দিচ্ছেন? তিনি জবাবে বললেন : আমি ইসলামের দিকে আহ্বান জানাই এবং এই কথার দিকে : তোমরা সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই আর আমি আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত কর না। গোলাম বলল : আমি যদি এই সাক্ষ্য দেই এবং আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার ওপর ঈমান আনি তাহলে কি পাব? তিনি বললেন, যদি তোমার এই বিশ্বাসের ওপর মৃত্যু হয় তাহলে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে। এতচ্ছ্রবণে সে ইসলাম কবুল করল এবং বলতে লাগল : হে আল্লাহর নবী! আমার কাছে এই বকরীগুলো আমানত রয়েছে। (এগুলো আমি কি করব?) তিনি বললেন : তুমি এগুলো নিয়ে হিসবা’র ময়দানে ছেড়ে দাও। আল্লাহ তোমার এই আমানত আদায় করে দেবেন।
সে তাই করল। আল্লাহর কুদরত দেখুন! বকরীগুলো তাদের মালিকের কাছে এমনিতেই ফিরে গেল। আর ইয়াহূদী মালিকও জানতে পারল যে, তার গোলাম মুসলমান হয়ে গেছে। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা) দাঁড়িয়ে গেলেন এবং সকলকে সম্বোধন করলেন, তাদেরকে উপদেশ দিলেন এবং জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করলেন। যখন উভয় পক্ষ যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয় তখন শহীদদের কাতারে কৃষ্ণকায় গোলামটিও ছিল। মুসলমানরা তার লাশ তুলে নিজেদের তাঁবুতে নিয়ে এল। কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) শামিয়ানার দিকে দৃষ্টি ক্ষেপণ করলেন। এরপর তিনি সাহাবায়ে কিরামের দিকে ফিরে বললেন, “আল্লাহ তা‘আলা এই গোলামের সাথে খুবই সৌজন্যমূলক ব্যবহার করেছেন এবং তাকে খায়বারে পৌঁছে দিয়েছেন। আমি দেখলাম যে, তার শিয়রের দিকে জান্নাতের দু’টি হুরী বিদ্যমান, অথচ আল্লাহ তা‘আলার উদ্দেশ্যে সে একটি সিজদাও করেনি।”৯
“এজন্য আপনার সাহচর্য এখতিয়ার করিনি”
এক বেদুইন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে হাযির হল, ঈমান আনল, তাঁর আনুগত্য কবুল করল এবং বলল : আমিও আপনার সঙ্গে হিজরত করব। তিনি তাকে কতক সাহাবার হাতে সোপর্দ করলেন এবং বললেন : এর দিকে খেয়াল রেখ। খায়বার যুদ্ধের সময় কিছু যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হস্তগত হলে তিনি তা বণ্টন করেন। এই বেদুইন সে সময় চারণক্ষেত্রে গিয়েছিল। সে ফিরে এসে দেখতে পেল তাকেও একটা অংশ দেওয়া হয়েছে। সে বলল : এগুলো কি? লোকেরা তাকে বলল, এটা তোমার অংশ যা রাসূলুল্লাহ (সা) তোমাকে দিয়েছেন। সে ঐগুলো নিয়ে হুযূর (সা)-এর খেদমতে হাযির হল এবং জিজ্ঞেস করল : ইয়া রাসূলাল্লাহ! এগুলো কি? তিনি বললেন : এগুলো তোমার অংশ। সে বলল : এর খাতিরে আমি আপনার সঙ্গে সঙ্গে আসি নাই। আমি তো এজন্য আপনার আনুগত্য করেছিলাম যাতে আমার এই জায়গায়, নিজের কণ্ঠনালীর দিকে ইঙ্গিত করে, শত্রুর নিক্ষিপ্ত কোন তীর লাগবে, আমি মারা যাব এবং জান্নাতে পৌঁছে যাব। তিনি বললেন : যদি তোমার নিয়ত সহীহ-শুদ্ধ হয়ে থাকে তাহলে তেমনটিই আল্লাহ করবেন।
খায়বারে যখন শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ হল এবং শহীদদের লাশ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে আনা হল তখন ঐ সৌভাগ্যবান ব্যক্তিটির লাশও সেখানে ছিল। লাশটিকে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন : একি সেই ব্যক্তির লাশ? সাহাবায়ে কিরাম (রা) জবাব দিলেন : জী, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে সে মু‘আমালা সত্য করেছে, তাই আল্লাহ তা‘আলাও তার অভিলাষ সত্য করে দেখিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) আপন জোব্বা মুবারক দিয়ে তাকে কাফন দিলেন, এরপর তার জানাযা আদায় করলেন এবং তার জন্য এই দু‘আ করলেন, “হে আল্লাহ! তোমার এই বান্দা তোমার রাস্তায় হিজরতের জন্য বেরিয়েছিল, এ তোমার রাস্তায় শহীদ হয়েছে আর আমি তার সাক্ষী।”১০
খায়বারে অবস্থানের শর্ত
মোটের ওপর এভাবেই একের পর এক কেল্লার পর কেল্লা মুসলমানদের হাতে বিজিত হতে থাকে এবং কয়েকদিন ধরে অব্যাহত যুদ্ধ ও অবরোধের মাঝে অতিবাহিত হতে থাকে, এমন কি এমতাবস্থায় আর না পেরে শেষ পর্যন্ত ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ (সা)-র খেদমতে সন্ধির প্রস্তাব পেশ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু এবার তাঁর ইচ্ছাই ছিল তাদেরকে সেখান থেকে উচ্ছেদ করা ও নির্বাসনে পাঠানো। তারা বলল : হে মুহাম্মাদ (সা)! আমাদেরকে আপনি এখানেই অবস্থান করার অনুমতি দিন। যমীনের দেখাশোনা ও ক্ষেত-খামারে আমরা মশগুল থাকব। যেহেতু এ বিষয়ে আপনাদের তুলনায় আমরাই বেশি ওয়াকিফহাল। রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাহাবাদের ক্ষেত-খামার ও কৃষি কর্মের অভিজ্ঞতা ছিল না। যদি তাঁরা এ কাজ হাতে তুলে নিতেন তাহলে তাঁদের গোটা সময় একাজেই ব্যয়িত হত। অনন্তর তিনি তাদেরকে এই শর্তে খায়বারে অবস্থানের অনুমতি দিলেন যে, সমস্ত উৎপাদিত ফল-ফসলের অর্ধেক তারা মুসলমানদেরকে দেবে এবং রাসূলুল্লাহ (সা) যতদিন চাইবেন কেবল ততদিনই এই চুক্তি বলবৎ থাকবে।১১
রাসূলুল্লাহ (সা) উৎপাদিত ফল-ফসল বণ্টনের জন্য তাদের নিকট আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)-কে পাঠাতেন। তিনি সে সব পরিমাপপূর্বক দু’অংশে ভাগ করে দিতেন। এরপর তিনি তাদেরকে বলতেন : এ দু’টোর ভেতর যেটা তোমাদের পছন্দ নিয়ে নাও। এতদ্দৃষ্টে তারা বলত : এইরূপ ইনসাফের ওপরই আসমান যমীন টিকে আছে।১২
ধর্মীয় সহনশীলতা ও অন্তরের প্রশস্ততা
খায়বার যুদ্ধে যেসব যুদ্ধলব্ধ সম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়েছিল তার মধ্যে তাওরাতের কয়েকটি কপিও ছিল। তারা (ইয়াহূদীরা) দরখাস্ত করল যে, তা তাদেরকে দিয়ে দেওয়া হোক। রাসূলুল্লাহ (সা) এ সব কপি তাদেরকে সোপর্দ করার নির্দেশ দেন।১৩
ইয়াহূদী পণ্ডিত ড. ইসরাঈল ওয়েলফিনসন এই ঘটনার ওপর পর্যালোচনা পেশ করতে গিয়ে বলেন :
“এই ঘটনা থেকে আমরা পরিমাপ করতে পারি যে, এই সব ধর্মীয় সহীফার প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অন্তরে কোন পর্যায়ের সম্মান ও শ্রদ্ধা ছিল। তাঁর এই উদারতা ও সহনশীলতার বিরাট প্রভাব পড়ে ইয়াহূদীদের ওপর। তারা তাঁর এই বদান্যতা ভুলতে পারে না যে, তিনি তাদের পবিত্র ধর্মপুস্তকের সঙ্গে এমন কোন আচরণ করেননি যদ্বারা তার অসম্মান হয়। এর বিপরীতে তাদের সেই ঘটনা বেশ ভালই মনে আছে যখন রোমানরা জেরুসালেম খৃ. পূ. ৭০ সনে জয় করে ঐ সব পবিত্র সহীফায় অগ্নি সংযোগ করে এবং সে সব পদদলিত করে। ঠিক তেমনি ঈর্ষাকাতর ও সাম্প্রদায়িক খৃষ্টানরা স্পেনে ইয়াহূদীদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালানোকালীন তাওরাতের সহীফাগুলোকে আগুনে দগ্ধ করে। এই সেই বিরাট পার্থক্য যা ঐসব বিজয়ী (যাদের কথা একটু ওপরে বলা হয়) এবং ইসলামের নবীর মধ্যে আমরা দেখতে পাই।”১৪
জা‘ফর ইবন আবী তালিব (রা)-এর আগমন
এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চাচাতো ভাই জা‘ফর ইবন আবী তালিব (রা) ও তাঁর বন্ধুরা এসে তাঁর সঙ্গে মিলিত হন। তাঁদের আগমনে তিনি নিরতিশয় আনন্দিত হন। তিনি অত্যন্ত উৎসাহ ও আবেগের সঙ্গে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান এবং তাঁর কপালে চুমু দেন ও বলেন, “আল্লাহর কসম! আমি জানি না আমি কিসে বেশি খুশি হয়েছি : খায়বার বিজয়ে, নাকি জা‘ফর (রা)-এর আগমনে।”১৫
ইয়াহূদীদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র
এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বিষ প্রদান করা হয়। সালাম ইবন মাশকাম নামক ইয়াহূদীর স্ত্রী যায়নব বিনতে হারিছ বিষমিশ্রিত একটি ভুনা বকরী তোহফা হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে পেশ করে। সে প্রথমেই জিজ্ঞেস করে, বকরীর কোন অংশ তাঁর বেশি প্রিয়? তিনি বলেছিলেন, রান। এতে সে রানের অংশে বেশি করে বিষ মিশিয়েছিল। তিনি যখন রানের থেকে কিছু অংশ ভেঙে খেতে শুরু করেন তখন ঐ গোশতের টুকরোই তাঁকে অবহিত করে যে, এতে বিষ মিশ্রিত রয়েছে। তিনি তৎক্ষণাৎ তা উগরে ফেলে দেন।
এরপর তিনি ইয়াহূদীদের সমবেত করে তাদেরকে বলেন : আমি যদি তোমাদেরকে কিছু জিজ্ঞেস করি তোমরা কি তার ঠিক জবাব দেবে? তারা বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন : তোমরা কি এই বকরীতে বিষ মিশিয়েছিলে? তারা স্বীকার করল যে, হ্যাঁ, তারা বিষ মিশিয়েছে। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন : কিসে তোমাদেরকে এতে প্ররোচিত করেছিল? উত্তরে তারা জানায় : আমরা ভেবেছিলাম, আপনি যদি (না‘ঊযুবিল্লাহ) মিথ্যাবাদী হন তাহলে আমরা আপনার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাব। আর আপনি যদি সত্যি সত্যি নবী হন তাহলে বিষ আপনার ওপর কোন ক্রিয়াই করবে না। এরপর ঐ মহিলাকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে হাজির করা হল। সেও তার অপরাধ স্বীকার করল এবং বলল : আমি আপনাকে জানে মারার ইচ্ছা করেছিলাম। তিনি বললেন : আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে আমার ওপর জয়ী হতে দিতে পারেন না। অতঃপর সাহাবায়ে কিরাম (রা) অনুমতি চাইলেন মহিলাটিকে তার এই ঘৃণ্য অপরাধের দরুন হত্যা করতে। কিন্তু তিনি বললেন : না, তা হয় না। এ সময় তিনি এ ব্যাপারে মহিলাটিকে আর কিছু বলেননি এবং তাকে কোন প্রকার শাস্তিও দেননি, হত্যা করার অনুমতি তো দূরে থাক। কিন্তু পরে যখন তার বিষমিশ্রিত খাবার গ্রহণের ফলে বিশর ইবনু’ল-বারাআ ইবন মা‘রুর (রা) নামক সাহাবীর ইন্তেকাল হল তখন কিসাস হিসেবে মহিলাটিকে হত্যা করা হয়।১৬
খায়বার যুদ্ধের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া
খায়বার যুদ্ধ ও এ যুদ্ধে মুসলমানদের শানদার বিজয় আরবের সেই সব গোত্রের ওপর বিরাট শুভ ও কল্যাণকর প্রভাব ফেলে যারা তখন অবধি ইসলাম কবুল করেনি। তারা খায়বারে ইয়াহূদীদের সামরিক শক্তি, তাদের ধন-সম্পদের প্রাচুর্য, পর্যাপ্ত খাদ্যদ্রব্য, সমরোপকরণের আধিক্য, সুদৃঢ় দুর্গসমূহ, আক্রমণকারী ফৌজ ও অভিজ্ঞ জেনারেলদের কারণে এর অজেয় ও দুর্ভেদ্য হওয়া সম্পর্কে ভাল রকম অবহিত ছিল। তারা আরও জানত যে, তাদের মধ্যে মারহাব ও হারিছ ইব্ন আবী যয়নবের মত অভিজ্ঞ অশ্বারোহী ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সমর বিশেষজ্ঞ আছে। কিন্তু খায়বার বিজয় তাদের সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে এবং তাদের মনোবল ও পরবর্তী ঘটনাবলীর ওপর এর গভীর প্রভাব ফেলে।
ড. ইসরাঈল ওয়েলফিনসন খায়বার যুদ্ধ এবং ইসলামের ইতিহাসের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে পর্যালোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন :
“এতে কোনই সন্দেহ নেই যে, মুসলিম বিজয়ের ইতিহাসে খায়বার যুদ্ধের বিরাট গুরুত্ব রয়েছে। এটা এই কারণে যে, আরবের সমস্ত গোত্র খুবই চিন্তাযুক্তভাবে এর পরিণতির অপেক্ষা করছিল। আর এর ফয়সালা আনসার ও ইয়াহূদীদের তলোয়ারের ঝংকারের ওপর নির্ভর করছিল। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বহু দুশমন আরবের বিভিন্ন শহর ও পল্লীতে এই যুদ্ধের ব্যাপারে বড় আশায় বুক বেঁধেছিল।”১৭
যুদ্ধলব্ধ সম্পদ
রাসূলুল্লাহ (সা) যখন খায়বার বিজয় থেকে অবসর পেলেন তখন তিনি ফিদাকে (একটি আবাদী পল্লী এলাকা, হেজাযের উচ্চতর অংশে অন্যান্য আবাদী পল্লী এলাকার মতোই একটি ছোটখাট ক্ষুদ্র রাজ্য১৮)-এর দিকে মনোযোগ দিলেন। ইয়াহূদীরা সবকিছুর অর্ধেক প্রদানের শর্তে সন্ধি করতে চাইল। তিনি তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। এ থেকে যা পাওয়া যেত তিনি তা নিজের ও মুসলমানদের কল্যাণে যেখানে যেমন দরকার ব্যয় করতেন।১৯
এরপর তিনি ওয়াদীউ’ল-কুরায়২০ গমন করলেন। এটি খায়বার ও তায়মা’র মাঝখানে একটি নতুন বসতি ছিল যা ইসলামের পূর্বে ইয়াহূদীরা আবাদ করেছিল। অবস্থানগতভাবে তাদের জন্য এর একটি কেন্দ্রীয় মর্যাদা ছিল। আরবের কিছু লোকও এসে তাদের সাথে শামিল হয়ে গিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং বললেন, “যদি তোমরা ইসলাম কবুল কর তাহলে তোমাদের জীবন ও ধন-সম্পদ নিরাপদ থাকবে আর তাদের হিসাব হবে আল্লাহর যিম্মায়।”
এই যুদ্ধে কয়েকটি মোকাবিলা হয় যেগুলোতে যুবায়র ইবনু’ল-আওয়াম (রা)-এর বীরত্ব প্রকাশিত হয় এবং বিজয় ও সাফল্যের স্বর্ণ মুকুট তাঁর মাথায় অর্পিত হয়। অনন্তর দ্বিতীয় দিনেই ইয়াহূদীদের হাতে যা কিছু ছিল তা তারা মুসলমানদের হাতে দিয়ে দেয়। এইসব যুদ্ধে মুসলমানদের প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সামগ্রী হস্তগত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) এইসব সম্পদ সাহাবায়ে কিরাম (রা)-এর মধ্যে বণ্টন করে দেন এবং ভূ-সম্পত্তি ও খেজুর বাগান ইয়াহূদীদের হাতে ছেড়ে দেন আর এর ওপর সকল বিষয়ের নিষ্পত্তি ঘটে।
তায়মা’র২১ ইয়াহূদীরা যখন জানতে পারল যে, রাসূলুল্লাহ (সা) খায়বার, ফিদাক ও ওয়াদীউ’ল-কুরার বাসিন্দাদের সঙ্গে এভাবে নিষ্পত্তি করেছেন তখন তারাও রাসূলুল্লাহ (সা)-র সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করল। তাদের মালমাতা ও সহায়-সম্পত্তি তাদেরই দখলে থাকল এবং রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলেন।২২
মুহাজিরদের আত্মশুদ্ধি ও সংযম
মুসলমানরা যখন মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলেন তখন মুহাজিররা আনসারদের সেই সব দান সামগ্রী ফিরিয়ে দিতে চাইলেন যা তারা (আনসাররা) মুহাজিরদের দুরবস্থা ও সংকটের সময় খেজুর বৃক্ষ ও অন্যান্য বাগ-বাগিচার আকারে দিয়েছিলেন। কেননা খায়বারে মুহাজিররা নিজেরাই ভূসম্পত্তির মালিক হয়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁদের কাছে বাগ-বাগিচাও ছিল। আনাস ইবন মালিক (রা)-এর মাতা উম্মু সুলায়ম (রা) সেই সময় রাসূলুল্লাহ (সা)-কে কিছু খেজুর গাছ দান করেছিলেন। তিনি তা তাঁর মুক্ত ক্রীতদাসী উম্মু আয়মানকে দান করেছিলেন। ফিদাক থেকে পাবার পর তিনি এই গাছ উম্মু সুলায়ম (রা)-কে ফিরিয়ে দেন এবং উম্মু আয়মানকে প্রতিটি খেজুর গাছের বিনিময়ে দশটি করে ফিদাকের বাগানের খেজুর গাছ দান করেন।২৩
খায়বার যুদ্ধের পরও অনেক অভিযান রাসূলুল্লাহ (সা) পাঠিয়েছিলেন এবং জলীলু’ল-কদর সাহাবাদেরকে এসব অভিযানে আমীর নিযুক্ত করেন। এসব অভিযানের কোন কোনটিতে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং কোন কোনটিতে পরিণতি যুদ্ধ অবধি গড়ায়নি।২৪
‘উমরাতু’ল-কাযা
৭ম হিজরীর দ্বিতীয় অর্দ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা) মুসলমানদেরকে নিয়ে ‘উমরাতু’ল-কাযা আদায়ের নিয়তে মক্কা শরীফ গমন করেন। কুরায়শরা এতে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি। তারা মুসলমানদেরকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেয় এবং নিজেদের ঘরে তালা লাগিয়ে কুআয়কিআন পর্বতে২৫ চলে যায়। তিনি তিন দিন সেখানে অবস্থান করেন এবং ‘উমরা আদায় করেন। আল্লাহ তা‘আলা এই ঘটনার দিকে ইঙ্গিতপূর্বক এরশাদ করেন :
মেয়ে প্রতিপালনে প্রতিযোগিতা ও অধিকারের সাম্য
ইসলামের প্রভাবে ঐ সব লোকের মন-মস্তিষ্কে বিরাট বিপ্লব সৃষ্টি হয়। যেই কন্যা সন্তান এককালে খান্দানের জন্য ও অভিজাত কওমের নেতৃবর্গের দৃষ্টিতে লজ্জা ও শরমের বিষয় ছিল (এবং কোন কোন গোত্রে তাদেরকে জীবিত দাফন করার প্রথা ছিল) আজ এমন প্রিয় বিষয়ে পরিণত হয়েছিল যে, কন্যা সন্তান প্রতিপালন ও প্রশিক্ষণের জন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা পর্যন্ত দেখা দিল। মুসলমান ছিল সকলেই সমান এবং তাদের অধিকারও ছিল সমান। কারো যদি কোন বিষয়ে অগ্রাধিকার ও শ্রেষ্ঠত্ব ছিল তবে সেই শ্রেষ্ঠত্ব ও অগ্রাধিকার ছিল ইল্ম, ‘আমল ও কোন যৌক্তিক ভিত্তির ওপর। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন মক্কা থেকে প্রত্যাবর্তনের অভিলাষী হলেন তখন সায়্যিদুনা হযরত হামযা (রা)-র ছোট্ট বাচ্চা উমামা ‘চাচা! চাচা’ বলে ডাকতে ডাকতে পেছনে দৌড়লেন। হযরত ‘আলী (রা) তাকে কোলে তুলে নিলেন, হযরত ফাতেমা (রা)-কে সোপর্দ করলেন এবং বললেন : দেখ, এ আমার চাচার মেয়ে। এখন যায়দ (ইবন হারিছা) ও জা‘ফর (রা) এর মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়ে গেল। সকলেরই ইচ্ছা উমামাকে সেই প্রতিপালন করবে। হযরত ‘আলী (রা) বললেন : একে আমি নিচ্ছি, এ আমার চাচাতো বোন। হযরত জা‘ফর (রা) বললেন : এ তো আমারও চাচাতো বোন আর তার খালা আমার স্ত্রী। হযরত যায়দ (রা) বললেন : (ইসলামের আত্মীয়তা সূত্রে) এ আমার ভ্রাতুষ্পুত্রী। রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত জা‘ফরের অনুকূলে রায় প্রদান করলেন এবং বললেন : যেহেতু মেয়ের খালা তার ঘরে এবং খালা মায়ের স্থলাভিষিক্ত হয়ে থাকে (বিধায় সে সেখানে বেশি আদর পাবে এবং সেখানে সে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে)। অতঃপর তিনি হযরত ‘আলী (রা)-কে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বললেন : তুমি আমার এবং আমি তোমার। হযরত জা‘ফর (রা)-কে বললেন, “তুমি আকারে-প্রকারে ও জীবন-চরিতের দিক দিয়ে আমার সদৃশ।” হযরত যায়দ (রা)-কে বললেন, “তুমি আমার ভাই ও বন্ধু (মাওলা)।”
টীকা
- ১এইসব কেল্লার মধ্যে না’ইম, ক্বামূস, হিসনু’শ-শাক, হিসন নাতাত, হিসনু’স-সুলালিম, হিসনু’ল-ওয়াতীহ, হিসনু’ল-কুতায়বা সর্বাধিক বিখ্যাত ছিল। ইয়াকূবী লিখেছেন যে, খায়বারে ২৫ (পঁচিশ) হাজার যুদ্ধবাজ সৈন্য বর্তমান ছিল (২য় খণ্ড, ৫৬; মৌলবী মুজীবুল্লাহ নদভীকৃত গ্রন্থ “সাহাবা ও তাবিঈন” থেকে বর্ণিত, দারুল-মুসান্নিফীন, আজমগড় প্রকাশিত)।
- ২বিখ্যাত ইংরেজ প্রাচ্যবিদ মন্টগোমারী ওয়াট তাঁর “Muhammad: Prophet and Statesman” নামক গ্রন্থে লিখেছেন যে, খায়বারের ইয়াহূদীরা, বিশেষত বনী নাদীর গোত্রের সেই সব সর্দার যাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনা থেকে উচ্ছেদ করেছিলেন, মুহাম্মাদ (সা)-এর বিরুদ্ধে অন্তরে হিংসা পোষণ করত। এরাই ছিল সেই সব লোক যারা আরবের অপরাপর গোত্রকে নিজেদের সম্পদের মাধ্যমে উস্কে দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামিয়ে দিয়েছিল। আর এটাই ছিল সেই বুনিয়াদী কারণ দরুন মুহাম্মাদ (সা) খায়বারে আক্রমণ অভিযান চালিয়েছিলেন (পৃ. ১৮৯, লন্ডন ১৯৬১)। এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য কেবল ইয়াহূদীদের সেই শক্তি চূর্ণ করাই ছিল না যা খায়বারে সমবেত হয়েছিল, বরং হেজায ও নজদের মধ্যবর্তী উত্তর ও জাযীরাতু’ল-আরবের মাঝে এক বিরাট শক্তিশালী গোত্র গাতফানের দিক থেকেও নিশ্চিন্ত হওয়াও উদ্দেশ্য ছিল যা আরব গোত্রগুলোর একটি অত্যন্ত যুদ্ধবাজ ও শক্তিশালী সমষ্টি ছিল। তাদের দিক থেকে নিরাপদ না হয়ে মক্কাভিমুখে নিশ্চিন্তে সেনাভিযান পরিচালনা সম্ভব ছিল না।
- ৩ইবন কাছীর, ২য় খণ্ড, ৩৪৫-৪৬; এছাড়া সহীহ বুখারী, গাযওয়ায়ে খায়বার শীর্ষক অধ্যায়।
- ৪সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, ৩২ বর্ষ-৩০।
- ৫দুর্গের নাম ছিল কামূস।
- ৬সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, খায়বার যুদ্ধ শীর্ষক অধ্যায়।
- ৭সহীহ বুখারী, বাব গাযওয়া খায়বার, সহীহ মুসলিম, নাসাঈ; লাল উট আরবে বিরাট সম্পদ ও একটি দুর্লভ বস্তু মনে করা হয়।
- ৮কোন কোন সীরাত প্রণেতা একে না’ইম দুর্গ জয়ের সঙ্গে উদ্ধৃত করেছেন এবং কেউ কেউ একে কামূস দুর্গ জয়ের সঙ্গে। বুখারীতে এর বিভিন্ন টুকরো উল্লিখিত হয়েছে, কিন্তু দুর্গের নাম নেই। ইবন হিশাম প্রভৃতিতে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে মারহাবের হত্যাকারী বলা হয়েছে। কিন্তু সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় হযরত আলী (রা)-র নাম পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেই সঙ্গে পঠিত কবিতাও।
- ৯যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৩৯৪ পৃ.।
- ১০যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৩৯৪ পৃ.।
- ১১যাদুল-মা‘আদ, ৩৯৪-৯৫; বিস্তারিত দ্র. সুনানে আবী দাউদ, আল-মুসাকাত অধ্যায়।
- ১২ফুতূহুল-বুলদান, বালাযুরীকৃত, ৩৪ পৃ.।
- ১৩তারীখুল-খামীস, ২য় খণ্ড, ৬০ পৃ.।
- ১৪তারীখুল-ইয়াহূদ ফী বিলাদিল-আরব, পৃ. ১৭০।
- ১৫যাদুল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৩৯৭ পৃ.।
- ১৬বুখারী, হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে খুব সংক্ষেপে এই রিওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন।
- ১৭তা’রীখুল ইয়াহুদ ফী বিলাদি’ল ‘আরব, ১৬২ পৃ.।
- ১৮এই পল্লীর জনবসতি ইয়াহূদী বনী মুররা ও বনী সা‘দ ইবন বকরের গোত্রের জনসম্বলিত ছিল (নিহায়াতুল-আরাব ১৭.২০৯)।
- ১৯সীরাত ইবন হিশাম, ২খ, ৩৮৮।
- ২০ওয়াদীউ’ল-কুরা বহু গ্রামবিশিষ্ট উপত্যকাকে বলা হয়। এখানে আরব ও ইয়াহূদীরা বাস করত। জাযীরাতু’ল আরবের শস্য-শ্যামল ও সবুজ এলাকার অন্তর্গত। এতে ঝর্ণা ও কুয়াও পাওয়া যায়।
- ২১এটি ওয়াদীউ’ল-কুরা ও সিরিয়ার মধ্যবর্তীতে অবস্থিত। সিরিয়ার নিকটবর্তী একটি পল্লী। প্রাচীনকালে সিরিয়া থেকে আগত হাজী সাহেবানের পথে পড়ত। ইয়াহূদী কবি সামওয়ালের বিখ্যাত দুর্গ “আল-আবলাকু’ল-ফারদ” এখানেই অবস্থিত ছিল।
- ২২যাদু’ল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪০৫ পৃ.।
- ২৩যাদু’ল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪০৬; মুসলিম এই ঘটনা বিস্তারিতভাবে “কিতাবু’ল-জিহাদ ওয়া’স-সিয়ার” এ, رد المهاجرين إلى الأنصار منائحهم শীর্ষক অধ্যায়ে বিবৃত করেছেন। এতে কুরায়জা ও নাদীর বিজয়েরও উল্লেখ রয়েছে।
- ২৪বিস্তারিত যাদু’ল-মা‘আদ, ১ম খণ্ড, ৪০৯-১০।
- ২৫সহীহ বুখারী, ‘উমরাতু’ল কাযা শীর্ষক অধ্যায়।